১৬১তম অধ্যায়
মূৰ্ত্তিভেদে রুদ্ৰমাহাত্মভেদ
কৃষ্ণ কহিলেন, “হে ধৰ্ম্মরাজ! এক্ষণে আমি বহুরূপ ও বহুনামধারী মহাত্মা রুদ্রদেবের মাহাত্ম্য আরও কিঞ্চিৎ কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। মুনিগণ সেই দেবদেব মহাদেবকে অগ্নি, স্থাণু, মহেশ্বর, একাক্ষ [একনেত্র], ত্র্যম্বক [ত্রিনেত্র], বিশ্বরূপ ও শিব বলিয়া কীর্ত্তন করেন। বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণেরা কহিয়া থাকেন যে, মহাদেবের মূৰ্ত্তি দুই প্রকার। তন্মধ্যে এক মূৰ্ত্তি অতি ভীষণ ও অপর মূৰ্ত্তি মঙ্গলময়। ঐ মূৰ্ত্তিদ্বয় আবার নানাবিধ মূর্ত্তিতে বিভক্ত হইয়া থাকে। তন্মধ্যে ভীষণমূৰ্ত্তি অগ্নি, বিদ্যুৎ ও ভাস্কর এবং সৌম্যমূৰ্ত্তি ধৰ্ম্ম, জল ও চন্দ্রস্বরূপ। মুনিগণ উহার শরীরের অর্ধাংশকে অগ্নি ও অর্ধাংশকে সোম বলিয়া কীর্ত্তন করেন। উহার সৌম্যমূৰ্ত্তি ব্রহ্মচর্য্যের অনুষ্ঠান এবং উগ্রমূৰ্ত্তি জগতের সংহার করিয়া থাকে।
“মহত্ত্ব ও ঈশ্বরত্বনিবন্ধন মহাদেবকে মহেশ্বরনামে নির্দ্দেশ করা যায়। উনি তীক্ষ্ণ, উগ্র, প্রবলপ্রতাপ, জগতের দহনকৰ্ত্তা ও শোণিতমিশ্রিত মজ্জামাংসভক্ষক বলিয়া উঁহার নাম রুদ্র; উনি দেবগণের মধ্যে মহান; উহার বিষয়ের পরিসীমা নাই ও উনি বিশ্বসংসারকে প্রতিপালন করেন বলিয়া উহার নাম মহাদেব। উনি ধূমরূপী বলিয়া উহার নাম ধূর্জ্জটি; উনি মনুষ্যগণের মঙ্গলকামনা করিয়া নিয়ত বিবিধ কর্ম্মদ্বারা তাহাদিগকে উন্নত করেন বলিয়া উহার নাম শিব; উনি স্থির, স্থিরলিঙ্গ ও স্বয়ং ঊর্ধ্বে অবস্থান করিয়া প্রাণীগণের প্রাণ বিনাশ করেন বলিয়া উহার নাম স্থাণু; উনি স্থাবরজঙ্গমাত্মক বহুবিধ রূপ ধারণ করেন বলিয়া উহার নাম বহুরূপ এবং বিশ্বদেব তাঁহার শরীরমধ্যে অবস্থান করেন বলিয়া উহার নাম বিশ্বরূপ হইয়াছে। উনি কখন সহস্রাক্ষ ও কখন অযুতাক্ষ হয়েন এবং কখন বা উহার শরীরের সর্ব্বত্র চক্ষু বিদ্যমান থাকে। উনি পশুদিগের অধিপতি হইয়া সতত তাহাদিগের প্রতিপালন ও.তাহাদিগের সহিত বিহার করেন বলিয়া পশুপতিনামে অভিহিত হয়েন।
“উঁহার লিঙ্গ প্রতিনিয়ত ব্রহ্মচর্য্যের অনুষ্ঠান করে বলিয়া সকলেই উঁহার পূজা করিয়া থাকে। লিঙ্গপূজায় উহার পরম প্রীতিলাভ হয়। যে ব্যক্তি উহার মূৰ্ত্তি এবং উঁহার লিঙ্গ পূজা করে, ঐ উভয়ের মধ্যে লিঙ্গপূজয়িতারই অপেক্ষাকৃত অধিকতর উন্নতিলাভ হইয়া থাকে। ঋষি, দেবতা, গন্ধৰ্ব্ব ও অপ্সরাগণ উহার ঊর্দ্ধসমাস্থিত লিঙ্গের অর্চ্চনা করেন। লিঙ্গপূজা করিলে মহেশ্বর পরমাহ্লাদিত হইয়া পূজয়িতাকে উৎকৃষ্ট সুখ প্রদান করেন। শ্মশানভূমি উহার আবাসস্থান। যাঁহারা ঐ স্থানে উঁহার অর্চ্চনা করেন, তাঁহারা চরমে বারলোকগমনে সমর্থ হয়েন। ভগবান ভূতপতি দেবগণের মৃত্যু এবং শরীরস্থিত প্রাণ ও অপানবায়ুস্বরূপ। ব্রাহ্মণগণ তাঁহার নানাপ্রকার বিকটমূৰ্ত্তির পূজা করিয়া থাকেন। কৰ্ম্ম ও চরিত্রনিবন্ধন বেদে উহার নানাপ্রকার নাম কীৰ্ত্তিত হইয়াছে। ব্রাহ্মণগণ উঁহার বেদোক্ত ও ব্যাসোক্ত শতরুদ্রীয় পাঠ করিয়া থাকেন। উনিই সমুদয় লোককে অভিলষিত বস্তু প্রদান করেন।
“ব্রাহ্মণ ও অন্যান্য ঋষিগণ উহাকে বিশ্বরূপী, মহৎ ও সৰ্ব্বজ্যেষ্ঠ বলিয়া কীর্ত্তন করিয়া থাকেন। উনি দেবগণের আদি। উঁহার মুখ হইতে অগ্নি সমুৎপন্ন হইয়াছে। উনি প্রাণান্তেও শরণাগত ব্যক্তিদিগকে পরিত্যাগ করেন না। উনি মনুষ্যদিগকে আয়ু, আরোগ্য, ঐশ্বৰ্য্য, ধন ও বিবিধ কামনা প্রদান করেন; আবার উনিই তৎসমুদয় বিনষ্ট করিয়া থাকেন। ইন্দ্রাদি দেবগণের যেসমুদয় ঐশ্বৰ্য্য রহিয়াছে, তৎসমুদয় উঁহারই ঐশ্বৰ্য্য। উনি প্রতিনিয়ত ত্রিলোকের শুভাশুভ-কার্য্যে ব্যাপৃত রহিয়াছেন। সমুদয় ভোগ্যবস্তুতে উঁহার প্রভুত্ব আছে বলিয়া উহাকে ঈশ্বর এবং উনি যাবতীয় মহবিষয়ের অধীশ্বর বলিয়া উহাকে মহেশ্বর বলিয়া নির্দ্দেশ করা যায়। উনি স্বীয় বিবিধ রূপদ্বারা এই বিশ্বসংসার ব্যাপ্ত করিয়া অবস্থান করিতেছেন। সমুদ্রমধ্যস্থিত বড়বামুখ উঁহারই বক্ত্র।”
