১৬২ততম অধ্যায়
ধর্ম্মের প্রামাণ্য-নির্ণয়
বৈশম্পায়ন কহিলেন, দেবকীনন্দন কৃষ্ণ এই কথা কহিলে ধৰ্ম্মরাজ যুধিষ্ঠির শান্তনুতনয় ভীষ্মকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, “পিতামহ। ধৰ্ম্মসংশয় উপস্থিত হইলে প্রত্যক্ষ ও আগম এই দুইটির মধ্যে কোনটি প্রমাণ হইবে?”
ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! আমার বোধ হইতেছে, এ বিষয়ে কিছুমাত্র সংশয় উপস্থিত হইতে পারে না। যাহাই হউক, তোমার যদি এই বিষয়ে সন্দেহ হইয়া থাকে, আমি তাহা নিরাকরণ করিয়া দিতেছি। প্রত্যক্ষ ও আগম এই উভয় প্রমাণে অনায়াসে সংশয় জন্মিতে পারে, কিন্তু সেই সংশয়টি ছেদন করা নিতান্ত সুকঠিন। প্রজ্ঞাভিমানী হেতুবাদীরা প্রত্যক্ষ কারণ দেখিয়া অপ্রত্যক্ষ বিষয়ের এককালে অসদ্ভাব স্বীকার বা তাহার অস্তিত্ব-বিষয়ে সংশয় করিয়া থালে। সেই সমস্ত পাণ্ডিত্যাভিমানী অল্পবুদ্ধি ব্যক্তির ঐরূপ সিন্ধান্ত ভ্রান্তিবিজৃম্ভিত [ভ্রান্তপথে চালিত] সন্দেহ নাই। যদি ঐ সিদ্ধান্ত ভ্রান্তিমূলক হইল, তাহা হইলে আগমকেই প্রধান প্রমাণ বলিয়া নির্দ্দেশ করিতে হয়। কিন্তু অনলস, প্রাণযাত্রানিৰ্ব্বাহে অভিনিবেশশূন্য ও তৎপর না হইলে আগমপ্রমাণ স্থির করা সহজ হয় না। হেতুবাদ পরিত্যাগপূর্ব্বক সকল লোকের জ্যোতিঃস্বরূপ আগম অবলম্বন করিলে বিপুল জ্ঞানলাভ করা যায়। হেতুবাদ নিতান্ত অগ্রাহ্য ও অমূলক উহা কদাচই প্রমাণ বলিয়া স্বীকার করা যাইতে পারে না।”
যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! প্রত্যক্ষ, আগম ও বহুবিধ শিষ্ঠাচার এই তিনটির মধ্যে কোনটি প্রধান হইবে, তাহা কীর্ত্তন করুন।”
ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! বলবান্ দুরাত্মাদিগের দৌরাত্ম্যে ধর্ম্ম হ্রিয়মান [লুপ্তপ্রায়] হইলে, যদিও যত্নসহকারে তৎকালে তাহার মর্য্যাদারক্ষা করা হয়, কিন্তু তাহা কালসহকারে নিশ্চয়ই ভিন্ন [ভগ্ন-বিচ্ছিন্ন] হইয়া যায় খায়। ঐ সময় তৃণদ্বারা যেমন কূপ সমাচ্ছন্ন হয়, সেইরূপ অধর্ম্মদ্বারা ধর্ম্ম সমাচ্ছন্ন হইয়া থাকে। তখন দুষ্টলোকেরা অতএব ঐ সময় ধর্ম্মসংশয় উপস্থিত হইলে ঐ সমস্ত শিষ্টাচার উচ্ছিন্ন করিতে সর্ব্বতোভাবে যত্নবান্ হয়। অসচ্চরিত্র, শ্রুতিত্যাগপরায়ণ, ধর্ম্মবিদ্বেষী পরের বাক্য কদাচ সপ্রমাণ বলিয়া গ্রাহ্য করা কর্ত্তব্য নহে। যাহারা বেগপরায়ণ, সন্তুষ্টচিত্ত ও ঐ সমস্ত পামরের বিদ্বেষী—অর্থ, কাম, লোভ ও মোহের প্রতি ঘৃণা প্রদর্শনপূর্ব্বক ধর্ম্মপরায়ণ হইয়া সেই সমস্ত মহাত্মার নিকট গমনপূর্ব্বক ধর্ম্মসংশয় জিজ্ঞাসা করা উচিত। ঐ সমস্ত মহাত্মার চরিত্র কদাচ দূষিত হয় না এবং উঁহারা যজ্ঞ ও বেদাধ্যয়ন কখনই পরিত্যাগ করেন না। ফলতঃ প্রত্যক্ষ, বেদ ও শিষ্টাচার এই তিনটিকেই প্রমাণ বলিতে হইবে।”
যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! আমি সংশয়রূপ দুস্তর-সাগরে নিপতিত হইয়াছি, উহার পাড় নিরীক্ষিত হইতেছে না। এক্ষণে জিজ্ঞাস্য এই যে, যদি বেদ, প্রত্যক্ষ ও আচার এই তিনটিই ধৰ্ম্মের প্রমাণ হইল, তাহা হইলে ধৰ্ম্মও তিন প্রকার স্বীকার করিতে হইবে।”
ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! ধৰ্ম্ম একমাত্র। ঐ তিনটি উহার প্রমাণ। ঐ তিন প্রমাণ প্রত্যেকেই যে পৃথক পৃথক্ ধর্ম্ম প্রতিপাদন করিতেছে, তাহা নহে; উহারা সমবেত হইয়াই ধর্ম্মের বিচার করিয়া থাকে। এক্ষণে ঐ তিনটি যে ধর্ম্মের প্রমাণস্থল, আমি তোমার নিকট তাহা কীর্ত্তন করিলাম। অতঃপর ধর্ম্মসংশয় উপস্থিত হইলে, তুমি আর কাহাকেও কিছু জিজ্ঞাসা করিও না। তুমি আপনিই ঐ তিন প্রমাণানুসারে সংশয়চ্ছেদন করিবে। আমি যাহা কহিতেছি, তাহাতে যেন তোমার সংশয় উপস্থিত না হয়; অন্ধ ও জড়ের ন্যায় নিঃশঙ্কচিত্তে উহার অনুষ্ঠান করা তোমার উচিত।
“অহিংসা, সত্য, অক্রোধ ও দান এই চারিটি সনাতন ধর্ম্ম। তুমি এই সমস্ত ধৰ্ম্মেরই অনুষ্ঠান করিবে, তোমার পিতা ও পিতামহ প্রভৃতি পূৰ্ব্বতন পুরুষেরা ব্রাহ্মণের প্রতি যেরূপ ব্যবহার করিয়া গিয়াছেন, তুমিও তাহাদের প্রতি তদনুরূপ ব্যবহার কর। যে ব্যক্তি প্রমাণকে অপ্রমাণ বলে, সে নিতান্ত অপণ্ডিত, তাহার বাক্য কদাচ প্রমাণ হইতে পারে না; সে সকলেরই শোচনীয় অতএব তুমি এক্ষণে ব্রাহ্মণগণের সৎকার ও সমাদর কর। ব্রাহ্মণেরা উৎকৃষ্ট ধৰ্ম্মের উপদেশ প্রদান করেন। উঁহারাই এই তিননোক ধারণ করিয়া রহিয়াছেন।”
ধর্ম্মদ্বেষী ও ধৰ্ম্মানুরাগীর গতি
যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! যাহারা ধর্ম্মের প্রতি বিদ্বেষ প্রকাশ করে এবং যাঁহারা ধর্ম্মের প্রতি অনুরাগ প্রকাশ করিয়া থাকেন, ঐ উভয়বিধ লোকদিগের মধ্যে কাহাদের কিরূপ গতিলাভ হয়?”
ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! যাহারা ধর্ম্মদ্বেষী, তাহারা রজ ও তমগুণে আচ্ছন্ন হইয়া নরকে গমন করিয়া থাকে। আর যাঁহারা সতত ধৰ্ম্মে অনুরক্ত থাকেন, সেই সমস্ত সত্য ও সরলতাপরায়ণ সাধু ব্যক্তি অনায়াসে স্বর্গে গমন করেন। তাঁহারা নিরন্তর আচার্য্যদিগের সেবা করিয়া ধৰ্ম্মকেই একমাত্র গতি বলিয়া বিবেচনা করিয়া থাকেন। মনুষ্যই হউক আর দেবতাই হউক, যাঁহারা শারীরিক ক্লেশ স্বীকার করিয়া ধৰ্ম্ম উপার্জ্জন করেন, সেই সমস্ত লোভমোহশূন্য মহাত্মারা নিশ্চয়ই সুখলাভ করিতে সমর্থ হয়েন। ব্রহ্মার প্রধানপুত্র ব্রাহ্মণেরাই ধৰ্ম্মস্বরূপ। ধার্ম্মিকগণ একাগ্রচিত্তে তাঁহাদিগেরই উপাসনা করিয়া থাকেন।”
যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! কাহাদিগকে সাধু ও কাহাদিগকে অসাধু বলিয়া নির্দ্দেশ করা যায় এবং তাহাদিগের উভয়ের কাৰ্য্যই বা কি প্রকার, তাহা কীর্ত্তন করুন।”
সাধু ও অসাধুর লক্ষণ
ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! অসাধু দুরাচার ও দুর্ম্মুখ। সাধু ব্যক্তিরা সুশীল ও শিষ্টাচারসম্পন্ন। তাঁহারা কখন রাজমার্গ, গোষ্ঠ ও ধান্যমধ্যে মূত্রপুরীষ পরিত্যাগ করেন না; দেবতা, পিতৃগণ, ভূত, অতিথি ও কুটুম্বদিগকে আহার প্রদান করিয়া পরিশেষে আপনারা আহার করেন; ভোজনকালে কথোপকথন বা আর্দ্রহস্তে শয়ন করেন না। উঁহারা সূৰ্য্য, বৃষ, দেবতা, গোষ্ঠ, চতুষ্পথ, ধার্ম্মিক ব্রাহ্মণ ও চৈত্যবৃক্ষকে প্রদক্ষিণ; ভারাক্রান্ত বৃদ্ধ, স্ত্রীলোক, নগরাধিপতি, গো, ব্রাহ্মণ ও নরপতিদিগকে পথ প্রদান এবং সমাগত অতিথি, পোষ্যবর্গ ও শরণাগত ব্যক্তিদিগকে রক্ষা করিয়া থাকেন। সায়ংকাল ও প্রাতঃকাল এই উভয়কালই ভোজনের প্রকৃত সময়। এই সময়ের মধ্যে আর আহার গ্রহণ না করিলেই উপবাস করা হয়। হোমকালে বহ্নি যেমন আজ্যপাত্রের অপেক্ষা করে, তদ্রূপ স্ত্রীজাতি ঋতুকাল উপস্থিত হইলে পুরুষসংসর্গ প্রত্যাশা করিয়া থাকে। অতএব ঋতুকালে স্ত্রীসংসর্গ করা কর্ত্তব্য। ঋতুকাল ভিন্ন অন্য সময়ে পত্নীসংসর্গ না করিলে ব্রহ্মচর্য্যের অনুষ্ঠান করা হয়। সত্যবাক্য, গো ও ব্রাহ্মণ এই তিনই তুল্য পদার্থ। অতএব নিয়ত নিয়মানুসারে গো-ব্রাহ্মণের পূজা করা কর্ত্তব্য।
“যজুর্ব্বেদানুসারে যে মাংসের সংস্কার করা হয়, তাহা ভক্ষণ, করা দোষাবহ নহে। পৃষ্ঠমাংস ও বৃথামাংস পুত্রমাংসের তুল্য। স্বদেশেই হউক আর ভিন্ন দেশেই হউক, অতিথিকে উপবাসী রাখা কদাচ বিধেয় নহে। উপাধ্যায়কে অভিবাদন করিয়া আসন প্রদান, পাঠসমাপনান্তে দক্ষিণা দান করা শিষ্যের অবশ্য কর্ত্তব্য। উপাধ্যায়কে অৰ্চ্চনা করিলে দেহপুষ্টি, আয়ু ও শ্রীবৃদ্ধি হইয়া থাকে। বৃদ্ধ ব্যক্তিদিগের অবমাননা ও দূরদেশে প্রেরণ করা কদাচ বিধেয় নহে। উঁহারা দণ্ডায়মান থাকিলে উপবেশন করা নিতান্ত অনুচিত। উহা করিল আয়ুঃক্ষয় হইবার বিলক্ষণ সম্ভাবনা। বিবস্ত্রা স্ত্রী ও উলঙ্গ পুরুষকে দর্শন করা নিতান্ত নিষিদ্ধ। গোপনেই স্ত্রীসম্ভোগ ও আহার করা উচিত। গুরুজন অপেক্ষা পবিত্র তীর্থ, হৃদয় অপেক্ষা পবিত্র বস্তু, জ্ঞান অপেক্ষা উৎকৃষ্ট অন্বেষণের বিষয় ও সন্তোষ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর সুখ আর কিছুই নাই।
“বৃদ্ধজনের বাক্য শ্রবণ করা সৰ্ব্বতোভাবে উচিত। বৃদ্ধগণের সেবা করিলে অতি উৎকৃষ্ট জ্ঞানলাভ হয়। বেদাধ্যয়ন ও ভোজনকালে দক্ষিণাপাণি উত্তোলন করা বিধেয়। প্রতিনিয়ত বাক্য, মন ও ইন্দ্রিয়সংযম করা অবশ্য কর্ত্তব্য। সংস্কৃত পায়স, যাবক, কৃশর ও হবিদ্বারা দেবতা ও পিতৃলোকের উদ্দেশে অষ্টকা শ্রাদ্ধ, গ্রহগণের পূজা, ক্ষৌরকৰ্ম্মে মঙ্গলাচরণ, ক্ষুতকারীকে আশীর্ব্বাদ এবং ব্যাধিত ব্যক্তিদিগকে ‘দীর্ঘায়ুরস্তু’ বলিয়া অভিনন্দন করা উচিত। বিপদগ্রস্ত হইয়াও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির প্রতি ‘তুমি’ এই বাক্য প্রয়োগ করা বিধেয় নহে। বিদ্যাসম্পন্ন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদিগের পক্ষে তুমি এই বাক্য মৃত্যুতুল্য। বয়ঃকনিষ্ঠ, সমবয়স্ক বা শিষ্যদিগের প্রতি ‘তুমি’ বাক্য প্রয়োগ করা দোষাবহ নহে। পাপাত্মাদিগের মনোমধ্যে নিয়ত পাপকাৰ্য্যেরই উদয় হইয়া থাকে। পাপাত্মারা জ্ঞানপূর্ব্বক পাপকার্য্যের অনুষ্ঠান ও সজ্জনসমাজে তাহা গোপন করিয়া পরিশেষে স্বয়ং বিনষ্ট হয়।
“অসাধু ব্যক্তিরা ‘আমি যে কুকার্য্যের অনুষ্ঠান করিলাম, ইহা দেবতা বা মনুষ্য কেহই জ্ঞাত হইতে পারে নাই’, এই মনে করিয়া কত পাপকার্য্য গোপনে করিতে চেষ্টা করে, কিন্তু উহা নিতান্ত দোষাবহ। পাপাচরণ করিয়া গোপনে রাখিলে নিশ্চয়ই পাপের বৃদ্ধি হয়। অতএব পাপানুষ্ঠানপূৰ্ব্বক তাহা গোপনে না রাখিয়া সাধুসমাজে প্রকাশ করাই উচিত। সাধুব্যক্তিদিগের নিকট পাপকাৰ্য্য প্রকাশ করিলে, তাহারা কোন না কোন উপায়দ্বারা তাহার শান্তিবিধান করিতে পারেন। যেমন লবণের উপর জলসেক করিলে উহা তৎক্ষণাৎ বিলীন হয়, তদ্রূপ পাপানুষ্ঠান করিয়া প্রায়শ্চিত্ত করিলে পাপ অচিরাৎ বিলুপ্ত হইয়া যায়। অধিক.. ধর্ম্মলাভের নিমিত্ত অল্প পাপের অনুষ্ঠান করা অনুচিত নহে।
“আশাগ্রস্ত হইয়া দ্রব্য সঞ্চয় করিলে কালসহকারে উহা বিনষ্ট হয় সঞ্চয়কার দেহনাশের পর অন্যকর্ত্তৃক উপভুক্ত হয়। পণ্ডিতব্যক্তিরা কহেন যে, মনের দ্বারাই লোকের ধর্ম্মানুষ্ঠান হয়। অতএব অনায়াসসাধ্য ধর্ম্মের অনুষ্ঠান করা সকলেরই উচিত। একাকী ধর্ম্মানুষ্ঠান করা কর্ত্তব্য, ধৰ্ম্মধ্বজী হওয়া কদাপি বিধেয়, নহে। যাহারা ফল উপভোগের বাসনায় ধৰ্ম্মানুষ্ঠান করে, তাহাদিগকে ধর্ম্মের বণিক বলিয়া কীর্ত্তন করা যায়। গর্ব্বিতভাব পরিত্যাগপূৰ্ব্বক দেবার্চ্চনা, অকপটভাবে গুরুজনের সেবা এবং সৎপাত্রে দান করিয়া পরলোকের হিতসাধন করা অবশ্য কর্ত্তব্য।”
