১৫৬তম অধ্যায়
অত্রি ও চ্যবনঋষির প্রভাববর্ণন
ভীষ্ম কহিলেন, “হে ধৰ্ম্মরাজ! ভগবান সমীরণ এই কথা কহিলে, মহারাজ কার্ত্তবীৰ্য্য তাঁহার বাক্যশ্রবণে মৌনাবলম্বন করিয়া রহিলেন। তখন পবনদেব পুনর্ব্বার তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘মহারাজ! আমি তোমার নিকট মহর্ষি অত্রির কাৰ্য্য কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। পূৰ্ব্বে যখন অসুরগণের সহিত দেবগণের যুদ্ধ হয়, তৎকালে রাহু, চন্দ্র ও সূৰ্য্যকে শরনিকরে বিদ্ধ করিয়াছিল; সুতরাং ঐ সময়ে সমুদয় দেবগণকে অন্ধকারে সমাচ্ছন্ন হইতে হইয়াছিল। পরাক্রান্ত দানবগণ ঐ সুযোগে অন্ধকারাবৃত দেবগণকে নিতান্ত নিপীড়িত করিতে আরম্ভ করিল। তখন দেবগণ অসুরগণের শরে একান্ত কাতর হইয়া তপোধনাগ্রগণ্য জিতেন্দ্রিয় মহাত্মা অত্রির সমীপে গমনপূর্ব্বক তাঁহাকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, “ভগবন! চন্দ্র-সূৰ্য্য অসুরগণের শরজালে বিদ্ধ হওয়াতে আমরা এই অন্ধকারময় প্রদেশে শত্ৰুবাণে বিদ্ধ হইতেছি; কোনরূপেই শান্তিলাভ করিতে পারিতেছি না। অতএব আপনি অনুগ্রহ করিয়া আমাদিগের পরিত্রাণ বিধান করুন।”
‘তখন অত্রি কহিলেন, “দেবগণ! আমি কিরূপে তোমাদিগের রক্ষাবিধান করিব, তাহা নির্দ্দেশ কর।” দেবগণ কহিলেন, “ভগবন! আপনি চন্দ্রসূৰ্য্যরূপী হইয়া তিমিরসমুদয় ধ্বংস করিয়া আমাদিগের শত্রুগণকে নিপাতিত করুন।” দেবগণ এইরূপ অনুরোধ করিলে মহাত্মা অত্রি তাঁহাদের বাক্যানুসারে প্রথমে প্রিয়দর্শন চন্দ্রের রূপ ধারণ করিয়া পরিশেষে স্বীয় তপোবলে দানবগণের শরনিকরে বিদ্ধ চন্দ্র ও সূৰ্য্যকে উদ্ভাসিত করিলেন। তখন সমুদয় জগৎ তিমিরশূন্য ও দেবগণের অস্ত্রজালে প্রদীপ্ত হইয়া উঠিল। ভগবান্ অত্রি এইরূপে তিমিররাশি ধ্বংস করিয়া আপনার তেজোবলে দেবগণের প্রবল শত্রু দানবগণকে দগ্ধ করিতে লাগিলেন। তখন দেবগণও অসুরদিগকে মহাত্মা অত্রির তেজে দগ্ধ হইতে দেখিয়া তাহাদিগকে নিপাতিত করিলেন। হে মহারাজ! এই আমি তোমার নিকট মহাত্মা অত্রির কাৰ্য্য সবিস্তর কীর্ত্তন করিলাম। ঐ অগ্নিসহায়, চৰ্ম্মাম্বরধারী, ফলমূলভোজী মহাত্মা অত্রি হইতে এইরূপে দেবগণের রক্ষা ও অসুরগণের সংহার হইয়াছিল। এক্ষণে বল দেখি, কোন্ ক্ষত্রিয় সেই মহাত্মা অত্রি হইতে শ্রেষ্ঠ?
“ভগবান সমীরণ এই কথা কহিলে মহারাজ কার্ত্তবীৰ্য্য তাঁহার বাক্যশ্রবণে মৌনাবলম্বন করিলেন। তখন পবন পুনৰ্ব্বার তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, “মহারাজ! এক্ষণে আমি মহাত্মা চ্যবনের কার্য্য কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। পূৰ্ব্বে মহাত্মা চ্যবন দেবসমাজে অশ্বিনীকুমারদ্বয়কে সোমপায়ী করিবেন বলিয়া অঙ্গীকার করিয়া দেবরাজ ইন্দ্রকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিয়াছিলেন, “দেবরাজ! তুমি অশ্বিনীকুমারদ্বয়কে দেবগণের সহিত সোমরস পান করিতে অনুমতি প্রদান কর।”
“তখন ইন্দ্র কহিলেন, ‘ভগবান্ উহারা আমাদিগের পরিত্যজ্য ও অসম্মানিত, সুতরাং আমরা কখনই উহাদিগের সহিত সোমরস পান করিতে পারিব না; অতএব আপনার এরূপ অনুরোধ নিতান্ত অকর্ত্তব্য। আপনি আমাকে অন্য যাহা আজ্ঞা করিবেন, আমি অবশ্যই তাহা প্রতিপালন করিব।’
“চ্যবন কহিলেন, ‘দেবরাজ! ইঁহারা সূর্য্যের পুত্র। সুতরাং ইঁহারা অবশ্যই তোমাদিগের সহিত সোমরস পান করিতে পারেন। অতএব তোমরা আমার বাক্য রক্ষা কর, তাহা হইলে নিশ্চয়ই শ্রেয়লাভে সমর্থ হইবে। যদি তোমার আমার বাক্য লঙ্ঘন কর তাহা হইলে তোমাদের বিপদের পরিসীমা থাকিবে না।’
“ইন্দ্র কহিলেন, ‘মহর্ষে! আমি কখনই অশ্বিনীকুমারদ্বয়ের সহিত সোমরস পান করিব না। অন্যের যদি ইচ্ছা হয়, উহাদিগের সহিত সোমরস পান করুক।’
“তখন চ্যবন কহিলেন, ‘দেবরাজ! যদি তুমি সহজে আমার বাক্য প্রতিপালন না কর, তাহা হইলে আমি অদ্যই তোমাকে নিপীড়িত করিয়া যজ্ঞভূমিতে অশ্বিনীকুমারদ্বয়ের সহিত সোমরস পান করাইব। মহর্ষি চ্যবন এই বলিয়া অশ্বিনীকুমারদ্বয়ের হিতসাধনার্থ সহসা যজ্ঞ আরম্ভ করিয়া মন্ত্রবলে সুরগণকে অভিভূত করিলেন, দেবরাজ ইন্দ্র মহর্ষি চ্যবনের সেই কাৰ্য্য দর্শনে ক্রোধাবিষ্ট হইয়া বিপুল শৈল ও বজ্ৰ সমুদ্যত করিয়া তাঁহার প্রতি ধাবমান হইলেন। তপোধনাগ্রগণ্য ভগবান্ চ্যবন ইন্দ্রকে ঐরূপ পর্ব্বত ও বজ্রহস্তে ধাবমান দেখিয়া সহসা জলনিক্ষেপপূৰ্ব্বক তাঁহাকে বজ্র ও পৰ্ব্বতের সহিত স্তম্ভিত করিয়া মদনামে এক মন্ত্ৰাহুতিময় ভীষণ পুরুষের সৃষ্টি করলেন। ঐ পুরুষের দন্তসমুদয় শতযোজন বিস্তৃত ও দংষ্ট্ৰাসকল দ্বিশত যোজন বিস্তৃত। উহার বদনমণ্ডল দেখিতে দেখিতে অতি ভীষণ হইয়া উঠিল এবং অধর ভূমিতল ও ওষ্ঠ আকাশমণ্ডল স্পর্শ করিল। তখন মহার্ণবে তিমিমৎস্যের মুখে যেমন ক্ষুদ্র মৎস্যসমুদয় বাস করে, তদ্রূপ ইন্দ্রাদি দেবগণ তাহার জিহ্বামূলে অবস্থান করিতে লাগিলেন।
“এইরূপে দেবগণের ঘোরতর বিপদ উপস্থিত হইলে তাঁহারা সকলে সমবেত হইয়া ইন্দ্রকে সম্বোধনপূৰ্ব্বক কহিলেন, ‘দেবরাজ! আমরা সকলেই অশ্বিনীকুমারদ্বয়ের সহিত সোমরস পান করিব, এক্ষণে আপনি এ বিষয়ে অসম্মত না হইয়া মহাত্মা চ্যবনকে নমস্কারপূর্বক উহার ক্রোধশান্তি করুন।’ দেবগণ এইরূপ অনুরোধ করিলে দেবরাজ অগত্যা মহাত্মা চ্যবনের চরণে নিপতিত হইয়া তাঁহার অভিলষিত বিষয়ে স্বীকার করিলেন। তখন মহর্ষি চ্যবন সেই যজ্ঞে সমুদয় দেবতার সহিত অশ্বিনীকুমারদ্বয়কে সোমরস পান করাইয়া অক্ষক্রীড়া, মৃগয়া, মদ্য ও স্ত্রীগণে সেই ভীষণমূৰ্ত্তি মদের বাসস্থান নির্দেশ করিয়া দিলেন। এই নিমিত্ত অক্ষক্রীড়াদিতে আসক্ত হইলে মনুষ্যমাত্রকেই অবসন্ন হইতে হয়; অতএব ঐ সমস্ত পরিত্যাগ করা মনুষ্যের অবশ্য কর্ত্তব্য।
“হে মহারাজ! এই আমি তোমার নিকট মহাত্মা চ্যবনের মাহাত্ম্য সবিস্তারে কীর্ত্তন করিলাম। এক্ষণে বল দেখি, কোন্ ক্ষত্রিয় সেই মহাত্মা চ্যবন হইতে শ্রেষ্ঠ?
