মজন্তালী সরকার – নবম দিন

নবম দিন

তারিখ : ১০ আগস্ট, ২০১৩

দ্য ব্রিজ (ফ্লোটেল), বিবাদি বাগ, সকাল ১০টা

ইলিয়াস আজ অন্য বেশে। দাড়ি পরিপাটি করে কামানো। চোখে কালো চশমা। পরনে আরমানি স্যুট। অমিতাভ এসে তার মুখোমুখি বসতে নিচু গলায় বলল, ‘নো ফিশি বিজনেস স্যার। এভরিথিং অলরাইট।’

‘মানে লাশ লাশের জায়গাতেই?’

‘হ্যাঁ। এবং কবর দেবার পর মাটি কোনওভাবেই খোঁড়া হয়নি।’

‘তার মানে সুজান জর্ডান সত্যিই মারা গেছেন।’

‘হানড্রেড পারসেন্ট।’

অমিতাভ ফোঁৎ করে একটা শ্বাস ছাড়লেন, ‘কেসটা সেলোটেপের মতো হয়ে যাচ্ছে হে ইলিয়াস।’

‘সেলোটেপের মতো মানে?’

‘সেলোটেপ কাটতে গিয়ে যেমন নাজেহাল হতে হয়, এখানেও তাই হচ্ছে। মুখটা পয়েন্ট করে রাখতে চাইছি, কিন্তু হারিয়ে যাচ্ছে বারবার। অথবা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি মুখ বেরিয়ে পড়ছে। মানে অপরাধী সেটাই চাইছে।’

ইলিয়াস সিরিয়াস ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল। তারপর বলল, ‘তবে এই যে এত কেরামতি দেখাচ্ছে, এই করতে গিয়েই ফাঁদে পড়বে স্যার। ভাববেন না।’

‘কিন্তু ফাৎনা কখন নড়বে তার অপেক্ষায় থাকলে দেরি হয়ে যাবে ইলিয়াস। দিশাহীন রেল-ওয়াগনের মতো শান্টিং করে যাচ্ছি এদিক থেকে ওদিক।’

‘এটা তো আর-পাঁচটা কেসের মতো সহজ-সরল কেস নয় স্যার। সময় লাগবে।’

‘সময়ই তো নেই, ইলিয়াস। লালবাজার থেকে একজন বড় অফিসারকে সিআইডি-তে পাঠাচ্ছে শুনলাম।’

‘জানি। জয়েন্ট সিপি ক্রাইম চতুর্বেদী।’

অমিতাভ অবাক হলেন না। ইলিয়াসের কাছে ভিতরের সব খবরই থাকে। বললেন, ‘খুব শিগগিরি আমাকে কেস থেকে সরিয়ে দিলে একটুও অবাক হব না। অবশ্য ভবানী ভবনে ঢুকে নাকের ডগায় যে-ঘটনা ঘটিয়ে গেল, এর দায় ইনভেস্টিগেটিং অফিসার হিসেবে আমায় তো নিতেই হবে। সরিয়ে দিলে কিছু বলারও নেই।’

ইলিয়াস একটু চুপ করে রইল। তারপর বলল, ‘একটা এসপ্রেসো বলছি স্যার।’

‘বলো।’

‘আপনার জন্যই বলছি। আমি তো চায়ের লোক। খান। মাথাটা ছাড়বে।’

অমিতাভ মাথা নেড়ে সোফায় গা এলিয়ে দিলেন। ইলিয়াস ফ্লোটেলের ডেকে ওপেন-এয়ারে জায়গা বুক করেছে। ডানদিকে হাওড়া ব্রিজ। দূর থেকে মনে হচ্ছে যেন টু-বি পেনসিলে আঁকা। আজ রোদ বড্ড চড়া। গঙ্গার বুকে রুপোর কুচি ঝিকিয়ে উঠছে। এই মন ভালো-করা দৃশ্যের দিকে তাকিয়েও দীর্ঘশ্বাস ছাড়া কিছুই আসছে না তাঁর। কোথাকার জল কোথায় গড়াচ্ছে, কিছুই বুঝে ওঠা যাচ্ছে না।

.

ভবানী ভবন, এডিজির চেম্বার, সকাল ১০টা ৪৫

খবর শুনে এডিজি প্রবীর চক্রবর্তী মৃদু হাসলেন, ‘ইলিয়াস?’

‘আর কে?’

‘খবর কী তার?’

‘রোগা হয়ে গেছে। লিভারের প্রবলেম ধরা পড়েছে।’

‘ইলিয়াস আজকাল অ্যাডিশনাল সিপি-কেও রিজেক্ট করে দিচ্ছে, কিন্তু তোমার প্রতি আজও কুকুরের মতো লয়াল।’

চওড়া করে হাসলেন অমিতাভ।

‘অমিতাভ, নাও ইউ আর শিওর অ্যাবাউট সুজান জর্ডান, কনসেনট্রেট অন আদারস। আর সুজানকে নিয়ে একটা প্রেস স্টেটমেন্ট দিয়ে দাও। এতে আজেবাজে রটনা খানিক বন্ধ হবে। সুজানকে নিয়ে যে একটা টানাহ্যাঁচড়া হয়েছে সেটা এখন ওপেন সিক্রেট। মিডিয়া বা অপোজিশন যাতে সেটা এনক্যাশ করতে না পারে, মেক শিওর অফ দ্যাট।’

অমিতাভ খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে বললেন, ‘বেশ। স্টেটমেন্টের ড্রাফটটা একবার চেক করে দেবেন।’

সম্মতিবাচক মাথা নাড়লেন এডিজি।

অমিতাভ বললেন, ‘দুটো কথা বলব স্যার!’

‘গো অন।’

‘এক, আমাদের সাসপেক্ট লিস্ট লম্বা হচ্ছে। সোর্সমানি বাড়াতে হবে।’

‘ডান।’

‘দু-নম্বর কথা, আমাকে কি এই কেসে রাখা হচ্ছে? সেটা আগাম জেনে গেলে আমার সুবিধা হয় আর কী।’

‘মানে?’ এডিজি সচকিত হলেন, ‘হঠাৎ একথা কেন বলছ?’

‘জয়েন্ট সিপি ক্রাইমকে সিআইডি-তে আনার দরকার কেন হচ্ছে স্যার?’

.

ভবানী ভবন, অমিতাভর চেম্বার, সকাল ১১টা

সুচেতারা এলে তাঁর চেম্বারে বসাতে বলেছিলেন অমিতাভ। ঠিক এগারোটায় রমেশ এসে খবর দিল, ‘স্যার, উনারা এসে গেছেন গিয়া।’

সাদা কুর্তা-পায়জামায় বিবস্বান দত্তকে আজ অন্যরকম লাগছে। অমিতাভদের দেখে উঠে দাঁড়িয়ে হাত জোড় করলেন ভদ্রলোক, ‘নমস্কার। কী কাণ্ড দেখুন তো! কেসটার সঙ্গে একেবারে সাত পাকে জড়িয়ে যাচ্ছি!’

অমিতাভ নিজের চেয়ারে বসতে বসতে বললেন, ‘আপনার সঙ্গে পরশু যখন কথা হল তখন বলেননি কেন?’

বিবস্বান বললেন, ‘আরে জানলে তো বলব। মেয়ে কি আমাদের বলেছে? আমরাও আপনাদের মতোই নিউজ চ্যানেল থেকে জেনেছি।’

বিবস্বানের পাশের ভদ্রমহিলা বললেন, ‘নমস্কার। আমি জয়তী। সুচেতার মা।’

অমিতাভ তাঁর দিকে ফিরলেন, ‘নমস্কার। আপনি কলেজে পড়ান বোধহয়?’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ। স্কটিশ চার্চ। ইংলিশ পড়াই।’

দময়ন্তী জয়তীকে ভালো করে মাপল। একেকজন প্রথাগত অর্থে সুন্দর না হলেও চেহারায় এমন একটা আভিজাত্যের ছাপ থাকে যে চোখ ফেরানো যায় না। সুচেতার মা জয়তী সেই ধরনের মানুষ। জয়তীকে প্রতি-নমস্কার করে সুচেতার দিকে তাকাল দময়ন্তী, ‘গুড ইভনিং সুচেতা।’

সুচেতা হাসল, ‘গুড মর্নিং ম্যাম।’

‘এভরিথিং ফাইন?’

‘হ্যাঁ ম্যাম।’

অমিতাভও তিনজনের এই পরিবারটিকে জরিপ করছিলেন। তিনজনের মধ্যেই ঝকঝক করছে আত্মবিশ্বাস। এটা কি স্বতঃস্ফূর্ত, নাকি রিহার্স-করা? রিহার্স-করা হলে স্মার্টনেসের পলেস্তারা একসময় না একসময় খসে পড়তে বাধ্য। অমিতাভ বললেন, ‘আপনারা চা বা কফি নেবেন?’

‘না ধন্যবাদ।’

রমেশকে ডেকে নিজের আর দময়ন্তীর কফি বলে অমিতাভ আসল কথায় এলেন, ‘সুচেতার নিউজ চ্যানেলে যাওয়া প্রসঙ্গে আপনাদের কী প্রতিক্রিয়া?’

বিবস্বান বললেন, ‘আমার থেকে অনুমতি চাইলে আমি সত্যিই জানি না কী বলতাম! আসলে কী জানেন, মুখে যত যা-ই বলি না কেন, প্র্যাক্টিকালি কোনও একটা পরিস্থিতিতে পড়লে তবেই বোঝা যায় মানুষ ঠিক কতটা প্রগ্রেসিভ। আমি ওকে বলেছি, আমাদের না জানিয়ে সোজা মিডিয়ায় মুখ খুলে ভালোই করেছিস। সেই পরিস্থিতিতে কী বলতাম তার ঠিক আছে!’ সুচেতার দিকে তাকিয়ে হাসলেন বিবস্বান, ‘নাও উই আর প্রাউড অব হার।’

সুচেতা হেসে মুষ্টিবদ্ধ হাত এগিয়ে দিল বাবার দিকে। বিবস্বান হাত মুঠো করে ছুঁইয়ে দিলেন সুচেতার মুঠোয়। বাবা-মেয়ের কেমিস্ট্রি দুর্দান্ত। ভালো লাগল দময়ন্তীর। নিজের বাবার কথা মনে পড়ল। ভদ্রলোক মনে করতেন, মেয়েদের রান্নাঘরে আর আঁতুড়ঘরেই মানায়। নিজে খালি গায়ে লুঙ্গি পরে পাড়ার দোকানে চা খেয়ে আসতেন, অথচ মেয়ে হাফপ্যান্ট পরে বারান্দায় গেলেই অশান্তি। সুচেতা ভাগ্যবান। এমন বাবা পেলে লড়াইগুলো অনেক সহজ হয়ে যায়।

জয়তী বললেন, ‘ইয়েস উই আর প্রাউড অব হার যে ও নিজেকে লুকিয়ে না রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সুজান জর্ডান যদি রেপ সারভাইভার হয়ে নিজেকে পাবলিকলি এক্সপোজ করতে লজ্জা না পায়, হোয়াই শ্যুড শি?’

বিবস্বানের হাসি চওড়া হল, ‘দেখুন, আমরা আমাদের মেয়েকে ওর নিজের মতো করে বড় হতে দিয়েছি। সেইজন্যই শি ওয়াজ কনফিডেন্ট এনাফ টু টেক সাচ আ স্টেপ। বিয়েই জীবনের সার সত্য, এই মন্ত্র শিখিয়ে আমরা ওকে বড় করিনি। এই ঘটনার পর যদি ওকে বিয়ে করার মতো ছেলে না-ও পাওয়া যায়, জানব একটা ভুল বিয়ে থেকে আমার মেয়েটা বেঁচে গেল।’

অমিতাভ বললেন, ‘আপনারা চিহ্নিত হয়ে যাবার ভয় পাচ্ছেন না? কোনও গুন্ডাই তো আজকাল বিচ্ছিন্ন নয়। সবারই তো কোনও না কোনও সংঘের অ্যাফিলিয়েশন থাকে। বুঝতেই পারছেন কী বলছি।’

‘হ্যাঁ। সেটা নিয়ে ভাবনাচিন্তা করেছি। সুচেতা গাড়িতে যাতায়াত করবে। বডিগার্ড রাখছি।’

‘হ্যাঁ, সেটা আপনারা অ্যাফোর্ড করতে পারেন। ঠিকই।’

‘হ্যাঁ। অ্যাফোর্ড করতে পারছি সেটা একটা আশীর্বাদ।’ কাঁধ ঝাঁকালেন বিবস্বান, ‘অনেকেই হয়তো এরকম ভাববেন, কিন্তু অ্যাফোর্ড করতে পারবেন না। আমরা পারছি। আর পারছি বলেই ও যে-সাহসটা দেখিয়েছে, সেটাকে জলে যেতে দিতে চাই না। এটা একটা স্টেটমেন্ট হিসেবে থাকুক। সুজান চেয়েছিল ধর্ষণ বা শ্লীলতাহানির শিকার হলেও কেউ যেন লজ্জা না পায়।’

‘আই অ্যাপ্রিশিয়েট দ্যাট,’ বলল দময়ন্তী, ‘যাই হোক, এই কেসে সুজানের সূত্রে আপনি সামান্য জড়িয়ে আছেন, আর সুচেতা তো আই উইটনেস হিসেবে সরাসরি জড়িয়ে পড়েছে। ফলে আমাদের উৎপাত মাঝেমধ্যে সহ্য করতে হবে, বুঝতেই পারছেন। অপরাধীকে ধরতে আপনাদের সাহায্য আমাদের লাগবেই।’

বিগলিত হাসি হাসলেন বিবস্বান, ‘আমার মেয়েকে যে নিশ্চিত বিপদের হাত থেকে বাঁচিয়েছে, আমি তাকে কী করে অপরাধী বলি ম্যাডাম? তবে আপনাদের তদন্তে আমরা নিশ্চয়ই যথাসাধ্য সাহায্য করব। তবে একটা কথা বলি, কিছু মনে করবেন না। আজ আমাদের ডেকেছেন সেটা নিয়ে তো আপত্তির কিছু নেই। কিন্তু লাইভ নিউজের অফিস থেকে সুচেতাকে সোজা আপনাদের দপ্তরে তুলে নিয়ে যাওয়াটা আমি খুব একটা ভালো চোখে দেখছি না। ও তো ক্রিমিনাল নয়। বাচ্চা একটা মেয়ে। এতে ওর মনের ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে সেটা আপনাদের ভেবে দেখা উচিত ছিল না কি?’

অমিতাভর সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় করল দময়ন্তী। ঝানু উকিলের হুল বেরোচ্ছে। দময়ন্তী শীতল গলায় বলল, ‘ঘটনার গুরুত্ব অনুযায়ী আমরা রিয়াক্ট করেছি মিঃ দত্ত। সুচেতা এই কেসে কতটা গুরুত্বপূর্ণ একজন সাক্ষী, সেটা তো বুঝতেই পারছেন। কে ক্রিমিনাল, কে ক্রিমিনাল নয় সেটা তো তদন্তে প্রকাশ পাবেই। সুচেতা কি বাড়ি এসে বলেছে যে ওর সঙ্গে ক্রিমিনালের মতো আচরণ করা হয়েছে?’

বিবস্বান ব্যস্তসমস্ত হয়ে বললেন, ‘না না, তা কেন বলবে? একদমই তা নয়। আমি কথাটা ওভাবে বলিনি ম্যাডাম।’

লোকটা যে উঁচুদরের কথাশিল্পী, সেটা এই দু-দিনে অমিতাভ বুঝে নিয়েছেন। একটা কথাও না-ভেবেচিন্তে বলে না। তারই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অভিনয়েও দড়। অমিতাভ বললেন, ‘মজন্তালী সরকারের কেস কালকের পর আলাদা জায়গায় পৌঁছে গেছে মিঃ দত্ত। ভূত বা মানুষ যে-ই হোক, সে গোটা এস্টাবলিশমেন্টকে চ্যালেঞ্জ করেছে। আমরা এ-ব্যাপারে “জিরো টলারেন্স” নিচ্ছি। কথাপ্রসঙ্গে আপনাকে জানিয়ে রাখলাম জাস্ট।’

বিবস্বান সিরিয়াস মুখ-চোখ করে বারদুয়েক, ‘তা তো বটেই, তা তো বটেই’ বলে চুপ করে গেলেন।

‘হোয়াটেভার। কয়েকটা প্রশ্ন করব এবার। তার আগে একটা কথা বলে নিই। আপনাদের স্পষ্ট সমর্থন মজন্তালী সরকারের দিকে। আর সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আশা করব কোনও তথ্য আপনারা গোপন করবেন না।’

.

কসবা, সকাল ১১টা ৪৫

প্রোডিউসার অশোক বসু কসবায় তাঁর বিলাসবহুল থ্রি বি এইচ কে ফ্ল্যাটের তালা খুলছেন। আজ তাঁর সঙ্গে রয়েছে শমিতা। চাবুক ফিগার। অশোকবাবুর আর তর সইছে না।

‘শমিতা, তুমি কিছু নেবে?’

‘পরে স্যার,’ শমিতা গাঢ় গলায় বলল, ‘আগে একটু ফ্রেশ হয়ে নিই? বাথরুমটা কোনদিকে?’

শমিতার গায়ে ভুরভুর করছে সুগন্ধ। অশোকবাবু এ-গন্ধ বিলক্ষণ চেনেন। বাজারচলতি ডিও বা বিদেশি পারফিউম না। এ-হচ্ছে খাঁটি দেশি আতর। শামামা। রীতিমতো নেশা ধরায়। উত্তর দিতে দেরি হয়ে গেল অশোকবাবুর। শমিতা আবার প্রশ্ন করায় তাঁর হুঁশ ফিরল, ‘শিওর। ওয়াশরুম ডানদিকে।’

শমিতা বাথরুমের দিকে চলে গেল। তৈরি মেয়ে। খুব সুন্দর বুঝে নিয়েছে ব্যাপারটা। তাছাড়া অ্যারোমার সেন্স যাদের ভালো, তাদের ব্যাপারটাই আলাদা। অ্যারোমা ম্যাটারস। ভেরি মাচ ম্যাটারস। হাসিমুখে অশোকবাবু ফ্রিজ খুলে স্কচের বোতল বের করলেন। তারপর তাক থেকে তুলে নিলেন দুটো গ্লাস।

‘ওটা কি ম্যাকালান?’

ভয়ানক চমকে ওঠায় অশোকবাবুর হাত থেকে গ্লাসদুটো পড়ে গেল। মেঝেতে কার্পেট থাকায় ভাঙল না অবশ্য। অশোকবাবু দেখলেন ড্রইংরুমের দরজায় এক মুখোশধারী দাঁড়িয়ে আছে। আপাদমস্তক কালো পোশাক।

‘হোয়াট দা হেল…।’

‘আপনি সত্যিই বড়লোক। প্রতি সপ্তাহে ম্যাকালান যে-সে অ্যাফর্ড করতে পারে না।’

‘হু আর ইউ? এখানে ঢুকলে কী করে?’

‘এত বড়লোক হলেন কী করে মিঃ বসু? আপনার পাঁচটা সিনেমার চারটেই তো সুপার ফ্লপ।’

হঠাৎ অশোক বসু কেঁপে উঠলেন। তিনি দুটো জিনিস একসঙ্গে আবিষ্কার করে ফেলেছেন। এক, এই মহিলা এইমাত্র তাঁর সঙ্গেই এখানে এসেছে। আর দুই, এই সাজপোশাক প্রিন্ট আর ডিজিটাল মিডিয়ার সৌজন্যে তিনি বেশ কয়েকবার দেখে ফেলেছেন। ‘আই নো হু ইউ আর! আমি পুলিশে ফোন করছি! ইউ বিচ! তুমি জানো না কার সঙ্গে পাঙ্গা নিচ্ছ!’ বলতে বলতে পকেট থেকে ফোন বের করলেন তিনি।

মুখোশধারী পকেট থেকে একটা পিস্তল বের করে টেবিলের ওপর রেখে বলল, ‘তাড়াহুড়ো করবেন না অশোকবাবু। পুলিশে ফোন যাবে। কিন্তু এখনই না। আপনার লাশ খুঁজে পেতে অনেকক্ষণ সময় লাগবে।’

অশোক বসু কাঁপতে কাঁপতে সোফায় বসে পড়েছেন। ‘আমি কী করেছি?’

‘এসব ন্যাকা ন্যাকা কথা একদম পোষায় না, জানেন তো! পর্ন ফিল্মের ব্যবসা করাটাকে আপনি অপরাধ বলে মনে না করলেও আমি মনে করি।’

‘বুলশিট! মিথ্যে কথা! একদম মিথ্যে কথা! একজন রেসপেক্টেবল মানুষকে এসব জঘন্য অ্যালিগেশন…’

‘আপনার নিউ টাউনের ফ্ল্যাটে নিয়মিত পর্ন ফিল্ম শ্যুট হয়। গত সপ্তাহে শুক্রবারও হয়েছে। এমনকী এই ফ্ল্যাটেও কয়েকবার হয়েছে। তবে এটাকে আপনি মেইনলি কাস্টিং কাউচ পারপাসেই ইউজ করেন।’

অশোক বসুর গলা কাঁপছে। তবু তড়পে উঠে বলার চেষ্টা করলেন, ‘কী প্রমাণ আছে?’

মজন্তালী মুচকি হেসে বলল, ‘প্রমাণ আছে। যথেষ্ট প্রমাণ আছে। তবে আমি তো পুলিশ নই। আমি আপনাকে প্রমাণ দেখাব না। চার্জশিট দেব না।’

‘এসব বাজে কথা। প্লিজ আমায় ছেড়ে দিন। প্লিজ।’

‘মরার আগেও দোষ স্বীকার করবেন না? আপনি তো আচ্ছা লোক মশাই।’ মজন্তালী পিস্তল তাক করল।

‘আরে এটা কি মজা হচ্ছে নাকি? কী করছেন এটা?’

ব্লপ করে একটা চাপা শব্দ হল। অশোক বসুর কানের ঠিক তিন ইঞ্চি পাশ দিয়ে গুলিটা গিয়ে দেওয়ালের একটা ছবিকে চুরমার করে দিল।

অশোকবাবু ভারী শরীরটা নিয়ে হাঁটু গেড়ে বসার চেষ্টা করলেন। পারলেন না। থপ করে মাটিতে বসে পড়লেন, ‘প্লিজ। আমায় মারবেন না। আমি এসব ছেড়ে দেব।’

‘অবভিয়াসলি। মরে গেলে মানুষের পক্ষে কিছু করা সম্ভবও না।’

‘প্লিজ। দয়া করুন।’

‘আপনি দয়া করেন? যে মেয়েদের আপনি রোল দেবার নামে ধরে আনেন, তারা জানে আপনি ওদের শরীর ভোগ করার বিনিময়ে ওকে কী ধরণের ফিল্মের হিরোইন করবেন? আপনার এই ফ্ল্যাটের বেডরুমে দুটো সিসিটিভি ক্যামেরা আছে না? আপনি যে একজন জঘন্য ব্ল্যাকমেলার, অ্যাসপায়ারিং নায়িকারা সেটা জানে?’

‘ক্যান উই মেক আ ডিল? কত টাকা চাই আপনার?’

মুখোশধারীর বন্দুক ধরা টানটান ভঙ্গি সামান্য শিথিল হল, ‘টাকা দেবেন?’

‘হ্যাঁ। আপনার কত চাই বলুন।’

মুখোশধারী তারপর বলল, ‘খুচরো পয়সা আছে আপনার পকেটে? একটু দেখবেন?’

‘খুচরো? মানে?’

‘এক টাকা বা দু-টাকা। আছে?’

‘কেন ইয়ার্কি মারছেন? কত চাই বলুন না।’

অশোক বসু বিভ্রান্ত মুখে বুকপকেট হাতড়ে তিন-চারটে খুচরো পয়সা বের করে আনলেন।

‘অত লাগবে না। জাস্ট একটা কয়েন নিন। বাকিগুলো যথাস্থানে রেখে দিন।’ থাম্বস আপ দেখাল মুখোশধারী, ‘থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ। আমাকে দিতে হবে না। এবার টস করুন দেখি।’

‘মানে?’

‘গুলিটা কোথায় করব দেখি। মাথায় না বুকে।’

.

ভবানী ভবন, দময়ন্তীর চেম্বার, বেলা ১২টা ১৫

কার্ডে চোখ বুলিয়ে দময়ন্তীর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, ‘আসতে বলো।’

রমেশ মাথা নেড়ে বেরিয়ে গেল। একটু পরে দরজা ঠেলে ঢুকল শালিনী।

‘সাত বছর। নাকি আরও বেশি?’ দময়ন্তী চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে হাত বাড়াল। হাসিমুখ।

শালিনী মিটিমিটি হেসে দু-দিকে মাথা নাড়ল, ‘হয়নি, হয়নি। ফেল। ২০০৫-এর রিইউনিয়ন।’

‘উঁহু। পৌলমীর বিয়ে। মনে কর।’

‘না দময়ন্তীদি। দুটোই ২০০৫-এ। বাট পৌলমীর বিয়ে আগে। মে মাসে। আর রিইউনিয়ন ডিসেম্বর।’

‘তাই, না? তা হবে। ক্রিমিনাল ঘাঁটতে ঘাঁটতে মাথাটা গেছে আমার,’ দময়ন্তী ধপ করে চেয়ারে বসে পড়ে বলল, ‘যাকগে, কী খাবি বল।’

‘খেয়ে বেরিয়েছি। কফি বলে দাও। ব্ল্যাক, চিনি কম।’

দময়ন্তী বেল টিপে রমেশকে ডাকল। বলল, ‘দুটো ব্ল্যাক কফি, তার মধ্যে একটা কম চিনি। আর দুটো চিকেন স্যান্ডউইচ।’

শালিনী হাঁ হাঁ করে উঠল, ‘স্যান্ডউইচ কেন বলছ? আমি খেয়ে এসেছি!’

দময়ন্তী চোখ সরু করে বলল, ‘আমার খিদে পেয়েছে।’

‘তুমি তো দুটো বললে!’

‘আমি একা একা খেতে পারি না। কোম্পানি লাগে। একটা স্যান্ডউইচ খেলে মরে যাবি না।’

‘আরে পেট ভর্তি! সত্যি বলছি!’

‘চুপ করে থাক। কোনও কথা বলবি না। কোনও যোগাযোগ রাখিসনি ইডিয়ট।’

‘পুলিশে ছুঁলে ক-ঘা বলে যেন? সেইজন্যই তোমার সঙ্গে টাচে থাকতে ভয় পাই।’

‘মারব এক চাঁটি! বাঁদর!’

শালিনী কাঁচুমাচু হয়ে বলল, ‘সরি গো! মাঝখানে তিন বছর তো বাইরে চলে গেলাম। তারপর ফিরে নতুন চাকরি, বিয়ে, আদার্স কাজকর্ম নিয়ে একেবারে ল্যাজেগোবরে অবস্থা! তুমি তো সোশাল মিডিয়ায় নেই। না-হলে যোগাযোগ থাকত।’

‘সেটা একটা ব্যাপার। ফেসবুক না থাকলে আজকাল আর সত্যি যোগাযোগ রাখা হয়ে ওঠে না। সবসময় ফোন-টোন করা খুব চাপের ব্যাপার। আমার সত্যি বলতে কী, অত পোষায় না রে। তাছাড়া মাঝখানে একটা মিসহ্যাপ হয়ে আমি অনেকদিন…।’

শালিনী ‘আমি জানি দময়ন্তীদি। ব্যাপারটা আমি শুনেছি।’

দময়ন্তী নিরাবেগ গলায় বলল, ‘আমি নিজেও ভাবিনি এত বড় কেসে কাজ করতে পারব কোনওদিন। এর পিছনে রঞ্জাদির অনেকটা অবদান আছে। রঞ্জাবতী রায়। তুই নিশ্চয়ই চিনবি।’

‘এই ফ্র্যাটারনিটিতে আছি, রঞ্জাদিকে চিনব না? সায়েন্স কলেজে আমাদের ফ্যাকাল্টি ছিলেন। রঞ্জাদি তোমার কাউন্সিলর ছিলেন?’

‘হ্যাঁ।’

‘শি ইজ দ্য বেস্ট। আপাতত বছর তিনেকের জন্য কানাডা সেটল করলেন।’

‘সেটাই তো মুশকিল হয়ে গেল। আমার আরও কিছুদিন ওঁকে দরকার ছিল। এখন অবশ্য আরেকজনকে সাজেস্ট করে গেছেন। ওঁরই ছাত্রী। তনয়া রায়চৌধুরী।’

‘আরে! তনয়া তো আমার কলেজ জুনিয়র।’

‘তোদের ফ্র্যাটারনিটিটা বেশ ছোট, না?’

‘হ্যাঁ। মোটের ওপর সবাই সবাইকে চিনি।’ বলে শালিনী গলা খাদে নামাল, ‘তোমার এখনও হেল্প লাগছে দময়ন্তীদি?’

‘হ্যাঁ। আমি পুরোটা বেরোতে পারিনি। জানি না কোনওদিন পারব কিনা।’ বলেই দময়ন্তী সতর্ক হল। মনটা তলতলে হয়ে যাচ্ছে। প্রসঙ্গ পাল্টানো দরকার। দময়ন্তী হেসে বলল, ‘কিন্তু তোর সঙ্গে এভাবে আচমকা যোগাযোগ হয়ে কী যে ভালো লাগছে শালিনী!’

‘থ্যাঙ্কস টু মিস সরকার। কী বলো?’

‘মিস না মিসেস নট শিওর। বাট ইনডিড, মেলালেন তিনি মেলালেন।’

‘সরকারের ব্যাপারে কী বুঝছ দময়ন্তীদি?’

এসির আউটার পার্টের ঘরঘর শব্দ শোনা যাচ্ছে। মেশিনটার বয়েস হয়েছে মনে হয়। জোরে হর্ন বাজিয়ে একটা গাড়ি বেরিয়ে গেল। আর সব চুপ।

খুব ধীরে ধীরে দময়ন্তী বলল, ‘শালিনী, এই সময় তোর মতো কাউকেই দরকার ছিল রে!’

.

বালিগঞ্জ প্লেস, সকাল ১১টা ৪০

অফিসে এসে সৌমিলি দময়ন্তী মুখার্জীর সঙ্গে শালিনীর পূর্বপরিচয়ের ব্যাপারটা বলতেই সবাই লফিয়ে উঠল। শাক্য উৎসাহী গলায় বলল, ‘তাহলে বলছিস এবার থেকে কিছু কিছু স্কুপ আমরা খোদ ভবানী ভবন থেকেই পেতে পারি?’

সৌমিলি বলল, ‘সেটা কখন বললাম? আমি বললাম লিয়াঁজো মেনটেন করতে খানিক সুবিধা হবে হয়তো। এটুকুই।’

শিরিন জিগ্যেস করল, ‘কেমন সম্পর্ক রে? খুবই ক্লোজ?’

সৌমিলি বলল, ‘শালিনীদি তো তাই বলল। মাঝখানে বেশ কিছুদিন যোগাযোগ ছিল না। কিন্তু এককালে নাকি খুবই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।’

শাক্য বলল, ‘ওতেই হবে। টুকটাক খবর পেলেই হল।’

শিরিন শাক্যকে বলল, ‘তুই কি সিরিয়াসলি আশা করছিস দময়ন্তী মুখার্জী নিজে এবার থেকে ফোন করে করে আমাদের প্রগ্রেসের খবর জানাবেন?’

‘আরে বাবা, কিছু হাঞ্চ পেলে কনফার্ম তো করতে পারব। তাড়িয়ে তো দেবে না অন্তত।’

‘অত সোজা হবে না সোনা! দময়ন্তী মুখার্জী হেবি কড়া ধাতের লোক! তাছাড়া বড় বড় অফিসাররা পার্সোনাল আর প্রফেশনাল লাইফ আলাদা করতে জানেন। তোর মতো কাছাখোলা না।’

শাক্য বলল, ‘উপরওয়ালা এখন ছপ্পর ফুঁড়ে দিচ্ছেন। কেন আরও আরও আশা করব না ভাই? লীনা, সুচেতা সবাই আমাদের চ্যানেলেই এসেছে। মজন্তালী সরকার নিজে আমাদের ব্রেক দিচ্ছে। উপরওয়ালা সদয় হলে দেখবি দময়ন্তী মুখুজ্যের প্রসাদও পাব।’

.

ভবানী ভবন, সন্ধে ৬টা ৩০

তানিয়া ফাইলের স্তূপে ডুবে ছিল। ঘেমেনেয়ে একশা অবস্থা। সামনে বহুকাল আগে জুড়িয়ে যাওয়া এক কাপ চা। রাহুল ঘরে ঢুকে চেয়ারে বসে মাথাটা এলিয়ে দিল পিছন দিকে। বলল, ‘এগুলো কি আমাদের রেকর্ডসের ফাইল?’

তানিয়া কাঁদো কাঁদো মুখে তাকাল।

‘প্লিজ আমাকে হেল্প করতে বলিস না। বিশ্বাস কর, লালবাজার রেকর্ডসের সঞ্জয়দার সঙ্গে ডিল করতে গেলে আমাদের দিলীপবাবুকে ভগবান বলে মনে হবে।’

‘তোমার আর কী? অফিস থেকে গাড়ি পেয়েছ। টইটই করে বেড়াচ্ছ সারাদিন।’

‘লরির পিছনে কী লেখা থাকে দেখিসনি? হিংসে কোরো না। চেষ্টা করো। তোমারও হবে।’

‘ঘুরে তো বেড়াচ্ছ। দেখি কেমন বেড়াল শিকার করতে পারো।’

‘বেড়ালের এক্সপ্ল্যানেশনটা তোর মনে ধরেছে মনে হচ্ছে?’

‘খুব। মজন্তালী নামটা হেব্বি হয়েছে।’

‘তুই নিজেই তো বেড়ালের মতোই নরমসরম। তোকে দেখলে কেউ বলবে তুই সিআইডিতে আছিস? আসলে বাঘিনী কিনা সেটা অবশ্য জানি না।’

তানিয়া ফাইল বন্ধ করে চেয়ার ঘুরিয়ে রাহুলের মুখোমুখি হল, ‘শোনো, আমাকে দেখে নরমসরম মনে হয়। কলেজে পড়ার সময় আমার বন্ধু মিলিকে ‘মিল্কি’ বলে ডাকায় দুটো বরাহনন্দনের কানের গোড়া ফাটিয়ে দিয়ে এসেছিলাম। আক্ষরিক অর্থে ফাটিয়েছিলাম।’

‘ওরে বাবা!’ রাহুল দু-হাত তুলে সারেন্ডারের ভঙ্গি করল।

কটাক্ষ হেনে তানিয়া বলল, ‘সেইজন্যই তো বলছি, বেড়ালের উপমাটা বেশ জুতসই বেছেছে।’

‘না, জোকস অ্যাপার্ট, আমারও ভালো লেগেছে। সত্যি বলতে কী, নারীদের নিয়ে ন্যাকামিই তো করে এসেছে বাঙালি। (দীর্ঘ) ঈ কারের মতো চুল মেলে প্রেমিকা নাকি বিপ্লবের শত্রু হয়ে আছে। ভাব! ক্লারা জেটকিন কারও প্রেমিকা ছিলেন না? বা সিমন দ্য বভেয়া? ওঁদের কথা ছেড়ে দে, তুই গ্যারান্টি দিতে পারবি এই মজন্তালী সরকার কারও প্রেমিকা নয়?’

শেষ কথাটায় হেসে ফেলল তানিয়া, ‘ঠিকই তো। বউও হতে পারে।’

রাহুল চুল ঠিক করতে করতে বলল, ‘আমি শালা কোনওদিন বিয়েই করব না।’

‘প্রেম?’

‘অবশ্যই। প্রেম করব এবং লিভ ইন করব।’

‘বাড়িতে বাওয়াল দেবে না?’

‘দেবে। তাতে বয়েই গেল। লাখ লাখ খরচ করে সার্কাস করার কোনও মানে হয়, বল? কী বিপুল অপচয়! মধ্যবিত্ত বাঙালির জীবনে তো বিশেষ কিছু অ্যাচিভ করার নেই। চাকরি, বিয়ে, বাচ্চা। এই হচ্ছে মধ্যবিত্তের সত্যম, শিবম, সুন্দরম।’

‘মধ্যবিত্ত বাঙালির ওপর তোমার এত রাগ?’

‘মধ্যবিত্ত বাঙালি সবচেয়ে দু-মুখো। মুখে প্রগতিশীল হাবভাব। অথচ মাকে নির্বিচার পুজো, প্রেমিকাকে অসহ্য ন্যাকামি, বউকে নিয়ে সেক্সিস্ট জোক ছাড়া কিছুই দিতে পারে না। এই ছোট ছোট বিষয়গুলো আপাতভাবে ক্ষতিকর মনে না হলেও ম্যাটার করে, তানিয়া। সফট পুরুষতন্ত্র ব্যাপারটাকে ভালো করে বুঝে নিতে হবে। সব পুরুষতন্ত্রে মারধোর থাকে না, রক্তপাত থাকে না। পিয়ার প্রেশার থাকে, গ্যাসলাইটিং থাকে। এগুলো একেকটা প্রচ্ছন্ন সন্ত্রাস। ফ্রেডরিক অ্যাঙ্গেলস তো অনেক আগেই বলে গেছেন যে, পরিবার হচ্ছে রাষ্ট্রের ক্ষুদ্র সংস্করণ।’

‘মায়ের ব্যাপারটা কী বললে বুঝলাম না। মায়ের পুজোয় কী সমস্যা?’

‘পুজোয় সমস্যা নেই তো। পুজোর ছলে মানুষটাকেই ভুলে থাকলে সমস্যা আছে। ভালো করে ভাব তো, পারিবারিক পরিসরে মায়েদের মহান বানিয়ে এক্সপ্লয়েট করা ছাড়া আর কীই-বা করে উঠতে পারলাম আমরা? আমার মা বেচারি সবার খিদমত খাটতে খাটতে নিজেকে নিয়ে ভাবার সুযোগটাই পেল না কেন, মাকে জিগ্যেস করলে ঠিকঠাক উত্তর দিতে পারবে? পারবে না। মায়ের এই সারাদিনের গৃহশ্রমটাকে বাড়ির অন্যান্যরা ফ্রি সার্ভিস বলে ভেবে নিল কেন তার উত্তর দিতে পারবে কেউ? বাড়ির ছেলেদের কাছে যেটা অপশনাল, সেটা মেয়েদের ক্ষেত্রে কম্পালসারি কেন হয়ে যায়? কে উত্তর দেবে?’

‘আমাদের প্রায় সবার মায়েরই এক দশা রাহুলদা। ভালো বউ, ভালো মা হতে গিয়ে নিজেরই খোঁজ নিতে বেমালুম ভুলে গেল। সবার পরিবারেই এক দশা। নিম্নবিত্ত পরিবারে খানিকটা প্রকট। আমাদের মতো উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারে শিকলটা সোনার। এটাই যা তফাত।’

‘একশো মজন্তালী এলেও আমাদের মায়েদের পরিস্থিতি বদলাবে না রে।’

‘তবু প্রশ্নগুলো তো উঠতে শুরু করেছে রাহুলদা। এটাই বা কম কী, বলো?’

আলোচনাটা আর এগোল না। কারণ অমিতাভ এসে পড়লেন। পিছন পিছন দময়ন্তী। দময়ন্তীর হাতে দুটো ফটোপেপার। রাহুলদের সামনে ফেলে দিয়ে বলল, ‘এই দ্যাখ। এই দুই মক্কেল। জেড নিউজের রিপোর্টার সেজে ঢুকে পড়েছিল।’

রাহুল আর তানিয়া দেখল, ফর্মাল পরিহিত দুটি কমবয়সি মহিলা। দুজনেই মাঝারি উচ্চতা, চাপা গায়ের রং। একজন একটু বেশি রোগা। অত্যন্ত সাধারণ চেহারা।

দময়ন্তী বলল, ‘অ্যাক্টিভ সিসি ক্যামেরাগুলোয় এদের আসার টাইমিং দেখাচ্ছে কনফারেন্স শুরুর পনেরো মিনিট আগে। ঘর খোলাই ছিল।’

রাহুল ভুরু কুঁচকে বলল, ‘কিন্তু অত ওপরে প্রোজেক্টরের গায়ে কী করে ডিভাইসটা লাগাল সেটাই রহস্য।’

‘খবরের কাগজের মহিলা নয় কোনওভাবেই।’ তানিয়া ভালো করে দেখে বলল, ‘লুক আউট নোটিশ ছেড়ে দেওয়া হয়েছে?’

অমিতাভ নিজের চেয়ারে বসে বললেন, ‘বলেছি।’

রাহুল অমিতাভকে বলল, ‘একটা খবর শুনলাম স্যার। জয়েন্ট সিপি ক্রাইম নাকি আইজি হয়ে আসছেন।’

তানিয়া কথাটা শুনে ঝট করে মাথা তুলল, ‘অনিমেষ ভদ্র চলে যাচ্ছেন?’

অমিতাভ বললেন, ‘না। চতুর্বেদীর ভ্যাকান্ট পোস্টের এগেইন্সটে আসছেন।’

রাহুল মিচকে হেসে তানিয়াকে বলল, ‘দুঃখ পাস না।’

দাঁতে দাঁত ঘষল তানিয়া, ‘একটা মারও বাইরে পড়বে না বলে দিচ্ছি।’

অমিতাভ বললেন, ‘আরও কয়েকটা ট্রান্সফার হচ্ছে। ফোর্থ ব্যাটেলিয়নের শুদ্ধেন্দু চৌধুরী মালদা যাচ্ছে এস এস হয়ে। আইজি নর্থ বেঙ্গল নবীন চতুর্বেদী সিআইডি-র আইজি হয়ে আসছেন।’

‘তা-ও ভালো। কিন্তু জয়েন্ট সিপির ডিআইজি হয়ে আসাটা…।’ ঠোঁট কামড়াল দময়ন্তী, ‘অবশ্য লোকসভা ইলেকশনের আগে কিছু ট্রান্সফার হয়। ভোটের স্পেশাল দায়িত্ব নিয়েও আসতে পারেন।’

অমিতাভ বললেন, ‘এডিজিকে সরাসরিই জিগ্যেস করেছিলাম। উনি কিন্তু কথাটা এড়িয়ে গেলেন। ঠিকঠাক উত্তর দিলেন না। চতুর্বেদী ভালো লোক। যোগ্য লোক। হয়তো এই কেসে ওঁকে জুড়ে দেবে। আমাকে সরিয়ে ওঁকেও দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।’

রাহুল বলল, ‘আমরা দায়িত্ব নিয়েছি ক’দিন হয়েছে স্যার? অথরিটি কি আমাদের পি.সি.সরকার ভাবছেন?’

অমিতাভ ‘নো কমেন্টস’ ধরনের মুখ করে বললেন, ‘যাক গে, একটা প্রগ্রেস হয়েছে। সেটা তোমাদের জানিয়ে দিই। সুজান জর্ডান সত্যিই মারা গেছেন।’

দু-জোড়া চোখ নির্নিমেষ তাকিয়ে আছে তাঁর দিকে। অমিতাভ সবার চোখে একবার করে চোখ বুলিয়ে বললেন, ‘পাকা খবর। বিলিভ মি।’

রাহুল বা তানিয়া হয়তো এই কথাটার তল পাবে না, কিন্তু দময়ন্তী জানে সিনিয়র অফিসারেরা চাইলে কী কী করতে বা করাতে পারেন। ইন ফ্যাক্ট, দময়ন্তী আন্দাজ করতে পারছে পুরোটাই। গত পরশু রাতে হাজরা থেকে ফেরার সময় অমিতাভ স্যার নিউ মার্কেটে নেমে গেছিলেন। রাত ন’টা তখন। বেশ অড টাইম। মনে মনে হাসল দময়ন্তী। বলল, ‘ওয়েল। তাহলে এবার আমরা বাকি সম্ভাবনাগুলোর ওপর মনোযোগ দিতে পারি।’

‘একটু আগে টেলিকম থেকে এটা দিয়েছে,’ অমিতাভ পকেট থেকে একটা চওড়া এ-ফোর খাম তুলে দেখালেন। দময়ন্তী খামটা হাতে নিল। উপরে কনফিডেনশিয়াল আর নীচে সিআইডি টেলিকমের স্ট্যাম্প। মাঝে অমিতাভ সান্যালের নাম লেখা।

‘লীনা, সুচেতা আর লিলির কললিস্ট,’ অমিতাভ বললেন, ‘উইথ ট্রান্সস্ক্রিপ্ট। দ্যাখো।’

দময়ন্তী খাম খুলে কাগজগুলো বের করল। টেলিকম থেকে সন্দেহজনক কলগুলোয় লাল দিয়ে দাগিয়ে দেয়। দময়ন্তী দেখল, লীনা আর সুচেতার কললিস্টে কোনও লাল দাগ নেই। লিলির দুটো কলে লাল দাগ। দময়ন্তী মন দিয়ে ট্রান্সস্ক্রিপ্ট চেক করে বলল, ‘ঝুম্পা কয়ালের সঙ্গে কথা বলেছে লিলি।’

‘ইয়েস। জামদুনির ঝুম্পা কয়াল।’

‘কিন্তু এর কল লাল দাগিয়েছে কেন? এমন কিছু সন্দেহজনক কথাবার্তা তো দেখছি না। সুজানের স্মরণসভা নিয়ে কথা বলেছে।’

‘হয়তো মহিলাকেই সন্দেহভাজন হিসেবে ধরেছে।’

দরজা ঠেলে উঁকি দিল সুকুমার, ‘স্যার, মালিপাঁচঘড়া থানা থেকে এক অফিসার এসেছেন। মজন্তালীর কেসের ব্যাপারে কিছু কথা বলতে চান।’

‘আসতে বলো।’

সুকুমারের পিছন থেকে অবতীর্ণ হলেন চশমা আঁটা, নুন-মরিচ চুলের এক ভদ্রলোক। বয়স চল্লিশের সামান্য বেশি হবে। বেল্ট ছাপিয়ে বেরিয়ে পড়তে চাইছে নেয়াপাতি ভুঁড়ি। হাত জোড় করে বললেন, ‘আমি হাওড়ার মালিপাঁচঘড়া থানার সিনিয়র ইনস্পেকটর সাগ্নিক সাহা। মজন্তালীর কেসের ব্যাপারে কিছু কথা বলতে এলাম।’

‘বসুন,’ অমিতাভ চেয়ারের দিকে ইঙ্গিত করলেন, ‘চা-কফি কিছু বলি?’

সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করে ভদ্রলোক সরাসরি প্রসঙ্গে চলে এলেন, ‘হাওড়া ডিসট্রিক্ট সিআইডি থেকে ইন্দ্রনীলবাবু ফোন করে আমাদের থানায় থানায় খোঁজ নিচ্ছিলেন এমন কোনও পুরোনো কেস ফাইল পাওয়া যায় কিনা যেখানে রেপিস্টের আনন্যাচারাল ডেথ হয়েছে। আপনারা সেরকম ফাইলগুলো চেয়ে পাঠাচ্ছেন বোধহয়।’

‘হ্যাঁ।’

‘আমি সেই ব্যাপারেই এসেছি স্যার। একটা কেস আপনাদের কাজে লাগতে পারে। প্রতিশোধ তো আছেই। এছাড়াও মজন্তালীর কেসের সঙ্গে দু-একটা অদ্ভুত মিল রয়েছে। ভাবলাম আপনাদের কাছে সরাসরি চলে এলে আপনাদেরও সুবিধা হবে। সময় বাঁচবে। ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খেতে চাইছি ভাববেন না যেন।’

‘খুব ভালো করেছেন। বলুন কী ঘটনা।’

সাগ্নিক সাহা একটা বড় শ্বাস নিয়ে বললেন, ‘আটানব্বই সালের বাগনানের মহাদেবপুর গ্রামের ঘটনা। আমি তখন বাগনান থানায় পোস্টেড। প্রথম পোস্টিং। এক বছরও হয়নি ঢুকেছি। সেদিন আমিই ছিলাম ডিউটি অফিসার। পঞ্চায়েত প্রধানের দলবল এল একটা খুনের অভিযোগ নিয়ে। অভিযোগ একটা মেয়ের বিরুদ্ধে। মেয়েটার নাম রেখা ভট্টাচার্য। ঠিক তার মাস দেড়েক আগে মেয়েটার বোনকে রেপ করে খুন করেছিল একটা লোকাল ক্রিমিনাল। তবে কিছু প্রমাণ করা যায়নি এবং বদমাইশটা বেকসুর ছাড়া পেয়ে যায়। এবার অভিযোগ সেই মৃত নাবালিকার দিদির বিরুদ্ধে। সে নাকি ওই নানকু মণ্ডল নামের লোকটাকে খুন করেছে। পার্টির লোকজনের অবশ্য স্বাভাবিকভাবেই দাবি ছিল, নানকু নির্দোষ। মেয়েটাকে গ্রেপ্তার করার দাবিতে হইচই পাকিয়ে তুলল তারা।’

‘এত বড় একটা ঘটনা। অথচ খেয়াল পড়ছে না কেন?’ভুরু কুঁচকে দময়ন্তীদের দিকে তাকালেন অমিতাভ, ‘তোমাদের কারও খেয়াল পড়ছে?’

‘আমিও মনে করতে পারছি না,’ দময়ন্তী বলল, ‘আসলে মিডিয়া তখন এতটা অ্যাক্টিভ ছিল না।’

সাগ্নিক বললেন, ‘হ্যাঁ। তাছাড়া পার্টির তরফে ঘটনাটাকে অনেকটা চেপে দেওয়া হয়েছিল। সব সামনে থেকেই দেখলাম। হাত-পা বাঁধা ছিল। মেয়েটাকে জুভেনাইল হোমে পাঠানো হল। মেয়েটার পরিবারের ওপরেও সম্ভবত চাপ তৈরি করা হচ্ছিল। কয়েক মাসের মধ্যে ওখান থেকে চলে যায়। আমি এটুকুই জানি।’

‘বেশ। আপনার মনে হচ্ছে যে ওই মেয়েটির সঙ্গে আমাদের মজন্তালী সরকারের কেসের সম্পর্ক থাকলেও থাকতে পারে। তাই তো?’

‘হ্যাঁ। খুনটায় প্রতিশোধ ছাড়াও মজন্তালীর কেসের সঙ্গে আরও দু-একটা মিল রয়েছে। যেমন ধরুন, মজন্তালী সরকার বেশ কয়েকটা খুন করেছে গলায় চুলের কাঁটা গেঁথে। তাই তো? এই মেয়েটাও সেভাবেই খুন করেছিল। মজন্তালীর খুনের জায়গায় চিরকুট পাওয়া যায়। এই মেয়েটাও খুন করে চিরকুটে কবুল করেছিল। তাছাড়া আপনারা যে-মেয়েটির লুক আউট নোটিশ জারি করেছেন, অর্থাৎ যাকে মজন্তালী বলে সন্দেহ করছেন, তার বয়েস ত্রিশের এদিক-ওদিক। মেয়েটির বয়েস আটানব্বই সালে যদি পনেরো-ষোলো হয়, তাহলে এখন ওই তিরিশের আশেপাশেই।’

অমিতাভ বিশ্রামের ভঙ্গিতে চেয়ারে পিঠ এলিয়ে ছিলেন। সাগ্নিক সাহার কথা শুনতে শুনতে ক্রমশ টানটান হচ্ছিল তাঁর শরীর। দময়ন্তী, রাহুল, তানিয়ারাও ‘সাবধান’ মোডে চলে গেছে। দময়ন্তীর সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় করলেন অমিতাভ। বললেন, ‘বাগনান থানায় ফোন করে কেস ফাইলের কপিটা পাঠাতে বলো।’

‘তার দরকার হবে না স্যার,’ সাগ্নিক ব্যাগ থেকে একটা ক্লিয়ার ফাইল বের করে এগিয়ে দিলেন, ‘আমিই নিয়ে এসেছি কপি করে।’

হাত বাড়িয়ে ফাইলটা নিয়ে অমিতাভ বললেন, ‘অনেক উপকার করলেন সাগ্নিকবাবু। আপনি আপনার যোগাযোগ নম্বরটা রেখে যাবেন। আর সেই সময়ের ইনভেস্টিগেটিং অফিসারকে পাওয়া যাবে কিনা বলতে পারবেন?’

‘তখন যিনি মেজবাবু ছিলেন, নিমাই সাহা, তিনি দেখছিলেন কেসটা। শুনেছি তিনি গত বছর মারা গেছেন। তবে তখনকার বড়বাবুকে পেয়ে যাবেন। গোলাম কুদ্দুস। বাগনানের খাদিনান এলাকায় থাকেন। আপনারা তাঁর সঙ্গে দেখা করুন। আমি বাগনান থানার এখনকার বড়বাবুর নম্বর নিয়ে এসেছি। তাঁর থেকে কুদ্দুস সাহেবের যোগাযোগ নম্বর পেয়ে যাবেন আশা করি।’

‘নম্বরটা ওঁকে দিন।’ বলে লোকনাথের দিকে নির্দেশ করলেন অমিতাভ। সাগ্নিক ফোন ঘেঁটে নম্বর বের করে ফোনটা এগিয়ে দিলেন লোকনাথের দিকে। তারপর অমিতাভকে বললেন, ‘একটা অনুরোধ ছিল স্যার। যদি কিছু মনে না করেন।’

‘নিশ্চয়ই। বলুন।’

‘অনেকদিন তো জেলায় জেলায় ঘুরলাম। রেকর্ড ভালো। সার্ভিস বুকে কোনও কাটাকুটি নেই। ভবানী ভবনে আসার চেষ্টা করছি। হচ্ছে না। একটু ইয়ে করা যায় কিনা দেখবেন স্যার।’

‘আপনি তো হাওড়াতেই ঘুরছেন।’

‘রাজ্য পুলিশের কর্মীদের সে-কপাল কোথায় বলুন?’ ম্লান হাসলেন সাগ্নিক, ‘মাঝখানে শিলিগুড়ি, মেদিনীপুর আর বাঁকুড়া ঘুরে এসছি। লোকসভা ইলেকশন আসছে। এই সময় একটা বড়সড় শাফলিং হয় জানেন তো। আবার কোথায় নিয়ে ফেলবে কে জানে! আপনারা স্পেশালাইজড অফিসার, আমাদের দুঃখটা ঠিক বুঝতে পারবেন না স্যার।’

অমিতাভ জানালেন তিনি কর্তাদের বলে ‘ইয়ে’-র চেষ্টা করবেন। সাগ্নিক সাহা খুশি হয়ে স্যালুট ঠুকে বেরিয়ে গেলেন।

দময়ন্তী বলল, ‘এখান থেকে সত্যিই কিছু পাওয়া গেলে লোকটার “ইয়ে”-র ব্যবস্থা করতে হবে।’

‘তার আগে একবার এর আইডেন্টিটি ভেরিফাই করে নিতে হবে। বলা যায় না, মিসলিড করার চেষ্টা হতে পারে।’ বলে রাহুলের দিকে তাকালেন অমিতাভ, ‘ফোন-টোন করে হবে না, বুঝলে? আমি একটা ডিপ সার্চ চাইছি, ইনক্লুডিং ব্যাকগ্রাউন্ড চেক।’

.

রবিনসন স্ট্রিট, রাত ১১টা

ডিনার সারতে একটু দেরিই হয়ে গেল। ডায়েরি নিয়ে এসে খাটে আধশোয়া হল দময়ন্তী।

বাড়িতে থাকলে আজকাল সারাদিন একটা শব্দ কানে আসে। ড্রিল মেশিনের শব্দ। দিন নেই রাত নেই কারা যেন সব দেওয়াল ফুটো করে। নতুন ঘর বানায়। মেঝেতে মার্বেল বসায়। কারা খনন চালায় এত? কারা এত ঘর তোলে? দয়মন্তীর আজকাল মনে হয়, তার প্রেজেন্ট কনটিনুয়াস টেন্সটা বড্ড নড়বড়ে হয়ে গেছে। স্মৃতিতে বা ভবিষ্যতে তবু একটু বসার জায়গা আছে। ‘বর্তমান’-টা ঠিক কোথায়, ঠাহর করা কঠিন। তার বর্তমানটা কেমন ভগবানের মতো হয়ে গেছে। আছে বললে আছে, নেই বললে নেই। আজকাল একটা ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে দময়ন্তী তার আসল চেহারাটা টের পায় না। অন্তত কয়েক মিনিট পুরোনো হয়ে গেলে তবে তাকে ছুঁতে পারে। তবে তার সংবেদন জাগে।

এই কেসটাই যেমন। ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে, কিন্তু ধরা দিচ্ছে না ঠিক। যা যা ঘটে চলেছে, তাতে আরও অনেক বেশি রোমাঞ্চিত হওয়া উচিত ছিল না কি? কিন্তু হচ্ছে কই? একদিন যখন সব তামাদি হয়ে যাবে, তখন হয়তো এই ঘরে বসে বসে তাকে এই ভেবে শিহরিত হতে হবে যে, একদল মহিলা একটা গোটা রাজ্যের নড়া ধরে ঝাঁকিয়ে দিয়েছিল।

কাল সকালে উঠে একটা বুনো হাঁসের পিছনে তাড়া করতে হবে। কিন্তু দময়ন্তী কিছুই বোধ করছে না। কারও সঙ্গে মন খুলে কথাও বলা যাচ্ছে না। অফিসে বন্ধু হয় না। কলিগ হচ্ছে আঁতাতের সম্পর্ক। গরুর পিঠে কাকের মতো। অবশ্য রাহুল, তানিয়ার মতো ছেলেমেয়েগুলো এক ঝলক টাটকা হাওয়ার মতো। কিন্তু দময়ন্তী ওদের কাছেও মন খুলতে পারে না।

ভালোমতো দেখলে হয়তো দেখা যাবে, খরার দেশের দিগন্তরেখায় জলসত্র নিয়ে ঠিকই বসে আছে কেউ-না-কেউ। কিন্তু ততদূরে পৌঁছানো যাচ্ছে না। কী করে যেন কয়েক মিটার বাকি থেকে যায় ঠিক। কারও কাছেই, কোনও কিছুর কাছেই পৌঁছানো হয়ে ওঠে না। চরাচরব্যাপী ড্রিল মেশিনের শব্দ অদ্ভুত এক নিঃসময় নামিয়ে আনে পৃথিবীতে। নিজের রক্ত দেখার সাধ হয় দময়ন্তীর। ভদ্রভাবে চুঁইয়ে পড়া রক্তের ফোঁটা। কিংবা নিদেনপক্ষে লম্বা টানা একটি রক্তরেখা। পরীক্ষা করে দেখতে ইচ্ছে করে, কতদূর ছড়িয়ে গেছে বিষাদ। বিছানায় আধশোয়া হয়ে দময়ন্তী নিজেকে পড়ার চেষ্টা করে। নিজেকে খোঁড়ে। মাটিচাপা দেয়। আবার খোঁড়ে।

.

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *