১০২তম অধ্যায়
কর্ম্মানুরূপ গতি—গৌতম-ইন্দ্রসংবাদ
যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! কৰ্ম্মনিরত ব্যক্তিরা কৰ্ম্মানুষ্ঠান করিয়া কি একপ্রকার লোক লাভ করে, না তাহাদের নানাবিধ লোক লাভ হয়, তাহা বিশেষরূপে কীৰ্ত্তন করুন।”
ভীষ্ম কহিলেন, “মহারাজ! মানবগণ বিবিধ কর্ম্মানুষ্ঠানদ্বারা নানাপ্রকার লোক লাভ করে, তন্মধ্যে পুণ্যবান ব্যক্তিরা পুণ্যলোকসমুদয় এবং পাপাত্মা ব্যক্তিরা পাপলোক লাভ করিয়া থাকে। আমি এই উপলক্ষ্যে গৌতম-বাসবসংবাদনামে এক পুরাতন ইতিহাস কীৰ্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর।
“একদা দমগুণসম্পন্ন জিতেন্দ্রিয় মৃদুস্বভাব দ্বিজবর গৌতম অটবীমধ্যে এক মাতৃহীন হস্তিশিশুকে অবলোকন করিলেন। ঐ হস্তিশাবক অরণ্যমধ্যে নিতান্ত কষ্টভোগ করিতেছিল। মহর্ষি গৌতম তাহাকে অবলোকন করিবামাত্র একান্ত দয়া হইয়া আশ্রমে আনয়নপূর্ব্বক তাহাকে লালন-পালন করিতে লাগিলেন। কালক্রমে ঐ হস্তিশিশু মহাবলপরাক্রান্ত, মদস্রাবী ও পর্ব্বতাকার হইয়া উঠিলে একদা দেবরাজ ইন্দ্র নরপতি ধৃতরাষ্ট্রের রূপ ধারণ করিয়া সেই মত্তমাতঙ্গকে অপহরণ করিলেন। মহর্ষি গৌতম ধৃতরাষ্ট্রকে সেই মাতঙ্গ অপহরণ করিতে অবলোকন করিয়া সম্বোধনপূর্ব্বক কহিলেন, ‘হে অকৃতজ্ঞ ধৃতরাষ্ট্র! আমি অতিকষ্টে এই মাতঙ্গকে প্রতিপালন করিয়াছি, এ আমার পুত্রস্বরূপ; অতএব তুমি ইহাকে অপহরণ করিও না; তুমি আমার আশ্রমে আসিয়া আমার সহিত কথোপকথন করাতে আমার সহিত তোমার মিত্রতা জন্মিয়াছে; অতএব এই হস্তিশিশু অপহরণ করিয়া মিত্রদ্রোহী হওয়া তোমার কদাপি কর্ত্তব্য নহে। আমি আশ্রমে না থাকিলে এই হস্তী আমার আশ্রম রক্ষা এবং কাষ্ঠ ও উদকাদি আহরণ করে। এ অতি বিনীত, কার্য্যকুশল, শিষ্ট, কৃতজ্ঞ ও আমার অত্যন্ত প্রিয়। অতএব ইহাকে অপহরণ করা তোমার কর্ত্তব্য নহে।
হস্তি-হর্ত্তা ইন্দ্রের সহিত বাদ-প্রতিবাদ
“ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, ‘মহর্ষে! আমি আপনাকে সহস্র গোধন, একশত দাসী, পঞ্চশত স্বর্ণমুদ্রা এবং অন্যান্য নানাবিধ ধন প্রদান করিতেছি, আপনি তৎসমুদয় লইয়া আমাকে এই হস্তীটি প্রদান করুন। আপনি ব্রাহ্মণ, হস্তী লইয়া আপনার কি হইবে?’
“গৌতম কহিলেন, ‘রাজ! গোধন, দাসী, সুবর্ণমুদ্রা ও বিবিধ রত্নে আমার কিছুমাত্র প্রয়োজন নাই। আমি ব্রাহ্মণ, আমার প্রভূত ধন গ্রহণ করিবার আবশ্যক কি?
“তখন ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, ‘ভগবন্! ব্রাহ্মণদিগের হস্তী রক্ষা করিবার কিছুমাত্র প্রয়োজন নাই। হস্তীদ্বারা ক্ষত্রিয়দিগেরই মহোপকার সাধিত হইয়া থাকে। হস্তী আমাদের বাহন। অতএব স্বীয় বাহন অপহরণ করাতে আমার কিছুমাত্র অধৰ্ম্ম নাই। এক্ষণে আপনি ইহার আশা পরিত্যাগ করুন।’
“গৌতম কহিলেন, ‘রাজন! যে যমালয়ে গমন করিয়া পুণ্যাত্মা ব্যক্তিরা আহ্লাদ ও পাপাত্মারা শোকসাগরে নিমগ্ন হয়, তুমি তথায় গমন করিলে আমি সেই স্থানে গমন করিয়া এই হস্তী গ্রহণপূর্ব্বক তোমাকে যন্ত্রণা প্রদান করিব।’
“ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, ‘মহর্ষে। কর্ম্মপরিত্যাগী ইন্দ্রিয়পরায়ণ পাপাত্মা নাস্তিকেরাই যমযন্ত্রণা ভোগ করিয়া থাকে। আমি যমলোক গমন করিব না, তাহা অপেক্ষা উৎকৃষ্ট লোকেই গমন করিব।’
“গৌতম কহিলেন, ‘রাজন! যমালয়ে সত্য ভিন্ন কখন মিথ্যা বাক্যের ব্যবহার হয় না। যথায় দুর্ব্বল ব্যক্তিরাও বলবানদিগকে যন্ত্রণা প্রদান করিয়া থাকে, তুমি তথায় গমন করিলেও আমি সেই স্থানে গমন করিয়া এই হস্তী গ্রহণপূর্ব্বক তোমাকে যন্ত্রণা প্রদান করিব।’
“ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, ‘ভগবন্! যেসকল ব্যক্তিরা মদমত্ত হইয়া পিতা, মাতা ও জ্যেষ্ঠাভগিনীর সহিত শত্রুর ন্যায় ব্যবহার করে, তাহারাই যমলোকে গমন করিয়া থাকে। অতএব আমি তথায় গমন করিব না, তদপেক্ষা উৎকৃষ্ট লোকেই গমন করিব।’
“গৌতম কহিলেন, ‘ধৃতরাষ্ট্র! যে কুবেরপুরীতে ভোগী ব্যক্তিরা প্রবেশ করিয়া থাকে; যথায় গন্ধর্ব্ব, যক্ষ ও অপ্সরাগণ নিয়ত বিদ্যমান রহিয়াছে, তুমি তথায় গমন করিলেও আমি সেই স্থানে গমন করিয়া এই হস্তী গ্রহণপূৰ্ব্বক তোমাকে যন্ত্রণা প্রদান করিব।’
‘ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, ‘মহর্ষে! যাহারা অতিথিসেবাতৎপর ও ব্রতপরায়ণ হইয়া ব্রাহ্মণদিগকে আশ্রয় প্রদান এবং প্রথমতঃ সামগ্ৰীসমুদয় বিভাগপূর্ব্বক আশ্রিত ব্যক্তিদিগকে অর্পণ করিয়া পরিশেষে স্বয়ং অবশিষ্ট সামগ্রী ভোজন করে, তাহারাই কুবেরলোকে গমন করিয়া থাকে। আমি তথায় গমন করিব না, তদপেক্ষা উৎকৃষ্ট লোকেই গমন করিব।’
“গৌতম কহিলেন, ‘ধৃতরাষ্ট্র! সুমেরুপৰ্ব্বতের শিখরদেশে কিন্নরীসঙ্গীতপরিপূর্ণ, পুষ্পসমাকীর্ণ, সুদীর্ঘজম্বুবৃক্ষসম্পন্ন যে রমণীয় উপবন বিদ্যমান রহিয়াছে, তুমি তথায় গমন করিলেও আমি সেই স্থানে গমন করিয়া এই হস্তী গ্রহণপুৰ্ব্বক তোমাকে যন্ত্রণা প্রদান করিব।’
“ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, ‘মহর্ষে! যে ব্রাহ্মণগণ মৃদুস্বভাব, সত্যপরায়ণ, বহুশাস্ত্ৰপারদর্শী ও সৰ্ব্বভূতপ্রিয় এবং যাঁহারা ইতিহাসপাঠ, পুরাণপাঠ ও ব্রাহ্মণগণকে মধুদান করেন, তাঁহারাই সুমেরুশিখরের উপবনে গমন করিয়া থাকেন। আমি তথায় গমন করিব না, তদপেক্ষা উৎকৃষ্ট লোকে গমন করিব।’
“গৌতম কহিলেন, ‘ধৃতরাষ্ট্র! যে বিবিধ পুষ্পসংযুক্ত কিন্নরগণসমাকীর্ণ, নারদের প্রিয় নন্দনবনে নিরন্তর অপ্সরা ও গন্ধৰ্ব্বগণ অবস্থান করিতেছে, তুমি তথায় গমন করিলেও আমি সেই স্থানে গমন করিয়া এই হস্তী গ্রহণপূর্ব্বক তোমাকে যন্ত্রণা প্রদান করিব।’
“ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, মহর্ষে! যেসকল ব্যক্তি যাজ্ঞপরাঙ্মুখ হইয়া নৃত্যগীতাদির আলোচনা করে, তাহারাই নন্দনবনে গমন করিয়া থাকে। আমি তথায় গমন করিব না, তদপেক্ষা উৎকৃষ্ট লোকেই গমন করিব।’
“গৌতম কহিলেন, ধৃতরাষ্ট্র! যে উত্তরকুরুতে মানবগণ দেবতাদিগের সহিত একত্র আহ্লাদ অনুভব এবং অগ্নি, জল ও পর্ব্বতসম্ভূত মানবগণ অবস্থান করেন, যথায় দেবরাজ ইন্দ্র সকলের মনোরথ পরিপূর্ণ করিয়া থাকেন, যে স্থানের কামিনীগণ সকলেই স্বেচ্ছাচারিণী, যথায় স্ত্রীপুরুষদিগের মনোমধ্যে কিছুমাত্র ঈর্ষা নাই, তুমি তথায় গমন করিলেও আমি সেই স্থানে গমন করিয়া এই হস্তী গ্রহণপূর্ব্বক তোমাকে যন্ত্রণা প্রদান করিব।’
“ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, ‘মহর্ষে! যাঁহারা বীতস্পৃহ, মাংসভোজন পরাঙ্মুখ, দণ্ডবিধানবিরত ও মমতাপরিশূন্য, যাঁহারা লাভালাভ ও স্তুতিনিন্দা সমান জ্ঞান করেন এবং যাঁহারা স্থাবরজঙ্গমাত্মক কোন প্রাণীরই কিছুমাত্র হিংসা করেন না, তাঁহারাই উত্তরকুরুতে গমন করিয়া থাকেন। আমি তথায় গমন করিব না, তাহা অপেক্ষা উৎকৃষ্ট লোকে গমন করিব।’
“গৌতম কহিলেন, ‘ধৃতরাষ্ট্র। সোমলোকে যে পুণ্যগন্ধসম্পন্ন রজোগুণবিহীন শোকশূন্য স্থানসমুদয় বিরাজিত রহিয়াছে, তুমি তথায় গমন করিলেও আমি সেই স্থানে গমন করিয়া এই হস্তী গ্রহণপূর্ব্বক তোমাকে যন্ত্রণা প্রদান করিব।’
“ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, ‘তপোধন! যাঁহারা দানশীল, যাঁহারা অন্যের অর্থ কদাচ প্রতিগ্রহ করেন না, পূজ্যযাকদিগকে যাঁহাদিগের কিছুমাত্র অদেয় নাই, যাঁহারা অতিথিপ্রিয়, প্রসাদগুণসম্পন্ন, পুণ্যবান্ ও ক্ষমাশীল, যাঁহারা অন্যের প্রতি কখনই কটুক্তি প্রয়োগ করেন না, যাঁহারা সতত প্রাণীগণের রক্ষায় নিরত থাকেন, সোমলোক সেই সমস্ত মহাত্মাদিগেরই সম্যক উপযুক্ত। আমি কদাচ সেই লোকে গমন করিব না, তদপেক্ষা উৎকৃষ্ট লোকেই গমন করিব।’
“গৌতম কহিলেন, ‘ধৃতরাষ্ট্র! সূর্য্যলোকে যে রজঃ ও তমোগুণবিহীন শোকশূন্য স্থানসমুদয় বিদ্যমান রহিয়াছে, তুমি তথায় গমন করিলেও আমি সেই স্থানে গমন করিয়া এই হস্তী গ্রহণপূৰ্ব্বক তোমাকে যন্ত্রণা প্রদান করিব।’
“ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, ‘তপোধন! যাঁহারা স্বাধ্যায়সম্পন্ন, গুরুশুশ্রূষানিরত, তপ ও ব্রতপরায়ণ, সত্যপ্রতিজ্ঞ-আচার্য্যগণের অনুকূলভাষী ও উদ্যোগী, যাঁহারা স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া গুরুর কার্য্য নির্ব্বাহ করেন, সেই সমস্ত বেদবিৎ বিশুদ্ধস্বভাব মহাত্মারাই। সুর্য্যলোকে গমন করিয়া থাকেন; কিন্তু আমি তথায় কদাচ গমন করিব না, আমি তদপেক্ষা উৎকৃষ্ট লোকে গমন করিব।’
“গৌতম কহিলেন, ‘ধৃতরাষ্ট্র! বরুণলোকে যে পবিত্র গন্ধসম্পন্ন শাকশূন্য রজোগুণবিহীন নিত্যস্থানসমুদয় বিরাজমান রহিয়াছে, তুমি তথায় গমন করিলেও আমি সেই স্থানে উপস্থিত হইয়া এই হস্তী গ্রহণপুৰ্ব্বক তোমাকে যন্ত্রণা প্রদান করিব।’
“ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, ‘তপোধন! যাঁহারা চাতুর্ম্মাস্যযাগের অনুষ্ঠান, দশাধিক শত যজ্ঞ আহরণ, শ্রদ্ধাসম্পন্ন হইয়া তিন বৎসর বেদবিধানানুসারে অগ্নিহোত্রে আহুতিপ্রদান, প্রাণপণে ধর্ম্মভারবহন ও সাধুনির্দ্দিষ্ট পথে অবস্থান করিয়া থাকেন, সেই সমস্ত মহাত্মারাই বরুণলোকে গমন করেন, আমি তথায় গমন করিব না, তদপেক্ষা উৎকৃষ্ট লোকে গমন করিব।’
“গৌতম কহিলেন, ‘ধৃতরাষ্ট্র! ইন্দ্রলোকে যে রজোগুণশূন্য, শোকবিহীন, নিতান্ত দুর্গম, সকলের প্রার্থনীয় স্থানসমুদয় বিদ্যমান রহিয়াছে, তুমি তথায় গমন করিলেও আমি সেই স্থানে উপস্থিত হইয়া এই হস্তী গ্রহণপূৰ্ব্বক তোমাকে যন্ত্রণা প্রদান করিব।’
“ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, ‘তপোধন! যাঁহারা শতবর্ষজীবী, মহাবলপরাক্রান্ত, বেদাধ্যায়ী, যাজ্ঞিক ও অপ্রমত্ত, তাঁহারাই ইন্দ্রলোকে গমন করিয়া থাকেন, আমি তথায় গমন করিব না, তদপেক্ষা উৎকৃষ্ট লোকেই গমন করিব।’
“গৌতম কহিলেন, ‘ধৃতরাষ্ট্র! স্বর্গে যে শোকশূন্য সকলের প্রার্থনীয় প্রজাপতিলোকসমুদয় বিদ্যমান রহিয়াছে, তুমি তথায় গমন করিলেও আমি সেই স্থানে উপস্থিত হইয়া এই হস্তী গ্রহণপূৰ্ব্বক তোমাকে যন্ত্রণা প্রদান করিব।’
“ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, ‘তপোধন! যেসমস্ত মহীপাল রাজসূয়যজ্ঞে অভিষিক্ত হইয়াছেন, যাঁহারা প্রজাগণের রক্ষণাবেক্ষণে নিযুক্ত থাকেন এবং যাঁহারা অশ্বমেধ-যজ্ঞানুষ্ঠানপূর্ব্বক অবভৃতস্নান করিয়াছেন, তাঁহারাই প্রজাপতিলোকে গমন করিয়া থাকেন। আমি তথায় গমন করিব না, তদপেক্ষা উৎকৃষ্ট লোকেই গমন করিব।
“গৌতম কহিলেন, ‘ধৃতরাষ্ট্র! প্রজাপতিলোকের ঊর্ধ্বে যে পবিত্র-গন্ধসম্পন্ন, রজোগুণবিহীন, শোকশূন্য, নিতান্ত দুর্ল্লভ গোলোকসমুদয় বিদ্যমান রহিয়াছে, তুমি তথায় গমন করিলেও আমি সেই স্থানে উপস্থিত হইয়া এই হস্তী গ্রহণপূর্ব্বক তোমাকে যন্ত্রণা প্রদান করিব।’
“ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, ‘তপোধন! যে ব্যক্তি সহস্র গোধনের অধিপতি হইয়া প্রতি বৎসর একশত, একশত গোধনের অধিপতি হইয়া প্রতি বৎসর দশ অথবা দশাৰ্দ্ধ বা পাঁচটি গোধনের অধিকারী হইয়া প্রতি বৎসর একটি গোদান করেন; যে সমস্ত তীর্থযাত্রাপরায়ণ মহাত্মা ব্রহ্মচর্য্য অবলম্বনপূৰ্ব্বক বৈদিক রীতিনীতি-প্রতিপালনে প্রবৃত্ত হয়েন এবং যাঁহারা প্রভাস, মানস, পুষ্কর, নৈমিষ, বৃহৎসরোবর, বাহুদা, করতোয়া, গঙ্গা, ফল্লু, বিপাশা, কৃষ্ণা, পঞ্চনদ, মহাহ্রদ, গোমতী, কৌশিকী, পম্পা, সরস্বতী, দৃশদ্বতী ও যমুনা প্রভৃতি তীর্থে গমন করিয়া থাকেন, তাঁহারাই গোলোক লাভ করিয়া যারপরনাই হৃষ্ট ও সন্তুষ্ট হয়েন। আমি তথায় গমন করিব না, তদপেক্ষা উৎকৃষ্ট লোকেই গমন করিব।’
“গৌতম কহিলেন, ‘ধৃতরাষ্ট্র! যে স্থানে শীত, উত্তাপ, ক্ষুধা, পিপাসা, সুখ, দুঃখ, স্নেহ, দ্বেষ, শত্রুতা, মিত্রতা, জরা, মৃত্যু ও পুণ্যপাপের কিছুমাত্র প্রাদুর্ভাব নাই, তুমি সেই রজোগুণবিহীন সত্ত্বগুণের আকর অতিপবিত্র ব্রহ্মলোকে গমন করিলেও আমি তথায় উপস্থিত হইয়া এই হস্তী গ্রহণপূৰ্ব্বক তোমাকে যন্ত্রণা প্রদান করিব।’
“ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন, ‘তপোধন! যাঁহারা সৰ্ব্বসঙ্গবিবর্জ্জিত, অধ্যাত্মযোগনিরত, কৃতাত্মা ও জিতেন্দ্রিয়, সেই সমস্ত সাত্ত্বিক মনুষ্যেরা ব্রহ্মলোকে গমন করিয়া থাকেন। আমি তথায় গমন করিয়া এইরূপ প্রচ্ছন্নভাবে অবস্থান করিব যে, আপনি আমাকে কিছুতেই নিরীক্ষণ করিতে সমর্থ হইবেন না।’
“গৌতম কহিলেন, ‘হে ধৃতরাষ্ট্র! যে স্থানে সামবেদগীত হইয়া থাকে, যে স্থানে বেদীসমুদয়ে পুণ্ডরীকযজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয়, যে স্থানে অশ্বগণসাহায্যে সোমবীথিতে গমন করা যায়, তুমি ব্রহ্মলোকমধ্যে সেই স্থানে উপস্থিত হইলেও আমি তথায় গমন করিয়া এই হস্তী গ্রহণপূর্ব্বক তোমাকে যন্ত্রণা প্রদান করিব।
‘যাহা হউক, এক্ষণে তোমার কথা শুনিয়া বোধ হইতেছে, তুমি দেবরাজ ইন্দ্র। তুমি স্বেচ্ছানুসারে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডমধ্যে এইরূপে নিরন্তর পরিভ্রমণ করিয়া থাক। আমি এতক্ষণ তোমাকে জ্ঞাত হইতে পারি নাই; অতএব আমি সবিশেষ না জানিয়া তোমার প্রতি যে পুরুষবাক্য প্রয়োগ করিয়াছি, তজ্জন্য আমার অপরাধ ক্ষমা কর।’
ইন্দ্র-গৌতমের সম্প্রীতি—গৌতমের সদ্গতি
তখন ধৃতরাষ্ট্ররূপী ইন্দ্র কহিলেন, ‘হে তপোধন! আমি দেবরাজ ইন্দ্র, আমি এই হস্তী গ্রহণ করিবার নিমিত্তই ভূতলে অবতীর্ণ হইয়াছি। এক্ষণে আমি এই অপরাধনিবন্ধন তোমার নিকট প্রণত হইয়া তোমার আজ্ঞা প্রার্থনা করিতেছি, তুমি আমাকে যাহা আদেশ করিবে, আমি অবিচলিতচিত্তে তাহাই অনুষ্ঠান করিব।’
“তখন গৌতম কহিলেন, ‘পুরন্দর! তুমি এই আমার দশমবর্ষবয়স্ক শ্বেতবর্ণ করিশাবকটিকে গ্রহণ করিয়াছ, ইহাকে সূতনির্ব্বিশেষে প্রতিপালন করিয়াছি। এক্ষণে আমি এই নির্জ্জন কাননমধ্যে কেবল উহারই সহিত নিরন্তর অবস্থান করিয়া থাকি। এ স্থানে এই হস্তী ব্যতীত আমার আর কেহ সহায় নাই। অতএব তুমি অবিলম্বে ইহাকে প্রত্যর্পণ কর।’
‘ইন্দ্র কহিলেন, ‘তপোধন! দেখ, তোমার কৃতক পুত্র করিশাবক তোমাকে নিরীক্ষণপূর্ব্বক তোমারই নিকট গমন ও নাসিকাদ্বারা তোমার চরণদ্বয় আঘ্রাণ করিতেছে। এক্ষণে তুমি ইহাকে গ্রহণ করিয়া আমার শুভানুধ্যান কর।’
“গৌতম কহিলেন, ‘ইন্দ্র! আমি নিরন্তর তোমার শুভচিন্তা ও পূজা করিয়া থাকি। এক্ষণে আমি তোমাকর্ত্তৃক প্রদত্ত এই করিশাবকটিকে পুনরায় গ্রহণ করিলাম। অতএব তুমিও আমার শুভচিন্তা কর।’
‘ইন্দ্র কহিলেন, ‘তপোধন! এক্ষণে বেদপারগ মহাত্মাদিগের মধ্যে কেবল তোমাকর্ত্তৃকই আমি ছদ্মবেশে পরিজ্ঞাত হইলাম, এই নিমিত্ত আজ তোমার প্রতি আমার যারপরনাই সন্তোষ জন্মিয়াছে। এক্ষণে তুমি তোমার এই কৃতকপুত্রের সহিত আমার সমভিব্যাহারে আগমন কর। তুমি চিরকালের নিমিত্ত শুভলোকসমুদয় লাভ করিবার উপযুক্ত পাত্র।’ এই বলিয়া দেবরাজ ইন্দ্র সেই হস্তীর সহিত মহর্ষি গৌতমকে সমভিব্যাহারে লইয়া নিতান্ত দুর্ল্লভ দেবলোকে গমন করিলেন। হে ধৰ্ম্মরাজ! যিনি জিতেন্দ্রিয় হইয়া এই উপাখ্যান শ্রবণ ও অধ্যয়ন করেন, তিনি নিশ্চয়ই মহাত্মা গৌতমের ন্যায় ব্রহ্মলোক লাভ করিয়া থাকেন।”
