ষষ্ঠ দিন
তারিখ : ৭ আগস্ট
ভবানী ভবন, সকাল ১১টা
আজ থেকে নতুন ঘরে বসা হচ্ছে। আয়তনের দিক থেকে এটা ভবানী ভবনের দ্বিতীয় বৃহত্তম ঘর। প্রায় চোদ্দশো স্কোয়ার ফিট। ছ-টা চওড়া ডেস্ক পরিপাটি করে সাজানো। প্রতিটায় ডেস্কটপ কম্পিউটার। পশ্চিম দেওয়ালে মাঝারি স্ক্রিনের পর্দা। সুপারবিম থেকে পর্দার ওপর তাক করা প্রোজেক্টর। দক্ষিণ দেওয়ালে জিরো ফিগারের টিভি। তার পাশে ছোট্ট একটা কিচেনেট। একপাশে আলাদা করে পার্টিশন করা একটা ছোট অ্যান্টিচেম্বার। চাইলে গড়িয়ে নেবার ব্যবস্থা রয়েছে।
দময়ন্তীকে ঢুকতে দেখে অমিতাভ বললেন, ‘কাল রাতে সুব্রত ফোন করেছিল, বুঝলে? আলিপুর কারেকশনালের ডিআইজি সুব্রত সরকার।’
‘কী বলছেন?’
‘একদিন বসতে চাইছে। আইজি কারেকশনাল তাড়া দিচ্ছেন ওকে।’ অমিতাভ আঙুল মটকাতে মটকাতে বললেন, ‘ম্যাগাজিনের আপিস পুড়িয়ে দেবার পর অবশেষে মজন্তালীর হুমকিটাকে ওঁরা সিরিয়াসলি নিতে শুরু করেছেন।’
‘তা-ও ভালো। মরণকালে হরিনাম করতে বসেনি এই ঢের।’
অমিতাভ হাই তুলে বললেন, ‘সুব্রত আর আমি ব্যাচমেট জানো তো?’
‘তাই নাকি?’
‘হ্যাঁ। এক নম্বরের বিচ্ছু ছিল। কোর্স ইন্সট্রাকটরের জুতো চুরি করেছিল। যাই হোক, ওর সঙ্গে একদিন বসতে হবে চটপট। একটা বেসিক প্ল্যান মাথায় ছকে রেখো। আমরা কী ভাবছি কিছু একটা জানাতে হবে তো।’
দময়ন্তী চেয়ারে বসল। বলল, ‘আলিপুরের হাল চালুনির মতো। কোন প্ল্যান কাজ করবে ওখানে বলুন তো?’
‘সবকটারই এক হাল দময়ন্তী। একটা ইন্টারনাল রিপোর্টে পড়ছিলাম, গত এক বছরে কলকাতার তিনটে সেন্ট্রাল জেল থেকে নাকি পাঁচশোরও বেশি সিম কার্ড উদ্ধার হয়েছে। সিম কার্ডের তো রীতিমতো ঢালাও ব্যবসা চলে। পুরোটাই গার্ডদের সহায়তায়। প্লাস, ড্রাগস। পয়সা ফেললেই গাঁজা, মদ, চরস সব পাওয়া যায়। গত মাস না তার আগের মাসেই তো ক্রাইম কনফারেন্সে কে যেন বলছিল, আলিপুর বা প্রেসিডেন্সি থেকে যে রোজই কোনও-না-কোনও আসামি পালাচ্ছে না সেটা জেলরক্ষীদের কৃতিত্ব নয়। আসামিদেরই বদান্যতা।’
‘আপনার মনে আছে আইবি গত বছর কী বলেছিল? আফতাব আনসারি নাকি এই আলিপুর জেলে বসে পাকিস্তানে নিজের স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছে।’
‘কেন? গত বছর লস্করের আবদুল রহমানও তো দিল্লি পুলিশের কাছে জেরায় জানিয়েছিল যে এই আলিপুর জেলে বসেই সে দেদার আইএসডি কল করেছে। এমনকী, ছকও কষেছে বিস্ফোরণের। ভাবো একবার!’
‘সবাই সব জানে স্যার। কিছুই করা যাচ্ছে না।’
‘আসলে মারাত্মক স্টাফ শর্টেজ হয়ে যাচ্ছে। তুমি কারেকশনালগুলোর কর্মীসংখ্যা দ্যাখো। কত শর্টেজ। আলিপুরে মোট বন্দি রয়েছে অ্যাপ্রক্স আঠেরোশো। হিসেবমতো গার্ড থাকার কথা অন্তত তিনশো জন। সিক্স ইসটু ওয়ান থাকার কথা। ছ’জন বন্দি পিছু এক জন করে গার্ড। কিন্তু রয়েছে পঁয়ত্রিশ জন পিছু এক জন। টোটাল তিনশোর জায়গায় রয়েছে মাত্র দেড়শো। সুব্রত নিজেই বলল, অর্ধেক। তাহলেই ভাবো। এত হাই প্রোফাইল বন্দিদের রাখা হয় যেখানে, কী হাল তার!’
‘তাহলে চলুন না, সরেজমিনে দেখে আসি একদিন।’
‘তাই চলো। কালকের প্রেস কনফারেন্সটা হয়ে যাক। তারপর সুব্রতর সঙ্গে কথা বলে নিচ্ছি।’
বলতে বলতে অমিতাভর ফোন বেজে উঠল। ডিজিটাল ফরেন্সিকের শুভঙ্কর।
‘হ্যাঁ শুভঙ্কর, বলো।’
‘স্যার, বারুইপুরে মজন্তালীর মার্ডার কেসটায় চিরকুটে যে ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাওয়া গেছিল, সেটা লালবাজারের ডেটাবেসে পাওয়া গেছে। বাট, দিস ইজ ইমপসিবল। কোথাও ভুল হচ্ছে স্যার।’
‘কেন?’ অমিতাভ টানটান হয়ে বসলেন।
‘কারণ যার ফিঙ্গারপ্রিন্ট, সেই মহিলা দিনকয়েক হল মারা গেছেন।’
‘কী যা-তা বলছ! কে তিনি?’
‘পার্ক স্ট্রিট রেপ কেসের ভিক্টিম। সুজান জর্ডান।’
.
লাইভ নিউজের অফিস, বেলা ১২টা ৪৫
গাড়ি অফিসের পার্কিংয়ে ঢুকছে, এমন সময় শাক্যর ফোনে কোকিল ডাকল। টেক্সট মেসেজ ঢুকেছে।
শাক্য ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে পকেট থেকে ফোন বের করল। আননোন নম্বর। কিন্তু মেসেজ দেখেই হৃদপিণ্ড ডিগবাজি খেয়ে গেল, ‘সৌমিলি!’
শাক্যর চোখমুখ দেখে সৌমিলি ভয় পেয়ে গেল, ‘কী হল রে?’
শাক্য ঢোঁক গিলে কোনওমতে অবিশ্বাসভরা গলায় বলল, ‘ভূত!’
‘মানে?’
‘বারুইপুরে মজন্তালীর মার্ডার কেসটায় চিরকুটে ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাওয়া গেছে। সেটা সুজান জর্ডানের ফিঙ্গারপ্রিন্ট।’
‘কী যা-তা বলছিস?’
‘আমার ফোনে একটা আননোন নম্বর থেকে মেসেজ এসেছে। দ্যাখ।’ বলে ফোনটা সৌমিলির দিকে বাড়িয়ে দিল শাক্য।
.
ভবানী ভবন, দুপুর ১টা ১৫
শুভ্রকান্তিকে সময়ে পাওয়া কঠিন। কিন্তু চরম সংকটের সময় ভদ্রলোক ঠিক কী করে যেন হাজির হয়ে যান। ঘরে ঢুকে শুভ্রকান্তি বললেন, ‘দ্যাখো, এই ফিঙ্গারপ্রিন্ট মৃতদেহ থেকে জোগাড় করা হয়নি সেটা নিশ্চিত। করলেও মৃত্যুর ঠিক পরপরই জোগাড় করেছে। খুব বেশি হলে এক ঘণ্টার মধ্যে। কারণ মৃত্যুর পর কিছুটা সময় পেরিয়ে গেলেই মানুষের ফিঙ্গারপ্রিন্ট বিগড়াতে শুরু করে। সিমেট্রি ঘেঁটে যায়।’
মাধ্যমিকে সায়েন্স সাবজেক্টে লেটার পেয়ে বহু ছেলেমেয়ে যেমন প্রবল কনফিডেন্স নিয়ে উচ্চমাধ্যমিকে সায়েন্স নিয়ে ভর্তি হয়ে যায় এবং একদিন আচমকা খেয়াল করে যে বাঁও মিলছে না, অমিতাভর মুখটা ঠিক সেরকম দেখাচ্ছিল। বললেন, ‘আপনি শিওর শুভ্রকান্তিদা?’
শুভ্রকান্তি বললেন, ‘তুমি চাইলে আমি কম্প্যারিজন মাইক্রোস্কোপে দেখিয়ে দিতে পারি মৃত আর জীবিত মানুষের ফিঙ্গারপ্রিন্টের বেসিক তফাত ঠিক কী। এই ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিশ্চিতভাবে সুজান জর্ডানের বেঁচে থাকাকালীন, বা বড়জোর তার মৃত্যুর এক ঘণ্টার মধ্যেকার।’
দময়ন্তী বিভ্রান্ত মুখে বলল, ‘তাই যদি হয় তাহলে তো অনেকগুলো সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে হবে। সুজানের বাড়ির লোক জড়িত থাকতে পারে। হাসপাতালের কেউ জড়িত থাকতে পারে।’
শুভ্রকান্তি প্রশ্ন করলেন, ‘আচ্ছা, সুজানের ডেথ সার্টিফিকেট কে ইস্যু করেছিলেন খোঁজ নিয়েছ?’
রাহুল বলল, ‘ডঃ ঐন্দ্রিলা রয়।’
‘নিউরোলজিস্ট ঐন্দ্রিলা রয়?’
‘হ্যাঁ।’
শুভ্রকান্তির ভুরু কুঁচকে গেল, ‘শি ইজ ওয়ান অফ দ্য বেস্ট উই হ্যাভ ইন কলকাতা। কিন্তু কোথাও কিছু একটা গন্ডগোল তো হচ্ছেই।’
অমিতাভ নড়েচড়ে বসলেন। রাহুলের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ডু কনট্যাক্ট হার রাইট নাও। অ্যাপয়েন্টমেন্ট ফিক্স করাও। আজই। এখন সম্ভব হলে এখনই। আর সুজান জর্ডানের ডেথ সার্টিফিকেটের এবং চিকিৎসার যাবতীয় কাগজপত্রের কপি হাসপাতালের সঙ্গে কথা বলে বের করাও। কুইক।’
‘ওকে স্যার।’ রাহুল বেরিয়ে গেল।
শুভ্রকান্তি দাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, ‘দ্যাখো অমিতাভ, মার্ডার ওয়েপন হিসেবে যে চুলের কাঁটাগুলো ব্যবহৃত হয়েছে, কোনওটায় ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাওয়া যায়নি। অন্য কোনও চিরকুটে ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাওয়া যায়নি। লীনা দাশগুপ্তকে দেওয়া চিঠিতেও লীনা আর তার মা-বাবা বাদে কারও ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাওয়া যায়নি। আমি নিজে হাতে ডাস্টিং করেছি, ম্যাগনেটিক পেন দিয়ে সবকটা স্ক্রুটিনি করেছি। ফলে ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিয়ে এরা যে খুব সতর্কতা অবলম্বন করেছে তাতে সন্দেহ নেই। এই প্রথম একটা চিরকুটে ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাওয়া গেল এবং সেটাও কাগজে-কলমে মৃত একজন ব্যক্তির ফিঙ্গারপ্রিন্ট। এটা সিআইডি-কে খেলানোর চেষ্টা না তো?’
তানিয়া অনেকক্ষণ ধরে উসখুস করছিল। এবার একটু ফাঁক পেয়ে বলল, ‘আমি একটা জিনিস বুঝতে পারছি না, সুজান জর্ডানের ফিঙ্গারপ্রিন্ট পুলিশের ডেটাবেসে কী করছে? শি ওয়াজ নট আ ক্রিমিনাল।’
অমিতাভ বললেন, ‘আসলে সুজানকে যে-চারজন রেপ করেছিল, তার মধ্যে একজনের গত বছর আনন্যাচারাল ডেথ হয়েছিল। সেই কেসে সুজান ছিল প্রাইম সাসপেক্ট। যদিও শেষমেশ কেস সলভ হয়নি। সেজন্যই ওর বায়োমেট্রিকস নিয়ে রাখা হয়েছিল।’
‘তাহলে তিনটে সম্ভাবনা বোঝা যাচ্ছে,’ দময়ন্তী বলল, ‘এক, সুজান জর্ডানের মৃত্যুর ঠিক পরেই তার ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিয়ে নেওয়া হয়েছিল। দুই, সুজান জর্ডান বেঁচে থাকাকালীন তার অজান্তে এই ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহ করা হয়েছে। তিন, সুজান জর্ডন বেঁচে থাকাকালীন নিজেই সজ্ঞানে এই কাগজে তাঁর ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়েছেন।’
‘অথবা চার, সুজান জর্ডান আদৌ মরেননি।’ শুভ্রকান্তি বলে উঠলেন।
সবার বিস্ফারিত চোখ ঘুরে গেল তাঁর দিকে।
.
বালিগঞ্জ প্লেস, লাইভ নিউজের অফিস, দুপুর ১টা ২০
শিরিন হাঁ করে খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে বলল, ‘এর মানেটা কী দাঁড়াল?’
‘কিছুই বুঝতে পারছি না।’ শাক্যর মুখটা জাবর-কাটা গরুর মতো দেখাচ্ছে।
সৌমিলি শাক্যর ফোনের মেসেজটা ওপেন করে ভোম্বল হয়ে বসেছিল। বিড়বিড় করে বলল, ‘সব জট পাকিয়ে যাচ্ছে। সব ঘেঁটে যাচ্ছে।’
পৃথ্বীশ বলল, ‘শেষে রহস্য গল্পে থেকে হরর গল্পের দিকে চলে যাবে নাকি রে?’
‘না পৃথ্বীশদা,’ শিরিন চোখ সরু করে বলল, ‘হয় পুলিশের কোথাও একটা ভুল হচ্ছে, আর না হয় ইচ্ছে করে ফলস ফ্ল্যাগ দেওয়া হচ্ছে। পুলিশকে কনফিউজ করার জন্য।’
‘ফলস ফ্ল্যাগ কীভাবে দেবে? সুজান জর্ডানের ফিঙ্গারপ্রিন্ট কী করে হওয়া সম্ভব? মহিলা মারা গেছেন প্রায় এক সপ্তাহ হয়ে গেল। একজন মৃত মানুষের ফিঙ্গারপ্রিন্ট মজন্তালীর চিরকুটে কী করছে?’
‘ঘটনাটা কিন্তু তিনদিন আগের। সুজানের মৃত্যুর প্রায় ছত্রিশ ঘণ্টার মাথায় ঝন্টু কুণ্ডু খুন হয়েছে। খুব বেশি টাইমল্যাপস কি এটা?’
‘তুই কী বলতে চাইছিস বল তো! আমার তো কিছুই মাথায় ঢুকছে না।’
‘আমিও জানি না ঠিক কী বলতে চাইছি। তবে কোথাও একটা ম্যানিপুলেট করার চেষ্টা আছে।’
সৌমিলি দু-হাতে মাথার রগ চেপে ধরে বলল, ‘আমি মজন্তালী নিয়ে ভাবতে ভাবতে পাগল হয়ে যাব এবার!’
শাক্য বলল, ‘তোমরা আগে বলো, আমার কাছে যে মজন্তালী সরকারের মেসেজ এসেছে সেটা কি সিআইডি-কে জানানো উচিত?’
পৃথ্বীশদা বলল, ‘অবশ্যই। পরে জানতে পারলে ফালতু টানাহ্যাঁচড়া করবে। ওরা নম্বরটা ট্র্যাক করুক। যদিও কিছু পাবে না। তবু, আমরা আমাদের জায়গা থেকে ক্লিয়ার থাকি।’
‘ঠিক আছে। আমি নিজেই যাচ্ছি। এই ফিঙ্গারপ্রিন্টের খবরটাও কনফার্ম করে আসব। সৌমিলি যাবি?’
‘অবশ্যই। পুলিশের ব্যাপারে তোকে একা ছাড়া যাবে না।’ সৌমিলি বলল, ‘তুই যা হাঁদা। কী বলতে কী বলবি, অ্যারেস্ট করে নেবে।’
‘না সৌমিলি। তুই না।’ পৃথ্বীশদা বলল, ‘তোকে একটা রাইট-আপ রেডি করতে হবে। এই নতুন অ্যাঙ্গলটা নিয়ে। শিরিন যা।’
‘ওকে বস,’ শিরিন মোবাইল ঝোলায় ভরে উঠে পড়ল।
সৌমিলি বিরস মুখে বলল, ‘অ্যাঙ্গল কী হবে? সুপারন্যাচারাল?’
‘আবার কী? এত ভালো স্পিন করার সুযোগ ছাড়ে কেউ? বেশ খেলিয়ে লেখ দিকি। শাক্যরা কনফার্ম করা মাত্রই ব্রেকিংয়ে ছেড়ে দেব।’
‘তুমি হেডলাইন দাও। আমার হেডলাইন তো তোমার পছন্দ হয় না।’
‘বেটরিজের হেডলাইন ল ভুলে গেলি?’ পৃথ্বীশদা চোখ টিপল, ‘ইউজ কোশ্চেন মার্ক, বাডি। যে-প্রশ্নের উত্তর নেগেটিভ, মিডিয়া তাকেই কোশ্চেন মার্ক দিয়ে হেডলাইন বানায়।’
শাক্য বলল, ‘যদি কনফার্মেশন না পাই?’
‘তাহলেও ছেড়ে দেব। আমাদের কাছে কংক্রিট লিড আছে। আমরা সিআইডি-কে ঠিক সময়ে ইনফর্ম করেছি। ব্যাস। আমাদের জায়গা থেকে আমরা ক্লিয়ার।’
গাড়িতে উঠে শাক্য একটা সিগারেট ধরাল। মাথার মধ্যে শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড়ের জ্যাম হয়ে আছে। সুজান জর্ডানের সঙ্গে মজন্তালী সরকারের কি সত্যিই কোনও সম্পর্ক আছে, নাকি এটা তদন্তকে বিপথগামী করার চেষ্টা?
ওদিকে শিরিনও চুপ। কপালে ভ্রূকুটি।
হাজরার কাছাকাছি পৌঁছে শাক্য বলল, ‘তুই তাহলে বলতে চাইছিস এটা সুপারন্যাচারাল ব্যাপার নয়?’
শিরিন ‘দেয়া নেয়া’ ছবির কমল মিত্রের কায়দা নকল করে বলল, ‘বলতে চাইছি না, বলছি।’
‘এত শিওর হচ্ছিস কী করে?’
‘সুপারন্যাচারাল অ্যাঙ্গেলটাই আমরা দেখাব। কারণ লোকে সেটা খাবে। কিন্তু একটা কথা জেনে রাখ, দশটা ঘটনায় গাঁথা একটা মালায় কোনও একটা ঘটনাকে যদি সুপারন্যাচারাল মনে হয় তাহলে বুঝবি কেউ সেটাকে সুপারন্যাচারাল হিসেবে শোকেস করার চেষ্টা করছে।’
বারো-আনা বিভ্রান্তির সঙ্গে চার-আনা বিরক্তি মিশিয়ে তাকাল শাক্য, ‘তুই আমাকে আরও গুলিয়ে দিচ্ছিস, শিরিন।’
.
শিবপুর, বিকেল ৪টে
ডাঃ ঐন্দ্রিলা রয় সাংঘাতিক ব্যস্ত মানুষ। অবশ্য পুলিশ-কেস শুনলে সময় আপনাআপনিই বেরিয়ে আসে। ফলে তাঁকে তাঁর বাড়িতেই পাওয়া গেল। সবটা শুনে তিনি আকাশ থেকে পড়লেন, ‘এটা কী করে সম্ভব, মিঃ সান্যাল?’
অমিতাভ বললেন, ‘এক্ষেত্রে চারটে সম্ভাবনার কথা আমরা ভাবছি। সম্ভাবনা নম্বর এক, সুজান জর্ডানের মৃত্যুর ঠিক পরেই তার ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিয়ে নেওয়া হয়েছিল। সম্ভাবনা নম্বর দুই, সুজান জর্ডান বেঁচে থাকাকালীন তার অজান্তে এই ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহ করা হয়েছে। এই দুই ক্ষেত্রে হাসপাতাল স্টাফ বা সুজানের আত্মীয়-বন্ধুদের সন্দেহের আওতায় আনতে হয়। সম্ভাবনা নম্বর তিন, সুজান জর্ডন বেঁচে থাকাকালীন নিজেই সজ্ঞানে এই কাগজে তাঁর ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়েছেন। আর সম্ভাবনা নম্বর চার, সুজান জর্ডান মরেননি।’
ঐন্দ্রিলা রয় খানিকক্ষণ অপলকে অমিতাভর দিকে চেয়ে রইলেন। তারপর অবাক-গলায় বললেন, ‘আর ইউ সিরিয়াস? এই চার নম্বর সম্ভাবনাটার কথা আপনারা সত্যিই ভাবছেন?’
অমিতাভ একটুও অপ্রতিভ না-হয়ে বললেন, ‘আমাদের বাধ্য হয়েই সবরকম সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে হচ্ছে ডক। প্লিজ।’
‘বাট দিস ইজ রিডিকুলাস। অ্যাবসার্ড। প্রথম তিনটে পয়েন্ট তা-ও ফিসিবল।’ ঐন্দ্রিলা রয়ের গলায় বিরক্তি স্পষ্ট।
অমিতাভ শুভ্রকান্তির সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় করলেন। শুভ্রকান্তি আলোচনার সুতো ধরে নিলেন, ‘ডক রয়, আবারও বলছি, খটকার কারণ একটাই। সুজান জর্ডানের ফিঙ্গারপ্রিন্টটা মৃত্যুর আগেই নেওয়া।’
আপাত-অবিন্যস্ত শুভ্রকান্তির মধ্যে একটা বিরল প্রজাতির স্মার্টনেস আছে যা সহজেই লোকজনের সমীহ, ভরসা দুই-ই আদায় করে নেয়। আর কণ্ঠস্বরে আছে একটা চোরা আগ্রাসন। ঐন্দ্রিলার বিরক্তি সামান্য প্রশমিত হল বোধহয়। বললেন, ‘আর ইউ শিওর? কারণ সোললি এই পয়েন্টটার ওপরেই দাঁড়িয়ে আছে এই হাইপোথিসিসগুলো।’
শুভ্রকান্তি ব্যাগ থেকে একটা ফাইল বের করতে করতে বললেন, ‘আপনি তো জানেন, মানুষের মৃত্যুর পর কিছুটা সময় পেরিয়ে গেলে ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাল্টাতে শুরু করে। এই ফিঙ্গারপ্রিন্ট মৃতদেহ থেকে জোগাড় করা হয়নি সেটা নিশ্চিত। করলেও মৃত্যুর ঠিক পরপরই জোগাড় করেছে।’ ফাইলের মধ্যে থেকে পলিয়েস্টার ফিল্মের একটা লম্বাটে শিট বের করে একটা জায়গায় আঙুল ছোঁয়ালেন শুভ্রকান্তি, ‘দেখুন। আমি ফ্লুরোসেন্স ইমেজটা নিয়ে এসেছি। এখানটা দেখুন, মৃত মানুষের রেডিয়াল লুপ, আলনার লুপ বা টেন্টেড আর্ক কোনওভাবেই এমন হবার কথা না। কারণ যেসব সিক্রেশন থেকে এই জাতীয় ছাপ এত নিটোলভাবে তৈরি হয়, আপনি নিশ্চয়ই জানেন, সেগুলো মানুষের মৃত্যুর পর নিষ্ক্রিয় হতে থাকে।’
‘ফিঙ্গারপ্রিন্টটা কি খুব টাটকা, ডঃ ব্যানার্জী?’
‘লেটেন্ট ফিঙ্গারপ্রিন্ট, মানে চোখে দেখা যায় না এমন ফিঙ্গারপ্রিন্ট ঠিক কবেকার, সেটা তো একেবারে নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে বেশি পুরোনো নয়। সুজান মারা গেছেন বেশিদিন হয়নি।’
ঐন্দ্রিলা কয়েক মুহূর্ত ভেবে বললেন, ‘কোনও ব্যাখ্যা পাচ্ছি না।’
অমিতাভ বললেন, ‘এই কারণেই আপনার কাছে এসেছি ডক্টর রয়। সুজান জর্ডানের মৃত্যুর ব্যাপারে কয়েকটা তথ্য একটু ডিটেলে শুনতে চাই।’
‘বেশ। বলুন কী জানতে চান।’
‘সুজানের মৃত্যুর কারণটা একটু বুঝিয়ে বলবেন? একজন লে-ম্যানের বোঝার মতো করে বলবেন প্লিজ।’
‘রোগটার নাম মেনিঙ্গোএনসেফেলাইটিস। মেনিনজাইটিস আর এনসেফেলাইটিস একসঙ্গে। ব্রেন আর স্পাইনাল কর্ডের ইনফেকশন। একধরনের ভাইরাসঘটিত রোগ। মানুষের মস্তিষ্কের চারপাশ মেনিন নামে একটি পর্দার মাধ্যমে ঢাকা থাকে। বেশ কিছু ব্যাকটেরিয়া এবং ভাইরাস ও মেনিনজেস পর্দাকে আক্রমণ করলে পর্দাটি ফুলে যায়। এই অসুখকে মেনিনজাইটিস বলা হয়। মেনিনজেস পর্দাটি ফেটে গিয়ে সংক্রমণ যখন মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়ে তখন তাকে বলা হয় মেনিঙ্গোএনসেফেলাইটিস। শেষ পরিণতি মাল্টি-অরগ্যান ফেইলিওর।’
‘বেশ। এই রোগ কীভাবে নির্ণয় করা হয়?’
‘রোগীর মেরুদণ্ড থেকে সেরিব্রো স্পাইনাল ফ্লুইড কালেক্ট করে পরীক্ষা করতে হয়।’
‘রোগীর বাঁচার চান্স কীরকম থাকে?’
‘নব্বই শতাংশ ক্ষেত্রে মৃত্যু নিশ্চিত।’
‘রোগের লক্ষণগুলো কীরকম?’
‘জ্বর, খিঁচুনি, বমি, পাতলা পায়খানা। আস্তে আস্তে ঘাড় শক্ত হয়ে যায়। শেষে মস্তিষ্ক ফুলে উঠে ফুল প্যারালাইসিস হয়ে যায়। রোগী ডিলিরিয়ামে চলে যায়, মানে ভুল বকে। তারপর আস্তে আস্তে কথা বলার ক্ষমতাও চলে যায়। কাউকে চিনতে পারে না। তবে সুজান শেষ বেলা অবধি কথা বলেছেন।’
‘পয়েন্ট টু বি নোটেড,’ শুভ্রকান্তির উদ্দেশে বলে অমিতাভ আবার ঐন্দ্রিলা রয়ের দিকে ফিরলেন, ‘সুজানের মৃত্যুর কতক্ষণ পরে আপনি তাঁকে ভিজিট করেন?’
‘মিনিট চল্লিশ।’
‘মানে কেউ যদি মৃত্যুর পর ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিয়ে থাকে, আপনার তাকে দেখার সম্ভাবনা কমই।’ আপনমনে আওড়ে অমিতাভ বললেন, ‘সেইসময় কে কে সেখানে উপস্থিত ছিল মনে আছে? বলতে পারবেন?’
‘সুজানের বাবা বেঞ্জামিন, মেয়ে, সুজানের দু-তিনজন বন্ধু, হসপিটালের একজন জুনিয়র ডাক্তার, যে সেদিন হাউজ স্টাফ ছিল, আর বোধহয় দুজন নার্স, দুজন আয়া।’
‘ডক রয়, এবার আমি যে প্রশ্নটা করব, সেটা আপনার কাছে বোকা বোকা এবং অপমানজনক দুই-ই মনে হতে পারে। আপনার কাছে আমার বিনীত অনুরোধ, প্লিজ ডোন্ট টেক ইট পার্সোনালি। আমি লজ্জিত। তদন্তের স্বার্থে বাধ্য হয়ে আমাকে এ-প্রশ্ন করতে হচ্ছে।’
‘রিল্যাক্স মিঃ সান্যাল। আমি বুঝতে পারছি। আপনি প্রশ্ন করুন।’
‘আপনি শিওর যে সুজান জর্ডান মারা গেছেন? মানে ২ তারিখে যিনি মারা গেলেন তিনি সুজান জর্ডানই ছিলেন আপনি নিশ্চিত?’
‘আমি সুজানের বডি দেখেছি। তাতে প্রাণ ছিল না। সবকিছু দেখেশুনে তবেই ডেথ সার্টিফিকেট ইস্যু করেছি। বিলিভ মি মিঃ সান্যাল, এক্ষেত্রে কোনও ডাক্তার চান্স নেবেন না। যদি দেখা যায় উনি বেঁচে আছেন তাহলে সবচেয়ে বড় ক্ষতি আমার হবে। লাইসেন্স তো যাবেই, পাশাপাশি এই কেসের অন্যতম আসামি হয়ে যাব আমি। যাবজ্জীবনও হতে পারে।’
‘না, না ডক রয়,’ অধৈর্য ভঙ্গিতে বললেন অমিতাভ, ‘আমি বলছি, ইন এনি কেস, এসব ক্ষেত্রে কোনও মিরাকল কি সম্ভব?’
‘অন্তত চিকিৎসাবিজ্ঞানের দিক থেকে দেখলে, সম্ভব না। চিকিৎসাবিজ্ঞানসম্মত মিরাকল যদি কিছু ঘটে সেটার জন্য ম্যাক্সিমাম সময়সীমা ধরা থাকে চার ঘণ্টা। সকলেই জানে। সেইজন্য মৃত্যুর চার ঘণ্টা পরে ডেথ সার্টিফিকেট দেওয়া হয়।’
‘আচ্ছা, আপনার হসপিটাল স্টাফেদের মধ্যে কারও সঙ্গে সুজানের বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল? খেয়াল করেছেন?’
‘না।’
‘কিছু মনে করবেন না ডক্টর রয়, আমরা আমাদের মেডিকো-লিগাল অ্যাডভাইসারকে দিয়ে সার্টিফিকেটগুলো চেক করাচ্ছি। আমি আবারও জানাই, আমি লজ্জিত।’
‘আপনাকে লজ্জিত হতে হবে না মিঃ সান্যাল। ডু ইয়োর ডিউটি। আমি যথাসাধ্য সাহায্য করব। কিন্তু যদি আমার বক্তব্য শুনতে চান, আমি বলব এটা পিওর ফলস ফ্ল্যাগ। ক্যাটওম্যান রেড হেরিং ছড়াচ্ছেন। একজন মৃত মানুষকে ফ্রেম করা হচ্ছে, যাতে একটা চমৎকার ভূতের গল্প ফাঁদা যায়।’
অমিতাভ টের পেলেন প্যান্টের পকেটে তাঁর ফোন গোঁ গোঁ করে কাঁপছে। দময়ন্তী কলিং।
‘কী খবর?’
‘স্যার, ফিঙ্গারপ্রিন্টের ব্যাপারটা মিডিয়ায় লিক হয়ে গেছে।’
‘কী করে?’
‘লাইভ নিউজ থেকে দুজন রিপোর্টার এসেছেন। তাদের ফোনে মজন্তালী সরকারের মেসেজ এসেছে।’
অমিতাভর মাথায় ঘ্যাঁট পাকিয়েই ছিল। এই কথাটা শুনে আরও ঘেঁটে গেলেন। তার মানে মজন্তালী চাইছে এটা খবর হোক? গুজব ছড়ানোটাই উদ্দেশ্য? ফলস ফ্ল্যাগ? কিন্তু বাজিয়ে না দেখে সেটাই বা মেনে নেওয়া যায় কী করে?
ওপাশ থেকে দময়ন্তী বলল, ‘কনফার্মেশন চাইছে। কী করব স্যার? ডিনাই করে দেব?’
অমিতাভ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘ডিনাই করে লাভ নেই দময়ন্তী। হালকা লিকেজ দাও। সুপারন্যাচারাল অ্যাঙ্গলটাকে শুরুতেই কাঁচি করে দেবে।’
.
ভবানী ভবন, বিকেল ৪টে ৩০
ফোন রেখে কেবিনে ফিরে এসে দময়ন্তী বললেন, ‘ইয়েস। খবরটা সত্যি। বারুইপুরে খুনের স্পটে যে-চিরকুটটা পাওয়া গেছে, তাতে সুজান জর্ডানের ফিঙ্গারপ্রিন্ট রয়েছে।’
শাক্য বলল, ‘আপনারা কী করে এত শিওর হচ্ছেন ম্যাম?’
‘আমরা ডেটাবেস সার্চ করিয়েছি।’
‘মে আই আস্ক, সুজান জর্ডানের ফিঙ্গারপ্রিন্ট অপরাধীদের ডেটাবেসে কীভাবে এল?’
দময়ন্তী নিজের চেয়ারে বসল, ‘গত বছর একটা মার্ডার কেসে সুজান সন্দেহভাজন ছিলেন। লালবাজার থেকে ওঁর ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেওয়া হয়েছিল।’
শিরিন বলল, ‘আপনারা কী সন্দেহ করছেন ম্যাম? সুজান জর্ডানের সঙ্গে মজন্তালীর কিছু যোগ থাকতে পারে?’
‘সম্ভবত সুজান জর্ডানের অচেতন অবস্থায় তাঁর ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহ করে অপরাধমূলক কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।’
শাক্য দ্রুত হাতে নোট নিতে নিতে বলল, ‘এটা অন-রেকর্ড বলছেন তো ম্যাম?’
‘হ্যাঁ।’
কৃতজ্ঞতার হাসি হেসে শাক্য বলল, ‘কিন্তু সুজান জর্ডানের ফিঙ্গারপ্রিন্ট ব্যবহার করে মজন্তালীর কী উপকার হতে পারে?’
‘আমাদের সময় নষ্ট করানো যাবে। তদন্তকে বিপথগামী করা যাবে। মানুষের মনে ভুল ধারণা তৈরি করা যাবে।’
‘আপনারা কি সুজানের ঘনিষ্ঠ কাউকে সন্দেহ করছেন?’
‘সেটা এখনই ডিসক্লোজ করা সম্ভব না। এটুকু বলতে পারি, এই গল্পে কোনও সুপারন্যাচারাল এলিমেন্ট নেই। মজন্তালী সরকার চায় তাকে নিয়ে ভূতুড়ে গসিপ রটুক। সে চায় মানুষ বিশ্বাস করুক যে এসব ভূতুড়ে কাণ্ড। আমার এই বাইটটা চাইলে মোবাইল ক্যামেরায় নিয়ে রাখুন। দেখাবেন। আমরা চাই মানুষ মজন্তালী সরকারের ম্যানিপুলেশনটা বুঝুন।’
‘শিওর ম্যাম।’
‘আপনাদের মিডিয়া হাউজও কিন্তু ধীরে ধীরে এই কেসের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে।’
শাক্য ঘাবড়ে গেল, ‘একথা কেন বলছেন ম্যাম?’
‘লীনা দাশগুপ্ত মজন্তালীর চিঠি পড়তে আপনাদের চ্যানেলকেই বেছে নিচ্ছেন। মজন্তালী সরকার নিজে মেসেজ করে আপনাদের লিড দিচ্ছেন।’
‘লীনা দাশগুপ্ত তাহলে আপনাদের সন্দেহের তালিকায় রয়েছেন? তাঁর বিরুদ্ধে কোনওরকম প্রমাণ পেয়েছেন আপনারা?’
‘না। নাথিং। এতে স্বীকার-অস্বীকারের কিছুই নেই। তিনি তো বাই ডিফল্ট সন্দেহভাজন, যেহেতু তাঁর ধর্ষককেই জেলে ঢুকে খুন করার হুমকি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মে আই আস্ক, মজন্তালী সরকার আপনাদের চ্যানেলকেই কেন ফেভার করছে?’
শাক্য উত্তর হাতড়াচ্ছে দেখে শিরিন সময় নষ্ট না করে ধরতাই নিল, ‘ম্যাম, আমরা বাংলার এক নম্বর নিউজ চ্যানেল। গত এক বছর ধরে আমাদের ভিউয়ারস সবচেয়ে বেশি।’
‘দ্যাটস ইট?’
‘দ্যাটস ইট, ম্যাম। এছাড়া আমাদের ফেভার করার কী কারণ থাকতে পারে? মজন্তালীর লাইমলাইট দরকার। আর আমার সামর্থ্য থাকলে আমি বাজারের বেস্ট জিনিসটাই কিনতে চাইব। তাই না? ইটস জাস্ট সিম্পল গিভ অ্যান্ড টেক।’
‘মানে তোমরা আমাকে ফুটেজ দাও, আমি তোমাদের টিআরপি দেব। তাই তো?’ দময়ন্তীর মুখে হাসি। নির্মল হাসি। প্যাঁচ নেই।
‘এক্স্যাক্টলি ম্যাম।’ হাসল শিরিন। শাক্য দুরুদুরু বুকে দময়ন্তীর মেজাজ বোঝার চেষ্টা করছিল। সে-ও হাঁফ ছেড়ে হাসিতে যোগ দিল।
‘যে-নম্বর থেকে আপনাদের কাছে মেসেজ এসছে, সেটা আমরা ট্র্যাক করার চেষ্টা করছি। ভুয়ো নম্বর হবার চান্সই বেশি, বুঝতেই পারছেন।’ বলে দময়ন্তী চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল, ‘একটা ফ্রেন্ডলি অ্যাডভাইস। আপনাদের চ্যানেলের স্টান্স যতদূর জানি প্রো-গভর্নমেন্ট। এই কেসে কিন্তু পলিটিকাল ইন্টারভেনশন আসবে। তৈরি থাকবেন।’
.
সল্টলেক, রাত ১১টা
ডিনার সেরে উঠেই কলকাতা মেডিকেল কলেজের চিকিৎসক-অধ্যাপক প্রজ্জ্বল ঘোষের ফোন পেলেন অমিতাভ। রাজ্য পুলিশের মেডিকো-লিগাল অ্যাডভাইসারের দায়িত্ব মূলত প্রজ্জ্বলই সামলান।
‘হ্যাঁ প্রজ্জ্বলদা, রিপোর্টগুলো দেখলেন?’
‘দেখলাম। কোনও গন্ডগোল নেই। সমস্ত রিপোর্ট ডেট অনুযায়ী যেভাবে সাজানো, তাতে এ-ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই যে মহিলা মেনিঙ্গোএনসেফেলাইটিসে আক্রান্ত হয়েছেন এবং ওই রোগেই মারা গেছেন।’
‘এত নিখুঁতভাবে নকল মেডিক্যাল ডকুমেন্টস তৈরি করা কঠিন বলছেন?’
‘কঠিন কেন হবে? সত্যিকারের মেনিঙ্গোএনসেফেলাইটিসে আক্রান্ত যে-কোনও রোগীর শেষ দু-মাসের রিপোর্টের জায়গায় রোগীর নাম ইচ্ছামতো এডিট করে নিলেই হল। কিন্তু কথা হচ্ছে এত জটিল করে ভাবার দরকার আছে কি? ঐন্দ্রিলা রয় খুবই রেপুটেড ডাক্তার। তাছাড়া এটা ফলস ফ্ল্যাগ হবার প্রবল সম্ভাবনা। তুমি আশা করি বুঝতে পারছ যে এটা অসাবধানে ছেড়ে যাওয়া ফিঙ্গারপ্রিন্ট নয়। মজন্তালী সরকার ওয়ান্টস আস টু নোটিশ দ্য ফিঙ্গারপ্রিন্ট অ্যান্ড চেজ ইট।’
‘প্রজ্জ্বলদা, আমি নাইনটি নাইন পারসেন্ট শিওর এটা ফলস ফ্ল্যাগ। কিন্তু সেটাও তো কেউ তৈরি করেছে। সেখান থেকেও তো কোনও লিড পাওয়া যেতে পারে। তাই না? সেইজন্যই যেখানে যা ছাই আছে সবই উড়িয়ে দেখতে চাইছি।’
ফোনের ওপারে প্রোজ্জ্বল ঘোষ খানিকক্ষণ নিরুত্তর। বোধহয় খানিক বিরক্ত। নির্বিবাদী মানুষটা পলিটিকাল ইন্টারফেয়ারেন্স এড়িয়ে চলতেই পছন্দ করেন। কয়েক মুহূর্ত পরে তাঁর গলা পাওয়া গেল, ‘তাহলে হোয়াট নেক্সট?’
অমিতাভ বললেন, ‘লাশ লাশের জায়গায় আছে কিনা সেটা দেখে নিতে হবে।’
‘অমিতাভ, ঝামেলা হবে।’
‘তা হবে। ধরেই রাখুন আপনাকে কোর্টে সাক্ষ্য দিতে ছুটতে হবে।’
.
রবিনসন স্ট্রিট, রাত ১১টা ৩০
পরপর এতরকম ঘটনা ঘটছে, খেই রাখা যাচ্ছে না। নয়েজ বটলনেক হয়ে যাচ্ছে একেবারে। নিজেকে খানিকটা জোরজার করেই লিলি জর্ডানের ফেসবুক প্রোফাইলটা খুলে বসল দময়ন্তী।
ফেসবুকে মানুষ নিজের অজান্তেই নিজের চরিত্র বিষয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ফুটপ্রিন্ট রেখে যায়। সন্দেহভাজনদের সোশাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট চেক করা আজকাল তদন্তের একটা জরুরি অংশ। এটা অবশ্য অ্যানালিটিকস বিভাগের কাজ। সোশাল মিডিয়া সারভেল্যান্সের জন্য আলাদা সফটওয়ার হয়। তবু সবকিছু নিজে একবার না আঁচালে দময়ন্তীর শান্তি হয় না। শেষ এক সপ্তাহে লিলির কোনও পোস্ট নেই। স্বাভাবিক। তার আগে মোটামুটি রোজই কিছু-না-কিছু পোস্ট করেছে। বেশিরভাগই শেয়ারড মিম। কুকুরের ভিডিও। আমিষ জোক। উঠতি বয়েসের তেজালো সব কোটেশন। মাঝে মাঝে মায়ের সঙ্গে ছবি দিয়েছে। বেড়াতে যাবার ছবি, মিটিং বা জনসভায় মায়ের বক্তব্য রাখার ছবি। অ্যানালিটিকস থেকে জানিয়েছে, লিলি মেয়েটা ‘হ্যাপি গো লাকি’ টাইপের। মায়ের ঘটনা তাকে কিছুটা প্রতিবাদী চিন্তাভাবনার দিকে নিয়ে এসেছে। বৃহত্তর সমস্যা নিয়ে লিলির তেমন মাথাব্যথা নেই। দেখে মনে হচ্ছে তা-ই ঠিক।
ফিঙ্গারপ্রিন্টের কেসটা ক্লিয়ার ফলস ফ্ল্যাগ। না-হলে মজন্তালী নিজে কেন প্রেসের কাছে কথাটা পৌঁছে দেবে? তবে অমিতাভ স্যারের কথাটাও সত্যি। ফলস ফ্ল্যাগ দিলে সেটা তো অ্যারেঞ্জ করতে হয়েছে। সেখানে ক্লু পাওয়া যেতেই পারে। স্যার আবার গোঁ ধরেছেন, সুজানের মৃত্যুর ব্যাপারটা শিওর হবেন।
দময়ন্তী এই ব্যাপারে তাঁর সঙ্গে সহমত নয়। মৃত্যুর পর শেষ এক ঘণ্টায় কাজটা হয়েছে এবং সেটা হয়ে থাকলে সন্দেহের তির ঘুরে যায় তাঁদের দিকে, যাঁরা সেদিন সুজানের শেষ মুহূর্তে হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন। লিলি জর্ডান, বেঞ্জামিন জর্ডান, উপাসনা আচার্য এবং বিবস্বান দত্ত। অপরাধী হাসপাতালের স্টাফেদের মধ্যেও আত্মগোপন করে থাকতে পারে। ডক্টর ঐন্দ্রিলা রয়কেও চোখ বুজে ক্লিনচিট দেওয়া যাচ্ছে না। অন্তত জনাদশেক লোক সন্দেহের আওতায় চলে আসছে। বৃত্ত ছোট হবার বদলে বড় হয়ে চলেছে ক্রমশ।
এই ফলস ফ্ল্যাগটা যে-দুটো উদ্দেশে তৈরি করা, দুটোই তুমুল সফল। আজ সন্ধে থেকে সব নিউজ চ্যানেলে একই কেত্তন বাজছে। কাল সব পেপারের হেডলাইন বা সফট লিডে এই খবরটাই যাবে। সুজান জর্ডান আর মজন্তালী সরকার মিলিয়েমিশিয়ে দুর্দান্ত ঘ্যাঁট রান্না হয়ে গেছে। তাতে নানা বিচিত্র ফোড়ন পড়ছে। কোন এক তান্ত্রিক সাধক নাকি মজন্তালীকে মা কালীর অবতার বলে ঘোষণা করে দিয়েছেন। ক্যাটওম্যান বিলক্ষণ জানে যে এই ভূতুড়ে আখ্যানে বিস্তর ছ্যাঁদা। এই দিয়ে সিআইডি-কে বেশিদিন ডিসট্র্যাক্ট করা যাবে না। কিন্তু এ-ও জানে যে, ম্যাঙ্গোজনতা এই অলৌকিক গালগল্প চেটেপুটে খাবে। বিশেষত, যে অলৌকিক গল্পের সঙ্গে বঞ্চিত-লাঞ্ছিতের ‘জাস্টিস’ পাবার প্রসঙ্গ জড়িয়ে থাকে, তার বাজারদরই আলাদা। এ-হচ্ছে উচ্চমানের একটা ইমোশনাল হ্যাক।
মজন্তালী সরকার যে-ই হোক, সে চাইছে তাকে নিয়ে অলৌকিক গালগল্প রটুক। আসল সত্যকে ঘিরে জমে উঠুক রটনার উইঢিবি। কেসটা ক্রমশ শিবপুর বোটানিক্যাল গার্ডেনের সেই বিখ্যাত বটগাছের মতো হয়ে উঠছে। অজস্র ঝুরি। কোনটা আসল কাণ্ড, কোনটা আসল শিকড় সেটা বলা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াল দময়ন্তী। রঞ্জনের কথা মনে পড়ছে। রঞ্জন যখন লিখত, ধারেকাছে যাওয়া যেত না। গেলেই মেজাজ হারাত। বলত, লেখার সময় লেখক নগ্ন থাকেন। তাঁকে দেখতে নেই। বিরক্ত করতে নেই। ডিডাকশনের সময় গোয়েন্দাও কি নগ্ন থাকেন? না বোধহয়। দময়ন্তী ভেবে দেখেছে ডিডাকশনকে ঠিক সৃষ্টি বলা যায় না। ডিটেকশনের মতো ডিডাকশনও নিঃসন্দেহে একটি নির্মাণ। খুবই কম্পোজিট ধরনের, কিন্তু নিয়মতান্ত্রিক একটি নির্মাণ। তবে ভালো গোয়েন্দার কল্পনার দৌড় থাকা চাই। এই গুণটিকে গোয়েন্দাপ্রবর হোমস নিজে খুবই গুরুত্ব দিতেন। উর্বর কল্পনাশক্তি না থাকলে ‘ফ্যাক্ট’-এর বহুস্তর বল্কল খুলে প্রকৃত ‘ট্রুথ’-টির পাঠোদ্ধার করা যায় না। তদন্তকে কে-যেন তুলনা করেছিলেন প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজের সঙ্গে। খুঁড়ে খুঁড়ে তুলে আনতে হয় মাটিচাপা সত্য। এই কেসে ঠিকঠাক খোঁড়াখুঁড়ির কাজটা সিআইডি কি আদৌ শুরু করে উঠতে পেরেছে? নাকি কানাভুলো ভূতের মতো কেবলই পথ গুলিয়ে দিচ্ছেন শ্রীমতী সরকার?
.
