4 of 4

১৫১. ব্রাহ্মণসৎকারের শুভফল

১৫১তম অধ্যায়

ব্রাহ্মণসৎকারের শুভফল

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! এই জীবলোকে কাহারা পূজনীয় এবং কাহার প্রতি কিরূপ ব্যবহার করা কর্ত্তব্য তাহা কীর্ত্তন করুন।”

ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! ব্রাহ্মণগণকে অবমানিত করিলে দেবতাদিগকেও অবসন্ন হইতে হয়। ব্রাহ্মণগণকেই নমস্কার করা কর্ত্তব্য। এই জীবলোকে তাঁহারাই পূজনীয়। তাঁহাদিগের নিকট পুত্রের ন্যায় অবস্থান করা সকলেরই পক্ষে শ্রেয়স্কর। ঐ মনীষিগণ সমুদয় লোক ধারণ করিয়া রহিয়াছেন। তাঁহারা সকলের শ্রেষ্ঠ ও ধৰ্ম্মের সেতুস্বরূপ। নিঃস্ব ভাবই তাঁহাদিগের সুখের কারণ। তাঁহারা প্রাণীগণের প্রিয়দর্শন, সকলের আশ্রয়স্বরূপ, ব্রতধারী, লোকস্রষ্টা, শাস্ত্রপ্রণেতা ও যশস্বী। উঁহারা সংযতবাক হইয়া কঠোর তপানুষ্ঠান করিয়া থাকেন। তপস্যাই তাঁহাদের পরমধন এবং বাক্যই তাঁহাদিগের পরমবল। তাঁহারা ধর্ম্মের উৎপত্তিস্থান, ধর্ম্মপরায়ণ, ধর্ম্মার্থী ও সূক্ষ্মদর্শী। প্রজাগণ তাঁহাদিগেরই আশ্রয় গ্রহণ করিয়া জীবিত রহিয়াছে। উঁহারা সৎপথপ্রদর্শক, যজ্ঞনাশক ও সনাতন। উঁহারা নিরন্তর পিতৃপিতামহধৃত দুৰ্ব্বহ ব্রাহ্মণ্যভার বহন করিয়া থাকেন; অতি দুঃসময়েও ঐ ভারবহনে অবসন্ন হয়েন না। উঁহারা হব্যকব্যের অগ্রভাগভোক্তা এবং দেবতা, পিতৃলোক ও অতিথিগণের মুখস্বরূপ। উঁহারা ভোজনদ্বারা তৃপ্তিলাভ করিলেই ত্রিলোককে মহাভয় হইতে উদ্ধার করিতে সমর্থ হয়েন। উঁহারা সৰ্ব্বজ্ঞ, শ্রুতিনিষ্ঠ, সকল বিষয়ে সুনিপুণ, মোক্ষদর্শী, সকলের গতিজ্ঞানবিশারদ, অধ্যাত্মচিন্তাপরায়ণ এবং সকল লোকের দীপ ও চক্ষুষ্মনদিগেরও চক্ষুঃস্বরূপ। আদি, মধ্য ও অন্ত সকলই উঁহাদের বিদিত আছে। উঁহারা সংশয়বিরহিত ও উৎকৰ্ষাপকর্ষ জ্ঞানসুনিপুণ। উঁহাদের চরমে পরমগতি লাভ হইয়া থাকে। উঁহারা বিগতপাপ, নির্দ্বন্দ্ব, নিস্পরিগ্রহ, সম্মানের উপযুক্ত ও সম্মানিত। চন্দন ও পঙ্ক এবং ভোজন ও অভোজনে উঁহাদের সমান জ্ঞান। উঁহারা দুকূল, শণসূত্রনির্ম্মিত বস্ত্র, ক্ষৌম ও মৃগচর্ম্ম অভিন্নবোধে পরিধান করেন। উঁহারা ইন্দ্রিয়নিগ্রহ ও বেদাধ্যয়ন করিয়া অনাহারে বহুদিবস অতিক্রমপূৰ্ব্বক দেহ শুষ্ক করিতে পারেন। উঁহারা কুপিত হইলে দেবতার অদেবত্ব, প্রসন্ন হইলে অদেবতার দেবত্ব সম্পাদন এবং নূতন লোকসমুদয় ও লোকপালগণের সৃষ্টি করিতে সমর্থ হয়েন। ঐ মহাত্মাদিগের শাপপ্রভাবেই সাগরজল নিতান্ত অপেয় হইয়াছে। উঁহাদিগের কোপানল দণ্ডকারণ্যে অদ্যাপি উপশমিত হয় নাই। উহারা দেবগণের দেবতা, কারণের কারণ ও প্রমাণের প্রমাণ। অতএব উঁহাদিগকে অবমানিত করা বিজ্ঞ ব্যক্তির কর্ত্তব্য নহে। উঁহাদিগের মধ্যে কি বৃদ্ধ, কি বালক সকলেই সম্মানের উপযুক্ত। উঁহাদের মধ্যে যাঁহারা তপ ও বিদ্যায় সমধিক কৃতার্থতা লাভ করিতে পারেন, তাঁহারা স্বজাতীয়দিগের নিকটে সম্মানজনক হইয়া থাকেন।

“যে ব্রাহ্মণ বিদ্যাশূন্য, তিনিও অন্যকে পবিত্র করিতে পারেন; সুতরাং যিনি বিদ্বান, তিনি যে পরমপাবন, তাঁহার আর বিচিত্র দেবতাস্বরূপ জ্ঞান করা কর্তব্য। অগ্নি সংস্কৃতই হউন বা অসংস্কৃত হউন, তাঁহার দেবত্ব কদাচ বিলুপ্ত হয় না, যেমন তেজস্বী অগ্নি শ্মশানে অবস্থান করিলেও দূষিত হয় না, প্রত্যুত যজ্ঞগৃহে বিধিবৎ ব্যবহৃত হইতে পারে, তদ্রূপ ব্রাহ্মণ যদিও সতত অনিষ্টকর কাৰ্য্যে নিরত থাকেন, তথাপি তাঁহাকে পরম দেবতাস্বরূপ বলিয়া সমাদর করা কর্ত্তব্য।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *