3 of 4

১০৬. উপবাস-ধৰ্ম্মের শ্রেষ্ঠতা ও বিধি

১০৬তম অধ্যায়

উপবাস-ধৰ্ম্মের শ্রেষ্ঠতা ও বিধি

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! কি নিমিত্ত ব্রাহ্মণাদি বর্ণচতুষ্টয় এবং ম্লেচ্ছজাতিরাও উপবাসপরায়ণ হইয়া থাকে? ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়জাতির ব্রাদিনিয়মপ্রতিপালনেরই বিধি বিহিত আছে; কিন্তু উপবাস করিয়া তাহাদিগের কি ফললাভ হইয়া থাকে, এক্ষণে মনুষ্য নিয়মানুষ্ঠান ও পরম পুণ্যজনক সদগতিলাভের একমাত্র উপায় উপবাস করিয়া কিরূপ কার্য্য প্রভাবে সে অধৰ্ম্ম হইতে মুক্তিলাভ করিয়া ধার্ম্মিক হয়, কিরূপে তাহার স্বর্গ ও পুণ্যলাভ হইয়া থাকে, উপবাস করিয়া কোন্ বস্তু দান করা কর্ত্তব্য এবং কোনরূপ ধর্ম্মাচরণদ্বারা মনুষ্য সুখলাভ করিতে পারে, আপনি এই সমস্ত বিষয় সবিস্তর কীৰ্ত্তন করুন।”

ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! উপবাস করিলে যে উৎকৃষ্ট ফললাভ হয় তাহা আমি পূর্ব্বেই শ্রবণ করিয়াছি। তুমি এক্ষণে যেমন আমাকে উপবাসবিধি জিজ্ঞাসা করিতেছ, এইরূপ আমি পূৰ্ব্বে তপোধন অঙ্গিরাকে জিজ্ঞাসা করিলে তিনি কহিয়াছিলেন, গৃহস্থ ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়ের তিন রাত্ৰি পর্য্যন্ত উপবাস বিহিত হইয়াছে। তিন রাত্রির অধিক উপবাস করা উহাদিগের নিতান্ত অনুচিত। উহারা দুই রাত্রি ও এক রাত্রি উপবাস করিতে পারেন। বৈশ্য ও শূদ্রের দুই রাত্ৰি পর্য্যন্ত উপবাস বিহিত আছে। তিন রাত্রি উপবাস উহাদিগের নিতান্ত নিষিদ্ধ। মনুষ্য জিতেন্দ্রিয় হইয়া পঞ্চমী, ষষ্ঠী ও পূর্ণিমাতে একবারমাত্র আহার করিলে ক্ষমা, রূপ ও শাস্ত্রজ্ঞানসম্পন্ন হয়। সে কদাচ বংশহীন বা দরিদ্র হয় না, দেবপূজায় তাহার অনুরাগ জন্মে এবং সে সতত সৎকুলসম্ভূত ব্রাহ্মণগণকে ভোজন করাইয়া থাকে। যিনি অষ্টমী ও কৃষ্ণপক্ষীয় চতুর্দ্দশীতে উপবাস করেন, তিনি নির্ব্ব্যাধি ও বলবীর্য্যসম্পন্ন হয়েন।

“যিনি অগ্রহায়ণমাস একাহার করিয়া অতিবাহিত করেন এবং ভক্তিপূৰ্ব্বক ব্রাহ্মণভোজন করান, তিনি ব্যাধি ও পাপ হইতে মুক্ত হইয়া থাকেন; তাঁহার সমস্ত বিষয়েই কল্যাণলাভ হয় এবং তিনি নিতান্ত ধনধান্যপরিপূর্ণ ও বলবীর্য্যসম্পন্ন হয়েন। যিনি পৌষমাস একাহারদ্বারা অতিবাহিত করেন, তিনি সৌভাগ্যশালী, প্রিয়দর্শন ও যশোভাগী হইয়া থাকেন। যিনি একাহারদ্বারা মাঘমাস অতিক্রম করেন, তিনি সুসমৃদ্ধবংশে জন্মগ্রহণ করিয়া জ্ঞাতিগণমধ্যে প্রাধান্যলাভ করিতে সমর্থ হয়েন। যিনি ফাল্গুনমাস একাহারদ্বারা অতিবাহিত করেন, তিনি মহিলাগণের নিতান্ত প্রিয় হয়েন এবং মহিলাগণ সতত তাহার বশীভূত থাকে। যিনি একাহার করিয়া চৈত্রমাস অতিবাহিত করেন, তিনি সুসমৃদ্ধবংশে জন্মগ্রহণ করিয়া থাকেন। যিনি জিতেন্দ্রিয় হইয়া একাহার দ্বারা বৈশাখমাস অতিক্রম করেন, তিনি জ্ঞাতিগণমধ্যে প্রাধান্যলাভ করিতে পারেন। যিনি একাহার করিয়া জৈষ্ঠমাস অতিবাহিত করেন, তাঁহার সমতুল ঐশ্বর্য্য লাভ হয়। যিনি একাহার করিয়া আষাঢ়মাস অতিক্রম করেন, তিনি ধনধান্যসম্পন্ন ও বহুপুত্রযুক্ত হইয়া থাকেন। যিনি একাহার করিয়া শ্রাবণমাস অতিক্রম করেন, তিনি যে দেশে বাস করিয়া থাকেন, সেই দেশেই আধিপত্যবিস্তার করিতে সমর্থ হয়েন এবং তাহা হইতে তাহার জ্ঞাতিদিগের সমৃদ্ধিলাভ হইয়া থাকে। যিনি একাহারী হইয়া ভাদ্রমাস অতিবাহিত করেন, তাহার স্থিরলক্ষ্মীলাভ হয়। যিনি একাহারী হইয়া আশ্বিনমাস অতিক্রম করেন, তিনি শুদ্ধিযুক্ত, বাহনাচ্য ও বহুপুত্রসম্পন্ন হইয়া থাকেন। যিনি একাহারী হইয়া কার্ত্তিকমাস অতিক্রম করেন, তিনি শূর, বহুভাৰ্য্যাসম্পন্ন ও কীর্ত্তিমান হয়েন। এই আমি তোমার নিকট মাসোপবাসের বিধি ও ফল কীৰ্ত্তন করিলাম।

“যিনি, পক্ষান্তরে [পনের দিন অন্তর] অন্নভোজন করেন তিনি গোসম্পদ, বহুপুত্রযুক্ত ও দীর্ঘায়ু হইয়া থাকেন। যিনি দ্বাদশ বৎসর মাসে তিন রাত্রি উপবাস করেন, তাঁহার নির্ব্বিঘ্নে গণাধিপত্যলাভ হয়। এক্ষণে আমি যে সমস্ত নিয়মের উল্লেখ করিলাম, তাহা দ্বাদশ বৎসর প্রতিপালন করিবে। যিনি কেবল দিবসে একবার ও রজনীযোগে একবারমাত্র ভোজন করেন এবং অহিংসানিরত হইয়া হোমাদি কার্য্যের অনুষ্ঠানে প্রবৃত্ত হয়েন, তিনি ছয় বৎসরে সিদ্ধিলাভ করিতে পারেন; তাহার অগ্নিষ্টোমযজ্ঞের ফললাভ হয়; তিনি নৃত্যগীতনিনাদিত স্ত্রীসহসঙ্কুল অপ্সরালোকে রজোগুণশূন্য হইয়া বিহার ও সুবর্ণবর্ণ বিমানে আরোহণ করিতে সমর্থ হয়েন, তাঁহার সহস্র বৎসর ব্রহ্মলোকে বাস হয় এবং ব্রহ্মলোকে বাসকাল অতীত হইলে তিনি পুনরায় পৃথিবীতে গমন করিয়া মাহাত্ম্য লাভ করেন। যিনি একবৎসরকাল একাহারী হইয়া থাকেন, তাহার অচিরাৎ যজ্ঞের ফললাভ হয় এবং তিনি দশ সহস্র বৎসর স্বর্গে বাস করিয়া পুনরায় পৃথিবীতে জন্মগ্রহণপূর্ব্বক মাহাত্ম্যলাভ করিয়া থাকেন। যিনি অহিংসানিরত, সত্যবাদী ও জিতেন্দ্রিয় হইয়া সংবৎসরকাল ত্রিরাত্রি উপবাসের পর চতুর্থ দিবসে আহার করেন, তাঁহার বাজপেয় যজ্ঞের ফলাভ হয় এবং তিনি দশ সহস্র বৎসর স্বর্গে বাস করিতে পারেন। যিনি একবৎসরকাল পাঁচদিন উপবাসের পর ষষ্ঠ দিবসে আহার করেন, তাহার অশ্বমেধ যজ্ঞের ফললাভ হয় এবং তিনি চক্রাকবাহিত বিমানে আরোহণপূর্ব্বক স্বর্গে গমন করিয়া চত্বারিংশৎ সহস্র বৎসর বাস করেন। যিনি সংবৎসরকাল সাত দিন উপবাসের পর অষ্টম দিবসে আহার করেন, তাঁহার গোমেধ যজ্ঞের ফললাভ হয় এবং তিনি হংসসারসযুক্ত বিমানে আরোহণপূর্ব্বক স্বর্গে গমন করিয়া পঞ্চশত সহস্র বৎসর বাস করেন। যিনি একবৎসরকাল পক্ষান্তে আহার করেন, তাঁহার ছয় মাস অনশনের তুল্য ফললাভ হয় এবং তিনি যষ্ঠি সহস্র বৎসর স্বর্গে বাস করিয়া বীণা ও বেণুর মধুর শব্দে প্রতিবোধিত হইয়া থাকেন। যিনি সংবৎসরকাল মাসে মাসে সলিলমাত্র পান করেন, তাঁহার বিশ্বজিৎযজ্ঞের ফলাভ হয় এবং তিনি সিংহ, ব্যাঘ্র প্রভৃতি হিংস্র-জন্তুগণবাহিত বিমানে আরোহণপূর্ব্বক স্বর্গে গমন করিয়া সপ্ততি সহস্র বৎসর বাস করেন। এক মাসের অধিককাল উপবাস কাহারও পক্ষে বিহিত হয় নাই। যিনি ব্যাধিরহিত হইয়া অকাতরে এই সমুদয় উপবাস করেন, তাঁহার পদে পদে যজ্ঞফললাভ হয়; তিনি হংসযুক্ত বিমানে আরোহণপূর্ব্বক স্বর্গে গমন করিয়া লক্ষ বৎসর বাস করেন এবং বহুসংখ্যক অঙ্গরা তাঁহার সহিত বিহার করিয়া থাকে। আর যিনি ব্যাধিগ্রস্ত ও কাতর হইয়াও এই সমুদয় উপবাস করেন, তিনি সহস্র হংসযুক্ত বিমানে আরোহণপূর্ব্বক স্বর্গে গমন করিয়া লক্ষ বৎসর বাস করেন এবং তিনি নিদ্রিত হইলে স্বর্গীয় মহিলাগণ কাঞ্চী ও নুপুর শব্দে তাঁহাকে জাগরিত করে।

স্বর্ণার্থী ব্যক্তি ইহলোকে ক্ষীণ হইলে বলধান, ক্ষতাঙ্গ হইলে প্রতিকারবিধান, ব্যাধিত হইলে ঔষধসেবন, ক্রূদ্ধ হইলে প্রসাদন ও দুঃখিত হইলে অর্থাদিদ্বারা দুঃখাপনোদন প্রীতিকর জ্ঞান করেন না। এই নিমিত্ত তিনি দেহান্তে দেবলোকে সুবর্ণবর্ণ স্ত্রীশতসমাকীর্ণ বিমানে আরোহণপূৰ্ব্বক ভ্রমণ করিয়া থাকেন এবং অলঙ্কৃত বিশুদ্ধচিত্ত, সুস্থ, সফলকাম ও পাপহীন হইয়া যারপরনাই সুখলাভে সমর্থ হয়েন। যিনি অনাহারে প্রাণত্যাগ করেন, তাঁহার গাত্রে যতগুলি রোমকূপ বিদ্যমান থাকে, তত সহস্র বৎসর তাঁহার স্বর্গবাস হয় এবং তিনি তরুণসূর্য্যসঙ্কাশ, বৈদূর্য্যমুক্তাখচিত, বীণামুরজনিনাদিত, পতাকাপরিশোভিত, দিব্যঘণ্টামুখরিত বিমানে আরোহণপূর্ব্বক পরিভ্রমণ করিয়া থাকেন। বেদ অপেক্ষা উৎকৃষ্ট শাস্ত্র, মাতার তুল্য গুরু, ধৰ্ম্ম অপেক্ষা পরম লাভ, অনশন অপেক্ষা তপ এবং ভূলোক ও দ্যুলোকে ব্রাহ্মণ অপেক্ষা পরম পাবন আর কিছুই নাই। দেবগণ উপবাসদ্বারাই স্বর্গলাভ এবং ঋষিগণ উপবাস করিয়াই পরম সিদ্ধি লাভ করিয়াছেন। পূৰ্ব্বে মহর্ষি বিশ্বামিত্র একাহারী হইয়া দিব্য সহস্র বৎসর অতিবাহিত করিয়াছিলেন; সেই নিমিত্ত তাহার ব্রাহ্মণত্বলাভ হয়। আর মহর্ষি চ্যবন, জমদগ্নি, বশিষ্ঠ, গৌতম ও ভৃগু এই সমস্ত ক্ষমাশীল মহাত্মারা উপবাস দ্বারাই স্বর্গলাভ করিয়াছেন। পূৰ্ব্বে মহর্ষি অঙ্গিরা অন্যান্য মহর্ষিগণকে এই উপবাস বিষয়ে শিক্ষা প্রদান করিয়াছিলেন। যিনি, অন্যকে এই উপবাসব্রতে দীক্ষিত করেন, তাঁহার কদাচই দুঃখ উপস্থিত হয় না। হে যুধিষ্ঠির! যে ব্যক্তি এই মহর্ষি অঙ্গিরার প্রবর্ত্তিত উপবাসবিধি পাঠ বা শ্রবণ করেন, তাঁহার সমুদয় পাপ নাশ হয়; তাঁহার মন কোন দোষে অভিভূত হয় না, তিনি অনায়াসে পশু-পক্ষাদির শব্দ হৃদয়ঙ্গম করিতে পারেন এবং তাঁহার কীৰ্ত্তিলাভ হয়।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *