সপ্তদশ দিন
তারিখ : ১৮ আগস্ট, ২০১৩
হাওড়া স্টেশন, ব্যান্ডেল লোকাল, সকাল ৯টা ৩০
লোকাল ট্রেনের সিটে চার নম্বরে বসলে হাফ পাছা সবসময় শূন্যে ঝোলে। নন্তুর মেজাজটা অবশ্য অন্য কারণে খারাপ। আসলে কিছুতেই নিশ্চিন্ত হওয়া যাচ্ছে না। জগুদা যদিও বলেছে আপাতত কয়েকমাস গা ঢাকা দিলেই কেসটা মিইয়ে যাবে। পার্টির ছেলেরা অলরেডি মেয়েটার বাপকে রাস্তায় ধরে চমকেছে। নালিশ করার সাহস পাবে বলে মনে হয় না। তবু ভয় একটা থেকেই যায়। কীসের থেকে কী হয়ে যায় কিছু তো বলা যায় না। তাছাড়া গোছানো একটা লাইফ ছেড়ে যাওয়া…। ক-মাস এদিক-সেদিক করে কাটাতে হবে তার কি ঠিক আছে? ফালতু কিচাইন হয়ে গেল। মনটা সমানে খচখচ করছে। বিরক্ত নন্তু দু-প্যাকেট বাদাম কিনে ফেলল। মুখ চালালে যদি মুডটা একটু ভালো হয়। জ্বিনবিদ্যা, তান্ত্রিক বশীকরণ, সম্মোহনের পোস্টার, লিঙ্গবর্ধক তেলের বিজ্ঞাপন। ওইসব মাখলে কি সত্যি বড় হয়? একবার ট্রাই করে দেখতে হবে।
ট্রেন ঢিকঢিক করে চলছে। লিলুয়ার ঢোকার খানিক আগে অবধি এভাবেই চলবে। মাল বিক্রিওয়ালা এক মহিলা নন্তুর ঠিক পাশটায় এসে দাঁড়িয়ে ঝুপ করে তার পসরা টাঙিয়ে দিল হাতলে। চেরা গলায় ফিরি করতে শুরু করল, ‘নেলকাটার আছে, হেডফোন আছে, ছুরি আছে, কাঁচি আছে, মোবাইলের কভার, এটিএম কার্ডের কভার আছে, বিদ্যুৎ বাম আছে…।’ জিনিসগুলো গায়ে এসে লাগছে। মেজাজটা আরও খাট্টা হয়ে গেল নন্তুর। কিছু করার নেই। চার নম্বরে বসলে হকারদের ধাক্কা খেতেই হবে।
‘তুমি নন্তু? নন্তু শেখ?’
নন্তু চমকে উঠে দেখল সামনের সিটের বোরখা-পরিহিত মহিলা উঠে দাঁড়িয়েছেন। আপাদমস্তক বোরখার আড়াল থেকে উঁকি মারছে ঝকঝকে দুটো চোখ। প্রশ্নটা উনিই করেছেন।
নন্তু খুব অবাক হয়ে বলল, ‘হ্যাঁ। আপনি কী করে…?’
‘অতসীকে চেনো?’
নন্তুর হৃদপিণ্ড একটা ডিগবাজি খেয়ে গেল। একটা হাত হাঁটুর ওপর ছিল। অজান্তেই খামচে ধরল প্যান্ট। চাপা, খসখসে গলায় নন্তু বলল, ‘কে অতসী?’
‘অতসী মণ্ডল। ক্লাস এইট। তোমাদের পাড়াতেই থাকে।’
বাকি যাত্রীরা একবার মহিলার দিকে, একবার নন্তুর দিকে তাকাচ্ছে। নন্তুর মুখ ছাইবর্ণ হয়ে গেছে।
‘এই নাও। এটা তোমার জন্য। অতসী পাঠিয়েছে।’ বলে একটা কাগজের টুকরো এগিয়ে দিলেন মহিলা।
চিরকুটটা দেখেই বিস্ফারিত হয়ে গেল নন্তুর চোখ। তীব্র অবিশ্বাস আর ভয় মিশিয়ে সে তাকাল মহিলার দিকে। তারপরেই হিংস্র একটা চিৎকার করে লাফিয়ে উঠতে গেল। কিন্তু তার আগেই এক-কামরা লোককে তীব্র চমকে দিয়ে হরেক মাল বিক্রিওয়ালা মহিলা বাঁ-পাশ থেকে চেপে ধরল নন্তুর চুলের মুঠি। সামলে ওঠার বিন্দুমাত্র সুযোগ না দিয়ে তার আরেক হাত বিদ্যুৎগতিতে ছুরি চালিয়ে দিল নন্তুর গলায়।
.
ভবানী ভবন, সকাল ৯টা ৫৫
ব্রিজ ছাড়িয়ে দময়ন্তী শুভঙ্করের ফোন পেল, ‘দিদি, লীনার মেসেঞ্জারে একটা মজার জিনিসের সন্ধান পেয়েছি।’
প্রায় লাফিয়ে উঠে দময়ন্তী বলল, ‘কী রে?’
‘এসো না। দেখাচ্ছি।’
এই কেসটা নেবার পর থেকে দিনকাল এমন যাচ্ছে যে প্রাণ আজকাল সারাক্ষণ গলার কাছে এসে বসে থাকে। ট্রাফিকে ভরা দশ মিনিটের রাস্তাটা কীভাবে মাত্র আড়াই মিনিটে এল, দময়ন্তী নিজেই জানে না। প্রায় ছুটতে ছুটতে ডিজিটাল ফরেন্সিকের ঘরে ঢুকে হাঁপাতে হাঁপাতে শুভঙ্করের ডেস্কের সামনে গিয়ে দাঁড়াল, ‘কী পেলি রে?’
প্রতীক দময়ন্তীর সিরিয়াস মুখচোখ দেখে হেসে বলল, ‘আরে ওরকম কিছু না। একটা মজার ব্যাপার। এদিকে আসো, দ্যাখো।’
দময়ন্তী শুভঙ্করের ল্যাপটপে উঁকি মেরে বিষয়টা দেখল, এবং হেসে ফেলল। মুখে বলল, ‘এ তো খুবই নিরীহ মেসেজ।’
‘নিরীহ মেসেজ? তা হবে? আমারই পাপী মন।’ প্রতীক হাসল, ‘যাক গে, রাহুলকে বলতে যেও না যেন। ওরকম কিছু না হলে আমি লজ্জায় পড়ব।’
ওয়ার্কস্টেশনে ফিরে এসে দময়ন্তী দেখল রাহুল ডেস্কটপে বসে। দময়ন্তীকে দেখে ‘মর্নিং!’ বলে আবার মুখ নামাল।
দময়ন্তী মুচকি হেসে বলল, ‘তুই এমনিতে বুদ্ধু টাইপের হলে কী হবে, চয়েজটা ভালো।’
রাহুল চোখ তুলল, ‘মানে? কীসের চয়েজ?’
‘ডুবে ডুবে আর কত জল খাবি? কিডনিটা যাবে যে! লীনার কথা বলছি।’
রাহুলের মুখ দেখে মনে হল সোজা ইউরেনাস বা নেপচুন থেকে পড়ল, ‘মানে?’
দময়ন্তী রাহুলের গালে একটা ঠোনা মেরে নিজের চেয়ারে এসে বসল, ‘মানে আবার কী? লীনা মেয়েটা ভালো। আমার খুব পছন্দ।’
রাহুল চেয়ারটা ঘুরিয়ে দময়ন্তীর মুখোমুখি হল, ‘তোমার আরবান নকশাল বন্ধুদের ঠেকে গিয়ে গাঁজা-ফাজা টেনে এলে নাকি?’
‘তুমি ভুলে গেছ সন্টুমনা, লীনার সমস্ত ডিভাইসেই নজরদারি চলছে।’
রাহুল খানিকক্ষণ অবিশ্বাসের চোখে থেকে মাথায় হাত দিয়ে বলল, ‘কপাল!’
‘এখন আর কপালকে দোষ দিয়ে কী হবে!’
‘দময়ন্তীদি, পাড়ার কাকিমা-জেঠিমাদের মতো আচরণ করছ তুমি!’
‘কিন্তু আমি তো তোকে আর তানিয়াকে নিয়ে অনেকদূর ভেবে ফেলেছিলাম,’ দময়ন্তী ঘাড় বেঁকিয়ে মিটিমিটি হাসল, ‘দেখিস, কাউকে কষ্ট-টষ্ট দিস না বাবা!’
রাহুল এই দ্বিতীয় বোমাটা খেয়ে একেবারে প্রস্তরবৎ হয়ে গেল। খুব শান্ত গলায় বলল, ‘সিরিয়াসলি?’
‘সিরিয়াসলি।’
‘দময়ন্তীদি, তানিয়া একেবারেই নয়। আর লীনাও নয়। বিশ্বাস করো। চ্যাট দেখে তোমার তাই মনে হল? কী বলেছি ওখানে? লীনাই বা কী এমন বলেছে?’
‘মেয়েটা তোর ওপর চাপ খায়। লিখে রাখ।’
‘কোন কথাটা থেকে মনে হল তোমার?’
‘আমি একটা মেয়ে, রাহুল। মেয়েদের অনুরাগের বাক্যবিন্যাস আমি চিনি। বিশ্বাস কর।’
‘একটা বোগাস বিষয় নিয়ে ফিমেল কার্ডও খেলবে?’
‘এখানে ফিমেল কার্ডের কী দেখলি?’
‘মাথা খারাপ হয়ে গেছে তোমার। আমি উঠছি। বাজে বকার সময় নেই।’ বলে রাহুল বেরিয়ে গেল।
দময়ন্তী একা একাই দাঁড়িয়ে কেঁপে কেঁপে হাসছিল। তবে বেশিক্ষণ হাসতে পারল না। কারণ রাহুল ঠিক এক মিনিটের মধ্যেই ফিরে এল পাংশু মুখে, ‘দময়ন্তীদি, আরেকটা খুন।’
‘কোথায়?’
‘চলন্ত ট্রেনে। লিলুয়া স্টেশনে ঢোকার মুখে।’
.
হাওড়া আরপিএফ পোস্ট, সকাল ১০টা ৩০
আততায়ীদের হুলিয়া নিয়ে প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে বিস্তর অমিল পাওয়া যাচ্ছিল। পান-চিবোনো এক বিরলকেশ প্রৌঢ় বললেন, ‘ওই মহিলা তো বোরখা পরা ছিল। কী আর দেখব। আর এই হকার মহিলাকে ভালো করে খেয়াল করিনি। তবে বয়স্ক গোছের। চুলে জট। সাদা শাড়ি পরে ছিল। ময়লা। গায়ে চামসা গন্ধ। হকাররা যেমন হয় আরকি।’
মধ্যবয়সি মোটকাসোটকা ভদ্রলোক বললেন, ‘সাদা না। অফহোয়াইট।’
‘আরে মশাই ময়লা বলে ওরকম দেখাচ্ছিল। আসলে সাদা।’
রাহুল বলল, ‘রোগা-মোটা, বেঁটে-লম্বা কিছু বলুন।’
‘বোরখাওয়ালি মেয়ে হিসেবে বেশ লম্বা।’
‘হ্যাঁ। বেশ লম্বা।’ সায় দিল এক ছোকরা কলেজপড়ুয়া।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রেলপুলিশের অফিসারটিকে অমিতাভ জিগ্যেস করলেন, ‘এই লাইনে মহিলা হকার কি দেখা যায় তেমন?’
‘খুবই কম। এঁদের খুঁজে বের করা অসম্ভব, স্যার। কতজন আর রেজিস্ট্রেশনের ধার ধারে? রেলওয়েতে প্রতিদিন হাজারে হাজারে ইল্লিগাল হকার যাতায়াত করে। আমরা মাঝেমাঝে ধরপাকড় করি বটে, কিন্তু সেটা এক্সপ্রেস ট্রেনগুলোয়।’
ঘরের বাইরে বেরিয়ে এসে অমিতাভ বললেন, ‘ধুর। একটা নিশ্চিত ডেসক্রিপশন পাচ্ছি না।’
‘এখানে ডেসক্রিপটিভ রোল তেমন কাজে আসবে না।’ দময়ন্তী বলল, ‘আসলে বোরখার জন্য খুব ডেফিনিট কোনও ডেসক্রিপশন কেউই দিতে পারবে না। আর হকারকে সেভাবে আলাদা করে নোটিশ করার সময়ই পায়নি কেউ।’
অমিতাভ বললেন, ‘চোখ আর স্কিনটোনের বিবরণ থেকে মোটের ওপর যা বুঝলাম, আমাদের লুক আউট নোটিশের মহিলার সঙ্গে মিলছে না।’
দময়ন্তী বলল, ‘কিন্তু এই ডেসক্রিপশনের সঙ্গে আমি বেহালার কাফের মেয়েটির চোখের মিল পাচ্ছি স্যার। মানে যে মেয়েটি সেলিমের সঙ্গে এক টেবিলে বসেছিল, মানে সেলিমকে ফুসলেছিল।’
অমিতাভ ঠোঁট টিপলেন, ‘বলছ?’
‘হ্যাঁ,’ মাথা নাড়ল দময়ন্তী, ‘কাফের কর্মীরা যেমন বিবরণ দিয়েছিলেন, এর সঙ্গে মিল আছে।’
রাহুল বলল, ‘অ্যাকশন ফ্রন্টে একাধিক লোক কাজ করছে সেটা অন্তত হাতেনাতে প্রমাণ হয়ে গেল।’
‘ক্যামেরা ফুটেজ কিছু পাওয়া গেল, লোকনাথ?’
‘হ্যাঁ পেয়েছি। একটু দূরে অ্যাডজয়েনিংয়ে সিসি ক্যামেরা ছিল। তবে তার ফুটেজের খুব খারাপ অবস্থা। খুব কিছু বোঝা যাচ্ছে না। তবু নিয়ে নিয়েছি। জয়ন্তদাকে দেব। দেখি ক্লিয়ার করে কিছু বলতে পারে কিনা।’
‘চেনা কারও টাওয়ার লোকেশন মিলছে?’
‘না স্যার। সাসপেক্টদের সবাই তো নজরবন্দি। সাসপেক্টদের আত্মীয়বন্ধুদেরও কারও লোকেশন মেলেনি।’
অমিতাভ রুমাল দিয়ে ঘাম মুছলেন। চারপাশে তাকালেন। স্টেশনে প্রচুর যাত্রীর কাওতালি চলছে। একটা লোকাল ট্রেন এত ভিড় নিয়ে এল, তাতে অনেকেই উঠতে পারলেন না। ইস্টার্ন লাইনে রেল পরিষেবা আধ ঘণ্টামতো বন্ধ থাকার পর আবার চালু হয়েছে। ফলে সমস্ত গাড়ি পরপর লেট হয়ে গেছে। সমস্যায় পড়ছেন যাত্রীরা।
প্লাস্টিক কাপে চা এগিয়ে দিলেন রেলপুলিশের এক কর্মী, ‘স্যার আই উইটনেসগুলো ঝামেলা করছে। ছেড়ে দেব?’
অমিতাভ বিরক্ত চোখে তাকালেন।
ভদ্রলোক একটু মিইয়ে গিয়ে বললেন, ‘আরেকবার কথা বলবেন কিনা সেটাই জিগ্যেস করছিল। আসলে সকাল থেকে বসে আছে।’
অমিতাভ দময়ন্তীর দিকে তাকালেন, ‘আর কিছু জিগ্যেস করবে?’
‘লাভ নেই। বোরখা সব ঢেকে দিয়েছে।’
অমিতাভ পুলিশকর্মীটিকে বললেন, ‘নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর নিয়ে ছেড়ে দিন। আর বলুন ডাক পড়তে পারে যে-কোনও সময়।’
প্রত্যক্ষদর্শীরা অবশ্য এবার রিপোর্টারদের কবলে পড়ে গেল। দু-একজন বিরক্তি প্রকাশ করে বেরিয়ে গেল। তবে বেশিরভাগই খুশি। মধ্যবিত্ত বাঙালি বড্ড ফুটেজখোর। টিভিতে মুখ দেখাতে পারলে হাতে চাঁদ পায়। রিপোর্টারদের ভিড়ে দময়ন্তী চেনামুখ দেখতে পাচ্ছিল। লাইভ নিউজের সৌমিলি আর শিরিন। দময়ন্তীকে দেখতে পেয়ে ওরা এগিয়ে এল। সৌমিলি জিগ্যেস করল, ‘কিছু জানা গেল দময়ন্তীদি?’
‘ওই, আই উইটনেসরা যা বলছে, সেটুকুই।’
‘এইভাবে সবার সামনে খুন করে নেমে পালাল, জাস্ট ভাবা যাচ্ছে না। বলুন?’
কথাটা এড়িয়ে গিয়ে দময়ন্তী বলল, ‘চলো একটু চা খাওয়া যাক।’
.
মোকাম্বো, বিকেল ৫টা ১৫
মোকাম্বোয় এলে শালিনী টুনা মাছের একটা বিশেষ ডিশ নিতে পছন্দ করে। আজও তাই বলল। সম্পূর্ণা অর্ডার করল রিসোটো। সঙ্গে দুজনের জন্যই স্ক্রুড্রাইভার, মানে অরেঞ্জ জুস আর ভদকা দিয়ে একটা ককটেল। সম্পূর্ণা ঢুকেই বলে দিয়েছিল এটা তার ট্রিট, কারণ সে-ই শালিনীকে ডেকেছে। এই নিয়ে কোনওরকম দড়ি-টানাটানি চলবে না।
নীল আলোয় ভাসছে মোকাম্বো। স্টেজ এখনও ফাঁকা। লাইভ পারফরম্যান্স সম্ভবত সন্ধেয় শুরু হয়। শালিনী সম্পূর্ণার দিকে চেয়ে পনেরো বছর আগের মুখটা খোঁজার চেষ্টা করছিল। আর সম্পূর্ণা সম্ভবত ভাবছিল, ঠিক কোথা থেকে কথা শুরু করা যায়।
শালিনীই কথা শুরু করল, ‘বহ্নিতে তোমার অভিনয় দেখে যখন ভাবছি কে এই নতুন মেয়েটা, তখন কি জানতাম লিলুয়ার হোমে সেই শান্ত, নম্র মেয়েটাই এই মেয়ে?’
লাজুক হাসল সম্পূর্ণা।
‘সম্পূর্ণা বলেই ডাকছি। অতীত মুছে তুমি ঘুরেই দাঁড়িয়েছ যখন, পুরোনো নামে আর ডাকব কেন?’
‘আপনার যে নামে ইচ্ছে ডাকুন দিদি।’
‘সেদিন সেমিনারে আমায় চিনতে পেরেছিলে?’
‘পেরেছিলাম দিদি। আপনি তো বিশেষ বদলাননি। কিন্তু পরিচয় দিতে গেলে এত কথা বলতে হত, আর ইচ্ছে করল না।’
শালিনী সম্পূর্ণাকে আরেকবার চুল থেকে নখ দেখে নিল। খুশির গলায় বলল, ‘তুমি যে এভাবে ঘুরে দাঁড়ালে, এত প্রতিষ্ঠিত হলে, কী যে আনন্দ হচ্ছে সম্পূর্ণা!’
‘কিন্তু ইতিহাস যে চুপিচুপি আমায় ধাওয়া করে এতদিন পরে এসে দাঁত-নখ বের করবে, সে তো ভাবিনি।’ সম্পূর্ণা ম্লান হাসল, ‘আজ সক্কাল সক্কাল ভরা ট্রেনে সবার সামনে একটা খুন হয়ে গেল। শুনেছেন তো?’
‘না শুনে আর কোথায় যাব? এখন এ-ছাড়া খবর আছে আর? কী সাংঘাতিক ডেয়ারিং ব্যাপারস্যাপার!’ বলতে বলতে আচমকা ব্রেক কষল শালিনী। সম্পূর্ণা সত্যিই মজন্তালীর দলের কিনা সেটা তো এখনও শিওর না। সেটা জিগ্যেসও করা চলে না। আর সেটা না-জেনে এ-বিষয়ে মন্তব্য করাও সমীচীন হবে না।
সম্পূর্ণা বলল, ‘আমি সে সময় একটা স্ক্রিপ্ট রিডিং সেশনে ছিলাম। পুলিশ জানে সেটা। সারাক্ষণই আমার ওপর নজর রাখা হয়েছে। তা সত্ত্বেও যদি আমার ওপর থেকে সন্দেহ না যায়, কী বলি বলুন!’
শালিনী সতর্কভাবে বলল, ‘এখানেও নজর রাখছে বলছ?’
‘অপোজিট ফুটেই দাঁড়িয়ে আছে দুই মক্কেল। সাদা টি শার্ট পরা একটা চোয়াড়েমার্কা লোক আর লাল সালওয়ার পরা একজন মহিলা।’
শালিনী ডানদিকে একটু ঝুঁকতেই দুজনকে দেখতে পেল। সোজা হয়ে বসে সম্পূর্ণাকে বলল, ‘আসলে মজন্তালীকে তো একটা দল বলে সন্দেহ করছে সিআইডি। ফলে একটা খুনের সময় তোমার অ্যালিবাই থাকলেও সেটা তোমার ইনোসেন্সের যথেষ্ট প্রমাণ না।’
‘সেটা শুনলাম। ঠিকই। তবে একটা বিষয় খুব মজার হয়েছে। আমার মাঝে মাঝে লেট নাইটে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ার বাই চাপে। বিষয়টা রিস্কি বুঝতে পারি, কিন্তু কান্ট হেল্প। তো এখন থেকে আমার সঙ্গে সরকারি খরচে পাহারাদার থাকছে। এখন আমি নিশ্চিন্তে রাতে বেরোতে পারি।’ বলে হাসল সম্পূর্ণা।
খাবার এসে পড়েছে। ড্রিঙ্কে চুমুক দিয়ে শালিনী বলল, ‘সম্পূর্ণা, আজ তোমার কথা শুনতেই এসেছি। তবে তার আগে একটা কথাই বলব। পুলিশ কিন্তু নোংরা ঘাঁটবে। দময়ন্তীদিকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি। উনি নিজে নোংরা ঘাঁটবেন না। যথাসম্ভব আটকানোরও চেষ্টা করবেন। কিন্তু পারবেন না। কিছু একটা ডেফিনিট লিঙ্ক পেয়ে গেলে পুলিশ নোংরা ঘাঁটবেই। ফলে স্টে স্ট্রং।’
সম্পূর্ণা বিনীত ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল। বলল, ‘ডেফিনিট লিঙ্ক খুঁজে পেলে নোংরা ঘাঁটা তো পুলিশের জায়েজ অধিকার, শালিনীদি। দময়ন্তী মুখার্জীর সঙ্গে কথা বলে এটুকু বুঝেছি যে উনি সেনসিটিভ মানুষ। ইন ফ্যাক্ট ওঁর ফতোয়াতেই নিউজ চ্যানেলগুলো আমার খবরটা ব্রেক করতে পারছে না। কিন্তু উনি কি এটা এনশিওর করতে পারবেন যে পুলিশ জোর করে কোনও লিঙ্ক এসটাবলিশ করার চেষ্টা করবে না?’
‘এটা কেউ এনশিওর করতে পারবে না। এই কেসে সিআইডি-র ওপর এমনিই পাহাড়প্রমাণ চাপ ছিল। প্লাস ভবানী ভবনের ব্যাপারটায় তাঁদের সাংঘাতিক ফেসলস হয়েছে। তাঁরা বাঘের মতো রক্তপিপাসু হয়ে আছেন, এটুকু আমি বুঝতে পারছি।’
‘পুলিশ যদি আমাকে সহজ শিকার পেয়ে ফ্রেম করার চেষ্টা করে, আমি কী করব?’
শালিনী অপলকে তাকিয়ে রইল মেয়েটার দিকে। তার বিশ্বাস করে ফেলতে ইচ্ছে করছে যে সম্পূর্ণা নির্দোষ। কিন্তু এত সহজে কি মানুষকে বিশ্বাস করা চলে? সে কতটুকু চেনে সম্পূর্ণাকে? নিজের মনকে বাগে আনল শালিনী, ‘ভালো একজন ল-ইয়ারের সঙ্গে কথা বলো ইমিডিয়েটলি।’
‘সেটা আমিও ভেবেছি। উকিলের খোঁজও করছি। আমার ইচ্ছে বিবস্বান দত্ত। তিনি সুজান জর্ডানের উকিল ছিলেন।’
‘গুড চয়েস। এখন তাঁর নিজের মেয়েও সাসপেক্ট তালিকায়। সব মিলিয়ে তিনি কেসটা বেশ মরিয়া হয়ে লড়বেন।’
‘দেখি, যদি রাজি হন।’
‘আমার মনে হয় রাজি হবেন। উনি নিজেই যেচে তিয়াসা পৈলানের হয়ে ক্ষতিপূরণে দেরির মামলা করিয়েছেন সরকারের বিরুদ্ধে।’
‘শুনেছি। আমার মনে হয় ব্যাপারটাকে উনি বেশ পারসোনালি নিচ্ছেন। আমার এমন লোকই প্রয়োজন। আরেকটা কথা শালিনীদি। এই ব্যাপারে আপনার সাহায্য পেলে ভালো হয়, সেজন্যই বলছি। একজন সারভাইভার হিসেবে আমার জার্নিটা যদি সবার সামনে আনতে চাই, কেমন হয়?’
শালিনী মেয়েটার সাহস দেখে আবারও স্তব্ধ হয়ে গেল। বলল, ‘কীরকম?’
‘আমি ইনফ্লুয়েন্সার হিসেবে কাজ করতে পারি না? যাতে আমার মতো লোকজন একটু সাহস পেতে পারে?’
‘তুমি একথা বলছ খুবই ভালো লাগছে, কিন্তু তাতে তোমার পুরো অতীতটা এক ধাক্কায় হাটের মাঝে এসে পড়বে। মুখরোচক চর্চা শুরু হবে। তোমার পেশা, তোমার নতুন জীবন সব বিপন্ন হয়ে পড়বে। লোকজন নোংরা নোংরা ট্রোল করবে। তুমি তার জন্য তৈরি তো?’
‘সেই সম্ভাবনা অলরেডি তৈরি হয়েছে শালিনীদি। এই খবর কতদিন আর চাপা থাকবে? আমি তো দেখছি অনেকেই জেনে গেছে যে সিআইডি আমায় জেরা করেছে। অতীতকে আর ঢাকাঢুকি দিয়ে রাখা যাবে না শালিনীদি। আমি বুঝে গেছি আমাকে সেটা নিয়েই বাঁচতে হবে। আমি আর চোখ নামিয়ে নয়, চোখে চোখ রেখে লড়তে চাই।’
.
ভবানী ভবন, সন্ধে ৬টা
অমিতাভ ফোন চার্জে বসিয়ে বললেন, ‘প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছে, ট্রেন স্লো চলছিল। লাফিয়ে পড়তে সমস্যা হয়নি। বেতোর লেভেল ক্রসিংয়ের ঠিক আগে।’
‘বোরখা ছিল। ফলে অনেকে দেখলেও খুব ডেফিনিট কোনও হুলিয়া পাওয়া যাচ্ছে না। চোখ দেখে এবং গলা শুনে যেটুকু বোঝা যাচ্ছে তাতে একেকজন একেকরকম বলছে। সব মিলিয়ে পঁচিশ থেকে চল্লিশ। তবে চোখের বিবরণ কিন্তু আমাদের আগের হুলিয়ার সঙ্গে মিলছে না।’ দময়ন্তী বলল।
প্রবীর চক্রবর্তী জিগ্যেস করলেন, ‘সম্পূর্ণা মিত্র কোথায় ছিল বললে?’
রাহুল বলল, ‘ডিরেক্টর কৌশিক রায়চৌধুরী পাম অ্যাভিনিউয়ের বাড়িতে। মিটিংয়ে। ওঁর ওপর চব্বিশ ঘণ্টা নজর আছে আমাদের। এখন উনি পার্ক স্ট্রিট মোকাম্বোয় মনোবিদ শালিনী সিনহার সঙ্গে সামান্য পানাহার করছেন।’
দময়ন্তী চমকাল।
অনিমেষ ভদ্র বললেন, ‘এই শালিনী সিনহা মহিলার নাম এই কেসে আগে শুনেছি মনে হচ্ছে।’
রাহুল বলল, ‘ঠিক শুনেছেন স্যার। মজন্তালী কেসের আই উইটনেস সুচেতা দত্তের টিভি ইন্টারভিউয়ের মূল কাণ্ডারি উনি। পরে একটা নতুন যোগসূত্রও বেরিয়েছে।’
‘কী সেটা?’
‘নতুন না। আসলে অনেক পুরোনো।’ দময়ন্তী বলল, ‘সম্পূর্ণা, মানে রেখা হোমে থাকাকালীন শালিনী সিনহা এক বছর সেখানে ট্রেইনি সাইকোলজিস্ট হিসেবে কাজ করেছিলেন।’
অনিমেষ ভদ্র বললেন, ‘তোমরা এঁকে ভালো করে জেরা করছ না কেন? গভীর জলের ফিশ বলে মনে হচ্ছে।’
‘শালিনী সিনহার ব্যাপারটা দময়ন্তী নিজেই দেখছে।’ বলে অর্থপূর্ণ চোখে তাকালেন এডিজি।
অনিমেষ ভদ্র অত খেয়াল করলেন না। বললেন, ‘আমি ভাবিত এদের নেটওয়ার্ক নিয়ে। কলকাতার বুকে যেসব ঘটনা ঘটছে সেগুলোর খবর জোগাড় করা না হয় খুব কঠিন না। কিন্তু আজকের খুনটা অভাবনীয়। কাঁচরাপাড়ার মতো একটা আধা মফস্বল এরিয়ায় নন্তু শেখ নামে একটি লোক একটি মেয়েকে রেপ করেছে এবং পলিটিকালি প্রেসারাইজড করে তাদের মুখ বন্ধ রেখেছে, এ খবর জানতে হলে যে লেভেলের নেটওয়ার্ক লাগে, সেটা এরা তৈরি করল কীভাবে? কিংবা আজকের এই ঘটনার কথাই যদি ধরি! এত ইনফরমেশন এরা পাচ্ছে কোত্থেকে?’
দময়ন্তী বলল, ‘আমাদের সাসপেক্ট তালিকার কেউ মজন্তালীর এজেন্ট হয়ে থাকলেও এই মুহূর্তে নিউট্রালাইজড। কারণ কোনওরকম বেগড়বাঁই দেখা যাচ্ছে না। এদের সমস্ত ডিজিটাল ডিভাইসেও আমাদের নজরদারি চলছে।’
অনিমেষ ভদ্র বললেন, ‘আপাতত হয়তো এদের নিউট্রালাইজ করে রেখেছে। কিছুটা গ্যাপ দিয়ে আবার একটিভ হতেই পারে।’
প্রবীর চক্রবর্তী বললেন, ‘এরা কোনও কোভার্ট পদ্ধতিতে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখছে না তো?’
অমিতাভ বললেন, ‘ডার্ক ওয়েব হলেও আশ্চর্য হব না। এদের হাতে যে ডিজিটাল এক্সপার্ট রয়েছে সে তো পূর্ণেন্দু সরকারের কেসে টের পাওয়াই গেছে। ডার্ক ওয়েবে ইউজারদের ট্রেস করা প্রায় অসম্ভব।’
অনিমেষ ভদ্র বললেন, ‘কীভাবে অপারেট করছে সেটা তো তখন আঁচ করতে পারব যখন এটা আঁচ করা যাবে যে এরা কারা? এরকম একটা কজ নিয়ে এত লার্জ স্কেলে এত বড় একটা নুইস্যান্স কীভাবে চালিয়ে যাচ্ছে? রীতিমতো ভালো ম্যান পাওয়ার তো রইয়েছে, পাকা মাথাও রয়েছে। দুর্দান্ত প্ল্যানিং। দুর্দান্ত হোমওয়ার্ক। এত গোছানো, নিশ্ছিদ্র অপারেশন কিন্তু দুর্দান্ত অরগ্যানাইজেশন ছাড়া সম্ভব না। আমার ভয় হচ্ছে এরা কি কোনও টেররিস্ট অরগ্যানাইজেশন?’
অমিতাভ বললেন, ‘ভুলে গেলে চলবে না যে কলকাতায় আরডিএক্স ঢুকেছে।’
‘কিন্তু কোনও টেররিস্ট অরগ্যানাইজেশন এইরকম একটা কজের জন্য কেন লড়বে? এখানেই এসে অঙ্কটা মিলছে না। এদের কজ আর অপারেশনের ধরন সম্পূর্ণ উল্টো কথা বলছে।’
প্রবীরবাবু উটের মতো মুখ তুলে কী-যেন ভাবছিলেন। বললেন, ‘এমন কোনও অরগ্যানাইজেশন যারা টেররিস্ট অরগ্যানাইজেশনের ইনফ্রাস্ট্রাকচার ব্যবহার করছে? কোনও কিছুর বিনিময়ে?’
ঘরশুদ্ধু সবাই প্রবীরবাবুর মুখের দিকে চেয়ে নিরুত্তর। প্রবীরবাবু বললেন, ‘হোয়াট অ্যাবাউট আরবান নকশালস?’
‘মন্দ বলেননি,’ অনিমেষ ভদ্র বেজায় উত্তেজিত হয়ে উঠলেন, ‘খুবই সম্ভব। কিষেণজির মৃত্যুর পর সবটাই একটু টালমাটাল। তবে কে বলতে পারে, অন্য আড়াল নিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে না?’
অমিতাভ বললেন, ‘মানে আপনি বলছেন এটা ভেক? মজন্তালীদের আসল উদ্দেশ্য অন্য?’
অনিমেষ মুখ বেঁকালেন, ‘আরবান নকশালদের মতো ঘাঁটা জাত দুনিয়ায় আর নেই। এরা যে কী চায় সেটাই আজ পর্যন্ত ঠিকঠাক বুঝে উঠতে পারলাম না। টোটালি ডিজওরিয়েন্টেড।’
‘একটুও ডিজওরিয়েন্টেড না,’ প্রবীর চক্রবর্তী হাসিমুখে মাথা নাড়লেন, ‘ওটা একটা মোড অব লিভিং, অনিমেষ। তুমি জ্যাভেরিয়ান, তুমি বুঝবে না। তোমরা গুড বয়। পরে এরা বেশিরভাগই বিদেশ-ফিদেশ বা আমার মতো সরকারি উচ্চপদে সেটল করবে। কিন্তু ছাত্রবয়েসের জন্য ওটা একটা আলাদা ঝাঁকানাকা ব্যাপার। আমি, দময়ন্তী বুঝব। অমিতাভ স্কটিশ, রাহুল বিদ্যাসাগর। ওরাও বুঝবে। তানিয়া কোন কলেজ?’
কথার গতিমুখ আচমকা দিক বদলে ওর কলেজের দিকে ধেয়ে আসবে, তার জন্য তানিয়া প্রস্তুত ছিল না। একটু থতমত খেয়ে বলল, ‘লেডি ব্রেবর্ন, স্যার।’
‘তুমিও বুঝবে না। কিছু মনে কোরো না।’ বলে অনিমেষ ভদ্রের দিকে ফিরলেন প্রবীর চক্রবর্তী, ‘যাদবপুর-প্রেসিডেন্সি-ক্যালকাটা মেডিকেল কলেজ বেস করে বেশ কয়েকটা আরবান নকশাল টিম কিন্তু অপারেট করে চলেছে বেশ কয়েক বছর ধরেই। এই রাজ্যে ছোট ছোট কতগুলো মাইক্রো অরগ্যানাইজেশন চলছে, তার মোট সংখ্যা বিষয়ে সম্ভবত কোনও ধারণা নেই আমাদের। এরা নিজেদের এলাকায় সেবামূলক কর্মসূচি চালায়। স্ট্রিট কর্নার করে। কফি হাউজের সামনে সভা করে। ছোটখাটো বিভিন্ন ইস্যুতে পোস্টার নিয়ে বসে যায় কলেজ স্কোয়ারে। কেউ কেউ এসবের তলায় আরও অনেক কিছু করে। আমি প্রেসিডেন্সিতে পড়াকালীন এদের খুব কাছ থেকে দেখেছি। দময়ন্তী সম্ভবত আরও কাছ থেকে দেখেছে। ও নিজে যতদূর জানি এরকম একটা স্বাধীন সংগঠনের সঙ্গে যুক্তও ছিল।’
দময়ন্তী বলল, ‘হ্যাঁ। তারা নিজেদের সংগঠন বলত না, প্ল্যাটফর্ম বলত। কোন্নগরে তাদের হেডকোয়ার্টারেও যেতাম মাঝেমধ্যে। এক সরকারি ডাক্তারবাবু সিটিং দিতেন। খাপে থাকা সরকারি কর্মী ছিলেন বেশ কিছু।’
প্রবীর চক্রবর্তী বললেন, ‘এরকম কোনও খাপে থাকা রাঘব বোয়াল এইসব কাণ্ডের পিছনেও আছে কিনা সেটাই হচ্ছে প্রশ্ন। হয়তো সিস্টেমের মধ্যে থেকে সাবোটাজ করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। দময়ন্তী, তোমার পুরোনো কানেকশনগুলো একটু ঝাঁকিয়ে দ্যাখো কিছু বেরোয় কিনা।’
.
ভবানী ভবন, রাত ৮টা ১৫
তানিয়া বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে ছিল। একটা গাড়ি এসে ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষল। ড্রাইভারের সিট থেকে বকের মতো মুখ বাড়িয়ে রাহুল বলল, ‘লিফট চাই ম্যাডাম?’
‘না,’ তানিয়া মুখ মটকে বলল, ‘তোমার গাড়িতে উঠব না। তুমি শুনলাম আমাকে ডিচ করেছ? কোন মুখে আমাকে লিফট অফার করছ?’
রাহুল করুণ চোখে তাকাল, ‘দময়ন্তীদি তোকেও এইসব বলেছে?’
‘কেন বলবে না? আমি কি ডিপার্টমেন্টের বাইরে?’ বলে তানিয়া দাঁত বের করে বদমাইশি হাসি হাসল, ‘কথাটা সত্যি রাহুলদা?’
‘তানিয়া প্লিজ! এটা আসল সিআইডি-র দপ্তর। তোরা সবাই মিলে এটাকে সোনি টিভির সিআইডি সিরিয়াল বানিয়ে দিচ্ছিস!’
তানিয়া উচ্চস্বরে হেসে উঠল, ‘এটা দারুণ বলেছ। তুমি কি ইনস্পেকটর অভিজিৎ? অমিতাভ স্যার এসিপি প্রদ্যুম্ন ভালোই মানাবে। এদিকে ইনস্পেকটর দয়া তো আছেই। আমাদের বাহুবলী সুকুমারদা। কিন্তু দময়ন্তীদি কী হবে?’
‘দময়ন্তীদি কী হবে জানি না, তবে শুভ্রকান্তি স্যার ডক্টর সালুঙ্খে।’
হি হি করে হাসতে হাসতে গাড়ির দরজা খুলে রাহুলের পাশের সিটে বসল তানিয়া, ‘চলো। কিন্তু আমায় যে ডিচ করলে, আমিনিয়ার রোল খাইয়ে কম্পেনসেট করো।’
‘আমার লেগপুল না করে একটা কাজ করে দে। হিরোইনের সঙ্গে একদিন কফি ডেটে যেতে চা।’
‘সম্পূর্ণার সঙ্গে? কেন বলো তো?’
‘তাঁর ডিএনএ স্যাম্পল লাগবে।’
‘কী হবে? কোথায় ম্যাচ করাবে?’
‘অশোক বসুর ফ্ল্যাটে পাওয়া গেছে না?’
‘আচ্ছা আচ্ছা। কিন্তু আমার বদলে তুমি ডেটে গেলে বেটার হয় না? আমি কি তোমার মতো এত ভালো মাইন্ডহান্টার?’
‘শিখে নে। আর কতদিন আন্ডাবাচ্চা হয়ে থাকবি?’
‘তোমারই বা যেতে কী প্রবলেম? তুমি অন্য মেয়ের সঙ্গে ডেটে গেলে কি লীনা রাগ করবে?’
‘মারব এক চড়। রোল খেতে চাইলে মুখে আঙুল দিয়ে বোস।’
‘তুমি আমাকে নামিয়ে বাড়ি ফিরবে? না রাতবিরেতে গাড়ি নিয়ে ঘুরে বেড়াবে ভূতের মতো?’
‘রবীন্দ্র সদন হয়ে সাঁতরাগাছির দিকটা ঢুঁ মারব একবার। কিছু সোর্সের সঙ্গে কথা বলার আছে।’
‘তোমারও তো দেখি আমাদের হিরোইনের মতো অভ্যেস ধরে গেল।’
‘বলা যায় না। হয়তো আজ এইদিকে এলেন। মাঝরাস্তায় দেখা হয়ে গেল হয়তো।’
.
সল্টলেক, রাত ১০টা ২০
অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকে গাড়ি পার্ক করতে গিয়ে অমিতাভ চমকে উঠলেন। গার্ডের চেয়ারে বসে জাপান মিটিমিটি হাসছে।
‘আরেকটু হলে গুলি-ফুলি চালিয়ে দিতাম!’ হাঁপ ছেড়ে অমিতাভ বললেন, ‘কতক্ষণ বসে আছিস?’
জাপান বিগলিত স্বরে বলল, ‘এই মিনিট দশ হল।’
অমিতাভ কোমরে হাত দিয়ে জাপানকে আপাদমস্তক মাপলেন, ‘তুই কি আমার ওপর নজর রাখিস, জাপান?’
‘আমাদের কি একটা চোখ-কানে চলে স্যার? ও কথা জিগ্যেস করে লজ্জা দেবেন না। আমার লয়ালটিতে বিশ্বাস রাখুন, আর আশীর্বাদের হাতটা মাথায় রাখুন সবসময়।’
‘রেখেছি বলেই করেকম্মে খাচ্ছিস। কী খবর আছে বল।’
‘আরডিএক্স ট্র্যাক করতে পারছি না এখনও। কলকাতা বা তার পার্শ্ববর্তী শহরতলিতেই আছে এটা শিওর। কিন্তু ঠিক ইয়ে পাচ্ছি না।’
‘তাহলে মুখ দেখাতে এলি কেন ভাইটি?’
‘অন্য খবর আছে। আপনি খুশি হয়ে যাবেন।’
‘বল।’
‘শিলিগুড়ি আর কলকাতায় প্রি-অ্যাকটিভেটেড সিম ডিলারদের থেকে কোনও এক পার্টি তিন খেপে মোট সাড়ে তিনশো সিম তুলেছে। ডিল করেছেন একজন মহিলা।’
.
.
