মজন্তালী সরকার – পঞ্চবিংশ দিন

পঞ্চবিংশ দিন

তারিখ : ২৬ আগস্ট

বাগুইআটি, রাত ১২টা ৪০

ঘড়িতে প্রায় পৌনে একটা। এই সময় ফ্ল্যাটের বেল বাজালে যে-কেউ খচে বোম হবে। দময়ন্তীদের প্রশ্নের উত্তরে শম্পা চৌধুরীর পাশের ফ্ল্যাটের বয়স্ক, ভারিক্কী ভদ্রমহিলা রাগত স্বরে বললেন, ‘আমি কী করে বলি বলুন তো কোথায় গেল? এইটা একটা সময় হল কারও খবর জিগ্যেস করার? কে আপনারা?’

দময়ন্তী নিজেদের পরিচয় দিয়ে বলল, ‘দেখুন এত রাতে আপনাকে ঘুম ভাঙিয়ে এভাবে বিরক্ত করার জন্য আমরা অত্যন্ত দুঃখিত। আমরা একটা কেসের ব্যাপারে শম্পাদেবীকে খোঁজ করছি।’

সিআইডি শুনেই ভদ্রমহিলা ঘাবড়ে সাদা হয়ে গেলেন। দময়ন্তীর খানিক সময় গেল তাঁকে অভয় দিতে। কপালের ঘাম মুছে ভদ্রমহিলা বললেন, ‘শম্পা অত্যন্ত ভালো মেয়ে। বারো বছর ধরে আমরা প্রতিবেশী। কোনওদিন কারও সঙ্গে কোনওরকম সমস্যা হতে দেখিনি। স্কুল আর টিউশনি এই নিয়েই থাকত।’

দময়ন্তী বলল, ‘আপনার সঙ্গে সম্পর্ক তো ভালোই মনে হচ্ছে। গল্পগুজব হয় নাকি প্রায়শই?’

‘হয় তো। গল্পগুজব হয়। খাবারদাবার বিনিময় হয়। বারকয়েক একসঙ্গে সিনেমাও দেখতে গেছি। আসলে দুজনেই একা মানুষ। ও তো ফ্যামিলি করেনি। স্বামী মারা যাবার পর থেকে আমিও একা। ছেলে মুম্বইয়ে চাকরি করে। দু-মাসে একবার করে আসে। দুজনের জমতে সময় লাগেনি।’

‘আচ্ছা, মানিকতলা এলাকায় শম্পাদেবীর দিদির বাড়ি ছিল, এরকম কিছু জানেন?’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ, সাহিত্য পরিষদের কাছে। প্রায়ই যেত সেখানে। তবে দিদি গত বছর মারা গেছেন বলে শুনেছি। সেখানে এখন কেউ থাকে না মনে হয়।’

‘দিদির কোনও ছেলেমেয়ে আছে কিনা জানেন?’

‘এক ছেলে। বাইরে থাকে। যতদূর জানি ব্যাঙ্গালোরে চাকরি করে। নামধাম কিছু জানি না।’

‘তদন্তের স্বার্থেই একটা প্রশ্ন করছি। কিছু মনে করবেন না। আপনাদের বাড়ির কাছে এই এসবিআই-টায় আপনার অ্যাকাউন্ট আছে?’

‘হ্যাঁ। কেন বলুন তো?’

‘ওই ব্রাঞ্চে শম্পাদেবীরও অ্যাকাউন্ট আছে। গত দু-মাসে কয়েক খেপে তিনি পিএফের প্রচুর টাকা তুলে নিয়েছেন। দশ বছর পুরোনো একটা এফডি ভেঙেছেন। এ-ব্যাপারে কিছু জানেন?’

‘যার টাকা সে তুলেছে। আমি কী করে জানব?’

‘না, না, আমার জিজ্ঞাস্য হচ্ছে উনি নতুন কিছু কিনেছেন বা কোনও খাতে অনেক টাকা খরচ করেছেন বলে জানেন? এই যেমন ধরুন, নতুন গাড়ি কেনা বা ঘরের ইন্টিরিয়ারের কাজ, বা কিচেন রেনোভেশন?’

‘আমি এই কিছুদিন আগেও শম্পার ঘরে চা খেতে গেছিলাম। সেরকম কিছুই দেখিনি।’

অমিতাভ সতীর্থদের দিকে ফিরে স্বগতোক্তি করলেন, ‘এত টাকা কোথায় গেল তবে?’

তানিয়া বলল, ‘কয়েক লাখ টাকায় কী হবে স্যার?’

‘তেমন কিছুই হবে না। কিন্তু যদি আরও অনেকে এরকম কয়েক লাখ করে টাকা করে দেয়?’

বয়স্ক ভদ্রমহিলা আচমকা একটু কেঁপে উঠলেন। যেন হঠাৎই কিছু-একটা মনে পড়ে গেছে তাঁর, ‘আপনারা কি মজন্তালী সরকারের কেসে শম্পার খোঁজ করছেন?’

.

ব্যাঙ্গালোর, সকাল ৮টা

‘মিঃ নীলাচল চক্রবর্তী?’

‘বলছি।’

‘আমি দময়ন্তী মুখার্জী বলছি। ওয়েস্ট বেঙ্গল সিআইডি থেকে।’

কেঁপে গেলেন আইটি কর্মী, ‘ক…কী ব্যাপার ম্যাডাম?’

‘শম্পা চৌধুরী আপনার মাসি তো?’

‘হ্যাঁ। কেন বলুন তো?’

‘ওঁর সম্পর্কে কিছু কথা জানতে আপনাকে ফোন করলাম। শম্পাদেবী এখন কোথায় আছেন আপনি জানেন?’

‘উনি তো বাগুইআটিতে থাকেন।’

‘না। সেখানে ওঁকে পাওয়া যায়নি। গত কুড়ি তারিখের পর আর ওঁকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। স্কুল বলছে, উনিশ তারিখ থেকে ছুটিতে। দু সপ্তাহের আর্নড লিভ নিয়ে নিয়েছেন একসঙ্গে। সরকারি চাকরিতে ছুটি নিয়ে বাইরে গেলে স্টেশন লিভের অনুমতি নিতে হয়। সেরকম কিছু উনি দিয়ে যাননি।’

‘সে কী?’ বিচলিত হলেন নীলাচল, ‘আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।’

‘শম্পাদেবীর সঙ্গে আপনার যোগাযোগ কেমন?’

‘খুব যে যোগাযোগ আছে তা না। ওই বিজয়া, নববর্ষটুকু জানাই। কিন্তু…।’

‘মিঃ চক্রবর্তী, আপনাকে একবেলার জন্য হলেও ছুটি নিয়ে কলকাতায় আসতে হবে। সম্ভব হলে আজই আসুন। আপনার ছোটমাসি একটা ভয়ানক ক্রাইমের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন।’

‘এসব কী বলছেন অফিসার?’ খাবি খেলেন নীলাচল, ‘উনি একজন রেসপেক্টেবল টিচার।’

‘টিচার হলে সিরিয়াল কিলার হওয়া যাবে না, এমন তো কোথাও লেখা নেই।’

‘সিরিয়াল কিলার?’

‘আজ্ঞে। মজন্তালী সরকারের নাম শুনেছেন তো?’

.

ঘোষ ইন্সটিটিউশন, সকাল ১০টা ১০

ভূগোলের প্রবীণ শিক্ষিকা রুমা মণ্ডল আলুথালু বেশে উদ্ভ্রান্তের মতো ক্লাসরুমের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছেন। দেখে কাবেরী ঘাবড়ে গেলেন। টেবিলে বই উল্টে রেখে তড়িঘড়ি ঘরের বাইরে এলেন, ‘কী হয়েছে গো!’

রুমাদি হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, ‘তোর হাজব্যান্ড এসেছেন।’

কাবেরীর চোখ কপালে উঠল, ‘এখানে?’

‘হ্যাঁ। শম্পার খোঁজ করছেন। হয়তো আমাদের সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন।’

‘কিন্তু কেন?’

‘শম্পাকে ওরা মজন্তালী সরকার বলে সন্দেহ করছেন।’

.

ভবানী ভবন, দুপুর ১টা

দময়ন্তী যে-ফোনকলের অপেক্ষা করছিল, সেটা এল না। বদলে এল অন্য একটা ফোনকল। অচেনা নম্বর। ওপাশ থেকে ভরাট এক নারীকণ্ঠ বলল, ‘দময়ন্তী মুখার্জী বলছেন?’

‘বলছি। আপনি?’

‘আমার নাম সর্বাণী সেন।’

অবিশ্বাসে, সম্ভ্রমে কেঁপে গেল দময়ন্তীর গলা, ‘বলুন ম্যাম।’

‘নবীন চতুর্বেদী বোধহয় গতকাল আপনাকে একটা হাঞ্চ দিয়েছে। আমি সেটা কনফার্ম করতে ফোন করলাম। বাংলাদেশী ওই মহিলার নাম ফারজানা হক। উনি সুজান জর্ডানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন।’

সদ্য ওয়াক্সিং না-করালে গায়ের লোমগুলো খাড়া হত নির্ঘাত। আকাশ থেকে পড়া-গলায় দময়ন্তী বলল, ‘নায়িকা ফারজানা হক?’

‘হ্যাঁ। তবে নেপথ্যে আরও একজন রয়েছেন বলে আমার অনুমান। তিনি বড়সড় কোনও পদাধিকারী আমলা বা অফিসার। জানতে পারলে জানাব।’

দময়ন্তীর মাথার মধ্যে প্রবল বেগে ফর্মুলা ওয়ান রেসিং চলছে। এই সুজান জর্ডানের কেসেই রাজ্য সরকারের সঙ্গে মনোমালিন্যে জড়িয়ে পড়েছিলেন সর্বাণী সেন। বহুদিন টিভি এবং কাগজের ফ্রন্টপেজে বিরাজ করেছে তাঁর অনমনীয়তা আর সাহসের অলৌকিক আখ্যান। তাঁর বদলির পিছনে সরকারি অসূয়া কাজ করেছে, এ-কথা কারও জানতে বাকি নেই। সেই মানুষটা আজ সম্ভবত এই কেসের সবচেয়ে বড় লিডটা দময়ন্তীকে প্লেটে করে সাজিয়ে দিলেন।

সর্বাণী সেন বোধহয় ওপাশ থেকে দময়ন্তীর মনের কথা বুঝতে পারলেন। একটু চুপ করে থেকে তিনি বললেন, ‘আই অ্যাডোর সুজান। বাট আই অ্যাডোর মাই সার্ভিস মোর দ্যান এনিথিং।’

.

পার্ক স্ট্রিট, দুপুর ২টো

‘উইগটা জ্বালাচ্ছে, না?’

‘একটু কুটকুট করছে। কিন্তু সেটা কথা না। কথা হচ্ছে, হোয়াট নেক্সট?’

‘আপনি কিচ্ছু চিন্তা করবেন না শম্পাদি। আপনি নিশ্চিন্তে সেফ হাউজে যান। কয়েকদিন লুকিয়ে থাকুন। তারপর বাংলাদেশ চলে যাবার ব্যবস্থা করব।’

‘আমি আমার কথা বলছি না। আমি তোমাকে নিয়ে ভাবছি। বাকিদের নিয়ে ভাবছি।’

‘কিচ্ছু ভাববেন না। আমরা সাবধানে থাকব। ইউ জাস্ট টেক কেয়ার। এই যে, আপনার গাড়ি এসে গেছে।’

.

ভবানী ভবন, দুপুর ২টো ২০

তানিয়া একা একা ওয়ার্ক স্টেশনে বসে ল্যাপটপ ঘাঁটছিল। দময়ন্তীকে ফিরতে দেখে বলল, ‘কোথায় ছিলে? ফোনে পাচ্ছিলাম না।’

‘কিছু পেলি?’

‘শিলিগুড়ির সাগর হোটেলের সিসিটিভি ফুটেজে দুই মহিলার ছবি পাওয়া গেছে। রিসেপশনে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন। তবে ফ্রন্ট শট না। আর ফুটেজের কোয়ালিটিও বেশ বাজে। একজন মামণি হেমব্রম হতে পারে।’

‘কোয়াইট অবভিয়াস।’ দময়ন্তী চেয়ারে বসে বলল, ‘আরেকজন? চেনা কারও সঙ্গে মিল পাওয়া যাচ্ছে?’

‘না, আরেকজনের প্রোফাইল কোনও সাসপেক্টের সঙ্গে মিলছে না। জয়ন্তদা আরেকবার অ্যানালাইজ করছে। বিকেলের মধ্যে রিপোর্ট দেবে।’

‘গুড। এবার আরেকটা জরুরি কথা বলি শোন। সুনীতা দেওয়ানের নাম শুনেছিস?’

তানিয়া একটু মনে করার চেষ্টা করে বলল, ‘আমতলার সেই কুখ্যাত রেপ কেস?’

‘ভেরি গুড। কবে ঘটেছিল?’

‘একানব্বই বোধহয়।’

‘নব্বই। তিরিশে মে। স্বাস্থ্য দপ্তরের তিন মহিলা-কর্মী কাজ সেরে গাড়ি করে ফিরছিলেন। একদল দুষ্কৃতি গাড়ি থামিয়ে ড্রাইভারকে খুন করে এবং তিনজন মহিলাকে ধর্ষণ করা হয়। একজন ঘটনাস্থলেই মারা যান। বাকি দুজনকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সুনীতা দেওয়ানের ক্ষতবিক্ষত যোনির ভিতর একটা টর্চ পাওয়া গেছিল।’

তানিয়া সামান্য শিউরে উঠল। বলল, ‘সুনীতা দেওয়ানের সঙ্গে মজন্তালীর কিছু লিঙ্ক আছে?’

‘সম্ভবত। এই কেস সাধারণত সুনীতা দেওয়ান বা আমতলার নামে চিহ্নিত হয়। বাকি যে-দুজন মহিলা সেদিন ধর্ষিত হন, তাঁদের নাম একটু আড়ালে চলে গেছে। ঝুমা ঘোষ আর শিবানী মণ্ডল। এই দুজনের মধ্যে একজনের নাম এই কেসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বলে মনে হচ্ছে। আরেকটু শিওর হয়ে বলব।’

‘হাইপোথিসিসটুকুই বলো না।’

‘উঁহু। আরেকটু শিওর হওয়া দরকার।’

‘সিরিয়ালের মতো আচরণ করো কেন?’ তানিয়া রেগেমেগে বলল, ‘কোমর অবধি দেখিয়ে এপিসোড শেষ করে দেবার কী মানে? এখন অশান্তিতে মরব।’

‘রাগ করিস না। চেকভের বন্দুক কাকে বলে জানিস?’

‘না।’

‘চেকভ’স গান একটা লিটারারি কয়েনেজ। কোনও কোনও সমালোচক বলছেন, একটা কাহিনিতে যে যে বিষয়ের উল্লেখ থাকে তার যে-কোনওটাই গল্পের প্লটের জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠতে পারে। সে আপাতদৃষ্টিতে যত তুচ্ছ জিনিসই হোক না কেন। চেকভের গল্পে এরকম দেখা যেত। একটা জায়গায় হয়তো নিতান্ত কথাচ্ছলে একটা বন্দুকের কথা বলা আছে। শেষে দেখা গেল সেটাই একটা বড়সড় ভূমিকা নিল। একটা তদন্তের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা সেরকম। খুঁটিনাটি যা যা পয়েন্ট আছে সব খেয়াল রাখতে হয়। পাইলেও পাইতে পারো অমূল্য রতন। বুঝলি? এই কেসটা তিনটে আলাদা আলাদা দিক থেকে এসে ওই আমতলা-কেসের সঙ্গে জুড়ছে।’

‘তিনটে আলাদা দিক মানে?’

‘পার্ক স্ট্রিট, লিলুয়া হোম আর নর্থ বেঙ্গল। তিনটে রাস্তাই এসে মিশছে আমতলায়।’

‘সবই তো মাথার ওপর দিয়ে গেল,’ তানিয়া কাতর গলায় বলল, ‘পুরোটা না বলো, খানিক হিন্ট তো দাও অন্তত।’

‘বেশ, নর্থ বেঙ্গল দিয়ে শুরু করি তবে?’ দময়ন্তী গলায় রহস্য ঢালল, ‘বাংলাদেশের কজন ফিল্মস্টারকে চিনিস আগে শুনি। খানকতক নাম বল দেখি।’

.

হাটারি রেস্তোরাঁ, সল্টলেক, দুপুর ২টো ৪৫

ধোঁয়া-ওঠা ক্যান্টনিজ নুডলসকে কাঁটাচামচ দিয়ে বাগ মানাতে মানাতে কাবেরী বললেন, ‘শম্পাকে এই ভূমিকায় ভাবতেই পারছি না জাস্ট। এত বছরের কলিগ। স্টাফরুমে নেহাত কম সময় কাটাইনি। কিন্তু বিশ্বাস করো, কোনওরকম আঁচ পাইনি। বরং ওকে যথেষ্ট পেট্রিয়ার্কাল মনে হত।’

অমিতাভ বললেন, ‘ওটা ওর কভার ছিল।’

‘একটা মানুষ এতটা সিক্রেট কী করে বজায় রাখতে পারে তাই ভাবছি! আচ্ছা, তোমরা কি শম্পাকে অত্যাচার করবে?’

‘আরে, মহিলা আগে ধরা পড়ুন!’

‘ধরা পড়লে থার্ড ডিগ্রি দেবে? বলো না।’

‘এ-ব্যাপারে আমাকে ভরসা করো না করো, দময়ন্তী মুখার্জীকে ভরসা করতে পারো। অত্যাচার হবে না এরকম কথা দিতে পারছি না। তবে দময়ন্তী থাকতে অন্যায়ভাবে অত্যাচার হবে না।’

‘হ্যাঁ। দময়ন্তী তোমাদের মধ্যে একেবারে অন্যরকম।’

‘বরাবরই তাই। তবে এই কেসে ওকে আগের চেয়ে অনেক বেশি কম্পোজড দেখছি। রিজিডিটিও কমেছে। আমি বলব, ওর ব্যক্তিগত ট্রাজেডিটা ওকে আলাদারকমের একটা ভিশন দিয়েছে।’

‘রঞ্জন চৌধুরী ছেলেটা অসম্ভব ভালো লিখত। খুব দুঃখজনক।’

‘যা-ই হোক, শম্পা চৌধুরী দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন মানে এই নয় যে তোমার ওপর থেকে নজরদারি সরছে।’ হাসতে হাসতে বললেন অমিতাভ, ‘মজন্তালী সরকার একটা উইমেনস গ্যাং। যদি তুমি তার মেম্বার হও, এখনও সময় আছে। স্বীকার করে নাও।’

‘স্বীকার আমি করতেই পারি। কিন্তু তুমি হাজব্যান্ড কোটায় শাস্তি কম করানোর চেষ্টা করবে তো?’ হেসে উঠলেন কাবেরী।

অমিতাভ ভুরু নাচালেন, ‘হাজব্যান্ড কোটা তা-ও থাকতে পারে। কিন্তু এক্স হাজব্যান্ড কোটা থাকার কোনও চান্স নেই।’

কাবেরী আর এক চামচ নুডল মুখে তুলে বললেন, ‘উইমেনস গ্যাং কথাটা ভালো লাগছে। চারদিকে “গার্লস গ্যাং” কথাটা শুনতে শুনতে একটা খারাপ লাগা তৈরি হয়েছিল। ফাইনালি মাঝবয়েসি মহিলাদেরও যে তোমরা হিসেবে ধরছ, ভালো লাগছে।’

‘সে তোমার কলিগেরই কৃতিত্ব। নাহলে আমরা এতদিন মজন্তালীদের বয়স তিরিশ বছরের আশেপাশে ধরেই এগোচ্ছিলাম। মানে ওরাই ওরকম একটা ভাইব তৈরি করে দিয়েছিল। একজন মাঝবয়েসি অবশ্য আমাদের সন্দেহের তালিকায় অনেক আগে থেকেই ছিলেন। উপাসনা আচার্য।’

‘আচ্ছা, সম্পূর্ণা মিত্রকে কি তোমরা ক্লিনচিট দিয়েছ?’

‘এই তো পুলিশের চাকরির খারাপ দিক। প্রফেশনাল কোনও কথা নিজের বউয়ের সঙ্গেও শেয়ার করা যায় না।’

‘হুঁ। প্রাক্তন বউয়ের সঙ্গে তো করাই যায় না। বিশেষত সে নিজেই যদি সন্দেহের তালিকায় থাকে।’

‘এটুকু বলতে পারি, উপাসনা আচার্যের বাড়ির মিটিংটায় যারা ছিল, অনেকেই এখনও আমাদের সন্দেহের তালিকা আলো করে বসে আছেন। ইনক্লুডিং ইউ। তবে আমি বিশ্বাস করি তুমি নির্দোষ।’

‘তুমি আমাকে যথেষ্ট চিনে উঠতে পারোনি, অমিতাভ। তুমি কী করে জানবে আমি দোষী কিনা?’

‘আরে সেই কারণে না। তোমাকে নির্দোষ মনে করছি কারণ আমি নিশ্চিত, এক জায়গা থেকে একাধিক বেড়াল বেরোবে না।’

‘হুমম। দ্যাটস ইন্টেলিজেন্ট।’

কাফের বাইরে নিরলঙ্কার এক বিকেল আপন মনে বয়ে যাচ্ছে। সেদিকে তাকিয়ে অমিতাভ আচমকা বিনা-ভূমিকায় বলে বসলেন, ‘কাবেরী? আরেকবার শুরু করা যায়?’

কাবেরী কি একটু অবাক হলেন? অবাক অমিতাভ নিজেও হয়েছেন। লজ্জিতও। একেকটা মুহূর্তকে রবার দিয়ে স্রেফ মুছে দিতে ইচ্ছে করে। এটা সেরকম একটা মুহূর্ত ছিল। যথাসম্ভব গম্ভীর হয়ে চাউমিনে মনোনিবেশ করার ভান করলেন অমিতাভ।

কাবেরী বলল, ‘সত্যি কথা বলব? একটা বয়েসে পৌঁছে সুন্দর কথার চেয়ে সত্যি কথা বলতেই বেশি ইচ্ছে করে।’

অমিতাভ একটু গা-ছাড়া গলায় বললেন, ‘সত্যিটাই বলো।’

‘আমি তোমায় মিস করছি না অমিতাভ।’

অমিতাভ এবার সোজাসুজি তাকালেন কাবেরীর চোখে। অভিব্যক্তিহীন দৃষ্টি।

কাবেরীর গলা সামান্য দ্রব হল, ‘একা আমি অনেক বেশি ভালো আছি। আমার ধারণা, তুমিও।’

অমিতাভ কাবেরীর দিকে চেয়ে রইলেন অপলক।

‘সঙ্গী হিসেবে তুমি মন্দ নও। স্পেস দিতে জানো। হয়তো প্রয়োজনের চেয়ে বেশিই স্পেস দাও। শেষমেশ সেটাই হয়তো আমাদের মধ্যে দুর্লঙ্ঘ্য ব্যবধান হয়ে দাঁড়াল। সম্পর্কের গোড়ায় রোজ জল দিতে হয়। টবের গাছের মতো। আমাদের গাছটা জলের কষ্টে মরে গেছে।’ বলে একটু থেমে কাবেরী যোগ করলেন, ‘তোমার বিরুদ্ধে আমার তেমন ক্ষোভ বা অভিযোগ নেই। আমাদের জুটিটা জাস্ট ক্লিক করল না।’

অমিতাভ বাকি চাউমিনটুকু শেষ করে টিস্যুকাগজ দিয়ে মুখ মুছলেন। তারপর বললেন, ‘বুঝলাম।’

‘কিন্তু আমি সত্যি খুশি হব বাকি জীবনটা আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকলে।’

‘তাহলে মাঝে মাঝে আমার সঙ্গে ডেটে যেতে আপত্তি নেই বলছ?’

যেভাবে অল্প অল্প করে ভোর হয়, ঠিক সেরকম একটা অপূর্ব হাসি ছড়িয়ে পড়ল কাবেরীর সারা মুখে।

.

ভবানী ভবন, বিকেল ৪টে ১৫

রাজ্য পুলিশের হেড কোয়ার্টার থেকে বেরিয়ে ডানদিকে কয়েক গজ এগোলে দ্বিতীয় গলির ভিতর গিট্টুর চা-পাউরুটির দোকান। দময়ন্তীর এমনিতে ধোঁয়ার নেশা নেই। একমাত্র গিট্টুর দোকানে গেলেই সিগারেট খায়। খেতে হয়। তবে কোনও কেসের ব্যাপার থাকলে তবেই। গিট্টুর দেওয়া সিগারেট-বাক্সে সাদা কাঠি থাকে একটাই। সঙ্গে ভাঁজ করা একটা সাদা কাগজও থাকে। কখনও তাতে এক-দুটো শব্দ লেখা থাকে, কখনও গোটা একটা লাইন। বাক্সটা পকেটে পুরে বাকি পথটা দময়ন্তী আঙুলের ফাঁকে সিগারেট নিয়ে অলস গতিতে হেঁটে হেঁটে ফেরে। মাঝেসাঝে একটা-দুটো টান দেয়। ‘ইন’ করে না। প্রবল ইচ্ছে হলেও নিজের কেবিনে ঢোকার আগে বাক্সটা খোলে না কখনও।

আজকেও বাক্স পকেটে নিয়ে মুখে উদাসীনতার পোস্টার ঝুলিয়ে ফিরছিল দময়ন্তী, আর ভাবছিল অবিশ্বাস জিনিসটাই যে-চাকরির আসল মূলধন সেই চাকরি করে কোনও মানুষ কি সুখী হতে পারে কোনওদিন?

লিফটে পৌঁছানোর ঠিক আগে হাফিজের ফোনটা এল, ‘আপনার আমতলার বইটা পেয়ে গেছি ম্যাডাম।’

দময়ন্তী উত্তেজনায় লাফিয়ে উঠল প্রায়, ‘থ্যাঙ্কিউ হাফিজ ভাই! আপনি অসাধ্য সাধন করেছেন।’

খিচিক করে হাসল হাফিজ মিয়াঁ, ‘ম্যাডাম, এটা কলেজ স্ট্রিট। ঠিকমতো খুঁজলে এখানে ব্যাসদেবের ডায়েরিও পাওয়া যাবে।’

‘কাউকে দিয়ে এখনই পাঠিয়ে দিন প্লিজ।’ বলে ফোন রেখে দময়ন্তী হাত মুঠো করে শূন্যে ছুড়ে দিল একবার। তারপর দ্রুত পায়ে নিজের কেবিনে ঢুকে দরজা এঁটে পকেট থেকে সিগারেটের বাক্সটা বের করল। এবার শুধু এটা খোলার অপেক্ষা। আমতলার বইটা হাতে এলে একটা সন্দেহের এসপার-ওসপার হয়ে যাবে, আর বাক্সের ভিতরের কাগজটা খুললে আরেকটা। দুটো লাইনই কি একই জংশনে গিয়ে মিলবে?

দময়ন্তীর বুকের ভিতর ঘরঘর শব্দ করে একটা আর্থ অগার মেশিন চলতে শুরু করল।

.

সিটি সেন্টার, সল্টলেক, বিকেল ৫টা

‘কোথাও ভুল হচ্ছে না তো?’ অমিতাভ উত্তেজিত হয়ে প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘ক্রসচেক করো প্লিজ।’

ফোনের ওপার থেকে জাপান বলল, ‘পাক্কা খবর স্যার। ফারজানা হক বছরে অন্তত চার-পাঁচ মাস এখন শিলিগুড়িতে থাকছেন।’

হলের লোকজন চরম বিরক্ত। কাবেরীর কপালেও ভ্রূকুটি। অমিতাভ অবশ্য সেসব খেয়াল করার অবস্থায় নেই। মাথায় চাক্কাজ্যাম হয়ে গেছে। সামনে পরদায় শাহরুখ আর দীপিকা তুমুল নাচাগানা করছেন। ফোন রেখে অমিতাভ খানিকক্ষণ সেটাই দেখলেন হাঁ করে। মিনিট দু-তিনেক পর হুঁশ ফিরতে উঠে বাইরে বেরিয়ে দ্রুতপায়ে এগোলেন পার্কিংয়ের দিকে। পিছন পিছন কাবেরী প্রায় ছুটছেন, কিন্তু অমিতাভর সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই।

.

ভবানী ভবন, বিকেল ৫টা ৫০

ওয়ার্ক স্টেশনে দময়ন্তী একা বসে আছে। মাথার ভিতর একটু আগে আছড়ে পড়েছে দৈত্যাকার একটা উল্কা। বাইরে ঘ্যানঘ্যানে বৃষ্টি। অন্ধকার হয়ে এসেছে। দময়ন্তী আলো জ্বালেনি। ব্যস্ততার মাঝে ফাঁক পায়নি, আজ বেশ কিছুদিন পর সার-জল পেয়ে গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াচ্ছে বিষাদ। ব্যাপারটা এখনই কাউকে বলা যাবে না। নিশ্চিত হওয়া দরকার। অন্য মেথডে দেখে নিতে হবে, অঙ্ক মিলছে কিনা। মাথা ঝাঁকিয়ে নিজেকে চাঙ্গা করার চেষ্টা করল দময়ন্তী। তারপর ক্লারিকাল সেকশনের অরিজিৎ সেনের নম্বর বের করে কল করল, ‘শোন, আমাদের আপডেটেড ট্রান্সফার পলিসি নিয়ে দু-বছর আগে একটা অর্ডার বেরিয়েছিল না?’

অরিজিৎ এসব ব্যাপারে গেজেট। বলল, ‘হ্যাঁ। এগারোর অক্টোবরে বেরিয়েছিল। লাগবে?’

‘হ্যাঁ। ওটা মেল কর। আর সেই বছরের অর্ডার কম্পেনডিয়ামটা পুরোটাই পাঠা।’

‘পাঠাচ্ছি। দশটা মিনিট টাইম দাও।’

.

মিলেনিয়াম পার্ক, সন্ধে ৬টা ৪৫

‘এত বাঘা বাঘা সাসপেক্ট ছেড়ে শেষে নিরীহ শিক্ষিকা?’

‘বেড়াল আর বাঘের ইনুয়েন্ডোটা কতটা ভালো ছিল বুঝতে পারছিস তো?’

শাক্য বাদামভাজা চিবোতে চিবোতে বলল, ‘হ্যাঁ। মজন্তালী সরকার এইবার নামটা সার্থক হয়ে উঠল।’

সৌমিলির বাদামভাজা শেষ। ফাঁকা ঠোঙাটা গোল্লা পাকিয়ে রাস্তায় ছুড়ে ফেলে বলল, ‘অনেকগুলো লিঙ্ক বেরিয়েছে রে। শিরিন ফোন করল একটু আগে। শম্পা চৌধুরীর মা লিলুয়া হোমে কাজ করতেন। ফলে সম্পূর্ণা আর মামণি—দুজনের অ্যাক্টিভিটির পিছনেই ওই মহিলার অবদান আছে বলে মনে করা হচ্ছে। এছাড়া ব্যাঙ্ক থেকে সমস্ত সেভিংস তোলা, মানিকতলা এরিয়ায় দিদির বাড়ি ইত্যাদি ইত্যাদি।’

‘আচ্ছা, একটা কথা বল, সম্পূর্ণা মিত্রর ব্যাপারটা নিয়ে সিআইডি ঝেড়ে কাশছে না কেন? কেমন অসম্পূর্ণ থেকে গেল না বিষয়টা?’

‘হয়তো ডেড এন্ড।’

‘এতদূর এগিয়ে যাবার পর? আমার কিন্তু ব্যাপারটা কেমন লাগছে। সম্পূর্ণার অ্যাক্টিভিটির দোহাই দিয়ে যদি শম্পা চৌধুরী আর তাঁর মাকে চিহ্নিত করা হয়, তাহলে সম্পূর্ণা ক্লিনচিট পাচ্ছে কী করে?’

‘ক্লিনচিট পেয়েছে এমনও তো বলা হয়নি।’

‘তাহলে সবাইকে এক্সপোজ করা হচ্ছে, ওকে করা হচ্ছে না কেন?’

‘নিশ্চয়ই পাকা প্রমাণ কিছু পাওয়া যাচ্ছে না। জাজমেন্টাল হোস না। দময়ন্তী মুখার্জীর ওপর ভরসা রাখ।’

‘তোরা সবাই দময়ন্তী মুখার্জীর ফ্যান হয়ে গেছিস, না?’

‘মহিলার ব্যক্তিত্বটাই চুম্বক।’

‘তাহলে আজ দময়ন্তীদির কাছে গেলি না যে?’

‘শিরিন তো গেছে। কেউ একটা তো গেলেই হল।’

‘তুই তো কোনওদিন মজন্তালীর অ্যাসাইনমেন্ট মিস করিসনি, সেজন্যই বলছি।’

‘একটা দিন ছুটি নিতে পারি না?’ সামনে হাত ছড়িয়ে আড়মোড়া ভাঙল সৌমিলি, ‘আমি আজ ছুটির মুডে।’

‘আমরা এইখানে, আর বেচারি শিরিন একা ওইদিক সামলাচ্ছে। আজ তো শুধু মজন্তালীরই খবর। চাপ পড়ে যাচ্ছে।’

‘শিরিনই তো জোর করল আসতে। আমি কী করব?’

‘তা বটে,’ বলে একটু আনমনা হয়ে গেল শাক্য, ‘কিন্তু মজন্তালীর গল্প এইভাবে শেষ হবে? ভাবতে ভালো লাগছে না রে।’

‘শেষ কেন হবে? বেড়াল তো একটা নয়। গোটা একটা বাহিনী আছে। ভুলে যাস না।’

‘ধুর! বড় বেড়ালই যদি ধরা পড়ে যায়!’

‘না না! শম্পা চৌধুরী কিছুতেই বড় বেড়াল নয়। বড় বেড়াল এত সহজে ধরা পড়তেই পারে না।’

তারপরে খানিকক্ষণ কোনও কথা হল না। জোলো হাওয়া দিচ্ছে। কেয়ারি করা বেঁটে বেঁটে শৌখিন গাছের ফাঁক গলে রেলিংয়ের ধারে গিয়ে দাঁড়াল দুজনে। দূরে ঝলমলে আলোর পোশাক পরে ঝিম মেরে বসে আছে বৃদ্ধ হাওড়া ব্রিজ। হুগলী নদীর জলে সেই আলোর ক্যালাইডোস্কোপ।

সৌমিলি বলল, ‘রাতের কলকাতা কত সুন্দর! বল?’

‘সে আর বলতে!’

‘অথচ আনসেফ।’

‘কী আর করা যাবে!’

‘কী যাবে সেটা একদল মহিলা দেখিয়ে দিচ্ছেন, শাক্য।’

শাক্য চুপ করে রইল। মিলেনিয়াম পার্কের নীলচে ত্রিফলা আলোয় ধরা দিচ্ছে রেণু রেণু বৃষ্টি। কামিনী ফুলের গন্ধে ভরে আছে বাতাস। ঠাকুমা-দিদিমারা বলতেন, এই গন্ধে নাকি সাপ আসে। বড় হতে হতে এসব কথা হেসে উড়িয়ে দিতে হয়। কিন্তু আজ হঠাৎ পায়ের পাতা শিরশির করছে। বাইরে ভেজা হাওয়ার ছোবল, অথচ ভিতরে ভিতরে গরম হয়ে উঠছে শ্বাস। একটা ঠান্ডা, মসৃণ, আঁশটে স্পর্শ পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে উঠছে কোমর থেকে কানের লতি অবধি।

সৌমিলি সামান্য এগিয়ে গেছিল। হঠাৎ পিছনে ঘুরল। দ্ব্যর্থহীন পদক্ষেপে শাক্যর একেবারে মুখোমুখি এসে পথ আটকে দাঁড়াল। মায়াবী নীল আলো এসে সৌমিলির চশমার কাচে বেয়াড়াভাবে থেবড়ে বসেছে, তবু তার চোখ পড়তে অসুবিধা হল না শাক্যর। অঘোষ এক শিলালিপি সেখানে পাঠোদ্ধারের অপেক্ষায় থমকে। কিন্তু চোখদুটো বড্ড বিপজ্জনকরকম কাছে এসে পড়েছে। এত কাছ থেকে শাক্য কাউকে দেখেনি কোনওদিন। ভেবলে গিয়ে ঢোঁক গিলল সে।

আঙুলমাত্র দূরত্ব থেকে নিবিড় গলায় সৌমিলি বলল, ‘রাত হোক বা দিন, এত সুন্দর শহরটাকে কেউ কেন ভয় পাবে বল!’

.

ভবানী ভবন, সন্ধে ৬টা ৫০

ঝড়ের মতো ডিজিটাল ফরেন্সিকের ঘরে ঢুকে দময়ন্তী বলল, ‘প্রতীক, একটা নম্বর বলছি। লোকেশন দ্যাখ তো! কুইক!’

দময়ন্তীর মুখের চেহারা দেখে প্রতীক একটাও কথা বাড়াল না। দ্রুত হাতে নম্বরটা কম্পিউটারে টাইপ করতেই মালিকের নাম দেখা গেল। এইবার হতভম্ব হয়ে তাকাল প্রতীক, ‘কী ব্যাপার দময়ন্তীদি? এটা তো…।’

কথা শেষ করার আগেই প্রতীকের জামার হাতা খামচে ধরল দময়ন্তী, ‘প্রতীক, কেউ যেন জানতে না পারে। প্লিজ।’

তিন মিনিট পর গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে দময়ন্তী খেয়াল করল, হাত-পা এখনও থরথর করে কাঁপছে। ভিতরে যেন ভেঙেচুরে যাচ্ছে সমস্ত আণবিক গঠন। দময়ন্তী মনকে প্রাণপণে শাসন করে অ্যাক্সিলেটরে পা রাখল।

.

স্টেট ফরেন্সিক ল্যাব, সন্ধে ৭টা ১০

শুভ্রকান্তি ব্যানার্জির অফিসের বাইরে বসে অপেক্ষা করছিল তানিয়া। এমন সময় অমিতাভর ফোন, ‘তানিয়া, তুমি কোথায়?’

‘মেডিকেল কলেজে, স্যার।’

‘দময়ন্তীকে ফোনে পাচ্ছি না। ফোন বেজে যাচ্ছে, ধরছে না। ও কোথায় জানো?’

‘দময়ন্তীদির সঙ্গে এক ঘণ্টা আগে অফিসেই দেখা হয়েছে। অফিসেই থাকার কথা এখন।’

‘রাহুলের ফোন আবার সুইচড অফ। সে-ই বা কোথায় গিয়ে বসে আছে কে জানে! যাক গে শোনো, বড় ব্রেকথ্রু পেয়েছি। ওয়ার্ক স্টেশনে এসো চটপট।’

‘কিন্তু রিপোর্টটা?’

‘পরে কাউকে পাঠিয়ে দেব। তুমি চলে এসো।’

.

পার্ক স্ট্রিট, সন্ধে ৭টা ১৫

রাহুল দ্রুত হাতে ব্যাগ গোছাচ্ছিল। সময় খুব কম। এখনই বেরোতে হবে। পরিস্থিতি এত দ্রুত বদলাবে, সেটা আঁচ করা যায়নি একেবারেই। যাক গে, প্ল্যান বি বা প্ল্যান সি সবসময় রেডিই থাকে।

এমন সময় কোথায় অ্যালার্ম বেজে উঠল উচ্চগ্রামে। রাহুল চমকে উঠল। এ তো ফায়ার অ্যালার্ম বলে মনে হচ্ছে। এ আবার কী উটকো ঝামেলা!

একটু পরেই ঘরের বেল বাজল। সঙ্গে দরজায় অধৈর্য ধাক্কা, ‘স্যার! প্লিজ ইভাকুয়েট ইয়োর রুম! উই হ্যাভ কট ফায়ার!’

পালানোর টেনশনের সঙ্গে উটকো আকস্মিকতা যোগ হয়ে রাহুলের সতর্কতা এক মুহূর্তের জন্য শিথিল হয়ে গিয়েছিল। ওই একটা মুহূর্তই হয়ে গেল লৌহবাসরের ছোট্ট ছিদ্র। হতবুদ্ধি রাহুল তড়িঘড়ি করতে গিয়ে দরজা খুলতেই ধাক্কা মেরে ঘরে ঢুকে এল দময়ন্তী। রিভলভার উঁচিয়ে বলল, ‘কিস্তিমাত!’

.

কাশীপুর, সন্ধে ৭টা ১৮

‘মায়েরা সব বুঝতে পারে, বুঝলি?’

অফেন্স ইজ দি বেস্ট ডিফেন্স। নিজের অপ্রস্তুত ভাবটাকে আড়াল করতে মুখঝামটা দিল লীনা, ‘সেম বস্তাপচা ডায়লগ বছরের পর বছর চালিয়ে যাচ্ছ!’

‘সেনগুপ্ত তো বদ্যি,’ মা মুচকি হাসল, ‘একদম পাল্টি ঘর।’

‘ইয়ার্কি মেরো না তো!’

‘ইয়ার্কি কেন মারতে যাব। আমি সিরিয়াস। বলেছিস?’

লীনা চোখ নামাল, ‘ও বুঝে গেছিল মা। কিন্তু আমি অস্বীকার করেছি।’

মা হতাশ, ‘অস্বীকার কেন করলি?’

‘পাগল? কেউ বলে?’

‘আচ্ছা পাগল মেয়ে! তুই জানিস ও তোকে ভালোবাসে কিনা? একবার বলে দেখলে কী হত?’

‘আরে বাবা আমি ভালোবাসি এটাই তো যথেষ্ট!’

‘না! যথেষ্ট না! তুই এখনি ফোন কর।’

‘না!’ প্রায় আর্তনাদ করে উঠে লীনা বলল, ‘আমি ফোন করতে পারব না।’

‘তুই না করলে আমি করব কিন্তু।’

‘না! প্লিজ মা! তোমার পায়ে পড়ি! এরকম কোরো না।’

মা-কে হঠাৎ কেমন বিহ্বল দেখাল, ‘দ্যাখ মুনাই, আমি তোকে অনেক বাধা দিয়েছি এতদিন। তুই বারবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছিস, আমি পিছন থেকে টেনে ধরেছি। একটুও সাহস দিইনি। বরং অনেক কষ্ট দিয়েছি। আজ আমি বলছি, একদম লজ্জা পাবি না। আমরা কেউ লজ্জা পাব না। অ্যাক্সিডেন্ট হলে কেউ লজ্জা পায় না। যদি মনে হয়, তোর সঙ্গে এরকম ঘটনা ঘটেছে বলে রাহুল তোকে ভালোবাসবে না, তাহলে তো তোর অবশ্যই ওকে বলা উচিত। ফোন কর।’

লীনার চোখে জল এসে গেল। মা বুঝেছে। কত রাত জেগে লীনা শুধু এই দিনটার স্বপ্ন দেখেছে, মা একদিন এসে ওর পাশে দাঁড়াবে। বলবে, আমিও আর লজ্জা পাচ্ছি না। মা বুঝেছে। আর কী চাই? লীনা চোখ বুজে ফেলল। আনন্দ জিনিসটা কি মাছের মতো? খলবল করে বুকের মধ্যে? কতদিন পর তাহলে আনন্দের সঙ্গে দেখা হল তার!

লীনাকে নিরুত্তর দেখে মা বলল, ‘তোর কি মনে হয় রাহুল ওইজন্য তোকে রিজেক্ট করে দেবে?’

‘রাহুল ওরকম নয় মা! কিন্তু ও বুঝতে পেরে গেছিল আমি ওকে ভালোবাসি। তবে একরকম রিজেক্টই করেছে বলা যায়। সেটা যে-কারণেই হোক।’

মা মিইয়ে গেল, ‘রিজেক্ট করেছে? কী বলেছে?’

‘হ্যাঁ। বলেছে যে, তুমি যেটা ভাবছ সেটা হয় না। আমি তখন অস্বীকার করেছি! বলেছি আমি ওরকম কিছু ভাবছি না!’

‘কেন ওরকম বলল বল তো?’

‘ওরা তো আমাকেই মজন্তালী সরকার বলে সন্দেহ করে!’

‘ওঃ! এই ব্যাপার?’ মা-র গলায় উৎসাহ ফিরে এসেছে, ‘তাহলে তো ঝামেলা মিটেই গেছে। ঘোষ ইন্সটিটিউশনের ওই টিচার! উনিই তো মজন্তালী! টিভিতে দেখাচ্ছে! তাহলে তোকে আর ভাববে কেন? তুই ফোন কর! ফোন করে পুরোটা খুলে বল!’

‘না মা!’ লীনা প্রবল বেগে দু-দিকে মাথা নাড়ল, ‘আমার লজ্জা করছে!’

.

পার্ক স্ট্রিট, সন্ধে ৭টা ১৮

বাবা একবার ঝুলঝাড়ু দিয়ে খোঁচা মেরে সিলিংয়ে ঝুলে থাকা মাকড়সার ডিম ফাটিয়ে দিয়েছিল। দময়ন্তী তখন অনেক ছোট। শিউরে উঠে দেখেছিল, ডিম ফেটে ভরা-কোটালের মতো বেরিয়ে আসছে পাল পাল সদ্যোজাত। দময়ন্তীর ভিতরে আজ সেরকমই কিছু-একটা ফেটে গেছে। সেদিনের সেই খুদে আটপেয়েদের থকথকে ভিসকাস-স্রোতের মতোই বেরিয়ে আসছে আবেগ। তার তোড় সামলাতে সামলাতে দময়ন্তী মাঝে মাঝেই কেঁপে উঠছিল। কিন্তু বাইরে সেটা প্রকাশ হতে দেওয়া চলে না। দৃশ্যত দময়ন্তীর শরীর ধনুকের ছিলার মতো টানটান। মুখের একটা পেশিও কাঁপছে না। কিন্তু ভিতরে ভিতরে সে এক সর্বনাশী নদীর ভাঙনকূলে দাঁড়িয়ে একের পর এক বালির বস্তা ফেলে যাচ্ছে।

এক কামরার ছোট্ট হোটেল-ঘরটায় আসবাব বলতে একটা খাট আর একটা সোফা। রাহুল দু-হাত মাথার ওপরে তুলে খাটে পা ঝুলিয়ে বসে আছে। দময়ন্তী বসেছে সোফায়, রাহুলের দিকে রিভলভার তাক করে। মাঝারি পাওয়ারের এলইডি বালবের আলোয় দুজন পরস্পরকে মাপছে।

রাহুলের চোখ বা শরীরী ভাষা কোনওটারই পাঠোদ্ধার করা যাচ্ছে না। কারণ সেখানে হতাশা বা ভয়ের লেশ নেই। রাগও না। আউট অব সিলেবাস এক নিঃস্পৃহ চাউনি। সব শেষ। তবু স্নায়ুর লড়াইয়ে রাহুল ভয়ানক কঠিন প্রতিপক্ষ। কিন্তু সেটা আসল কথা নয়। আসল কথা হচ্ছে, বাৎসল্য জিনিসটা দময়ন্তী নিজের চারপাশের খুব বেশি মানুষের প্রতি বোধ করার সুযোগ পায়নি। আর সেটা যে অফিসের কারও প্রতি কখনও জাগতে পারে, দময়ন্তী ভাবেনি পারেনি কখনও। প্রবল শক্তিতে নিজেকে সামলাতে সামলাতে দময়ন্তী বলল, ‘এ-গল্পের শুরু অনেক আগে। ১৯৯০ সালের ৩০ মে, আমতলায়। তাই না?’

রাহুল ভাবলেশহীন গলায় বলল, ‘কী বলছ কিছুই বুঝতে পারছি না।’

‘আমরা সুজান জর্ডান, লীনা দাশগুপ্ত, সম্পূর্ণা মিত্র, তিয়াসা পৈলানদের নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। এদিকে যে তেইশ বছর আগের এক ভয়ংকর কেস ডালপালা মেলে বসেছে, তার তিলমাত্র আভাস পাইনি। সেই আমতলা কেস হিস্ট্রি থেকেই দু-দুটো বেড়াল ধরা পড়ল।’

রাহুল একইরকম নির্ভাষ, নির্নিমেষ দৃষ্টিতে চেয়ে। যেন কিছুই বুঝতে পারছে না।

দময়ন্তী বলল, ‘১৯৯০ সালের ৩০ মে রাতে আমতলার মাঠে গাড়ি থামিয়ে সুনীতা দেওয়ান, ঝুমা চৌধুরী আর শিবানী মণ্ডলকে ধর্ষণ করেছিল একদল দুষ্কৃতি। কিন্তু এই তিনজন ছাড়াও সেদিন মারা গিয়েছিলেন আরও একজন। এঁদের গাড়ির ড্রাইভার অবনী দত্ত। দুষ্কৃতিদের আটকানোর চেষ্টায় অবনীবাবু সাংঘাতিক আহত হন। তাঁকে পিজি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সারা দেহে মোট তেতাল্লিশটা জখম ছিল। ৪ জুন ভদ্রলোক মারা যান।’

‘হ্যাঁ। এগুলো তো ইন্টারনেট ঘাঁটলেই জানা যায়। তুমি কী বলতে চাইছ?’

‘এরপর যেগুলো বলব, সেগুলো ইন্টারনেটে নেই। আমতলা নিয়ে ডঃ অমিতা হাজরা একটা বই লিখেছিলেন। তৎকালীন গভর্নমেন্ট বইটা চেপে দিয়েছিল। খুব অল্প কিছু কপি এদিক-ওদিক রয়েছে। আমি একটা কপি জোগাড় করতে পেরেছি। বইটায় প্রয়াত অবনী দত্তের স্ত্রী মধুমিতা দত্তের একটা ছোট ইন্টারভিউ ছাপা হয়েছিল। সেখানে তিনি তাঁর শিশুপুত্রের উল্লেখ করেছেন। বাচ্চাটার বয়েস তখন ছয়। অবশ্য তখনও মধুমিতা দত্তের দ্বিতীয় বিয়ে হয়নি। সেটা হয় আরও এক বছর পর। যাই হোক, সেই শিশুপুত্রের বয়েস এখন দাঁড়াচ্ছে উনত্রিশ।’

রাহুলের দৃষ্টিতে অস্বস্তি লুকোনোর একটা চেষ্টা উঁকি মেরে গেল চকিতে, ‘তাতে কী প্রমাণ হয়?’

টেক্কা ফেলার সময় তাসুড়ের মুখে তৃপ্তি আর আত্মবিশ্বাসের যে-ককটেল বিচ্ছুরিত হয়, দময়ন্তীর মুখে সেই ভাব ফুটে উঠল, ‘কমল সেনগুপ্ত, মানে খাতায়-কলমে যাঁর নাম এখন তোর বাবার নাম হিসেবে থাকে, তিনি অবনী দত্তের বন্ধু। তিনিই পরে মধুমিতা দত্ত অর্থাৎ তোর মা-কে বিয়ে করেন। ঠিক বলছি?’

রাহুল কয়েক মুহূর্ত চেয়ে রইল। নিঃস্পৃহতা ঝুপ করে এক দাগ নেমে এল কি? স্লো ক্ল্যাপ করে রাহুল বলল, ‘চমৎকার ডিটেকশন। কিন্তু তাতেই বা কী প্রমাণ হয়?’

দময়ন্তী বাঁকা হাসল, ‘কৌশিক মুখুজ্যের শিষ্যের মুখে কুতর্ক মানায় না। তিনি সত্যকে সবসময় সহজে হাসিমুখে গ্রহণ করতে বলতেন।’

হেসে ফেলল রাহুল, ‘শম্পা চৌধুরীর খোঁজ পেলে কী করে? লিলুয়া হোম বাদে আর কোনও লিঙ্ক পেয়েছ?’

‘ওখান থেকেই শুরু। লিলুয়া হোমের লিঙ্ক না পেলে শম্পা চৌধুরীকে কিছুতেই খুঁজে পাওয়া যেত না। মামণি হেমব্রম থেকে শম্পা চৌধুরীর মা নীলিমা চৌধুরী অবধি পৌঁছেছিলাম। কিন্তু ওটুকু যুক্তি যথেষ্ট হচ্ছিল না। আসল ম্যাওটা বেরোল উল্টোদিক থেকে অঙ্ক রিভিউ করতে গিয়ে। শম্পা চৌধুরী যে আমতলার ভিক্টিম ঝুমা চৌধুরীর ছোট বোন, এটা বের করা সহজ হয়নি। নিজের অতীতের কোনও চিহ্ন রাখেননি। একেবারে ছিন্নমূল করে নিয়েছিলেন নিজেকে। ভাগ্যিস ঝুমা আর শম্পার মাঝে আরও এক বোন ছিলেন। তিনি গত বছর মারা গেছেন, কিন্তু তাঁর একটি ছেলে আছে। এই একজন মাত্র পরিজন আছে শম্পা চৌধুরীর। তাঁর অ্যাকিলিস হিল। ব্যাঙ্গালোরের আইটি সেক্টরে কর্মরত সেই ছেলেটির সঙ্গে আজই কথা হয়েছে। প্লাস, তিয়াসা পৈলান শম্পা চৌধুরীর কাছে টিউশন পড়ত। তিয়াসার ওপর অ্যাসিড-অ্যাটাক হবার পর তিনি বেশ কয়েকবার ওদের বাড়ি গিয়েছিলেন।’

‘ভেরি গুড। আমায় কী করে ট্র্যাক করলে এবার শুনি।’

‘শুধু তিয়াসা না। ইলেভেন-টুয়েলভে তুই নিজেও শম্পা চৌধুরীর কাছে টিউশন পড়তে যেতিস। অস্বীকার করিস না। ভেরিফাই করিয়েছি।’

‘এইটা কোনও যুক্তি হল? ধুর।’

‘আচ্ছা। পরেরটা শোন। সম্পূর্ণা মিত্রের ফলস ফ্ল্যাগটা ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই সূত্র ধরে আরও একটা ফলস ফ্ল্যাগ ধরা পড়ে গেল, যার সঙ্গে তোর সরাসরি সম্পর্ক। মালিপাঁচঘড়া থানার অফিসার সাগ্নিক বড়াল তো তোর স্কুলের সিনিয়র?’

রাহুল এবার সত্যিকারের অবাক হল। চোখে একটু উৎকণ্ঠাও উঁকি মেরে গেল যেন, ‘সে আমি কী করে জানব? উনি আমার চেয়ে বয়েসে অনেক সিনিয়র। হতেই পারে আমার স্কুলে পড়তেন। কিন্তু তাতে কী এসে যায়? সময়ের তফাতটা দ্যাখো।’

‘সে না-হয় দেখলাম। কিন্তু তুই দ্যাখ, কাল সকালে আমাদের আলোচনায় সাগ্নিক বড়ালের নাম ওঠার পরেই আশ্চর্যজনকভাবে তার ফেসবুক প্রোফাইলটা ডিঅ্যাক্টিভেট করা হয়েছে। অথচ গত পরশু অবধি লোকটার প্রোফাইল দিব্যি দেখা যাচ্ছিল। এটা ফাউল প্লে হয়ে গেল না?’

ব্যঙ্গের ভঙ্গিতে নাক কোঁচকাল দময়ন্তী, ‘সম্পূর্ণার ব্যাপারটা ধরতে পারার পরেই আমি সাগ্নিক বড়ালের পিছনে অ্যানালিটিকসের লোক লাগিয়ে দিয়েছিলাম। পরশু বিকেল থেকেই। সাগ্নিকের প্রোফাইলে তোর কোনও ছবি পাওয়া যায়নি। কাল দুপুরের মধ্যে প্রোফাইলটা আর খুঁজে পাওয়া গেল না। কিন্তু তোদের মিউচুয়াল বন্ধুদের লিস্ট করে রাখা ছিল। তাদের প্রোফাইল তো আর ডিলিট হয়নি। কয়েক ঘণ্টা আগে তোদের এক কমন বন্ধু বিপ্রনারায়ণ ভট্টাচার্যের ফেসবুক প্রোফাইলে বেশ কয়েক বছর আগের একটা ছবি পাওয়া গেছে। দীঘার সমুদ্রসৈকতে আরও কয়েকজনের সঙ্গে তুই আর সাগ্নিক বড়াল বারমুডা পরে ডাব হাতে পোজ দিচ্ছিস।’

রাহুল কিছু বলতে পারল না। তার স্থৈর্য দৃশ্যতই বিচলিত হয়েছে। চোখের মণি চঞ্চল। দেহভঙ্গিতে প্রকট হয়ে আছে উপযুক্ত জবাব খোঁজার চেষ্টা।

ডান পা ভাঁজ করে বা পায়ের ওপর তোলা ছিল। এবার পা বদল করল দময়ন্তী, ‘তবে এই পাজলগুলো পরে মিলিয়েছি। তোকে সন্দেহ করার পিছনে মূলত নর্থ বেঙ্গল-লিঙ্ক। নর্থ বেঙ্গল থেকে যে হোমরাচোমরা মানুষটি একশো কেজি আরডিএক্সকে সেফ প্যাসেজ দিয়েছিলেন, তিনি আদৌ কোনও মহিলা অফিসার নন। মহিলা এবং অফিসার কথাদুটোকে কেউ বা কারা জুড়ে দিয়েছিল। আসলে দুজন আলাদা মানুষ। একজন মহিলা, অন্যজন রাজ্য পুলিশের প্রাক্তন অফিসার এবং পুরুষ। মহিলা ঢাকা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির প্রাক্তন নায়িকা এবং সুজান জর্ডানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এখন ফিল্ম ছেড়ে রাজ্য পুলিশের প্রাক্তন অফিসারটির উপপত্নী হয়েছেন। আর প্রাক্তন গোয়েন্দা-অফিসারটি এখন রাজনীতিতে ঢুকেছেন। শিলিগুড়ির সাগর হোটেলে দুজন মহিলা অপারেশন সেরেছিলেন। একজন মামণি হেমব্রম। ফারজানা হকের নাম আসার পর দেখা গেল, দ্বিতীয়জনের সঙ্গে তাঁর প্রোফাইল হুবহু ম্যাচ করে যাচ্ছে। মানে তিনি স্বয়ং নুটু আর বুয়ার কেসটা সেরেছিলেন।’

রাহুল ঠোঁট কামড়ে আছে। জবাব দিল না।

দময়ন্তী মাথা নেড়ে বলল, ‘তোর গুরুর সবই ভালো। মুশকিল একটাই। বড্ড ইন্দ্রিয়পরায়ণ। কেবলই মহিলাদের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করে দেন।’

রাহুল নিজেকে খানিকটা পুনরুদ্ধার করেছে। বলল, ‘সে বিষয়ে একমত না হয়ে উপায় নেই। কিন্তু ফারজানা হক বা কৌশিক মুখার্জীর সঙ্গে আমার সম্পর্ক খানিক জোর করেই এস্টাবলিশ করছ না কি? সার্ভিস লাইফের গুরু অপরাধ জগতেও আমায় টানবেন, এটা বড্ড বেশিই সরলীকরণ হয়ে যাচ্ছে।’

‘গত চার মাসে তোর তিনবার নর্থ বেঙ্গল যাওয়ার ব্যাপারটাও রয়েছে।’

‘সে-ও তো কাকতালীয় হতেই পারে।’

‘কাকতালীয় বলেই ধরতাম, যদি-না আরও একটা জিনিস তোর বিপক্ষে যেত। তোর কেরিয়ারগ্রাফ। তুই দেড় বছর আগে লালবাজার থেকে এখানে এসেছিস অনেকগুলো স্টেপ ম্যানিপুলেট করে। আমি আজই অর্ডার কম্পেনডিয়াম বের করিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছি। কী কী ম্যানিপুলেট করেছিস সেসব তুই ভালো করেই জানিস। লালবাজার ছেড়ে এখানে আসা তোর দরকার ছিল। এই কেস লালবাজারের সীমানা পেরিয়ে যাবে, তুই জানতিস। আর এই কেসের জন্য অমিতাভ স্যারের কাছে কোন কোন জায়গা থেকে তোর রেকমেন্ডেশন এসেছিল, সেগুলো কি এক-এক করে বলব?’

‘ব্রিলিয়ান্ট! একেবারে চেকমেট করে দিয়েছ!’ রাহুল অভিবাদনের ভঙ্গিতে মাথাটা সামান্য ঝোঁকাল, ‘আই লেট মাই গার্ড ডাউন। কিন্তু তুমি একা এলে কেন? বাকিরা কই?’

বুকের অতল থেকে গভীর একটা দীর্ঘশ্বাস উঠে আসছিল। সেটাকে গোপন করে দময়ন্তী বলল, ‘নিজেকেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। কাকে বলব!’

‘নাকি একা-হাতে বেড়াল ধরার কৃতিত্বটা ছাড়তে চাইলে না?’

বাঁ হাতের চেটো দিয়ে কপালের ঘাম মুছে দময়ন্তী বলল, ‘সে তুই যা-খুশি মনে করতে পারিস।’

‘তোমার গরম লাগলে এসিটা অন করে নিতে পারো। টেবিলের ওপর রিমোট। ওই যে।’ মাথার ওপরে হাত তোলা অবস্থাতেই আঙুল দিয়ে দিকনির্দেশ করল রাহুল।

দময়ন্তী রাহুলের দিক থেকে চোখ সরাল না। বলল, ‘আমায় নিয়ে ভাবিস না।’

রাহুল ফোঁৎ করে একটা শ্বাস ছাড়ল। বলল, ‘ফারজানা হকের অ্যাঙ্গেলটা ক্র্যাক করলে কী করে একটু বলবে?’

‘এটা আইজি নর্থ বেঙ্গল নবীন চতুর্বেদীর কৃতিত্ব, যিনি সিআইডি-তে আইজি থ্রি হয়ে আসছেন। এবং সর্বাণী সেন। ফারজানা হক আর সুজান জর্ডানের পুরোনো সম্পর্কের দিকটা উনি ক্র্যাক না করলে শম্পা চৌধুরীতেই আটকে বসে থাকতাম।’

‘সর্বাণীদি?’ রাহুলের মুখ আচমকা ফ্যাকাসে হয়ে গেল। সর্বাঙ্গে একটা আলগা আত্মবিশ্বাস খেলা করে বেড়াচ্ছিল এতক্ষণ। সেটা মুহূর্তে উধাও হয়ে গেল।

দেখে তৃপ্তি পেল দময়ন্তী, ‘হ্যাঁ। এত অবাক হচ্ছিস কেন?’

রাহুলকে একটু টালুমালু দেখাল। অবশ্য বেশিক্ষণের জন্য না। কয়েক সেকেন্ড সময় নিয়ে নিজেকে সামলে রাহুল বলল, ‘ফারজানা হককে খুঁজে পাবে না। নর্থ বেঙ্গল কৌশিকদার নিজের তালুক। রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের যেমন বাদাবন, কৌশিক মুখুজ্যের তেমনই নর্থ বেঙ্গল।’

‘তোকে পেয়েছি যখন, বাকিদেরও পাব। প্রচুর ফলস ফ্ল্যাগ দিয়েছিস, ভাই। সবকটা ডিকোড করেছি। একেকটা গোটা মানুষকে শুধু ফলস ফ্ল্যাগ হিসেবেই ইউজ করে গেছিস। সম্পূর্ণা মিত্রের ফলস ফ্ল্যাগটা তো একটা মাস্টারস্ট্রোক।’

‘সম্পূর্ণার ব্যাপারটা যেভাবে ধরলে, সেটা অতুলনীয়। যা-ই হোক, ওকে কবজা করে খুব একটা সুবিধাও করতে পারতে না। মনোরোগীর কথার ভিত্তিতে তো আর চার্জশিট হয় না।’

‘এই কেসে আমাদের কতটা ফ্রি হ্যান্ড দেওয়া হয়েছে তুই তো জানিস, রাহুল। তুলে আনার ইচ্ছে থাকলে হাতে যেটুকু ছিল সেটাই কি যথেষ্ট হত না?’

‘এইজন্যই তো তুমি আলাদা, দময়ন্তীদি। তুমি আছ বলেই মামণিকে নিয়ে নিশ্চিন্ত ছিলাম যে, তুমি থাকতে মেয়েটার কোনও ক্ষতি হবে না। যদিও ওকে এভাবে স্যাক্রিফাইস করায় আমার একেবারেই মত ছিল না। যারা ওই অপারেশনটা সেরেছে ওটা তাদের শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্ত।’

‘মানে ফারজানা হকের সিদ্ধান্ত, তাই তো? অর্থাৎ আমরা যেটা ভাবছিলাম সেটাই ঠিক? ফারজানাকে বাঁচাতেই মামণিকে ধরা পড়তে হল?’

রাহুল চোখ সরু করল। সামান্য আক্ষেপের সুরে বলল, ‘প্রত্যেকটা স্টেপ অঙ্ক কষে নেওয়া। টেকনিক্যালি প্রায় কোনও ভুল রাখিনি। কিন্তু টুকটাক ভুল থেকেই যায়। অমিতাভ স্যার ঠিকই বলেন। দেয়ার ইজ নো পারফেক্ট ক্রাইম। দেয়ার উইল নেভার বি। মামণি ধরা না-পড়লে তোমরা কস্মিনকালে শম্পাদির খোঁজ পেতে না।’

‘ছোট ছোট ভুলই তো অপরাধীদের ধরিয়ে দেয়। যেমন সিমের ব্যাপারটা। সিম থেকে নুটু, নুটু থেকে মামণি। আচ্ছা একটা কথা বল, লীনা নিশ্চয়ই তোদের দলের নয়?’

রাহুলের মুখের ভূগোল সামান্য অদলবদল হল। দু-দিকে মাথা নেড়ে বলল, ‘না। তবে চেষ্টা করছিলাম লীনাকে দলে নেবার। একটা ছোট্ট গন্ডগোল হয়ে গেল।’

‘কী গন্ডগোল? প্রেম?’

ফ্যাক করে হেসে ফেলল রাহুল, ‘তোমার মাথায় প্রেমের ভূত চেপেছে।’

‘এদের দলে কেন জয়েন করলি রাহুল? কেন এত কাণ্ড করলি? তেইশ বছর আগের একটা ঘটনার প্রতিশোধ কি এইভাবে নেওয়া যায়?’

‘শুধু বাবার প্রতিশোধ নিতে চাইলে এত কাণ্ড করব কেন? সবকিছু অসহ্য লাগছিল বলেই এত কিছু করেছি। স্বাভাবিক রিফ্লেক্সে করেছি। গায়ে চুলকানি হলে লোকে যেমন স্বতঃস্ফূর্তভাবে চুলকায়, সেরকম। কনসেন্ট কাকে বলে, সেটা নেওয়া কেন জরুরি—এইসব শেখানোর ক্লাস খুলতেই পারতাম। পলিটিকালি কারেক্ট পথে চলতেই পারতাম। কিন্তু সে অনেক শতাব্দীর মনীষীর কাজ, দময়ন্তীদি। আমাদের চারপাশের লোকজন যে-ভাষাটা ভালো বোঝে, সেই ভাষাতেই তাদের বোঝাতে হবে। কিছু করার নেই। পৃথিবীটা বর্বরদের হাত থেকে কেড়ে নিতে হবে। বুঝিয়ে সুঝিয়ে কাজ হবে না।’

‘কী লাভ হল? সেই তো ধরা পড়েই গেলি। সব শেষ।’

‘কই শেষ? এখনও বাকিরা রয়েছে।’

‘চিন্তা করিস না। খুব শিগগিরি তোদের সব্বাইকে একসঙ্গে বসিয়ে জেলের লপসি খাওয়াব। যা-ই হোক, সুজান জর্ডান কি তোদের দলের একজন ছিলেন?’

‘নো কমেন্ট।’

‘ওই ফিঙ্গারপ্রিন্ট ওঁর সজ্ঞানেই নেওয়া তো?’

‘এগেইন, নো কমেন্ট।’

‘বেশ। তোর নিজের কথাই বল। তুই আশা করি এই দলে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিস।’

‘ঠিকই ভাবছ।’

‘তোর এক্স্যাক্ট ভূমিকাটা কী সেটা জানতে পারি?’

রাহুল টানটান হয়ে বসল। অনেকটা বাতাস বুকে পুরে নিয়ে বলল, ‘আমিই বড় বিল্লি। মজন্তালী সরকার, ব্র্যাকেটে আদি।’

.

রবীন্দ্র সদন, সন্ধে ৭টা ৪০

গাড়ি জ্যামে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় দশ মিনিট হয়ে গেল।

লোকনাথ গাড়ির জানলা দিয়ে মুখ বের করে দেখে বলল, ‘বিশাল জ্যাম, স্যার!’

‘ড্যাম ইট!’ হতাশায় নিজের হাঁটুতে ঘুষি মেরে বসলেন অমিতাভ।

তানিয়ার সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। দময়ন্তীদি কাউকে কিছু না বলে হঠাৎ পার্ক স্ট্রিটে চলে গেল কেন? ফোনও ধরছে না। রাহুলদার ফোন কেন অফ? অমিতাভ স্যার খোলসা করে কিছুই বলছেন না। মুখের চেহারা দেখে একবারের জায়গায় দুবার জিগ্যেস করতেও ভরসা হচ্ছে না। কিন্তু এটুকু বোঝা যাচ্ছে যে, দুনিয়া ওলট-পালট করে দেওয়ার মতো কিছু-একটা ঘটেছে। এই টেনশন আর নেওয়া যাচ্ছে না।

.

পার্ক স্ট্রিট, সন্ধে ৭টা ৪৫

দময়ন্তী এত অবাক হল যে খানিকক্ষণ কোনও কথা বলতে পারল না, ‘তুই?’

রাহুল মুচকি হাসল, ‘এত অবাক হচ্ছ কেন?’

দময়ন্তীর কথা আটকে যাচ্ছিল। কোনওমতে বলল, ‘তা কী করে সম্ভব? এটা একটা উইমেনস গ্যাং নয়?’

‘না। মহিলারা সংখ্যায় অনেক বেশি ঠিকই, তবে পুরুষও আছে। আমরা এটাকে খুব সচেতনভাবেই গার্লস গ্যাং হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছি। এই কনফার্মেশন বায়াস তৈরি করাটাই আমাদের লক্ষ্য ছিল। কিন্তু প্রজেক্টটা প্রাথমিকভাবে আমারই ব্রেনচাইল্ড।’

‘তুই মিথ্যে কথা বলছিস।’

‘সত্যি বলছি।’ সমাহিত গলায় রাহুল বলল, ‘গত ছ-সাত বছর ধরে আমি একটু একটু করে প্রস্তুত হয়েছি। প্রথম ধাপ ছিল নিজে পুলিশের মোটামুটি ভদ্রস্থ একটা পদে সুযোগ পাওয়া। রাজ্য পুলিশে চেষ্টা করেছিলাম। পেলাম কলকাতা পুলিশ। লালবাজারে পোস্টিং যে-কারও স্বপ্ন। কিন্তু আমার টার্গেট ছিল ভবানী ভবন। ওই, তুমি যেটা বললে, নানা কলকাঠি নেড়েছি সিআইডি-তে আসতে। সত্যিই নেড়েছি।’

দময়ন্তী ঘোর-লাগা গলায় বলল, ‘তুই-ই আসল মজন্তালী সরকার? ফারজানা বা শম্পা চৌধুরী নন?’

‘আমরা সবাই মিলেই মজন্তালী সরকার। পয়েন্ট ইজ, দে প্লে দি মিউজিক, আই প্লে দ্য অর্কেস্ট্রা।’

‘কিন্তু এটা কী করে একজন পুরুষের ব্রেনচাইল্ড হয়?’

‘কেন? কী অসুবিধা তাতে?’

কী অসুবিধা, সেটা দময়ন্তী গুছিয়ে বলতে পারবে না। শুরুর দিন থেকে তদন্তের সমস্ত অগ্রগতি তো এইদিকেই ইঙ্গিত করে এসেছে যে একদল মহিলাই এসব করছেন। হয়তো দু-একজন পুরুষ সাহায্য-টাহায্য করেছে, কিন্তু সেটা বাইরে থেকে। আসলে পুরোটাই মহিলাদের কীর্তি। দময়ন্তী নিজেও প্রবলভাবে তা-ই ভেবে এসেছে এতদিন। কর্তব্যের খাতিরে শিকারির মতো মজন্তালীদের তাড়া করতে হয়েছে ঠিকই, কিন্তু গোপনে গোপনে দময়ন্তী প্রতিদিনই শিহরিত হয়েছে। কোনওদিন কাউকে এ-কথা বলতে পারবে না, কিন্তু মজন্তালীদের প্রত্যেকটা কাজে মনের গভীরতম প্রদেশে কোথাও-না-কোথাও নিষিদ্ধ এক ভালোলাগা অনুভব করেছে সে। ভিতরে কোথাও কোনও-একটা অজানা অরগ্যান বেজে উঠেছে বারবার।

দময়ন্তী জানে সে অবজেক্টিভিটি ধরে রাখতে পারেনি, স্পষ্ট পক্ষ অবলম্বন করেছে। সে-সবই তবে মিথ্যে? এখানেও একজন পুরুষের হাতে সুতো? এখানেও মেয়েরা পিছনের সারিতে? মেয়েরা কি আজন্মকাল বিপ্লবের সেবাদাসী হয়েই থাকবে? দময়ন্তী দুদিকে মাথা নেড়ে রুক্ষ গলায় বলল, ‘এটা হতে পারে না! দিস ইজ নট পোয়েটিক জাস্টিস!’

রাহুল বোধহয় ঠিক এই কথাটার জন্যই তৈরি হয়ে বসেছিল। কথাটাকে সে যেন কামড়ে ধরল, বাঘ যেভাবে শিকার ধরে, ‘কেন? সমস্যাটা কি শুধু তোমাদের সমস্যা? সমাজটা যে আমার মা-বোন-প্রেমিকার জন্য সুরক্ষিত নয়, এটা শুধু আমার মা-বোন-প্রেমিকার সমস্যা? আমার সমস্যা নয়?’

দময়ন্তী থমকে গেল। জবাব এল না মুখে। দিনকয়েকের না-কাটা দাড়িতে রাহুলকে অন্যরকম লাগছিল। চোখের তলায় কালিটাও কি নতুন? দময়ন্তী টের পেল তার চোখের চাউনি নরম হয়ে এসেছে। মায়া। বড় মায়া। নিজের গহীন ভিতরে হড়পা বানের শব্দ পেল দময়ন্তী।

দেবশিশুর মতো হেসে রাহুল বলল, ‘কেন সমস্যাটাকে তোমরা নিজেদের সম্পত্তি বলে ভাববে, দময়ন্তীদি? কেন দেখার চেষ্টা করবে না যে এইসব ঘটনায় তোমার যতটা রক্তক্ষরণ হয়, আমারও ততটাই হয়? আমরা এটাকে কেন উইমেন্স গ্যাং হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছি সেটা বোঝো। খুব সচেতনভাবেই এটা আমরা করতে চেয়েছি। তার কারণ ম্যাঙ্গো পিপলের দেখা দরকার যে একদল মহিলা এসব করছে। এই সামাজিক অবস্থায় এটাই হওয়া উচিত, সঠিক স্টেটমেন্ট। কিন্তু এই দলের প্রধান নীতিনির্ধারক যদি ঘটনাচক্রে একজন পুরুষ হন, তুমি এ-কথা কী করে বলতে পারো যে দ্যাট ইজ নট আ পোয়েটিক জাস্টিস?’

বাষ্পে ভরে যাচ্ছে ভিতরটা। সত্যিই, পুরুষের কাছে দস্যুতা প্রত্যাশা করতে করতে দময়ন্তী কি ভুলে গেছে, পুরুষই প্রেমিক আর পুরুষই পিতা? সব প্রেমিক তিয়াসা পৈলানের প্রেমিকের মতো না। কেউ কেউ রঞ্জন চৌধুরীর মতো। সব বাবা দময়ন্তীর বাবার মতো না। কেউ কেউ সুচেতার বাবার মতো। সব ভাই মামণি হেমব্রমের ভাইয়ের মতো না। কেউ কেউ রাহুলের মতো। দময়ন্তী মুখার্জীর পায়ের তলার জমি নরম কোলয়েডে পরিণত হচ্ছে। দময়ন্তী মুখার্জী চোরাবালিতে ডুবে যাচ্ছে। টাল খেয়ে গেল দময়ন্তী মুখার্জীর রিভলভার-ধরা হাত।

রাহুলের গলায় কিন্তু কোনও অতিরেক নেই। সন্তের মতো নিরুত্তেজ গলায় সে বলে চলল, ‘একজন পুরুষ হিসেবে আমি শারীরিকভাবে সুজান, লীনা বা তিয়াসার কষ্টটা নিতে পারব না। ঈশ্বর বা প্রকৃতি যা-ই বলো, আমাকে সে ক্ষমতা দেয়নি। কিন্তু আমার কষ্টটাও একটা অসহ্য কষ্ট দময়ন্তীদি। সেটাকে কেন রেকগনাইজ করবে না তোমরা? আমি তো কিছু প্রমাণ করতে নামিনি। তাই নিজের জেন্ডার-আইডেন্টিটি গোপন করেছি। আজ যখন ঘটনাচক্রে তুমি জানতে পারছ যে মজন্তালী সরকার আসলে একজন পুরুষ, তখন কেন তোমার মনে হচ্ছে এটা পোয়েটিক জাস্টিস নয়? একজন পুরুষ তোমাদের সহযোদ্ধা হতে চাইছে, এটা তোমার মনে হচ্ছে না কেন?’

এমন করে তো কেউ বলেনি কোনওদিন। কাঁপুনি ধরছে দময়ন্তীর হাতে-পায়ে। বুক ফাঁকা করে কী যেন একটা নেমে যাচ্ছে। কলটা কি আবার খুলে দিল কেউ? ছ্যারছ্যার করে জলের শব্দ হচ্ছে কোথাও। না! এই সময় অন্যমনস্ক হলে চলবে না। কিছুতেই চলবে না। মাথা ঝাঁকিয়ে নিজেকে চাঙ্গা করার চেষ্টা করল দময়ন্তী। রিভলভার তাক করে থাকতে থাকতে হাতে ব্যথা করছিল। হাতবদল করল রিভলভার।

রাহুল হাসল, ‘হাত ব্যথা করছে?’

দময়ন্তী গম্ভীর হল। বাঁ-হাত বাড়িয়ে বলল, ‘তোর ফোনটা দে।’

‘এইটা এত পরে বলে কেউ?’ রাহুল পকেট থেকে মোবাইল বের করে এগিয়ে দিল, ‘তোমার চোখের আড়ালে একটা মেসেজ পাঠিয়ে দিতে পেরেছি যথাস্থানে। আর কাজ নেই। নিয়ে নাও।’

দময়ন্তী তড়িঘড়ি মোবাইলটা হাতে নিয়ে সেন্ট মেসেজে গেল। কাউকে ‘গুডবাই’ লিখে পাঠিয়েছে রাহুল।

‘ওই নম্বরটা ট্র্যাক করার চেষ্টা করে লাভ হবে না! ওর নেটওয়ার্ক ট্যাম্পার করা আছে। সত্তর মাইল দূরে লোকেশন দেখায়। আর তাছাড়া এতক্ষণে সিমটাও মোবাইল থেকে আলাদা হয়ে গেছে!’

‘কাকে পাঠালি মেসেজটা?’

রাহুল কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তার গলায় সামান্য বিষাদের ছোঁয়া লাগল, ‘আমি দুজনের প্রতি অন্যায় করে যাচ্ছি দময়ন্তীদি। একজন আমায় একতরফা ভালোবেসে গেল। আরেকজন, যে আমার জন্য অপেক্ষায় বসে থাকবে, কিন্তু অপেক্ষার শেষ হবে না কোনওদিন।’

‘এই দুজনের মধ্যে লীনা কোনটা?’

‘সরি। নো কমেন্ট।’

জল ভরে আসছে চোখে। ভিতরটা যেন কোদাল দিয়ে কোপাচ্ছে কেউ। শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসা গলায় দময়ন্তী বলল, ‘তাহলে তোরা এইসব লোকজনকে খুঁজে খুঁজে এক জায়গায় করেছিস, যারা ঘরপোড়া গরু। তাই তো? সুজান জর্ডান, সম্পূর্ণা মিত্র, মামণি হেমব্রম, শম্পা চৌধুরী এবং এঁদের মতো আরও লোকজন নিয়েই তোদের প্রজেক্ট মজন্তালী সরকার?’

‘এইত্তো। মজন্তালী সরকারের একেবারে ঠিকঠাক সংজ্ঞা দিয়েছ।’

‘কীভাবে এতকিছু করলি?’

‘ট্রেড সিক্রেট। মাপ কোরো।’

‘তোদের দলে আর কে কে আছে? তিয়াসা, সুচেতা, লিলি—এরা আছে?’

‘কেন শুধু শুধু একই কথা জিগ্যেস করছ? তোমার কি মনে হয়, আমি বলব?’

একইসঙ্গে এত বিরোধী-পক্ষের হইহল্লা চলছে বুকের ভিতর, নিজেকে পার্লামেন্ট বলে মনে হচ্ছে। দাঁতে দাঁত চাপল দময়ন্তী। রাশ আলগা দেওয়া দেওয়া যাবে না। বলল, ‘তোদের ফান্ডিং কোত্থেকে আসে?’

‘নিজেই তো দেখলে! কোনও টেররিস্ট অরগ্যানাইজেশন না, মানুষ ভালোবেসে নিজের সঞ্চয় তুলে দিচ্ছে প্রজেক্ট মজন্তালী সরকারের হাতে। সব এভাবেই এসেছে। টুকটাক হাত-গন্ধও করতে হচ্ছে অবশ্য।’

‘কীরকম?’

‘দু-মাস আগে বিল্ডার অনুপম ঘোষের আট বছরের বাচ্চা কিডন্যাপ হল, মনে আছে? আমরাই করেছিলাম। আড়াই কোটি নিয়ে ছেড়েছি,’ আড়মোড়া ভাঙল রাহুল, ‘এইসবও করতে হচ্ছে টুকটাক।’

দময়ন্তী অবাক হল, তবে মুখে সেটা ফুটতে দিল না। তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল, ‘আমিও যেমন! তোদের থেকে মরালিটি আশা করেছিলাম!’

‘মরালিটির স্থান-কাল-পাত্র থাকে, দময়ন্তীদি। অনুপম ঘোষ কীভাবে টাকা করেছে কলকাতার সবাই জানে। সমুদ্র থেকে এক মগ জল না-হয় ভালো কাজে লাগল। মরার পর নরকে যাবার আগে পাঁচটা মিনিট স্বর্গ ঘুরে যেতে পারবে।’

‘বারো তারিখ ঠিক কীভাবে কী কী প্ল্যান-ট্যান করেছিলি বল তো?’

‘করেছিলি মানে? সে-প্ল্যান তো এখনও রয়েছে। এই সপ্তাহেই হয়তো তোমরা ফোন পাবে।’

‘কীসের ফোন?’

‘বারোই সেপ্টেম্বরের নেমন্তন্নের ফোন। দূরভাষ দ্বারা নিমন্ত্রণের ত্রুটি মার্জনা কোরো প্লিজ।’

‘শেষের মুখে দাঁড়িয়েও কমেডি করবি?’

‘শেষ কোথায়!’ চওড়া হল রাহুলের হাসি। যেন বহু আলোকবর্ষ দূরবর্তী মৃত সব তারাদের আলো এসে পড়ল তার মুখে, ‘আমি না-থাকলেও মজন্তালী সরকার থাকবে দময়ন্তীদি। আমরা থাকব। বিশ্বাস করো, আমরাও চাই আমাদের প্রয়োজন ফুরিয়ে যাক। দুর্ভাগা সেই দেশ যার সুপারহিরো দরকার হয়। কিন্তু তুমিও জানো, মজন্তালীকে এখন এই শহরের প্রবলভাবে দরকার, এবং এই দরকার খুব তাড়াতাড়ি ফুরোবে না।’

দময়ন্তীর নাকের পাটা ফুলে উঠল শুধু। মুখে জবাব এল না।

রাহুল মুখের হাসি ধরে রেখে বলল, ‘ফলে যতদিন-না আমাদের দরকার ফুরোচ্ছে, আমরা থাকব। এখনও বেশ কিছুদিন তোমাদের জ্বালাব। সেজন্য আগাম ক্ষমা চেয়ে রাখছি।’

‘তোরা যতজনই থাক, সবকটাকে ধরব। চিন্তা করিস না। কান টেনে মাথা বের করেছি। এবার মাথা টেনে পুরো বডি বের করে আনব।’

‘আচ্ছা। সে দেখা যাবে। কিন্তু তুমি এত ঘামছ কেন? শরীর খারাপ লাগছে?’

‘আমায় নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না।’

‘হাইপারটেনশনে তোমার সমস্যা হয়, সেজন্যই বলছি। তুমি প্রচণ্ড ঘামছ। চোখমুখ লাল হয়ে গেছে।’

‘এইসব বলে আমায় ভেজাতে পারবি না।’

‘শোনো, ইউ ক্যান রিল্যাক্স। আমি তোমায় অ্যাটাক করব না।’

‘অ্যাটাক করবি না?’ তীব্র ব্যঙ্গে বক্র হল দময়ন্তীর কণ্ঠ।

‘না। আমায় বিশ্বাস করতে পারো।’

দয়মন্তীর অবরুদ্ধ আবেগ লকগেট ভেঙে বেরিয়ে এল প্রচণ্ড চিৎকার হয়ে, ‘বিশ্বাসের কথা মুখে আনবি না তুই! ইউ আর আ লায়ার! একটা মিথ্যেবাদী! আমাদের সবাইকে তুই বিট্রে করেছিস!’

রাহুলের কোনও ভাবান্তর হল না। সামান্য নড়েচড়ে বসে শান্তভাবে বলল, ‘হ্যাঁ, আমি তোমাদের বিট্রে করেছি। বাট ফর আ গ্রেটার কজ। সো আই ডোন্ট রিগ্রেট। আমার কোনও আফসোস নেই।’

দময়ন্তী রাগের চোটে চোখে ধোঁয়া দেখছিল। ফুঁসতে ফুঁসতে বলল, ‘এবার আফসোস হবে। বিলিভ মি। তোর টোপ দিয়েই পুরো দলটাকে ধরব। তুই জাস্ট দ্যাখ।’

রাহুল খানিকক্ষণ শূন্য চোখে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর দময়ন্তীর দিকে চোখ নামাল। তার গভীর কালো মণিতে গভীরতর ছায়া ঘনাচ্ছে। সেই শীতল চোখে চোখ পড়তেই দময়ন্তীর মাথার ভিতরে দপ করে একটা বাল্‌ব জ্বলে উঠল। ভুল হচ্ছে। মারাত্মক ভুল। রাগ অবশ করে দিচ্ছে তাকে। বর্ম শিথিল হয়ে যাচ্ছে। এরকম পরিস্থিতিতে এতটা রেগে যাওয়া মানে নিজের নিয়ন্ত্রণ প্লেটে সাজিয়ে বিপক্ষের হাতে তুলে দেওয়া। সেটা প্রায় আত্মহত্যার শামিল।

রাহুল এখন কোণঠাসা। একটা দুর্বল মুহূর্ত পেলেই নিমেষে বাঘ হয়ে উঠবে। রাগের গলায় লাগাম পরাতে তৎপর হল দময়ন্তী। তার ডান হাতকে রিভলভার স্পর্শ করতে দেখে রাহুলের ঠোঁটে একটা ম্লান হাসি জাগল। বলল, ‘আমার যাবজ্জীবন বা ফাঁসি হলে তুমি আমার মা-বাবাকে দেখবে দময়ন্তীদি?’

যথাসম্ভব নিরাবেগ গলায় দময়ন্তী বলল, ‘দেখব। চিন্তা নেই।’

‘কথা দিচ্ছ?’

‘দিচ্ছি।’

এর ঠিক পরমুহূর্তেই, ফিজিক্সে যাকে টেম্পোরাল ভেলোসিটি বলে, সেই জিনিসটার বোধে দময়ন্তী সম্ভবত সামান্য নড়ে গিয়েছিল; কিংবা রাহুল হয়তো পকেট থেকে পিস্তলটা একটু বেশিই দ্রুত বেগে বের করেছিল। মোট কথা, দময়ন্তী চোখের পলক ফেলার সুযোগ পেল না। তার বিমূঢ় দৃষ্টির ওপারে রাহুল নিজের রগে পিস্তল ধরে ট্রিগার টেনে দিল।

.

বালিগঞ্জ প্লেস, সন্ধে ৭টা ৪২

শাক্য আর সৌমিলি নেই। কাজের প্রেসার তুঙ্গে। তার মাঝখানেই ফোনে একটা মেসেজ ঢুকল। সচকিত হল শিরিন। এই টোন দিনে এক-দুবারের বেশি বাজে না। মেসেজটা এসেছে দু-নম্বর সিমে। মানে, কাজের মেসেজ। তড়িঘড়ি মেসেজটা খুলে দেখতেই শিরিনের মাথার মধ্যে ব্ল্যাকআউট হয়ে গেল। ফোনটা খসে পড়ল হাত থেকে। সবাই, ‘কী হল! কী হল!’ বলে ব্যস্ত হয়ে নিজেদের ডেস্ক ছেড়ে উঠে এল।

শিরিন টেবিলে মাথা রেখে শুয়ে পড়েছে। অনেকে মিলে তাকে ঘিরে দাঁড়াল। অনন্যাদি পিঠে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, ‘জল খাবি? জল খা একটু!’

শ্বাসকষ্ট হলে যেমন হয়, সেরকমভাবে টেনে টেনে অতি কষ্টে শিরিন বলল, ‘দরকার নেই। আমি ঠিক আছি।’ বলে হঠাৎ চেয়ার ছেড়ে উঠে সবাইকে ঠেলেঠুলে দ্রুত এগিয়ে গেল ওয়াশরুমের দিকে।

‘কী রে, বমি হবে?’ বলতে বলতে অমৃতা পিছন পিছন যাচ্ছিল। শিরিন দ্রুত পায়ে ওয়াশরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। ফোন খুলে সিমকার্ড বের করে কমোডে ফেলে ফ্ল্যাশ করল। বন্ধ দরজায় পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল কিছুক্ষণ। তারপর দু-হাতে মুখ চেপে হু-হু করে কেঁদে ফেলল।

.

কাশীপুর, সন্ধে ৭টা ৫৫

‘লজ্জা করছে?’ মা মরিয়া গলায় বললেন, ‘এত বড় বড় সব লজ্জা জয় করলি আর এটা পারবি না? প্লিজ ফোন কর। বড়জোর না বলবে। এর চেয়ে বেশি কী হবে?’

এর চেয়ে বেশি কী হবে, মা-কে কী করে বোঝাবে লীনা? কী করে বোঝাবে, এই লজ্জার সঙ্গে বাকি লজ্জাগুলোর তফাত আছে? এর সামনে সব ত্যাগ করে কাঙাল হয়ে দাঁড়াতে হয়। এক-কাপড়ে। যেভাবে জ্বরতপ্ত কপাল নিজেকে নিবেদন করে দেয় জলপট্টির কাছে। যেভাবে ভাতের গন্ধের কাছে নিজেকে সঁপে দেয় নিরন্নের ঘুম। কিন্তু মুখ তুলে তাকাতে নেই। চোখে চোখ রাখতে নেই কিছুতেই।

কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে। বুকের ভিতর প্রচণ্ড ভূমিকম্পে উপড়ে যাচ্ছে গাছপালা, ভেঙে পড়ছে ঘরবাড়ি, উন্মাদ প্রলয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে একের পর এক সভ্যতা। লীনা অবশ হাতে কল লগ থেকে রাহুলের নম্বরটা বের করে ‘কল’ অপশনে আঙুল ছোঁয়াল।

ঠাকুর, লোকটা যেন ফোন না ধরে! লজ্জায় লীনা মরে যাবে!

***

3 Comments

শেষটা ঠিক ভালো লাগলো না। মনে হলো লেখক খেই হারিয়ে তাড়াহুড়ো করে শেষ করে দিলেন।

Animesh Chakraborty November 24, 2025 at 2:19 pm

Take off টা দারুন।ফ্লাইটটাও মন্দ নয়।কিন্তু ল্যান্ডিংয়ের সময় হুমড়ি খেয়ে পড়ল।

রোহন রায়ের লেখা আগে পড়িনি। অত্যন্ত ভালো লাগলো উপন্যাসটা। লেখক একটা তদন্তের টেকনিক্যাল দিকগুলোর দিকে জোর দিয়েছেন, এটা খুব ভালো লেগেছে। বেশির ভাগ গোয়েন্দা গল্পে যার অভাবটা খুব প্রকট। এছাড়াও গল্পের জটিলতা, ট্যুইস্ট, ফ্লো, চরিত্রদের কথাবার্তার স্বাভাবিকতা এগুলোও খুব সুন্দর ভাবে এনেছেন। শেষের দিকে একটু তাড়াহুড়ো হয়েছে এটা আমারও মনে হয়েছে। তবে সেটুকু মেনে নিলাম। শেষ দুটো অধ্যায়ে আভাস দিয়ে ছেড়ে দেওয়াটা খুব শৈল্পিক লাগলো। নিতান্ত নিটপিকিং এর মতো দুটো কথা বলবো। এক, এক জায়গায় একটি পানীয়কে ‘মোজিতো’ লেখা হয়েছে, উচ্চারণটা ‘মোহিতো’ হলে ঠিক হয়। দুই, পুলিশের প্রেস কনফারেন্সের সময় ভবানীভবনে হ্যাকিং এর ঘটনাটা বিবিসি’র শার্লকের থেকে অণুপ্রাণিত মনে হয়। সেটা লেখক ভূমিকায় লিখে দিলেও পারতেন, যেমন লিখেছেন আগাথা ক্রিস্টির কথা। তবে এগুলো ছোট ব্যপার, দরকারী কিছু না।
রোহন রায়কে অনেক বাহবা ও শুভেচ্ছা, ই-বাংলা লাইব্রেরীকে অনেক ধন্যবাদ বইটা তোলার জন্য।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *