ত্রয়োদশ দিন
তারিখ : ১৪ আগস্ট, ২০১৩
সেভন্থ হেভন ক্লাব ক্যাফে, কলকাতা, বেলা ১২টা ২০
প্রযোজক সুজিত ঘোষ একটা স্কচের পেগ নিয়ে বসে মুম্বইয়া ইনভেস্টারের জন্য অপেক্ষা করছিলেন, এমন সময় ফোনটা এল।
‘মিঃ সুজিত ঘোষ?’
‘বলছি। হু ইজ দিজ?’
‘চারটে কিউব দিয়ে এক পেগ মদ কে খায় মশাই?’
‘মানে? আপনি কে বলছেন?’
‘সেভেন্থ হেভেনে বিফস্টেকটা ট্রাই না করলে জীবন বৃথা। প্লিজ অর্ডার করুন। থ্যাঙ্ক মি লেটার।’
‘কী আশ্চর্য! আপনি কে?’
‘শুনুন, ফিল্মে আইটেম নাম্বার রাখবেন না। আপনার ব্যানার থেকে রিলিজ হওয়া কোনও ফিল্মে আইটেম নাম্বার থাকলে প্রোডিউসার হিসেবে আপনাকেই দায়ী বলে ধরে নেওয়া হবে এবং আপনাকে মরতে হবে। কেমন?’
‘হোয়াট ননসেন্স? হু ইস দিস?’
‘মজন্তালী সরকার। নাম তো শুনা হি হোগা।’
.
ভবানী ভবন, দুপুর ২টো ১৫
লোকনাথ একটা কাগজ দেখে বলল, ‘পরপর চার প্রোডিউসরের কাছে ফোন গেছে। প্রথম কল পূর্ণেন্দু সরকারের কাছে। বেলা ১২টা ১০। এরপর যথাক্রমে চয়ন মিত্র, মনীশ আগর্বাল, সুজিত ঘোষ। টাওয়ার লোকেশন সুকিয়া স্ট্রিট। বেলা ১২টা ৪০ মিনিটে ফোন সুইচড অফ হয়েছে মানিকতলায়।’
অমিতাভ খুব যত্নের সঙ্গে গোঁফে হাত বোলাচ্ছিলেন। বললেন, ‘নম্বরগুলো ট্রেস করা গেল?’
‘টেলিকমের শৌভিক বলছে, এই নম্বরগুলোয় সম্ভবত কোনও একটা মাস্কিং করা হয়েছে। দিনদুয়েক সময় লাগবে। চয়ন মিত্র বুদ্ধি করে ফোনকলটা রেকর্ড করেছেন। সেটা আমায় পাঠিয়েও দিয়েছেন। তবে সফটওয়ার ইউজ করে গলাটাকে রোবোটিক এফেক্ট দেওয়া হয়েছে। আপনি একবার শুনে দেখুন। তেমন হলে জয়ন্ত স্যারকে পাঠান।’
‘আমায় শোনাতে হবে না। জয়ন্তকে পাঠিয়ে দাও।’
‘ঠিক আছে। আরেকটা কথা স্যার। পূর্ণেন্দু সরকার আর সুজিত ঘোষ দুজনেই দাবি করেছেন যে ওঁরা যেখানে ছিলেন মজন্তালীও সেখানেই ছিল।’
‘ওঁরা দুজন একই জায়গায় ছিলেন নাকি?’
‘না। সুজিত ঘোষ পার্ক সার্কাসের একটা পাবে ছিলেন আর পূর্ণেন্দু সরকার গড়িয়া বাজার এরিয়ায়, একটা বইয়ের স্পেশাল স্ক্রিনিংয়ে।’
‘বই নয় লোকনাথ। ফিল্ম।’
‘ওই হল।’
‘ওই হল না। বইয়ে মলাট থাকে। যাক গে, ওঁরা কী করে বুঝলেন সেটা বলো।’
‘সুজিত ঘোষ কী খাচ্ছিলেন সেটা নাকি ফোনে নির্ভুল বলে দিয়েছে মজন্তালী। আর পূর্ণেন্দু সরকারের পাঞ্জাবির তারিফ করেছে।’
‘অথচ টাওয়ার লোকেশন সুকিয়া স্ট্রিট?’
‘হ্যাঁ স্যার। তার মানে ওই দুটো জায়গায় মজন্তালীর একজন করে এজেন্ট ছিল।’
অমিতাভ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, ‘দুটো জায়গার সিসিটিভি ফুটেজ চেক করাতে হবে।’
‘সুকুমারকে বলে দিয়েছি স্যার।’ বলে লোকনাথ দেওয়ালে কলকাতার দৈত্যাকার ম্যাপটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। হাতে একটা মার্কার নিয়ে ম্যাপে নির্দেশ করল, ‘এবার একটা জিনিস দেখুন স্যার। খুনগুলো গোটা কলকাতা এবং পার্শ্ববর্তী শহরতলি জুড়েই হচ্ছে। দূরের জেলায় হয়নি। সেদিক থেকে দেখলে মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া যায় যে এদের ঘাঁটি কলকাতাতেই। আরও নিশ্চিত হওয়া যাবে কল লোকেশন দেখলে। বিউটি স্পট ম্যাগাজিন থেকে শুরু করে প্রডিউসরদের হুমকি পর্যন্ত সব কল এসেছে মোটামুটি সাড়ে তিন-চার কিলোমিটার রেডিয়াসের মধ্যে। খান্না টু রাজাবাজার।’ বলতে বলতে কলকাতার ম্যাপে ওই অঞ্চলে লাল মার্কার দিয়ে একটা বৃত্ত আঁকল লোকনাথ, ‘মাত্র একটা কল বাদে। সেটাও কলেজ স্ট্রিট এরিয়া। খুব দূরে না।’
‘গুড অবজারভেশন,’ অমিতাভ বললেন, ‘ওই এরিয়ায় পেট্রলিং শুরু করাও। টুয়েন্টি ফোর ইনটু সেভেন। কোন কোন থানার এরিয়া পড়ছে? মানিকতলা আর এন্টালি?’
‘মানিকতলা, এন্টালি, নারকেলডাঙা।’ লোকনাথ বলল, ‘আপনি সিপিকে ফোন করে বলে দিতে বলুন। বাকি কো অর্ডিনেশন আমি করে নিচ্ছি।’
‘বলে দিচ্ছি,’ অমিতাভ টেবিল থেকে ফোন হাতে তুলে নিয়ে বললেন, ‘সবাই রাস্তাঘাটে নিজেদের খুচরো সোর্সদের অ্যাক্টিভ করাও। পয়সা নিয়ে ভাবতে হবে না।’
লোকনাথ বলল, ‘আরেকটা জিনিস স্যার। কলিং বৃত্ত আর অপারেশনাল বৃত্ত এই দুটো ট্যালি করলে কিন্তু দেখা যাচ্ছে, কলিং বৃত্তের ধারেকাছে কোনও অপারেশন নেই।’
‘দ্যাট প্রুভস দ্য পয়েন্ট, লোকনাথদা।’ রাহুল বলল, ‘আমাদের মানিকতলা এলাকা চষে ফেলতে হবে। দরকারে বাড়ি ধরে ধরে খবর নিতে হবে।’
তানিয়া বলল, ‘তবে একটা প্রশ্ন থেকেই যায়। মানিকতলাটা কোনওভাবে ফলস ফ্ল্যাগ না তো? মাত্র একটা কল বাদে সব কল এই এক এরিয়া থেকে। এটা একটু সন্দেহের ব্যাপার তো বটেই।’
‘ভালো বলেছিস,’ দময়ন্তী প্রশংসার চোখে তাকাল, ‘এমন হতেই পারে যে মানিকতলা থেকে কলগুলো করা হয়েছে আমাদের মিসলিড করার জন্য। মানিকতলায় যদি সত্যিই এদের ঘাঁটি হয়, তাহলে নিজেদের ঘাঁটিকে কি ডিজিটালি ভালনারেবল করে রাখবে কেউ?’
‘তোমাদের সঙ্গে একমত। তবে ওখানে চিরুনি তল্লাশি চালাতেই হবে।’ অমিতাভ ড্রয়ার থেকে আইড্রপ বের করে চোখে দিলেন, ‘আসল ঘাঁটি না হলেও একটা ছোটখাটো কিছু তো থাকতেই হবে। এইধরনের ফোনালাপ করতে একটা নিরাপদ নিরিবিলি জায়গা লাগবেই। সেটা দোকান হতে পারে, অফিস হতে পারে, কারও বাড়ির বাগানও হতে পারে। কিন্তু সেখানে এই মহিলার অ্যাক্সেস তো নিশ্চয়ই আছে।’
এই কথাটায় সকলেই একমত হল। অমিতাভ লোকনাথকে বললেন, ‘তুমি এখনই মানিকতলা আর এন্টালি থানার সঙ্গে কথাটা সেরে এসো। আমি সিপিকে ফোন করে নিচ্ছি।’ বলে ফোন হাতে উঠে গেলেন। লোকনাথও বেরিয়ে গেল।
রাহুল ভুরু কুঁচকে কী-যেন ভাবছিল। এবার দময়ন্তীকে বলল, ‘দময়ন্তীদি, স্ক্রিনিংয়ে তো লিমিটেড লোকজনই থাকে। এবং তাঁরা সাধারণত বিনোদন জগতেরই মানুষ হন। তাই না?’
দময়ন্তী কয়েক সেকেন্ড নিল ব্যাপারটা ধরতে। চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল তার, ‘ঠিক বলেছিস।’
তানিয়ারও চোখ বড় বড় হয়ে গেছে। বলল, ‘খোঁজ নিচ্ছি সম্পূর্ণা মিত্র ওই সময় কোথায় ছিলেন।’ বলে ফোনটা হাতে তুলে নিল।
দময়ন্তী রাহুলকে বলল, ‘দ্যাখ, আমরা কিন্তু নয় নয় করে বেশ কয়েকটা ডট পেয়ে গেলাম। এবার সেগুলোকে সরলরেখায় যোগ করা যাচ্ছে কিনা সেটাই দেখার।’
‘একটা-দুটো ডট খুঁজে পাবার অপেক্ষা দময়ন্তীদি, যেগুলো মিসিং লিঙ্ক। সেগুলো পেয়ে গেলেই লাইনগুলো টানা যাবে। পুরো মাকড়সার জালের নকশাটা আমাদের চোখের সামনে ক্লিয়ার হয়ে উঠবে।’
‘এখানে কিছু-না-কিছু পাবই। স্পেশাল স্ক্রিনিংয়ে লোকসংখ্যা যদি ম্যাক্সিমাম দুশো-আড়াইশোর মধ্যেও থাকে, তার মধ্যে অন্তত একজন সম্ভাব্য সাসপেক্ট আমরা পাচ্ছিই। খড়ের গাদায় ছুঁচ খোঁজা তো নয়।’
‘ইয়েস। গিমিকবাজি করতে গিয়ে একটা ভুল চাল দিয়ে ফেলল ক্যাটওম্যান।’
তানিয়া সোর্সের সঙ্গে গুজুর গুজুর করে কথা সেরে এগিয়ে এল, ‘সম্পূর্ণা মিত্র ওই সময় পার্ক স্ট্রিটে ছিলেন স্যার। ফ্লুরিজে ব্রাঞ্চ খাচ্ছিলেন।’
‘এত কাঁচা কাজ করবেন এটা আশাও করা যায় না। তুই একটা কাজ কর, রাহুল। সুকুমারদাকে একটা কল করে বল আজকের ওই স্পেশাল স্ক্রিনিংয়ের অতিথি তালিকাও যেন জোগাড় করে আনে।’
রাহুল তাই করল। তারপর বলল, ‘তাহলে নেক্সট কাজ হচ্ছে পূর্ণেন্দু সরকারকে ডেকে অতিথি-তালিকার সঙ্গে ট্যালি করে করে সবার ব্রিফ নেওয়া।’
‘ইয়েস’ দময়ন্তী ডান হাত মুঠো পাকিয়ে বাঁ-হাতের তালুতে ঘুষি মারল, ‘ম্যাওকে থলিতে পুরতে আর দেরি নেই মনে হচ্ছে।’
তানিয়া নিজের ডেস্কে গিয়ে একটা ফাইল নিয়ে কী-যেন দেখছিল। একটু পরে বিভ্রান্ত মুখে এসে দময়ন্তীকে বলল, ‘একটা জিনিস দ্যাখো।’
তানিয়ার হাতে রেখা ভট্টাচার্য, মানে সম্পূর্ণা মিত্রের লিলুয়া হোমের ফাইল। দময়ন্তী ভুরু কুঁচকে বলল, ‘কী রে?’
‘হোম থেকে বলা হয়েছিল, দুজন ট্রেইনি সাইকোলজিস্ট ওদের নিয়ে কাজ করেছিলেন। ওঁদের নামও এই ফাইলে রয়েছে। একটা নাম দেখে আমার চেনা লাগল।’ পেন্সিল দিয়ে একটা জায়গা পয়েন্ট করল তানিয়া, ‘দ্যাখো তো, ইনিই কি সেদিন এসেছিলেন তোমার কাছে?’
দময়ন্তী সবিস্ময়ে দেখল, দ্বিতীয় নামটা শালিনী সিনহা।
.
গার্ডেন ক্যাফে, দুপুর ৩টে
সবটা শুনে শালিনী বলল, ‘হ্যাঁ। প্রজ্ঞা দেবনাথ আমার ব্যাচমেট। ও ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট, আমি সেকেন্ড। ইউনিভার্সিটি পাশ করেই আমরা দুজনে এক বছর করে ট্রেইনি হিসেবে কাজ করি লিলুয়া সরকারি হোমে।’
‘রেখা ভট্টাচার্যের ফাইলে দেখলাম প্রজ্ঞা দেবনাথের সই করা একটা রিপোর্ট, আর একটা রিপোর্ট দেখছি ইন্সটিটিউট অব সায়কিয়াট্রির। মানে তুই রেখার রিপোর্ট দিসনি?’
‘লিলুয়া হোমে আমি আর প্রজ্ঞা পরপর এক বছর করে কাজ করেছিলাম। প্রজ্ঞার রিপোর্ট আছে মানে তখন প্রজ্ঞার টার্ম চলছিল। আমার টার্ম তার আগে শেষ হয়ে গিয়েছিল।’
‘আর ইউ ইন টাচ উইথ হার?’
‘হ্যাঁ। কথা বলতে চাও?’
‘হ্যাঁ।’
‘বলিয়ে দেব। তবে স্কাইপে কথা বলতে হবে। প্রজ্ঞা এখন অস্ট্রেলিয়ায় সেটলড।’
‘ঠিক আছে। তুই একটা টাইম দিতে বল। যত তাড়াতাড়ি হয়, ভালো। এবার এই রেখা ভট্টাচার্য মেয়েটির কথা বল দেখি কিছু মনে আছে কিনা।’
‘আমি তো ওই এক বছরই কাজ করেছিলাম। আমার খুবই ভালো মনে আছে। মেয়েটা ভীষণ ইনটেলিজেন্ট আর কম্পোজড ছিল। খুব ইনট্রোভার্টও। এইধরনের বাচ্চারা সাইকোপ্যাথ হয়ে যাবার একটা চান্স থাকে। কিন্তু ওর ক্ষেত্রে সেটা হয়নি। শি ওয়াজ নট ইমোশনালি কোল্ড। ওর টেন্ডার ফিলিংগুলো নষ্ট হয়নি। আমার মনে আছে মেয়েটা বিড়াল-কুকুর খুব ভালোবাসত।’
‘মেয়েটার ওপর খুনের চার্জ ছিল। সারকামস্ট্যানশিয়াল এভিডেন্স ছিল। তা সত্ত্বেও মাত্র আড়াই বছরের মাথায় ক্লিনচিট পেল? এমনকী চাইল্ড কোর্টেও যেতে হল না? এক্ষেত্রে নাকি সাইকোলজিস্টদের রিপোর্ট একটা ফ্যাক্টর হয়। তবে জুভেনাইল বোর্ডের জাস্টিস তপন রায়চৌধুরী বলছিলেন, ক্রিটিকাল কেসের ক্ষেত্রে ইন্সটিটিউট অব সায়কিয়াট্রির রিপোর্ট লাগে। এক্ষেত্রে সেটা ছিল। এই ইন্সটিটিউট অব সায়কিয়াট্রির রিপোর্টের ব্যাপারটা ঠিক কী? একটু বুঝিয়ে বল তো।’
‘কোনও কেস নিয়ে জেজেবি, মানে জুভেনাইল জাস্টিস বোর্ডের সদস্যদের মধ্যে মতভেদ থাকলে আমাদের রিপোর্টে কাজ হত না, ইন্সটিটিউট অব সায়কিয়াট্রিতে সাইকোলজিকাল টেস্ট করা হত। তাদের রিপোর্ট দেখে জেজেবি ক্লিনচিট দিত অথবা চাইল্ড কোর্টে ঠেলত। এখনও বোধহয় তাই হয়। কেউ যদি অপরাধী বলে সাব্যস্ত হয় তাহলে মেইনলি দেখা হয় তিনটে জিনিস। এক, অপরাধ সে আচমকা বা ইম্পালসিভ হয়ে করেছে নাকি সজ্ঞানে ঠান্ডা মাথায়। দুই, অপরাধ করার পরে বিষয়টার গুরুত্ব সে বুঝতে পারছে কিনা। আর তিন, অপরাধবোধ রয়েছে কিনা, কিংবা এরপরেও অপরাধ করার মতো মানসিক সক্ষমতা রয়েছে কিনা। এই তিনটে প্রশ্নের উত্তরের ওপর নির্ভর করে যে কেস চাইল্ড কোর্টে যাবে কিনা। ফলে সাইকোলজিস্টদের রিপোর্ট ম্যাটার করে। তবে অনেক বেশি ম্যাটার করে জেজেবি সদস্যদের পার্সোনাল বায়াস।’
দময়ন্তী চোখ সরু করে খানিক ভাবল। তারপর বলল, ‘কিন্তু আল্টিমেটলি এটা মার্ডার চার্জ। সেলফ ডিফেন্সের যুক্তিটা বেশ নড়বড়ে। ছাড়া পেল, সে না-হয় বুঝলাম। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি?’
‘দ্যাখো, হোমে ইন্টারনশিপে ঢোকার আগে একটা কথা আমাদের বলা হয়েছিল। হোম কখনও বাড়ি হতে পারবে না। আমাদের রিপোর্ট যেটুকু ম্যাটার করবে তাতে যেন আমরা চেষ্টা করি অল্পস্বল্প অপরাধ যারা করেছে, তাদের চটপট ছেড়ে দেবার তদ্বির করতে। ফলে জেজেবি-র লক্ষ্যই থাকে পজিটিভ আউটপুট পেলে তাকে ছেড়ে দেওয়া।’ বলে এক টান ফ্রেশ লাইম সোডা খেল শালিনী, ‘তোমরা তাহলে মজন্তালীর কেসে এই রেখাকে সন্দেহ করছ?’
‘হ্যাঁ,’ দময়ন্তী মাথা নাড়ল, ‘মেয়েটার হিস্ট্রি আর প্রোফাইল দুটোই সন্দেহ করার অনুকূল।’
‘সে এখন কোথায়? খোঁজ পেয়েছ কিছু?’
‘শুনলে চমকাবি,’ হাসল দময়ন্তী, ‘সে এখন ফিল্মস্টার।’
‘বলো কী! নাম শুনিনি তো।’
‘শুনবি কী করে? পুরোনো নাম তো নেই আর। রেখা হোম থেকে ছাড়া পাবার পরেই বাড়িশুদ্ধু লোক এফিডেভিট করে নাম পাল্টে ফেলেছে। রেখার নাম এখন সম্পূর্ণা মিত্র।’
শালিনী খাবি খেল, ‘অভিনেত্রী সম্পূর্ণা মিত্র?’
‘হ্যাঁ।’
শালিনী হাঁ করে বসে থাকল কয়েক সেকেন্ড। তারপর বলল, ‘মেয়েটার সঙ্গে কালই আমার দেখা হল দময়ন্তীদি।’
.
ভবানী ভবন, দুপুর ৩টে ৪০
ডেকে ডেকে যাকে পাওয়া যায় না, না-ডাকতে তাঁকে পেয়ে গেলে ব্যাপারটা জমে না। যেমন শুভ্রকান্তি আজ নিজেই হুট করে ফোন করে চলে এলেন। ঘরে ঢুকেই বললেন, ‘খুব খিদে পেয়েছে। আমার জন্য একটা ফ্রায়েড রাইস আর চিলি চিকেন বলে দাও তো।’
বেয়ারাকে ডাকার বেল টিপে অমিতাভ বললেন, ‘এত জাঙ্ক ফুড খাবেন না দাদা। বয়েসটা খেয়াল রাখুন।’
‘তোমাদের ক্যান্টিনে সাধারণ ডালভাতের চেয়ে এইটাই ভালো করে।’ রিমোট তুলে নিয়ে এসির তাপমাত্রা ষোলো করে দিলেন শুভ্রকান্তি। তারপর বললেন, ‘কষ্ট করে এতটা দূর এসেছি, এখন এত নীতিকথা শুনিও না। জানি বয়েস বাড়ছে। তোমার না বললেও চলবে।’
একটু আগে শুভ্রকান্তি নিজেই ফোনে বলেছেন যে ন্যাশনাল টেস্ট হাউস আসছেন, পথে একবার ঘুরে যাবেন। ন্যাশনাল টেস্ট হাউস থেকে ভবানী ভবন গাড়িতে পাঁচ মিনিটও লাগে না। আর যে-কোনও জায়গায় গিয়েই শুভ্রকান্তি রোজকার সাধারণ খাবার ফেলে বিরিয়ানি বা চাইনিজই খোঁজেন। অমিতাভ অবশ্য দুটো কথার একটাও শুভ্রকান্তিকে মনে করালেন না। রমেশ এসে খাবার অর্ডার নিয়ে গেল।
শুভ্রকান্তির খাবারের সঙ্গে নিজের আর রাহুলের জন্য কফি জুড়ে দিলেন অমিতাভ। তারপর শুভ্রকান্তির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘বলুন দাদা, কী এমন হল আপনি নিজেই কষ্ট করে ছুটে এলেন?’
‘অশোক বসুর ফ্ল্যাট থেকে কয়েকটা জরুরি ক্লু পেয়েছি। রিপোর্ট বানিয়ে দিতে দিতে পরশু। টেক অ্যাওয়েগুলো শুনে নাও এখনই।’
‘এত তাড়াতাড়ি হয়ে গেল! কী সৌভাগ্য!’ মুখ ফস্কে বলে ফেলেই জিভ কাটলেন অমিতাভ। শুভ্রকান্তি ফাটবেন।
ফাটলেন না, বরং ক্লান্ত দেখাল শুভ্রকান্তির চোখজোড়া, ‘আমি কাজ ফেলে রাখি না অমিতাভ। তুমি জানো আমার সমস্ত স্টাফ কতটা ওভারবার্ডেনড। বাড়ি ফিরতে ফিরতে সাড়ে এগারোটা-বারোটা বাজছে হামেশাই। পরশু তো দেড়টা বেজে গেছিল।’
কথাটা মিথ্যে নয়। অমিতাভ সামাল দিতে তৎপর হলেন, ‘আমি ওভাবে বলতে চাইনি দাদা। স্টেট ফরেন্সিক ল্যাব কীভাবে চলছে সেটা আমরা সবাই জানি। আপনি রিটায়ার করে গেলে পুলিশ টের পাবে।’
শুভ্রকান্তি বহুকালের পুরোনো ডিজেল গাড়ির মতো গলগলিয়ে তেল খান। এবারেও খেলেন, এবং খুশি হয়ে বাজে কথা না-বাড়িয়ে সোজা কাজের কথায় চলে গেলেন, ‘শোনো, অশোক বসুর ঘরের ভিতরে আর বাইরে ফুটওয়ার প্রিন্ট পাওয়া গেছে। বাথরুমের দরজায় হাতের ছাপও পাওয়া গেছে। এই দুটোই যথাসম্ভব মোছার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু কাজের কাজ করতে পারেনি। পোশাকের ফাইবারের স্যাম্পলও পেয়েছি। মিক্সড কটনের কামিজ বা কুর্তি গোছের কিছু। নীল রঙের।’
ডায়েরি, পেন টেনে নিয়ে অমিতাভ বললেন, ‘হ্যাঁ, নীল। সিসিটিভি ফুটেজে তাই দেখা গেছে।’
‘চুলের নমুনাও পাওয়া গেছে। চুলে বেশ কিছু ড্রায়েড শ্যাম্পু পার্টিকল পেয়েছি। ভদ্রমহিলা খুনের দিন বা তার আগের দিনই শ্যাম্পু করেছিলেন। এমনিতে চুলের কোয়ালিটি মোটামুটি। নিয়মিত হেয়ার প্রডাক্ট ব্যবহার করেন বলে হেয়ার শ্যাফট ড্যামেজড।’
গরম তেলে জলের ছিটে পড়ার মতো কথাটা ছ্যাঁক করে বেজে উঠল অমিতাভর মাথার মধ্যে। অভিনয়-দুনিয়ার লোকেদের নিয়মিত হেয়ার প্রোডাক্ট ব্যবহার করতে হয়। সম্পূর্ণা মিত্রের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে।
শুভ্রকান্তি বললেন, ‘জুতোটা স্নিকারস। লোগো থেকে কোম্পানিও উদ্ধার করেছি। রিবক। ব্যাস। আপাতত এটুকুই। ডিএনএ অ্যামপ্লিফাই করা হয়ে গেছে। প্রোফাইলিং আজ রাতের মধ্যেই হয়ে যাবে। রিপোর্টের সঙ্গে পাঠাব।’
নোট নেওয়া শেষ করে অমিতাভ তৃপ্ত গলায় বললেন, ‘থ্যাঙ্কিউ ব্যানার্জীদা। আপনি গুরুদেব লোক।’
‘এইটা তোমাদের এডিজি-কে একটু বুঝিয়ে বোলো।’ বলে শুভ্রকান্তি নিজের ফোনে মন দিলেন।
অমিতাভ রাহুলের দিকে তাকিয়ে চোখ নাচালেন, ‘চুলে খুব হেয়ার প্রোডাক্ট ব্যবহার করে। বুঝলে তো?’
রাহুল বলল, ‘এটাও খাপে খাপ, স্যার।’
‘ডিএনএ প্রোফাইলটা আসতে দাও। হিরোইনকে তুলে আনব।’
‘না-মিললেও হিরোইনের জড়িত থাকার সম্ভাবনা শূন্য হয়ে যাচ্ছে না কিন্তু।’
শুভ্রকান্তি বললেন, ‘এই হিরোইনটা কে?’
‘আপনি কি চিনবেন?’ অমিতাভ বললেন, ‘সিনেমা-টিনেমা তো দ্যাখেন না।’
‘সিনেমা দেখি না বলে খবর একেবারে রাখি না তা নয়,’ তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে বললেন শুভ্রকান্তি, ‘কমলেশ্বর মুখার্জী “চাঁদের পাহাড়” করছেন। সৃজিত মুখার্জীর সিনেমায় প্রসেনজিৎ কাকাবাবু সাজছে। বরুণ বিশ্বাসকে নিয়ে রাজ চক্রবর্তীর সিনেমাটা তো বোধহয় বেরিয়েও গেল।’
অমিতাভ চোখ ছানাবড়া করে বললেন, ‘আপনি তো ফিল্ম বাফ হয়ে গেছেন ব্যানার্জীদা।’
‘হুঁ হুঁ বাবা। পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে…বুঝলে?’ যাত্রাপালা-স্টাইলে হাসলেন শুভ্রকান্তি।
অমিতাভ হেসে হাত জোড় করে কপালে ঠেকালেন। তারপর বললেন, ‘ইনি বাংলা ছবির উঠতি একজন নায়িকা। সম্পূর্ণা মিত্র। মজন্তালীর কেসে আমরা এঁকে সন্দেহ করছি। আপনার এই চুলের ব্যাপারটাও খাপে খাপ হচ্ছে। ডিএনএ রিপোর্টটা এলে এসপার-ওসপার হয়ে যাবে।’
রাহুল বলল, ‘কিন্তু ডিএনএ তো জোগাড় করতে হবে স্যার। সেটা কীভাবে হবে?’
‘এটা তোমাকে বলে দিতে হবে?’ শুভ্রকান্তি বললেন, ‘তুমি কৌশিক মুখুজ্যের চ্যালা না?’
অমিতাভ মিটিমিটি হাসছেন। রাহুল লজ্জা পেয়ে হাসল, ‘আমি তাঁর নখের যুগ্যি না স্যার।’
‘হওনি। হবে।’ শুভ্রকান্তি বললেন, ‘তোমার সেই সামর্থ্য আছে। খিদেটাও আছে। আর তোমার গুরুর মহৎ দোষ যেটা ছিল সেটা তোমার মধ্যে নেই। খামখেয়ালিপনা। কৌশিকের কেরিয়ারটা ব্রাজিলের ফুটবলারদের মতো। কম বয়েসে চোখ-ধাঁধানো উত্থান, তারপর জীবনকে এনজয় করতে গিয়ে হারিয়ে যাওয়া। বিপুল প্রতিভার অকালমৃত্যু। সেরকম হোয়ো না।’
‘ঠিক।’ অমিতাভ সায় দিলেন। রাহুল বাধ্য ছাত্রের মতো ঘাড় নাড়ল।
শুভ্রকান্তি উদার কণ্ঠে রাহুলকে বললেন, ‘তোমার সবচেয়ে ভালো অভ্যেস, সময় পেলেই রেকর্ডস সেকশনে বসে পুরোনো কেস ফাইল পড়ো। আমি লালবাজারে ডিসিডিডি ব্রতেশ মাইতির কাছে শুনেছি। প্রবীরবাবুর কাছেও শুনেছি।’
রাহুল এত প্রশংসা নিতে পারছে না। সলজ্জ গলায় বলল, ‘আমি কিন্তু আপনার ফ্যান স্যার।’
শুভ্রকান্তির অনেকগুলো দাঁত বেরিয়ে পড়ল, ‘আমার ফ্যান সবাই। কিন্তু মার্ক মাই ওয়ার্ড মাই ডিয়ার, একদিন সার্ভিসের সবাই তোমারও ফ্যান হবে। জাস্ট ফোকাসটা হারিও না।’
অমিতাভ বললেন, ‘রাহুল কিন্তু শুধু কেস ফাইল না, ক্রাইম জার্নালগুলোও মুখস্থ করে ফেলে। আমাদের তানিয়ারও এই গুণটা আছে।’
‘ইয়েস। তানিয়া।’ শুভ্রকান্তি বললেন, ‘তানিয়া মেয়েটিও খুব হার্ডওয়ার্কিং। এবং ভিশন খুব ক্লিয়ার। সবচেয়ে বড় কথা, এই বয়েসের কেউ আমায় সেরোলজি নিয়ে এত খুঁটিয়ে প্রশ্ন করতে পারে, আমি ভাবতেই পারিনি। তোমার স্কাউটিং ব্রিলিয়ান্ট, অমিতাভ। ডিপার্টমেন্ট তোমাকে তোমার মগজাস্ত্রের পাশাপাশি একজন দুর্দান্ত মেন্টর হিসেবেও মনে রাখবে।’
অমিতাভ হাসতে হাসতে বললেন, ‘আজ আপনার মেজাজটা খুব খুশিয়াল আছে ব্যানার্জীদা।’
শুভ্রকান্তি নিমীলিত চোখে বললেন, ‘নিন্দের ব্যাপারে আমি যেমন ঠোঁটকাটা, প্রশংসার ব্যাপারে তেমনই দরাজদিল। আজ তোমায় বলে দিচ্ছি, এই দুজনের ভবিষ্যৎ খুবই উজ্জ্বল। রাহুলের মধ্যে আমি নজরুল ইসলামকে দেখতে পাই, আর তানিয়ার মধ্যে সর্বাণী সেনকে।’
সর্বাণী সেনের নাম উঠলেই সবাই খানিকক্ষণ চুপচাপ হয়ে যান। হবারই কথা। সর্বাণী মন্ত্রীর মুখের ওপর উল্টো কথা বলতে পারেন, এমন পুলিশ শুধু সিনেমায় দেখা যায়। আর দেখেছিল পশ্চিমবঙ্গ। সুজান জর্ডানের কেসে। অমিতাভ বললেন, ‘আপনি সর্বাণীকে মিস করেন ব্যানার্জীদা, তাই না?’
‘করি। কাউকে অসম্মান না করেই বলছি অমিতাভ, ওর মতো মেরুদণ্ড আর একটাও দেখলাম না।’
‘সর্বাণীকে যে-কেসের জন্য এখান থেকে অনেক দূরে চলে যেতে হল, সেই কেস আমাদের পিছু ছাড়ল কই?’ অমিতাভ হাসলেন, ‘সুজান জর্ডান তো প্রবলভাবেই রয়ে গিয়েছেন এই কেসে।’
রাহুল বলল, ‘কিছুদিন আগে আমি শিলিগুড়ি ট্যুরে গেছিলাম। একদিন দার্জিলিং গিয়ে সর্বাণীদির সঙ্গে দেখা করে এসেছি।’
‘কী খবর তার?’
‘দিব্যি আছেন। ভাত-রুটি ছেড়ে মোমো-থুকপা ধরেছেন পার্মানেন্টলি।’
শুভ্রকান্তি অমিতাভকে বললেন, ‘সর্বাণীর সঙ্গে সুজানের সম্পর্ক খুব ভালো ছিল। শি মাস্ট বি ভেরি আপসেট।’
লোকনাথ এসে দাঁড়াল। কুণ্ঠিত ভঙ্গিতে মোবাইল-ধরা হাত বাড়িয়ে বলল, ‘স্যার, একবার দেখবেন? ইনি কি…?’
লোকনাথের ফোন হাতে নিয়ে অমিতাভ ছবিটা দেখলেন। টিভি স্ক্রিন থেকে মোবাইলে তোলা বলে প্রচুর স্ক্র্যাচ। তবে মহিলাকে চিনে নিতে অসুবিধা হয় না। অমিতাভ সহসা বুকের ভিতরে একটা বন্যা-পরিস্থিতি অনুভব করলেন। কাবেরী।
লোকনাথ অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বলল, ‘“গঞ্জের মানুষ”-এর স্পেশাল স্ক্রিনিংয়ে এসেছিলেন। গেস্ট লিস্টে নামও আছে।’
.
বিকেল ৩টে ৪৫, ঘোষ ইন্সটিটিউশন (মেন), কলকাতা
স্কুলের শেষ পিরিয়ড যখন শেষের পথে, তখন কাবেরী সান্যালকে স্টাফরুমে ঢুকতে দেখে ক্লাস না-থাকা কলিগেরা অবাক হলেন।
ইতিহাসের শম্পা চৌধুরী অবাক হয়ে বললেন, ‘কী রে কাবেরী, এখন?’
আলমারি খুলে খাতার স্তূপ বের করে কাবেরী বললেন, ‘একটা কাজে সিএল নিয়েছিলাম গো। কাজটা হয়ে গেল, ভাবলাম সেভেনের ইউনিট টেস্টের খাতাগুলো দেখে দিয়ে যাই।’
‘স্কুলের কাছে বাড়ির এই সুবিধা।’ বললেন বাংলার মহুয়া মল্লিক।
জীবন বিজ্ঞানের রুমা পাল বয়স্ক মানুষ। বললেন, ‘কাবেরী, বরুণকে নিয়ে সিনেমা হচ্ছে শুনেছিস তো? আমরা একসঙ্গে যাবার প্ল্যান করছি। যাবি তো?’
‘সিনেমা হচ্ছে খুব ভালো কথা, কিন্তু দোষীদের শাস্তি হবে তো?’ হাসলেন কাবেরী।
‘তুই না কিছুতে খুশি হতে পারিস না!’ শম্পার নাক কুঁচকে গেল, ‘সিনেমা হলে তো বরুণের কথা সবাই জানতে পারবে, নাকি? আরে বাবা, বরুণ হচ্ছে আমাদের স্কুলের গর্ব। আমি তো সব্বাইকে ডেকে ডেকে বলি, বরুণ বিশ্বাস আমার কলিগ ছিল।’
একগাল হেসে সায় দিলেন রুমা পাল, ‘তা যা বলেছিস শম্পা! ছেলেটার জন্য এত কষ্ট হয়! দেখতে দেখতে একটা বছর কেমন পেরিয়ে গেল বল!’
কাবেরীর জোর হাসি পেয়ে গেল। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালিই সম্ভবত একমাত্র জাত যারা বিবর্তনের ধারায় কোনওদিনই বিলুপ্ত হয়ে যাবে না। কারণ মেনে নিতে এবং মানিয়ে নেওয়ার চেয়ে দড় আর কিছু নেই। বরুণের মৃত্যুর এক বছর পূর্তিতে ছলছল চোখে তাঁর ছবিতে মালা দিতে কেউ পিছপা হয়নি। অথচ বরুণের জন্য কলেজ স্কোয়ার থেকে একটা মিছিল করার প্রস্তাব রাখলে সাংঘাতিক বিরোধিতার মুখে পড়তে হয়। একটা মিছিলে পা মেলাতে কীসের ভয় এদের? কীসের নিরাপত্তাহীনতা?
রুমাদি জীবন বিজ্ঞান পড়ান। তাঁকে জিগ্যেস করলে হয়, মধ্যবিত্ত বাঙালিকে এখনও মেরুদণ্ডী শ্রেণিভুক্ত করা হচ্ছে কিনা। নাঃ! এদের মাঝখানে বসলেই মেজাজ গরম হয়ে যাবে। কাবেরী সবার উদ্দেশে বললেন, ‘চলি, বুঝলে? বাড়ি গিয়েই দেখব।’
কাবেরী বেরিয়ে গেলে মহুয়া মল্লিক গলা নামিয়ে শম্পাকে জিগ্যেস করলেন, ‘হ্যাঁ গো শম্পা, এই অমিতাভ সান্যালই তো কাবেরীদির হাজব্যান্ড ছিল? মজন্তালী সরকারের কেসের ইনভেস্টিগেটিং অফিসার যিনি?’
শম্পা চোখমুখ মটকে বললেন, ‘এতদিনে জানলে?’
‘ডিভোর্স হয়ে গেছে?’
‘সেটা ঠিক জানি না। তবে সেপারেশনে আছে।’
ক্লাস শেষের ঘণ্টা পড়েছে। একে একে বাকি শিক্ষক-শিক্ষিকারাও স্টাফরুমে ফিরছেন। ফিজিক্সের সাহেবুল হক অ্যাটেনডেন্স খাতা আলমারিতে তুলতে তুলতে বললেন, ‘মজন্তালীর ব্যাপারটা কী দাঁড়াচ্ছে বলুন তো রুমাদি? কিছুই বুঝতে পারছি না।’
রুমা বললেন, ‘এতে আর বোঝার কী আছে? সুজান জর্ডানের ভূতই মজন্তালী হয়ে প্রতিশোধ নিচ্ছে।’
শম্পা বললেন, ‘ধুর! কী যে বলো! ভূতফুত বলে কিছু আছে নাকি?’
‘ভূত না হলে সিআইডি-র ঘাঁটিতে ঢুকে ওইরকম পোংটামো মেরে আসতে পারে?’ রুমা বললেন, ‘নেবুলা চ্যানেল একজন ত্রিকালদর্শী গুরুদেবকে এনেছিল। উনি বললেন, কী একটা যজ্ঞ করলে তবেই সুজানের আত্মা ঠান্ডা হবে। মজন্তালীর উৎপাতও থামবে।’
ইংরাজির অদিতি ব্যানার্জী কমবয়সি। ‘ট্যাঁশ’ বলে পরিচিত। সে মহুয়ার কথা শুনে ফুট কাটল, ‘কিন্তু সুজান জর্ডান তো খ্রিস্টান ছিল। হিন্দুদের যজ্ঞে কাজ হবে? চার্চের হোলি ওয়াটার-ফোয়াটার আনলে কাজ হতে পারে।’
মহুয়া বললেন, ‘ইয়ার্কি মারিস না অদিতি। এসব অশৈলী কাণ্ডকারখানা কোনও মানুষের কাজ হতে পারে না।’
অঙ্কের সুব্রত ফাজিল মানুষ। বলল, ‘আচ্ছা মহুয়াদি, ভূতই যদি হয় তাহলে তো বরুণের ভূতও হতে পারে।’
মহুয়া বললেন, ‘হ্যাট! বরুণের ভূত কেন হতে যাবে খামোখা?’
‘বা রে! বরুণের জন্মদিনের দিনই তো জেলে ঢুকে খুন করবে বলেছে। বারোই সেপ্টেম্বর বরুণের জন্মদিন তো।’
রুমাও ইয়ার্কিটা ধরতে পারেননি। বললেন, ‘কী মুশকিল! মজন্তালী তো মেয়ে! ভূত হয়ে জেন্ডার তো পাল্টে যাবে না।’
‘বারো তারিখটা হচ্ছে বরুণের জন্য একটা ট্রিবিউট, বুঝলে?’ শম্পা বললেন, ‘বরুণও তো ফাইটার ছিল। মেয়েদের লাঞ্ছনার বিরুদ্ধে লড়তে গিয়েই তো মরল ছেলেটা।’
জীবন বিজ্ঞানের লক্ষ্মী ঘোষ হঠাৎ কাঁঠালে মাছি পড়ার মতো হইহই করে ছুটে এলেন, ‘রুমাদি, মহুয়াদি, শোনো শোনো, আজ স্কুলে আসার সময় ওই মেয়েটাকে দেখলাম।’
‘কোন মেয়ে?’
‘আরে লীনা! লীনা দাশগুপ্ত!’ লক্ষ্মীর উত্তেজনা তুঙ্গে।
রুমা বললেন, ‘সেই রেপ ভিক্টিম মেয়েটা?’
‘হ্যাঁ। ফড়িয়াপুকুরের রেপ ভিক্টিম।’ লক্ষ্মী বললেন, ‘আমার সঙ্গে একই বাসে উঠেছিল। এমনি নর্মাল হাবভাব। দিব্যি কানে হেডফোন গুঁজে গান শুনতে শুনতে যাচ্ছিল। আমার সঙ্গে একবার চোখাচোখিও হল।’
‘নর্মাল হাবভাব হবার কথা না, বলো? লজ্জা পাবার কথা? তা, তুমি মনে করিয়ে দিলে না কেন?’ বলে ব্যঙ্গাত্মক হেসে টিফিনবক্স হাতে উঠে গেল অদিতি।
সবাই কিছুক্ষণের জন্য চুপ।
লক্ষ্মী মুখ বেঁকিয়ে বললেন, ‘এই আর এক বিপ্লবী। কাবেরীর ভাবশিষ্য।’
‘কলির বউ ঘরভাঙানি বলে না?’ শম্পা গলা নিচু করলেন, ‘ওইজন্যেই তো দুজনের কেউই সংসারটা টেকাতে পারল না।’
.
বালিগঞ্জ প্লেস, সন্ধে ৬টা
যে-চারজন প্রোডিউসারকে মজন্তালী ফোন করে হুমকি দিয়েছে তাঁদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করছিল সৌমিলি। তাঁদের মধ্যে দুজন সংবাদমাধ্যমে মুখ খুলতে রাজি হয়েছেন। পূর্ণেন্দু সরকার আর চয়ন মিত্র। তবে সামনাসামনি না, বাইট দিয়েছেন ফোনে। দুজনেই প্রাণের ভয় পাচ্ছেন। ভয় পাওয়াটা অস্বাভাবিক না। কিছুদিন আগে আর এক প্রযোজক অশোক বসুর খুনটা নাড়িয়ে দিয়েছে সবাইকেই। ক্যাটওম্যানের হুমকিকে হালকাভাবে নেবার সাহস দেখাতে পারছেন না কেউই।
পূর্ণেন্দু সরকারের ভয় পাওয়াই স্বাভাবিক। দিনকয়েক আগেই তিনি মজন্তালীর আইডেনটিটি থেফটের শিকার হয়েছেন। নাকের ডগা দিয়ে ম্যানুয়ালি ফোন হ্যাক করে নিতে পারলে কপালে একটা গুলি করতে কী আর এমন বেগ পেতে হবে! পূর্ণেন্দুবাবু বলেই দিয়েছেন তাঁরা পরের ফিল্মে আইটেম নাম্বার রাখছেন না। এতে ছবি মার খাবে, কিন্তু প্রাণ আগে। চয়ন মিত্র একটু তড়পালেন। ওপরমহলে নাকি তাঁর অনেক জানাশোনা আছে, অমিতাভ সান্যালের হাত থেকে কেস তিনি অন্য কারোর হাতে দিয়ে দেবার ব্যবস্থা করবেন। সৌমিলি ভয়েস ক্লিপগুলো এডিটের তন্ময়দাকে ফরওয়ার্ড করে আপাতত একটু জিরিয়ে নিচ্ছে। রণ এসে বলল, ‘পানু সাইট নিয়ে প্রবলেম সেটাও মেনে নিলাম। কিন্তু আইটেম নম্বর নিয়েও প্রবলেম? এই মহিলার মাথায় প্রবলেম আছে।’
‘সে তো আগে থেকেই ছিল। লীনা দাশগুপ্তকে লেখা চিঠিতে আইটেম নম্বরের কথা উল্লেখ করেছিল তো।’
‘সিনেমা কি সত্যি নাকি? অদ্ভুত বোকা বোকা যুক্তি ফেমিনিস্টদের। সিনেমা দেখে কেউ ক্রাইম করলে সিনেমা দেখে ভালো হয় না কেন? কই, শাহরুখের “স্বদেশ” দেখে কি দলে দলে এনআরআই বিদেশের মোটা মাইনের চাকরি ছেড়ে দেশের এঁদো গ্রামে ফিরে আসছে? নাকি ক্ষুদিরামের বায়োপিক দেখে লোকে বার খেয়ে ক্ষুদিরাম হয়ে যাচ্ছে?’
শিরিন বলল, ‘প্রথমত ‘‘বার খেয়ে ক্ষুদিরাম’’ কথাটা আর বলিস না রণ। কথাটা একজন বিপ্লবীর ক্ষেত্রে অত্যন্ত অসম্মানজনক। দ্বিতীয়ত, ভালো জিনিস অনুসরণ করা সহজ না। খারাপ কাজের ক্ষেত্রে ডেমনস্ট্রেশন এফেক্ট অনেক ভালোভাবে কাজ করে, এটা প্রমাণিত সত্য। মানুষের সহজাত প্রবৃত্তিই খুন, জখম, অ্যানার্কির দিকে। সেইজন্যই জনতা বরুণ বিশ্বাসকে ফেলে মজন্তালী সরকারকে মাথায় তুলে নাচে। এটা বোঝ।’
‘কিন্তু চয়ন মিত্র তো ওই সিনেমাটার প্রডিউসার। ওই যে বরুণ বিশ্বাসকে নিয়ে যেটা বেরোল। পরমব্রত বরুণের রোল করছে।’
‘তাতে কী হল?’
‘তা ওকে হুমকি দিল কেন? বরুণকে নিয়ে সিনেমা করছে লোকটা।’
সৌমিলি রণর দিকে এমনভাবে তাকাল যেন একটা বাছুর বা ছাগলের ছানা দেখছে, ‘তুই কি ধরেই নিয়েছিস মজন্তালী সরকার বরুণ বিশ্বাসের বউ বা শালী?’
.
গার্ডেনরিচ ফ্লাইওভার, রাত ৮টা ৫৫
আইসক্রিম চুষতে চুষতে তানিয়া বলল, ‘আমি ব্যাপারটা বুঝতে পারছি না। কাবেরী ম্যাডামকে স্ক্রিনিংয়ে দেখা গেছে তো কী! আরও একশো সাতাত্তর জনকে দেখা গেছে।’
রাহুল স্পিড বাড়াল, ‘না না সে কথা বলছিই না। সে তো লোকনাথদা ফোন করে চেক করেছে। ওঁর খুড়তুতো ভাই ফিল্মমেকার সৌম্য চক্রবর্তী। তাঁরই সূত্রে এই স্পেশাল স্ক্রিনিংয়ে আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন। ডালে কোনও কালো বস্তু নেই। আমি বলছি অন্য কথা। স্যার কেমন একটা চুপ মেরে গেলেন দেখলি? এত তাড়াতাড়ি শেষ কবে বাড়ি গেছেন স্যার? মনে করতে পারিস?’
‘হতেই পারে। এতদিনের সম্পর্ক যখন ভেঙে যায়!’ দীর্ঘশ্বাস ফেলল তানিয়া, ‘আচ্ছা ওঁদের কি ডিভোর্স হয়ে গেছে? জানো কিছু?’
‘জানি না। দুহাজার এগারোর মাঝামাঝি থেকে আলাদা থাকেন, এটুকুই জানি।’
তানিয়া দেখল, গাড়ি গার্ডেনরিচ ফ্লাইওভারের কাছাকাছি চলে এসেছে।
‘আমরা কোথায় যাচ্ছি?’
‘অত খুশি হবার দরকার নেই। তোকে নিয়ে লং ড্রাইভে যাচ্ছি না।’
তানিয়া রাহুলের পিঠে গুম গুম করে দুটো কিল বসিয়ে দিল, ‘অসভ্য লোক! আমি তাই বলেছি?’
‘চল তোকে একটা ক্যারেক্টারের সঙ্গে আলাপ করাই।’
‘এখানে? কে?’
‘চল না।’
ফ্লাইওভারের নীচে একটা আলো-আঁধারি জায়গায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাহুল ডাকল, ‘বটাইদা আছ নাকি?’
সেখানে একটা বাল্ব ঝুলছিল। অল্প আলোয় তানিয়া দেখল, ফ্লেক্সের ওপর পোঁটলা-পুঁটলি নিয়ে একটা ছোটখাটো সংসার। একজন মহিলা, তাকে ঘিরে ছোটবড় নানা বয়েসের তিনটে বাচ্চা। চারপাশ ঘিরে অনেকগুলো সরু-মোটা টায়ার, নানা মাপের অজস্র কাচের বোতল আর একপাশে হেলান দেওয়া একটা সাইকেলের কঙ্কাল। ফ্লেক্সের একপাশ থেকে উঁকি মারছে মুখ্যমন্ত্রীর হাসিমুখের খানিকটা। এরই মাঝখান থেকে অন্ধকার ফুঁড়ে এসে দাঁড়াল দাড়িগোঁফওয়ালা, লম্বা, সুড়ুঙ্গে চেহারার একটা লোক। মুখে একটা গা-ছমছমে হাসি, ‘আরে স্যার! আপনে?’
‘তোমাকে ফোনে মাঝেমাঝে পাওয়া যাচ্ছে না কেন?’
‘আরে নিজে থেকেই অফ হয়ে যাচ্ছে। অনেকদিন তো হল। গেছে বোধহয়।’
‘নতুন লাগবে?’
‘এখনই দিও না। দেখি ক’টা দিন। রফিকের কাছে দেখাই একবার।’
রাহুল গ্লোভ বক্স খুলে একটা পলিপ্যাক বের করে বাড়িয়ে দিল জানলা দিয়ে, ‘বাচ্চাদের জন্য আইসক্রিম নিয়ে এলাম।’
লোকটা দেঁতো হেসে শিরা ওঠা দুটো হাত বাড়িয়ে পলিপ্যাকটা নিল। গিয়ে বউয়ের হাতে দিল। বাচ্চাগুলো লাফালাফি করতে লাগল। লোকটা ফিরে এসে বলল, বলল, ‘কিছু পেলেন স্যার?’
রাহুল জিভ দিয়ে টাকরায় একটা তাচ্ছিল্যের শব্দ করল, ‘তেমন কিছু না।’
‘আমরা চোখকান খোলা রেখেছি। ভাববেন না।’
রাহুল কী যেন একটা লক্ষ করছিল। বলল, ‘বটাইদা, বউদি আবার প্রেগন্যান্ট?’
বটাই লাজুক হেসে মাথা নামাল।
‘ক নম্বর হবে এটা নিয়ে?’
‘ছয়।’
‘লজ্জা করে না? এবার জোর করে তুলে নিয়ে গিয়ে ভ্যাসেকটমি করিয়ে দেব।’
হি হি করে হাসতে শুরু করল বটাই।
‘যেদিন তুলব সেদিন হাসি ইয়ে দিয়ে বেরোবে।’ বলে গাড়ির এক্সিলিয়েটরে চাপ দিল রাহুল।
তানিয়া বলল, ‘সোর্স?’
‘এ-তল্লাটের রোডেশিয়ান সোর্সদের লিডার।’
‘এটা তোমায় জিগ্যেস করব ভাবি কতবার। তুমি এত বড় সোর্স-ব্যাঙ্ক তৈরি করলে কী করে? আর এদের ম্যানেজই বা করো কী করে?’
‘সবই গুরুকৃপা। কত সোর্স তাঁর থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি। হাতে ধরে সোর্স নারচার করা শিখিয়েছেন। ভালো সোর্স কীভাবে বেছে নিতে হবে, সে-ও তাঁর থেকেই শিখেছি। উনি বলতেন, পুলিশের চাকরিতে সোর্স হচ্ছে কারেন্সি। বিশেষত গোয়েন্দা-পুলিশের চাকরিতে।’
‘কৌশিক মুখার্জীর কথা বলছ?’
‘তুই জানিস?’
‘শুনব না? উনি তো ডিপার্টমেন্টে প্রবাদের মতো। অনেক শুনেছি ওঁর কথা। কেয়া ম্যাডামের মুখে শুনেছিলাম তুমি ওঁর ভাবশিষ্য।’
‘আমার প্রথম পোস্টিং লালবাজার ডিডি-তে জানিস তো? অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেলাম এআরএস, মানে অ্যান্টি রাওডি স্কোয়াডে। বাংলায় যাকে বলে গুন্ডাদমন শাখা। উনি তখন এআরএসের অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার। ওঁর আন্ডারে নাড়া বেঁধে দুটো বছর কত কী যে শিখেছি। ভারি পছন্দ করে ফেলেছিলেন আমায়।’
‘তা ভদ্রলোক হঠাৎ পলিটিক্স জয়েন করতে গেলেন কেন বলো তো?’
‘এই কথাটাই আজ থেকে দেড় বছর আগে আমিও জিগ্যেস করেছিলাম। উনি লুকোছাপা করেননি। স্পষ্টই বলেছেন, জীবনের শেষ কুড়িটা বছর অন্তত আরামে থাকতে চান।’
‘বলো কী?’
‘হ্যাঁ। আসলে পলিটিকাল প্রেশারও ছিল প্রচুর। একসময় কাউকে রেয়াত করতেন না। ফ্যামিলি-ট্যামিলি ছিল না। পিছুটান ছিল না। ডেয়ারডেভিল লোক ছিলেন। বেশ কয়েকবার “ক্লোজ” খেয়েছিলেন। খাদিম কর্তা পার্থ রায় বর্মণের অপহরণ কেসে প্রথম ব্রেকথ্রু কৌশিকদা এনেছিলেন। দুবাই ডন আনসারির সঙ্গে এই কেসের যোগ আছে, এটা কৌশিকদার আবিষ্কার। তারপরেই কোনও অজানা কারণে তাঁকে সরিয়ে পুলিশ ট্রেনিং স্কুলে ট্রান্সফার করে দেওয়া হয়।’
‘কেন?’
‘সে জানি না। কোন কেঁচো খুঁড়তে কোন কেউটের ল্যাজে পা পড়ে যায়, তার ঠিক আছে? গোটা সার্ভিস-লাইফের অর্ধেকই বোধহয় পানিশমেন্ট পোস্টিংয়ে ঘুরে বেড়ালেন এদিক-ওদিক। এগারোয় সরকার বদলের পরে আচমকা ভিড়ে গেলেন পলিটিক্সে। পার্টিকে খোলাখুলি শর্ত দিয়েছিলেন নর্থ বেঙ্গলের কোথাও কন্সটিটুয়েন্সি দিতে হবে। পার্টি মন্ত্রীত্ব অফার করেছিল। রিফিউজ করে জলপাইগুড়ির এমপি হয়ে বসে পড়লেন। এখন বইটই পড়েন, ইংরেজি খবরের কাগজে কলাম লেখেন আর মাঝেসাঝে গাড়ি নিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যান কোথাও।’ একটা ইউ টার্ন পেয়ে রাহুল গাড়ি ঘুরিয়ে নিল, ‘চল তোকে নামিয়ে দিয়ে আসি।’
‘আসি মানে? তুমি এখন বাড়ি ফিরবে না?’
‘আমি একবার শিয়ালদা-রাজাবাজার হয়ে মানিকতলা-খান্না ঢুঁ মেরে তারপর ফিরব।’
‘ওইদিকে? এত রাতে?’
‘ওটাই ক্যাটওম্যানের সাসপেক্টেড ডেন, ভুলে গেলি?’ হাসল রাহুল, ‘এত রাতেই তো বেড়াল শিকারে বেরোয়।’
.
সল্টলেক, রাত ১১টা ৩০
কাবেরীর সঙ্গে কেন জমল না, সেটা অমিতাভ অনেক ভেবেও বুঝতে পারেননি। অমিতাভ সেরকম রক্ষণশীল নন। কাবেরীর কোনও সিদ্ধান্তেই কখনও বাধা দেননি। কোনও বিষয় নিয়ে খুব যে বাগ্বিতণ্ডা হয়েছে, এমনও মনে পড়ে না। ভাগ্যিস ইস্যু হয়ে যায়নি। তাহলে একটা মস্ত বিড়ম্বনা হতো। সম্পর্কের লাশ টেনে নিয়ে যাওয়া কোনও কাজের কথা নয়।
নিয়মতান্ত্রিক শারীরিক সম্পর্ক থাকলেও কোনওরকম দাম্পত্য গড়েই ওঠেনি। কাবেরী যেদিন আলাদা হয়ে যেতে চাইল, সেদিন তিনি একটু ধাক্কা খেয়েছিলেন। যে-পুরুষের বউ ছেড়ে চলে যেতে চায়, তার ‘মেল ইগো’-য় আঘাত লাগাই দস্তুর। কিন্তু কাবেরী কোনও পরকীয়া বা অতৃপ্তিজনিত কারণে তাঁকে ছাড়েনি।
একটু শান্ত হতে অমিতাভ নিজেও খেয়াল করেছেন, তেমন কষ্ট হচ্ছে না। পুড়ে যাচ্ছে না ভিতরটা। মুখ-হাত থেকে দোলের রং যেতে যতদিন সময় লাগে, নিজেকে একা বলে মেনে নিতে তার চেয়েও কম সময় নিয়েছেন অমিতাভ। তেরো বছরের দাম্পত্যের পরেও যৌথতা অভ্যেস হল না কেন! এটা কি মানসিক অগভীরতা? কে জানে।
অমিতাভর আত্মজিজ্ঞাসা কম। তিনি সেই সব লোকজনের মধ্যে পড়েন না, যারা নিজেকে ক্রমাগত প্রশ্ন করে করে ঝাঁঝরা করে। কাজের বাইরে অন্য কিছু নিয়ে বেশিক্ষণ ভাবতে পারেন না। এখনও ভেবে সময় নষ্ট করলেন না। এক গ্লাস জল খেয়ে তানিয়ার পাঠানো ডেইলি কেস-আপডেট নিয়ে বসে গেলেন।
.
