১৫৭তম অধ্যায়
ব্রাহ্মণগণের প্রভাবে কপ নামক দানব বধ
ভীষ্ম বলিলেন, “হে ধৰ্ম্মরাজ! ভগবান্ সমীরণ এই কথা কহিলে মহারাজ কার্ত্তবীৰ্য্য তাঁহার বাক্যশ্রবণে মৌনাবলম্বন করিয়া রহিলেন। তখন বায়ু পুনরায় তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘মহারাজ! এক্ষণে ব্রাহ্মণগণের প্রধান কার্য্য কীর্ত্তন করিতেছি, শ্রবণ কর। যে সময় ইন্দ্রাদি দেবগণ চ্যবনের আহুতিময় মদের আস্যবিবরে প্রবিষ্ট হয়েন, ঐ সময় মহর্ষি চ্যবন তাঁহাদিগের অধিকৃত মর্ত্যলোক এবং কপ নামক অসুরগণ, স্বর্গ অপহরণ করিয়াছিলেন। এইরূপে উভয়লোক অপহৃত হওয়াতে দেবগণ নিতান্ত দুঃখিতমনে ব্রহ্মার শরণাপন্ন হইয়া কহিলেন, ‘পিতামহ! আমরা মদের আস্যবিবরে প্রবিষ্ট হইলে কপগণ স্বর্গ ও মহর্ষি চ্যবন আমাদিগের অধিকৃত মর্ত্তলোক অপহরণ করিয়াছেন।”
‘তখন ব্রহ্মা কহিলেন, “হে সুরগণ! তোমরা অচিরাৎ ব্রাহ্মণগণের শরণাপন্ন হইয়া তাঁহাদিগকে প্রসন্ন কর; তাহা হইলেই অনায়াসে পূৰ্ব্বের ন্যায় উভয়লোক অধিকার করিতে সমর্থ হইবে।” কমলযোনি এই উপদেশ প্রদান করিলে দেবতারা ব্রাহ্মণগণের শরণাপন্ন হইলেন। তখন ব্রাহ্মণগণ তাঁহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “হে দেবগণ! আমরা কাহাদিগকে পরাজিত করিবার উদ্দেশে যজ্ঞ আরম্ভ করিব?” দেবগণ কহিলেন, “আপনারা কপদিগের সংহারার্থ যজ্ঞ আরম্ভ করুন।” তখন দ্বিজগণ কহিলেন, “আমরা অনায়াসে ঐ দুরাত্মাদিগকে মর্ত্যলোকে আনয়ন ও পরাজিত করিতে পারিব।”।
ব্রাহ্মণগণ এই কথা কহিয়া কপদিগের বিনাশসাধনার্থ যজ্ঞ আরম্ভ করিলেন। তখন কপগণ, ঐ বিষয় অবগত হইয়া ব্রাহ্মণগণের নিকট ধনীনামে একজন দূতকে প্রেরণ করিল। ঐ দূত ব্রাহ্মণগণের নিকট সমুপস্থিত হইয়া তাঁহাদিগকে সম্বোধনপূর্ব্বক কহিল, “হে দ্বিজগণ! কপগণ কোন অংশেই আপনাদিগের অপেক্ষা ন্যূন নহেন, তবে কেন বৃথা আপনারা তাঁহাদিগের বিনাশের নিমিত্ত যজ্ঞানুষ্ঠান করিতেছেন? তাঁহারা সকলেই বেদবেত্তা, প্রাজ্ঞ, যাজ্ঞিক ও সত্যব্রতপরায়ণ। লক্ষ্মী সৰ্ব্বদাই তাঁহাদিগের নিকট বিরাজমান রহিয়াছেন। তাঁহারা রজঃস্বলা সংসর্গ, অসময়ে স্ত্রীসম্ভোগ বা বৃথামাংস ভোজন করেন না। প্রতিদিন প্রদীপ্ত হুতাশনে আহুতি প্রদান, গুরুজনের আজ্ঞা প্রতিপালন, বালকদিগকে খাদ্যসামগ্রী প্রদান, সকলে মিলিত হইয়া শকটে গমন ও শুভকর্ম্মের অনুষ্ঠান করিয়া থাকেন। তাঁহারা কখন গর্ভবতী স্ত্রী ও বৃদ্ধজন অভুক্ত থাকিতে ভোজন, প্রাতঃকালে ক্রীড়া ও দিবাভাগে শয়ন করেন না। এতদ্ভিন্ন তাঁহারা অন্যান্য বহুবি: গুণে বিভূষিত। অতএব আপনারা কেন বৃথা তাঁহাদিগকে পরাজয় করিতে উদ্যত হইয়াছেন? এক্ষণে আপনারা এই অধ্যবসায় হইতে নিবৃত্ত হউন। তাহা হইলেই সুখী হইতে পারিবেন।”
‘কপগণপ্রেরিত দূত এই কথা কহিলে, ব্রাহ্মণগণ তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, “হে দূত! আমাদিগের সহিত দেবগণের কিছুমাত্র প্রভেদ নাই। অতএব আমরা সেই দেবগণের শত্রু কপগণকে অবশ্যই বিনাশ করিব। তুমি স্বস্থানে প্রস্থান কর।”
‘ব্রাহ্মণগণ এইরূপে দূতের বাক্য অস্বীকার করিলে দূত কপগণের নিকট সমুপস্থিত হইয়া কহিল, “হে মহাশয়গণ। ব্রাহ্মণেরা কোনরূপেই আপনাদিগের হিতসাধনে সম্মত নহেন।” দূত এই কথা কহিলে কপগণ ব্রাহ্মণদিগের প্রতি যারপরনাই ক্রূদ্ধ হইয়া অস্ত্রশস্ত্র গ্রহণপূৰ্ব্বক তাঁহাদিগের প্রতি ধাবমান হইল। তখন ব্রাহ্মণগণ তাঁহাদিগকে ধ্বজ উন্নত করিয়া আগমন করিতে দেখিয়া তাঁহাদিগের প্রাণবিনাশার্থ প্রজ্বলিত পাবক নিক্ষেপ করিলেন। সেই ভীষণ হুতাশন ব্রাহ্মণ কর্ত্তৃক নিক্ষিপ্ত হইবামাত্র কপদিগকে বিনাশ করিয়া মেঘমণ্ডলের ন্যায় আকাশমধ্যে বিচরণ করিতে লাগিল। ঐ সময়ে দেবতারাও সকলে সমবেত হইয়া অন্যান্য দৈত্যগণকে নিপাতিত করিয়াছিলেন। কিন্তু এদিকে বিপ্রগণ যে কপদিগকে বিনাশ করিয়াছেন, তাহা তাঁহারা অবগত হইতে পারেন নাই। অনন্তর দেবর্ষি নারদ তাঁহাদিগের নিকট সমুপস্থিত হইয়া কপগণের নিধনবৃত্তান্ত বিশেষরূপে কীর্ত্তন করিলেন। তখন দেবগণ নারদের বাক্য শ্রবণে অত্যন্ত আহ্লাদিত হইয়া ব্রহ্মা এবং ব্রাহ্মণগণকে বারংবার প্রশংসা করিতে লাগিলেন এবং পরিশেষে প্রভূত বলবীৰ্য্যসম্পন্ন হইয়া পুনরায় ত্রিলোকমধ্যে আধিপত্য লাভ করিলেন।
বিপ্রপ্রভাব শ্রবণে কার্ত্তবীর্য্যের দম্ভ ত্যাগ
“হে ধৰ্ম্মরাজ! পবনদেব এই কথা কহিলে মহারাজ কার্ত্তবীৰ্য্য ব্রাহ্মণগণের প্রতি ভক্তিপরায়ণ হইয়া তাঁহাকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘সমীরণ! আমি ব্রাহ্মণের হিতসাধনার্থই জীবনধারণ করিয়াছি, অতঃপর প্রতিনিয়ত উহাদিগকে নমস্কার করিব। আমি মহাত্মা দত্তাত্রেয়ের প্রসাদবলেই এইরূপ যশোলাভ ও শ্রেষ্ঠতর ধর্ম্মের অনুষ্ঠান করিয়াছি। আপনি ব্রাহ্মণদিগের যেরূপ মাহাত্ম্য কীর্ত্তন করিলেন, আমি যত্নপূৰ্ব্বক তৎসমুদয়ই শ্রবণ করিয়াছি।
“তখন পবনদেব কার্ত্তবীৰ্য্যকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘মহারাজ! জিতেন্দ্রিয় হইয়া ক্ষত্রিয়ধৰ্ম্ম অনুসারে ব্রাহ্মণগণকে প্রতিপালন কর। তুমি ইতিপুর্ব্বে ব্রাহ্মণগণের প্রতি যে অবজ্ঞা প্রদর্শন করিয়াছ, সেই অপরাধনিবন্ধন কালক্রমে ভৃগুবংশ হইতে তোমার ঘোরতর ভয় সমুপস্থিত হইবে।”
