একাদশ দিন
তারিখ : ১২ আগস্ট, ২০১৩
নিয়োগীপাড়া, সোনারপুর, সকাল ১০টা ১০
চিঠিতে লেখা আছে—‘সেলিম মল্লিক যেখানেই থাকুক, সেপ্টেম্বর মাস দেখতে পাবে না। কথা দিচ্ছি। কথা দাও তুমি হেরে যাবে না।—মজন্তালী সরকার।’
দময়ন্তী চিঠিটা তানিয়ার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে তিয়াসাকে প্রশ্ন করল, ‘কবে এসেছে চিঠিটা?’
‘তিনদিন আগে।’
‘পুলিশকে চিঠির ব্যাপারটা জানানোর কথা মনে হয়নি?’
তিয়াসার মুখের একটা পাশ সম্পূর্ণ ঝলসে চামড়া দুমড়ে মুচড়ে গেছে। মাড়ি বেরিয়ে বীভৎস দেখাচ্ছে। ঠোঁট টেনে হাসার চেষ্টা করল মেয়েটা, ‘না। সাত-আট মাস তো পুলিশের ওপর ভরসা করে দেখলাম। এর মধ্যে প্রায়ই ছেলেটা আমাকে ফেসবুকে মেসেজ করে হুমকিও দিয়ে গেছে। পুলিশ কোনও কিনারা করতে পারেনি। উল্টে আমাকে অপমান করেছে নানাভাবে। কেন ভরসা করব পুলিশের ওপর?’
দেওয়ালে তিয়াসার আগের ছবি। হাসিমুখ। একেবারে তপ্তকাঞ্চনবর্ণা যাকে বলে। পটে-আঁকা চোখ। ধনুকের মতো ঊর্ধ্বঠোঁট। সব মিলিয়ে অসাধারণ সুন্দরী। দময়ন্তীর চোখ বারবার সেইদিকেই চলে যাচ্ছে আর ভয়ানক একটা অস্বস্তি হচ্ছে। তিয়াসা কি ইচ্ছে করেই ওই ছবির পোশাকটাই পরেছে আজ? দময়ন্তী বলল, ‘চিঠিটার কথা পুলিশকে না-জানানোর ফলে একটু সমস্যাই হল তিয়াসা। তোমাকে একটু উটকো ঝামেলা পোহাতে হবে। কারণ সেলিম মণ্ডলের ওপর গতকালের অ্যাটাকের পর মজন্তালী সরকারের কেসে তুমিও একজন সাসপেক্ট হয়ে পড়লে।’
‘তা হলাম,’ মাথা নাড়ল তিয়াসা, ‘কিন্তু যা নরকযন্ত্রণা ভোগ করছি, তার তুলনায় কতই বা সমস্যা বাড়বে! আমি জানতাম সেলিম মণ্ডল মরলে আপনারা অবশ্যই আসবেন। ভেবেছিলাম, তখনই একেবারে এটা দেখাব। তবে এত তাড়াতাড়ি যে আপনাদের আসতে হবে সেটা স্বপ্নেও ভাবিনি।’
তানিয়া বলল, ‘তিয়াসা, ছেলেটা কিন্তু মরেনি। হি ইজ আউট অব ডেঞ্জার নাও। বাট ডোন্ট ওরি, আমরা হাসপাতালে টাইট সিকিউরিটি রেখেছি। ও পালাতে পারবে না। এবার তুমি সুবিচার পাবে।’
‘আপনাদের অত ঝামেলায় যেতে হবে না ম্যাম,’ তিয়াসা মৃদু হাসল, ‘কারণ ও মরবে।’
.
সুপ্রিম হসপিটাল, কলকাতা, সকাল ১০টা ২৫
ডক্টর বোস যতক্ষণে খবর পেয়ে ছুটে এলেন, ততক্ষণে সেলিমের দেহ নিথর হয়ে গেছে। ম্যাসাজে সাড়া দিচ্ছে না। প্রাণপণে ম্যাসাজ করতে করতে ডক্টর বোস বললেন, ‘ডিফাইব্রিলেটর দাও! ফাস্ট!’
জেল মাখিয়ে সেলিমের বুকে ডিফাইব্রিলেটরের মুখ দুটো ছোঁয়াতে প্রচণ্ড ঝটকা খেয়ে লাফিয়ে উঠল দেহটা। একবার। দু’বার। তিনবার। চারবার। ডক্টর বোস বারবার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কিন্তু মনিটরে কোনও হার্টবিট ধরা পড়ছে না।
‘শিট! কী করে হল এরকম?’ ডক্টর বোস আয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘সব তো ঠিকঠাকই ছিল!’
আয়া বিপন্ন গলায় বলল, ‘সকালের খাবারটাও তো খেল। ওষুধ আনতে গেছিলাম। এসেই দেখি কোনও সাড়া দিচ্ছে না।’
‘ও গড!’ ডাক্তার ডিফাইব্রিলেটরে জেল লাগালেন আবার।
কনস্টেবল দুজন পাংশু মুখে দাঁড়িয়ে। তারা দু-দিন ধরে ফার্স্ট শিফটের ডিউটিতে আছে। সকাল আটটা থেকে রাত আটটা। ওপর থেকে বলা ছিল, সেলিম পালানোর চেষ্টা করবে। তাই তারা সাংবাদিকদের ঢুকতে দিচ্ছে না। সেলিমের বাড়ির লোক যখন দেখতে আসছে, তখনও সার্চ না করে ঢুকতে দিচ্ছে না। কিন্তু এ-ব্যাটা যে সুইসাইড করে বসবে তা কে জানত!
টানা বেশ কয়েকবার চেষ্টা করে ডক্টর বোস নার্সের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়লেন। মনিটরে রেখাচিত্র একেবারে সরলরেখা।
খবর ছড়িয়ে পড়েছে। ভিড় জমতে শুরু করেছে কেবিনে। অন্যান্য ডাক্তাররা ছুটে আসছেন। এমন সময় কনস্টেবল সুজয় দাসের ফোন বেজে উঠল।
আশ্চর্য টাইমিং। সিনেমায় যেমন হয়।
ফোনের সবুজ বোতাম টিপে কানে দিয়ে বিমূঢ় গলায় সুজয় বলল, ‘হ্যালো ম্যাডাম!’
‘সুজয়, বি অ্যালার্ট! সেলিম মণ্ডলের ওপর মার্ডার অ্যাটেম্পট হবার হাই চান্স!’
সুজয়ের কথা আটকে গেল।
ফোনের ওপার থেকে দময়ন্তী চেঁচিয়ে যাচ্ছে, ‘শুনতে পাচ্ছ? হ্যালো! আরও লোক লাগবে ওখানে। লোক পাঠাচ্ছি। তোমরা অ্যালার্ট থাকো!’
.
সুপ্রিম হসপিটাল, কলকাতা, দুপুর ১২টা ৪৫
তিয়াসা তানিয়াকে বলেছিল, সেলিম মণ্ডল মরবে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, ঠিক সকাল ১০ টা ২৮ মিনিটে সেলিম এক্সপায়ার করেছে। মৃত্যুর কারণ হার্ট ফেইলিওর। বডি পোস্টমর্টেমে গেছে। পিএম রিপোর্ট আসার আগে কিছুই বলা যাচ্ছে না।
সেলিমের কেবিনের দায়িত্বে যে আয়া ছিল, তাকে জেরা করা শেষ করে বাইরে এসে অমিতাভ বললেন, ‘ইটস ভেরি সিলি অব আস, রাহুল। আমরা ভাবছিল সেলিম মণ্ডল পালাতে পারে। উল্টোটা মাথায় আসেনি একবারও। বোঝা উচিত ছিল, মজন্তালী এসে বাকি কাজটুকু সেরে যেতে পারে।’
রাহুল জবাব দিল না। চিন্তিত মুখে মাথা নাড়ল শুধু।
হসপিটাল লাউঞ্জের এন্ট্রান্সে পুলিশ ব্যারিকেড করে দিয়েছে। দশ-বারো মিটার জায়গার মধ্যেই কোনওমতে জায়গা করে নিয়ে বিভিন্ন নিউজ চ্যানেলগুলো লাইভ যাচ্ছে। সেদিকে তাকিয়ে অমিতাভ সিগারেট ধরালেন। বললেন, ‘একটা জিনিস আমাদের নজর এড়িয়ে যাচ্ছে। কাফেটা কিন্তু জর্ডানদের বাড়ি থেকে হাঁটা পথে মিনিট দশেক।’
রাহুল বলল, ‘কিন্তু ওরা টুয়েন্টি ফোর ইন্টু সেভেন আন্ডার সারভেলান্স, স্যার। নো ফিশি বিজনেস।’
‘লিলি আর বেঞ্জামিন দুজনেই বাড়িতে ছিল?’
‘হ্যাঁ। ইনফ্যাক্ট প্রায় সারাদিনই দুজন বাড়িতে ছিলেন। সকালে বেঞ্জামিন বাজারে গেছিলেন। মিনিট চল্লিশের মধ্যে ফিরে আসেন। তারপর সারাদিন বেঞ্জামিন বা লিলি কেউই বেরোননি। কেউ আসেওনি। পরে সন্ধে ৬টা নাগাদ ওদের সঙ্গে কথা বলতে গেছিলেন লাইভ নিউজের দুজন রিপোর্টার। আগে থেকে তাঁদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া ছিল।’
‘যারা ওই কাফেতেও ছিলেন?’
‘হ্যাঁ।’
‘ভালো কথা মনে করিয়েছ। ওঁদের সঙ্গে একবার কথা বলতে হবে, বুঝলে?’
‘এখনই বলতে পারেন,’ রাহুল চাপা গলায় বলল, ‘ওই দিকে দেখুন। গাছের তলায়।’
অমিতাভ সৌমিলি আর শিরিনকে দেখতে পেলেন। গুজগুজ করছে।
‘এঁদের ভূমিকাটাও সন্দেহের ঊর্ধ্বে নয়। লীনা, সুচেতা দুজনেই এঁদের কাছে গেছে। মজন্তালী সরকার এঁদেরই মেসেজ পাঠিয়েছে। আবার সেলিম মণ্ডলের অ্যাটাকের সময় এঁরাই অকুস্থলে। বড্ড বেশি কো-ইন্সিডেন্স হচ্ছে না?’
‘তা হচ্ছে।’
‘তবে আরেকটা পয়েন্ট। এঁরা লোকাল পুলিশকে বলেছেন, সেলিম মণ্ডলের সঙ্গে থাকা মেয়েটার আচরণ সন্দেহজনক ছিল।’
‘সন্দেহজনক ছিল মানে?’
‘চলো, ডিটেলে কথা বলে আসি একবার।’
অমিতাভদের এগিয়ে আসতে দেখে তটস্থ হল সৌমিলিরা।
অমিতাভ বললেন, ‘আপনারা লাইভ নিউজ তো?’
সৌমিলি বলল, ‘হ্যাঁ স্যার।’
‘একটু কথা বলা যায়?’
‘শিওর।’
‘কাল সেলিম মণ্ডলের ওপর যখন হামলা হয়, আপনারা স্পটেই ছিলেন শুনলাম। ঘটনাটা আপনাদের মুখ থেকে শুনতে চাই।’
সৌমিলি আর শিরিন দৃষ্টি বিনিময় করল। শিরিন একটা ছোট্ট ‘নড’ করল। অর্থাৎ, ও সামলে নিচ্ছে। তারপর বলতে শুরু করল, ‘কাল বিকেল ৫টা থেকে মিঃ বেঞ্জামিন জর্ডানের সঙ্গে আমাদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া ছিল। আমরা চল্লিশ মিনিট আগে পৌঁছে গেছিলাম। তাই একটু সময় কাটাতে এই রেস্তোরাঁয় গিয়ে বসেছিলাম। দুজনে দুটো কফি নিয়ে গল্প করছিলাম। আমাদের ডানদিকে কোণের টেবিলে সেলিম আমাদের আসার আগে থেকেই বসেছিল।’
‘রেস্তোরাঁর কর্মীরা জানিয়েছেন, ওর সঙ্গে কমবয়সি একটি মেয়ে ছিল?’
‘হ্যাঁ স্যার।’
‘আপনাদের কি মেয়েটিকে খেয়াল আছে? বা ওদের দেখে বডি ল্যাঙ্গোয়েজে মনে হচ্ছিল সম্পর্কটা রোমান্টিক?’
‘সেভাবে তো খেয়াল করিনি। এক ঝলক দেখে মনে হচ্ছিল ডেট। কিন্তু খুব নিশ্চিত হয়ে বলতে পারব না।’
‘স্বাভাবিক। আচ্ছা, আততায়ী যখন ঢুকল, সেই ঘটনাটা বলুন।’
‘কালো সালোয়ার কামিজ। চোখে সানগ্লাস। মুখ রুমালে ঢাকা। দরজা ঠেলে ঢুকে সোজা শ্যুট করল।’
‘পুলিশের কাছে শুনলাম, আপনারা জানিয়েছেন, সেলিমের সঙ্গে থাকা মেয়েটার আচরণ সন্দেহজনক ছিল। একটু খুলে বলবেন বিষয়টা?’
‘আমার যতদূর মনে পড়ছে, শ্যুট আউটের পর প্রথম যে কাস্টমারটি উঠে ঊর্ধ্বশ্বাসে পালিয়েছিল, সে ওই মেয়েটি। খটকার কারণ, এক, এরকম একটা ঘটনা ঘটলে শক কাটতেই মিনিমাম কয়েক মুহূর্ত বেরিয়ে যায়। মেয়েটার পালানোটা আমার অত্যন্ত তাড়াতাড়ি বলে মনে হচ্ছিল। আর দুই, আমার বন্ধুর গুলি লাগলে আমি একবারও তাকে অ্যাটেন্ড না-করে দৌড়ে পালাব? যদি ধরেও নিই, ওরা বন্ধু নয়, ব্লাইন্ড ডেট, তবু, সঙ্গে সঙ্গে উঠে পালানোটা কোয়াইট আনন্যাচারাল। আমি হয়তো ঠিক বোঝাতে পারছি না স্যার। কিন্তু আমার বেশ খটকা লাগছে। আমার মনে হচ্ছে, কেউ পুরো পরিস্থিতিটার জন্য তৈরি না-থাকলে এমন হওয়া অস্বাভাবিক।’
শুনতে শুনতে অমিতাভ ক্রমশ গম্ভীর হয়ে যাচ্ছিলেন, ‘আপনি কি বলতে চাইছেন মেয়েটা সামহাউ মজন্তালীর অ্যালাই?’
‘মে বি।’
রাহুল বলল, ‘সেক্ষেত্রে কি এমন হতে পারে স্যার, যে সেলিমকে প্ল্যান করে এখানে আনা হয়েছিল?’
অমিতাভ চিন্তিত মুখে বললেন, ‘সেলিমের কল হিস্ট্রি চেক করাও। আমি সেন্ট্রাল জেল ঘুরে অফিস ফিরছি।’
.
আলিপুর সেন্ট্রাল কারেকশনাল হোম, দুপুর ১টা ৩৫
অমিতাভরা পাঁচ মিনিট লেট করে ঢুকেছিলেন। কারেকশনালের সুপারিনটেনডেন্ট ঢুকলেন আরও দশ মিনিট লেট করে। এসেই অমিতাভদের দেখে ভ্যাবলামতো হাসলেন, ‘লাঞ্চ করছিলাম স্যার। একটু লেট হয়ে গেল। মাপ করবেন।’
‘আপনি বিপ্লব নাইয়া?’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ,’ সুপারিনটেনডেন্ট হাত জোড় করলেন, ‘চা-কফি-কোল্ড ড্রিঙ্ক কিছু বলি?’
‘না না। আমরা লাঞ্চ করেই এসেছি। চলুন শুরু করি।’
‘ডিআইজি সাহেব তো এখনও…।’
‘আপনার ডিআইজি সাহেবের সঙ্গে একটু আগেই আমার কথা হল। তাঁর আরও অন্তত মিনিট পনেরো-কুড়ি লাগবে। চলুন আমরা টুকটুক করে দেখতে শুরু করি।’
বিপ্লব নাইয়াকে সামান্য বিচলিত দেখাল। ডিআইজি-র অনুপস্থিতিতে নানারকম প্রশ্নের উত্তর তাঁকেই দিতে হবে, এই ভেবেই সম্ভবত তিনি অস্বস্তিতে। শুকনো মুখে বললেন, ‘আসুন তবে।’
শতাব্দী প্রাচীন বিল্ডিং। বহু ঐতিহ্যের সাক্ষী এই জেলবাড়ি আর থাকবে না। হিডকো জমি নিয়ে নিচ্ছে। এখানে জেল মিউজিয়াম হবে। সম্ভবত পরের বছর থেকেই আস্তে আস্তে খালি করার কাজ শুরু হবে। বছর ছয়েকের মধ্যে পুরো ফাঁকা করার কথা। বন্দিদের বারুইপুর আর প্রেসিডেন্সি জেলে শিফট করানো হবে। একটা ইতিহাসের অবসান।
গেস্টরুমের বাইরে এসে বিপ্লব নাইয়া বললেন, ‘এক নম্বর ওয়ার্ড থেকেই ভিজিট শুরু করা যাক, নাকি স্যার?’
‘আগে বাউন্ডারি বরাবর পুরোটা একটা রাউন্ড দিই চলুন।’
‘চলুন।’
অমিতাভ আর দময়ন্তী এগোল। আগে আগে গাইড করে চলেছেন বিপ্লববাবু। অমিতাভ বললেন, ‘বিপ্লববাবু, এখানে টোটাল বন্দি এখন আঠেরোশো মতো। তাই তো?’
‘সতেরোশো তেতাল্লিশ স্যার।’
‘আর গার্ড কজন?’
‘একশো উনপঞ্চাশ।’
‘মানে হিসেব করলে প্রায় অর্ধেক শর্ট।’
‘হ্যাঁ স্যার,’ বিপ্লববাবু বললেন, ‘লোক রিটায়ার করে যাচ্ছে, কিন্তু নতুন লোক রিক্রুট হচ্ছে খুব কম। একসঙ্গে পাহারা দেয় পঞ্চাশ জন। একেকজন গার্ড আগে রাতে দু’ঘণ্টা করে পাহারা দিত। তারপর ডিউটি চেঞ্জ হত। তাতে কর্মীরাও রাতে একটু অবসর নেওয়ার সুযোগ পেতেন। এখন রাত দশটা থেকে টানা সকাল ছ’টা অবধি ডিউটি দিতে হয়। কী অবস্থা বুঝতেই পারছেন। গার্ডরাও তো মানুষ।’
‘সে তো ঠিকই। কিন্তু গার্ডদের সাহায্যে নাকি মোবাইল সিম থেকে শুরু করে বিড়ি-সিগারেট এমনকী মদ, গাঁজা, ড্রাগসের ব্যবসা জমে উঠেছে?’ অমিতাভ ঠোঁট টিপে হাসলেন, ‘বন্দিরা আসতেই নাকি রেট চার্ট পেয়ে যায়? পয়সা ফেললেই ছুরি কাঁচি ব্লেড সবই পাওয়া যাচ্ছে। মার্চে ওইসব দিয়ে গরাদ কেটে তিনজন পালাল। কী চলছে আপনার জেলে, সুপারিনটেনডেন্ট সাহেব?’
বিপ্লব নাইয়ার কপালে ঘাম জমেছে, ‘আমরা বিভিন্ন ওয়ার্ডে প্রায়ই সারপ্রাইজ সার্চ করছি। তাতে কাজও দিচ্ছে। আসলে কিছু কিছু গার্ডের মদত রয়েছে। না তাদের ধরা যাচ্ছে, না ব্যাপারগুলো আটকানো যাচ্ছে। ফর সেফটি আমরা গার্ডদের ডিউটিও ঘন ঘন রিশিডিউল করছি। খবরের কাগজে তো একটু বাড়িয়েই লেখে স্যার।’
দময়ন্তী বলল, ‘আমাদের খবরের কাগজ পড়ে জানতে হয় না সুপারিনটেনডেন্ট সাহেব। আমরা এই ফ্র্যাটারনিটিরই লোক।’
‘আমি তা বলিনি ম্যাডাম,’ দু-হাত বুকের কাছে তুললেন বিপ্লববাবু, ‘আমি বলছি, লিমিটেড ম্যানপাওয়ার নিয়েও আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছি।’
অমিতাভর কান সুপারিনটেনডেন্টের দিকে ছিল না। তিনি সেফটি ওয়ালগুলো খুঁটিয়ে দেখছিলেন। পাঁচিলের কাঁটাতারের বেড়া অনেক জায়গাতেই খুলে খুলে এসেছে। সম্ভবত জং লেগে গেছে। সারানো হয়নি সেগুলো। চেষ্টা করলে এই পাঁচিল টপকে যাওয়া কঠিন কিছু না। বিশেষত, পাঁচ আর ছয় নম্বর টাওয়ারের মাঝে পাঁচিলের যে-অংশটা, সেখানে একটা জায়গায় কাঁটাতার অনেকটা ঝুলে আছে।
‘এই সিসি ক্যামেরাগুলো অ্যাকটিভ? দেখে তো মনে হচ্ছে না। ধুলো জমে গেছে।’
‘না স্যার, ওগুলো সারাতে হবে। রিকুইজিশন দেওয়া আছে।’
‘কবে থেকে খারাপ?’
‘কোনওটা ছ-মাস, কোনওটা এক বছর।’
‘সব মিলিয়ে এখানে মোট ক’টা ক্যামেরা আর তার মধ্যে ক’টা অ্যাকটিভ আছে, আমাকে রিপোর্ট দেবেন।’
ঘাড় নাড়লেন বিপ্লব নাইয়া। তাঁর মুখে অস্বস্তির ছাপ বাড়ছে। ঘড়ি দেখছেন ঘন ঘন। ডিআইজি সাহেব এসে কখন বাঁচাবেন, সেই আশায় আছেন মনে হয়।
দময়ন্তী বলল, ‘এই ক্যামেরাগুলো এমনিও তেমন ভালো কোয়ালিটির না। রাতের ফুটেজ স্পষ্ট দেখা যায়?’
‘না। স্পষ্ট বোঝা যায় না।’
‘আরও ভালো কোয়ালিটির দামি ক্যামেরা আনাতে হবে। তাছাড়া পাঁচিলের ধার ঘেঁষে সিসি ক্যামেরা দরকার। শুনেছি বাইরে থেকে কাপড়ে মুড়ে নানারকম জিনিস ভিতরে ছুড়ে দেয়।’
বিপ্লব নাইয়া তোম্বা মুখ করে বললেন, ‘আমি হুকুমের চাকর। আপনারা আপনাদের রিপোর্টে লিখে দেবেন কী কী দরকার। আমি লিখলে ফান্ড স্যাংশন হতে বছর গড়িয়ে যায়।’
দূরে একটা শোরগোল শুনে মুখ ফেরাল দময়ন্তী। ডিআইজি আলিপুর কারেকশনাল সুব্রত সরকারকে দেখা গেল হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে আসছেন। সঙ্গে দুজন গার্ড। কাছে এসে সুব্রত সরকার বললেন, ‘সরি অমিতাভ, আসতে একটু দেরি হয়ে গেল।’
‘একটু? আধ ঘণ্টা লেট,’ অমিতাভ মৃদু গলায় বললেন, ‘তোর অবস্থা জেলের মতোই!’
‘জানি জানি, প্রচুর প্রশ্নবাণে বিদ্ধ করবি,’ সুব্রতবাবু মুচকি হাসলেন, ‘তবে এখন তো ভবানী ভবনেও ঢুকে লোকে সিনেমা দেখিয়ে যাচ্ছে। শুধু কারেকশনালকে ঠুকলে তো শুনব না ভাই!’
দময়ন্তী আড়চোখে চেয়ে দেখল অমিতাভর মুখটা লালচে হয়ে গেছে। সুব্রত সরকার অবশ্য সেটা খেয়াল করেননি। তিনি অমিতাভর কাঁধে একটা চাপড় মেরে বললেন, ‘শোন, আইজি সাউথ আজ সকালেই ডিজির সঙ্গে কথা বলেছেন। ডিজি অ্যাশিওর করেছেন, বড় ফান্ড আসছে। তুই অ্যাজ সুন অ্যাজ পসিবল একটা রিপোর্ট বানিয়ে দে। আমরা খরচের এস্টিমেশন রেডি করে পাঠিয়ে দিচ্ছি।’
অমিতাভ বিরক্ত গলায় বললেন, ‘সবচেয়ে আগে লোক লাগবে সুব্রত। তার কী হবে? অন্য জায়গা থেকে স্টাফ বদলি করে হবে না। সব কারেকশনালেই সিভিয়ার আন্ডারস্টাফ। এদিকের মাটি ওদিকে ফেলে কাঁহাতক কাজ চলে? নাকি তোরা ভাবছিস একেবারে বারোই সেপ্টেম্বর বিশাল পুলিশ পোস্টিং দিয়ে নাশকতা আটকে দিবি?’
.
পাটুলি, কলকাতা, দুপুর ৩টে
‘ভচাই। ভালো নাম গৌতম নস্কর। আজই ফিরেছে। বিকেলে ৫টা নাগাদ উল্টোডাঙার বাসন্তী কলোনিতে রবিদার চায়ের দোকানে খোঁজ করবেন।’
রাহুল ঘড়ি দেখল। ঘণ্টাদুয়েক সময় আছে। অফিসে ঢুকে তারপর যাওয়া যাবে। বলল, ‘কনফার্ম?’
‘হানড্রেড পারসেন্ট স্যার। কিচ্ছু পুছতাছ করার দরকার নেই। সিধা তুলে নেবেন।’
রাহুল ওয়ালেট থেকে পাঁচশো টাকার চারটে নোট বের করে গুঁজে দিল মন্টুর হাতে। মন্টু দেঁতো হেসে হাত মুঠো করে মাথায় ঠেকিয়ে বলল, ‘আরেকটা কথা স্যার। এরকম হিরোর মতো লুক দিয়ে যাবেন না কিন্তু। খবর হয়ে যাবে।’
‘থ্যাঙ্কিউ। যা, কাট এবার।’
.
ভবানী ভবন, দুপুর ৩টে ৩০
লোকনাথ একটা রোল করা কাগজ অমিতাভর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘একটা নম্বর সেলিমের কললিস্টে গত দশ দিন ধরে কনস্ট্যান্ট। রোজ দু-তিন ঘণ্টা করে কথা বলেছে। নম্বরটা রেণুকা মিশ্রার নামে। গতকাল বিকেল ৫টা থেকে সুইচড অফ। লাস্ট লোকেশন বেহালা।’
‘তার মানে টোপ ফেলে দশ দিন ধরে খেলিয়ে ছিপে তুলেছে, তারপর নিয়ে এসে মেরেছে?’ অমিতাভর গলায় অবিশ্বাস।
‘তাই তো দাঁড়াচ্ছে।’
‘রেণুকা মিশ্রার ছবি বের করে কনফার্ম করাও কাফের কর্মীদের দিয়ে। ভোটার কার্ডের ছবি দিয়ে আইডেন্টিফাই করা কঠিন। তবু দ্যাখো। আর হসপিটালের সিসিটিভি ফুটেজ কখন পাব?’
‘পেয়ে গেছি। জয়ন্তবাবুকে হ্যান্ড ওভার করে দিয়েছি অলরেডি।’
‘লাভ কী? ঘরে সিসি ক্যামেরা থাকলে একটা কথা ছিল না-হয়।’ বলল দময়ন্তী।
অমিতাভ গোমড়া মুখে বললেন, ‘পোস্টমর্টেম রিপোর্টটা এলে একটা দিশা পাওয়া যাবে।’
তানিয়া নিজের ডেস্ক ছেড়ে উঠে এল অমিতাভদের ডেস্কে। একটা কাগজ বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘তিয়াসার ফ্যামিলি ট্রি-টা করে ফেলেছি স্যার।’
‘ব্যাকগ্রাউন্ড চেক কমপ্লিট?’
‘মোস্টলি। যাঁদের সন্দেহ করা যায়, লাল কালি দিয়ে আন্ডারলাইন করেছি।’
‘গুড।’ অমিতাভ চশমা এঁটে কাগজটায় মনোনিবেশ করতে যাচ্ছিলেন এমন সময় সশব্দে দরজা ঠেলে রাহুল ঘরে ঢুকল। বলল, ‘বারুইপুর মার্ডারের একটা লিড পেয়েছি স্যার। যুবনেতা ঝন্টুর কেসটা।’
উত্তেজনায় চেয়ারের হাতল খামচে ধরলেন অমিতাভ। দময়ন্তী আর তানিয়াও।
রাহুল একটু দম নিয়ে বলল, ‘ঝন্টুর এক চ্যালা ফেরার ছিল না? ভচাই। সে আজ কলকাতায় ফিরেছে।’
দময়ন্তী দেখল, অমিতাভর চোয়াল শক্ত। চোখে আগের উদ্দীপনা ফিরে এসেছে। উত্তেজনায় দময়ন্তীও অজান্তেই কখন দুটো হাত মুঠি পাকিয়ে বসেছিল। রাহুলকে বলল, ‘কজনের ফোর্স নিবি?’
রাহুল বলল, ‘লোকনাথদা আর সুকুমারদাকে নিয়ে যাচ্ছি। সঙ্গে দুজন কন্সটেবল পেলেই হবে। সুজিতদা আর কাকলিদিকে নিয়ে নিচ্ছি?’
অমিতাভ সম্মতি জানালেন, ‘গুড লাক।’
দময়ন্তী বলল, ‘আমি যাব?’
‘দরকার নেই। ফেতি মস্তান। সামলে নেব।’ বলে রাহুল বেরিয়ে গেল।
অমিতাভ চুপ করে বসে আছেন। কপালের একাধিক শিরা জেগে উঠেছে। দেখে বোঝা যাচ্ছে এইটুকু বাতাসের জন্য তিনি কতটা হাপিত্যেশ করে বসে ছিলেন। এখান থেকে কতটা কী হবে কে জানে, কিন্তু একটা অ্যারেস্টও এখন অনেকটা অক্সিজেন জোগাবে। দময়ন্তী নিচু গলায় বলল, ‘পথ খুলছে স্যার।’
অমিতাভ মোহাচ্ছন্নের মতো তাকালেন। যেন গভীর ঘোর থেকে উঠে এলেন এইমাত্র। বিড়বিড় করে বললেন, ‘মাচ নিডেড ব্রেকথ্রু দময়ন্তী, মাচ নিডেড ব্রেকথ্রু।’
.
উল্টোডাঙা, সন্ধে ৬টা ৩০
চা-টা পুরো পায়েস। ঠোঁট দিয়েই মুখটা বিচ্ছিরি হয়ে গেল। কিন্তু ফেলা ঠিক হবে না। তা হলে নজরে পড়ে যাবে। চোখ-কান বুঝে বড় বড় চুমুক মারল রাহুল।
মন্টু হালকা ছদ্মবেশ নিতে বলেছিল। রাহুল একটা সস্তার বুশ শার্ট আর ঢোলা ট্রাউজার পরেছে, সকালে দাড়ি কামায়নি এবং চুলটা সামান্য উসকোখুসকো করে রেখেছে।
দোকানটা ছোটর মধ্যে বেশ পরিপাটি। টিপিক্যাল চায়ের দোকানের পরিবেশ। একপাশে কিছু প্রৌঢ় ও বয়স্ক লোকজন খোশগল্প করছে। ওদিকে দুধ জ্বাল দেবার গন্ধ উঠছে, এদিকে বড় ডাবু হাতায় তেল ছেঁকে শিঙাড়া নামছে। তার সঙ্গে আবার সদ্য নামানো ঘুগনির সুবাস। সব মিলেমিশে বাতাসে দুর্দান্ত একটা ককটেল তৈরি হয়েছে। এরকম গন্ধে যার মন উদাস হয় না সে অবশ্যই কসাই কিংবা শেয়ারের দালাল, নিদেনপক্ষে আইজি অনিমেষ ভদ্র। যাই হোক, উদাস হবার সময় এটা নয়।
রাহুল নিজের মুদ্রাদোষে মন দিল। এসব ক্যামোফ্লাজে কিছু একটা মুদ্রাদোষ খুব কাজে লাগে। রাহুল বেছে নিয়েছে গাল চুলকানো। দোকানের দেওয়ালে রাজত্ব করছে ডাঃ বি. কে. লোধের যৌনশক্তিবর্ধক চিকিৎসার তিন-রঙা বিজ্ঞাপন। তার নীচ থেকে কোনওমতে উঁকি মারছে দশ দিনে ভুঁড়ি কমানোর প্রতিশ্রুতি। এক পাশে রাজ চক্রবর্তীর সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত ‘বিপ্লব’ ছবির পোস্টার। বরুণ বিশ্বাসকে নিয়ে সিনেমা। হালকা স্টাবলে পরমব্রতকে মানিয়েছে ভালো। শাশ্বত পুলিশ। পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে কোন রোল দেওয়া হয়েছে বোঝা যাচ্ছে না। গল্প পাল্টেপুল্টে দেবে নির্ঘাত। তবু মেনস্ট্রিম মিডিয়া যে বরুণকে ‘সাবজেক্ট’ হিসেবে উপযুক্ত মনে করেছে এই ঢের।
ঠিক বারো মিনিটের মাথায় কদমছাঁট চুল, খেঁকুড়ে চেহারার একটা ছেলে কায়দা করে হাঁটতে হাঁটতে এল। রাহুলের ওপর একটু চোখ বুলিয়ে দোকানের ভেতর ঢুকে গেল। দোকানির সঙ্গে নিচু গলায় দু-একটা বাক্যবিনিময় করেই আবার বেরিয়ে এল বাইরে। রাহুলের কাছে এসে চাপা স্বরে ‘লাইটপোস্টের নীচে আসুন!’ বলে এগিয়ে গেল।
রাহুল কয়েক সেকেন্ড সময় নিয়ে ধীরে ধীরে উঠল। একটা নিড়বিড়ে, আনস্মার্ট ব্যাপার বজায় রাখতে হবে।
ছেলেটা খর চোখে রাহুলকে আপাদমস্তক মাপল। রাহুল একটু নার্ভাস মুখ করে হাসল। ছেলেটা চেরা গলায় প্রশ্ন করল, ‘কী কাজ?’
‘আপনি ভচাইদা?’
‘হ্যাঁ। কী কাজ?’
রাহুল বিনীতভাবে বলল, ‘একটা খবর চাই।’
‘কীসের খবর?’
‘ঝন্টুদাকে কে খুন করল বলতে পারবেন?’
ভচাইয়ের মুখে বিপর্যয় মেশানো বিস্ময়ের একটা পর্দা পড়েই উঠে গেল। মুহূর্তের মধ্যে কোমর থেকে একটা ছোট ছুরি বের করে উঁচিয়ে হিসহিসে গলায় বলল, ‘কে তুই?’
আর ছদ্মবেশ দরকার নেই। ইস্পাতকঠিন গলাটা বের আনল রাহুল, ‘যেটুকু জানতে চাইছি বলো। সত্যি বললে ছেড়ে দেব।’
ভচাই ছুরিটা আরও একবার আন্দোলিত করল। রাহুল চোখের পলক ফেলল না, সটান তাকিয়ে থাকল ভচাইয়ের চোখে। সহজ মাইন্ড গেম। ভচাই বেশিক্ষণ চোখে চোখ রাখতে পারল না। একটু কেঁপে গেল। তারপরেই পিছন ফিরে টেনে দৌড় মারল।
রাহুল তাড়া করল না। বিন্দুমাত্র ব্যস্তও হল না।
ভচাই প্রাণপণে দৌড়চ্ছে। পিছনে ফিরে দেখছে না যে কেউ তাড়া করছে কিনা। দৌড়োতে দৌড়োতে যখন প্রায় মোড়ের মাথায় পৌঁছে গেছে, ঠিক সে সময় অফিসব্যাগ কাঁধে যে প্রৌঢ় ভদ্রলোক মোড়ে দাঁড়িয়ে বাদাম খাচ্ছিলেন, তিনি আচমকা পা বাড়িয়ে দিলেন। ভচাই দুটো ভল্ট খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ল।
এই বয়েসেও লোকনাথদার ফিটনেস যে কোনও কুড়ি-পঁচিশ বছর বয়সিকেও লজ্জা দেবে।
একটু সরে এসে একটা গাছের তলায় দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরাল রাহুল।
.
ভবানী ভবন, কলকাতা, রাত ৮টা
ইন্টারোগেশন রুমের পরিবেশটাই অনেকে সহ্য করতে পারে না। ভচাই হাঁউমাঁউ করে উঠে বলল, ‘আমি কিছু করিনি স্যার। আমি খুন করিনি।’
অমিতাভ বললেন, ‘তাহলে পালালি কেন?’
‘আমি ভয় পেয়ে গেছিলাম স্যার। যদি আমাকেও মেরে দেয়! কিংবা যদি আমাকেই মার্ডার চার্জে ফাঁসিয়ে দেয়। মেয়েরা সব পারে স্যার।’
‘খুনটা তাহলে একটা মেয়ে করেছে?’
‘হ্যাঁ স্যার,’ ভচাই সুড়ুৎ করে নাক টানল, ‘সেইদিন সন্ধে থেকে ঝন্টুদার সঙ্গেই লেপটে ছিল। পরে বুঝতে পারলাম ওটাই মজন্তালী সরকার। মার্ডার করবে বলেই এসছিল।’
‘সেদিন কী দেখলি বল শুনি।’
‘আমি সেদিন একটু তাড়াতাড়ি ফিরব বলে বেরিয়েছিলাম। পার্কিং লটে এসে দেখছিলাম চেনা কেউ বেরোচ্ছে কিনা, তাহলে তার গাড়িতে বা বাইকে উঠে পড়ব। এসে দেখি ঝন্টুদা পড়ে আছে। গলায় ধারালো কী একটা বিঁধে আছে। আর মেয়েছেলেটা বডির ওপর ঝুঁকে। আমি যেতেই মেয়েটা চমকে তাকাল। আমি আর দাঁড়াইনি স্যার। চোখকান বুজে দৌড় মেরেছি।’
‘পালিয়ে কোথায় গেছিলি?’
‘হাওড়া। সেখান থেকে ট্রেন ধরে জলেশ্বর।’
‘তুই সত্যি বলছিস তার প্রমাণ কী? মার্ডার তো তুইও করতে পারিস।’
‘স্পটে মজন্তালী সরকারের চিরকুট পাওয়া গেছে। আর কী প্রমাণ চাই?’
‘আচ্ছা। সেটা তুই জানলি কী করে?’
‘টিভি থেকে স্যার।’
অমিতাভ হাসলেন, ‘খুব স্মার্ট, না? তা মজন্তালী তো তোকে দিয়েও খুনটা করাতে পারে? সব খুন যে সে নিজে হাতে করবে তার তো মানে নেই।’
ভচাই চোখ গোল গোল করল, ‘ঝন্টুদাকে আমি মারব? ঝন্টুদা আমার মাইবাপ।’
অমিতাভ দময়ন্তী, রাহুলদের দিকে চেয়ে বললেন, ‘আর্টিস্টকে ডাকিয়ে পোর্ট্রেট আঁকাই, নাকি?’
দময়ন্তী বলল, ‘আর কিছু করার নেই। ওই ফার্মহাউজ থেকে তো আর সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া সম্ভব না। সব ইললিগাল কাজকর্ম হত।’
বলতে বলতেই তানিয়া ঝড়ের মতো ঘরে ঢুকল। উত্তেজনায় কাঁপছে। বলল, ‘রেখার খবর এসেছে।’
চোখের ইশারায় অমিতাভর সম্মতি পেয়ে দময়ন্তী তানিয়াকে বলল, ‘চল, বারান্দায় যাই।’
বারান্দায় এসে তানিয়া বলল, ‘হাওড়া কোর্ট থেকেই এফিডেভিটের কপি পাওয়া গেল। বিপিন ভট্টাচার্যের নাম এখন শ্যামল মিত্র। আর রেখার নতুন নাম সম্পূর্ণা মিত্র।’
‘দেন হান্ট হার আউট। ডোন্ট ওয়েস্ট টাইম।’
‘পেয়ে গেছি। সম্পূর্ণা মিত্র। বয়েস ৩৩-৩৪। এই প্রোফাইলের একজনই আছেন পশ্চিমবঙ্গে, যাঁর বাবার নাম শ্যামল মিত্র। পেপারে বিনোদনের পাতায় ভদ্রমহিলার ছবি বেরোয় মাঝেসাঝে।’
দময়ন্তী খানিকক্ষণ অপলক চেয়ে থেকে বিস্মিত গলায় বলল, ‘অভিনেত্রী সম্পূর্ণা মিত্র?’
‘বুলস আই,’ তানিয়া বলল, ‘প্রতিবাদী ভাবমূর্তি আছে। সুজান জর্ডানের কেসে খোলাখুলি সমর্থন জানিয়েছিল।’
‘সেজন্য কেরিয়ার হালকা ধাক্কাও খেয়েছে।’ দময়ন্তী বিড়বিড় করল, ‘ইয়েস। শি লুকস ইনটেলিজেন্ট। সব মিলে যাচ্ছে।’
‘হ্যাঁ। সিটি কলেজে পড়াশোনা করেছে। মেরিটলেস ছবি করে না। খবরের কাগজের অফিসের হুলিয়ার সঙ্গে সম্পূর্ণার বয়েস আর হাইট মিলছে। স্কিনটোন অবশ্য ডাস্কি। তবে মেক আপ নিয়ে ফরসা করতে কতক্ষণ?’
‘আমি ভাবতেই পারছি না।’
‘আরও একটা কথা মনে পড়ল, দময়ন্তীদি। গত মাসে সম্পূর্ণা মিত্রের একটা ইন্টারভিউ ঘিরে ফেসবুকে বিরাট বাওয়াল হয়েছিল তোমাদের মনে পড়ছে?’
‘আমি অত ফেসবুক করি নাকি?’
‘ঋতুপর্ণ ঘোষ মারা যাবার পর তাঁর সঙ্গে কাজ করা বিভিন্ন অভিনেতা-অভিনেত্রীদের একটা ইন্টারভিউ-সিরিজ হচ্ছিল। সেখানে ঋতুপর্ণর অ্যাস্থেটিক সেন্স বিষয়ে বলতে গিয়ে সম্পূর্ণা বলেছিল, সে চরিত্রের প্রয়োজনে অন্তরঙ্গ দৃশ্য করতে রাজি, কিন্তু আইটেম নম্বর কখনোই করবে না। ইন্টারভিউটার পরপরই এক প্রডিউসার নাম না-করে কটাক্ষ করেছিলেন সম্পূর্ণাকে। নিজের ফেসবুক পেজে খুব বাজে একটা কথা লিখেছিলেন। লিখেছিলেন, আইটেম নাম্বার করতে গেলে মিনিমাম “অ্যাসেট” লাগে। প্রযোজক বা পরিচালক যাকে-তাকে আইটেম নাম্বার করতে ডাকবেন না। সেই প্রডিউসার কে বলো তো?’
‘অশোক বসু।’
দময়ন্তী খানিকক্ষণ অপলক চেয়ে থেকে বলল, ‘সম্পূর্ণা এখন কোথায়?’
‘শ্যুটিংয়ে। উলুবেড়িয়া। সামন করি?’
‘খেপেছিস? আমাদের হাতে একটা হিস্ট্রি ছাড়া কিস্যু নেই। মেক ইট আ রিকোয়েস্ট। ফোন করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট চেয়ে নে। তবে তারও আগে, টেলিকমকে বল ওর ফোনের নেটওয়ার্ক ট্র্যাক করতে। আর সোর্স ফিট করে দে। এমনি খোঁচর না। পুলিশের লোকই চাই।’
.
বালিগঞ্জ প্লেস, রাত ৮টা ৩০
মজন্তালীর কেসে প্রথম অ্যারেস্টের খবর পেয়েই ভবানী ভবনের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়ল শাক্য, সৌমিলি আর শিরিন। দময়ন্তী মুখার্জী নিজে ফোন করে ডেকেছেন।
‘আমি বলেছিলাম কিছু-না-কিছু ফেভার পাবই। পেলাম তো?’ উচ্ছ্বসিত গলায় শাক্য বলল, ‘দ্যাখ, এটা ক্রিস্টাল ক্লিয়ার যে মজন্তালী সরকার আমাদের মাউথপিস বানাতে চাইছে। এখন কথা হচ্ছে, দময়ন্তী মুখার্জীও কি সেটাই চাইছেন? চাইলে আই ডোন্ট মাইন্ড।’
শিরিন বলল, ‘তুই সিরিয়াসলি ভাবছিস পুলিশ আমাদেরই শুধু ডেকেছে? এটা একটা ব্রেকথ্রু, শাক্য। গিয়ে দেখবি সবকটা নিউজ চ্যানেলই পৌঁছে গেছে। যদি ধরেও নিই দময়ন্তী শুধু আমাদেরই খবর দিয়েছেন, তবু জেনে রাখ বাকিদের কাউকে হয়তো অমিতাভ সান্যাল খবর দিয়েছেন। অথবা কন্ট্রোল রুম থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। দ্যাটস হাউ ইট ওয়ার্কস।’
‘কথাটা বোঝ। পাতি ইনফো হলেও কন্ট্রোল রুম না, উনি নিজে ফোন করে আমাদের জানিয়েছেন। এটা গুরুত্বপূর্ণ।’
‘ভিতরের কিছু খবর পাই আগে, তারপর বোঝা যাবে কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ছোটখাটো একটা কো-অ্যাকিউজড ধরা পড়েছে সবে। দিল্লি এখনও অনেক দূর।’
সৌমিলি বলল, ‘প্রাইম সাসপেক্ট এখন চারজন। সুজান জর্ডান, লিলি জর্ডান, লীনা দাশগুপ্ত, সুচেতা দত্ত আর তিয়াসা পৈলান। তাই তো?’
‘এটা কার সাসপেক্ট লিস্ট বললি? সিআইডি নাকি মিডিয়া?’ ফুট কাটল শাক্য।
হেসে ফেলল তিনজনেই।
শাক্য হাসিমুখে বলল, ‘না। সিরিয়াসলি। প্রথম যে-নামটা বললি ওটা নিয়ে সিআইডি সত্যিই ভাবিত, নাকি আমরাই ভূতের গপ্পের লোভ ছাড়তে না পেড়ে এখনও মৃতদেহ আঁকড়ে বসে থাকতে চাইছি?’
সৌমিলি বলল, ‘আমার তো লিলি আর সুচেতা দুজনকেই সন্দেহ হয়। সুচেতার গপ্পটায় কেমন সিন্থেটিক গন্ধ আছে। প্লাস, ওর বাবা সুজানের উকিল ছিলেন।’
শিরিন বলল, ‘বিবস্বান দত্ত লোকটা গভীর জলের ফিশ। ওর একটা ইন্টারভিউ নেওয়া দরকার।’
‘এখনই ফোন কর। শুভ কাজে সিংহের মতো ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। সুচেতাকে ফোন করে নম্বর নিয়ে নে।’
.
.
