3 of 4

১১১. বৃহস্পতিবর্ণিত পরলোকর্ত্তা

১১১তম অধ্যায়

বৃহস্পতিবর্ণিত পরলোকর্ত্তা

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! মানবগণ কি নিমিত্ত বারংবার জন্মপরিগ্রহ করে, কি কার্য্যদ্বারা তাহাদের স্বর্গ ও কি কার্য্যদ্বারা তাহাদের নরকভাগ হয় এবং তাহারা এই লোক ক্ষণভঙ্গুর কলেবর পরিত্যাগপূর্ব্বক পরলোকে প্রস্থান করিলে কে মহা তাহাদিগের অনুগামী হয়, এই সমুদয় বৃত্তান্ত সবিস্তর কীৰ্ত্তন করুন।”

পাণ্ডুবংশাবতংস ধৰ্ম্মরাজ এইরূপ প্রশ্ন করিবামাত্র মহাত্মা ভীষ্ম আকাশে দৃষ্টিপাতপূৰ্ব্বক বৃহস্পতিকে আগমন করিতে দেখিয়া যুধিষ্ঠিরকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, “বৎস! ঐ দেখ, উদারবুদ্ধি ভগবান্ বৃহস্পতি এই স্থানে আগমন করিতেছেন। তুমি উহার নিকট এই বিষয়ে জিজ্ঞাসা কর। উঁহার তুল্য সদ্বক্তা আর কেহই নাই। উনি ভিন্ন অন্য কেহ কখনই ইহার সদুত্তর প্রদানে সমর্থ হইবেন না।”

ধর্ম্মপরায়ণ মহাত্মা ভীষ্ম ও যুধিষ্ঠির এইরূপ কথোপকথন করিতেছেন, এমন সময়ে বিশুদ্ধাত্মা ভগবান্ বৃহস্পতি সুরলোক হইতে সেই স্থানে সমুপস্থিত হইলেন। তখন ধর্ম্মপরায়ণ যুধিষ্ঠির, মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র ও তত্ৰত্য অন্যান্য সভাসদগণ তাঁহার যথোচিত সৎকার করিলেন। অনন্তর ধর্ম্মরাজ বিনীতভাবে তাঁহাকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, “ভগবন্! কোন ধর্ম্মই আপনার অবিদিত নাই; অতএব মনুষ্য পরলোকগমন করিলে পিতা, মাতা, গুরু, পুত্র, জ্ঞাতি, সম্বন্ধী ও মিত্রবর্গের মধ্যে কোন্ ব্যক্তি তাহার সহিত পাপপুণ্য ভোগ করে এবং মনুষ্য বিনশ্বর দেহত্যাগপূৰ্ব্বক পরলোকে গমন করিলে কে-ই বা তাহার অনুগামী হইয়া থাকে, তাহা কীর্ত্তন করুন।”

বৃহস্পতি কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! মনুষ্য একাকীই জন্ম-মরণের বশীভূত হয় এবং স্বর্গনরক ভোগ করিয়া থাকে। পিতা, মাতা, ভ্রাতা, পুত্র, গুরু, জ্ঞাতি, সম্বন্ধী ও বান্ধবগণের মধ্যে কেহই মৃতব্যক্তির সহিত সুখদুঃখ ভোগ করে না। মৃতব্যক্তির পরিবারগণ কাষ্ঠ ও লোষ্ট্রের ন্যায় মৃতদেহ পরিত্যাগপূর্ব্বক মুহূর্ত্তকাল রোদন করিয়া আবাসে প্রত্যাগমন করে, ঐ সময় একমাত্র ধর্ম্মই তাহার অনুগমন করিয়া থাকে; অতএব সৰ্ব্বদা ধৰ্ম্মানুষ্ঠান করা মনুষ্যের অবশ্য কর্ত্তব্য। ধর্ম্মপরায়ণ হইলে স্বর্গ ও অধর্ম্মাক্রান্ত হইলে নরকভোগ করিতে হয়। অতএব বিজ্ঞ ব্যক্তিরা ন্যায়ানুগত অর্থদ্বারা সর্ব্বদা ধৰ্ম্মানুষ্ঠান করিবেন। ধৰ্ম্মই পরলোকে মনুষ্যের একমাত্র সহায় হইয়া থাকে। অনেকানেক জ্ঞানবান ব্যক্তিও অন্যের হিতাকাঙ্ক্ষী অথবা লোভ, মোহ, দয়া বা ভয়ের বশীভূত হইয়া অকাৰ্য্যের অনুষ্ঠান করেন, কিন্তু তাহা কোনরূপেই বিধেয় নহে। ধর্ম্ম, অর্থ ও কাম এই তিনটি জীবনের ফলস্বরূপ। অতএব ধর্ম্মানুসারে এ সমুদয়ের অনুষ্ঠান করা লোকের অবশ্য কর্ত্তব্য।”

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “ভগবন্‌! আমি আপনার মুখে ধর্ম্মযুক্ত হিতকর বাক্যসমুদয় শ্রবণ করিলাম, এক্ষণে মৃতদেহ চক্ষুর অগোচর হইলে ধর্ম্ম কিরূপে তাহার অনুসরণ করে, তাহা পরিজ্ঞাত হইতে আমার নিতান্ত বাসনা হইতেছে; আপনি ঐ বিষয় কীর্ত্তন করুন।”

বৃহস্পতি কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! পৃথিবী, বায়ু, আকাশ, সলিল, জ্যোতি, মন, যম, বুদ্ধি ও আত্মা ইহারা সমুদয় প্রাণীর ধৰ্ম্মাধৰ্ম্মের সাক্ষিস্বরূপ। জীব ত্বক, অস্থি, মাংস, শুক্র ও শোণিতনিৰ্ম্মিত দেহকে পরিত্যাগ করিলে উহারা উহাকে পরিত্যাগ করে। তখন ধৰ্ম্ম উহাদের সহিত অলক্ষিতভাবে জীবের অনুগমনে প্রবৃত্ত হয়। জীব পরলোকে স্বর্গ বা নরকভোগ করিয়া পুনরায় শরীরপরিগ্রহ করিলে তখন পঞ্চভূতের অধিষ্ঠাত্রী দেবতাগণ পুনরায় উহার শুভাশুভ কৰ্ম্মসমুদয় দর্শন করিয়া থাকেন। যাঁহারা ধর্ম্মপরায়ণ হয়েন, তাঁহারা উভয়লোকে সুখভোগ করিতে সমর্থ হইয়া থাকেন, সন্দেহ নাই।”

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “ভগবন্! ধৰ্ম্ম যেরূপে জীবাত্মার অনুগমন করেন, তাহা আপনি কীৰ্ত্তন করিলেন, এক্ষণে যেরূপে রেতঃ উৎপন্ন হয়, তাহা কীৰ্ত্তন করুন।”

বৃহস্পতি কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! পৃথিবী, বায়ু, আকাশ, সলিল, জ্যোতি ও মন শরীরস্থ এই সমুদয় ইন্দ্রিয় অন্নাদিভোজনদ্বারা পরিতৃপ্ত হইলে রেতঃ উৎপন্ন হয়। স্ত্রীপুরুষের সহযোগসময়ে ঐ রেতঃপ্রভাবেই গর্ভের সঞ্চার হইয়া থাকে।”

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “ভগবন্! আমি আপনার মুখে গর্ভের উৎপত্তি শ্রবণ করিলাম, এক্ষণে সূক্ষ্ম জীব কি প্রকারে রেতঃসম্ভূত স্থূলদেহের সহিত তাদাত্ম প্রাপ্ত হয়, তাহা কীৰ্ত্তন করুন।”

বৃহস্পতি কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! জীব রেতোমধ্যে প্রবিষ্ট হইবামাত্র তত্রত্য পঞ্চভূত উহাকে আবরণ করে, তন্নিবন্ধনই উহার পাঞ্চভৌতিক দেহের সহিত তাদাত্মলাভ হয়। জীব ঐ পঞ্চভূতকে আশ্রয় করিয়াই ইহলোকে বর্ত্তমান থাকে, আর উহাদিগকে পরিত্যাগ করিলেই পুরলোকে গমন করে। কৰ্ম্মপ্রভাবে ঐ পরলোক হইতে পুনরায় তাহাকে ইহলোকে আগমনপূর্ব্বক পাঞ্চভৌতিক কলেবর পরিত্যাগ করিতে হয়। তখন ইন্দ্রিয়াধিষ্ঠাত্রী দেবতাগণ পুনরায় তাহার শুভাশুভ কার্য্য দর্শন করিতে থাকেন।”

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “ভগবন্‌! জীবাত্মা পাঞ্চভৌতিক কলেবর পরিত্যাগ করিয়া কোন স্থানে অবস্থানপুৰ্ব্বক সুখদুঃখ ভোগ করিয়া থাকে, তাহা কীৰ্ত্তন করুন।”

বৃহস্পতি কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ। জীবাত্মা স্বীয় কর্ম্মপ্রভাবে প্রথম রেতঃ আশ্রয় করিয়া পরিশেষে স্ত্রীদিগের গর্ভকোষে প্রবেশপূর্ব্বক যথাকালে ইহলোকে সমাগত ও পরলোকগত হয়। এইরূপে মানগণ স্ব স্ব কর্ম্মপ্রভাবে বারংবার সংসারচক্রে পরিভ্রমণ করিয়া যমদূতদিগের প্রহার ও বিবিধ যন্ত্রণা সহ্য করিয়া থাকে। সমুদয় প্রাণীকেই জন্মাবধি স্বীয় ধার্ম্মাধৰ্ম্মের ফলভোগ করিতে হয়। যে ব্যক্তি জন্মাবধি যথাশক্তি ধর্ম্মানুষ্ঠান করে, সে সতত সুখভোগ করিয়া থাকে। যে ব্যক্তি ধর্ম্ম ও অধৰ্ম্ম উভয়ই অনুষ্ঠান করে, তাহাকে সুখ ও দুঃখ উভয়ই ভোগ করিতে হয়। আর যে ব্যক্তি নিরন্তর অধর্ম্মে প্রবৃত্ত হয়, সে দেহান্তে যমলোকে অশেষ যন্ত্রণা ভোগ করিয়া পরিশেষে তির্য্যগযোনি লাভ করে। ইতিহাস, পুরাণ ও বেদে নির্দ্দিষ্ট আছে, যমলোকে দেবতাদিগের বাসোপযোগী স্থানের ন্যায় অতিপবিত্র স্থান এবং তির্য্যগযোনিদিগের বাসোপযোগী স্থান অপেক্ষাও অপবিত্র স্থানসমুদয় বিদ্যমান আছে। যাঁহারা ইহলোকে ধৰ্ম্মানুষ্ঠান করেন, তাঁহাদিগকে তথায় নিয়ত সুখভোগ এবং যাহারা ইহলোকে অধৰ্ম্মানুষ্ঠান করে, তাহাদিগকে তথায় নিয়ত দুঃখভোগ করিতে হয়।

কর্ম্মবিপাক—কৰ্ম্মানুযায়ী ফল

“এক্ষণে মানবগণ যে যে কৰ্ম্মদ্বারা যে যে প্রকার দুর্গতি লাভ করে, তাহা কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। যে ব্রাহ্মণ চারি বেদ অধ্যয়ন করিয়াও মোহপ্রযুক্ত পতিত ব্যক্তির নিকট দান গ্রহণ করেন, তিনি দেহত্যাগের পর প্রথমতঃ পঞ্চদশবর্ষ খর[গর্দ্দভ]যোনি, তৎপরে সাত বৎসর গোযোনি, তৎপরে তিন মাস ব্রহ্মরাক্ষসযোনি লাভ করিয়া পরিশেষে পুনরায় ব্রাহ্মণযোনি প্রাপ্ত হয়েন। যে ব্রাহ্মণ পতিত ব্যক্তির যাজনক্রিয়া সম্পাদন করেন, তিনি দেহান্তে প্রথমতঃ পঞ্চদশ বৎসর কৃমিযোনি, তৎপরে পাঁচ বৎসর গর্দ্দভযোনি, তৎপরে পাঁচ বৎসর শূকরযোনি, তৎপরে পাঁচ বৎসর কুক্কুরযোনি, তৎপরে পাঁচ বৎসর শৃগালযোনি ও তৎপরে এক বৎসর কুক্কুরযোনিতে ভ্রমণ করিয়া পরিশেষে মানবযোনিতে জন্মপরিগ্রহ করেন। যে শিষ্য উপাধ্যায়ের অনিষ্টসাধন করে, সে দেহত্যাগের পর প্রথমে কুক্কুর, তৎপরে রাক্ষস ও তৎপরে গর্দ্দভযোনি পরিভ্রমণপূৰ্ব্বক পরিশেষে পুনরায় ব্রাহ্মণযোনিতে জন্মপরিগ্রহ করিয়া থাকে।

“যে পাপাত্মা মনে মনে গুরুপত্নীহরণের চিন্তা করে, সে সেই অধর্ম্মচিন্তানিবন্ধন দেহত্যাগের পর প্রথমতঃ তিন বৎসর কুক্কুর ও এক বৎসর কৃমিযোনিতে পরিভ্রমণপূৰ্ব্বক পরিশেষে ব্রাহ্মণযোনিতে জন্মপরিগ্রহ করিয়া থাকে। যে উপাধ্যায় কোন কারণ ব্যতীত পুত্ৰতুল্য প্রিয়শিষ্যকে প্রহার করেন, তাহার নিশ্চয়ই হিংস্ৰযোনিলাভ হয়। যে পুত্র পিতামাতার অপমান করে, দেহান্তে তাহাকে দশ বৎসর গর্দ্দভ ও এক বৎসর কুম্ভীরযোনিতে পরিভ্রমণ করিয়া পরিশেষে মানবযোনিতে জন্মপরিগ্রহ করিতে হয়। যে পুত্র পিতামাতার অনিষ্টসাধন করিয়া তাঁহাদিগকে ক্রোধান্বিত করে, সে দেহান্তে প্রথমতঃ দশ মাস গর্দ্দভ, পরে চতুর্দ্দশ মাস কুক্কুর ও তৎপরে সাত মাস বিড়ালযোনিতে পরিভ্রমণপূর্ব্বক পরিশেষে মানবযোনি লাভ করিয়া থাকে। পিতামাতাকে তিরস্কার করিলে দেহান্তে সারিকাযোনিতে এবং তাঁহাদিগকে তাড়না করিলে দেহান্তে প্রথমতঃ দশ বৎসর কচ্ছপ, তৎপরে তিন বৎসর শল্লকী [সজারু] ও তৎপরে ছয় মাস সর্পযোনিতে পরিভ্রমণানন্তর পরিশেষে মানবযোনিলাভ হয়।

“যে ব্যক্তি রাজভৃত্য হইয়া রাজার অসন্তোষকর কাৰ্য্যের অনুষ্ঠান করে, সেই মোহান্ধ ব্যক্তি দেহত্যাগের পর প্রথমতঃ দশ বৎসর বানর, পরে পাঁচ বৎসর মূষিক ও তৎপরে ছয় মাস কুক্কুরযোনিতে পরিভ্রমণপূর্ব্বক পরিশেষে মানবযোনি লাভ করিয়া থাকে। যে ব্যক্তি অর্পিত ধন অপহরণ করে, তাহাকে দেহান্তে ক্রমে ক্রমে শতযোনি পরিভ্রমণপূৰ্ব্বক পরিশেষে কৃমিযোনি লাভ করিয়া পঞ্চদশ বৎসর পরে স্বীয় পাপের ধ্বংস হইলে পুনরায় মানবযোনিতে জন্মপরিগ্রহ করিতে হয়। ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তি মানবলীলাসংবরণের পর খঞ্জনপক্ষী হইয়া জন্মপরিগ্রহ করে। বিশ্বাসঘাতক ব্যক্তি দেহত্যাগের পর প্রথমতঃ আট বৎসর মৎস্য, তৎপরে চারি মাস মৃগ, পরে এক বৎসর ছাগ ও তৎপরে কিয়ৎকাল কীটযোনিতে পরিভ্রমণ করিয়া পরিশেষে মানবযোনি লাভ করে। যে ব্যক্তি ধান্য, যব, তিল, মাষ, কুলত্থ, সর্ষপ, ছোলক, কলায়, মুদগ, গোধূম ও অতসী [তিসি] প্রভৃতি শস্য অপহরণ করে, তাহার দেহান্তে প্রথমতঃ মূষিকযোনি লাভ হয়। তৎপরে সে মৃগ হইয়া কিছুকালের পর প্রাণপরিত্যাগপূৰ্ব্বক শূকরযোনিতে জন্মপরিগ্রহ করিবামাত্র রোগাক্রান্ত হইয়া পঞ্চত্বপ্রাপ্ত হয় এবং তৎপরে কুক্কুরযোনিতে জন্মগ্রহণপূর্ব্বক পাঁচ বৎসর জীবিত থাকিয়া দেহত্যাগ করিয়া পুনরায় মনুষ্যদেহ লাভ করে।

“যে ব্যক্তি পরস্ত্রী অপহরণ করে, তাহাকে ক্রমে ক্রমে বক, শৃগাল, কুক্কুর, গৃধ্র, কঙ্ক ও বৃকযোনিতে পরিভ্রমণ করিতে হয়। যে ব্যক্তি মোহিত হইয়া ভ্রাতৃপত্নীর সহিত সংসর্গ করে, তাহাকে এক বৎসরকাল পুংস্কোকিল হইয়া থাকিতে হয়। যে ব্যক্তি বন্ধুপত্নী, গুরুপত্নী বা রাজপত্নী অপহরণ করে, তাহাকে প্রথমতঃ পাঁচ বৎসর শূকর, পরে দশ বৎসর বৃক, তৎপরে পাঁচ বৎসর বিড়াল, তৎপরে দশ বৎসর কুক্কুট, তিন মাস পিপীলিকা ও এক মাস কীটযোনিতে পরিভ্রমণের পর কৃমিযোনিতে জন্মপরিগ্রহ করিতে হয়। পরিশেষে সে ঐ যোনিতে চতুর্দ্দশ মাস অতিবাহিত করিয়া পাপক্ষয় হইলে দেহত্যাগপুৰ্ব্বক পুনরায় মানব-দেহ লাভ করে। যে ব্যক্তি মোহপ্রযুক্ত বিবাহ, যজ্ঞ ও দানকার্য্যের বিঘ্ন উৎপাদনে প্রবৃত্ত হয়, সে কৃমিযোনিতে জন্মপরিগ্রহপূৰ্ব্বক পঞ্চদশ বৎসর অতিবাহিত করিয়া পাপক্ষয় হইলে প্রাণত্যাগ করিয়া পুনরায় মানবদেহ ধারণ করে। যে ব্যক্তি প্রথমতঃ একমাত্র কন্যাদান করিয়া পুনরায় সেই কন্যাকে অন্য পাত্রে দান করিতে অভিলাষ করে, তাহাকে দেহান্তে কৃমিযোনি লাভ করিয়া এয়োদশ বৎসর পাপ ভোগ করিতে হয়। পরে পাপক্ষয় হইলে সে পুনরায় মনুষ্যযোনিতে জম্মপরিগ্রহ করে।

“যে ব্যক্তি দেবকার্য্য বা পিতৃকার্য্য সম্পাদন না করিয়া ভোজন করে, দেহান্তে তাহাকে কাকযোনিতে জন্মপরিগ্রহ করিয়া এক শত বৎসর জীবিত থাকিতে হয়। তৎপরে সে কিয়ৎয়াল কুক্কুটযোনি ও একমাস সর্পযোনিতে পরিভ্রমণ করিয়া পুনরায় মানবদেহ লাভ করে। যে ব্যক্তি পিতৃতুল্য জ্যেষ্ঠভ্রাতার অবমাননা করে, তাহার দেহান্তে দুই বৎসর বকযোনিতে অবস্থানপূর্ব্বক পুনরায় মনুষ্যযোনি লাভ হয়। শূদ্র ব্রাহ্মণীগমন করিলে তাহাকে প্রথমতঃ কৃমিযোনিতে জন্মপরিগ্রহ করিতে হয়, পরে সেই কৃমিযোনি হইতে মুক্ত হইয়া শূকরযোনিতে জন্মপরিগ্রহ করিবামাত্র রোগাক্রান্ত ও কালকবলে নিপতিত হয় এবং পরিশেষে কিয়ৎকাল কুক্কুরযোনিতে অবস্থানপূর্ব্বক দেহত্যাগ করিয়া মনুষ্যত্ব লাভ করে। যে শূদ্র ব্রাহ্মণীর গর্ভে অপত্যোৎপাদন করে, তাহাকে নিশ্চয়ই দেহান্তে মূষিকরূপে জন্মপরিগ্রহ করিতে নয়। কৃতঘ্ন ব্যক্তি যমালয়ে গমন করিলে, যমদূতেরা ক্রোধাবিষ্ট হইয়া দণ্ড, মুগর, শূল, অগ্নিকুণ্ড, খড়গ, উত্তপ্ত বালুকা ও কন্টকযুক্ত শাল্মলী [শিমূলের কাঁটা] প্রভৃতি বিবিধ ক্লেশকর বস্তুদ্বারা তাহাকে ঘোরতর যন্ত্রণা প্রদানপূর্ব্বক নিপাতিত করে। তখন সে প্রথমতঃ কৃমিযোনি পরিগ্রহপূর্ব্বক পঞ্চদশ বৎসর অতীত হইলে প্রাণত্যাগ করিয়া বারংবার গর্ভগত ও তম্মধ্যে বিনষ্ট হয়। কৃতঘ্ন এইরূপে বহুবিধ গর্ভযন্ত্রণাভোগের পর তির্য্যগযোনিতে জন্মপরিগ্রহ করে এবং ঐ যোনিতে বহুকাল দুঃখভোগ করিয়া পরিশেষে কর্ম্মযোনি প্রাপ্ত হয়।

“দধি হরণ করিলে বক, অসংস্কৃত মৎস্য [কাঁচা মাছ] হরণ করিলে বানর, মধু হরণ করিলে দংশ, ফলমূল ও পিষ্টক হরণ করিলে পিপীলিকা, রাজমাষ [মাষকলাই] হরণ করিলে হলগোলকনামক কীট, পায়স হরণ করিলে উলূক, লৌহ হরণ করিলে বায়স, কাংস্যপাত্র হরণ করিলে হারিত [শুক], রৌপ্যপাত্র অপহরণ করিলে কপোত, সুবর্ণপাত্র অপহরণ করিলে কৃমি, ধৌত কৌষেয়-বস্তু অপহরণ করিলে কৃকর[৭]পক্ষী, কোষেয়-বস্ত্র হরণ করিলে বর্ত্তকপক্ষী [ডারুই], বিচিত্র বন্ধ অপহরণ করিলে উলূক, পট্টবস্ত্র অপহরণ করিলে হংস, কার্পাসনির্ম্মিত বস্ত্র অপহরণ করিলে ক্রোঞ্চ [বক], ক্ষৌম ও মেষলোমজ বক্স অপহরণ করিলে শশ, বর্ণক অপহরণ করিলে ময়ূর ও রক্তবস্ত্র অপহরণ করিলে চকোর-যোনিতে জন্মগ্রহণ করিতে হয়। যে ব্যক্তি লোভপরায়ণ হইয়া গন্ধদ্রব্য অপহরণ করে, সে ছুছুন্দরী [ছুঁচো] যোনিতে জন্মগ্রহণপূর্ব্বক পঞ্চদশ বর্ষ জীবিত থাকিয়া পাপক্ষয় ইলে পুনরায় মনুষ্যযোনি প্রাপ্ত হয়। দুগ্ধ অপহরণ করিলে যোনি ও তৈল অপহরণ করিলে তৈলপায়িকযোনি প্রাপ্ত হয়।

“যে নরাধম সশস্ত্র হইয়া অর্থলাভ বা বৈর-নির্য্যাতনের নিমিত্ত অশস্ত্র পুরুষকে বিনাশ করে, সে দেহান্তে খরযোনি প্রাপ্ত হইয়া দুই বৎসর পরে শস্ত্রাঘাতে প্রাণ পরিত্যাগপূর্ব্বক মৃগযোনিতে জন্মপরিগ্রহ করিয়া থাকে। ঐ মৃগযোনিতে তাহাকে প্রতিনিয়ত প্রাণভয়ে ভীত ও শঙ্কিত হইতে হয়। তৎপরে এক বৎসর অতীত হইলে সে শস্ত্রদ্বারা নিহত হইয়া মংস্যরূপে জন্মগ্রহণপূর্ব্বক চতুর্থ মাসে জালিকদিগের জালে বদ্ধ ও নিহত হইয়া থাকে। তদনন্তর তাহাকে ব্যাঘ্রযোনিতে জন্মগ্রহণপূর্ব্বক দশ বৎসর ও দ্বীপিযোনিতে পাঁচ বৎসর অতিবাহিত করিতে হয়। এইরূপে বহুবিধ যোনিতে পরিভ্রমণদ্বারা অধর্ম্ম ক্ষয় হইলে সে পুনরায় মনুষ্যযোনিতে জন্মপরিগ্রহ করে। স্ত্রীহত্যাকারী নরাধমকে দেহান্তে যমলোকে গমনপূর্ব্বক বহুতর ক্লেশভোগ ও বিংশতিপ্রকার নিকৃষ্ট যোনিতে পরিভ্রমণপূর্ব্বক পরিশেষে কৃমিযোনিতে জন্মগ্রহণ করিতে হয়। ঐ যোনিতে বিংশতি বৎসর নরকভোগদ্বারা পাপক্ষয় হইলে সে পুনরায় মনুষ্যযোনি প্রাপ্ত হইয়া থাকে। ভোজনদ্রব্য অপহারী ব্যক্তি দেহান্তে মক্ষিকাযোনিতে জন্মগ্রহণপূর্ব্বক বহুদিন মক্ষিকাদিগের সহিত বাস করিয়া পাপক্ষয়ান্তে পুনরায় মনুষ্যযোনিতে জন্মগ্রহণ করিয়া থাকে।

“ধান্য অপহরণ করিলে পরজন্মে অতিশয় লোমশ হইতে হয়। যে ব্যক্তি তিলকল্ক-মিশ্রিত ভোজনদ্ৰব্য অপহরণ করে, সে সেই অপহৃতদ্রব্যপরিমিতাকার মূষিক হইয়া জন্মগ্রহণপূর্ব্বক প্রতিদিন মানবগণকে দংশন করে এবং বহুদিনের পর পাপক্ষয় হইলে পুনরায় মনুষ্যযোনি প্রাপ্ত হয়। ঘৃত অপহরণ করিলে দাহ যোনিতে, মৎস্য অপহরণ করিলে কাকযোনিতে, লবণ অপহরণ করিলে দণ্ডকাক যোনিতে জন্মগ্রহণ করিতে হয়। যে ব্যক্তি ন্যস্ত ধন অপহরণ করে, সে দেহান্তে মৎস্যযোনিতে জন্মগ্রহণ করিয়া থাকে এবং সেই মৎস্যঘোনিতে কিয়ৎকাল অবস্থানপূর্ব্বক পুনরায় মানবযোনি লাভ করিয়া নিতান্ত অল্পায়ু হয়।

‘মানৱগণ এইরূপে বিবিধ পাপানুষ্ঠান করিয়া বিবিধ তির্য্যগযোনি লাভ করিয়া থাকে। যাহারা লোভমোহপ্রযুক্ত পাপানুষ্ঠান করিয়া ব্ৰতাদিদ্বারা তাহা নিরাকরণে [নিবারণে] প্রবৃত্ত হয়, তাহারা নিরন্তর সুখ-দুঃখযুক্ত ও ব্যথিত হইয়া কালযাপন এবং দেহান্তে লোভমোহপরায়ণ ও পাপশীল ম্লেচ্ছ হইয়া জন্মগ্রহণ করে। যেসকল মহাত্মা জন্মাবধি পাপকর্ম্মে যথোচিত ঘৃণা প্রদর্শন করেন, তাহারা রোগশূন্য, ধনবান ও রূপসম্পন্ন হইয়া থাকেন। শ্রীলোকেরাও পূর্ব্বোক্তরূপ পাপে আসক্ত হইলে উহাদিগকে পূর্ব্বোক্ত প্রকার যোনি পরিগ্রহ করিতে হয়, সন্দেহ নাই। হে ধর্ম্মরাজ! এই আমি তোমার নিকট পরস্বাপহরণ প্রভৃতি কয়েকটি পাপকর্ম্মের দোষ কীর্ত্তন করিলাম। অতঃপর তুমি কথাপ্রসঙ্গে অন্যান্য পাপকর্ম্মের দোষ সবিস্তর শ্রবণ করিবে। পূর্ব্বে আমি সুরর্ষিগণের [দেবর্ষিদিগের] সমীপে ব্রাহ্মণমুখে এই সমস্ত কথা শ্রবণ করিয়াছিলাম। এক্ষণে আমার এই সমস্ত বাক্য অনুধাবনপূর্ব্বক ধর্ম্মানুষ্ঠানে তৎপর হও।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *