চতুর্দশ দিন
তারিখ : ১৫ আগস্ট, ২০১৩
রবীন্দ্র সদন, সকাল ৯টা ৪৫
রবীন্দ্র সদনের সিঁড়িতে লোকে প্রেমিকার সঙ্গে বসে। রাহুল সকাল সকাল বসেছিল সোর্সের সঙ্গে। চুইয়িং গাম চিবাতে চিবাতে সুড়ুঙ্গে মধ্যবয়সি লোকটা বলল, ‘জায়গাটার নাম জুতোগ্রাম।’
রাহুল ভুরু কুঁচকে বলল, ‘জুতোগ্রাম? এ-কেমন নাম?’
‘ওটাই নাম হয়ে গেছে স্যার। বারাসাত থেকে দত্তপুকুরের দিকে যেতে দীঘার মোড়ে নেমে সাহারা কোম্পানি বললেই দেখিয়ে দেবে লোকে। প্রায় শ-খানেক কারখানা। বড় বড় সমস্ত কোম্পানির কমদামি জুতোগুলো সব ওইখানেই তৈরি হয়। ওখানে গিয়ে বীরুদার কারখানা বলবেন, দেখিয়ে দেবে।’
‘এইটা ক্লিক করলে স্যারকে বলে তোমায় অফিশিয়াল খোঁচর করে দেব গণশাদা,’ লোকটার হাতে চারটে পাঁচশোর নোট গুঁজে দিয়ে রাহুল বলল, ‘মাসমাইনে পাবে। লাইফ সেট।’
.
সল্টলেক, সকাল ৯টা ৫০
অমিতাভ সবে স্নান সেরে এসে গা মুছছিলেন, এমন সময় রাহুলের ফোন এল, ‘স্যার, ফুটওয়ার ডিজাইন নামে একটা কোর্স আছে, জানেন?’
‘না। কেন বলো তো?’
‘আমিও জানতাম না। সত্যি বলতে কী, ভাবিইনি কখনও। ভাবলে ব্যাপারটা আরও আগে মাথায় আসত। কারণ ভবানী ভবনের স্ক্যানার ঠিকঠাকই কাজ করছে।’
‘কী বলছ একটু ঝেড়ে কাশবে?’
‘কেউ জুতোর নীচে গর্ত করে সেখানে যদি কিছু নিয়ে ঢোকে, স্ক্যানারে ধরা পড়বে?’
অমিতাভর কোঁচকানো ভুরু প্রথমে টানটান হল, তারপর একসাথে উঠে গেল উপরদিকে। ফোনের ওপারে রাহুল সেটা দেখতে পেল না। কিন্তু অমিতাভর প্রচণ্ড উত্তেজিত গলা আছড়ে পড়ল তার কানে, ‘জুতো! ইয়েস! জুতো! কোনও লিড পেয়েছ?’
‘হ্যাঁ স্যার। দত্তপুকুর থেকে একটি জুতো-শিল্পীকে তুলব।’
‘কিন্তু আজ তো স্বাধীনতা দিবস। ফ্যাক্টরি ছুটি না তো? খোঁজ নিয়েছ?’
‘খোলা আছে। পতাকা তুলে তারপর কাজ হবে। এরা ছুটিফুটি দেয় না।’
‘বেশ। বেরোচ্ছি। কজন লাগবে?’
‘সব মিলিয়ে জনাপনেরো হলেই হয়ে যাবে।’
‘ডান। বারাসাত চাঁপাডালি মোড়ে মিট করছি। দেড় ঘণ্টা ধরে রাখো।’
.
বারাসাত চাঁপাডালি মোড়, সকাল ১১টা ২০
তিনটে আলাদা গ্রুপে মোট ষোলজন অফিসার এসে হল্ট নিলেন বারাসাত চাঁপাডালি মোড়ে।
আজ স্বাধীনতা দিবস। চারদিকে খুশি-খুশি ভাব। গান-টান বাজছে। দোকানে-দোকানে স্পেশাল অফার। স্পেশাল দিনে স্পেশাল ব্রেকথ্রু পেয়ে অমিতাভর মনে উত্তেজনা তুঙ্গে। সবার উদ্দেশে বললেন, ‘আমরা দুটো দলে ভাগ হয়ে দু-দিক থেকে ঢুকব। ফ্রন্ট লিডে থাকছি আমি, তানিয়া আর লোকনাথ। রিয়ারগার্ডে উল্টোদিক থেকে আমাদের কভার করবে দময়ন্তী, রাহুল, সুকুমাররা। দ্বিতীয় টিম ওখানে কাউকে কিছু জিগ্যেস করবে না। অনলাইনে আমাদের লোকেশন ফলো করে উল্টোদিক থেকে এন্ট্রি নেবে। একই কারখানা সম্বন্ধে এত জিজ্ঞাসাবাদ হলে খবর হয়ে যেতে পারে।’
কন্সটেবলরা পাঁচজন করে দু-দলে ভাগ হয়ে গেল। ন্যাশনাল হাইওয়ে ১১২ ধরে দুটো দুধসাদা বোলেরো রওনা দিল দত্তপুকুর দীঘার মোড়ের দিকে।
দীঘার মোড়, বেলা ১১টা ৫০
‘জেঠু, গোপালকে কোথায় পাব?’
বৃদ্ধ ভদ্রলোক কমবয়সি মেয়ে দেখে একটু চেয়ে রইলেন। তারপর আঙুল তুলে ভিতরের ঘরের দিকে নির্দেশ করলেন।
ভিতরের ঘরে দরজা নেই। উঁকি মেরে তানিয়া দেখল, একটি ছেলে বসে স্কেল আর পেন্সিল দিয়ে জুতোর সোলের ওপর দাগ কাটছে।
‘তুমি গোপাল?’
ছেলেটি মুখ তুলে মহিলা দেখে একটু চমকে গেল, ‘হ্যাঁ।’
‘হ্যাপি ইন্ডিপেন্ডেন্স ডে।’
গোপাল ভড়কে গেল। আমতা আমতা করে বলল, ‘হ্যাপি ইন্ডিপেন্ডেন্স ডে। আপনি?’
‘আমার একটা স্নিকার চাই। কাস্টমাইজড। আমাকে একজন বলল, তুমি অর্ডার অনুযায়ী স্পেশাল ডিজাইন করে দিতে পারবে।’
‘কীরকম ডিজাইন?’
তানিয়ার পিছন দিয়ে উঁকি মারলেন অমিতাভ, ‘সোলের কাছটা একটা গর্ত চাই, যেখানে ছোটখাটো কিছু রাখা যাবে। তুমি তো এর আগে এরকম কাজ করেছ শুনলাম।’
গোপাল ঝট করে উঠে দাঁড়াল বটে, কিন্তু ঢোঁক গেলার চেয়ে বেশি কিছু করে উঠতে পারল না। কারণ দু-দুটো রিভলভার ততক্ষণে তাকে চোখ রাঙাচ্ছে।
.
ভবানী ভবন, দুপুর ৩টে
এডিজি অমিতাভর হাতে আলতো করে চাপড় মারলেন, ‘ইটস আ হিউজ ব্রেকথ্রু, অমিতাভ। ভেরি ওয়েল ডান।’
অমিতাভ সহর্ষে বললেন, ‘এই লিডটা কিন্তু রাহুল এনেছে স্যার।’
এডিজি রাহুলের পিঠ চাপড়ে দিলেন, ‘কৌশিকের যোগ্য ছাত্র। ব্র্যাভো।’
রাহুল সলজ্জ হেসে বলল, ‘কিন্তু এ-ও ওই এক তিরিশ বছর বয়সি মহিলার গপ্প শোনাচ্ছে।’
ভারি প্রফুল্ল দেখাচ্ছিল প্রবীর চক্রবর্তীকে। ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে বললেন, ‘এ হার্ডকোর ক্রিমিনাল না। পাকেচক্রে ফেঁসে গেছে। খাতিরযত্ন করলে ভাঙতে সময় লাগবে না।’
দময়ন্তী বলল, ‘স্যার, প্রেস রিলিজ দিই?’
‘অবশ্যই। ড্রাফট রেডি করো। তার আগে এখনই লিকেজ দাও মিডিয়ায়। ভবানী ভবন হ্যাজ অ্যাভেঞ্জড।’
দময়ন্তী সৌমিলির নম্বরে টেক্সট মেসেজ ছেড়ে দিল, ‘স্কুপ পেতে চাইলে চলে এসো এখনই।’
তানিয়া রাহুলকে ঠেলা দিয়ে নিচু গলায় বলল, ‘স্যারকে বলো আজ বিরিয়ানি খাওয়াতে।’
‘আজ সব্বাই কল্পতরু!’ রাহুল চোখ টিপল, ‘খোদ এডিজির ঘাড় ভাঙি যদি?’
বিটি রোড চিড়িয়ামোড়, বিকেল ৪টে
নিউজ চ্যানেলে এখন শুধুই জুতোকাহিনি। হামলে পড়ে দেখছে লোকজন। মিষ্টির দোকান যাবার পথে লীনা সোনির বিরাট শো-রুমের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল। এই প্রথম বোধহয় দেখা গেল, টিভির দোকানে খেলা বা ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চলছে না। খবর চলছে। গ্রাফিক্স করে দেখানো হচ্ছে জুতোর কারিকুরির গল্প।
সংবাদ পাঠক উত্তেজিত কণ্ঠে বলছেন, ‘কীভাবে তৈরি হয়েছিল সেই জুতো, যা ধরা পড়ল না স্ক্যানারে? আমাদের গ্রাফিক্স টিম আপনাদের জন্য বানিয়েছেন সেই ভিডিও। সেই দু-জোড়া জুতো ছিল স্পেশালি কাস্টমাইজড। সোলের মধ্যে এক ইঞ্চির এই গর্ত দেখতে পাচ্ছেন আপনারা। এই সোল আলাদা করে লাগানো যায়। এই গর্তেই মিনি ডিটোনেটর আর রেকর্ডার লুকোনো ছিল। আরেকটা জুতোয় প্যামফ্লেটগুলো রোল করে ভরা ছিল। এই জুতো পরেই সাংবাদিকদের মধ্যে মিশে গেছিল দুই অপরাধী। ফলে সিকিউরিটি চেকে তারা ধরা পড়েনি। এমনকী স্ক্যানারও ব্যর্থ হয়েছে তাদের বুদ্ধিমত্তার কাছে। আপনারা দেখতে পাচ্ছেন কীভাবে তৈরি হয়েছিল সেই বিশেষ জুতো, যা পরে অপরাধীরা নির্বিঘ্নে প্রবেশ করেছিল রাজ্য পুলিশের প্রধান দপ্তরে। দত্তপুকুরের দীঘা অঞ্চল থেকে ধৃত গোপাল মল্লিককে আজ দিনভর জেরা করছেন সিআইডি অফিসাররা। নতুন কী জানা গেল তার থেকে? আমাদের নজর থাকবে সেইদিকে…।’
দোকানের কাচের সামনে কতক্ষণ দাঁড়িয়েছিল, খেয়াল নেই লীনার। হঠাৎ একদম পাশ থেকে কে-যেন ডাকল, ‘আপনি লীনা দাশগুপ্ত, না?’
লীনা ঘুরে তাকাল। একজন মহিলা। ছোট চুল। মাঝারি উচ্চতা। বছর তিরিশ বয়েস হবে। পরনে ফর্মাল এথনিক। লীনা বলল, ‘হ্যাঁ।’
মহিলা আপ্লুত গলায় বললেন, ‘আমি আপনার ফ্যান।’
লীনা ব্যোমকে গেল। বুঝে পেল না কী বলবে।
‘আমার অফিসের বস আমাকে খারাপ অফার দিয়েছিলেন। চাকরি যাবার ভয়ে এতদিন কিছু বলতে পারিনি। আপনার ইন্টারভিউ দেখার পরদিনই গিয়ে সবার সামনে তাকে সপাটে থাপ্পড় মেরেছি।’
লীনা এখনও বুঝতে পারছিল না কী বলবে। কিন্তু ভিতরটায় কে যেন জলে-ভেজানো গামছা দিয়ে মুছিয়ে দিচ্ছিল।
‘আপনার থেকে সাহস না পেলে পারতাম না,’ মহিলা লীনার দুটো হাত তুলে নিজের মুঠোয় নিলেন, ‘থ্যাঙ্কিউ।’
.
ভবানী ভবন, সন্ধে ৬টা
সেলিম মণ্ডলের পোস্টমর্টেম রিপোর্ট এসেছে। রক্তে ক্যালসিয়াম গ্লুকোনেট পাওয়া গেছে, যা সাধারণত ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করানো হয়। অর্থাৎ এটুকু স্পষ্ট যে এটা খুন। পাহারা থাকা সত্ত্বেও যদি হসপিটালে ঢুকে ইঞ্জেক্ট করে দিয়ে যায়, কীই-বা বলার থাকতে পারে। এদিকে পাহারায় থাকা পুলিশকর্মীরা জোর দিয়ে বলছে, ডাক্তার-নার্স-আয়া বাদে কেউ ঘরে ঢোকেনি। সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করে কোনও কূলকিনারা পাওয়া যাচ্ছে না। দময়ন্তী রিপোর্টটা হাতে নিয়ে বসেছিল, এমন সময় তানিয়া ওর টেবিল থেকে ডাকল, ‘দময়ন্তীদি, একবার এদিকে আসবে?’
‘বল।’
‘সোর্স এইমাত্র একটা খবর দিল। জানি না স্যারকে কীভাবে বলব।’
‘কী হয়েছে বল না।’
‘কাবেরী ম্যাডাম, মানে স্যারের স্ত্রীকে আজ সম্পূর্ণা মিত্রের সঙ্গে দেখা গেছে। সুজান জর্ডানের বন্ধু উপাসনা আচার্যের সঙ্গেও।’
‘বলিস কী?’
‘হ্যাঁ। কালকে সিনেমার স্ক্রিনিংয়ে ওঁর থাকাটা নেহাতই কাকতালীয় বলে মনে হচ্ছিল। কিন্তু আজ এই কথাটা শুনে তো…।’
দময়ন্তী একটু গুম মেরে রইল। তারপর বলল, ‘স্যারকে না বলে তো উপায় নেই। এবার তো সামন করতেই হবে।’
.
বালিগঞ্জ প্লেস, সন্ধে ৬টা ৩০
স্বাধীনতা দিবস নিয়ে চ্যানেলের উদ্যোগে একটা স্পেশাল টক শো ছিল মোহর কুঞ্জে। সৌমিলিরা সবাই সেজেগুজে এসেছে। শুধু শাক্য বেচারা অফিসেই বসে আছে। মজন্তালীর কেসে বিধ্বংসী আপডেট আসায় শেষ মুহূর্তে আটকে গেছে। কাউকে একটা গলা পাততেই হত। শাক্য পেতেছে। অবশ্য এক্সট্রা একদিন ছুটি পাবার শর্তে। এদিকে সৌমিলি, শিরিনদের মনও মজন্তালীতেই পড়ে আছে। আম-পোড়ার শরবত খেতে খেতে তাই নিয়েই আলোচনা চলছিল। সৌমিলি বলল, ‘খেলা কিন্তু জমে গেছে ভাই। সেয়ানে সেয়ানে টক্কর হচ্ছে।’
শিরিন বলল, ‘সোর্স। পুলিশের আসল শক্তি তো সোর্স। সেখানেই খেলাটা শেষমেশ বের করে নেবে।’
‘সেটা প্রেডিক্ট করতে গেলে তো জানতে হবে মজন্তালী সরকার কে বা কারা?’
‘দময়ন্তীদি তো অফ-রেকর্ড ইঙ্গিত দিয়েইছে। আরবান গুলাবি গ্যাং।’
রণ বলল, ‘গুলাবি গ্যাং? সেটা আবার কী?’
‘গুলাবি গ্যাং-এর কথা শুনিসনি?’ সৌমিলি বলল, ‘উত্তর ভারতের একটা মহিলা অ্যাকটিভিস্ট গ্রুপ। মূলত গ্রামাঞ্চলের পিছিয়ে পড়া বা নির্যাতিতা মহিলাদের অধিকার নিয়ে কাজ করে।’
‘খুনখারাপি করে নাকি?’
‘না। যা করার আইনি পথেই করে। তবে দুর্দান্ত কাজ করছে।’
‘ধুর,’ রণ মুখ ভেটকে বলল, আমাদের মজন্তালী সরকার অনেক এক্সাইটিং।’
‘হ্যাঁ। আর এখানেই সমস্যা!’ জবাব যেন ঠোঁটের গোড়ায় ছিল এমনভাবে বলল সৌমিলি, ‘কাজটা নিয়ে আমরা ভাবছি না। ঠিকই বলছিল শালিনীদি। মজন্তালী সরকার যে বার্তাটা দিতে চাইছে সেটা আমরা নিতে পারছি না। উই উইল ফেইল হার।’
রণ মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে বলল, ‘তুই জ্ঞানের কথা রাখ। আমায় বোঝা যে এটা একা একজন মহিলা হলে কোথায় বেমানান হচ্ছে বিষয়টা?’
শিরিন বলল, ‘তাহলে মেনে নিতে হয় সে সত্যিই সুপারন্যাচারাল পাওয়ারের অধিকারী! এই যে এত কিছু ঘটিয়ে চলেছে, তা-ও নিজেকে একেবারে আড়ালে রেখে, একটা স্বাভাবিক সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে সম্ভব কিনা একটু ঠান্ডা মাথায় ভেবে দ্যাখ! একটা গোটা টিম কাজ না করলে এই নিখুঁত প্ল্যানিং এবং এক্সিকিউশন সম্ভব?’
রণ বলল, ‘আরে, দিস ইজ আওয়ার ভেরি ওন ক্যাটওম্যান! ভাব, গল্পে ক্যাটওম্যানের কোনও সুপারন্যাচারাল পাওয়ার ছিল? ক্যাটওম্যান ব্যাটম্যানের মতোই সেলফ মেড! হতেই তো পারে যে আমাদের মজন্তালী সরকারও তাই! কোনও কংক্রিট প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত উল্টোটাই কেন ধরে নিচ্ছিস? তোরা ডার্ক নাইট দেখে লাফাবি আর রিয়েল লাইফে কিছু হলে সেটাকে বলবি অবাস্তব! ডাবল স্ট্যান্ডার্ড লোকজন যত!’
‘যেটাই হোক, কোনও কংক্রিট প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত আমরা সুপারন্যাচারাল গল্প বেচতেই পারি।’ শিরিন দাঁত বের করে হাসল।
‘না, এখন তো পাদুকা-পুরাণ আছে। সম্পূর্ণা মিত্রও আছেন। অবশ্য সম্পূর্ণা মিত্রের ব্যাপারটা তো হাফ বেকড। জাস্ট একটা ওয়ান লাইনার। ডিটেল কিছুই জানতে পারছি না।’
‘হ্যাঁ রে, শালিনীদি কিছু জানাল লীনা বা তিয়াসার ব্যাপারে?’
‘না। কাল দময়ন্তীদির ফোন পেয়ে সেই যে বেরিয়ে গেল, তারপর থেকে তো আর পাত্তা নেই।’
শিরিন কয়েক সেকেন্ড ভাবল। খুব গভীরভাবে কিছু ভাবলেই শিরিনের হাতে পেন বা পেনসিল কিছু একটা উঠে আসে। এখন এল একটা চুলের ক্লিপ, ‘যেভাবে হুড়মুড় করে বেরোল, তোর খটকা লাগল না? কী শুনে ওভাবে বেরোল? কী এমন কথা?’
সৌমিলি বলল, ‘তুই একটু রিল্যাক্স কর। আরেক গ্লাস শরবত খা। সবেতেই রহস্য খুঁজে পাচ্ছিস।’
শিরিন সৌমিলির দিকে তাকাল, ‘এখানে তো আর বিশেষ কাজ নেই। চল না, একবার শালিনীদির কাছে ঘুরেই আসি।’
.
ভবানী ভবন সন্ধে ৭টা
দময়ন্তী বলল, ‘কাবেরী ম্যাডামকে আমি যতটুকু দেখেছি, বেশ নিড়বিড়ে, ভালোমানুষ গোছের।’
রাহুল বলল, ‘তাতে কী? উনিই যে মজন্তালী হয়ে খুন করে বেড়াচ্ছেন সেটা তো কেউ দাবি করছে না। মজন্তালীর সাহায্যকারীদের মধ্যে উনি একজন কিনা সেটাই প্রশ্ন।’
‘এমনিতে অবশ্য স্ট্রং মরালের। বরুণের ঘটনার পর খুব অ্যাকটিভলি মিটিং-মিছিল করেছেন।’
‘সে তো বরুণ ওঁর কলিগ ছিলেন বলে। আচ্ছা, বরুণ মারা যাবার সময় ওঁদের কি ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছিল?’
‘হ্যাঁ। তার মাসকয়েক আগেই।’
‘কারণ জানো?’
‘না। নিজে থেকে না বললে কি এসব জিগ্যেস করা যায়?’
‘বিয়ের তেরো বছর পর ছাড়াছাড়ি হওয়াটা চট করে দেখা যায় না। কী কারণ ছিল কে জানে।’
‘দ্যাখ, পুরোটা কাকতালীয়ও হতে পারে। হয়তো দেখা যাবে কিছুই না।’
‘হতেই পারে।’ বলে রাহুল একটু আনমনা হয়ে গেল। অস্ফুটে বলল, ‘তাই যেন হয়।’
ধূমপান সেরে বারান্দার দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকলেন অমিতাভ। তাঁকে দেখে চুপ করে গেল দময়ন্তীরা। অমিতাভ জানেন, তাঁকে নিয়েই আলোচনা হচ্ছে। একটা শ্বাস ফেলে বললেন, ‘প্রাক্তন স্ত্রী হলে কি কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টের অভিযোগ আনা যায়, দময়ন্তী?’
দময়ন্তী বলল, ‘উনি আইনতই আপনার প্রাক্তন। সেক্ষেত্রে ওই অভিযোগ আনা যায় না।’
‘উঁহু। বরং উল্টো। প্রাক্তনদের ওপর মানুষের রাগ থাকে। ফলে…।’ বলতে বলতে দময়ন্তীর দিকে চোখ পড়তেই রাহুল খচাৎ করে ব্রেক কষল। দময়ন্তী কটমট করে চেয়ে আছে।
অমিতাভ অন্যমনস্ক স্বরে বললেন, ‘ডিজি কী বলেন, দেখা যাক। আপাতত ভদ্রমহিলাকে একটা ফোন করে কাল সকালে ডেকে পাঠাও।’
তানিয়া চোখ মটকে চাপা গলায় রাহুলকে বলল, ‘মাথাটাথা কি একেবারেই গেছে তোমার?’
‘স্লিপ অব টাং,’ করুণ চোখে তাকাল রাহুল, ‘একদম বেখেয়ালে।’
.
গলফ গ্রিন, রাত ৯টা
টুকটাক কয়েকটা কাজ সেরে এসে সৌমিলি আর শিরিনের মুখোমুখি বসল শালিনী। ‘এসে ভালোই করেছিস। শাক্যকেও নিয়ে আসতে পারতিস।’
সৌমিলি বলল, ‘আমরা মোহর কুঞ্জে একটা প্রোগ্রাম থেকে এলাম। শাক্য অফিসে। কালকে দময়ন্তীদি তোমায় ডেকে পাঠাল কেন সেটা বলো প্লিজ।’
‘এই কেসটা আমার প্রেমে পড়ে গেছে রে। পিছুই ছাড়ছে না।’ আড়মোড়া ভাঙল শালিনী, ‘সুচেতাকে তোদের চ্যানেলে নিয়ে এসেছিলাম বলে জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়লাম। যদিও দময়ন্তীদিকে ফিরে পেলাম সেজন্যই। এবার আরও এক সাসপেক্টের সঙ্গে জড়িয়েছি। মানে, আমার ইতিহাস জড়িয়ে গেছে তার ইতিহাসের সঙ্গে।’
‘কে সে?’
‘সম্প্রতি নতুন একজন সন্দেহভাজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে সিআইডি। রুপোলি জগতের তারকা।’
‘সম্পূর্ণা মিত্র। জানি।’
মাথা নাড়ল শালিনী, ‘এই সম্পূর্ণা মিত্রের সঙ্গেই আমার একটা ছোট্ট লিঙ্ক আবিষ্কৃত হয়েছে আচমকা। প্রায় পনেরো বছর আগের, ফসিল হয়ে যাওয়া একটা লিঙ্ক।’
সৌমিলি আর শিরিন দৃষ্টি বিনিময় করল।
শালিনী বলল, ‘ওর আসল নাম কিন্তু সম্পূর্ণা নয়। এফিডেভিট করে নাম বদল করেছে। আসল নাম রেখা ভট্টাচার্য। মেয়েটি মার্ডারের চার্জে আড়াই বছর সরকারি জুভেনাইল হোমে ছিল।’
‘হোয়াট?’
‘লম্বা গল্প। সিরাজের বিরিয়ানি অর্ডার করে দিচ্ছি। গল্প শুনে খেয়ে ফিরবি।’
সৌমিলি বলল, ‘তথাস্তু। কিন্তু তুমি থেমো না প্লিজ। সাসপেন্স সহ্য করতে পারছি না।’
বলতে শুরু করল শালিনী, ‘আমি সে-বছর ইউনিভার্সিটি পাশ করে ইন্টার্নশিপের জন্য লিলুয়ার সরকারি হোমে ঢুকেছিলাম ট্রেইনি সাইকোলজিস্ট হিসেবে…।’
.
সল্টলেক, রাত ১০টা
পারসোনাল আর প্রফেশনাল এইভাবে জট পাকিয়ে গাঁট পাকানো বাঁশ দেবে, অমিতাভ ভাবতে পারেননি।
অবশ্য কাবেরী মজন্তালীর দলের কেউ হতে পারে, এটা অমিতাভর ঠিক বিশ্বাস হয় না। যদিও সে বরাবরই কট্টর নারীবাদী। অমিতাভ আবার নারীবাদ ব্যাপারটা তেমন ভালো বুঝে উঠতে পারেন না। সভ্যতার আদিকাল থেকে নারীকে চেপেচুপে বনসাই করে রাখার একটা সামাজিক-সাংস্কৃতিক চেষ্টা হয়েছে সেটা অস্বীকার করা যায় না।
কিন্তু এখন তো মেয়েদের অবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। এখন নারীবাদীরা ঠিক কোন বিষয়গুলোকে আক্রমণ করতে চায় সেটা তাঁর কাছে খানিক ধোঁয়াটে। ছায়ার সঙ্গে যুদ্ধ করে গায়ে ব্যথা করার কী মানে হয়? বরুণ মারা যাবার পর সে বেশ হাইপারঅ্যাক্টিভ হয়ে উঠেছিল। প্রচুর সভা-সমিতি করেছে। মিছিল-টিছিলে হেঁটেছে। ততদিনে অবশ্য সল্ট লেকের এই ফ্ল্যাট ছেড়ে সে মায়ের বাড়িতে উঠে গেছে। সম্পর্কের বোঝা সেই কবে ঝেড়ে ফেললেও সম্পর্কের ভূত যে এভাবে বেতালের মতো ঘাড়ে চেপে থাকবে, সেটা কে জানত। বিবাহ নামক চুলের সামাজিক প্রথাটি হচ্ছে ইউরিন ইনফেকশনের মতো। একবার ধরলে পিছু ছাড়তে চায় না।
ফোন বাজছে। অনিচ্ছুক হাত বাড়িয়ে ফোনটা নিয়ে অমিতাভ দেখলেন, টেলিকমের শৌভিক। এই ফোনটা পেয়ে উত্তেজিত বোধ করার কথা ছিল। ততটা উত্তেজনা অমিতাভ অনুভব করলেন না, ‘হ্যাঁ শৌভিক, বলো।’
‘স্যার, নম্বরগুলো কাদের নামে সেটা পেয়ে গেছি।’
‘ভেরি গুড,’ নিরুত্তাপ গলায় অমিতাভ বললেন, ‘লোকনাথকে নামধাম পাঠিয়ে ফলো আপ করতে বলে দাও প্লিজ।’
‘সবাইকে তুলে লাভ নেই স্যার। আগেও তো দেখা গেল, এরা জানেই না এঁদের নামে অমুক নম্বর চালু আছে। এইসব প্রিঅ্যাক্টিভেটেড সিমের কারবার। সিম তোলার সময় ভোটার কার্ডের জেরক্স নিয়ে রাখে, সেগুলোই কালোবাজারে কেনাবেচা হয়। ধরেই নিন এরা জানবে না এঁদের ডকুমেন্টস ইউজ করে ঠিক কে বা কারা অপরাধমূলক কাজকম্ম করছে। কয়েক মাস আগে এই প্রিঅ্যাক্টিভেটেড সিম নিয়ে বিস্তর জলঘোলা হল না? দু-চারজন ধরাও পড়ল। লালবাজারের ভঞ্জদা দেখছেন কেসটা। তাঁর কাছেই শুনেছিলাম প্রিঅ্যাক্টিভেটেড সিম একটা অরগ্যানাইজড ক্রাইমে পরিণত হয়েছে। আমার কথা শুনুন। একটা প্যাটার্ন পাচ্ছি। খুব ইন্টারেস্টিং প্যাটার্ন।’
‘কী প্যাটার্ন?’
‘মাস চারেক ইনঅ্যাকটিভ থাকলেই সিম এখন ডরম্যান্ট হয়ে যায়। তারপর রিসাইকল করে অন্য কাস্টমারকে দিয়ে দেওয়া হয়। ফলে যে-কটা সিম ব্যবহার করা হয়েছে, সবকটাই দেখছি বেশ কয়েকবার হাতবদল হয়েছে এবং প্রত্যেক সিমে তিন-চারজন করে ইউজার পাচ্ছি। তার মধ্যে একজন করে অতিবৃদ্ধ।’
‘ঠিক বুঝলাম না কী বলছ।’
‘চোরাই ডকুমেন্টগুলোকে নানাভাবে ক্যাটাগরাইজ করা হয়। টেররিস্টদের সিম ব্যবহারের ক্ষেত্রে লেটেস্ট ট্রেন্ড হচ্ছে, নাশকতামূলক কাজে বৃদ্ধ থেকে অতিবৃদ্ধদের ডকুমেন্টস নিয়ে জালিয়াতিটা হচ্ছে। প্যাটার্নটা মিলছে অমিতাভদা। মজন্তালীর ব্যবহার করা আগের সিমগুলোতেও একজন করে অতিবৃদ্ধ গ্রাহক ছিলেন।’
‘অতিবৃদ্ধরা কেন?’
‘খুব সোজা। ধরে নেওয়া হয় বছর তিন-চারেকের মধ্যেই তাঁরা ওপারের টিকিট কেটে ফেলবেন। অথচ তার নামে তোলা সিম অপরাধমূলক কাজে ব্যবহার হয়েই চলবে।’
‘তার মানে তুমি বলছ আমাদের টার্গেট হওয়া উচিত গ্রাহকদের মধ্যে যে সবচেয়ে বৃদ্ধ, সে?’
‘এক্স্যাক্টলি। কিন্তু এখনও অবধি পাওয়া সব বৃদ্ধ গ্রাহকই মৃত। শুধু একজনের খোঁজ পাচ্ছি না। পূর্ণেন্দু সরকারকে যে নম্বর থেকে ফোন করা হয়েছিল সেটা দুবার হাতবদল হয়েছে। মানে মোট তিনজন গ্রাহকের নাম পাচ্ছি। তাঁদের মধ্যে একজন বীরশিবপুরের বাসিন্দা অনিল পাহান। বয়েস সাতাশি। তাঁকে তাঁর ভোটার কার্ডের অ্যাড্রেসে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি যদি বেঁচে থাকেন তো কেল্লাফতে।’
কথা বলতে একটা অনীহাবোধ টের পাচ্ছিলেন অমিতাভ। শৌভিকের কথার মাঝখানেই বললেন, ‘লোকনাথকে নামধাম ফরওয়ার্ড করে একটু দেখে নিতে বলবে ভাই? আমার আসলে মাথাটা একটু ঘেঁটে আছে। কনসেনট্রেট করতে পারছি না কিছুতেই। প্লিজ টেল হিম টু ডু দ্য নিডফুল।’
শৌভিক ওপাশে একটু চুপ করে রইল। তারপর সহানুভূতির সুরে বলল, ‘আমি জানি অমিতাভদা। শুনেছি সবটা। নো প্রবলেম। আপনি রেস্ট করুন। আমি লোকনাথদাকে বলে দিচ্ছি।’
ফোন রেখে অমিতাভ ভাবলেন, রেগে যাওয়া উচিত ছিল কি? এমন দিন এল যে লোকজন করুণা দেখাচ্ছে? অবশ্য এই নিয়ে অহেতুক ভেবে লাভ নেই। এসব কথা অফিসে গোপন থাকে না। এইরকম পরিস্থিতিতে ঠিক কীভাবে রিয়াক্ট করা সমীচীন, অমিতাভ জানেন না। এর তো কোনও ম্যানুয়াল হয় না। যা-ই হোক, মনটাকে আপাতত একটু শান্ত করা দরকার।
অমিতাভ মোবাইলে ব্লুটুথ স্পিকার কানেক্ট করে ইউটিউবে মান্না দে-র ‘কে তুমি তন্দ্রাহরণী’ চালালেন। তারপর ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ালেন। এই কদিন মার্জারললনা একাই তন্দ্রাহরণী ছিলেন। গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো প্রাক্তন স্ত্রী-ও এসে জুটেছেন। চাঁদটাকেও আজ কেমন যেন স্লিপিং পিলের মতো দেখাচ্ছে। ঘটাং করে একটা চোঁয়া ঢেকুর উঠল। বিস্বাদ হয়ে গেল মুখটা। অনিদ্রা আর বদহজমই তবে এবার থেকে নিত্যসঙ্গী হয়ে গেল? অমিতাভ রেলিংয়ে কনুই রেখে কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। জোলো হাওয়া দিচ্ছে। মেঘের স্তূপে ক্রমে তলিয়ে যাচ্ছে চাঁদ। বৃষ্টি নামবে।
নারকেলডাঙা, রাত ১১টা
বৃষ্টি দেখে প্রিভিলেজড বাঙালি উদাস বা রোমান্টিক হয়ে যাচ্ছে না মানে বৃষ্টির সঙ্গে তার অতি অবশ্যই কোনও খারাপ স্মৃতি জড়িয়ে আছে। এরকম এক ভারী ব্যাপক বৃষ্টির দিনেই রাজ্য পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের উচ্চপদস্থ অফিসার অমিতাভ সান্যালের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন কাবেরী। অমিতাভ তাঁর জীবনের একটা অনাবশ্যক অধ্যায়। অ্যাপেনডিক্সের মতো। ছিল, তাতেও খুব লাভের লাভ কিছু হচ্ছিল না। নেই, তাতেও ক্ষতিবৃদ্ধি হচ্ছে না। কলেজজীবন থেকে প্রচুর টেম্পোরারি লোকজন জীবনে আসা-যাওয়া করে। অমিতাভকেও এখন সেরকমই একটা পরিচ্ছেদ বলে মনে হয়। অথচ তেরোটা বছর নেহাত কম সময় না।
খাওয়া শেষ করে এক খাবলা মৌরি মুখে দিয়ে কাবেরী প্রাক্তন স্বামীর কথা ভাবতে বসলেন। অমিতাভর পছন্দ-অপছন্দ তিনি তেমন জানেন না। দুজনে শুধু রুমমেটের মতো ঘর শেয়ার করেছেন, জৈবিক প্রয়োজনে কাছে টেনেছেন একে অন্যকে। এটুকুই। অমিতাভ ভদ্রলোক। কোনও বিষয়ে নিজের মতামত চাপানোর চেষ্টা করেননি। নিজের ব্যাপারেও কাবেরীর মতামতের তোয়াক্কা করেননি। কাবেরীও করেনি। গান্ধর্ব বিয়ের মতোই ছিল ব্যাপারটা। আঠা ছিল না।
এখন ভাবলে কাবেরীর মনে হয়, দুজনের কেউই সংসার করার মতো ছিলেন না। মানুষ হিসেবে দুজনেই খুব আত্মনির্ভর। বলা ভালো, আত্মকেন্দ্রিক। অমিতাভ কাজপাগল। পড়াশোনা, লেখালিখি ইত্যাদি নিয়ে কাবেরীরও নিজস্ব একটা জগৎ ছিল বরাবরই। যে ক’টাদিন একসঙ্গে ছিলেন, অমিতাভকে সবসময়েই রাস্তার উল্টোদিকের ফুটপাথে দাঁড়িয়ে থাকা একটা মানুষ বলে মনে হয়েছে। সে-রাস্তা কাবেরী পার হতে পারেননি। খুব গা-লাগিয়ে চেষ্টাও করেননি হয়তো। তাঁরা ভাগ্যবান যে ছাড়াছাড়িটা খুব নির্বিবাদে মিটেছে। খুব শান্ত, নিস্তরঙ্গ এক বিচ্ছেদ। কারও সম্মানহানি হয়নি। বিন্দুমাত্র কাদা-ছোড়াছুড়ি হয়নি। সৌজন্যের অভাব হয়নি। তাঁদের উদাহরণ দিয়ে আদর্শ বিবাহবিচ্ছেদের ক্রাশ কোর্স করানো যাবে।
সেই অমিতাভ সান্যালের সঙ্গে কাল দেখা হবে। দীর্ঘ দেড় বছর পর। এমনিতে অফিসার হিসেবে অমিতাভ খুবই রেপুটেড। এরকম হাই প্রোফাইল কেস তাঁর কাছেই আসবে, এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। মুখে নাইটক্রিম মাখতে মাখতে কাবেরী টের পেলেন বৃষ্টি বাড়ল। পাশের বাড়ির টিনের চালে ঝমঝম শব্দ হচ্ছে। বৃষ্টির বর্ণনা দিতে গিয়ে যে-ধন্যাত্মক অব্যয়টি লেখক-সাহিত্যিকরা ব্যবহার করেন, ঠিক সেই শব্দ। আজ ভাসাবে।
.
