১২৩তম অধ্যায়
পতিব্রতাধর্ম্ম—শাণ্ডিলী-সুমনার কথোপকথন
যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! সাধ্বী স্ত্রীদিগের ব্যবহার পরিজ্ঞাত হইতে আমার নিতান্ত বাসনা হইতেছে; অতএব আপনি উহা আমার নিকট কীৰ্ত্তন করুন।”
ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! সৰ্ব্বতত্ত্বজ্ঞা পতিপরায়ণা শাণ্ডিলী স্বর্গে সমারূঢ় হইলে, দেবলোকবাসিনী সুমনা তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, ‘দেবি! তুমি কিরূপ সুশীলতা ও সদাচারদ্বারা সমুদয় পাপ হইতে বিমুক্ত হইয়া অনলশিখা ও চন্দ্রপ্রভার ন্যায় সমুজ্জ্বলকলেবরে এই সুরলোকে সমুপস্থিত হইলে? তোমাকে দিব্যবস্থধারণপূৰ্ব্বক স্বচ্ছন্দে বিমানোপরি অসাধারণ তেজঃপ্রকাশ করিতে দেখিয়া বোধ হইতেছে, সমধিক তপস্যা, দান বা নিয়মদ্বারা তোমার এই লোকলাভ হইয়াছে। যাহা হউক, এক্ষণে তুমি আমার নিকট স্বীয় সৎকার্য্য কীৰ্ত্তন করিয়া আমার চিত্তকে পরিতৃপ্ত কর।’
“তখন চারুহাসিনী শাণ্ডিলী সুমনার সেই মধুর বাক্য শ্রবণ করিয়া তাঁহাকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, “দেবি! আমি শিরোমুণ্ডন, জটাধারণ অথবা কাষায়বস্তু বা বল্কল পরিধান করিয়া এই লোক লাভ করিয়াছি, এরূপ বিবেচনা করিবেন না। আমি কখন ভর্ত্তার প্রতি অহিতকর বা পরুষবাক্য প্রয়োগ করি নাই। সৰ্ব্বদা অপ্রমত্ত হইয়া ও যতব্রত হইয়া দেবতা, পিতৃলোক ও ব্রাহ্মণগণের পূজা এবং শ্বশ্রূ ও শ্বশুরের সেবা করিতাম; আমার মনে কখনই কুটিলভাবের আবির্ভাব হয় নাই; আমি কদাপি বহির্দ্বারে দণ্ডায়মান বা কোন ব্যক্তির সহিত অধিকক্ষণ কথোপকথনে প্রবৃত্ত হইতাম না; কি প্রকাশ্যে, কি অপ্রকাশ্যে কোন হাস্যজনক ও অহিত কাৰ্য্যের অনুষ্ঠান করিতে কখনই আমার প্রবৃত্তি হয় নাই; আমার ভর্ত্তা স্থানান্তর হইতে গৃহে প্রত্যাগত হইলে আমি সমাহিতচিত্তে তাঁহাকে আসন প্রদানপূর্ব্বক তাঁহার যথোচিত পূজা করিতাম; যে সমুদয় ভক্ষ্যবস্তু তাঁহার অপরিজ্ঞাত ও অনভিমত হইত, আমি কদাচ তৎসমুদয় ভক্ষণ করিতাম না। পুত্র, কন্যা প্রভৃতি পরিজনদিগের নিমিত্ত যেসকল কার্য্যের অনুষ্ঠান করা আবশ্যক, আমি প্রতিদিন প্রাতঃকালে গাত্রোত্থান করিয়া স্বয়ং অন্যদ্বারা তৎসমুদয় সম্পাদন করিতাম; আমার পতি কোন কাৰ্য্যোপলক্ষে বিদেশে গমন করিলে আমি কেশসংস্কার এবং গন্ধ, মাল্য, অঞ্জন ও গোরোচনাদ্বারা দেহের সৌন্দর্য্যসাধনে প্রবৃত্ত না হইয়া সতত সংযতচিত্তে বিবিধ মঙ্গলকাৰ্য্যের অনুষ্ঠান করিতাম। যখন তিনি নিদ্রাসুখ অনুভব করিতেন, তখন বিশেষ কার্য্য থাকিলেও আমি তাঁহাকে পরিত্যাগ করিয়া গমন করিতাম না; পরিবারপ্রতিপালনের নিমিত্ত সর্ব্বদা পরিশ্রম করিতে অনুরোধ করিয়া তাঁহার বিরাগভাজন হইতাম না; গুপ্তবিষয় কদাপি প্রকাশ করিতাম না এবং নিরন্তর গৃহসমুদয় পরিষ্কার করিয়া রাখিতাম।
‘হে দেবি! যে নারী সমাহিত হইয়া এইরূপ ধর্ম্ম প্ৰতিপালন করেন, তিনি নিশ্চয়ই অরুন্ধতীর ন্যায় স্বর্গলোকে পরম সুখসম্ভোগে সমর্থ হয়েন।
“হে ধৰ্ম্মরাজঃ মহানুভবা শাণ্ডিলী সুমনার নিকট পতিব্রতাধৰ্ম্ম কীৰ্ত্তন করিয়া তাঁহার সমক্ষেই অন্তর্হিত হইলেন। যে ব্যক্তি প্রতি পৰ্ব্বে এই উপাখ্যান পাঠ করেন, তিনি দেবলোক লাভ করিয়া নন্দনবনে অতুল সুখসম্ভোগ করিয়া থাকেন, সন্দেহ নাই।”
