2 of 4

১০০. দীপদানাদি বলিকৰ্ম্মে পরাঙ্মুখ নহুষের পতন

১০০তম অধ্যায়

দীপদানাদি বলিকৰ্ম্মে পরাঙ্মুখ নহুষের পতন

যুধিষ্ঠির কহিলেন, “পিতামহ! মহারাজ নহুষ কিরূপে বিপন্ন ও ইন্দ্ৰত্ব হইতে পরিভ্রষ্ট হইয়া ভূতলে নিপতিত হইলেন, তাহা সবিস্তর কীৰ্ত্তন করুন।”

ভীষ্ম কহিলেন, “ধৰ্ম্মরাজ! মহারাজ নহুষ ইন্দ্ৰত্ব লাভপূৰ্ব্বক প্রথমতঃ বিবিধ দৈব ও লৌকিক কার্য্যের অনুষ্ঠান করিতে বাসনা করিয়া মনে মনে চিন্তা করিতে লাগিলেন, কি দেবলোক, কি মনুষ্যলোক, উভয়লোকেই সদাচারনিরত গৃহমেধী মহাত্মারা উন্নতিলাভে সমর্থন হয়েন। গ্রহদিগের উদ্দেশে ধূপদীপ, সিদ্ধান্নের অগ্রভাগ ও বলি প্রদান করিয়া তাহাদিগকে নমস্কার করিলে দেবগণ প্রীত হইয়া থাকেন। বলিকৰ্ম্ম সম্পাদন করিলে গৃহীদিগের যেরূপ প্রীতিলাভ হয়, দেবগণ তাহার শতগুণ অধিক প্রীতিলাভ করেন, সন্দেহ নাই। এই নিমিত্ত জ্ঞানবান্ মহাত্মারা গ্রহদিগের উদ্দেশে ধূপদীপ প্রদান ও পিতৃগণের তৰ্পণ করিয়া তাঁহাদিগকে নমস্কারপূর্ব্বক দেবগণের প্রতি সম্পাদন করিয়া থাকেন। দেবতা, পিতৃলোক, মহর্ষি ও গৃহদেবতাগণকে বিধিপূৰ্ব্বক পূজা করিলে তাঁহাদিগের প্রীতিলাভে সমর্থ হওয়া যায়। দেবরাজ নহুষ মনে মনে এইরূপ চিন্তা করিয়া সেই স্বর্গলোকে দীপদান, বলিকৰ্ম্ম ও অন্যান্য নানাবিধ দৈবমানুষ ক্রিয়া এবং উৎসবসমুদয় নির্ব্বাহ করিতে লাগিলেন।

“এইরূপে কিয়ৎকাল অতীত হইলে তাঁহার সৌভাগ্য তিরোহিত হইয়া দুর্ভাগ্যের প্রাদুর্ভাব উপস্থিত হইল। তখন তিনি দেবগণকে পূজোপহারপ্রদানে পারাঙ্মুখ হইলেন। পূৰ্ব্ববৎ ধূপদীপ ও উদকদান প্রভৃতি কাৰ্য্যের আর আস্থা প্রদর্শন করিলেন না। ঐ সময় রাক্ষসেরা তাঁহার যজ্ঞস্থলে নানাপ্রকার উৎপাত করিতে লাগিল।

নহুষের অগস্ত্যমস্তকে আরোহণ

“অনন্তর একদা মহারাজ নহুষ মহর্ষি অগস্ত্যকে যানে যোজিত করিবার নিমিত্ত আহ্বান করিলেন। তখন মহর্ষি ভৃগু অগস্ত্যকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, ‘তপোধন! তুমি লোচনযুগল নিমীলিত কর, আমি তোমার জটামধ্যে প্রবিষ্ট হইব।’ তখন মহর্ষি অগস্ত্য লোচন নিমীলিত করিয়া স্থাণুর ন্যায় স্থিরভাবে অবস্থান করিতে লাগিলেন। তপোধনাগ্রগণ্য ভৃগুও নহুষের বিনাশসাধনের নিমিত্ত তাঁহার জটামধ্যে প্রবেশ করিলেন। পরে মহর্ষি অগস্ত্য নহুষকে যানে বহন করিবার নিমিত্ত তাঁহার সন্নিধানে সমুপস্থিত হইয়া কহিলেন, ‘দেবরাজ! তুমি শীঘ্র আমাকে যানে যোজিত করিয়া অনুমতি কর, আমি তোমাকে কোন্ স্থানে লইয়া যাইব? তুমি যেখানে লইয়া যাইতে বলিবে, আমি নিঃসন্দেহেই তোমাকে সেই স্থানে উপনীত করিব।’ তখন সুররাজ নহুষ মহর্ষি অগস্ত্যের বাক্য শ্রবণ করিয়া অবিলম্বে তাঁহাকে যানে যোজিত করিলেন।

“ঐ সময় অগস্ত্যের জটামধ্যস্থ মহর্ষি ভৃগু তাঁহাকে যানে যোজিত দেখিয়া যারপরনাই হৃষ্ট ও সন্তুষ্ট হইলেন এবং নহুষের দৃষ্টিগোচর হইবেন না বলিয়া জটামধ্যে প্রচ্ছন্নভাবে অবস্থান করিতে লাগিলেন। মহর্ষি অগস্ত্য নহুষের ব্রহ্মা হইতে বরপ্রাপ্তির বিষয় সম্যক অবগত ছিলেন, এই নিমিত্ত তাঁহার এইরূপ অত্যাচার দর্শন করিয়াও ক্রোধ প্রকাশ করিলেন না। তখন মহারাজ নহুষ তাঁহার পৃষ্ঠে বারংবার কশাঘাত করিতে লাগিলেন; কিন্তু তাহাতেও তাঁহার ক্রোধ উদ্দীপিত হইল না।

ভৃগুশাপে নহুষের সর্পদেহপ্রাপ্তি

“অনন্তর নহুষ ক্রোধাবিষ্ট হইয়া বামপদদ্বারা অগস্ত্যের মস্তকে আঘাত করিলেন। ঐ সময় মহর্ষি ভৃগু অগস্ত্যের মস্তকে জটামধ্যে বাস করিতেছিলেন। তিনি নহুষকর্ত্তৃক বামপদদ্বারা প্রহৃত হইবামাত্র অতিমাত্র রোষাবিষ্ট হইয়া তাঁহাকে কহিলেন, ‘রে দুরাচার! তুই রোষপরবশ হইয়া অগস্ত্যের মস্তকে পদাঘাত করিলি; অতএব এই দুষ্কৰ্ম্মনিবন্ধন অবিলম্বে ভুজঙ্গদেহ পরিগ্রহ করিয়া ভূতলে গমন কর।’

“মহর্ষি ভৃগু এইরূপ অভিসম্পাত করিবামাত্র নহুষ সর্পদেহ পরিগ্রহ করিয়া ভূতলে নিপতিত হইলেন; কিন্তু পূৰ্ব্বকৃত দান, তপঃ ও অন্যান্য নিয়মপ্রভাবে তাঁহার স্মৃতিভ্রংশ হইল না। যদি ভৃগু শাপপ্রদানকালে নহুষের দৃষ্টিগোচর হইতেন, তাহা হইলে নহুষের তেজঃপ্রভাবে অভিহিত হইয়া তাঁহাকে কদাচ ভূতলে নিপতিত করিতে সমর্থ হইতেন না।

“অনন্তর ভূতলনিপতিত মহারাজ নহুষ আপনার শাপশান্তির নিমিত্ত ভৃগুকে বারংবার অনুনয় করিতে লাগিলেন। তদ্দর্শনে মহর্ষি অগস্ত্য একান্ত কৃপাবিষ্ট হইয়া নহুষের শাপশান্তি হইবার নিমিত্ত ভৃগুকে অনুরোধ করিলেন। তখন মহর্ষি ভৃগু নহুষের প্রতি প্রসন্ন হইয়া কহিলেন, ‘পৃথিবীতে যুধিষ্ঠির নামে এক কুলপ্রদীপ মহীপাল উৎপন্ন হইবেন। তিনিই নহুষকে এই শাপ হইতে বিমুক্ত করিবেন, সন্দেহ নাই।’ মহাত্মা ভৃগু এই বলিয়া অন্তর্হিত হইলেন। তখন মহর্ষি অগস্ত্যও পুরন্দরের হিতসাধননিবন্ধন ব্রাহ্মণগণকর্ত্তৃক সৎকৃত হইয়া আপনার আশ্রমে প্রতিগমন করিলেন।

“এ দিকে মহর্ষি ভৃগু নহুষকে এইরূপ শাপ প্রদান করিয়া ব্রহ্মলোকে গমনপূর্ব্বক ব্রহ্মার নিকট আনুপূর্ব্বিক সমুদয় বৃত্তান্ত কীৰ্ত্তন করিলেন। তখন লোকপিতামহ ব্রহ্মা দেবগণকে আহ্বানপূৰ্ব্বক কহিলেন, ‘সুরগণ! নহুষ আমারই বর প্রভাবে সুররাজ্য অধিকার করিয়াছিল। এক্ষণে সে মহর্ষি ভৃগুকর্ত্তৃক অভিশপ্ত হইয়া ভূতলে গমন করিয়াছে। রাজা যুধিষ্ঠির ব্যতিরেকে তাহার এই শাপমোচন করিয়া দেয়, এমন আর কেহই নাই; অতএব তোমরা অবিলম্বে দেবরাজ্যে ইন্দ্রকে পুনরায় অভিষিক্ত কর। লোকপিতামহ ব্রহ্ম এই কথা কহিলে, দেবগণ তাঁহার বাক্য-শ্রবণে পুলকিতমনে কহিলেন, ‘ভগবন্! আপনি যেরূপ কহিতেছেন, আমরা তদ্বিষয়ে সম্পূর্ণ অনুমোদন করিতেছি।’ অনন্তর ব্রহ্মা পুরন্দরকে দেবরাজ্যে পুনরায় অভিষিক্ত করিলেন।

“ধৰ্ম্মরাজ। রাজা নহুষ যে তোমাকর্ত্তৃক শাপ হইতে মুক্ত হইয়া ব্রহ্মলোকে গমন করিয়াছেন, তাহা আমার অবিদিত নাই। স্বধৰ্ম্মব্যতিক্রমনিবন্ধন তাঁহার ঐরূপ দুর্দ্দশা ঘটিয়াছিল। তিনি দীপদানাদি ধৰ্ম্মানুষ্ঠানপ্রভাবেই পুনরায় ঐরূপ সিদ্ধিলাভ করিয়াছেন। অতএব গৃহস্থ ব্যক্তি সায়ংকালে বিশুদ্ধচিত্তে দীপদান করিবে। যে ব্যক্তি সায়ংকালে দীপদান করে, সে দেহান্তে দিব্যচক্ষু লাভ করিয়া থাকে এবং পূর্ণচন্দ্রের ন্যায় তাহার কান্তিও একান্ত উজ্জ্বল হয়। দীপদান করিলে উহা যত নিমেষ প্রজ্বলিত হয়, দীপদাতা তত বৎসর রূপবান ও বলবান হইয়া স্বর্গলোকে সুখে কালহরণ করিয়া থাকে।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *