4 of 4

১৬৮. যোগমার্গে ভীষ্মের তনুত্যাগ—অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া

১৬৮তম অধ্যায়

যোগমার্গে ভীষ্মের তনুত্যাগ—অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া

বৈশম্পায়ন কহিলেন, শান্তনুনন্দন মহাত্মা ভীষ্ম তত্ৰত্য ব্যক্তিগণকে এইরূপ কহিয়া ক্ষণকাল মৌনাবলম্বনপূর্ব্বক যথাক্রমে মূলাধারাদি স্থানে চিত্তকে সন্নিবেশিত করিয়া যোগাবলম্বন করিলেন। তখন তাঁহার প্রাণবায়ু নিরুদ্ধ হওয়াতে উহা যে যে অঙ্গ পরিত্যাগ করিয়া ক্রমশঃ উর্দ্ধে উত্থিত হইতে লাগিল, তাঁহার সেই সেই অঙ্গ শরশূন্য ও ব্রণরহিত হইতে আরম্ভ হইল। তদ্দর্শনে বেদব্যাস প্রভৃতি মহর্ষিগণ, পাণ্ডবগণ ও বাসুদেব নিতান্ত বিস্ময়াবিষ্ট হইলেন। ক্ষণকালের মধ্যে ভীষ্মের গাত্র হইতে সমুদয় শরব্রণ অপনীত এবং প্রাণ ব্রহ্মরন্ধ্র ভেদ করিয়া উল্কার ন্যায় আকাশপথে উত্থিত হইল। ঐ সময় দেবগণ চতুর্দ্দিক হইতে দুন্দুভিধ্বনি ও পুষ্পবৃষ্টি করিতে আরম্ভ করিলেন। সিদ্ধ ও মহর্ষিগণ মহা আহ্লাদিত হইয়া শান্তনুনন্দনকে সাধুবাদ প্রদান করিতে লাগিলেন। ক্ষণকালমধ্যে সেই ভীষ্মের ব্রহ্মরন্ধ্র হইতে আকাশদেশে সমুত্থিত তেজোরাশি সকলের সমক্ষে বিলীন হইয়া গেল।

এইরূপে ভারতকুলধুরন্ধর মহাত্মা শান্তনুনন্দন দেহ পরিত্যাগ করিলে বিদুর ও পাণ্ডবগণ একত্র মিলিত হইয়া কাষ্ঠ ও বিবিধ গন্ধদ্রব্য আহরণপূর্ব্বক চিতা প্রস্তুত করিলেন। তৎকালে যুযুৎসু ও অপরাপর লোকসমুদয় দর্শকশ্রেণীমধ্যে পরিণত হইলেন। মহাত্মা যুধিষ্ঠির ও বিদুর ইঁহারা উভয়ে মহার্হ পট্টবস্ত্রদ্বারা ভীষ্মকে আচ্ছাদন করিলেন। তখন যুযুৎসু অতি উৎকৃষ্ট ছত্রধারণ, ভীমসেন ও অর্জ্জুন চামরগ্রহণপূৰ্ব্বক তাঁহার সমীপে অবস্থান ও মাদ্ৰীতনয়দ্বয় তাঁহার মস্তকে উষ্ণীষ প্রদান করিলেন। কামিনীগণ তালবৃন্ত ধারণপূৰ্ব্বক তাঁহার চতুর্দ্দিকে অবস্থান করিয়া বীজন করিতে লাগিলেন।

অনন্তর কৌরবগণ সকলে সমবেত হইয়া নিয়মানুসারে তৎকালোচিত শ্রাদ্ধ, হুতাশনে আহুতি প্রদান এবং সামবেদবেত্তারা সামগান করিতে আরম্ভ করিলেন। অনন্তর ধৃতরাষ্ট্র প্রভৃতি মহাত্মারা ভীষ্মকে চিতায় আরোপিত করিয়া চন্দন কাষ্ঠ এবং কালীয়ক ও কালাগুরু প্রভৃতি বিবিধ সুগন্ধদ্রব্যদ্বারা তাহাকে আচ্ছাদনপূৰ্ব্বক চিতা প্রজ্বলিত করিয়া দিলেন। কৌরবগণ এইরূপে মহাত্মা ভীষ্মের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সমাপনপূৰ্ব্বক চিতার বামপার্শ্ব দিয়া ঋষিগণের সহিত ভাগীরথীতীরে প্রস্থান করিলেন। ঐ সময় মহর্ষি বেদব্যাস, নারদ, বাসুদেব এবং কুলকামিনী ও পুরবাসিগণ তাঁহাদিগের পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করিতে লাগিলেন।

গঙ্গার পুত্রশোকজন্য বিলাপ—কৃষ্ণের সান্ত্বনা

অনন্তর সকলে ভাগীরথীতীরে উপস্থিত হইয়া ভীষ্মের উদ্দেশে জলাঞ্জলি প্রদান করিতে আরম্ভ করিলে, ভগবতী ভাগীরথী সলিল হইতে উত্থিত হইয়া শোকভরে রোদন করিতে করিতে কৌরবগণকে সম্বোধনপূর্বক কহিলেন, “হে কৌরবগণ! আমার পুত্র রাজোচিত সদ্ব্যবহার, প্রজ্ঞা ও বিনয়াদি গুণে বিভূষিত, বৃদ্ধ ও গুরুজনদিগের সৎকারনিরত, পিতৃভক্ত ও মহাব্রতপরায়ণ ছিল। পূৰ্ব্বে জমদগ্নিপুত্র পরশুরামও বিবিধ দিব্যাস্ত্রদ্বারা ঐ মহাবলপরাক্রান্ত বীরকে পরাজিত করিতে সমর্থ হয় নাই; ঐ মহারথ কাশীপুরীতে স্বয়ংবরসময়ে সমুদয় নরপতিকে পরাস্ত করিয়া কন্যাগণকে আনয়ন করিয়াছিল; এই পৃথিবীতে উহার তুল্য পরাক্রমশালী আর কেহই ছিল না। ঐ মহাবলপরাক্রান্ত বীর কুরুক্ষেত্রে অনায়াসে পরশুরামকে পরাস্ত করিয়াছিল; এক্ষণে শিখণ্ডী আমার সেই মহাবলপরাক্রান্ত পুত্রকে নিহত করিল। হায়! যখন আজ সেই প্রিয়পুত্রের অদর্শনেও আমার হৃদয় শতধা বিদীর্ণ হইল না; তখন নিশ্চয়ই উহা প্রস্তরদ্বারা নির্ম্মিত হইয়াছে।”

মহানদী গঙ্গা এইরূপে নানাপ্রকার বিলাপ করিলে মহাত্মা বাসুদেব ও বেদব্যাস তাঁহাকে আশ্বাস প্রদানপূর্বক কহিলেন, “দেবি! আর শোক করিবেন না। আপনার পুত্র অতি উৎকৃষ্ট রোকে গমন করিয়াছেন, সন্দেহ নাই। উনি অষ্টবসুর মধ্যে একজন, মহর্ষি বশিষ্ঠদেবের শাপপ্রভাবে মর্ত্যলোকে জন্মপরিগ্রহ করিয়াছিলেন, অতএব তাঁহার নিমিত্ত আপনার শোক করা কর্তব্য নহে। মহাবীর ধনঞ্জয়ই ক্ষত্রিয়ধৰ্ম্মানুসারে সমরাঙ্গনে তাঁহাকে নিহত করিয়াছেন। তাঁহাকে বিনাশ করা কখনই শিখণ্ডীর সাধ্যায়ত্ত নহে। তিনি অস্ত্র ধারণ করিলে ইন্দ্রাদি দেবগণও তাঁহাকে বিনাশ করিতে সমর্থ হইতেন না। এক্ষণে তিনি স্বচ্ছন্দে স্বর্গে গমন করিয়া পুনরায় বসুমধ্যে পরিগণিত হইয়াছেন।”

ভগবান বাসুদেব ও মহর্ষি বেদব্যাস উভয়ে জাহ্নবীকে এইরূপ আশ্বাস প্রদান করিলে, তিনি শোক পরিত্যাগপূর্বক প্রকৃতিস্থ হইলেন। তখন বাসুদেব প্রভৃতি সকলেই তাঁহাকে অভিবাদনপূৰ্ব্বক তাঁহার আজ্ঞা গ্রহণ করিয়া তথা হইতে প্রস্থান করিলেন।

স্বর্গারোহণিকপৰ্বাধ্যায় সমাপ্ত

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *