3 of 4

১২২. বিদ্যাদানের বৈশিষ্ট্য

১২২তম অধ্যায়

বিদ্যাদানের বৈশিষ্ট্য

“হে ধৰ্ম্মরাজ! মহামতি মৈত্রেয় এই কথা কহিলে মহর্ষি বেদব্যাস তাঁহাকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, ‘মৈত্রেয়! ভাগ্যবলে তোমার এইরূপ, জ্ঞান ও বুদ্ধি উপস্থিত হইয়াছে। সাধুলোক উৎকৃষ্ট গুণেরই ভূয়সী প্রশংসা করিয়া থাকেন। রূপ, বয়স ও সম্পত্তি যে তোমাকে অভিভূত করিতে সমর্থ হয় নাই, ইহার কারণ দৈব-অনুগ্রহ ভিন্ন আর কিছুই নহে। এক্ষণে তুমি দান অপেক্ষা যাহা অধিক ফলপ্রদ বলিয়া বিবেচনা কর, আমি তাহাও কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। শিষ্টাচার ও শাস্ত্ৰসমুদয় বেদ হইতেই উৎপন্ন হইয়াছে। আমি সেই বেদ-প্রমাণানুসারে দানের প্রশংসা করিতেছি, তুমিও বৈদিক মত অবলম্বনপূৰ্ব্বক তপস্যা ও শাস্ত্রজ্ঞানের প্রশংসা করিতেছ। ফলতঃ তপস্যা ও শাস্ত্রজ্ঞান যে দান অপেক্ষা ন্যূন নহে, তাহাতে সন্দেহ নাই। তপস্যা পরমপবিত্র 
ও বেদজ্ঞানের সাধন। তপঃপ্রভাবে
স্বর্গলাভ করা যায়। তপ ও শাস্ত্রজ্ঞান হইতেই মনুষ্যের মহত্ত্বলাভ হয়। মনুষ্য যাহা কিছু অসকাৰ্য্যের অনুষ্ঠান করে, তপস্যাদ্বারা তৎসমুদয়ই নিরাকৃত হইয়া থাকে। যে-কোন অভিসন্ধিতে তপ অনুষ্ঠিত হয়, তাহা পূর্ণ হইতে কিছুমাত্র ব্যাঘাত উপস্থিত হয় না।

‘এই জীবলোকে যাহা কিছু দুষ্প্রাপ্য ও দুরতিক্ৰমণীয় আছে শাস্ত্রজ্ঞান ও তপঃপ্রভাবে তৎসমুদয়ই উপলব্ধ ও অতিক্ৰমণীয় হয়, সন্দেহ নাই। তপস্যার বল অতি আশ্চর্য্য। মদ্যপায়ী, চৌর্য্যনিরত, ভ্রূণঘাতী ও গুরুতল্পগামী পামরেরাও তপঃপ্রভাবে পাপবিমুক্ত হইয়া উৎকৃষ্ট গতি লাভ করিতে পারে। যে ব্যক্তি সকল বিদ্যায় পারদর্শী, তিনি যথার্থ চক্ষুম্মান্‌; আর তপস্বী যেরূপ হউন না কেন, তাহাকেও চক্ষুম্মান বলিয়া নির্দ্দেশ করা যায়; অতএব সৰ্ব্বজ্ঞ ও তপস্বী উভয়কেই নমস্কার করা কর্ত্তব্য। যাঁহারা সতত দানে অনুরক্ত, তাঁহারা পরলোকে সুখ ও ইহলোকে সমৃদ্ধি লাভ করিয়া থাকেন। হিতানুষ্ঠানতৎপর মহাত্মারা অন্নদান করিয়া অনায়াসে ব্রহ্মলোক প্রভৃতি উৎকৃষ্ট লোকসমুদয় প্রাপ্ত হয়েন। পূজিত ব্যক্তিরা সতত অন্নদাতার পূজা ও সম্মানিত ব্যক্তিরা সতত তাঁহার সম্মান করিয়া থাকেন। অদাতা ব্যক্তি সর্ব্বত্রই হতাদর হইয়া থাকে, সন্দেহ নাই। যে যেরূপ কাৰ্য্যের অনুষ্ঠান করে, তাহার সেইরূপ ফললাভ হয়। জীব আকাশে বা পাতালেই অবস্থান করুক, তাহার অবশ্যই স্বকৰ্ম্মানুরূপ লোকলাভ হইবে। তুমি মেধাবী, সদ্বংশজাত, শাস্ত্রজ্ঞানসম্পন্ন, অনৃংশস, ব্রহ্মচারী ও ব্রতপরায়ণ; অতএব তুমি নিশ্চয়ই স্বর্গে গমন করিয়া অভিলাষানুরূপ অন্নপান লাভ করিতে পারিবে।

‘এক্ষণে আমি তোমাকে গৃহস্থদিগের প্রশস্ত কার্য্যের উপদেশ দিতেছি, তুমি তাহা প্রতিপালন করিতে যত্নবান হও। যে গৃহিণী আপনার ভর্ত্তার প্রতিই যথোচিত প্রীতিপ্রদর্শন করে, সেই গৃহে নিরন্তর কল্যাণই উৎপন্ন হয়। যেমন সলিলদ্বারা দেহের মল ক্ষালিত এবং অগ্নিপ্রভাদ্বারা অন্ধকার তিরোহিত হয়, সেইরূপ দান ও তপস্যাদ্বারা সমস্ত পাপই বিনষ্ট হইয়া যায়, সন্দেহ নাই। এক্ষণে আমি চলিলাম, তোমার মঙ্গল হউক। আমি তোমাকে যেরূপ উপদেশ প্রদান করিলাম, তাহা তুমি বিস্মৃত হইও না। আমার উপদেশানুরূপ কার্য্যানুষ্ঠান করিলে তোমার নিশ্চয়ই শ্রেয়োলাভ হইবে।’

‘মহর্ষি বেদব্যাস এই কথা কহিয়া প্রস্থানোদ্যত হইলে মহামতি মৈত্রেয় তাঁহাকে প্রণাম ও প্রদক্ষিণ করিয়া কৃতাঞ্জলিপুটে স্বস্তিবাক্য উচ্চারণপূৰ্ব্বক বিদায় করিলেন।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *