দশম দিন
তারিখ : ১১ আগস্ট
বাগনান, সকাল ৯টা
লোকজনকে জিগ্যেস করে প্রাক্তন দারোগা গোলাম কুদ্দুসের বাড়ির গলিটা খুঁজে পেতে সমস্যা হল না। তবে গলিটা এত সরু যে গাড়ি ঢুকবে না। দময়ন্তী আর তানিয়া নেমে পড়ল। গলিতে ঢুকে ডান হাতে চার নম্বর বাড়িটাই সাতান্ন বাই দুই।
সদর দরজা খোলাই ছিল। উঠোনে লুঙ্গি আর ফতুয়া পরিহিত এক ভদ্রলোক হাঁটু গেড়ে বসে খরগোশদের খাবার দিচ্ছিলেন। দময়ন্তীদের দেখে উঠে দাঁড়ালেন।
তানিয়া জিগ্যেস করল, ‘নমস্কার, গোলাম কুদ্দুসের বাড়ি তো এইটা?’
‘জি, আমিই গোলাম কুদ্দুস। বলেন।’
‘গুড মর্নিং কুদ্দুসসাহেব,’ দময়ন্তী পকেট থেকে আইডি বের করে দেখাল, ‘আমরা সিআইডি থেকে আসছি। পুরোনো একটা কেসের ব্যাপারে আপনার হেল্প চাই।’
‘আরে বাপ রে!’ বলেই ভদ্রলোক শশব্যস্ত হয়ে পড়লেন। হাঁকডাক করে গৃহসহায়ককে ডাকলেন। আপ্যায়ন করে বসালেন। খাবার দিতে বলছিলেন। দময়ন্তী বাধা দিল। ভদ্রলোক তবু জোরজার করে মস্ত এক গ্লাস করে দইয়ের ঘোল ধরিয়ে দিলেন ওদের হাতে। তারপর ভিতর থেকে একটা চেয়ার এনে মুখোমুখি বসলেন। কোলের কাছে হাত জড়ো করে বললেন, ‘বলুন ম্যাডাম। কী সেবা করতে পারি?’
দময়ন্তী বলল, ‘আটানব্বই সালের একটা ঘটনা নিয়ে কয়েকটা প্রশ্ন ছিল। আপনি তখন ইনচার্জ ছিলেন।’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, বলুন না।’
‘আমরা এই ঘটনাটার কথা জানলাম সাব ইনস্পেকটর সাগ্নিক বড়ালের থেকে। উনি সে-সময় সদ্য আপনার আন্ডারে জয়েন করেছিলেন। এই ঘটনাটার দিন টেবল ডিউটিতে সাগ্নিকবাবুই ছিলেন।’
‘সাগ্নিক! ইয়েস। ব্রাইট ইয়ং ম্যান। সে এখন কোথায়?’
‘তাঁর পোস্টিং এখন মালিপাঁচঘড়ায়। তিনিই এই কেসটা পয়েন্ট আউট করলেন। ইনভেস্টিগেটিং অফিসারের নাম নিমাই সাহা। উনি মারা গেছেন বলে আপনার কাছে আসতে হল।’
মাথা নেড়ে গোলাম কুদ্দুস বললেন, ‘নিমাইবাবু আমার সময়ে মেজোবাবু ছিলেন। আমি চার বছর বাগনান থানার দারোগা ছিলাম। দু-হাজার এক সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আমি ওখান থেকেই রিটায়ার করি। কিন্তু অত আগের ঘটনা কি মনে করতে পারব? কী কেস বলুন তো?’
‘একটা জুভেনাইল কেস। বোনের ধর্ষককে ছুরি মেরে খুন করেছিল একটি মেয়ে। রিপোর্টের কপি আছে আমাদের সঙ্গে। এই যে।’ ফাইলটা এগিয়ে দিল দময়ন্তী।
‘আরে, এই কেস ভোলা যায়?’ মনে করতে বিশেষ চেষ্টা করতে হল না প্রাক্তন দারোগাকে, ‘এসব হচ্ছে যাকে বলে ওয়ান্স ইন আ লাইফটাইম কেস।’
‘এই কেসের বিষয়ে কোনও ডিটেল কি মনে আছে আপনার? রিপোর্টের বাইরের কোনও ডিটেল আরকি। মেয়েটি বা মেয়েটির পরিবার বিষয়ে বা যে লোকটা খুন হয়েছিল তার বিষয়ে?’
গোলাম কুদ্দুসের দৃষ্টি বিষণ্ণ হল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘নানকু মণ্ডল লোকটা ছিল একেবারে বদের ধাড়ি যাকে বলে। তিন-চারটে রেপ, হ্যারাসমেন্টের অভিযোগ ছিল ওর এগেনস্টে। তখনকার রুলিং পার্টির মেম্বার ছিল বলে কেস টিকত না। আমরা চেয়েও কিছু করতে পারছিলাম না। আরও একটা ওর শাগরেদ ছিল। বুলান ঘোষ। একবার তো ধরে এনেও এক ঘণ্টার মধ্যে ছেড়ে দিতে হয়েছিল। কী আর বলব ম্যাডাম, আমি প্রাইজ-পাওয়া লোক। সুন্দরবনের ঢোলাহাটে যখন আইসি ছিলাম, মেয়েদের পাচার রুখে ব্রেভারি অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলাম। সেই আমি এখানে এসে নানকু, বুলানদের কিছুই করতে পারলাম না। বরং মদ-চালান আটকাতে গিয়ে আমাদেরই এক অফিসার শৈবাল পাহান নিখোঁজ হয়ে গেল।’
‘মেয়েটার কথা বলুন। মার্ডারের পর কী হল?’
‘পলিটিকাল বাওয়াল হয়েছিল ভালোই,’ শিবনেত্র হয়ে স্মৃতি রোমন্থন করলেন গোলাম কুদ্দুস, ‘মেয়েটার পরিবারকে ভয়-টয় দেখিয়েছিল। ওরা এখান থেকে চলে গিয়েছিল। এমনিতে ওরা এলাকার বেশ রেপুটেড পরিবার ছিল। এটা মনে আছে। ভটচায্যি বামুন। সম্ভবত পুরুতঠাকুর ছিলেন। মেয়েদুটিও লেখাপড়ায় ভালো ছিল। মেয়েটা পরে জুভেনাইল হোম থেকে ছাড়া পেতে পেতে ওরা এখান থেকে চলে গিয়েছিল।’
‘কোথায় চলে গিয়েছিল?’
‘সেটা বলতে পারব না। তবে চলে গিয়েছিল এটা শিওর। হোমে গিয়ে খোঁজ করে দেখুন কিছু বলতে পারে কিনা।’
.
ভবানী ভবন, সকাল ৯টা ৩০
অমিতাভ আজ একটু সকাল সকালই অফিসে চলে এসেছিলেন। রমেশকে কড়া করে একটা ব্ল্যাক কফি আনতে বলে এসিটা ষোলয় করে দিয়ে চেয়ারে পিঠ দিলেন। ওয়ার্কস্টেশনে এ-বেলাটা তিনি একাই। রাহুল গেছে মালিপাঁচঘড়ার ইনস্পেকটর সাগ্নিক সাহার ঠিকুজি ঘাঁটতে, আর দময়ন্তীরা বেরিয়েছে ইতিহাসের ল্যাজ ধরে টান মারতে।
অমিতাভ নিশ্চিত, ঠিক কেস ফাইলটির ল্যাজ টানলে বেড়ালের খোঁজ মিলবেই। বাগনান থানার এই কেস ফাইলই সেই মহার্ঘ্য পরশপাথর কিনা সেটাই এখন দেখার। সাগ্নিক সাহা লোকটা যদি জেনুইন হয়, তাহলে ওই নির্যাতিতা মেয়েটিই হয়তো মার্জারললনা। মোটিভ, চিরকুট, চুলের কাঁটা দিয়ে খুন, এমনকী বয়েসও মিলে যাচ্ছে। অমিতাভ গতকাল সবার সামনে খুব বেশি উৎসাহ দেখাননি ঠিকই, কিন্তু ভিতরে ভিতরে হালকা আশার টুনিবাল্ব জ্বলছে। তবে আরও কিছু হিসেব খাপে খাপ হওয়া দরকার। কফি খেয়ে কয়েকটা পয়েন্ট নিয়ে বসতে হবে।
কফি আসার আগে লোকনাথ এল, ‘স্যার, আরেকটা খুন।’
কনফারেন্স রুমের ঘটনার পর থেকে অমিতাভ আর চমকাচ্ছেন না। অবিচলিত কণ্ঠে বললেন, ‘কোথায়?’
‘কসবা। ফিল্ম প্রডিউসার। খুনটা সম্ভবত কাল হয়েছে। বডি ফ্ল্যাটের মধ্যে পড়ে ছিল। খবর হতে দেরি হয়েছে।’
অমিতাভ একটু ভেবে বললেন, ‘ফরেন্সিকের শুভ্রকান্তিবাবুকে ফোনে ধরো তো।’
.
লিলুয়া, সকাল ৯টা ৫০
জুভেনাইল সরকারি হোমটা হাওড়ার লিলুয়ায়। তিনতলা নীল সাদা বিল্ডিং। গেট দিয়ে ঢুকে সামনে ডানদিকে একটুখানি বাগান। দু-চারটে ফুলগাছের সঙ্গে একটা মাঝারি মাপের আমগাছ। বড়সড় পরিচ্ছন্ন পার্কিং স্পেস। হোমের সুপার চয়নিকা রাউত নিজের ঘরেই ছিলেন। হাসিখুশি মানুষ। তবে মুখে একটা দৃঢ়তার ছাপ। দেখে মনে হয় বয়েস পঞ্চাশ পেরিয়েছে। ফাইলটা দেখলেন। একজন স্টাফকে ডেকে একটা চিরকুট লিখে ধরিয়ে দিলেন। দময়ন্তীদের দিকে ফিরে বললেন, ‘ফাইল আসছে। ততক্ষণ একটু কিছু খান।’
‘না না, সে-সবের দরকার নেই। আমরা খেয়েই বেরিয়েছি।’
‘চা বলি অন্তত?’
‘চা-ই বলুন।’
চয়নিকা বেল টিপে একজন স্টাফকে ডেকে চায়ের কথা বলে দিলেন। তারপর বললেন, ‘আপনারা নিশ্চয়ই জানেন, পুলিশ-কোর্ট-হোম এই তিনের চক্কর আমাদের দেশে যেমন লম্বা তেমন যন্ত্রণাদায়ক। সেই ১৯৮৬ সালের আইন এখনও চলছে। প্লাস এখনও অনেক জেলায় নিজস্ব জেজেবি নেই। পাশের বড় জেলায় কেস যায়। বারবার পুলিশের কাছে বয়ান দেওয়া, বোর্ড বা আদালতের জাজের কাছে সাক্ষ্য দেওয়া, বাড়ির লোকজন ছেড়ে হোমে থাকা জুভেনাইল অপরাধীদের জন্য খুবই কষ্টকর এগুলো। আজকে দিল্লির কেসে ষোল বছরের ছেলেটি সবচেয়ে নৃশংস ছিল বলে হয়তো অ্যাক্টে বেশ কিছু অ্যামেন্ডমেন্ট আসবে। কিন্তু খুঁটিনাটি নানারকম বদল তো অনেক আগেই প্রয়োজন ছিল। কই? সব জেলায় পুলিশের স্পেশাল জুভেনাইল ইউনিট করার কথা যে বলা হয়েছিল, প্রত্যন্ত জেলাগুলোয় খোঁজ নিলে তাদের টিকির দেখা পাওয়া যাবে তো? জুভেনাইল ডেলিকোয়েন্সির শুশ্রূষা এত সহজ কথা নয় ম্যাডাম।’
ভদ্রমহিলা গল্প করার মুডে। কাজের কথায় আসা দরকার। দময়ন্তী বলল, ‘এই রেখা মেয়েটি যে-সময় ছিল, তখন হোমের ইনচার্জ যিনি ছিলেন, আপনি তাঁকে চেনেন?’
‘না। নামটুকু জানি। আমি এখানে এসেছি ২০০৭-এ। আমার আগে ছিলেন মন্দিরা চৌধুরী। মন্দিরাদির আগে অপর্ণা সামন্ত। ওই সময় অপর্ণা সামন্তই ইনচার্জ ছিলেন।’
‘তাঁর পার্মানেন্ট অ্যাড্রেস আপনাদের দপ্তরে আছে নিশ্চয়ই?’
.
সাঁতরাগাছি, সকাল ১১টা
অপর্ণা সামন্তর বাড়ি সাঁতরাগাছি রেলগেটের কাছে। ভদ্রমহিলার মাথাভরা কাশের মতো চুল। আশি ছুঁয়েও যথেষ্ট ফিট। স্মৃতিশক্তিও দেখা গেল যথেষ্ট ঠিকঠাক। সিআইডি শুনে আপ্লুত হয়ে পড়লেন, ‘রেখা ভট্টাচার্য? মনে আছে। হোমে এত শান্ত, এত ওয়েল বিহেভড বাচ্চা দেখাই যায় না প্রায়। যতদূর মনে পড়ে, ওকে নিয়ে কোনও সমস্যাই হয়নি কখনও।’
দময়ন্তী বলল, ‘পার্সোনাল ইন্টেরাকশন হত আপনার সঙ্গে?’
‘হত,’ তৃপ্তির সুরে বললেন অপর্ণা সামন্ত, ‘আমি সব বাচ্চার সঙ্গেই নিয়মিত কথাবার্তা বলতাম। সপ্তাহে দু-দিন একটা গল্প বলার আসর করতাম। তার শেষে সবাই সবার সমস্যার কথা শুনতাম। একেই ওদের নিজেদের মধ্যে বন্ডিং যে সবসময় সেভাবে গড়ে ওঠে তা-ও না, বুঝতেই পারছেন। বেশিরভাগেরই ডিস্টার্বড চাইল্ডহুড। নিহিত অপরাধবোধ, যার ব্যাখ্যা ওদের নিজেদের কাছেই নেই। তাই চেষ্টা করতাম যাতে কথাবার্তা হয়। কথাবার্তা না বললে এরকম বাচ্চারা আরও সাফোকেটিং ফিল করে।’
‘আমি আসলে আরেকটু পারসোনালাইজড ইন্টেরাকশনের কথা বলছি। এমনি আলাদা করে কিছু বলত? অনেক সময় বাচ্চারা সবার মাঝখানে মন খুলে সব কথা বলতে পারে না। সেজন্য বলছি।’
‘সেটা হয়ে ওঠেনি। সত্যি বলতে কী, তার জন্য সময় ছিল না। তবে রেখার কথা আমার অনেকটাই মনে আছে। কারণ আন্দুলের হোমে পনেরো বছরের চাকরিজীবনে লেখাপড়া আর খেলাধুলো দুটোতেই এত ভালো কাউকে আমি আর কখনও দেখিনি। যেমন ভালো এলোকেশন করত, তেমন হাইজাম্প বা দৌড়। একেবারে অলরাউন্ডার যাকে বলে।’
‘একটা জরুরি পয়েন্ট হোমে মিস করে গেছি রে তানিয়া,’ বলে আক্ষেপসূচক শব্দ করে আবার অপর্ণা সামন্তর দিকে ঘুরল দময়ন্তী, ‘আচ্ছা সেই সময় হোমের সাইকোলজিস্ট কে ছিলেন?’
‘পার্মানেন্ট কেউ ছিল কিনা মনে পড়ছে না ঠিক।’
দময়ন্তী চোখ কপালে তুলে বলল, ‘জুভেনাইল হোমে পার্মানেন্ট সাইকোলজিস্ট ছিল না?’
‘তখনও সাইকোলজি সাবজেক্ট হিসেবে ব্লুম করেনি বুঝলেন। লোক কম পাওয়া যেত। ইউনিভার্সিটি পাস করা ছেলেমেয়েদের ইন্টার্নশিপ করতে পাঠানো হত মাঝে মাঝে। কেউ ছ মাস, কেউ এক বছর কাজ করত। সার্টিফিকেট নিয়েই বিদায় হত।’
‘রেখার সময় কি এরকমই কেউ ছিল?’
‘আমার যতদূর মনে পড়ছে, পরপর দুটি মেয়ে কাজ করেছিল এক বছর করে।’ অপর্ণা সামন্ত চোখ বুজে মনে করার চেষ্টা করলেন, ‘সম্ভবত ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্ট ছিল তারা।’
‘হোমের অফিসে খুঁজলে তাদের নাম পাওয়া যাবে?’
‘পাওয়া তো উচিত। আমি কাগজপত্র খুবই যত্ন করে রাখতাম। জানি না এখন কী হাল হয়েছে।’
দময়ন্তী তানিয়ার দিকে তাকালেন। তানিয়া বলল, ‘চয়নিকা রাউতকে ফোন করব? নাকি যাবার সময় ঘুরে যাব একবার?’
‘ফোন করে বের করে রাখতে বল। আমরা তুলে নেব।’ বলে অপর্ণা সামন্তর দিকে ফিরল দময়ন্তী, ‘অপর্ণা ম্যাডাম, ফাইলে দেখলাম রেখাকে তিন বছরেরও কম সময়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। কেসটা চাইল্ড কোর্টে যায়নি। খুনের কেসে এত তাড়াতাড়ি কি জুভেনাইল অপরাধীরা ছাড়া পায়? বিশেষত যেখানে জুভেনাইল বোর্ডের দুর্নাম রয়েছে যে সামান্য অপরাধে হোমে আসা ছোটদেরও গয়ংগচ্ছ ভাব দেখিয়ে ক্লিনচিট দিতে দেরি করে।’
অপর্ণা সামন্ত একটু ভেবে বললেন, ‘আমার ধারণা, রেখা ছাড়া পেয়েছিল এক্সেলেন্ট বিহেভিয়ারের জন্য। হাওড়া জেলায় তখন সবে সবে আলাদা জেজেবি, মানে জুভেনাইল জাস্টিস বোর্ড তৈরি হয়েছে। শিবপুরে তার আপিস। ওর হিয়ারিংয়ের সময় আমি নিজে গেছি কয়েকবার। রেখাকে প্রাইমারিলি পাঁচ বছরের জন্য হোমে রাখার কথা বলেছিল বোর্ড। তার অনেক আগেই ওকে ক্লিনচিট দেয়।’
দময়ন্তী বলল, ‘পুলিশের রিপোর্টে লেখা আছে, সারকামস্ট্যানশিয়াল এভিডেন্সের বাইরে খুব জোরালো কিছু পাওয়াও যায়নি। তাছাড়া রেখা সেলফ ডিফেন্স প্লিড করেছিল।’
‘তা হবে। অনেক আগের ঘটনা তো, সব ডিটেল মনে নেই আসলে।’
‘দেখুন, একটা খটকা এখানে থেকেই যাচ্ছে। পুলিশের রিপোর্টে স্পষ্ট লেখা আছে, লাশের পাশে চিরকুট পাওয়া গেছিল। তাতে লেখা ছিল বোনের বদলা নিতে রেখাই খুন করেছে। এ-ও লেখা আছে যে হাতের লেখাটা রেখারই। তার মানে রীতিমতো প্ল্যানড মার্ডার। তাহলে সেলফ ডিফেন্সের অজুহাত গ্রাহ্য হয় কী করে? জুভেনাইলের ক্ষেত্রে নানারকম স্পেশাল কনসিডারেশন থাকে বুঝলাম। মাত্র আড়াই বছরে এত স্মুদলি ক্লিনচিট পেয়ে যাওয়াতে একটু খটকা লাগছে।’
‘এটা তো তখন জেজেবির মেম্বাররা বা ম্যাজিস্ট্রেট যিনি ছিলেন তিনিই বলতে পারবেন,’ বলে একটু থেমে অপর্ণা সামন্ত বললেন, ‘রেখা কিছু ঘটিয়েছে নাকি ম্যাডাম?’
‘নট শিওর রেখাই কিনা। সেটাই কনফার্ম করার চেষ্টা করছি।’
অপর্ণার দৃষ্টিতে চিন্তার আভাস দেখা দিল, ‘গত বছরও পুলিশ খোঁজ করল। এবার খোদ সিআইডি খোঁজ করছে। কিছু তো একটা হয়েইছে।’
দময়ন্তীর স্নায়ুতে প্রবল ঝাঁকুনি লাগল, ‘গত বছর পুলিশ রেখার খোঁজ করছিল?’
‘হ্যাঁ। একজন ম্যাডাম এসেছিলেন। কলকাতারই কোনও থানার অফিসার। জোড়াসাঁকো না নোনাপুকুর, ঠিক মনে পড়ছে না। এসে খোঁজখবর করে গেলেন।’
‘উনি আইকার্ড দেখিয়েছিলেন?’
‘হ্যাঁ দেখিয়েছিলেন,’ আমতা আমতা করলেন অপর্ণা সামন্ত, ‘কেন বলুন তো? উনি কি পুলিশ নন?’
.
স্টার ট্রাইডেন্ট, কসবা, সকাল ১১টা ১০
বুলেট খুঁজতে তেমন বেগ পেতে হল না। একটা টেবল ক্যালেন্ডার ভেদ করে দেওয়ালে আশ্রয় নিয়েছিল সে। ব্যালিস্টিকস এক্সপার্ট অনির্বাণ বাগচি চিমটে দিয়ে বের করে দেখেশুনে ডিক্লেয়ার করল, ‘ক্যালিবার পয়েন্ট থ্রিএইটজিরো অটো।’
রাহুল বলল, ‘গ্লক ৪২-এর গুলি হতে পারে?’
‘ইয়েস। গ্লক ৪২ বা ৪৩ বলেই মনে হচ্ছে।’
ক্লোজড এরিয়া। অশোক বসু ছাড়া খুব বেশি লোকের ডিএনএ নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে না। ফলে এই মার্ডারটায় ফরেন্সিক টিমের ফাইন্ডিং থেকে জরুরি লিড পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। লোকজন এনে কাজে লেগে পড়েছেন ফরেন্সিক এক্সপার্ট শুভ্রকান্তি ব্যানার্জী। তাঁর সার্চিং খুব গোছানো। একজন কর্মী ফ্ল্যাশলাইট হাতে ইম্প্রেশন খুঁজে বের করছেন, একজন নমুনা সংগ্রহ করছেন, আর একজন চেইন অব কাস্টডির জন্য সেসবের ডকুমেন্টিং করছেন। আরেক দিকে ফটোগ্রাফার লাশ আর ক্রাইম সিনের ফটো তুলছেন। শুভ্রকান্তি খুব মন দিয়ে দেখেশুনে দু-এক জায়গায় মার্কার কার্ড ফেলছিলেন। লাল মার্কার মানে ওই জায়গাগুলো ছবি তুলতে হবে এবং হলুদ মার্কার মানে কোনও ফাইবার বা ফ্লুয়িড স্যাম্পল পাওয়া যেতে পারে। নিজে একটা লিনেন টেস্টার দিয়ে মাঝেমাঝে ইতিউতি পরীক্ষা করে নিচ্ছিলেন। অমিতাভদের কাছে এসে বললেন, ‘সাসপেক্টদের ডিএনএ স্যাম্পল কি তোমাদের কাছে আছে? ভূতেরটা তো আছে। বাকিদের?’
রাহুল বলল, ‘না। জোগাড় করতে হবে।’
অমিতাভ বললেন, ‘শুনলাম এটা অশোক বসুর ফষ্টিনষ্টি করার ফ্ল্যাট। ফলে ওঁর নিজের ছাড়া বাকি সবই ফিমেল ডিএনএ-ই পাবেন বোধহয়।’
‘দেখা যাক। উল্টোদিকের এই জায়গাটা জুড়ে ডিএনএ স্যাম্পল নেব। আরেকটা ইম্পর্ট্যান্ট পয়েন্ট। বাথরুমের ছিটকিনিতে ফিঙ্গারপ্রিন্ট আছে।’
‘গোটা ফ্ল্যাটটাই পেরিমিটার সার্চ করালে কেমন হয়, শুভ্রকান্তিদা?’
‘পুরোটা মাইক্রোস্কোপিক অ্যানালিসিস করতে বলছ?’
‘হ্যাঁ। সমস্যা হবে?’
‘সমস্যা আর কীসের? টাইম লাগবে, এই যা।’ কাঁধ ঝাঁকালেন শুভ্রকান্তি, ‘তুমি বললে করিয়ে দেব।’
‘করিয়ে দিন তবে,’ অমিতাভ বললেন, ‘ক্লোসড এরিয়ায় এই প্রথম খুন। হাতে এখন কিছু সাসপেক্টও আছে। ছোটখাটো ক্লু-ও কাজে লেগে যেতে পারে। আর মেন ডোরের বাইরে ফুটওয়্যার ইম্প্রেসন পাবেন আশা করি।’
‘হুঁ। মাথায় আছে। কাস্ট করাব। ইডিএল-ও করিয়ে দেব।’ নাক বেয়ে নেমে আসা চশমাটা আঙুল দিয়ে পিছনে ঠেললেন শুভ্রকান্তি ব্যানার্জী, ‘তবে রিপোর্ট দেবার জন্য তাড়া দেবে না কিন্তু। চারটে দিন সময় দেবে। অনেক কাজ জমে আছে।’
রাহুল নিচু গলায় অমিতাভকে জিগ্যেস করল, ‘ইডিএল-টা কী?’
অমিতাভ বললেন, ‘ইলেক্ট্রোস্ট্যাটিক ডাস্ট লিফটিং। ইলেকট্রিক-চালিত প্লাস্টিক শিট দিয়ে ইম্প্রেশন তুলবে।’
রাহুল ঠোঁট টিপে বলল, ‘শুভ্রবাবুর কিন্তু আলাদাই রেলা, কী বলেন? ফ্যান হয়ে যাচ্ছি লোকটার।’
‘বেশ তো। ওঁকে চাপে রাখার দায়িত্ব তাহলে তোমার। কালকের দিনটা ছেড়ে পরশু থেকে তাড়া দেবে।’
একটুর জন্য সিট মিস করে-যাওয়া ডেলিপ্যাসেঞ্জারের মতো হয়ে গেল রাহুলের মুখটা। অমিতাভ মুচকি হেসে এগিয়ে গেলেন লাশের দিকে।
ব্যালিস্টিকসের অনির্বাণ বাগচির বয়স কম। অ্যাকাডেমিতে রাহুলের এক ব্যাচ জুনিয়র। সে লাশের কপালে বুলেটের ফুটো পরীক্ষা করছিল। অমিতাভ তার পাশে গিয়ে দাঁড়াতে বলল, ‘পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক। এন্ট্রি উন্ডটা দেখুন। সবকটা সারকল তৈরি হয়েছে। বার্ন আছে, ব্ল্যাকেনিং হেয়লো আছে।’
‘এইসব দেখে কাজ নেই। গ্লক ৪২-এ এই গুলি ইউজ হতে পারে কিনা জেনে দিলেই হবে।’
‘ধরেই রাখুন তাই। কনফার্ম করে দেব কাল-পরশুর মধ্যে। আরেকটা জিনিস,’ বলে পিছনে ফিরে শুভ্রকান্তিকে ডাকল অনির্বাণ, ‘স্যার, একবার এদিকে আসুন।’
শুভ্রকান্তি এগিয়ে এলেন। অমিতাভ আর শুভ্রকান্তিকে উদ্দেশ্য করে অনির্বাণ বলল, ‘লাশের ডান হাতের তর্জনী আর মধ্যমা লক্ষ করুন। ব্রাউনিশ কিছু দেখতে পাচ্ছেন?’
শুভ্রকান্তি লাশের ডান হাত তুলে ধরে চোখ সরু করে দেখে বললেন, ‘ইয়েস। ব্লাড। সান্যাল, কী মনে হচ্ছে?’
অমিতাভ বললেন, ‘ব্লাড বলেই মনে হচ্ছে। খুনির ব্লাড হতে পারে?’
শুভ্রকান্তি বললেন, ‘সোয়াব নিয়ে নিচ্ছি। বেঞ্জিনাইড টেস্ট করে নেব একটা।’
খুনির ব্লাড স্যাম্পল ছেড়ে যাবার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মনে হয় না। বরং গ্লক ৪২-এ ফোকাস করা যেতে পারে। দুটো কেসে একই বন্দুকের ব্যবহার। ডেফিনিট এটা একটা প্যাটার্ন। অশোক বসুর ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে এসে ফোন করলেন অমিতাভ, ‘জাপান, একটা খবর চাই। ইমিডিয়েটলি।’
‘এখন তো খুব বিজি আছি স্যার। সন্ধের দিকে রিং ব্যাক করি?’
‘শোন ভাই জাপান, বেআইনি কাট্টার ব্যবসা করিস। তবু তোকে ছেড়ে রেখেছি কেন জানিস তো? ঠিক সময়ে ঠিক খবরটা দিবি, তাই।’
ওপাশ থেকে জাপান হাসল, ‘সবসময় হুমকির সুরে কথা শুরু করেন কেন স্যার? কী খবর চাই বলুন না।’
‘গত তিন মাসে গ্লক ৪২ কারা কিনেছে খোঁজ লাগা। অন্তত দশ-পনেরোটা গ্লক একসঙ্গে কিনেছে এমন কাস্টমার।’
‘তারা আমায় নাম ঠিকানা থোড়াই দিয়ে যাবে স্যার। এসব ক্যাশের কারবার, জানেনই তো।’
অমিতাভ বললেন, ‘ফালতু আমড়াগাছি করিস কেন? আমায় কি তোর ভায়রাভাই পেয়েছিস?’
‘গ্লক ৪২ প্রচুর না হলেও ভালোই বিক্রি স্যার। ৪২ আসলে সবচেয়ে ছোট গ্লক। সাবকমপ্যাক্ট। ৬ ইঞ্চিরও কম। হ্যান্ডি। হালকা। অ্যামেচাররাও চালাতে পারে। এত কাস্টমার ধরে ধরে হুলিয়া মনে রাখা সম্ভব, আপনি বলুন তো?’
‘বলছি তো, একসঙ্গে দশ-পনেরোটা যারা কিনেছে।’
‘খবর নিচ্ছি। রাতের মধ্যে জানাচ্ছি।’
.
ন্যাশনাল হাইওয়ে ১৬, সকাল ১১টা ২৫
খানাখন্দ ভরা কাঁচা রাস্তা পেরিয়ে গাড়ি যখন হাইওয়েতে উঠল, দময়ন্তীর ভুরুতে তখনও সেকেন্ড ব্র্যাকেট।
একটু আগেই কসবায় একটা মার্ডারের খবর এসেছে। প্রডিউসার অশোক বসুকে মজন্তালী তাঁর ফ্ল্যাটে গুলি করে খুন করেছে। খুনটা হয়েছে গতকাল। ফরেন্সিক বলছে, অন্তত কুড়ি থেকে বাইশ ঘণ্টা আগে। মজন্তালীর চিরকুট থেকে জানা গেছে, লোকটা নাকি সিনেমায় কাজ দেবার নাম করে মেয়েদের সেক্সুয়ালি এক্সপ্লয়েট করত। তানিয়া অবশ্য জানে দময়ন্তীদি এই মুহূর্তে এই মার্ডারটার কথা ভাবছে না। অপর্ণা সামন্তের থেকে পাওয়া ব্যোমকে দেওয়া খবরটার কথা ভাবছে। এক বছর আগে রেখা ভট্টাচার্যের খোঁজ কে করেছিল? অপর্ণা সামন্ত যেমন বর্ণনা দিলেন, তাতে গায়ের রং বাদ দিলে বাকি ডেসক্রিপশন কিন্তু সুজান জর্ডানের সঙ্গে মিলছে। মাঝারি হাইট। বয়েস চল্লিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ। কোঁকড়া চুল। গায়ের রঙে তফাত। সেটা মেক আপে ম্যানেজ করা কোনও ব্যাপার না। তানিয়া স্বগতোক্তির ঢঙে বলল, ‘রহস্যটা কেমন পেঁয়াজের মতো খোসা ছাড়িয়েই যাচ্ছে, না?’
‘পেঁয়াজ না,’ দময়ন্তী রোদচশমাটা খুলে জামার খুঁট দিয়ে মুছতে মুছতে বলল, ‘আস্ত একটা ব্ল্যাকহোল হয়ে যাচ্ছে।’
‘তাহলে কি বেড়ালের পিছনে আরও বড় কেঁদো বেড়াল বসে আছে, দময়ন্তীদি?’
‘আপাতত ট্রেইল ফলো করা ছাড়া উপায় নেই রে।’
.
স্টার ট্রাইডেন্ট, পার্কিং স্পেস, কসবা, দুপুর ১২টা
সৌমিলি বলল, ‘অশোক বসু লোকটা একেবারে স্কাউন্ড্রেল।’
শিরিন বলল, ‘হুঁ। টলিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিতে কাস্টিং কাউচের মুকুটহীন সম্রাট।’
‘শুনছি নাকি পানুও বানাত।’
‘উফফ! মরেছে তো আপদ গেছে বাবা।’
‘সবে খবর বেরিয়েছে। একটু বাদেই দেখবি স্টারদের আসার ধুম পড়বে। কুমিরের কান্না কাঁদবে সব।’
‘আসতে শুরু করেছে। ওই দ্যাখ অমিত সেনগুপ্ত আর জিনা ব্যানার্জী।’
‘ওরা কি এখন কাপল?’
‘হুমম। হরিনাথ চক্রবর্তীর ফিল্মে কাজ করতে গিয়ে লটকেছে।’
শাক্য গেটের বাইরের গুমটি দোকান থেকে সিগারেট আনতে গেছিল। ফিরে এসে বলল, ‘হ্যাঁ রে, লোকটার ফ্যামিলি মেম্বার কেউ তো এল না এখনও।’
সৌমিলি বলল, ‘বউ-ছেলে সঙ্গে থাকত না শুনেছি। দিনরাত এখানে-সেখানে মুখ মেরে বেড়ালে ফ্যামিলির সঙ্গে আর সম্পর্ক থাকে?’
শাক্য গেটের দিকে আঙুল তুলে বলল, ‘ওই দ্যাখ, পূর্ণেন্দু সরকার না ওটা?’
শিরিন বলল, ‘আমি চিনি না।’
‘আরে সেই প্রোডিউসারটা, যাকে মজন্তালী ডিজিটাল ফ্রড করেছিল।’
‘ও হো! এই সে?’
সৌমিলি বলল, ‘কিন্তু ডিজিটাল ফ্রড তো বলা যায় না ওটাকে। টাকাফাকা মারেনি। ওর নাম করে অ্যাড দিয়েছিল।’
‘আরে, ফোন হ্যাক করেছিল। আইডেন্টিটি থেফট। সেটাও একরকম ডিজিটাল ফ্রডই তো হল।’
শিরিন কথাটা শেষ করার আগেই অপেক্ষারত সাংবাদিকদের মধ্যে একটা মৃদু আলোড়ন জাগল। লিফট থেকে নেমে এগিয়ে আসছেন তদন্তকারী অফিসারেরা। সবাই ঢেউয়ের মতো ধেয়ে গেল লিফটের দিকে।
শিরিনরাও দৌড় মারল।
.
স্টার ট্রাইডেন্ট, পার্কিং স্পেস, কসবা, দুপুর ১২টা ১০
ষাটোর্ধ্ব সিকিউরিটি গার্ডের চোখেমুখে অস্বস্তি প্রকট হয়ে আছে। অমিতাভর প্রশ্নের জবাবে একটু ইতস্তত করে বললেন, ‘আমি যতবার দেখেছি, সঙ্গে মহিলা ছিল। তবে রাতে খুব কম থাকতেন।’
‘মোটামুটি কতক্ষণ থাকতেন?’
‘তিন–চার ঘণ্টা।’
‘সিসিটিভিতে দেখছি অশোকবাবু এই মহিলাকে নিয়ে কমপ্লেক্সে ঢুকছেন ১০ টা ৫০ নাগাদ। তার ঠিক আধ ঘণ্টার মাথায় মহিলা বেরিয়ে গেলেন।’
‘হ্যাঁ স্যার, কালকের ম্যাডামকে আমি বেরোতে দেখেছি।’
‘তাহলে? আপনার মনে হল না এটা একটু বেশি তাড়াতাড়ি?’
‘আমি বুঝতে পারিনি স্যার,’ সিকিউরিটি মুখ নিচু করে বললেন, ‘আসলে এখানে বড় বড় লোকজন থাকেন। তাঁদের বড় বড় ব্যাপার। চালচলনই আলাদা। ঠিক মধ্যবিত্ত বাড়ির মতো তো নয়। এখানে নানা কিছুই হয়। তাই অত মাথা ঘামাই না।’
‘নানা কিছুই হয় মানে?’
‘মানে সময়-টময়ের তেমন বালাই নেই। সেটাই বলছি আরকি।’ সিকিউরিটি মুখে অস্বস্তির ছায়া গাঢ় হল, ‘এমন আগেও হয়েছে। ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না। বেল বাজিয়ে সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। লক ভেঙে দেখা গেল হয়তো ভরপেট ইয়ে খেয়ে বেহুঁশ হয়ে আছেন। এসব এখানে নর্মাল ব্যাপার স্যার। তাই প্রতীক স্যার, মানে অশোক স্যারের অ্যাসিস্ট্যান্ট যখন আজ সকালে এসে বললেন অশোক স্যারের খোঁজ পাচ্ছেন না, আমি প্রথমে খুব একটা চিন্তিত হইনি। কিন্তু তারপর তো দেখা গেল এই কেস।’
‘ঠিক আছে। নাইট শিফটের গার্ডের আসতে আর কতক্ষণ লাগবে? আরেকবার ফোন করুন প্লিজ।’
‘আচ্ছা স্যার।’ গার্ড ভদ্রলোক স্যালুট মেরে পকেট থেকে ফোন বের করলেন।
অমিতাভ একটা সিগারেট ধরিয়ে দেওয়ালে লটকানো প্রপার্টি ম্যাপটা খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন। এই কমপ্লেক্সে তিনটে জি প্লাস টোয়েন্টি ফ্লোরের উইং মিলিয়ে মোট একশো আশিটা ফ্ল্যাট। সবেরই দাম কোটির কাছাকাছি। আজকাল আবার সাউথ ফেসিং ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রে পার স্কোয়ার ফিট কিছু টাকা বেশি পড়ে। সুইমিং পুল, জিমনাসিয়াম, খেলার মাঠ, গার্ডেন স্পেস, বাচ্চাদের জন্য পার্ক সবই আছে। কভারড পার্কিং স্পেসের পাশাপাশি বেসমেন্ট পার্কিংও আছে। প্রপার্টির একেবারে মধ্যিখানে তপোবন নামে একটা জায়গা দেখা যাচ্ছে ম্যাপে। সম্ভবত ছোটখাটো গ্রিনারি তৈরি করেছে। তাকে বেড় দিয়েই তিনটে উইং। চমৎকার প্ল্যান। দুটো মেইন গেটে পর্যাপ্ত সিকিউরিটি। তাছাড়া প্রতি উইংয়েও আলাদা সিকিউরিটি গার্ডের ব্যবস্থা রয়েছে। প্রতিটা ফ্ল্যাটে ইয়েল লক, ইন্টারকম। প্রতিটা ফ্লোরে সিসিটিভি ক্যামেরা। দেখতে দেখতে অমিতাভ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। রিটায়ারমেন্টের পর কি এমন একটা ফ্ল্যাটের কথা ভাবা যেতে পারে? তাঁর অওকাদে পোষাবে?
সিকিউরিটি ভদ্রলোক স্যালুট মারলেন, ‘স্যার।’
ফিরে তাকালেন অমিতাভ।
‘প্রদীপ আর পনেরো মিনিটের মধ্যে চলে আসবে।’
‘বেশ। আপনি আপাতত আপনার ডেস্কে গিয়ে বসতে পারেন। দুপুরের খাওয়া হয়ে গিয়ে না থাকলে খেয়ে নিন। আপনার বয়ান রেকর্ড করা হবে।’
বলে পার্কিং লটের দিকে এগিয়ে গেলেন অমিতাভ। সেখানে পুলিশ লাইনের ভিতরে দাঁড়িয়ে রাহুল আর লোকনাথ, অশোক বসুর অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রতীককে জেরা করছে। লাইনের ওপারে দলবল নিয়ে ধোঁয়া সহযোগে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন ফরেন্সিক এক্সপার্ট শুভ্রকান্তি।
শুভ্রকান্তির খপ্পরে পড়া মানে রিপোর্টারদের পুরো ইয়ে মারা গেল। জারগন ঝেড়ে ঝেড়ে দিনে চাঁদ-তারা দেখিয়ে ছাড়বে। কাছাকাছি পৌঁছে অমিতাভ শুনতে পেলেন আর শুভ্রকান্তি বিপুল উৎসাহে বলে চলেছেন, ‘তাহলে বোঝাতে পারলাম তো? অবশ্য একটা-দুটো কেস স্টাডি দিয়ে সবটা ঠিক বুঝতে পারবেন না। পুরো ব্যাপারটা ভালোভাবে বুঝতে চাইলে আমি আপনাদের ডাঃ বি উমাদাতনের বই সাজেস্ট করব।’
রিপোর্টারদের মুখগুলো ঝুনো নারকেলের মতো হয়ে আছে। দেখে জোর হাসি পেয়ে গেল অমিতাভর।
.
মহাদেবপুর, বাগনান, বেলা ১২টা ৩০
মহাদেবপুর গ্রামে রেখাদের খোঁজ পাওয়া গেল প্রথম চেষ্টাতেই। সেই ঠিকানায় তালাবন্ধ। কিন্তু পাশের বাড়ির এক অশীতিপর বৃদ্ধা নাম শুনেই বললেন, ‘পুরুতঠাকুর বিপিন ভটচায?’
দময়ন্তীর মনে পড়ল দারোগা কুদ্দুসসাহেবও বলেছিলেন রেখার বাবা পুরুত। বলল, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, পুরুতঠাকুর বিপিন ভটচায। তাঁর দুটো মেয়ে ছিল। একটা খুব দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছিল। বিপিনবাবুর এক মেয়েকে…।’
‘বুঝেছি বুঝেছি। এক মেয়ের ইজ্জৎ নিয়ে খুন করে দিয়েছিল। পরে সেই জানোয়ারকে খুন করে আরেক মেয়ে জেলে গেছিল।’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, তাদের কথাই বলছি।’
‘তারা তো চলে গেছে গো অনেকদিন।’
‘কতদিন আগে গেছেন?’
‘ওই রেখা জেল খেটে ফিরে এল, তারপরেই।’ বৃদ্ধা আক্ষেপের গলায় বললেন, ‘বড় ভালো লোক ছিল ঠাকুরমশাই। আমাদের এখানে ওই একঘরই তো বামুন ঠাকুর ছিল। তারই কেমন পোড়া কপাল দেখুন!’
‘কোথায় গেছেন বলতে পারবেন?’
‘তা কি কাউকে বলে যায় গো?’ বৃদ্ধা করুণ গলায় বললেন, ‘কলঙ্কের ভয়ে যে পালায় সে কি কাউকে ঠিকানা বলে যায়? ওরা তো নামও বদলে ফেলেছিল এপিঠওপিঠ করে।’
‘কার নাম পাল্টে ফেলেছিল?’
‘সবার। চারজনেরই নাম পাল্টে ফেলেছিল।’
গাড়িতে উঠে দময়ন্তী বলল, ‘এটা কোন কোর্টের আন্ডারে আসছে তানিয়া? খোঁজ নে তো। বিপিন ভট্টাচার্য আর রেখা ভট্টাচার্য। এই দুটো নামের এগেইন্সটে এফিডেভিট খোঁজ করতে হবে। সাল দু-হাজার এক বা দুই।’
.
ক্যাফে ড্রিমল্যান্ড, বেহালা, বিকেল ৪টে ৩০
বেঞ্জামিন জর্ডান সময় দিয়েছেন বিকেল পাঁচটা। জ্যামের কথা ভেবে হাতে একটু সময় নিয়েই বেরিয়েছিল সৌমিলিরা। কসবা থেকে অফিস ঢুকে লাঞ্চ করে একটু টুকটাক কাজ সেরেই আবার বেরিয়ে পড়েছিল গাড়ি নিয়ে। জ্যাম বিশেষ ভোগায়নি আজ। ফলে ওরা একটু আগে আগেই পৌঁছে গেছে। কলকাতা শহরে বসার জায়গার বড় অভাব। আরাম করে বসতে গেলে গাঁটের কড়ি খসিয়ে খেতে হয়। সৌমিলিরা তাই করল। খিদে তো নেই। দুজনে দুটো কফি নিয়ে বসে গেল।
শিরিন বলল, ‘এই ফরেন্সিক এক্সপার্ট ভদ্রলোককে চিনে রাখলাম। দেখলেই অ্যাবাউট টার্ন মেরে পালাব। তিন-চার ঘণ্টা পরেও আমার মাথাটা কেমন করছে।’
সৌমিলি বলল, ‘হ্যাঁ ভাই। লাস্টে আবার দু-একটা বইয়ের নামও সাজেস্ট করে দিল। বাইট নিতে গেছি না ফরেন্সিকের ক্লাস করতে গেছি?’
‘সুজানের ফ্যামিলি যে প্রেসকে সময় দিতে রাজি হবে সেটা ভাবিনি।’
‘প্রেসকে এখন ওঁদের দরকার, বুঝলি? প্রচুর গরম গরম কথা পাব।’
‘মধ্যপ্রদেশের খবরটা পড়েছিস?’
‘কোন খবরটা?’
‘চার বছরের একটা বাচ্চা ছেলে স্কুলে নিজের সহপাঠী একটা মেয়েকে যৌন হেনস্থা করে গেছে দিনের পর দিন।’
‘চার বছর?’ শিউরে উঠল শিরিন।
‘ইয়েস। চার বছর।’
‘শাক্যর কথাটাই ঠিক রে,’ শিরিন একটা শ্বাস ফেলে বলল, ‘কী শাস্তি দিবি ওই চার বছরের ছেলেটাকে? এই শিশু কোথা থেকে শিখল এসব? কে শেখাল? নিশ্চয়ই ফ্যামিলিতে কাউকে না কাউকে দেখেছে।’
‘হয়তো ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স দেখে দেখেই বড় হচ্ছে।’
‘হানড্রেড পারসেন্ট। যৌন আচরণ মনোবিদদের মতে একটা অর্জিত আচরণ। সুতরাং যৌন নির্যাতনও তাই। ছেলেটা নাকি এমন নিষ্ঠুরভাবে আঙুল বা পেনসিলের মতো জিনিস ব্যবহার করেছে, যা কাউকে না দেখে শেখা যায় না। তাহলে কাকে শাস্তি দিলে বিষয়টা যুক্তিযুক্ত হবে বলে মনে হয় তোর?’
‘এত তর্কের তো জায়গাই থাকছে না। শাস্তি যে একটা ঠেকনা সেটা লীনাকে লেখা চিঠিতে মজন্তালী সরকার নিজেই একরকম স্বীকার করেছে।’
‘লোকে তো অ্যানার্কিটুকুই গ্রহণ করবে, সৌমিলি। নিহিত বার্তাটা কি নেবে? কারণ লোকের কাছে অনেক সহজ, আকর্ষণীয় এবং ফলপ্রসূ মনে হবে মজন্তালী সরকারের খুন-জখম এবং ধ্বংসাত্বক কাজকর্ম। ইউ কান্ট হেল্প দ্যাট। পাবলিককে মাতিয়ে তোলা যত সহজ, পাকিয়ে তোলা ততটাই কঠিন।’
‘মজন্তালী এবার যদি জেন্ডার জাস্টিস নিয়ে একটা পাবলিক ক্রাশ কোর্স চালু করে তাহলে ষোল কলাটি পূর্ণ হয় আর কী।’ খিক খিক করে হেসে কফিতে চুমুক দিয়েই সৌমিলি নাক-চোখ কোঁচকাল, ‘চিনি লাগবে। চিনির পাউচ দিতে বল তো।’
ওয়েটারকে ডাকতে গিয়ে শিরিন দেখল, কাফের দরজা ঠেলে একজন ঢুকছে। মাথায় আর মুখে স্কার্ফ জড়ানো। আর হাতে একটা পিস্তল।
.
শিবপুর মন্দিরতলা, বিকেল ৫টা
হাওড়া জাজেস কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি জাস্টিস তপন রায়চৌধুরীর বাড়িটা ব্রিটিশ বাংলো প্যাটার্নের। দেখেই বোঝা যায় অনেক কালের পুরোনো। তবে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ফলে এখনও খুবই ভালো অবস্থায়। তপনবাবু সাদাকালো বাংলা ছবির ‘বাবা’-দের প্রোটোটাইপ। ব্যাকব্রাশ করা চুল, মোটা কালো ফ্রেমের চশমা, পরনে গাউন। দোতলার সিঁড়ি দিয়ে তাঁকে গটমট করে নেমে আসতে দেখে ছবি বিশ্বাস বা কমল মিত্রের কথা মনে না এসে পারে না। গলাটিও ব্যারিটোন। প্রাথমিক আলাপচারিতার পর দময়ন্তী বলল, ‘একটা জুভেনাইল ক্রাইমের কেসের বিষয় জানতে আপনার কাছে এসেছি। হাওড়ার জুভেনাইল জাস্টিস বোর্ডের তিন সদস্যের কমিটিতে আপনিই ছিলেন একমাত্র জাজ। ফলে আপনার কাছেই এর ঠিকঠাক ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে।’
তপনবাবু বললেন, ‘আমার স্মৃতিশক্তি এমনিতে বেশ ভালো। তবে এত ঘটনার মাঝে কোনও পার্টিকুলার ঘটনা মনে রাখা খুব কঠিন। কবেকার কেস?’
‘আটানব্বই।’
‘ওরে বাবা! অত আগে!’ তপনবাবু চোখ কপালে তুললেন, ‘ছেলেদের হোমের কেস না মেয়েদের হোম?’
‘মেয়েদের। লিলুয়া হোম। এটা মনে রাখার মতো কেস স্যার। রেখা ভট্টাচার্য। বোনের রেপিস্টকে খুন করেছিল মেয়েটা। আমরা পুলিশ রিপোর্ট আর হোমের ফাইলের কপিও এনেছি। যদি লাগে, দেখতে পারেন।’
হাত বাড়িয়ে ফাইলদুটো নিয়ে নিবিষ্ট মনে উল্টেপাল্টে দেখতে লাগলেন তপনবাবু। প্রায় মিনিট দুয়েক দেখার পর মুখ তুললেন, ‘মনে পড়েছে। রেখা। ইয়েস। বেশ কম সময়ে ছাড়া পেয়েছিল মেয়েটা।’
‘সেলফ ডিফেন্স প্লিড করেছিল।’
‘অবভিয়াসলি। না-হলে অত তাড়াতাড়ি ছাড়া পাওয়া কঠিন ছিল।’
‘আমার প্রশ্নটা সেখানেই। লাশের পাশে মেয়েটার হাতে লেখা চিরকুট পাওয়া গেছিল। হাতের লেখা যে মেয়েটার, সেটাও প্রমাণিত হয়েছিল। দ্যাট ইন্ডিকেটস ইট ওয়াজ আ প্ল্যানড মার্ডার। অথচ তার সেলফ ডিফেন্সের দাবি আপনারা গ্রাহ্য করলেন কেন?’
ভুরু কুঁচকে দময়ন্তীর দিকে চেয়ে রইলেন তপনবাবু। আসলে দময়ন্তীকে না, তিনি দেখার চেষ্টা করছেন আঠেরো বছর আগের একটা ঘটনাকে। খানিকক্ষণ পরে বললেন, ‘অ্যাকটাস রিউস, মানে গিল্টি অ্যাক্ট ছিল। মেনস রি, মানে গিল্টি মাইন্ডও ছিল। ওর বোনকে লোকটা রেপ করেছিল। ফলে প্রতিশোধস্পৃহা ছিলই। ইমপারফেক্ট সেলফ ডিফেন্স। তা সত্ত্বেও রেখা বেনিফিট অব ডাউট পেয়েছিল সম্ভবত মূলত এক্সেলেন্ট বিহেভিয়ারের জন্য।’
‘আরেকটু বিশদে যদি বলেন।’
‘রেখার আড়াই বছরের হোমজীবন ছিল অভাবনীয়রকমের ভালো। শি ওয়াজ ব্রিলিয়ান্ট ইন এভরি অ্যাসপেক্ট। আমার যতদূর মনে পড়ছে ইন্সটিটিউট অব সায়কিয়াট্রি থেকে মেয়েটির সাইকোলজিকাল প্রোফাইলিং করানো হয়েছিল। তারপরেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আপনারা হোমের ফাইলে তার সার্টিফিকেট পাননি?’
‘পেয়েছিলাম। কিন্তু ইন্সটিটিউট অব সায়কিয়াট্রির সার্টিফিকেটই কি সোললি এফেক্ট করল আপনাদের সিদ্ধান্তকে? সাইকোলজিকাল টেস্টকে ফাঁকি দেওয়া কি একেবারেই অসম্ভব?’
‘আপনার দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর কোনও মনোবিদই দিতে পারবেন। আর প্রথম প্রশ্নের উত্তরটা আমার পক্ষে এতদিন পরে ঠিকঠাক মনে করে বলা কঠিন। তবে আমার যতদূর মনে পড়ে, জুড়ি মেম্বারদের পারসোনাল বায়াসও কাজ করেছিল। আমাদের মনে হয়েছিল চাইল্ড কোর্টে কেস দিলে এত ব্রাইট একটা মেয়ে কোনওদিন মূলস্রোতে ফিরতে পারবে না।’
দময়ন্তী তানিয়ার সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় করল। তারপর একটু গম্ভীর গলায় বলল, ‘বেগ ইয়োর পারডন স্যার। আপনাদের আঠেরো বছর আগের সেই সিদ্ধান্তই সম্ভবত আজ একটা বিষবৃক্ষের জন্ম দিয়েছে।’
মোটা ফ্রেমের ওপাশে যুগপৎ চঞ্চল ও বিচলিত হয়ে উঠল জাস্টিস তপন রায়চৌধুরীর চোখজোড়া, ‘কেন অফিসার? রেখা কি কিছু করেছে?’
‘হ্যাঁ স্যার, আমরা একটা অত্যন্ত জরুরি কেসের রেফারেন্সে রেখার খোঁজ করছি।’
‘কোন কেস?’
‘পশ্চিমবঙ্গে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় কেস যেটা।’
.
ক্যাফে ড্রিমল্যান্ড, বেহালা, বিকেল ৫টা ১২
টেবিল এবং টেবিলের নীচে এখনও চাপ চাপ রক্ত। মোছা হয়নি। আধখাওয়া খাবারের প্লেট সেভাবেই পড়ে। কাফের কর্মী এবং কাস্টমারদের আতঙ্কের ঘোর কাটেনি।
কাস্টমার কমই ছিল। এই মুহূর্তে সৌমিলি আর শিরিন ছাড়া কেউ নেই সেখানে। থাকার কথাও নয়। সৌমিলিরা আছে প্রফেশনাল তাগিদে। কারণ কাফের দরজার কাছেই খুঁজে পাওয়া গেছে মজন্তালী সরকারের নামাঙ্কিত কাগজ। সৌমিলিই আবিষ্কার করেছে সেটা। কাগজটায় লেখা আছে—অ্যাসিড অ্যাটাকের শাস্তি। নীচে মজন্তালী সরকারের নাম।
আততায়ীকে আটকাতে গিয়ে জখম হয়েছে কাফের সিকিউরিটি গার্ড। চোয়ালে একটা মোক্ষম আপার কাট ঝেড়ে মহিলাটি তাকে ধরাশায়ী করে গেছে। পুলিশ এসেই তাকে নিয়ে পড়েছে। প্রেস কার্ড দেখিয়ে অ্যাক্সেস করে নিয়েছে সৌমিলিরা। শিরিন ফোনেই ছবি নিয়ে নিচ্ছে। দরকার বুঝলে ভিডিও রেকর্ড করে নিচ্ছে মাঝেসাঝে।
জাঁদরেল চেহারার গুঁফো এক ইনস্পেকটরের জেরায় জেরবার হচ্ছে কাফের সিকিউরিটি গার্ড। ‘তোমার কাছে তো বন্দুক আছে! আটকাতে পারলে না?’
গালে বরফ ঘষতে ঘষতে ব্যাজার মুখে গার্ড বলল, ‘বন্দুক তোলার টাইম দিলে তবে তো!’
‘আশ্চর্য! ভিতরে এসে যখন গুলি করল তখন বুঝতে পারোনি তুমি?’
‘আমি তো বন্দুকের আওয়াজ শুনতেই পাইনি।’ সিকিউরিটি গার্ড মিইয়ে যাওয়া গলায় বলল, ‘বন্দুকে সাইলেন্সার লাগানো ছিল নিশ্চয়ই। আমি তো চিৎকার চেঁচামেচি শুনে বুঝলাম কিছু একটা গোলমাল হয়েছে। ভেতরে ঢুকতে যাব, তার আগেই মেয়েটা হুড়মুড়িয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে এল। বেরিয়েই আমাকে এক ঘুষি। এত তাড়াতাড়ি সবকিছু ঘটল! আমি গলা দিয়ে একটা আওয়াজও বের করতে পারিনি স্যার।’
সৌমিলি বলল, ‘উনি ঠিক বলছেন স্যার। ওর দোষ নেই। বন্দুকে সাইলেন্সার লাগানো ছিল।’
গুঁফো ইনস্পেকটর রসিকতার ভঙ্গিতে সৌমিলিকে বললেন, ‘আপনারাও কিছু কম সুপারপাওয়ারের অধিকারী নন ম্যাডাম। ঠিক সময়ে ঠিক জায়গায় পৌঁছে যান কী করে বলুন তো?’
সৌমিলি হাসল, ‘প্রেসের চাকরি স্যার।’
‘আপনারা চলে যাবেন না যেন। আইউইটনেস হিসেবে আপনাদেরও বয়ান নেওয়া হবে। সিআইডি কর্তাদের খবর দিয়েছি। তাঁরা এসে পড়বেন এখনই।’ বলে ইনস্পেকটর ব্যস্ত হয়ে পড়লেন কাফের বাকি স্টাফদের নিয়ে।
শিরিন ভিডিও করা ছেড়ে ভুরু কুঁচকে দাঁড়িয়ে ছিল। সৌমিলিকে এগিয়ে আসতে দেখে বলল, ‘ছেলেটার সঙ্গে একটা মেয়ে বসেছিল, তাকে ভালো করে খেয়াল করেছিলি?’
‘হ্যাঁ, ছেলেটার টেবিলেই বসেছিল। কেন বল তো?’
‘কোথায় গেল মেয়েটা? গন্ডগোল থামার পর আর দেখতে পেয়েছিস?’
সৌমিলি বিভ্রান্ত মুখে বলল, ‘কেন বল তো?’
‘আমি দেখেছি। সবচেয়ে আগে পালিয়েছে মেয়েটা। এবং বিন্দুমাত্র সময় নেয়নি। বন্ধু হলে কি আহত বন্ধুকে ফেলে ওভাবে পালাবে?’
সৌমিলির চোখ বড় বড় হয়ে গেল। একটু ভেবে বলল, ‘ব্লাইন্ড ডেট হতে পারে।’
‘যদি-না?’
‘যদি-না সে তৈরি থাকে।’
.
সুপ্রিম হসপিটাল, কলকাতা, সন্ধে ৬টা ৩০
অমিতাভকে ফোন সেরে এসেই রাহুল দেখল দময়ন্তী আর তানিয়া হন্তদন্ত হয়ে হসপিটালের লাউঞ্জের দিকে আসছে। রাহুল এগিয়ে গেল। বলল, ‘এর মধ্যে চলে এলে?’
তানিয়া বলল, ‘দময়ন্তীদি আজ সবকটা সিগনাল ভেঙেছে।’
‘কাউকে উড়িয়ে দিইনি এই ভাগ্যি!’ দময়ন্তী বলল, ‘কী আপডেট এদিকে?’
‘ছেলেটাকে আইডেন্টিফাই করা গেছে। তিয়াসা পৈলান কেসের আসামি। সেলিম মণ্ডল। সোনারপুর থানা কনফার্ম করেছে।’
‘তিয়াসা পৈলান মানে সেই অ্যাসিড অ্যাটাক কেস?’
‘হ্যাঁ। বদমাইশটা ফেরার ছিল।’
‘এখন কেমন আছে?’
‘আউট অব ডেঞ্জার।’
‘পালানোর চেষ্টা করতে পারে। গার্ড রেখেছিস তো?’
‘লোকাল পুলিশকে বলে তিনজন গার্ড ফিট করে দিয়েছি। এছাড়া স্যার আমাদের দুজন কনস্টেবল দিয়ে দিতে বললেন।’
‘স্যার কোথায়?’
‘কাফেতে গেছিলেন।’
‘একদিনে ডবল ধমাকা! ক্যাটওম্যান কি বসতে দেবে না রে?’
‘টেকনিক্যালি একদিনে না। অশোক বসুর খুনটা কালকে হয়েছে। তোমাদের ওদিকে কী খবর?’
‘রেখা ভট্টাচার্য এখনও পর্যন্ত একেবারে খাপে খাপ। কোর্ট থেকে একটা ইনফরমেশন আসার অপেক্ষা।’
.
বালিগঞ্জ প্লেস, সন্ধে ৭টা
শাক্য বলল, ‘সিডিউস করে নিয়ে গিয়ে গুলি করার থিওরিটা পাবলিক খুব খাবে কিন্তু।’
শিরিন বলল, ‘একটা সিনেমার মধ্যে বাস করছি মনে হচ্ছে।’
‘সে আর বলতে!’ সৌমিলি বলল, ‘বারোই সেপ্টেম্বর যে কিছু-একটা হচ্ছেই, আজ আমি নিঃসন্দেহ হলাম।’
রণ এতক্ষণ নিজের ডেস্কে চুপচাপ বসেছিল। এবার মুখ খুলল, ‘তোরা সিরিয়াসলি ভাবছিস বারোই সেপ্টেম্বর অবধি এই মহিলা সময় পাবে এইসব উচ্চিংড়েপনা করার?’
‘তার আগেই ধরা পড়ে যাবে বলছিস?’
‘পুঁটিমাছ অল্প জলেই ফরফর করে। অ্যামেচার ক্রিমিনালের এলেম কদ্দূর? যত লাফানিঝাঁপানি বেশি, তত ভুল করার সম্ভাবনাও বেশি। অনেক তাস অলরেডি ওপেন হয়ে গেছে। স্রেফ খোঁচর লাগিয়েই মজন্তালীর ল্যাজের খবর বেরিয়ে আসবে। দ্যাখ না।’
শাক্য মুখ টিপে বলল, ‘ফর দ্য ফার্স্ট টাইম, রণ কিন্তু বুদ্ধিমানের মতো কথা বলেছে।’
শিরিন বলল, ‘আচ্ছা একটা কথা বল, মজন্তালী সরকার যদি ধরা পড়ে, গভর্নমেন্ট নিশ্চয়ই ফাঁসিটাঁসিই দিতে চাইবে তাকে? তখন কি আমরা মজন্তালীর সপক্ষে জনমত গড়ব?’
সৌমিলি বলল, ‘অবশ্যই। লোকজনের বাইট নেব। জনতার আদালত বসিয়ে দেব। হরতাল, চাক্কাজ্যাম সব।’
শিরিন বলল, ‘এবং ফাইনালি মজন্তালীকে শহিদ বলে ডিক্লেয়ার করে ব্যাকগ্রাউন্ডে “অ্যায় মেরে বতন কে লোগো” চালিয়ে ক্লোজ আপে ফাঁসির ফান্দা দেখিয়ে কান্নাকাটি করব। তাই তো? সেটা কিন্তু ধনঞ্জয়ের ফাঁসির মতোই একটা কুৎসিত পাবলিক কার্নিভাল হবে। দেখতে যতই উল্টো লাগুক।’
রণ বলল, ‘ধনঞ্জয়ের সঙ্গে বিষয়টা এক করে দেখছিস কেন বুঝলাম না। ধনঞ্জয়ের ক্ষেত্রে পাবলিক সেন্টিমেন্ট পুরোটাই বিপক্ষে ছিল।’
শিরিন বলল, ‘পক্ষে হোক বা বিপক্ষে, আউটপুটের দিক থেকে তফাত আছে কি কিছু? ভালো করে ভেবে দ্যাখ তো। দশ বছর আগে আমরা মিডিয়ায় ছিলাম না। কিন্তু মিডিয়া মিডিয়াতেই ছিল। আমরা সম্ভবত আবার ওরকমই একটা কুৎসিত পাবলিক কার্নিভাল দেখতে চলেছি।’
রণ বলল, ‘মিডিয়া দায় এড়াতে পারে না ঠিকই, সরকার এড়াতে পারে? গ্লোবাল প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে ভারত একশো চল্লিশ। তার দায়ও কি মিডিয়ার?’
শিরিন হাসল, ‘তুই কি আচ্ছে দিনের অপেক্ষায় দিন গুনছিস?’
রণ হাত মুঠো করে বলল, ‘এবার আর থামানো যাবে না ভাই। আচ্ছে দিন আসছেই।’
‘গুজরাট ভুলে যাস না। গদি বদল হলে যদি ভাবিস বাকস্বাধীনতার পথ চওড়া হবে, মূর্খের স্বর্গে বাস করছিস।’
‘তাহলে মুক্তির উপায় কী?’ রণ মুখ বেঁকাল, ‘তোদের বিপ্লবী মহিলাটি ভোটে দাঁড়াবেন? দাঁড়াতে বল। আমি ভোট দেব। আবকি বার মজন্তালী সরকার বলে স্লোগানও দেব শালা! দাঁড়াবে? দাঁড়াবে না তো! তাহলে তো মুখোশ খুলতে হবে। অনেক দায়িত্ব নিতে হবে।’
শাক্য ফ্যাক করে হেসে বলল, ‘তোর মজন্তালী সরকারের ওপর এত খার কেন রে?’
‘কারণ সে একটা পাগল ক্রিমিনাল,’ রণ বলল, ‘তাকে তোরা ফোকটে বিপ্লবী বানাচ্ছিস।’
‘চমৎকার হচ্ছে রণ,’ হাততালি দিল সৌমিলি। গলায় ব্যঙ্গ, ‘বাধ্য, দায়িত্ববান নাগরিকের মতোই কথা বলছিস। রাষ্ট্র তোর মতো নাগরিকই চায়।’
রণ উত্তেজিত হয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল। আঙুল তুলে বলল, ‘শোন, আমার মতো কম-বোঝা লোকই দেশে বেশি। দেশটাকে চিনতে শেখ। এদেশের আশি ভাগ মানুষ বুঝতে পারছে না মজন্তালী সরকার কী বলতে চাইছে, কী করতে চাইছে। হুব্বা শ্যামলের সঙ্গে মজন্তালী সরকারের তফাত জিগ্যেস করলে বলতে পারবে না। আমার কথা লিখে রাখ, মহিলা কিচ্ছু ছিঁড়তে পারবে না। তোদের বিপ্লবী তোদের মতোই কুয়োর ব্যাঙ। তোরা যারা বিশ্বাস করছিস মজন্তালী সরকার সব পাল্টে দেবে, তারা ডেফিনিটলি মূর্খের স্বর্গে বাস করছিস।’
.
গোলপার্ক, কলকাতা, সন্ধে ৭টা ১৫
লীনা ফুটপাথে কানের দুল, মাথার ক্লিপ ইত্যাদি দেখছিল। এমন সময় কানের কাছে কে যেন বলে উঠল, ‘কেমন আছেন?’
লীনা মুখ ফিরিয়ে দেখল, সিআইডির রাহুল সেনগুপ্ত।
ভদ্রতার হাসি হেসে লীনা বলল, ‘ভালো। আপনি এদিকে?’
‘ডিউটিতে এসেছিলাম।’ রাহুল উল্টো ফুটপাথের দিকে আঙুল দেখাল, ‘ওইখানে লস্যি খাচ্ছিলাম। আপনাকে দেখতে পেয়ে ভাবলাম ডাকি।’
‘বেশ বেশ,’ হাতের জিনিসগুলো নামিয়ে রেখে লীনা বলল, ‘তারপর বলুন, তদন্ত কেমন চলছে?’
‘এখনও অন্ধকারে হাতড়াচ্ছি বলা যায়।’
‘কালকের লোকটা মারা যায়নি, না?’
‘কোন লোকটা?’
‘বেহালার কাফেতে যার ওপর মার্ডার অ্যাটেম্পট হল?’
‘না, মারা যায়নি। এখন আউট অব ডেঞ্জার।’ তর্জনী দিয়ে সানগ্লাসটা পিছনে ঠেলে রাহুল বলল, ‘শুনে নিশ্চয়ই খুশি হলেন না?’
রাহুলের বলার ভঙ্গিতে লীনা হেসে ফেলল, ‘সে তো বলাই বাহুল্য। তবে এই মার্ডার গেমে আমি বিশ্বাসী নই।’
‘মজন্তালী সরকার শুনলে দুঃখ পাবেন যে আপনি তাকে পুরোপুরি সাপোর্ট করেন না।’
‘কিন্তু আপনাদের মতে তো আমিই মজন্তালী!’ বলে মুখে হাত চাপা দিয়ে হাসতে শুরু করল লীনা।
রাহুল অপ্রতিভ হল না। নিঃস্পৃহ গলায় বলল, ‘আমাদের সন্দেহের তালিকা থেকে কেউই মুক্ত নয়।’
‘আপনারা সবসময় এরকম ডিপ্লোম্যাটিক জবাব দেন কেন বলুন তো?’
রাহুল মুচকি হাসল, ‘বোঝেনই যখন, কাইন্ডলি আর জিগ্যেস করে লজ্জা দেবেন না।’
লীনা ভালো করে লক্ষ করল লোকটাকে। সাদা বুশ শার্ট আর নীল জিন্সে বেশ লাগছে। লোক না বলে ছেলে বলাই ভালো। কত বয়েস হবে? সাতাশ-আঠাশ বড়জোর। গালে হালকা স্টাবল। যেদিন বাড়ি গেছিল, সেদিন যতদূর মনে পড়ছে ক্লিন শেভন ছিল। সেটাই ভালো ছিল। দাড়িতে একটুও মানাচ্ছে না। কথাটা ছেলেটাকে বলতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু মনে হলেই তো সেটা বলা যায় না সবসময়। লীনা হাসি চেপে বলল, ‘তা আপনাকে বুঝি আমার ওপর নজর রাখতে বলা হয়েছে?’
‘তাহলে কি এসে দেখা দিতাম? আপনি টেরটিও পেতেন না।’
‘আচ্ছা ওই ভদ্রলোক কি আপনার সঙ্গে আছেন?’
রাহুল অবাক হয়ে বলল, ‘কে?’
‘ওই যে ওই লোকটা! তখন থেকে দেখছি তাকিয়ে আছেন!’
রাহুল লীনার আঙুল অনুসরণ করে দেখল, সুকুমারদা। গাড়ির বনেটে আলগা ঠেসান দিয়ে দাঁড়িয়ে এদিকেই তাকিয়ে আছে।
‘হ্যাঁ। আমার কলিগ। সুকুমারদা।’
‘তাই বলুন। আমি ভাবলাম কে রে বাবা তাকিয়ে আছে!’ লীনা হাসতে হাসতে বলল, ‘অবশ্য আমার দিকে এখন অনেকেই তাকায়। ছোটখাটো সেলেব্রিটি হয়ে গেছি।’
কথা বলতে বলতে ওরা দুজন ফুটপাথে নেমে এল। লীনা বলল, ‘দময়ন্তীদি ভালো আছেন?’
‘হ্যাঁ। ভালো আছেন। আপনাকে খুব পছন্দ করেন উনি।’
‘তাই?’
‘হ্যাঁ। প্রায়ই আপনার কথা বলেন। বলেন যে আপনি ওঁর কাছে ইন্সপিরেশন।’
লীনা শুনে চুপ করে গেল। তারপর রাহুলের দিকে তাকিয়ে কাটা কাটা উচ্চারণে বলল, ‘আমায় গ্লোরিফাই করবেন না প্লিজ। তাতে বিষয়টাকে অহেতুক গুরুত্ব দেওয়া হয়। টেক ইট ইজি।’
রাহুল থমকে গেল, ‘আমি ঠিক ওভাবে…।’
‘আমি জানি। জাস্ট বললাম। কত কথা, কত কাজই তো আমরা অজান্তে বলে ফেলি বা করে ফেলি।’
‘বুঝতে পেরেছি। আপনি ঠিকই বলেছেন। আমায় ক্ষমা করবেন।’
‘ছাড়ুন!’ তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে হাত নাড়াল লীনা। তারপরেই আচমকা উল্টোদিকে ফিরে হাঁটা মারল। ফিরে তাকাল না আর।
রাহুল ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে রইল ভিড়ে ভিড়াক্কার ফুটপাথের মাঝখানে।
.
ভবানী ভবন, রাত ৮টা
দময়ন্তী ডায়েরি বন্ধ করে বলল, ‘আমাদের সামনে এখন পাঁচটা সুতো ঝুলছে তাহলে। লীনা দাশগুপ্ত, লিলি জর্ডান, সুচেতা দত্ত, তিয়াসা পৈলান আর রেখা ভট্টাচার্য।’
তানিয়া এলোমেলো চুলকে বাগে আনতে আনতে বলল, ‘এতগুলো সুতো! এর মধ্যে মাত্র একটাই জেনুইন!’
‘ইয়েস। অনেকগুলো সাপ, একটাই সিঁড়ি।’
‘আমি খেই রাখতে পারছি না, দময়ন্তীদি।’ তানিয়া মাথায় হাত দিয়ে বলল, ‘ইটস গেটিং অন মাই নার্ভস। এত ক্যারেক্টার, এত প্যাঁচ, এত সাবপ্লট! সব গুলিয়ে যাচ্ছে।’
‘ডায়েরিতে নোট নেওয়া অভ্যেস করো বৎস! পেন অ্যান্ড পেপারের কোনও বিকল্প নেই।’
‘কাল সকালে তিয়াসা পৈলানের বাড়ি যাচ্ছি তো?’
‘হ্যাঁ। দশটা। তোকে তোদের বাসস্ট্যান্ড থেকে তুলে নেব।’
‘আচ্ছা দময়ন্তীদি, জয়েন্ট সিপির সিআইডিতে আসার ব্যাপারে আর কোনও উচ্চবাচ্য তো শুনছি না?’
‘কী জানি। রিটন অর্ডার তো কিছু বেরোয়নি এখনও। ওগুলো মুখে মুখে চাউর হয়েছিল। আমলা-মহলে ট্রান্সফার রিউমার ফেল করে না। তবে অমিতাভ স্যার শুনেছি এডিজি, ডিজির কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এলেও এই কেসে জুড়ে দেওয়া হবে, এমন এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে না।’
.
সন্তোষপুর, রাত ৯টা ১০
রাহুল জুতো খুলতে খুলতে শুনল, ঘরে খবর চলছে। মুখ্যমন্ত্রী বলছেন, ‘নিরাপত্তায় গলতি ছিল। আমরা তদন্ত করছি। সুরক্ষা নিয়ে কোনও সমঝোতা নয়। তবে এই নিয়ে অহেতুক বিতর্ক তৈরি করার প্রয়োজন নেই।’
সাংবাদিক বললেন, ‘ফেসবুক ভিডিওয় মজন্তালী সরকার জানিয়েছে, কোনও নাশকতা ঘটানোর ছক তার ছিল না। এটা কতদূর সত্যি বলে মনে করছেন আপনি?’
‘দেখুন, এগুলো তদন্তকারী অফিসাররা বলতে পারবেন।’
‘মজন্তালী সরকার ধরা পড়ছেন না। এই ব্যাপারে কী বলবেন?’
‘আমি এটুকুই বলতে পারি যে আমাদের সবচেয়ে যোগ্য অফিসারেরা তদন্ত করছেন। আশা করি খুব তাড়াতাড়িই অপরাধী ধরা পড়বে।’
রাহুল ঘরে ঢুকে বিনা বাক্যব্যয়ে রিমোট নিয়ে টিভির ভল্যুম কমিয়ে দিল।
অসময়ে ধ্যান ভেঙে যাওয়া তপস্বীর মতো গর্জে উঠলেন কমল সেনগুপ্ত, ‘কী হল? খবরটা শুনছি তো!’
‘সারাদিন একই খবর শুনতে শুনতে বোর হও না একটুও?’
‘তুই তো এসে আপডেট জানাস না কিছু। অগত্যা নিউজ চ্যানেলগুলো থেকেই জানতে হয়।’
‘তুমি কি আমার বস যে তোমায় আপডেট দেব?’
‘একটু কিছু তো জানানোই যায়। কাদের সন্দেহ করছিস, তদন্ত কোন পথে এগোচ্ছে—এইসব।’
‘কী মুশকিল! বাড়ি এসেও ক্রাইম আর ক্রিমিনাল নিয়ে আলোচনা করব?’
‘সিআইডি অফিসারের বাপ হয়ে এটুকু প্রিভিলেজ তো পেতেই পারি। আমি তো আর পাড়ার চায়ের দোকানে গিয়ে সব রাষ্ট্র করে দিচ্ছি না। তাছাড়া তোদের দ্বারা তো কেস সলভ হবে বলে মনে হচ্ছে না। ভবানী ভবনে ঢুকে ভিডিও দেখিয়ে আসবে? ছ্যাবলামি হচ্ছে?’
রাহুল রাগতে গিয়েও হেসে ফেলল।
কমলবাবু চটে গেলেন, ‘হাসছিস? নিরাপত্তায় এত গলতি থাকে কী করে শুনি? কীসের সিআইডি তোরা?’
রাহুল গম্ভীর গলায় বলল, ‘শোনো, তোমায় তদন্তের এক্সক্লুসিভ খবর দিতে না-পারলেও, একটা এক্সক্লুসিভ জিনিস দিতে পারি। যদি মুখ বন্ধ রাখো, তবেই।’
কমলবাবু একটু থিতিয়ে গেলেন। সতর্ক গলায় বললেন, ‘কী?’
‘শ্রীকৃষ্ণ থেকে রাবড়ি এনেছি। দুটো ভাঁড় আছে। মা-কে কি দুটোই দিয়ে দেব, নাকি একটা দেব?’
কমলবাবু খানিকক্ষণ খর চোখে চেয়ে রইলেন। তারপর একগাল হাসলেন, ‘ন্যাকামো করিস না। দে।’
‘এখনই খাবে? সওয়া ন’টা বাজে কিন্তু।’
‘হ্যাঁ। মা মাসিকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেছে। ফিরে আসবে যে-কোনও সময়। তাড়াতাড়ি দে।’
রাহুল ব্যাগ খুলে প্যাক করা দুটো ভাঁড়ের একটা এগিয়ে দিল বাবার দিকে।
হাসিমুখে ভাঁড়টা হাতে নিয়ে কমলবাবু বললেন, ‘একটা চামচ এনে দে না।’
রাহুল রান্নাঘর থেকে চামচ এনে দিল।
রাবড়ির সরে চামচ ডুবিয়ে কমলবাবু উদ্ভাসিত গলায় বললেন, ‘তোদের তো তাহলে অনেকগুলো সাসপেক্ট রে।’
‘হ্যাঁ, তা তো বটেই। খুব সহজ কেস তো নয়।’
‘কিন্তু লীনা মেয়েটাকেও কি তোরা সন্দেহ করছিস?’
‘অবশ্যই। ও তো প্রাইম সাসপেক্ট।’
‘নে। তুইও একটু নে।’ কমলবাবু চামচ বাড়িয়ে দিলেন।
রাহুল নিল।
ভর্তি গাল আর তৃপ্ত মুখ তুলে কমলবাবু বললেন, ‘মেয়েটা কিন্তু ভারি মিষ্টি। কী বলিস? তোর কেমন লাগে ওকে?’
রাহুল বিষম খেতে খেতে কোনওমতে সামলাল।
.
.
