১৪০তম অধ্যায়
হরমাহাত্ম্য-হরপার্ব্বতী-সংবাদ
“হে ধৰ্ম্মরাজ! মহর্ষিগণ এইরূপ অনুরোধ করিলে নারায়ণসুহৃৎ দেবর্ষি নারদ হরপার্ব্বতীসংবাদ কীর্ত্তন করিতে অভিলাষ করিয়া কৃষ্ণকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, ‘মাধব! পূর্ব্বে ভগবান্ ভূতনাথ সিদ্ধ, চারণ, কিন্নর, যক্ষ, রাক্ষস, অপ্সরা, গন্ধৰ্ব্ব ও প্রমথগণে পরিবেষ্টিত হইয়া বিবিধ ওষধিসমাযুক্ত অতিরমণীয় পুণ্যাশ্রম হিমালয়পৰ্ব্বতে তপস্যা করিয়াছিলেন। ঐ সময় তাঁহার নিকট যেসমুদয় ভূত ছিল, তাহাদিগের মধ্যে কেহ কেহ বিকটাকার, কেহ দিব্যমূৰ্ত্তি, কেহ বা অতি কদাকার, কেহ কেহ সিংহ, কেহ কেহ ব্যাঘ্র ও কেহ কেহ বা হস্তীর ন্যায় আকারসম্পন্ন এবং কেহ কেহ শৃগাল, কেহ কেহ দ্বীপী, কেহ কেহ ভল্লুক, কেহ কেহ বানর, কেহ কেহ উলূক, কেহ কেহ শুক, কেহ কেহ শ্যেন, কেহ কেহ মৃগ ও কেহ কেহ অন্যান্য পশুর ন্যায় মুখবিশিষ্ট। ভগবান্ ভূতনাথ যে আশ্রমে বাস করিতেন, তাহা অসংখ্য মহোরগ, দিব্যপুষ্প, দিব্যজ্যোতি, দিব্যধূপ, গন্ধ, অতি উৎকৃষ্ট মৃদঙ্গ, পণব ও বিবিধ ভেরীশব্দে পরিপূর্ণ ছিল। উহার কোন দিকে ভূতগণ ও কোন দিকে অপ্সরাগণ নৃত্যকার্য্যে ব্যাপৃত ছিল এবং কোথাও বা ভ্রমরগণ মধুপানে মত্ত হইয়া গুন গুন শব্দে মধুপান করিতেছিল। মহাত্মা মুনিগণ, ঊর্দ্ধরেতা সিদ্ধগণ এবং মরুৎ, বসু, সাধ্য, হুতাশন, বায়ু, বিশ্বদেব, যক্ষ, নাগ, পিশাচ ও লোকপালগণ সকলেই সমাহিতচিত্তে তথায় অবস্থান করিতেছিলেন। সমুদয় ঋতু সৰ্ব্বদা তথায় বিরাজমান ছিল। ওষধিসকল প্রজ্বলিত হইয়া একেবারে সেই বনকে আলোকময় করিয়াছিল এবং সুকণ্ঠ বিহঙ্গমগণ সুমধুর অব্যক্তধ্বনি করিতে করিতে আহ্লাদে ইতস্ততঃ বিচরণ করিতেছিল। ফলতঃ মহাত্মা দেবদেবের তপঃপ্রভাবে ঐ পৰ্ব্বতের শোভার আর পরিসীমা ছিল না।
হরের তৃতীয় নেত্র উৎপত্তির কারণ
‘ঐ সময় আমরা তীর্থযাত্রাপ্রসঙ্গে একদা সেই স্থানে উপস্থিত হইয়া ভগবান্ ভূতনাথকে সন্দর্শন করিতে গিয়াছিলাম। তৎকালে জীবগণের অভয়দাতা, দৈত্যসংহারকর্ত্তা, হরিদ্বর্ণ শ্মশ্রুমণ্ডিত, জটাজুটধারী, ভগবান্ বৃষভধ্বজ ব্যাঘ্রচৰ্ম্মের পরিধেয়, সিংহচর্ম্মের উত্তরীয়, সর্পের যজ্ঞোপবীত ও লোহিতবর্ণ অঙ্গদ ধারণ করিয়া সেই বিচিত্র ধাতুশোভিত পৰ্য্যঙ্কসদৃশ গিরিতটে উপবিষ্ট ছিলেন। আমরা তাঁহাকে দর্শনমাত্র নমস্কার করিয়া একেবারে সমুদয় পাপ হইতে বিমুক্ত হইলাম। কিয়ৎক্ষণ পরে শৈলসুতা পার্ব্বতী মহাদেবের ন্যায় বস্ত্রপরিধানপূর্ব্বক সমুদয় তীর্থের জলপূর্ণ স্বর্ণকলস কক্ষে লইয়া প্রমথপত্নীগণ-পরিবেষ্টিত হইয়া পুষ্পবৃষ্টি করিতে করিতে মহাদেবের নিকট আগমন করিতে লাগিলেন। আগমনকালে গিরিনদীসকল তাঁহার অনুগমনে প্রবৃত্ত হইল। এইরূপে তিনি হিমালয়ের পার্শ্ব দিয়া ক্রমে ক্রমে মহাদেবসন্নিধানে সমুপস্থিত হইয়া পরিহাসচ্ছলে ঈষৎ হাস্যবদনে স্বীয় করতলদ্বারা সহসা প্রিয়তমের নেত্রদ্বয় সমাচ্ছন্ন করিলেন। দেবদেবের নেত্রদ্বয় সমাচ্ছন্ন হইবামাত্র সমুদয় জগৎ অন্ধকারময় এবং হোম ও বষট্কারশূন্য হইল। সকলেরই মন ভয়ে ব্যাকুল হইয়া উঠিল।
‘অনন্তর সহসা মহাত্মা মহাদেবের ললাটদেশে এক যুগান্তকালীন প্রচণ্ড মার্ত্তণ্ডসদৃশ নেত্র সমুৎপন্ন হইল। ঐ নেত্র হইতে প্রদীপ্ত জ্যোতিঃ বিনির্গত হইয়া ক্ষণকালের মধ্যে সমুদয় অন্ধকার বিনাশপূৰ্ব্বক হিমালয়পর্ব্বত দগ্ধ করিতে লাগিল। তখন মৃগসমুদয় ভয়ে পলায়নপূর্ব্বক মহাদেবের নিকট আগমন করিয়া তাঁহার শরণাপন্ন হইল। ক্রমে ক্রমে সেই দ্বাদশদিবাকরসন্নিভ যুগান্তকালীন দহনসদৃশ ভীষণ হুতাশন একেবারে গগনস্পর্শী হইয়া অচিরাৎ বিবিধ ধাতু, শিখর ও বনৌষধির সহিত হিমালয়পত ভস্মসাৎ করিতে লাগিল। ঐ সময় শৈলরাজপুত্রী পার্ব্বতী হিমালয়কে তদবস্থ অবলোকন করিয়া কৃতাঞ্জলিপুটে মহাদেবের সম্মুখে অবস্থান করিতে লাগিলেন। তখন ভগবান্ ভূতপতি পার্ব্বতীর স্ত্রীস্বভাবসুলভ মৃদুভাব এবং তাঁহার পিতার দুরবস্থা দর্শননিবন্ধন কাতরভাব অবলোকন করিয়া প্রীতিপ্রফুল্লনয়নে হিমালয়ের প্রতি দৃষ্টিপাত করিলেন। মহেশ্বর দৃষ্টিপাত করিবামাত্র হিমালয় পূৰ্ব্ববৎ প্রকৃতিস্থ ও পরমরমণীয় হইয়া উঠিল।
‘তখন পতিপরায়ণা পার্ব্বতী স্বীয় পিতা হিমালয়কে প্রকৃতিস্থ দেখিয়া ভূতভাবন ভগবান্ মহাদেবকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, ‘ভগবন্! কি নিমিত্ত আপনার ললাটে তৃতীয় নেত্র সমুত্থিত হইল এবং কি নিমিত্তই বা আপনি আমার পিতা হিমালয়কে বৃক্ষলতাদির সহিত দগ্ধ করিয়া পুনর্ব্বার প্রকৃতিস্থ করিলেন, এই বিষয়ে আমার নিতান্ত সংশয় উপস্থিত হইয়াছে; অতএব উহা আমার নিকট সবিশেষ কীর্ত্তন করুন।”
মহেশ্বর কহিলেন, ‘দেবি! তুমি অজ্ঞানবশতঃ হস্তদ্বারা আমার নেত্রদ্বয় সমাবৃত করাতে সমুদয় লোক আলোকবিহীন ও বিনষ্টপ্রায় হইয়াছিল। ঐ সময়ে আমি উহাদের রক্ষার নিমিত্তই এই সমুজ্জ্বল তৃতীয় নেত্রের সৃষ্টি করিয়াছি। আমার এই নেত্রেরই তীক্ষ্ণতেজে তোমার পিতা হিমালয় দগ্ধ হইয়াছিল। আমি তোমার প্রীতি উৎপাদনের নিমিত্ত পুনৰ্ব্বার উহাকে প্রকৃতিস্থ করিয়াছি।”
‘পার্ব্বতী কহিলেন, ‘ভগবন্! কি নিমিত্ত আপনার পূৰ্ব্ব, পশ্চিম ও উত্তরদিগের মুখ চন্দ্রের ন্যায় প্রিয়দর্শন এবং দক্ষিণদিকের মুখ অতি ভীষণ হইল; আপনার জটাসমুদয় কপিলবর্ণ ও ঊর্দ্ধগত হইল কেন? আপনার কণ্ঠদেশ যে ময়ূরপুচ্ছের ন্যায় নীলবর্ণ হইয়াছে, ইহার কারণ কি এবং আপনি কি নিমিত্তই বা পিনাকপাণি, জটিল ও ব্রহ্মচারী হইলেন, এই সমুদয় বিষয়ে আমি নিতান্ত সংশয়ারূঢ় হইয়াছি; অতএব আপনি এই একান্ত অনুরক্ত সহধর্ম্মিণীর প্রতি অনুগ্রহ করিয়া ঐ সমুদয় সবিস্তরে কীর্ত্তন করুন।”
