১৪৪তম অধ্যায়
স্বর্গলাভের অধিকারি-নির্ণয়
‘পার্ব্বতী কহিলেন, “ভগবন্! মানবগণ কাৰ্য্য, মন ও বাক্যপ্রভাবে কখন বন্ধনযুক্ত এবং কখন বা বন্ধন হইতে বিমুক্ত হইয়া থাকে; এক্ষণে মনুষ্য কিরূপ চরিত্র, কাৰ্য্য ও গুণসম্পন্ন হইলে স্বর্গলাভে অধিকারী হয়, তাহা আপনি আমার নিকট কীর্ত্তন করুন।”
মহেশ্বর কহিলেন, “দেবি! তুমি আমার নিকট যে সৰ্ব্বপ্রাণীহিতকর অতি উৎকৃষ্ট প্রশ্ন করিলে, তাহার উত্তর কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। যাঁহারা সত্যধর্ম্মনিরত ও শ্রমসমূদয়ের লক্ষণবিহীন হইয়া ধর্ম্মলব্ধ অর্থ ভাগ করেন, তাঁহারাই স্বর্গভোগ করিতে সমর্থ হয়েন। যাঁহারা প্রলয়োৎপত্তিতত্ত্বজ্ঞ, সৰ্ব্ববাদী ও সংশয়বিহীন হইতে পারেন, তাঁহাদিগকে কদাচ ধৰ্ম্মাধর্ম্মে লিপ্ত হইতে হয় না। যাঁহারা বীতরাগ হইয়া কায়মনোবাক্যে হিংসা পরিত্যাগ করেন, যাঁহাদিগের কোন বিষয়ে আসক্তি না জন্মে এবং যাঁহারা জিতেন্দ্রিয়, দয়াবান, সচ্চরিত্র ও শত্ৰুমিত্রে সমজ্ঞানসম্পন্ন হয়েন, তাঁহারাই কৰ্ম্মপাশ হইতে বিমুক্ত হইয়া থাকেন।
“যাঁহারা সৰ্ব্বভূতে দয়াবান, সকলের বিশ্বাসপাত্র, হিংসাবিহীন, সদাচারনিরত, পরধনে নিস্পৃহ, চৌর্য্যবিমুখ, স্বধনসন্তুষ্ট, স্বভাগোপজীবী, সংযতেন্দ্রিয়, সচ্চরিত্র ও বেদবিরুদ্ধ, সুখসম্ভোগে বিরত হয়েন, যাঁহারা ধৰ্ম্মলব্ধ অর্থদ্বারা জীবিকানির্ব্বাহ ও ঋতুস্নানের পর স্ত্রীসংসর্গ করেন এবং যাঁহারা পরস্ত্রীসংসর্গের কথা দূরে থাকুক, তাঁহাদের প্রতি কামভাবে দৃষ্টিপাতও করেন না, প্রত্যুত তাঁহাদিগকে মাতা, ভগিনী ও কন্যার ন্যায় জ্ঞান করিয়া থাকেন, তাঁহাদিগের স্বর্গলাভ হয়।
জীবিকানির্ব্বাহ বা ধর্ম্মলাভের নিমিত্ত সৰ্ব্বদা এই নিৰ্ম্মল পথ অবলম্বন করা পণ্ডিতগণের অবশ্য কর্ত্তব্য। যাঁহারা স্বর্গলাভের বাসনা করেন, তাঁহারা কদাচ ইহা অতিক্রম করিবেন না।”
স্বর্গ নরকজনক সদসৎ কাৰ্য্য
‘পাৰ্ব্বতী কহিলেন, “ভগবন্! কিরূপ বাক্য ব্যবহার করিলে স্বৰ্গভোগ হয়, তাহা আমার নিকট কীর্ত্তন করুন।”
‘মহেশ্বর কহিলেন, “দেবি! যাঁহারা আপনার বা অন্যের হিতসাধনদ্বারা জীবিকানির্ব্বাহ, ধর্ম্মলাভ ও কামবৃত্তির চরিতার্থতা সম্পাদনের নিমিত্ত অথবা পরিহাসচ্ছলে মিথ্যাবাক্য প্রয়োগ না করেন, যাঁহারা নির্দ্দোষ মধুর লোকের বাক্যে স্বাগতজিজ্ঞাসা ও সৰ্ব্বতোভাবে কপটতা পরিত্যাগ করেন, যাঁহারা কাহারও প্রতি কটুবাক্য বা নিষ্ঠুর বাক্য প্রয়োগ করেন না, মিত্রভেদকর [বন্ধুবিচ্ছেদজনক] পিশুনবাক্য প্রয়োগ করিতে যাঁহাদিগের কদাচ প্রবৃত্তি জন্মে না, যাঁহারা পরদ্রোহ পরিত্যাগপূৰ্ব্বক প্রিয়বাদী ও সব্বভূতে দয়াবান হয়েন, যাঁহারা শঠতা ও অসদ্বাক্য ব্যবহার না করিয়া সৰ্ব্বদা মধুরবাক্যে লোকের সহিত আলাপ করেন এবং যাঁহারা ক্রূদ্ধ হইয়াও মর্ম্মভেদী পরুষবাক্য উচ্চারণ না করিয়া মিষ্টকথা কহেন, তাঁহারা স্বর্গলাভ করিতে সমর্থ হয়েন। অতএব সৰ্ব্বদা এইরূপ ধৰ্ম্ম অবলম্বন করা মনুষ্যের অবশ্য কর্ত্তব্য। পণ্ডিতেরা কদাচ মিথ্যাবাক্য প্রয়োগের বাসনা করিবেন না।”
‘পার্ব্বতী কহিলেন, “ভগবন! কিরূপ মানসিক বৃত্তি অবলম্বন ও কার্য্যানুষ্ঠান করিলে মানবগণের স্বর্গলাভ এবং কিরূপ মানসিক বৃত্তি অবলম্বন ও কার্য্যানুষ্ঠানদ্বারা, উহাদের নরকভোগ হয়, তাহা কীর্ত্তন করুন।”
মহেশ্বর কহিলেন, “দেবি! ধর্ম্মপরায়ণ মনুষ্যেরা যেরূপ মনোবৃত্তি আশ্রয় করিয়া স্বর্গলাভ করেন এবং কুটিল প্রকৃতির মনুষ্যেরা যেরূপ মনোবৃত্তি আশ্রয়পূৰ্ব্বক নরকভোগ করিয়া থাকে, তাহা তোমার নিকট কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। যাঁহারা নির্জ্জন গ্রাম, গৃহ বা বিপিনমধ্যে পরধন দর্শন করিয়া উহা গ্রহণ করিতে ইচ্ছা না করেন, নির্জ্জনে কামুকী পরস্ত্রী দর্শন করিয়াও যাঁহাদিগের মন বিচলিত না হয়, যাঁহারা কি শত্ৰু, কি মিত্র সকল লোকেরই সহিত বন্ধুবৎ ব্যবহার করেন এবং যাঁহারা বিদ্বান্, পবিত্রস্বভাব, সত্যপ্রতিজ্ঞ, স্বধনসন্তুষ্ট, শত্রুতাবিহীন, আয়াসশূন্য, সকলের সহিত বন্ধুতাসংস্থাপনে যত্নশীল, প্রশান্তচিত্ত, সৰ্ব্বভূতে দয়াবান, শ্রদ্ধান্বিত, পবিত্র, পবিত্র ব্যক্তিদিগের প্রিয়, ধৰ্ম্মাধর্ম্মবেত্তা, শুভাশুভ কার্য্যের পরিণামদর্শী, ন্যায়পরায়ণ, গুণবান, দেব-দ্বিজভক্ত এবং সৎকার্য্যের অনুষ্ঠানে অধ্যবসায়সম্পন্ন হয়েন, তঁহারাই স্বর্গলাভের যথার্থ অধিকারী। এই আমি তোমার নিকট স্বর্গলাভের পথসমুদয় কীর্ত্তন করিলাম। ইহার বিরুদ্ধাচারী ব্যক্তিদিগকে নিশ্চয়ই নরকভোগ করিতে হয়। এক্ষণে আর কি শ্রবণ করিতে তোমার বাসনা হয়, তাহা ব্যক্ত কর।”
‘পার্ব্বতী কহিলেন, “ভগবন্! মনুষ্য কিরূপ কাৰ্য্য বা তপস্যাদ্বারা দীর্ঘায়ু ও কিরূপ কাৰ্য্যদ্বারা ক্ষীণায়ু হয় এবং ইহলোকে কি নিমিত্ত কেহ ভাগ্যবান, কেহ কুলীন, কেহ কুলভ্রষ্ট, কেহ প্রিয়দর্শন, কেহ অপ্রিয়দর্শন, কেহ জ্ঞানবিজ্ঞানসম্পন্ন পণ্ডিত, কেহ মূর্খ এবং কেহ অল্প ক্লেশযুক্ত হইয়া কালহরণ করিয়া থাকে, এই বিষয়ে আমার নিতান্ত সংশয় উপস্থিত হইতেছে; অতএব আপনি উহা সবিস্তর আমার নিকট কীর্ত্তন করুন।”
মহেশ্বর কহিলেন, “দেবি! যেরূপ কার্য্যের অনুষ্ঠান করিলে মনুষ্যের যেরূপ ফললাভ হয়, তাহা কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। যাহারা উগ্ৰস্বভাব, প্রাণীগণের প্রাণহন্তা, উদ্যতদণ্ড, শস্ত্রপ্রহারে সমুদ্যত, নির্দ্দয়, জীবগণের উদ্বেগজনক এবং কীটপতঙ্গেরও আশ্রয়দানে বিরত হয়, তাহারাই নরকে গমন করে। আর যাঁহারা এই সমুদয় আচরণে বিরত হয়েন, তাঁহারা সৎকুলে জন্মগ্রহণপূৰ্ব্বক রূপবান্ ও ধার্ম্মিক হইতে পারেন। লোকে হিংসাপরায়ণ হইলে নরক এবং হিংসাবিহীন হইলে স্বর্গলাভ করিয়া থাকে। যদি কোন ব্যক্তি প্রথমে নরকে দুৰ্ব্বিষহ যন্ত্রণা ভোগ করিয়া পরিশেষে কোনক্রমে মনুষ্যত্ব লাভ করিতে পারে, তথাপি তাহাকে ঐ মনুষ্যজন্মে ক্ষীণায়ু হইতে হয়। যাহারা পাপকার্য্যনিরত, হিংস্রস্বভাব ও সৰ্ব্বভূতের অপ্রিয় হয়, তাহারাই পরজন্মে অল্পায়ু হইয়া থাকে, আর যাঁহারা সত্ত্বগুণাবলম্বী, সৰ্ব্বভূতে দয়াশীল, হত্যাবিমুখ এবং দণ্ডবিধান ও শস্ত্রপ্রহারে পরাঙ্মুখ হইয়া কাহারও হিংসা বা পরহিংসার অনুমোদন না করেন, তাঁহারাই স্বর্গলাভপূৰ্ব্বক বিবিধ সুখভোগ ও পরিশেষে মনুষ্যত্ব লাভ করিয়া দীর্ঘায়ু হইয়া পরমসুখে কালহরণ করিতে সমর্থ হয়েন। সর্ব্বলোকপিতামহ ভগবান ব্ৰহ্মা সৎকার্য্যনিরত সচ্চরিত্র মহাত্মাদিগের দীর্ঘায়ু হইবার এই প্রাণীহিংসানিবৃত্তিরূপ উপায় নির্দ্দেশ করিয়া দিয়াছেন।”
