১৬৪তম অধ্যায়
কর্ম্মানুসারে সুখ-দুঃখ ভোগ
ভীষ্ম কহিলেন, “হে ধৰ্ম্মরাজ! যে ব্যক্তি স্বয়ং সৎকার্য্যের অনুষ্ঠান করে অথবা অন্যকে সকাৰ্য্যের অনুষ্ঠান করায়, তাহার ধারে ধর্ম্মলাভের আশা থাকে; আর যে ব্যক্তি স্বয়ং অসৎকার্য্যের অনুষ্ঠান করে, অথবা অন্যকে অসৎকার্য্যের অনুষ্ঠান করায়, সে কখই ধর্ম্মলাভ করিবার প্রত্যাশা করিবে না। কালই নিগ্রহ ও অনুগ্রহে কর্ত্তা। কালই প্রাণীগণের বুদ্ধিতে প্রবেশ করিয়া তাহাদিগকে ধর্ম্মাধর্ম্মে প্রবর্ত্তিত করে। লোকে যখন ধৰ্ম্মফল প্রত্যক্ষ করিয়া ধৰ্ম্মকেই শ্রেয়স্কর পদার্থ জ্ঞান করে, সেই সময়েই তাহার ধর্ম্মে বিশ্বাস জন্মে। অদৃঢ়বুদ্ধি ব্যক্তিদিগের কখনই ধৰ্ম্মফলে বিশ্বাস উৎপন্ন হয় না। ধর্ম্মে বিশ্বাস থাকাই প্রাজ্ঞ ব্যক্তির লক্ষণ। অতএব কর্ত্তব্যাকর্ত্তব্যবিশারদ বিজ্ঞ ব্যক্তিরা যত্নসহকারে সময়ানুরূপ ধৰ্ম্মের অনুষ্ঠান করিবেন। ঐশ্বৰ্য্যসম্পন্ন ধার্ম্মিক ব্যক্তিরা আর এই ভূমণ্ডলে রজোগুণসম্পন্ন হইয়া জন্মগ্রহণ করিবেন না মনে করিয়াই বুদ্ধিদ্বারা আত্মার উন্নতি করিয়া থাকেন। কাল কখনই যথার্থ ধর্ম্মকে অবিশুদ্ধ ও দুঃখের হেতুভূত করিতে পারে না, অতএব ধৰ্ম্মচারী ব্যক্তিদিগের আত্মাকে বিশুদ্ধ জ্ঞান করা অবশ্য কর্ত্তব্য। অধৰ্ম্ম প্রজ্বলিত পাবকের ন্যায় প্রদীপ্ত, কালকর্ত্তৃক পরিরক্ষিত ধৰ্ম্মকে স্পর্শও করিতে সমর্থ হয় না। ধৰ্ম্মপ্রভাবেই লোকে বিশুদ্ধচিত্ত ও নিস্পাপ হইয়া থাকে এবং ধৰ্ম্মই বিজয়প্রদ ও ত্রিলোকের প্রকাশক বলিয়া অভিহিত হয়।
“কেহ কাহাকে বলপূৰ্ব্বক ধর্ম্মে প্রবর্ত্তিত করিতে পারে না। অধাৰ্ম্মিকেরা পণ্ডিতগণকর্ত্তৃক বলপূৰ্ব্বক উপদিষ্ট হইলে, লোকভয়বশতঃই ছলধৰ্ম্মের অনুষ্ঠানে প্রবৃত্ত হয়। শূদ্রবংশীয় সাধুব্যক্তিরা ‘আমাদিগের কোন আশ্রমধৰ্ম্মেই অধিকার নাই’ এইরূপ ছলবাক্য প্রয়োগ না করিয়া স্বধর্ম্মের অনুষ্ঠান করিয়া থাকেন। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র চারিবর্ণই পঞ্চভূতময় দেহ ধারণ করে বটে, কিন্তু শাস্ত্রে উহাদিগের বিশেষ বিশেষ ধর্ম্ম নির্দ্দিষ্ট আছে। উহারা সেই সেই নির্দ্দিষ্ট ধর্ম্ম প্রতিপালন করিলেই সকলে একভাব প্রাপ্ত হইতে পারে। যদি বল যে, ধৰ্ম্ম নিত্যপদার্থ, কিন্তু উহার ফল স্বর্গাদি অনিত্য হয় কেন! তাহার উত্তর এই যে, ধর্ম্ম দুই প্রকার—সকাম ও নিষ্কাম। সকাম ধৰ্ম্ম অনিত্য; সুতরাং তাহার ফল অনিত্য; আর নিষ্কাম ধৰ্ম্মনিত্য, সুতরাং তাহার ফলও নিত্য। সমুদয় লোকেরই দেহ ও আত্মা একরূপ বটে, কিন্তু পূৰ্ব্বকৃত ধৰ্ম্মবলে কোন কোন ব্যক্তির হৃদয়ে ধৰ্ম্মসংযুক্ত সঙ্কল্প উদিত হইয়া গুরুর ন্যায় তাহাদিগকে সকাৰ্য্যে প্রবর্ত্তিত করিয়া থাকে। ফলতঃ প্রাক্তন কাৰ্য্যই লোকের সুখ-দুঃখের কারণ; সুতরাং তিৰ্য্যগযোনিগত প্রাণীগণেরও সুখদুঃখ ভোগ করা আশ্চর্য্যের বিষয় নহে।”
