মজন্তালী সরকার – সপ্তম দিন

সপ্তম দিন

তারিখ : ৮ আগস্ট

ভবানী ভবন, সকাল ১০টা

রাত সাড়ে বারোটায় টিমের সবার ফোনে অমিতাভর টেক্সট মেসেজ ঢুকেছিল। দশটা বাজার মিনিট দশেক আগেই সবাই হাজিরা দিল চারতলার কোণের ঘরে। অমিতাভ সান্যাল দেরি পছন্দ করেন না।

ওয়ার্কস্টেশনটাকেও অমিতাভ নিজের চেম্বারের মতো অ্যান্টার্কটিকা বানানোর ধান্দা করছিলেন। দময়ন্তী কড়া করে কথা শুনিয়ে দিয়েছে। বলে দিয়েছে, এসির টেম্পারেচার চব্বিশের নীচে নামানো চলবে না। ব্যাজার মুখে মেনে নিয়েছেন অমিতাভ। আজ ঘরে ঢুকেই দময়ন্তী দেখল, ভদ্রলোক নিজের টেবিলটাকে সামান্য ডানপাশে সরিয়ে এসির একেবারে সামনাসামনি নিয়ে এসেছেন। হাসি পেয়ে গেল দময়ন্তীর। দেখতেও পেঙ্গুইন, স্বভাবেও তাই।

কাঁটায় কাঁটায় ঠিক দশটায় কফিতে শেষ চুমুক দিয়ে অমিতাভ বললেন, ‘বন্ধুগণ, অপরাধী শুরু থেকেই আমাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। নিঃশ্বাস নেবার সময় দিচ্ছে না। ফলে কাজগুলো একটু গুছিয়ে নেওয়া দরকার। সবরকম এভিডেন্স, ফুটেজ, কল রেকর্ডস, ফরেন্সিক রিপোর্টস, লোকাল থানার ইনকোয়েস্ট রিপোর্টস ইত্যাদির দায়িত্বে থাকবেন লোকনাথ নস্কর আর সুকুমার ভট্টাচার্য। এরই পাশাপাশি কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার কাজ তোমরা যেমন করছ, করে যাবে।’

লোকনাথ আর সুকুমার মাথা নাড়ল।

‘তানিয়া গুহ অলরেডি প্রত্যেকটা ঘটনার ডিটেল শর্টলিস্ট করে রাখছেন। জর্ডান ফ্যামিলির ফলো আপ তানিয়ার দায়িত্ব। সঙ্গে পুরোনো কেস ফাইলের সুপারভিশন। ডিসট্রিক্ট অফিসের করেসপন্ডেন্টরা পুরোনো রেলেভ্যান্ট কেস ফাইল নিয়ে তোমায় রিপোর্ট করবে। করেসপন্ডেন্টদের লিস্ট দময়ন্তীর কাছে আছে। নিয়ে নেবে। অলরাইট?’

তানিয়া নার্ভাস মুখে ঘাড় হেলাল, ‘অলরাইট স্যার।’

‘রাহুল সেনগুপ্ত লীনা দাশগুপ্তের ফলো আপ নিচ্ছেন। প্লাস সোর্স ম্যানেজমেন্ট পুরোটা রাহুলের ওপর ছাড়ছি।’

রাহুলের ভুরুদুটো ওপরে উঠে গেল। অমিতাভর সেটা খেয়াল করে বললেন, ‘ডোন্ট ওভাররিয়াক্ট। ইউ আর কেপেবল অফ দ্যাট। সোর্স লিস্ট দময়ন্তী রেডি করে ফেলেছে। নিয়ে নেবে। এই অফিশিয়াল সোর্সদের বাইরে প্রত্যেকে নিজের পার্সোনাল সোর্স ব্যবহার করতে পারো, বলাই বাহুল্য।’

রাহুল কাঁচুমাচু মুখ করে বলল, ‘সোর্সের ব্যাপারটা দময়ন্তীদি দেখলে ভালো হত না?’

‘না। হত না। দময়ন্তীকে সব দিকেই মাথা দিতে হবে। এজন্য ওর স্পেশালাইজড কাজ কম রেখেছি। দময়ন্তী আমাদের মিডিয়া স্পোকসপারসন। সোর্সমানি ডিসবার্স করবে। এছাড়া আলিপুর কারেকশনালে হামলা রোখার ব্লু-প্রিন্ট দময়ন্তীর দায়িত্ব। অলরাইট? প্রতিদিন সবাই নিজের কাজের আপডেট তানিয়াকে দেবে। তানিয়া প্রতিদিনের আপডেটেড স্প্রেডশিট সবাইকে মেল করে দেবে। কারও কোনও প্রশ্ন আছে?’

কেউ উচ্চবাচ্য করল না।

‘লোকনাথ, লীনা দাশগুপ্ত আর লিলি জর্ডানের ফোন ট্যাপ করতে বলে দাও টেলিকমকে।’

মাথা নেড়ে লোকনাথ বলল, ‘স্যার, ডিজিটাল ফরেন্সিক থেকে জানাল, পূর্ণেন্দু সরকারের ফোনের অ্যানালিসিসটা আজই পেয়ে যাব।’

‘বেশ, এনি আদার আপডেট, এনিওয়ান? না থাকলে লেটস গেট ব্যাক টু ওয়ার্ক। দময়ন্তী, আমার টেবিলে এসো। আর সুকুমার, সুজানের গ্রেভের বিষয়ে কী কী পারমিশন লাগবে সেগুলো খোঁজ নিয়ে নাও।’

লোকনাথ, সুকুমার আর রাহুল বেরিয়ে গেল। তানিয়া নিজের টেবিলে গিয়ে কম্পিউটার খুলে বসল। দময়ন্তী অমিতাভর টেবিলের এপাশে চেয়ার টেনে বসল তাঁর মুখোমুখি। বলল, ‘আপনি তাহলে ডিটারমাইন্ড?’

অমিতাভ তাকালেন, ‘বড় একটা সম্ভাবনাকে জাস্ট ইগনোর করে যাব ঝামেলা পোহাতে হবে বলে?’

দময়ন্তীর কণ্ঠে অসন্তুষ্টি গোপন রইল না, ‘সুজান জর্ডান ইস্যু এই মুহূর্তে কতটা স্পর্শকাতর আপনি জানেন স্যার। উপরমহল থেকে…।’

দময়ন্তীকে কথাটা শেষ করতে দিলেন না অমিতাভ। একটা হাত অবহেলার ভঙ্গিতে নাচিয়ে মাঝপথেই যেন কাঁচি দিয়ে ছেঁটে দিলেন, ‘আমাদের শিওর হতে হবে দময়ন্তী। লিলি আর বেঞ্জামিন জর্ডান বাদে আর কার কার সঙ্গে আলাপ করতে হবে সেটা বলো।’

দময়ন্তী আর কিছু বলল না। বলে লাভ নেই। অমিতাভ সান্যালের অ্যাকসেন্টেই স্পষ্ট যে, তিনি শুনবেন না। ভদ্রলোকের জাল ছড়ানো এবং গুটিয়ে আনার কায়দা টপ নচ। লোকটাকে কখনও কখনও বিচ্ছিরি গোঁয়ার্তুমি পেয়ে বসে। নিজের সামনে তখন অম্বুজা সিমেন্টের একটা দেওয়াল তুলে দেন। কারও কোনও কথাই যে-দেওয়ালকে ভেদ করতে পারে না।

দময়ন্তী বিরক্তি চেপে ডায়েরি দেখল, ‘উপাসনা আচার্য। সুজানের বাল্যবন্ধু এবং বেস্ট ফ্রেন্ড। আর বিবস্বান দত্ত। সুজানের উকিল। মেয়ে আর বাবাকে বাদ দিয়ে গত দু-বছরে সুজানের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠতা, ইন্টেরাকশন এই দুজনের সঙ্গেই।’

‘বেশ,’ অমিতাভ গাল চুলকোতে চুলকোতে বললেন, ‘নোটিশ করছি না কাউকেই। আমরাই গিয়ে কথা বলে আসি। কী বলো?’

‘সেই ভালো। দ্বিতীয়বার কথা বলার প্রয়োজন হলে তলব করা যাবে।’

‘আচ্ছা এই উপাসনা ভদ্রমহিলা কী করেন?’

‘চল্লিশোর্ধ্ব। মজন্তালীর রোলে ফিট হচ্ছে না।’

‘তা হোক। মজন্তালী না হোক, তার সাইডকিক হতে অসুবিধা কোথায়? নিশ্চয়ই একা হাতেই জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ সবটা করেন না!’ আড়মোড়া ভাঙলেন অমিতাভ, ‘চলো এক এক করে শুরু করি। আজই।’

‘লিলির পিছনে খোঁচড় লাগাবেন না?’

‘কাল থেকেই লেগে গেছে।’

‘তা সেটা আমায় বলবেন না?’ সুযোগ পেয়ে হালকা করে ঝাল ঝেড়ে দিল দময়ন্তী, ‘আমায় সোর্স লিস্ট রেডি করতে হবে তো।’

‘এহে হে! এক্সট্রিমলি সরি!’ কাঁচুমাচু মুখ করলেন অমিতাভ।

এই সময় দরজা নক করে উঁকি মারল অ্যানালিটিকসের জয়ন্ত, ‘অমিতাভদা, আসব?’

অমিতাভ দেখলেন, জয়ন্তর পিছনে কমবয়সি তিন-চারটে ছেলেমেয়ে। ‘এসো জয়ন্ত। এরা কারা?’

জয়ন্ত দলবল নিয়ে ঢুকল, ‘এডিজি স্যার বললেন, অ্যানালিটিকস থেকে আপনার তিন-চারজন ট্রেনি লাগবে।’

অমিতাভ চমৎকৃত হলেন। এডিজি-র কাছে আর্জি জানিয়েছেন এক ঘণ্টাও পেরোয়নি। একান্ত পিছনে আগুন না লেগে গেলে এডিজি এত তাড়াতাড়ি রিয়াক্ট করেন না। এই ছেলেমেয়েগুলোর প্রবেশন শেষ হয়েছে সদ্য। চোখে-মুখে ঝকঝক করছে উদ্দীপনা। হাটুরে খাটনির কাজে এমন ছেলেমেয়েই দরকার। অমিতাভ বললেন, ‘তোমাদের বেশ কয়েকটা সিসিটিভি ফুটেজ চেক করতে হবে। তিনটে হুলিয়া দেব। সেগুলো খুঁজে পাও কিনা দেখতে হবে।’ জয়ন্তর দিকে একটা খাম এগিয়ে দিলেন অমিতাভ।

জয়ন্ত খাম থেকে ছবিগুলো বের করল। তিনটে ছবির মধ্যে একটা হাতে-আঁকা মজন্তালীর পোর্ট্রেট পার্লে। বাকি দুটো প্রিন্ট-আউট নেওয়া ইমেজ। লীনা আর লিলি জর্ডানের ছবি। জয়ন্ত বলল, ‘এগুলো কি সোশ্যাল মিডিয়া থেকে নেওয়া?’

‘হ্যাঁ, ফেসবুক থেকে নেওয়া বোধহয়।’

‘রেজলিউশন ভালো না,’ মুখ কোঁচকাল জয়ন্ত, ‘মাগশট পাননি বুঝতে পারছি। অন্তত ঠিকঠাক ফটোগ্রাফ পাওয়া গেলে ভালো হত।’

‘ঠিকঠাক ফটোগ্রাফ কী করে পাব?’ অমিতাভ হাতের তালু ওলটালেন, ‘এদের বিরুদ্ধে বিন্দুমাত্র প্রমাণ নেই। পিওর স্পেকুলেশন। তাই জাস্ট একটু বাজিয়ে দেখা আরকি। এই দিয়েই কাজ চালাতে হবে ভাই।’

জয়ন্ত রিভলভিং চেয়ারটা ঘুরিয়ে নিল ট্রেনিদের দিকে। বলল, ‘মনে হয় না সফটওয়ারে কাজ হবে। সবকটাই আগে সফটওয়ারে আপলোড করে অটোসার্চে দিয়ে দাও। না পাওয়া গেলে তখন ম্যানুয়ালি যাবে।’

জয়ন্ত দলবল নিয়ে বেরিয়ে গেলে অমিতাভ দময়ন্তীকে বললেন, ‘চলো বেরিয়ে পড়ি। প্রথমে জর্ডান ফ্যামিলি।’

.

বেহালা, সকাল ১১টা ৫০

জর্ডানদের অ্যাপার্টমেন্টটা বাইরে থেকে বেশ মলিন। ফ্ল্যাটের ভিতরটা আরও মলিন। শোকের বাড়ি যেমন হয়। আর্থিকভাবেও যে তাঁরা খুব সচ্ছল নন, সেটাও স্পষ্ট। চলটা ওঠা দেওয়াল, পরিকল্পনাহীনভাবে রাখা সামান্য কিছু আসবাব, প্লাস্টিকের খাবার টেবিল। সোফায় জামাকাপড় ডাঁই হয়ে ছিল। সেগুলো সরিয়ে অমিতাভদের বসার জায়গা করে দিলেন সুজানের বাবা বেঞ্জামিন জর্ডান। সত্তরোর্ধ্ব মানুষটাকে এর আগে দময়ন্তী টিভিতে দেখেছে। সুজানের দুর্ঘটনার সময় মিডিয়া বারবার সুজান এবং তাঁর পরিবারকে ফোকাসে এনেছে। তাঁরাও ট্যাবু কাটিয়ে ক্যামেরার সামনে সোচ্চার হয়েছেন বারবার। সেই তেজি মানুষটার সঙ্গে এখনকার এই ন্যুব্জ বৃদ্ধের মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন। শোক মানুষের চেহারা অনেকটা বদলে দেবার ক্ষমতা রাখে। লিলির চেহারাও বদলেছে। মুখের ঢলঢলে সারল্যের সঙ্গে বেদনার চেয়েও বেশি মিশেছে রাগ। চোখের কোলে এক ফোঁটা জল উঁকি মারছে। অমিতাভদের মুখোমুখি বসে বেঞ্জামিন শুরুতেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বললেন, ‘মৃত্যুর পরেও আপনারা মানুষটাকে রেহাই দিলেন না।’

দময়ন্তী বলল, ‘দেখুন, মার্ডার প্লেসে চিরকুটে আপনার মেয়ের ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাওয়া গেছে। উই আর হেল্পলেস।’

‘আপনাদের ধারণা মা নিজের মৃত্যু হোক্স করেছে? নাকি মায়ের ভূত মজন্তালী সরকার হয়ে ঘুরছে?’ লিলির গলায় শ্লেষ।

লিলি জর্ডানের দিকে ফিরল দময়ন্তী। শান্ত গলায় বলল, ‘সবরকম সম্ভাবনাই আমরা খতিয়ে দেখতে চাইছি।’

‘আমি যদি বলি যে মা-কে হেকল করার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যে প্রমাণ সাজিয়েছেন আপনারা?’

আজকাল অল্প কথা-কাটাকাটিতেই মেজাজ খিঁচড়ে যায়। নিজেকে দময়ন্তী সামলে নিল ঠিকই, তবে কণ্ঠে একটা অস্বাভাবিক শীতল ধার এসেই গেল, ‘হঠাৎ আপনার মা-কে হেকল করতে চাইব কেন আমরা? ওঁর সঙ্গে আমাদের কীসের শত্রুতা?’

‘আগেও আপনারা একটা মার্ডারের চার্জ দিয়ে মা-কে ফাঁসানোর প্ল্যান করেছিলেন। এখন মানুষটা চলে যাবার পরেও মিথ্যে সাক্ষ্যপ্রমাণ সাজিয়ে তাকে ডিফেম করতে চাইছেন। আপনাদের লজ্জা হয় না?’ বলতে বলতে লিলির মুখ লাল হয়ে গেল। রাগ আর কান্না দুটোই নিয়ন্ত্রণ করা চেষ্টা করছে প্রাণপণে।

দময়ন্তীর এবার খারাপ লাগল। সত্যিই, কী কী সইতে হয়েছে এই পরিবারটাকে। মুখে যে যা-ই বলুক, সুজান জর্ডানের মৃত্যু রাজ্যের পুলিশ, প্রশাসন, আইন-আদালত সহ গোটা এস্টাবলিশমেন্টকেই অপরাধী করে দেয়। তাছাড়া স্বজন হারানো কী জিনিস, তা কি বলে দিতে হবে দময়ন্তীকে? চুপ করে গেল সে।

দময়ন্তীর মুখের ভাব দেখে অমিতাভ কথাবার্তার রাশ ধরলেন। লিলিকে জিগ্যেস করলেন, ‘আপনার মায়ের মৃত্যুর সময় কে কে উপস্থিত ছিলেন, সেটা মনে আছে?’

লিলি ঘাড় বেঁকিয়ে বলল, ‘উকিলের সঙ্গে কথা না বলে আপনাদের একটা কথাও বলব না।’

অমিতাভর সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হল দময়ন্তীর। অমিতাভর হাতদুটো কোলের কাছে মুঠো করে রাখা। পা দুটো অল্প অল্প নড়ছে। দময়ন্তী বুঝল, তিনিও অস্বস্তি বোধ করছেন। একটা হালকা গলা-খাঁকারি দিয়ে বেঞ্জামিন জর্ডানকে উদ্দেশ্য করে অমিতাভ বললেন, ‘আমি আবারও বলছি মিঃ জর্ডান, তদন্তে সহযোগিতা না করলে আপনারা বোকামি করবেন। উকিলের সঙ্গে কথা বলতে চান বলুন। আপনাদের উকিলের সঙ্গে আমরাও কথা বলব। আজই সন্ধেয় তাঁর অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েছি। তিনি আইনের লোক। আমাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে তিনি আপনাদের বারণ করবেন না।’

বেঞ্জামিন সোফায় গা এলিয়ে বসেছিলেন। কথাটা শুনে শূন্য চোখে তাকালেন অমিতাভর দিকে। জবাব দিলেন না। ধ্বংসস্তূপের মতো দেখাচ্ছে তাঁকে।

অমিতাভ নরম গলায় বললেন, ‘আমি জানি মিঃ জর্ডান, স্টেট বা পুলিশ-প্রশাসনের বিরুদ্ধে আপনাদের যথেষ্ট গ্রিভান্স আছে। সেই গ্রিভান্স হয়তো খুবই জাস্টিফায়েড। আমি সেটা নিয়ে কোনও মন্তব্য করব না। কিন্তু মজন্তালী সরকারের কেস যেদিকে টার্ন নিয়েছে, আমাদের কিছু করার নেই। হোপ ইউ উইল কোঅপারেট। উই মিন নো ডিসরেসপেক্ট। বিশ্বাস করুন। সমস্ত কনসার্নড অথরিটির উপস্থিতিতে, সমস্তরকম প্রোটোকল মেনেই কাজ হবে। সে ব্যাপারে আপনারা নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।’

বেঞ্জামিন ফ্যাঁসফ্যাঁসে গলায় বললেন, ‘দিস ইজ ভেরি ডিসগ্রেসফুল। প্লিজ ডোন্ট ডু দিজ, ফর হেভনস সেক। মেয়েটা শান্তিতে ঘুমাচ্ছে। ওকে ঘুমোতে দিন। প্লিজ।’

অমিতাভ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ালেন, ‘চলো দময়ন্তী।’

.

লাইভ নিউজের অফিস, বেলা ১২টা ৩৫

সৌমিলি ফোন রেখে বলল, ‘বেঞ্জামিন জর্ডানের অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেয়ে গেছি। আগামীকাল বিকেল পাঁচটায়।’

শাক্য সন্ধের জন্য রাউন্ড-আপ স্টোরি এডিট করছিল। মুখ তুলে বলল, ‘কেসটা পুদিচ্চেরি টাইপের হয়ে যাচ্ছে রে। এত জট শিরিনের হেডফোনেও পাকায় না।’

সৌমিলি বলল, ‘মোক্ষম সময়ে ফোন করেছি। সিআইডি কর্তারা ওঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করে জাস্ট বেরোচ্ছিলেন।’

শাক্য ফিক করে হাসল, ‘এ-থেকেই বোঝা যায়, তদন্তে আমরা খুব পিছিয়ে নেই। কী বলিস?’

শিরিন বলল, ‘এই মুহূর্তে তাহলে সন্দেহভাজন বলতে দুজন। লীনা দাশগুপ্ত আর লিলি জর্ডান।’

‘আরেকজনকে বাদ দিচ্ছিস,’ শাক্য বলল, ‘সুজান জর্ডান হারসেলফ। মানে তাঁর ভূত। আমাদের ফোকাস তো তিনিই।’

‘আমি প্রকৃত সন্দেহভাজনদের কথা বলছি শাক্য,’ শিরিন সরু চোখে তাকাল, ‘ভূতের গল্প আমরা পাবলিককে খাওয়াব, নিজেরা খাব না।’

‘শোন গরিবের মিস মার্পল, ভূতে বিশ্বাস না-করাটা খুব কুল ব্যাপার, আই নো। কিন্তু আনফরচুনেটলি এখানে আমরা সবাই জানি তুই ভূতে ভয় পাস। ইনসিডিয়াসের মতো পাতি ভয়ের ছবি দেখতে গিয়ে কেঁপেঝেঁপে একসা হোস। নাটক করিস না।’

শিরিনের চোখেমুখে হরর ফিল্মের ভূতেদের মতোই জিঘাংসা ফুটে উঠছিল। কিন্তু শাক্য বেঁচে গেল, কারণ ডেস্কের অমৃতা উঠে এসে শিরিনের সামনে দাঁড়িয়েছে। শিরিন জিজ্ঞাসু চোখে তাকাতে অমৃতা নিচু গলায় বলল, ‘ভাই একটা অদ্ভুত কাণ্ড হচ্ছে! নেবুলার একজন স্টাফের থেকে খবর পেলাম। আমি নিজেও এখন ভেরিফাই করলাম।’

‘কী হয়েছে?’

‘যে-কোনও একটা পর্ন সাইট খোল।’

‘হোয়াট ননসেন্স!’ শিরিন বিরক্ত হল, ‘এখন খিল্লি করিস না ভাই। মাথা পুরো ভুলভুলাইয়া হয়ে আছে।’

‘খিল্লি করছি না। দেবর্ষির ফোনেও চেক করলাম। পাঁচ-ছটা সাইটে একই জিনিস হচ্ছে। তুই নিজে চেক কর। খুললেই বুঝতে পারবি। ইটস আ স্কুপ।’

অমৃতা যে সত্যিই সিরিয়াস সেটা মেনে নিতে শিরিন আরও কয়েক সেকেন্ড সময় নিল। তারপর ফোনে ইনকগনিটো মোডে গিয়ে শিরিন একটা ‘নিষিদ্ধ’ সাইট খুলল। খুলতেই দম আটকে এল তার।

একটা বিরাট খুলিচিহ্ন। বড় বড় অক্ষরে লেখা আছে—‘দিজ সাইট হ্যাজ বিন হ্যাকড। প্লিজ মেক আ গুড হ্যাবিট ফর ইয়োরসেলফ। হিয়ার ইজ আ লিস্ট অব মাস্ট রিড ফিফটি ক্লাসিক বুকস।’ তারপর একটা বইয়ের লিস্ট। আর একেবারে নীচে—অ্যাট ইয়োর সার্ভিস, মজন্তালী সরকার (ওয়েস্ট বেঙ্গল, ইন্ডিয়া)।

.

কালীঘাট, বেলা ১২টা ৪৫

অমিতাভ কী-একটা কাজে বেরিয়ে গেলেন। সুজান জর্ডানের ‘বেস্ট ফ্রেন্ড’ উপাসনা আচার্যের বাড়িতে দময়ন্তী একাই গেল। মহিলাকে দেখে চিনতে অসুবিধা হল না। টিভিতে কোনও অনুষ্ঠানে সুজান জর্ডানের পাশে এই ভদ্রমহিলাকে দময়ন্তী দেখেছে। ছোটখাটো মানুষ। খুব ‘লুক’ সচেতন। চুলে পিক্সি কাট। গলায় একটা চোকার। রংটা পোশাকের সঙ্গে মানানসই। ভদ্রমহিলার কালার সেন্স যে বেশ ভালো, সেটা ঘরের ইন্টিরিয়ার ডিজাইন দেখলেও বোঝা যায়। ক্রোম ইয়েলো রঙের দেওয়ালের সঙ্গে ব্রাউন আর অরেঞ্জের মাঝামাঝি একটা রঙের আসবাব চমৎকার কনট্রাস্ট করেছে। রংটার নাম ‘পেরু’।

সোফায় বসতে গিয়ে একটু অপ্রস্তুতে পড়তে হল। এইসব দামি সোফার এইটাই মুশকিল। বসামাত্র দাবনা আচমকা বিঘতখানেক ডুবে যায়। বেসামাল হতে হতে কোনওক্রমে সামলে নিয়ে দময়ন্তী জিগ্যেস করল, ‘আপনার বুটিক আছে শুনলাম। কতদিনের বুটিক?’

‘বছর পাঁচ।’

‘তার আগে কী করতেন?’

‘ডিজাইনিংয়ের কাজই করতাম। অগ্নিমিত্রা পলের টিমে ছিলাম।’

‘আর সোশাল ওয়ার্ক বলতে ঠিক কী করেন আপনি?’

‘জেন্ডার রিলেটেড বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে কাজ করি। তবে আমার মেইন কাজ পথশিশুদের নিয়ে। আমরা কয়েক বন্ধু মিলে “লাইফ” নামে একটা হোম চালাই। সেখানে আশ্রয়হীন মাইনরদের রাখি।’

‘সুজানের সঙ্গে বন্ধুত্ব কবে থেকে?’

বাঁ-হাতের আর্ট করা নখের ওপর ডান হাতের আঙুল বোলাতে বোলাতে উপাসনা বললেন, ‘সুজান আমার বড় বয়েসের বন্ধু। কিন্তু এমন বন্ধু আমি খুব বেশি পাইনি। শি ওয়াজ জেম অব আ পারসন। শি ওয়াজ মাই ইন্সপিরেশন। শি স্টিল ইজ। সমাজ রেপ ভিকটিমদের জন্য লজ্জাই বরাদ্দ রেখেছে। সুজান আমার জানা প্রথম মানুষ যে এই ট্যাবু ভেঙে মিডিয়ায় নিজের পরিচয় দিয়েছে। প্রত্যেকটা জেন্ডার ভায়োলেন্সের কেসে নিজের সলিডারিটি জানিয়েছে। অসুস্থ হবার আগের দিন অবধি জামদুনি কাণ্ডের প্রতিবাদ মিছিলে হেঁটেছে। রেপ থেকে লজ্জাকে মাইনাস করলে অর্ধেক লড়াই জেতা হয়ে যায়। একথা মজন্তালী সরকারের আগে সুজান বলে গেছে। নিজের জীবন দিয়ে।’

‘ধন্যবাদ। আপনি নিজেই প্রসঙ্গে আসতে সাহায্য করলেন,’ দময়ন্তী বললেন, ‘টিভি বা সোশাল মিডিয়া থেকে আপনি আশা করি জেনে গেছেন যে সুজানের সঙ্গে মজন্তালী সরকারের কোনও একটা যোগাযোগের অকাট্য প্রমাণ আমরা পেয়েছি। সুজান না হয়ে তাঁর নিকট স্বজন বা ঘনিষ্ঠ বন্ধুও হতে পারেন। এ-বিষয়ে আপনি আলোকপাত করতে পারেন?’

উপাসনা পূর্ণ চোখে তাকালেন, ‘না।’

‘জেন্ডার জাস্টিস নিয়ে সুজানের সঙ্গে নানা কাজে আপনিও শামিল থেকেছেন। চেনা বৃত্তের মধ্যে কি আপনার কাউকে সন্দেহ হয়? কারণ এটা তো পরিষ্কার যে মজন্তালী সরকার একার প্রতিশোধ নিতে মার্কেটে নামেনি। সে লং টার্ম প্ল্যান নিয়েই নেমেছে।’

‘পুলিশ-প্রশাসন নিজের কাজে ব্যর্থ হলে সাধারণ মানুষের মধ্যেই কাউকে না কাউকে নিজের ঘর সাফ করার দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নিতে হবে, ম্যাডাম।’

দময়ন্তী খেয়াল করল পকেটের মধ্যে ফোন কাঁপছে। ফোন বের করে দেখল, সৌমিলি। মানে লাইভ নিউজের মেয়েটা।

‘হ্যালো।’

ওপাশ থেকে সৌমিলি উত্তেজিত গলায় বলল, ‘ম্যাম আপনাকে হোয়াটসঅ্যাপে একটা স্ক্রিনশট পাঠিয়েছি একটু দেখবেন? আর্জেন্ট।’

.

ভবানী ভবন, বিকেল ৪টে

রাহুল বলল, ‘পর্ন সাইট হ্যাক করা এমন কিছু কঠিন না। এগুলোয় বেসিক এইচটিএমএল কোডিং থাকে। সিকিউরিটি বেরিয়ার বেশ লো। হ্যাকিংয়ের বেসিক জানলে যে কেউ হ্যাক করতে পারবে।’

তানিয়া বলল, ‘আচ্ছা পর্ন সাইটগুলো ব্যান হয়ে যায়নি? এই তো শুনলাম সব নাকি সার্কুলার দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছে?’

রাহুল ঠোঁট উল্টে বলল, ‘এসব বন্ধ করা খুবই কঠিন। প্রক্সি সার্ভার দিয়ে ব্যাটারা আবার চালু করে দেয়। হ্যাক হয়েছে তো, একটু পরে খুললেই দেখতে পাবি চালু হয়ে গেছে।’

‘খুনটুন ছেড়ে এরকম নীতিশিক্ষার ক্লাস খুললে তো বাঁচা যায়,’ তানিয়া বলল, ‘কিন্তু এটা করে লাভ কী হল? হোয়াট ইজ শি ট্রায়িং টু প্রুভ?’

দময়ন্তী নখ দিয়ে টেবিলের কোনা খুঁটছিল। বলল, ‘এইসব গিমিকবাজি স্রেফ মানুষের চোখ টানার জন্য। খবরের কাগজে অ্যাড দেওয়া বা পর্ন সাইট হ্যাক—সবই গিমিক। ঘটনার ঘনঘটায় আমাদের দিশেহারা করে দিতে চাইছে।’

অমিতাভ সায় দিয়ে বললেন, ‘শি ওয়ান্টস টু কন্ট্রোল দ্য ন্যারেটিভ। তবে ব্যাপারটা বেশ স্টাইলিশ। মাস্ট রিড ফিফটি বুকস। আমি ইমপ্রেসড।’

দময়ন্তী বলল, ‘পর্ন সাইট বন্ধ করে কোনও লাভ আছে বলে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি না। এসব যখন ছিল না তখন রেপ হত না? আসল সমস্যাটা অনেক গভীরে।’

অমিতাভ মাথা নাড়লেন, ‘সে তো যখন অ্যাটম বোমা ছিল না তখনও মানুষ যুদ্ধ করত। কিন্তু অ্যাটম বোমা এসে যুদ্ধকে আরও বিধ্বংসী করে তুলেছে, তাতে সন্দেহ আছে কি?’

‘স্যার, আমি বলতে চাইছি যে কারণে লোকে পর্ন দ্যাখে, আর যে কারণে রেপ করে, দুটো কারণ এক নয়। লোকে পর্ন দ্যাখে যৌন প্রবৃত্তি থেকে। কিন্তু নিছক যৌন প্রবৃত্তি থেকে কেউ রেপ করে না। ধর্ষক মনোবৃত্তির পিছনে রয়েছে ক্ষমতার বয়ান। পুরুষতন্ত্র এটাই শিখিয়ে দেয় যে, যা কিছু হোক, মেয়েদের একটাই দাওয়াই—রেপ। মেয়েটার ওপর রাগ? রেপ। মেয়েটা খুব বাড় বেড়েছে, একটু শিক্ষা দেওয়া দরকার—রেপ। এমনকী, ওই লোকটাকে জব্দ করতে হবে? ওর মেয়েটাকে রেপ করে দাও। এরা আমার ধর্মের লোক নয়? এদের মারো, আর এদের মহিলাদের রেপ করে দাও। নারীকে যৌন আক্রমণ করার অর্থ, তার কোট-আনকোট রক্ষক পুরুষটিও আক্রমণের আওতায় পড়ছে। এটাই পিতৃতন্ত্রের কাঠামো। নারীর যৌন বিপর্যয় শুধু তার বিপর্যয় নয়, সংশ্লিষ্ট পুরুষটির বা একটা গোটা পরিবারের বিপর্যয়। দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ আসলে নিছক দ্রৌপদীর লাঞ্ছনা নয়, পাণ্ডবদের সম্মানে বা পৌরুষে আঘাত। তাই পর্ন ব্যান করে খুব বেশি লাভের লাভ কিছু হবে না।’

‘দ্যাট আই অ্যাডমিট। নারী বলতে যে-দেশে লোকে নারীদেহের চেয়ে বেশি কিছু বোঝে না, সেখানেই তো পিঠোপিঠি এই বিশ্বাসটাও পাকাপোক্ত হয়ে ওঠে যে, এই দেহে হস্তক্ষেপ মানেই নারীর জীবন বরবাদ। এই দেহের প্রতি কুৎসিত ইঙ্গিত করলেই নারীকে লজ্জায় গুটিয়ে দেওয়া যাবে। ঠিক এই জায়গা থেকে জন্ম হয় শ্লীলতাহানি বা ধর্ষণের।’

‘আমি সেটাই বলতে চাইছি স্যার। পুরুষ আসলে সমস্ত উপায়ে নারীর ওপর আধিপত্য চায়। আর সেটা প্রকাশ করার সবচেয়ে বড় অস্ত্র হচ্ছে ধর্ষণ। পর্ন সারফেস লেভেলের ব্যাপার। আসল সমস্যা অনেক গভীরে।’

রাহুল বলল, ‘পুরুষ আসলে সমস্ত উপায়ে নারীর ওপর আধিপত্য চায়। এটাই আসল কথা। বিপ্লবী ননীবালা দেবীর ওখানে লঙ্কাবাটা ছড়িয়ে দিয়েছিল ব্রিটিশ পুলিশ। স্বাধীন ভারতে ছত্তিশগড় পুলিশ মানবাধিকার কর্মী সোনি সোরির ওখানে পাথর ভরে দিয়েছিল। আর ২০১২ সালে পৌঁছে দিল্লিতে একদল দুষ্কৃতি নির্ভয়ার ভিতরে গুঁজে দিচ্ছে লোহার রড। সব মুখগুলো এক।’

দময়ন্তী বলল, ‘তোর মতো সেনসিটিভ ছেলেও যোনিকে যোনি বলতে অস্বস্তি বোধ করছে, রাহুল?’

রাহুল অস্বস্তিভরে হাসল, ‘আরে সে তো তুমি আর তানিয়া আছ বলে।’

‘তাতে কী? যোনিকে যোনি, পিরিয়ডসকে পিরিয়ডস বলতে শেখ। অন্তত শিক্ষিত লাইক-মাইন্ডেড লোকজনের মাঝখানে বলার অভ্যেসটা শুরু কর। ওখানে-ওখানে বলে কী লাভ!’

রাহুল চোখ নামাল, ‘ঠিকই বলেছ। স্বাভাবিক বিষয়কে স্বাভাবিক করা দরকার।’

দময়ন্তী নরম গলায় বলল, ‘তুই এসব নিয়ে ভাবিস বলেই তোকে বলা।’

অমিতাভ বললেন, ‘দ্যাখো, তোমাদের সঙ্গে আমি একমত। আমার বক্তব্য একটাই। যে সমাজে যৌনতা নিয়ে এত ট্যাবু, সেখানে পর্ন এত সহজলভ্য হলে একটা মারাত্মক ইমব্যালান্স তৈরি হয়। আধা ভিক্টোরিয়ান সমাজে পর্নের এত বিপুল সহজলভ্যতা কোথাও বিপদ ঘটাচ্ছে না তো?’ বলে সিগারেটের বাক্সের দিকে হাত বাড়াতে যাচ্ছিলেন।

দময়ন্তী চোখ সরু করে বলল, ‘সকাল থেকে ক’টা হল স্যার?’

অমিতাভ হাত সংবরণ করলেন, ‘অনেকগুলো হল বুঝি?’

‘আমি নিজেই ছয় নম্বর দেখলাম। গত বছর কীরকম অসুস্থ হয়েছিলেন, ভুলে গেছেন?’

‘বলছ যখন থাক তাহলে,’ ব্যাজার মুখে বললেন, অমিতাভ, ‘মেয়েরা বারণ করলে শুনতে হয়।’

দময়ন্তী হেসে ফেলল, ‘মেয়েদের নিয়ে এত ভাবেন আপনি? মেয়েদের কী ভাগ্য!’

অমিতাভ ফোঁস করে একটা শ্বাস ফেললেন, ‘আজকাল তো নারীচিন্তাই করছি সারাক্ষণ।’

তানিয়া বিরস মুখে বলল, ‘আমাদের হাতে এখনও তেমন জোরালো কিছুই নেই, স্যার। সবচেয়ে জোরালো যেটা আছে সেটা খুব সম্ভবত ফলস ফ্ল্যাগ।’

‘যদি ধরেও নিই, সুজান জর্ডানের ব্যাপারটা ফলস ফ্ল্যাগ দেবার চেষ্টা, তাহলেও সেখানে কারও না কারও অবদান তো রয়েইছে। সেখানে কোনও লিড পাওয়া যেতেও তো পারে। ফলে ধুলো ঘাঁটতেই হবে।’ অমিতাভ আঙুল মটকাতে মটকাতে বললেন, ‘গপ্পে বা সিনেমায় যেমন গাছ থেকে টুপ করে পাকা ফলের মতো তদন্তকারী অফিসারের মাথায় ক্লু এসে পড়ে, তেমন তো বাস্তবে ঘটে না। ক্লু আপেল নয়। গোয়েন্দারাও নিউটন নন। বাস্তব তদন্তে ধুলো ঘাঁটতে হয়। বিস্তর হাত গন্ধ করতে হয়। যেখানে শক্তিশালী লিড নেই, সেখানে একধাওয়া করলে হয় না। বিশেষত সিরিয়াল কিলিংয়ের ক্ষেত্রে অনেকগুলো পথ ধরেই এগোতে হবে। সব পথ এসে মিলে যাবে শেষে। বুঝলে?’

তানিয়া বলল, ‘আমাদের সামনে অনেকগুলো পথ কই স্যার?’

‘পথ খুলবে। তার জন্য আমাদের কয়েকটা কৌশল নিতে হবে। আপাতত দুটো কাজ আমাদের করতে হবে। এক, আমি মিডিয়ায় কিছু কিছু সিলেকটিভ লিকেজ চাই। মজন্তালী মিডিয়াকে কাজে লাগাচ্ছে, আমরা কেন লাগাব না? আমরা ওর পথে ওকে কাউন্টার করতে পারি না? গিভ ইট আ থিঙ্ক, গাইজ।’

দময়ন্তী বলল, ‘আমি একমত স্যার। উই হ্যাভ টু রিথিঙ্ক অ্যাবাউট আওয়ার মিডিয়া ম্যানেজমেন্ট।’

‘এই কেসে আমাদের পক্ষ থেকে মিডিয়া স্পোকসপার্সন আমি তোমাকেই ভাবছি দময়ন্তী। সঙ্গে রাহুল থাকুক। শিখুক।’

‘বেশ। প্রেস কনফারেন্স কবে ডাকবেন?’

‘আমার মনে হয় দেরি না করে পরশু নাগাদই প্রেস ডেকে নেওয়া ভালো হবে। কেস নেবার পর প্রেসকে এখনও কোনও আপডেট আমরা দিইনি। তোমরা কী বলো?’

ইতিবাচক ঘাড় নাড়ল সবাই।

তানিয়া বলল, ‘দু-নম্বর কাজটা কী স্যার?’

‘একটু ইতিহাসের ধুলো ঘাঁটতে হবে,’ অমিতাভ মৃদুমন্দ মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, ‘দ্যাখো মজন্তালী সরকার যে-ই হোক, তার তো একটা ইতিহাস আছে। ভূঁইফোঁড় তো নয়। আর এরকম একটা কর্মকাণ্ডের পিছনে নিঃসন্দেহে গভীর ব্যক্তিগত ক্ষত আছে। প্রচণ্ড ব্যক্তিগত কোনও আবেগই এই পাগলামির ড্রাইভিং ফোর্স। তাই আমাদের আপাতত সাসপেক্ট যারা, তাদের ব্যাকগ্রাউন্ড চেক যেমন করছি, তাদের ওপর নজরদারি যেমন চালাচ্ছি, তেমনই পুরোনো পাপীদেরও স্মরণ করতে হবে। রিভেঞ্জ ইজ আ ডিশ বেস্ট সারভড কোল্ড। প্রাচীন ইতালীয় প্রবাদ। মনে রেখো।’

রাহুল বলল, ‘আপনি কি পুরোনো কেস ফাইল ঘাঁটার কথা বলছেন?’

‘বিলক্ষণ।’

‘কিন্তু কী বেসিসে সার্চ হবে? প্যারামিটারটা কী?’

‘গোটা রাজ্যে গত কুড়ি বছরে রেপিস্ট বা সাসপেক্ট রেপিস্টদের যতগুলো মার্ডার রিপোর্টেড হয়েছে।’

দময়ন্তী, রাহুল, তানিয়ারা মুখ চাওয়াচাওয়ি করছিল। দময়ন্তী বলল, ‘এ-তো জায়গ্যান্টিক কাজ। কে করবে?’

‘ডিসট্রিক্ট ইউনিটগুলোকে কাজে লাগাব।’ রমতা যোগী-ধরনের একটা হাসি হেসে অমিতাভ বললেন, ‘চব্বিশটা ডিসট্রিক্ট ইউনিট। চব্বিশজনকে দায়িত্ব দিয়ে দাও, রেসপেক্টিভ জেলাগুলো থেকে কেস ফাইলগুলো কালেক্ট করার। আজই খবর পাঠাও। আর এই পুরো ব্যাপারটা তানিয়া সুপারভাইজ করবে।’

দময়ন্তী আড়চোখে তানিয়ার দিকে তাকাল। মুখখানা আমসি হয়ে গেছে। ওদিকে রাহুল দাঁত বের করে তানিয়াকে একটু মুখ ভেংচে দিল। এই দুটো বাচ্চার মধ্যে কিছু চলছে নাকি? হলে বেশ হয়। ভেবেই দময়ন্তীর হাসি পেল। কী প্রাচীনপন্থী ভাবনা!

তানিয়ার মুখ দেখেই বোধহয় দয়াপরবশ হলেন অমিতাভ। বললেন, ‘ডিসট্রিক্ট করেসপন্ডেন্টদের আমি নোটিশ করে দেব। সে নিয়ে তোমায় ভাবতে হবে না। ওরা কেস ফাইল স্ক্যান মেল করে পাঠাবে তোমাকে। তোমার কাজ সেসব বেছেবুছে রাখা।’

তানিয়ার মুখের রেখা স্বাভাবিক হয়ে এল, ‘ঠিক আছে স্যার।’

অমিতাভ দময়ন্তীর দিকে তাকালেন, ‘আর আমাদের রেকর্ডস সেকশনে যা আছে, দিলীপবাবুকে বলে দাও কাউকে দিয়ে বেছেবুছে রাখতে। ওদিকে লালবাজারেও ফোন করে বলে দেব। এক ফাঁকে গিয়ে ওখানকার ফাইলপত্রও যা আছে তুলে নেবে।’

দময়ন্তী রাহুলের দিকে তাকাল, ‘লালবাজারটা রাহুল সামলে নিক, নাকি? তোর পুরোনো রাপো এনক্যাশ করে তাড়াতাড়ি বের করাতে পারিস কিনা দ্যাখ।’

রাহুল ঘাড় নাড়ল, ‘দেখে নেব।’

দময়ন্তী উঠে পড়ল, ‘আমি রেকর্ডস সেকশন ঘুরে আসছি। বিবস্বান দত্ত সাতটায় টাইম দিয়েছেন তো?

‘হ্যাঁ। আমিও যাব তোমার সঙ্গে।’

‘ঠিক আছে। ছ-টায় বেরোলেই তো হবে? আমি পৌনে ছ-টার মধ্যে চলে আসছি।’

‘তথাস্তু।’ বলেই অমিতাভ শুনলেন তাঁর ফোন গোঁ গোঁ করছে। এডিজি কলিং।

‘সান্যাল, অফিসে আছ?’

‘আছি স্যার।’

‘সিএম আসছেন। পনেরো-কুড়ি মিনিটে।’

.

লাইভ নিউজের অফিস, বিকেল ৪টে ২০

মিনিটখানেকের জন্য একটু হালকা হতে ব্যালকনিতে চলে এসেছিল সৌমিলি আর শিরিন। কিন্তু রণ আর শাক্য এসে পড়তেই জোর তর্কবিতর্ক লেগে গেল।

রণ বলল, ‘পানু নিয়ে মহিলার এত প্রবলেম কেন? পানু সাইট আসার আগেও পৃথিবীতে রেপ ছিল না?’

সৌমিলি বলল, ‘তুই জানিস, রেপের দৃশ্যও পানু সাইটে ঘুরে বেড়ায়? তার প্রচুর ভিউয়ার? আল জাজিরার একটা রিপোর্টে লিখেছিল, উত্তরপ্রদেশে ২০ টাকা থেকে ২০০ টাকায় ভায়া ব্লু-টুথ ফোনে ফোনে চালাচালি হয় রেপের আসল ভিডিও। ভিকটিমদের ব্ল্যাকমেল করার জন্য বানানো হয়। শুধু ইউপি নয়, আরও অনেক জায়গাতে নিশ্চয়ই এই জিনিস চালু। এগুলো আপত্তিজনক নয়?’

রণ একটু ভেবে বলল, ‘এগুলো তো ক্রাইম বটেই।’

শিরিন বলল, ‘দ্যাখ, পর্ন সাইট বন্ধ করে কতটা কাজের কাজ হবে, প্রশ্ন সেটা না। প্রশ্ন হচ্ছে একটা বার্তা পৌঁছানো। আমার মনে হচ্ছে এটা একটা শোম্যানশিপ। চমৎকার স্মার্ট একটা শোম্যানশিপ।’

‘শোম্যানশিপ?’ রণ বলল, ‘মজন্তালী সরকার বিপ্লবী না সার্কাসের জাগলার সেটা তোরা আগে ঠিক কর ভাই!’

শাক্য বলল, ‘দ্যাখো ভাই, বেসিক ইন্সটিংকক্ট নিজের পথ ঠিকই খুঁজে নেবে। যখন পানু সাইট ছিল না, গ্লোব সিনেমার সামনে ফুটপাথে ঢেলে বিক্রি হওয়া বই ছিল। বেসিক ইন্সটিংক্ট একটা নর্মাল জিনিস। কিন্তু ক্রিমিনাল মেন্টালিটি ইজ অ্যানাদার থিং। রেপের সঙ্গে আধিপত্য বা ক্ষমতা প্রদর্শনের ব্যাপারটা জড়িয়ে। পানুতে তো সেটা নেই। দুটোকে এক করে দেখব কেন? নিজের মতো করে নিজের প্লেজার খুঁজে নেওয়া এক কথা, আর অন্যকে জোর করে অধিকার করতে চাওয়া সম্পূর্ণ আরেক কথা। মানে বুঝতে পারছিস তো কী বলছি?’

‘হ্যাঁ রে বাবা, অত রেখেঢেকে বলার কী আছে?’ হি হি করে হাসল সৌমিলি, ‘সোজা কথা বললেই তো হয় যে, পানু অনেকেই দ্যাখে নিজের মতো করে। কিন্তু অন্যের স্পেসে গিয়ে উইদাউট কনসেন্ট হামলা করলে তবেই ব্যাপারটা সমস্যাজনক।’

শিরিন বলল, ‘এবং যাদের কনসেন্টের ধারণা নেই তারা পানু দেখুক বা না দেখুক, দ্যাট ডাজন্ট ম্যাটার। দেখলেও নেই, না-দেখলেও নেই। তবে হ্যাঁ, শাক্যর কথার রেশ ধরেই বলি, রেপের পানু দেখলে তাকে পোটেনশিয়াল রেপিস্ট বলে ধরে নিতে আমি পিছপা হব না।’

‘তবে আমি পর্নের বিরোধিতা করব আরও একটা দিক থেকে,’ শাক্য বলল, ‘পর্ন ইজ ডিলিউশনাল।’

সৌমিলি সায় দিয়ে বলল, ‘এইটা একটা জরুরি কথা। এই ডিলিউশন থেকে কত লোকের ব্যক্তিগত যৌথজীবন চটকে চৌষট্টি হয়ে যেতে দেখেছি।’

‘আরেকটা কথা,’ শিরিনের ঠোঁটে দুষ্টুমির হাসি, ‘পুরুষের ফ্যান্টাসিতে ধোঁয়া দেওয়া এই পানুর বাজারকে আমি রিজেক্ট করি। নারীর ফ্যান্টাসির কী হবে? ওই যে এখন স্কুটির অ্যাডের ক্যাচলাইনে যেটা বলে, সেটাই আমার বক্তব্য। হোয়াই শ্যুড বয়েজ হ্যাভ অল দ্য ফান?’

‘বুলস আই, ভাই। এইজন্যে তোকে এত্ত ভালোবাসি।’ বলে সৌমিলি দু-হাত বাড়িয়ে এগিয়ে গেল শিরিনের দিকে। খিলখিলিয়ে হাসতে হাসতে কোলাকুলি করল দুজনে।

রণ একটু যেন অবাক, ‘তোরা পানু বিষয়ে এত জানলি-বুঝলি কী করে ভাই?’

সৌমিলি বলল, ‘তোর কি ধারণা মেয়েরা পানু দেখে না?’

‘দেখে?’

শাক্য শেয়ালের মতো খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসল। শিরিনও হাসল ঠোঁট টিপে। শুধু সৌমিলি হাসল না। নিমের পাঁচন-গেলা মুখ করে বলল, ‘মেয়েদের বিষয়ে তুই কিছুই জানিস না রণ। হাঁদার মতো কমেন্ট না করে চুপ করে থাক।’

রণ চোখমুখ মটকে চুপ করে গেল।

শিরিন সৌমিলির পিঠে হালকা চাপড় মেরে বলল, ‘ওঠ ওঠ, আর দেরি করিস না। মৌলালি যেতে হবে।’

শাক্য বলল, ‘মৌলালি কী করতে যাবি?’

‘কিষণলালের ইন্টারভিউ।’

‘কে কিষণলাল?’

‘ভুলে গেলি? যে-লোকটা কাকভোরে মজন্তালীকে পোস্টারিং করতে দেখেছিল।’

‘ওঃ! পরপর ঘটনার ঘায়ে কুপোকাত হয়ে যাচ্ছি! মনে রাখব কী করে বল তো!’

‘মনে রাখতে হবে ভাই। খবর করতে হবে তো! প্রতিদিন ফ্রেশলি ব্রিউড কনটেন্ট না দিতে পারলে চলবে?’

.

ভবানী ভবন, বিকেল ৪টে ৩০

মুখ্যমন্ত্রী করুণাময় বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে এডিজি প্রবীর চক্রবর্তী ছাড়াও এলেন কমিশনার শাশ্বত ত্রিপাঠী আর আইজি অনিমেষ ভদ্র। প্রত্যেকের মুখ কমবেশি মেঘলা।

মুখ্যমন্ত্রী দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকে কোনও সম্ভাষণ ছাড়াই অমিতাভকে বললেন, ‘সুজান জর্ডানের পরিবারকে নিয়ে যা খুশি করুন, সুজান জর্ডানের লাশ নিয়ে কিছু করবেন না। দিস ইজ মাই অর্ডার।’ বলে চেয়ারে বসলেন, ‘বাই দা ওয়ে, গুড ইভনিং। আপনার কিছু বলার থাকলে বলতে পারেন।’

অমিতাভ মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই ছিলেন। ঋজু গলায় বললেন, ‘মার্ডার ওয়েপনে সুজান জর্ডানের ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাওয়া গেছে স্যার। তিনি এবং তাঁর পরিবারের লোকজন মিলে তাঁর মৃত্যুর ভুয়ো খবর রটিয়েছে কিনা সেটা যাচাই করব না?’

‘যাচাই কেন করবেন না? অবশ্যই করুন। লাশ বাদ দিয়ে।’

‘লাশ যথাস্থানে আছে কিনা সেটা চেক না করলে তদন্ত এগোব কী করে?’

‘ভদ্রমহিলা হিন্দু হলে কী করতেন? কোথায় পেতেন লাশ? সে পথেই তদন্ত করুন। কেন বুঝতে চাইছেন না, লোকসভা ভোটের আগে একটা আনরেস্ট তৈরি করার চেষ্টা চলছে! কে বলতে পারে এর পিছনে বিএসপি-র হাত নেই?’

এই শেষ যুক্তিবিন্যাসে অমিতাভ থমকে গেলেন। মুখ্যমন্ত্রী এখন সবেতেই বিএসপি-র হাত দেখবেন, তাতে অবশ্য আশ্চর্যের কিছু নেই। হতাশ ভঙ্গিতে অমিতাভ বাকিদের দিকে তাকালেন। এডিজি ভাবলেশহীন মুখে দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে আছেন। আইজি ফোন ঘাঁটছেন। কমিশনারের চোখে মনে হল প্রচ্ছন্ন কৌতুক। অমিতাভ মন্ত্রীমশায়ের দিকে তাকিয়ে বিনীত স্বরে বললেন, ‘সহজ পথে যাচাই করার সুযোগ আছে, সেই সুযোগ নেব না স্যার?’

মুখ্যমন্ত্রী অসহিষ্ণু গলায় বললেন, ‘সুজান জর্ডান নিয়ে অলরেডি প্রচুর নেগেটিভ পাবলিসিটি হয়ে গেছে। এবার তাঁর কবর খোঁড়ার অনুমতি দেওয়া মানে নিজের কবর খোঁড়া। এদিকে জামদুনি নিয়ে কেমন ফেস লস হচ্ছে, দেখছেন। আপনার মতো সিনিয়র একজন অফিসার এরকম আজব আবদার করেন কী করে সেটাই তো আমি ভেবে পাচ্ছি না।’

‘কিন্তু স্যার, সুজানের এই ব্যাপারটা দিয়ে মজন্তালী সরকারের গল্পে সুপারন্যাচারাল একটা অ্যাঙ্গেল দেবার চেষ্টা করা হচ্ছে। সত্যিটা সরেজমিনে দেখে জনতাকে জানানোর দরকার নেই?’

এবার কমিশনার ত্রিপাঠী মুখ খুললেন, ‘আপনি সিরিয়াসলি ভাবছেন মিঃ সান্যাল যে, কবর খুঁড়ে সুজান জর্ডানের লাশটাকে কাউন্ট ড্রাকুলার মতো টাটকা, জীবন্ত দেখতে পাবেন?’

অমিতাভ বললেন, ‘লাশ যথাস্থানে আছে কিনা আমি শুধু সেটুকু শিওর হতে চাই। ব্যস।’

মুখ্যমন্ত্রী অপ্রসন্ন মুখে বললেন, ‘লাশ পেলে তারপর তো বলবেন লাশের ডিএনএ টেস্ট করতে চাই।’

‘আমার একটা নির্দিষ্ট প্ল্যানিং আছে স্যার। মাই টিম অলরেডি হ্যাভ সাম লিডস। মজন্তালী সরকারকে যেমন তেমন অপরাধী ভাবলে হবে না। প্রতিটা চাল সে অত্যন্ত ভেবেচিন্তে নিচ্ছে। পাব্লিক সেন্টিমেন্টের হাওয়া নিজের পালে নেবার সমস্তরকম ব্যবস্থা সে করছে। মিডিয়াকে ইউজ করছে। সুজান জর্ডানের ফিঙ্গারপ্রিন্ট দাবার পরিভাষায় একটা চেক-মুভ। গুটি বাঁচাতে হলে আমাদের অলআউট অফেন্সে যেতে হবে। ফলে আমি আপনাকে আরও একবার ভেবে দেখতে অনুরোধ করব।’

মুখ্যমন্ত্রী হাত তুলে অমিতাভকে থামালেন, ‘দাবা খেলা আমি ভালো বুঝি না। কিন্তু এই যে পাবলিক সেন্টিমেন্টের কথাটা আপনি এইমাত্র বললেন, ওটা আবার আপনারা বোঝেন না। আর ওটা নিয়েই আমাদের কারবার। আপনি অফিশিয়ালি পিটিশন দেওয়া মাত্র জর্ডান ফ্যামিলি মানহানির মামলা ফাইল করবে। আর একবার মামলার চক্করে গেলে পাবলিক সেন্টিমেন্ট কিন্তু মৃত মানুষের দিকেই চলে যাবে। ফলে নো মিন্স নো।’

অমিতাভ চুপ করে গেলেন। কিন্তু মুখের রেখায় তাঁর বিরক্তি গোপন রইল না।

‘আপনাদের আর কিছু না বলার থাকলে আমি এবার উঠব,’ মুখ্যমন্ত্রী কবজি উল্টে ঘড়ি দেখলেন, ‘বিজনেস সামিটের জন্য একটা মিটিং রেখেছি।’

কেউ কোনও উচ্চবাচ্য করলেন না। মুখ্যমন্ত্রী সবার মুখে একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন, ‘শুনুন, পরের বছর লোকসভা ইলেকশন। আমি আপনাদের সবাইকে আবারও অনুরোধ করছি, এমন কোনও সিদ্ধান্ত নেবেন না যেটা গভর্নমেন্টের জন্য সিটব্যাক হয়ে দাঁড়ায়,’ বলে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন, ‘প্রতিদিন রাত আটটায় আমি প্রগ্রেসের ব্রিফ চাই।’

অমিতাভ ঠিক বুঝতে পারছিলেন না শেষ কথাটা কার উদ্দেশে বলা। কারণ এত বাকবিতণ্ডার পরেও তাঁকে এই কেসের দায়িত্বে রাখা হবে না নিশ্চয়ই। কিন্তু তাঁকে চমকে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী গলা চড়িয়ে বললেন, ‘আপনি শুনলেন মিঃ সান্যাল?’

ক্ষণিকের স্থবিরতা ঝেড়ে নড়েচড়ে উঠলেন অমিতাভ, ‘হ্যাঁ স্যার। ওকে স্যার।’

‘আমার পার্সোনাল নম্বর প্রবীরবাবুর থেকে নিয়ে নেবেন,’ পাঞ্জাবির হাতা ঠিক করতে করতে বললেন মুখ্যমন্ত্রী, ‘আর প্রেস মিট করছেন না কেন? সিলেক্টিভ ব্রিফ দিন। পুলিশের তরফ থেকে কোনও স্টেটমেন্ট না পেলে মজন্তালী সরকার ফাঁকা মাঠে পরপর গোল দিয়েই যাবে।’

‘কালই প্রেস কনফারেন্স ডাকার প্ল্যান করছি, স্যার।’

‘ডেকে ফেলুন। দেরি করবেন না। এই অ্যানার্কিস্ট ক্রিমিনালটাকে পাবলিক ফোকটে মাথায় তুলছে। ফিনিশ দিজ ননসেন্স।’

‘ইয়েস স্যার।’

‘আরও একটা কথা। এসিপি দময়ন্তী মুখার্জীকে টিমে রেখেছেন দেখলাম। ইজ শি কেপেবল এনাফ? না না, আমি ওঁর ট্র্যাক রেকর্ড জানি। কিন্তু যেহেতু উনি বহুদিন মেন্টাল ট্রমার মধ্যে ছিলেন ফর সাম পার্সোনাল রিজন, উনি কি এত বড় কেস হ্যান্ডল করার অবস্থায় রয়েছেন?’

উত্তরটা অমিতাভকে দিতে হল না। এডিজি-ই দিলেন, ‘দময়ন্তীকে আমিই রেফার করেছি স্যার। জটিল কেসে ওর মতো রেকর্ড এখানে কারও নেই।’

করুণাময় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখ দেখে বোঝা গেল না উনি কনভিন্সড হলেন কিনা, কিন্তু কথা বাড়ালেন না। ‘বেশ। দেখা যাক।’ বলে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বেরিয়ে গেলেন।

মিনিট পাঁচেক পর ঝুলবারান্দায় দাঁড়িয়ে অমিতাভর কাঁধে হাত রেখে এডিজি প্রবীর চক্রবর্তী বললেন, ‘এদেশে মানুষ মারা গেলে বোমা হয়ে যায়। তাদের খুব সাবধানে হ্যান্ডল করতে হয়।’

প্রৌঢ়তা কারও মুখের রেখায় বিষাদ আঁকে, কারও মুখে আবার জ্বেলে দেয় নিবিড় এক ভরসার আলো। সিআইডি-প্রধান প্রবীর চক্রবর্তী দ্বিতীয় ধরনের ব্যক্তিত্ব। ভবানী ভবনের লাইটহাউজ। তাঁকে দেখলেই গোটা ডিপার্টমেন্টের অলিন্দ-নিলয়ে রক্তের জোগান স্বাভাবিক হয়ে যায়। অমিতাভর মেজাজটা অবশ্য এখন খিঁচড়ে আছে। মিয়োনো তিনি গলায় বললেন, ‘আমার কী করা উচিত, প্রবীরদা? মোল্লা নাসিরুদ্দীনের সেই গল্পের মতো যেখানে খোঁজার সুবিধা সেখানেই চাবি খোঁজা উচিত? যেখানে চাবিটা হারিয়েছে সেখানে নয়?’

‘চাপ নিচ্ছ কেন? সিএম তোমার ওপর ভরসা করেন দেখলে তো। আমিও করি।’

‘ভরসা দিয়ে কি নাড়ু পাকাব? ভরসা দিয়ে তো আর সিরিয়াল কিলার ধরা যাবে না।’

‘কী করবে সেটা তো মন্ত্রীমশাই বলেই দিলেন। সুজান জর্ডানের কবর খোঁড়ার অনুমতি দেওয়া সম্ভব না।’

‘আপনি মজা করছেন প্রবীরদা?’

এডিজি একটা বিরক্তিসূচক শব্দ করলেন, ‘রিড বিটুইন দ্য লাইনস, সান্যাল। অনুমতি পাওয়া যাবে না। এত সিম্পল কথাটা বুঝতে পারছ না তুমি?’

অমিতাভ অবাক হয়ে এডিজির মুখের দিকে তাকালেন। তাঁর ঠোঁটে গূঢ় হাসি।

.

রাজাবাজার সায়েন্স কলেজ, বিকেল ৫টা

দরজায় টোকা পড়ল। মুখ বাড়াল সৌমিলি, ‘টুয়াদি, ব্যস্ত?’

উজ্জ্বল হয়ে উঠল শালিনীর চোখমুখ, ‘আরে! আয় আয়!’

সৌমিলি ঘরে ঢুকল, ‘একটা ইন্টারভিউয়ের কাজে মৌলালি এসেছিলাম। ভাবলাম তোমার সঙ্গে দেখা করে যাই। তোমার ফোনে পেলাম না।’

সৌমিলির পিছন পিছন আরেকটি মেয়ে ঢুকেছে। শ্যামলা, মিষ্টি। ওরই বয়সি হবে।

‘ফোন চার্জ হচ্ছে। আয় বোস তোরা।’ বলে সোনালী নামের মেয়েটিকে শালিনী বলল, ‘এখন আয়। কাল আমি অফ পিরিয়ডে ডেকে নেব তোকে। যা বললাম মনে রাখিস।’

মাথা নেড়ে ধীর পদক্ষেপে বেরিয়ে গেল মেয়েটি। শালিনী তার রিপোর্টার কাজিনের দিকে ফিরল। শিরিনকে নির্দেশ করে বলল, ‘তোর কলিগ?’

‘হ্যাঁ। শিরিন।’

শিরিন মিষ্টি করে হাসল।

শালিনী হেসে মাথা নাড়ল, ‘কোথায় থাকো শিরিন?’

‘বেলেঘাটা।’

‘তোমাদের চ্যানেল তো জমিয়ে দিয়েছে। ঘরে ঘরে লাইভ নিউজ। কেউ চ্যানেল চেঞ্জ করতে পারছে না।’

‘সবই মজন্তালী ঠাকুরের কৃপা।’ সৌমিলি হাসল।

‘আচ্ছা, তোদের জন্য চাউমিনের শিঙাড়া বলি?’

সৌমিলি ছেলেমানুষের মতো লাফিয়ে উঠল, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। উইথ দ্যাট অরগ্যানিক ট্যামারিন্ড সস। বলে দাও প্লিজ।’

শালিনী দোকানে ফোন করে অর্ডার দিয়ে দিল। তারপর সৌমিলিদের বলল, ‘কী শুরু করেছে রে তোদের মজন্তালী সরকার? সুজান জর্ডানের ফিঙ্গারপ্রিন্টের ব্যাপারটা শেষমেশ কী দাঁড়াল বল তো?’

‘জানি না। নো ক্লু। লোকজন তো ভূতের গপ্প ফেঁদে ফেলছে।’

‘আমরাও তাতে ধুঁয়ো দিচ্ছি।’ শিরিন বলল।

শালিনী শিরিনের দিকে তাকিয়ে সূক্ষ্ম হাসল, ‘সেই সত্য যা রচিবে তুমি, ঘটে যা তা সব সত্য নয়। বুঝলে? সত্য কী জিনিস কে বলে দেবে? কেউ তার মুখ দেখেনি।’

.

চায়ে ব্রেক, বেলভেডিয়ার রোড, সন্ধে ৬টা

অফিস থেকে দু-পা এগিয়ে এই নতুন ফুড জয়েন্টটা তানিয়ার খুব পছন্দ। কাজকম্ম মিটিয়ে সে আজ রাহুলকে পাকড়ে এনেছে। অর্ডার করেছে ফ্রেঞ্চ ফ্রাইজ আর পিজ্জা।

খেতে খেতে রাহুল বলল, ‘স্যারের মুখটা দেখলি? সিএম বেশ কড়া করেই সেঁকেছেন।’

তানিয়া বলল, ‘সিএম নিজে চলে আসবেন আমি ভাবিনি।’

‘মাইনরিটি ইস্যু হয়ে যাচ্ছে ভাই। পরের বছর লোকসভা। গেরুয়া বাহিনী ইজ রোরিং। সিএম চাপে আছেন।’

‘কী মনে হয়? লোকসভায় গদি পালটাবে?’

‘সেন্ট্রালে পালটাবে। তবে এখানে গেরুয়া খুব সুবিধা করতে পারবে না।’

‘তুমি তো দেখি অমিতাভ স্যারের মতো কথা বলছ। কোনও পার্টির নাম নিচ্ছ না। গেরুয়া, সবুজ, লাল! এ আবার কী!’

‘অমিতাভ স্যারের থেকেই তো ইন্সপায়ারড হয়েছি। পলিটিকাল পার্টি আর পুলিশের সম্পর্ক হচ্ছে ভাশুর-ভাদ্রবউয়ের মতো, বুঝলি? নাম না-নেওয়াই ভালো।’

তানিয়া হাসতে হাসতে বলল, ‘তাই বুঝি?’

‘হ্যাঁ। সেই গল্পটা শুনিসনি? এক অবিবাহিত ভদ্রলোকের নাম পটল। ভাই-ভাইয়ের বউয়ের সঙ্গেই থাকেন। ভাইয়ের বউকে একজন প্রশ্ন করল, ভাশুর ঠাকুরকে আজ কী দিয়ে খেতে দিলে গা? ভাইয়ের বউ বললেন, ওনারে ওনার তরকারি দিয়ে খেতে দিয়েচি। আমাদের সার্ভিসে তেমনই পলিটিকাল দলের নাম না-নেওয়াই ভালো।’

হি হি করে হাসল তানিয়া, ‘সেই। পুলিশ হচ্ছে জলের মতো। যে-পাত্রেই রাখো…।’

‘এই সার সত্যটি বুঝে নিলেই তোমার রকেটগতিতে পদোন্নতি নিশ্চিত।’

মকটেল এসেছে। ব্লু বেরি সিরাপ দেওয়া স্প্রাইট বা সেভেন আপ। তারই গালভরা নাম ব্লু লেগুন। গেলাসে চুমুক দিয়ে তানিয়া বলল, ‘জানো, আমার মনে হচ্ছে সুজান জর্ডানের উকিলটাই কলকাঠি নেড়েছে।’

‘হতেই পারে। বিবস্বান দত্ত ঘুঘু লোক। আগে ভেবেছিলাম এসপিএম। এখন দেখছি এই সরকারের উপরমহলেও দিব্যি সাঁট আছে।’

‘তোমার কী মনে হয়, বিবস্বান দত্ত মজন্তালীর একজন অ্যালাই?’

‘হতেই পারে। তবে উপাসনা আচার্য যে সবাইকে সরিয়ে সাসপেক্ট লিস্টের টপে চলে এল, সে খবর রাখিস?’

‘কেন? কী হয়েছে?’ তানিয়ার চোখমুখ নিমেষে টানটান, ‘এই তো সকালেই স্যাররা গেছিলেন কথা বলতে।’

‘ভদ্রমহিলার গতিবিধি হাইলি সাসপিশাস হয়ে উঠছে। স্যাররা বেরিয়ে এলেন, তারপরেই লাঞ্চ-টাঞ্চ করে উনিও গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন।’

‘কোথায়?’

‘জামদুনি। সেখানে ঝুম্পা কয়াল, মৌমিতা কয়ালের সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বলেছেন।’

‘এঁরা আবার কারা?’

‘শুধু নিজের কেসে মুখ গুঁজে থাকলে চলবে?’ তানিয়ার মাথায় একটা ছোট্ট চাঁটি বসিয়ে দিল রাহুল, ‘সিস্টেম বসে যাচ্ছে তোর। রিবুট মার।’

কাঁচুমাচু মুখে তানিয়া বলল, ‘দাঁড়াও দাঁড়াও, মনে পড়েছে। জামদুনিতে মিডিয়া এখন এদেরই ফোকাস করছে। জামদুনির নেত্রী।’

‘তুমি ক পেয়েছ।’ চিয়ার্সের ভঙ্গিমায় কফির কাপ তুলল রাহুল।

‘কিন্তু উপাসনা জামদুনি কেন গেল? কী ঘোঁট পাকাচ্ছে?’

‘সুজানের জন্য একটা স্মরণসভা করবে সম্ভবত। সেখানে জামদুনির লোকজনকে ইনভাইট করছে। পারস্পরিক একটা সলিডারিটি আরকি। তখন থেকে কী লিখছিস এটা?’

‘ধুলো ঘাঁটার ইন্সট্রাকশন।’

‘মানে?’

‘ডিসট্রিক্ট করেসপন্ডেন্টদের ইন্সট্রাকশনের একটা ড্রাফট তৈরি করছি। সকালে স্যার বলছিলেন না?’

‘করেও ফেললি এর মধ্যে?’

‘হ্যাঁ। আমার মেলে স্ক্যান করে পাঠাবে। ঝাড়াইবাছাই করব। তবে হেল্পলাইন হিসেবে দময়ন্তীদির নম্বরটাই দিচ্ছি। কোনও ক্রিটিকাল কোয়ারি থাকলে আমি ম্যানেজ করতে পারব না বাবা!’

‘তোর কনফিডেন্স এত লো কেন রে? তোর মতো রেজাল্ট নিয়ে বহু বছর কেউ ডিপার্টমেন্টে আসেনি, জানিস? এখন ঢাক পেটানোর যুগ। নকুলদানা স্রেফ প্রচারের চোটে জলভরা তালশাঁস হয়ে যাচ্ছে। আর তুই…।’

‘কী জানি! মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে, ভুল প্রফেশনে চলে এলাম কিনা!’

রাহুল কফিতে চুমুক দিল, ‘কতদিন সময় দিচ্ছিস ধুলো ঘাঁটার জন্য?’

‘এক সপ্তাহ।’

‘এক সপ্তাহ!’ রাহুল হাসল, ‘পূর্ব মেদিনীপুর বা বর্ধমানের মতো জেলায় ক’টা করে থানা বল তো?’

‘স্যার আলাদা চিঠি করছেন থানার ওসিদের জন্য। একজন করে লোক যাতে অ্যালট করে এই কাজে।’

‘একজন করে লোক এই কাজে অ্যালট করে দেবে? অত ম্যানপাওয়ার আছে? জেলার থানাগুলোর মাথায় কম্বল টানতে গেলে পা বেরিয়ে যায়। স্যারের প্রচুর উচ্চাশা।’

.

হাজরা, সন্ধে ৭টা

গোল স্বদেশি স্টাইলের চশমার আড়ালে বুদ্ধিদীপ্ত চোখ। সুন্দর করে ট্রিম করা বাহারি গোঁফদাড়ি। বিবস্বান দত্ত কায়মনোবাক্যে উকিল। নিজের পেশার সঙ্গে দৃশ্যত এত পারফেক্ট ম্যাচ খুব কম দেখা যায়। কথা বলার শিল্পটি ভদ্রলোক ভারি চমৎকার রপ্ত করেছেন। এত মোলায়েম ভঙ্গিতে হুল ফুটিয়ে ফুটিয়ে কথা বলতে কাউকে দেখেনি দময়ন্তী।

কর্মচারীকে চায়ের কথা বলে বিবস্বান বললেন, ‘সুজানের সঙ্গে পুলিশ ঠিক কী কী করেছে তার ফিরিস্তি দিলে যে-কোনও সভ্য দেশের নাগরিক লজ্জা পাবে, মিঃ সান্যাল। এফআইআর নেবার সময় চূড়ান্ত দুর্ব্যবহার। ঘটনা ঘটার পাঁচদিনের মাথায় গিয়ে মেডিকেল পরীক্ষা করার সময় হয়েছে আপনাদের। দেরির কারণ কী দেখানো হল? পরপর কয়েকটা ছুটি ছিল, পুলিশ কোর্টের নির্দেশ পায়নি। পুলিশি নেতৃত্বেই যদি সাক্ষ্যপ্রমাণ নষ্ট করার খেলা শুরু হয়, মানুষ যাবে কোথায়?’

অমিতাভ বললেন, ‘ওটা কলকাতা পুলিশের জুরিসডিকশন ছিল, মিঃ দত্ত।’

‘সিআইডি-র হাতে যেসব কেস যাচ্ছে তাদের কথা আর না-ই বা বললাম স্যার।’

‘জামদুনির কথা বলছেন?’

‘জামদুনি, কাটোয়া, গাইঘাটা—কত বলব,’ হাসলেন বিবস্বান দত্ত, ‘অথচ আপনাদের মধ্যে থেকেই একজন সর্বাণী সেন উঠে দাঁড়ান, যিনি কারও পরোয়া না করে বলে দেন যে, হ্যাঁ পার্ক স্ট্রিটে ধর্ষণ হয়েছে।’

‘বাকিটাও বলুন। তারপর তাঁকে একটা তাৎপর্যবিহীন পোস্টে বদলি হয়ে যেতে হয়।’

‘আপনি গোয়েন্দা হিসেবে এত রেপুটেড এবং এফিশিয়েন্ট, আপনি চাকরি নিয়ে ভয় পান?’

‘পাই। আমি রেবেল নই। দাগবিহীন, পরিচ্ছন্ন একটি সার্ভিস বুক নিয়ে আমি চাকরিজীবন শেষ করতে চাই। এবং আমার মনে হয় না সেটা অন্যায়।’

অমিতাভর চোখের দিকে তাকিয়ে আর তর্ক বাড়ালেন না বিবস্বান দত্ত। ফোর্থ গিয়ার থেকে সোজা ফার্স্ট গিয়ারে নেমে এলেন, ‘বলুন আপনাদের কীভাবে সাহায্য করতে পারি?’

‘শুনেছি সুজান জর্ডানের কেস আপনি এক দশমাংশ পারিশ্রমিকে লড়েছেন?’

‘হ্যাঁ। এখনও লড়ছি। প্রেজেন্ট কনটিনুয়াস টেন্স।’

‘সুজান নিজে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন?’

‘না। আমাকে ব্যক্তিগত অনুরোধ করেছিলেন উপাসনা আচার্য। উনি আমার স্ত্রী জয়তী এবং সুজানের কমন ফ্রেন্ড।’

‘দেখুন মিঃ দত্ত, আপনি এটা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন যে মজন্তালী সরকারের সঙ্গে সুজান জর্ডানের কোনওভাবে একটা যোগাযোগ আছে এটা এখন এস্টাব্লিশড। আপনি সুজানের উকিল। কাজের সূত্রে দীর্ঘ আলাপচারিতা করতে হয়েছে। সুজানের মৃত্যুর পরের দিনই লাইভ নিউজের একটা ইন্টারভিউয়ে আপনি এটা খোলাখুলি স্বীকারও করেছেন যে সুজানের সঙ্গে আপনার বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল। তাই জিগ্যেস করছি, মজন্তালী সরকারের সঙ্গে সুজান জর্ডানের যোগাযোগের ব্যাপারে কোনওরকম আলোকপাত করতে পারেন?’

‘না স্যার। সুজান ওয়াজ আ ফাইটার। একজন রেপ সারভাইভার গণমাধ্যমে নিজেই নিজের পরিচয় ফাঁস করছেন, এটা অভাবনীয়। আমি জানি না আমাদের দেশে এই সাহস এর আগে আর কেউ দেখাতে পেরেছেন কিনা।’

‘সে তো নিশ্চয়ই। তবে বিচারব্যবস্থার ওপর ওঁর আস্থা ছিল না। তাই জানতে চাইছি অন্য পথে প্রতিশোধ নেবার কথা-টথা কি তিনি বলতেন কখনও? বা সরাসরি না বললেও আপনি কি কখনও ওঁর মধ্যে এমন প্রবণতা টের পেয়েছেন?’

‘সুজান শুধু নিজে ন্যায়বিচার পেতে চাইত, আর চাইত সব নির্যাতিতাই যেন বিচার পায়। তার জন্য নাশকতার রাস্তা নেবার কথা সে ভাবেনি। ভাবলে সভাসমিতি করে সময় খরচ করত না। আর এটা খুব দুর্ভাগ্যজনক যে মানুষটা মারা যাবার পরেও তাঁর বিরুদ্ধে এরকম আষাঢ়ে অ্যালিগেশন উঠছে। মৃত্যুর পরেও কেন এই ডিফেমেশন? পুলিশ-প্রশাসন কি কাউকে আড়াল করার চেষ্টা করছেন? ইজ ইট আ স্টেট-ব্যাকড ডিফেমেশন?’

‘আপনি এটা বলতে পারেন না মিঃ দত্ত। আমাদের হাতে জলজ্যান্ত প্রমাণ আছে। ফিঙ্গারপ্রিন্ট।’

‘আমি পুলিশ প্রসিডিওরালের সঙ্গে পরিচিত মিঃ সান্যাল। পাবলিক প্রসিকিউটর সোমনাথ রায়চৌধুরীর জুনিয়র ছিলাম। যাই হোক, সেগুলো আপাতত অপ্রাসঙ্গিক।’

‘দেখুন মিঃ দত্ত, একমাত্র একটা সম্ভাবনাই রয়েছে যেটা ঘটে থাকলে সুজানকে ক্লিনশিট দেওয়া সম্ভব। কয়েকটা জিনিসে সুজানের ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিয়ে নেওয়া হয়েছে হোয়েন শি ওয়াজ নট ইন হার সেন্স। সেটা একেবারে অসম্ভব বলছি না। বেঙ্গল ট্রপিকাল মেডিসিনের সুরক্ষাব্যবস্থা যে খুব টাইট তা নয়। সব বিল্ডিংয়ের এন্ট্রান্স আর শুধু মেইন বিল্ডিংয়ের করিডর ছাড়া কোথাও সিসিটিভি নেই। সুজান যে-ঘরে ছিলেন সেখানে সিসিটিভি থাকলে ব্যাপারটা সহজ হত। সেটা যেহেতু ছিল না, ফলে তিনি বেঁচে থাকা অবস্থায় সজ্ঞানে জিনিসগুলোয় নিজের ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়েছেন কিনা সেই সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে হচ্ছে। সুজান মারা গেছেন খুব বেশিদিন হয়নি কিন্তু।’

‘আপনারা কি সুপার ন্যাচারাল সম্ভাবনার দিকটা একেবারেই ছেড়ে দিলেন?’ বিবস্বান দত্তের মুখে কৌতুকের হাসি।

খোঁচাটা এড়িয়ে অমিতাভ বললেন, ‘সুজান যদি সত্যিই বেঁচে থাকেন, আমরা তাঁকে ঠিকই খুঁজে বের করব।’

‘মন্ত্রীমশাই নাকি খুব বকাবকি করেছেন?’ বলে ফিচেল হেসেই নিজেকে সামলে নিলেন বিবস্বান দত্ত। সিরিয়াস গলায় বললেন, ‘না। জোকস অ্যাপার্ট, একজন মৃত মানুষের কবর খুঁড়ে দেখাটা খুবই অবমাননাকর হত। আমি আপনাদের কাছে থ্যাঙ্কফুল যে আপনারা শেষপর্যন্ত সে রাস্তায় হাঁটেননি। সুজান হ্যাজ সাফারড আ লট। লেট হার রেস্ট ইন পিস।’

অমিতাভ ভাবলেশহীন মুখে বললেন, ‘মন্ত্রীমশাই কী বলেছেন, সে-খবর পেয়ে গেছেন এর মধ্যেই?’

‘আমার ক্লায়েন্টের মানসম্মানের প্রশ্ন। খবর তো আমাকে রাখতেই হবে স্যার। আচ্ছা আপনার কী মনে হয়, মন্ত্রীমশাই কি চিঠির ওই ‘কমরেড’ শব্দে আঁশটে গন্ধ পাচ্ছেন?’

অমিতাভ উঠে পড়লেন, ‘চলি মিঃ দত্ত। পরে আবার বিরক্ত করব।’

‘নিশ্চয়ই বিরক্ত করবেন স্যার। আপনাদের কাজে লাগতে পারলে ধন্য মনে করব নিজেকে।’ হাত জোড় করলেন বিবস্বান দত্ত, ‘বাই দা ওয়ে, কাল আপনারা প্রেস কনফারেন্স করছেন তো? করুন। আমরা সাধারণ নাগরিকরা শুনতে চাই আপনারা মজন্তালী সরকারকে নিয়ে কী ভাবছেন।’

.

নিউ মার্কেট, রাত ৯টা

নিউ মার্কেটের কাছাকাছি এসে অমিতাভ বললেন, ‘আমায় এখানে নামিয়ে দাও।’

‘কতক্ষণের কাজ স্যার? খানিকক্ষণ অপেক্ষা করতে পারি।’

‘না। দরকার নেই। কাজ সেরে উবার ধরে নেব।’

গাড়ি বেরিয়ে গেল। অমিতাভ হাঁটা লাগালেন।

কিছুটা এগিয়ে লেনিন সরণী। ট্রামলাইন পেরোলেই শ ব্রাদার্স। আবগারি প্রেমীদের মুখে মুখে ‘ছোটা ব্রিস্টল’। কমজোরি আলো। সাদামাটা সজ্জা। শ-দেড়শো লোকের ভিড়ে গমগম করে সবসময়। দক্ষিণ কোণের সিটগুলোয় দ্রুত চোখ চালালেন অমিতাভ। ইলিয়াস আসেনি এখনও।

অমিতাভ ঘড়ি দেখলেন। ইলিয়াস দেরি করে না। তিনি নিজেই পাঁচ মিনিট আগে চলে এসেছেন।

ছোটা ব্রিস্টলে বারের ভিতর সিগারেট খাওয়া বারণ। বাথরুমে গিয়ে খেতে হয়। অমিতাভ তাই করলেন। যেসব ব্যাপারে হাত গন্ধ করতে সরকারিভাবে পুলিশ আটকে যায়, ইলিয়াস আহমদ সেসব কাজের কাজী। ইলিয়াস হার্ডকোর প্রফেশনাল। সিক্রেট এজেন্টের যাবতীয় শর্ত মেনে কাজ করে। রেট অনেক, কিন্তু ডিডি গেঞ্জি। চোখ বন্ধ করে ভরসা করা যায়। ইলিয়াসের পকেট ঘাঁটলে ভবানী ভবন আর লাল-বাজার দুয়েরই অনেক কেচ্ছা বেরোবে। সিগারেট শেষ করে ফিরে এসেই অমিতাভ দেখলেন কোণের টেবিলে হাসি হাসি মুখ করে বসে আছে ইলিয়াস।

অমিতাভ নিজের জন্য ড্রট বিয়ার বললেন। ইলিয়াস নিল স্মারনফ। চোখ কপালে তুললেন অমিতাভ, ‘ভদকা? কী ব্যাপার?’

‘লিভার ফাংশন টেস্টের রিপোর্ট খারাপ এসছে স্যার। রাম বন্ধ,’ হাসল ইলিয়াস, ‘এবার অনেকদিন বাদে মনে করলেন।’

‘কোন কেস নিয়ে কাজ করছি জানো তো?’

‘জানি স্যার। মেয়েছেলেটা হেবি ভোগাচ্ছে। কী করতে হবে হুকুম করুন।’

অমিতাভ গ্লাসে চুমুক দিয়ে বললেন, ‘কবর খুঁড়তে হবে।’

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *