১৫২তম অধ্যায়
বিপ্রপূজার ফল—পবন-কার্ত্তবীৰ্য্যসংবাদ
যুদ্ধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! ব্রাহ্মণগণের পূজা করিলে কি ফললাভ হয়, তাহা কীর্ত্তন করুন।”
ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! এই স্থানে পবন-কার্ত্তবীর্য্যসংবাদনামক এক পুরাতন ইতিহাস কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর।
“হৈহয়বংশোদ্ভব সহস্রভুজসম্পন্ন কার্ত্তবীৰ্য্য সদ্বীপা সসাগরা পৃথিবীর অধীশ্বর হইয়া স্বয়ং সমুদয় শাসন করিয়াছিলেন। মাহিষ্মতীপুরী তাঁহার রাজধানী ছিল। তিনি ক্ষত্রিয়ধৰ্ম্মানুসারে বিনীতভাবে বহুদিন মহর্ষি দত্তাত্রেয়ের আরাধনা ও তাঁহাকে প্রভূত ধনদান করিয়াছিলেন। একদা ঐ মহর্ষি কার্ত্তবীর্য্যের ভক্তিভাবে সাতিশয় সন্তুষ্ট হইয়া তাঁহাকে তিনটি বর প্রার্থনা করিতে কহিলেন। তখন কার্ত্তবীৰ্য্য তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘ভগবন! যদি প্রসন্ন হইয়া থাকেন, তবে এই বর প্রদান করুন যে, আমি যখন সমরাঙ্গনে সৈন্যমধ্যে অবস্থান করিব, তখন যেন আমার সহস্রবাহু উৎপন্ন হয়। আমি যেন স্বীয় বিক্রমবলে সমুদয় পৃথিবী পরাজয় ও ধৰ্ম্মানুসারে উহা শাসন করিতে পারি। আর আপনার নিকট আমার এই এক প্রার্থনা যে, আমি সত্যপথ হইতে বিচলিত হইলে যেন সাধু ব্যক্তিরা আমাকে শাসন করেন।’
বরলাভে উদ্দীপ্ত কার্ত্তবীর্য্যের দর্প
“কার্ত্তবীৰ্য্য এইরূপ প্রার্থনা করিলে দ্বিজবর দত্তাত্রেয় ‘তথাস্তু’ বলিয়া তাঁহাকে বর প্রদান করিলেন। তখন মহাবীর মহর্ষির বরপ্রভাবে সমুদয় পৃথিবী পরাজিত করিয়া সূৰ্য্য ও অনলসদৃশ রথে আরোহণপূৰ্ব্বক বলদর্পে একান্ত দর্পিত হইয়া কহিলেন, ‘ধৈৰ্য্য, বীৰ্য্য, যশ ও পরাক্রমে কেহই আমার তুল্য নাই।’ মহারাজ কার্ত্তবীৰ্য্য এই কথা কহিয়া তূষ্ণীম্ভাব অবলম্বন করিলে তৎক্ষণাৎ এই আকাশবাণী তাঁহার কর্ণকুহরে প্রবিষ্ট হইল, ‘রে মূঢ়! ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ; ব্রাহ্মণের সাহায্য ভিন্ন ক্ষত্রিয়েরা কখন প্রজাশাসন করিতে পারে না।’
“তখন কার্ত্তবীৰ্য্য কহিলেন, ‘আমি সন্তুষ্ট হইলে জীবগণের সৃষ্টি এবং রোষাবিষ্ট হইলে সমুদয় জীবকে বিনাশ করিতে পারি। অতএব ব্রাহ্মণ কখনই আমা অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ নহে। “ব্রাহ্মণের সাহায্য ভিন্ন ক্ষত্রিয় কখন প্রজাপালন করিতে সমর্থ হয় না।” তুমি এই হেতু নির্দ্দেশপূৰ্ব্বক ব্রাহ্মণকে শ্রেষ্ঠ ও ক্ষত্রিয়কে তদপেক্ষা হীন বলিয়া কীর্ত্তন করিলে; কিন্তু আমার মতে ব্রাহ্মণ অপেক্ষা ক্ষত্রিয় শ্রেষ্ঠ; ব্রাহ্মণগণ অধ্যয়ন, অধ্যাপন ও যজ্ঞাদিচ্ছলে ক্ষত্রিয়কে আশ্রয় করিয়া জীবিকানির্ব্বাহ করে। কিন্তু ক্ষত্রিয়েরা কখনই ব্রাহ্মণের আশ্রয় গ্রহণ করে না। প্রজা প্রতিপালন করা ক্ষত্রিয়ের কৰ্ম্ম। ব্রাহ্মণেরা সেই, ক্ষত্রিয়কে অবলম্বন করিয়া জীবিকানির্ব্বাহ করে, তবে ব্রাহ্মণ কিরূপে ক্ষত্রিয় অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হইল? তুমি আকাশ হইতে যাহা কহিলে, উহা মিথ্যা। অতঃপর আমি ভিক্ষোপজীবী আত্মাভিমানী ব্রাহ্মণগণকে নিশ্চয় পরাজিত ও বশীভূত করিব। ত্রিলোকমধ্যে কি দেবতা, কি মনুষ্য, কেহই আমাকে রাজ্য হইতে পরিভ্রষ্ট করিতে সমর্থ নহে। অতএব আমি কখনই ব্রাহ্মণ অপেক্ষা নিকৃষ্ট নহি। আজ আমি নিশ্চয়ই এই ব্রাহ্মণপ্রধান জগৎকে ক্ষত্রিয় প্রধান করিব। সমরাঙ্গনে কেহই আমার পরাক্রম সহ্য করিতে সমর্থ নহে।’
“মহাবীর কার্ত্তবীৰ্য্য এইরূপ অহঙ্কার প্রকাশ করিলে আকাশবাণীর অধিষ্ঠাত্রী দেবতা সরস্বতী তাঁহার বাক্য-শ্রবণে একান্ত শঙ্কিত হইলেন।
“তখন পবনদেব অন্তরীক্ষ হইতে কার্ত্তবীৰ্য্যকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘হে অর্জ্জুন! তুমি এক্ষণে এই দূষিত ভাব পরিত্যাগ করিয়া ব্রাহ্মণকে নমস্কার কর। উঁহাদিগের অপকার চেষ্টা করিলে নিশ্চয়ই তোমার রাষ্ট্রবিপ্লব উপস্থিত হইবে। উঁহারা তোমাকে হয় বিনষ্ট, না হয় রাজ্য হইতে নিরাকৃত করিবেন।’
“তখন কার্ত্তবীৰ্য্য তাঁহাকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, ‘ভদ্র তুমি কে?’
“পবন কহিলেন, “আমি দেবদূত বায়ু, তোমাকে হিতোপদেশ, প্রদান করিতে আগমন করিয়াছি।’
“তখন কার্ত্তবীৰ্য্য পবনদেবকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘সমীরণ! আপনি ব্রাহ্মণের প্রতি বিলক্ষণ ভক্তি প্রদর্শন করিলেন। ব্রাহ্মণ, অগ্নি, সূৰ্য্য, আকাশ, জল, পৃথিবীও আপনার সদৃশ নয়।’ ”
