প্রথম দিন
তারিখ : ২ আগস্ট, ২০১৩
বিকেল ৫টা, ক্যালকাটা স্কুল অব ট্রপিকাল মেডিসিন
এসি-র কৃত্রিম শীত বেড়ে উঠছে। ওষুধের মৃদু গন্ধে ভরে আছে ছোট্ট কেবিন। সাইড টেবলের ওপর একটা ফুলদানি। তাতে নিরক্ত সাদা করবী। যেমন, নিরক্ত দেখাচ্ছে সুজানের মুখ।
কথা বলতে কষ্ট হচ্ছিল। তবু খুব চেষ্টা করে স্তিমিত গলায় সুজান মেয়েকে বললেন, ‘দাদুর খেয়াল রাখিস।’
লিলি জবাব দিল না। মায়ের হাত মুঠোয় নিয়ে চোখ বুজে বসে আছে সে। চোখের কোলে জল জমে আঠা হয়ে আছে।
একটা বাক্য বলেই হাঁপ ধরছিল সুজানের। তবু পরের বাক্যটা বলার জন্য প্রাণপণে বুকের বেলোয় যথাসম্ভব শ্বাসবায়ু পুরে নিলেন তিনি। বললেন, ‘গভর্নমেন্ট ইজ দেয়ার। ইউ জাস্ট বি ব্রেভ।’
‘গভর্নমেন্ট?’ লিলির চোখে বিস্ময় মেশানো বিরক্তি, ‘টাকা অফার করলেই সব মাফ? একজন ইলেক্টেড এমপি তোমায় স্লাট শেম করেছেন। তোমার রেপিস্টদের পুলিশ দু-বছরে ধরতে পারেনি, উল্টে তোমাকে নিয়েই টানাহেঁচড়া করেছে। ডোন্ট ইউ রিমেম্বার দ্যাট?’
‘আরে বুদ্ধু, এ-গভর্নমেন্ট সে-গভর্নমেন্ট নয়।’
‘তবে?’
স্মিত হাসলেন সুজান জর্ডান।
.
সন্ধে ৭টা, রবিনসন স্ট্রিট
.
মাও সে তুং ভারি সুন্দর বলেছিলেন। কিছু মৃত্যু বেলেহাঁসের পালকের মতো হালকা, আর কিছু মৃত্যু পাহাড়ের মতো ভারী। এই মৃত্যুটা দময়ন্তীর কোনও আপনজনের নয়। তবু এটা পাহাড়ের মতো ভারী।
এই ফ্ল্যাটে টিভি চলে না তেমন। আজ চলছে। সংবাদ-পাঠক পোশাকি গলায় মৃত্যু সংবাদটি দিচ্ছেন—
‘টিভির পর্দায় যখন প্রথম তাঁকে দেখা গিয়েছিল, তাঁর মুখ ছিল ঢাকা। কিন্তু কিছুদিন পর থেকেই ঢাকা সরিয়ে নিয়েছিলেন। সর্বসমক্ষে দাঁড়িয়ে বলে দিয়েছিলেন, আমিই সুজান জর্ডান। আমি পার্ক স্ট্রিটের গণধর্ষিতা। সাহস আর প্রতিবাদের মুখ সেই সুজান তাঁর লড়াই অসম্পূর্ণ রেখেই প্রয়াত হলেন মাত্র ৪২ বছর বয়সে। হাসপাতাল-সূত্রে জানানো হয়েছে, জ্বর আর খিঁচুনি নিয়ে ক্যালকাটা স্কুল অব ট্রপিক্যাল মেডিসিনে ভর্তি ছিলেন তিনি। আজ বিকেল পাঁচটা নাগাদ মারা যান। মেনিঙ্গোএনসেফ্যালাইটিসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে তাঁর।
সুজান মুখ লুকিয়ে বাঁচেননি। বরং ধর্ষণের প্রতিবাদ-প্রতিরোধের লড়াইয়ে নিজেকে সামিল করে নিয়েছেন। দিল্লির নির্ভয়ার ঘটনাই হোক বা বরুণ বিশ্বাসের হত্যাকাণ্ড কিংবা জামদুনির সাম্প্রতিক গণধর্ষণ—সবেতেই প্রতিবাদে শামিল হয়েছেন তিনি। মিছিলে হেঁটেছেন। সংবাদমাধ্যমে বারবার মুখ খুলেছেন। এ-বছর ১৯ ফেব্রুয়ারি মামলাটির চার্জ গঠন হয়েছিল। কলকাতার নগর দায়রা আদালতের দ্বিতীয় ফাস্টট্র্যাক আদালতে বিচারক রণিতা চট্টোপাধ্যায়ের এজলাসে মামলার বিচার চলছে। শুনানির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে ছিল। কিন্তু মামলার পরিণতি সুজানের দেখে যাওয়া হল না। তাঁর মৃত্যুতে সমাজের নানা স্তরের মানুষ আজ…।’
টিভি মিউট করে দিল দময়ন্তী। গেলাসে সামান্য একটু সোডা ঢেলে নিয়ে সোফায় এসে বসল। নেকেড সোডা। অ্যালকোহল আপাতত বন্ধ। কতদিনের জন্য, সেটা এখনও স্থির করা হয়নি। উইথড্রয়াল হচ্ছিল প্রবলরকম। দিনকয়েক হল কিছুটা সামলেছে। তবু যখন-তখন বোঁদা মেরে যায় মাথাটা। বিনা নোটিশে জোন আউট করে ফাঁকা পৃষ্ঠার মতো হয়ে যায়। ট্যাবুলা রাসা। তার মধ্যে এরকম একটা খবর এলে ভিতরের হিম আরও বেড়ে ওঠে। ভাস্কর চক্রবর্তীর কবিতার মতো, মনে হয় শরীরে কে-যেন ব্যাঙের রক্ত ঢুকিয়ে দিয়েছে।
সুজান জর্ডানের মৃত্যু আসলে সবাইকে অপরাধী করে দেয়। গণধর্ষিত হবার পর সুবিচার পেতে ভদ্রমহিলাকে অবিশ্বাস্য লড়াই করতে হয়েছে। পুলিশ তাঁকে ধারাবাহিকভাবে অসহযোগিতা করে গেছে। প্রশাসনিক লেভেলে তাঁকে ‘ভিক্টিম ব্লেমিং’ করা হয়েছে। কিন্তু ভদ্রমহিলা হার মানেননি। এমন সাহসী মানুষটা যে শেষে এরকম একটা রোগের ধাক্কায় চলে যাবেন, এটা মেনে নেওয়া যায় না। অনেকেই আজ শোক প্রকাশ করছেন। বেশিরভাগটাই শৌখিন কুমিরাশ্রু। প্রগতিশীল সাজার প্রতিযোগিতা। দময়ন্তী জানে দু-দিন হল্লাগুল্লা হবে, তারপর সুজান জর্ডান হিমঘরে চলে যাবেন। যেমন গেছেন গুলি খেয়ে খুন হয়ে যাওয়া বরুণ বিশ্বাস।
দেশ যাঁরা চালান তাঁরা জানেন, মানুষের অ্যাটেনশন স্প্যান এখন কলকাতার শীতকালের মতো। এই কিছুদিন আগে লাগাতার বিক্ষোভ চলছিল জামদুনির গণধর্ষণ নিয়ে। কানা-খোঁড়া চার্জশিট পেশ করার অভিযোগে এই কদিন আগেও সিআইডি-র কুশপুতুল পুড়িয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন স্থানীয় লোকজন। এখন ভিক্টিম আর আন্দোলন দুই-ই পিছনের সারিতে চলে গেছে। ভোটের বাজারে সবকিছুর দখল নিয়েছে রাজনৈতিক আকচাআকচি আর কাদা ছোড়াছুড়ি।
দময়ন্তী অবশ্য এখন এসব থেকে বহু আলোকবর্ষ দূরে। শেষ যে গুরুত্বপূর্ণ কেস সে পেয়েছিল, সেটা ২০১১ সালের ডিসেম্বর মাসের ঘটনা। ডায়মন্ডহারবার বিষ মদের মামলা। মৃতের সংখ্যা ১৬৭ ছুঁয়ে ফেলার পর মুখ্যমন্ত্রী করুণাময় বন্দ্যোপাধ্যায় সেই মামলা সিআইডি-র হাতে সঁপেছিলেন। সেটাই এসিপি দময়ন্তী মুখার্জীর শেষ সফল অ্যাসাইনমেন্ট। ভাবলে মনে হয় যেন গত জন্মের কথা।
জানলার বাইরে তাকাল দময়ন্তী। আকাশের একপাশে ম্লান জ্যোৎস্নার পোঁচ, বাকিটায় কালো কালির দোয়াত উল্টে গেছে। অল্পস্বল্প বৃষ্টি হচ্ছে। তবে তেজ বাড়বে। আজ বজ্রবিদ্যুৎসহ ঝড়বৃষ্টির পূর্বাভাস আছে। দময়ন্তী মনটাকে অন্যদিকে ঘোরানোর চেষ্টা করছিল। কিন্তু যে-কোনও মৃত্যুসংবাদ ঢালু জমি ধরে পুরোনো মৃত্যুর স্মৃতির দিকে বয়ে যায়। তাকে আটকানো যায় না। দময়ন্তীও আটকাতে পারল না। বাইরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার বুকের ভিতরটা হঠাৎ শূন্য হয়ে গেল।
রঞ্জন নেই, দেড় বছর হয়ে গেছে। এতদিন পর আজও, আকাশে বিদ্যুৎরেখার যাতায়াত দেখলে চিন্তা হয়। মনে হয় এত দুর্যোগে কোথায় আছে! কী করছে! বৃষ্টি নামলে এখনও মনে হয়, ভিজে যাবে না তো? কোনও শেডের নীচে দাঁড়িয়েছে তো?
সাদামাটা, লালিত্যহীন দময়ন্তী জানে না—টল, ডার্ক, হ্যান্ডসাম রঞ্জন তার কী দেখে পছন্দ করেছিল? জানতে চেয়েছিল। কিন্তু রঞ্জন বলেনি কখনও। টলমল পায়ে উঠে দময়ন্তী আয়নার সামনে যায়। নিজের রুপোলি হয়ে আসতে থাকা ববকাট চুলের দিকে তাকিয়ে থাকে। সমস্ত পোশাক খুলে ফেলে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখে বুকের অপুষ্ট খাঁজ, পেটের তিল, কোমরের হালকা মেদ। যৌবন এই কায়াতরুতে দেরি করে এসেছে। তা-ও নিতান্তই যেন নিমরাজি হয়ে। ঊনযৌবনের মোট দময়ন্তীকে বয়ে বেড়াতে হয়েছে কিশোরীবেলা থেকেই। মনে আছে, মা কীসব তাগাতাবিজ বেঁধে দিত। জলপড়া-টড়াও খাওয়ানোর চেষ্টা করেছিল। কলেজে অবধি কিছু ছেলেপিলে আড়ালে ‘নিমাই’ বলে হাসাহাসি করত। সব মিলিয়ে শরীরের প্রতি দময়ন্তীর একটা বিবমিষাই চলে এসেছিল। পুরুষের প্রতিও। ব্যবহার করা স্যানিটারি প্যাডের চেয়েও ঘৃণ্য আর অপ্রয়োজনীয় বলে মনে হত পুরুষ জাতটাকে। মনে পড়ে, মাঝেমাঝেই সে পুরুষবিহীন পৃথিবী কল্পনা করত। সঙ্গোপনে বসে বসে হিংস্র, বিকৃত সব ফ্যান্টাসির ঝুলন সাজাত। এখন সেসব ভেবে হাসি পায়। দূর থেকে দেখলে সব দুঃখস্মৃতিই প্রসন্ন হাসি জাগায়। সব ট্রাজেডিই লং-শটে কমেডি।
রঞ্জন সরকার নামে আশ্চর্য লোকটা এসেই তো সব বদলে দিয়েছিল। সোনার কাঠি ছুঁইয়ে বদলে দিয়েছিল দময়ন্তীকে। অথবা বদলে দিতে পারেনি। ঠেকনা হয়ে ছিল। তাই তো রঞ্জনের অ্যাক্সিডেন্টের এতদিন পর আজও ক্ষতটা থেকে পুঁজ বেরোয়। ঠাকুর ভাসানের পরে শূন্য মঞ্চে একলা প্রদীপের মতো মনে হয় নিজেকে। এতদিন পর আজও মনে হয়, ভিতরের ট্যাপকলটা যেন খুলে দিয়ে চলে গেছে কেউ। জল পড়ে যাচ্ছে ছ্যারছ্যার করে। দ্রুত ফুরিয়ে আসছে সবকিছু। অবশ্য এই ফোরানোটাও যেন অনন্ত এক ইলাস্টিক-প্রক্রিয়া। ফুরিয়ে-আসা টের পাওয়াটাই বোধহয় আসল ফুরিয়ে-আসা। এর নামই কি দুঃখরোগ? এ-ই কি বিষাদ, বস্তায় বেঁধে দশ মাইল দূরে ফেলে দিয়ে এলেও যে ঠিক পথ চিনে ফিরে আসে? ছোট্ট অবুঝ বিড়ালছানাটির মতো পায়ে পায়ে ঘোরে সারাদিন। নখ বিঁধিয়ে ঝুলে পড়ে পাজামায়। আলো-নেভানো ঘরে ভূতে-পাওয়া মানুষের মতো দাঁড়িয়ে থাকে দময়ন্তী।
.
রাত ৯টা ১০, ফার্ন রোড, কলকাতা
বালিগঞ্জ স্টেশন রোডে গিয়ে মেশার ঠিক আগে ফার্ন রোড ডাইনে-বাঁয়ে অনেকগুলো সরু সরু গলিপথের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। তারই একটা গলি ধরে হাঁটতে হাঁটতে মেয়েটা টের পেল, কেউ পিছু নিয়েছে।
বড় রাস্তার থেকে খানিকটা ভিতরে হওয়ায় এদিকটা একটু অন্ধকার। কারখানা এলাকা বলে বসতবাড়ি নেই তেমন। একেকটা ল্যাম্পপোস্টের মধ্যে দূরত্ব অনেকটা। রাত ন’টা দশ। শর্টকাট মারার লোভে বড্ড বেশি ঝুঁকি নেওয়া হয়ে গেছে। স্টেশন এখনও মিনিট চারেক। মেয়েটা দ্রুত পা চালাল।
চারপাশ কেমন থমথমে হয়ে আছে অপরাধবোধে। মেয়েরা চেনে এইসব। হাওয়ায় শ্বাপদের মতো একটা সতর্কতা। এরকম সময় সবকিছুকেই পায়ের আওয়াজ বলে মনে হয়। বুকের ঢিপঢিপটা বেড়ে গেল। আরও জোরে পা চালাতে হবে।
দূরে কোথাও একটা কুকুর ডেকে উঠল। তাতে সরীসৃপ-নিস্তব্ধতাটা যেন আরও চেপে বসল। মেয়েটা চকিতে পিছন ফিরে একবার দেখে নিল।
কেউ নেই তো। তাহলে কি মনের ভুল?
কিন্তু হাওয়ায় স্পষ্ট একটা শ্বাপদ-সতর্কতা ভাসছে। ছেঁড়া কাগজ যেমন ঈষৎ লাট খেতে খেতে খুব ধীরেসুস্থে নেমে আসে মাটিতে, তেমনই শ্লথ অনিবার্যতায়। মেয়েদের ভিতরকার সিসমোগ্রাফে ধরা পড়ে এইসব।
বড় রাস্তা খুব কাছেই। ওই তো ভারী যানবাহনের গর্জন শোনা যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি পেরিয়ে যেতে হবে এই জায়গাটুকু। মেয়েটা হাঁটার গতি বাড়াল।
ঠিক তখনই ডানদিকের গলি থেকে একটা ছায়ামূর্তি ক্ষিপ্র বেগে বেরিয়ে এসে পথের একেবারে মাঝখানে দাঁড়াল। পিছন পিছন আরও একটা।
মেয়েটা থমকে দাঁড়াল। মরিয়া হয়ে বলল, ‘আমি কিন্তু চেঁচাব! আমি কিন্তু চেঁচাব বলে দিচ্ছি!’
দুটো ছায়ার মধ্যে বেঁটেটা ফ্যাঁচ করে হাসল। ভেজা চামড়ার জুতোর মতো মসমস করে উঠল তার গলা, ‘তুমি চেঁচাবে আর আমরা তালি বাজাব!’
জন্তুরা বাতাস শুঁকে গন্ধ পায়। হাওয়ায় বোধহয় ছড়িয়ে পড়ে শিকারের খবর। অন্ধকারের গর্ভ থেকে মন্ত্রপিশাচের মতো বেরিয়ে এল আরও দুটো লোক। এখন মোট চারজন। শিকারি চিতার মতো এগিয়ে আসছে।
মেয়েটা চেঁচিয়ে উঠল, ‘কেউ আছেন?’
কেউ উত্তর দিল না। চরাচর স্তব্ধ হয়ে আছে।
ব্যাগে পেপার স্প্রে আছে। লোকগুলোর চোখে চোখ রেখে এক-পা দু-পা করে পিছিয়ে আসতে আসতে মেয়েটা ব্যাগ হাতড়ে স্প্রে খুঁজতে শুরু করল। লোকগুলো এগিয়ে আসছে। কোথায় গেল স্প্রে-টা? ইন্দ্রিয়গুলো আতঙ্কে অবশ হয়ে আসছে, শেষ মুহূর্তে হঠাৎ কারেন্ট শক লাগার মতো ছিটকে উঠে বার্তা দিল, দৌড় মারা ছাড়া আর কোনও উপায় নেই। দৌড়ানোর জন্য পিছন ফিরতেই একটা লোক বাঘের মতো লাফিয়ে এসে জাপটে ধরে মেয়েটাকে মাটিতে ফেলে দিল। সঙ্গে সঙ্গে বাকি দুজনও ঝাঁপিয়ে পড়ল।
চারজন পুরুষের সঙ্গে একজন মহিলার শারীরিক শক্তিতে সুবিধা করতে পারার কথা নয়। একজন হাত দুটো আর দুজন পা-দুটো ধরেছে। আরেকজন মেয়েটারই ওড়না দিয়ে তার মুখ বাঁধছে।
‘হাতটা ঠিক করে ধর না শালা!’ ধমকে উঠল কেউ।
উঠে দাঁড়িয়ে খুব আয়েশ করে আড়মোড়া ভেঙে বেঁটে লোকটা প্যান্টের জিপ নামাতে যাচ্ছে, ঠিক সেই সময় ঘটনাটা ঘটল।
হাওয়া কেটে তীক্ষ্ণ একটা আওয়াজ এল। তারপরেই অস্ফুট একটা আর্তনাদ করে লোকটা ধপাস করে উপুড় হয়ে পড়ল ধুলোর মধ্যে। কেউ কিছু বোঝার সময় পেল না। অল্প আলোয় দেখা গেল লোকটার ঘাড়ে একটা ছুরির বাঁট চকচক করছে।
‘এহে! সেই এক ইঞ্চি নীচে! আরও প্র্যাকটিস চাই।’
ঘটনার আকস্মিকতায় লোক তিনটে কেমন ভ্যাবলা হয়ে গেছিল। চটক ভেঙে তারা আবিষ্কার করল একটু দূরে একটা ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে মাথা চুলকোচ্ছে।
বেঁটে লোকটা কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, ‘ক…কে তুই?’
ছায়ামূর্তিটা এবার এগিয়ে এল। একটু আগে বৃষ্টি হয়েছে। পিচের রাস্তা চিকচিক করছে। টোবলা-খাওয়া জায়গাগুলোয় জমে আছে অল্পস্বল্প জল। সেখানে পড়ে প্রিক্সলেটে ভেঙে যাচ্ছে সোডিয়াম ভেপারের হলুদ আলো। খানিকটা আলো রেণু রেণু হয়ে এসে পড়ছে আগন্তুকের গায়ে। তাতে স্পষ্ট হয়ে উঠল তার আপাদমস্তক কালো পোশাক আর মুখোশ। গ্লাভস পরা হাতদুটো আগন্তুক নমস্কারের ভঙ্গিতে এক করল, ‘শুভ সন্ধ্যা। কী সুন্দর হাওয়া দিচ্ছে না?’
লোকগুলো এতটাই ঘাবড়ে গেছে যে মুখ থেকে বাক্য সরছে না। তারা একবার মৃত সঙ্গীর দিকে দেখছে, একবার আগন্তুকের দিকে। মুখোশের অন্তরালে মহিলাকণ্ঠটি সম্ভবত তাদের বিভ্রান্তিকে দশগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। মেয়েটাও একইরকম বিভ্রান্ত। তার সামনে ছয়-সাতের দশকের ডিজনি ছবির মতো ইয়েলোস্ক্রিন ইস্টম্যানকালার এফেক্ট তৈরি হয়েছে। কোমরে হাত দিয়ে ফিল্মি কায়দায় দাঁড়িয়ে আছে মুখোশধারী আগন্তুক। দেহরেখা টানটান। পা-দুটোয় উল্টো ‘ভি’-এর ভঙ্গি। এই মুহূর্তে বাইরের কেউ এই ফ্রেমে ঢুকে পড়লে ফিল্মের সেট ভেবে ভুল করতে পারে। ফিল্মি কায়দাতেই গলা খেলিয়ে আগন্তুক বলে উঠল, ‘এমন সুন্দর স্বর্ণালী সন্ধ্যায় কোথায় হালকা করে গুলাম আলি বা জগজিৎ সিং চালিয়ে চপ-মুড়ি নিয়ে বসবেন, তা না…।’
অশ্রাব্য খিস্তি দিয়ে একটা লোক ঘুষি বাগিয়ে তেড়ে এল। মুখোশধারী সেই উদ্যত ঘুষিটা মহম্মদ আলীর ক্ষিপ্রতায় ডজ করে বরাভয়-মুদ্রায় আক্রমণকারীর বুকে একটা ধাক্কা মারল। ফাঁপা একটা শব্দ হল। লোকটা কাটা কলাগাছের মতো মাটিতে পড়ে গেল। আগন্তুক লোকটার পাশে হাঁটু মুড়ে বসল। তারপর তার মাথাটা দু-হাতে ধরে খুব পরিপাটি করে ঘাড়টা উল্টোদিকে ঘুরিয়ে দিল।
বেঁটে লোকটা ততক্ষণে একটা ছোট ছুরি বের করেছে। কিন্তু মুখোশধারী অসম্ভব ক্ষিপ্র। আক্রমণ করার আগেই এক লাথিতে সে ছুরি ছিটকে গেল। পরক্ষণেই বিদ্যুৎগতিতে হাতের ছোবল গিয়ে পড়ল লোকটার মুখে। অমানুষিক গলায় সে চিৎকার করে উঠল। তারপর দু-হাতে মুখ চেপে ধরে পাগলের মতো আর্তনাদ করতে করতে গড়াগড়ি দিতে লাগল রাস্তায়। অন্ধকার হলেও বোঝা যাচ্ছে তার দু-হাতের আঁজলা ছাপিয়ে গলগল করে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে রাস্তায়। মেয়েটা আঁতকে উঠল। মুখোশধারী লোকটার চোখ খুবলে নিয়েছে।
‘চোখ। চোখটা পাল্টানো খুব জরুরি,’ মুখোশধারী পকেট থেকে রুমাল বের করে যত্ন করে হাত মুছল, ‘সেটা একদিনের ব্যাপার নয় ঠিকই, কিন্তু তা বলে তো অতদিন বসে বসে আঙুল চোষা যায় না। কী বলেন?’
চতুর্থ লোকটা সম্মোহিতের মতো বসে সব দেখছিল। মুখোশধারী দু-হাত মাথার কাছে নিয়ে এসে চুলের কাঁটা আলগা করে নিল। স্লুইসগেট খুলে বেরিয়ে আসা জলের মতো ঝাঁপিয়ে নেমে এল একঢাল চুল। ‘সবচেয়ে বড় মুশকিলটা কী জানেন? আমি আবার পাপ আর পাপীকে আলাদা করতে পারি না।’ বলে ছটফট করতে থাকা বেঁটে লোকটাকে কলার ধরে হিঁচড়ে তুলে চুলের কাঁটাটা তার গলায় আমূল গেঁথে দিল।
এদিকে চতুর্থ লোকটা ভয়ে একেবারে ভেবলে গেছে। হাঁটু গেড়ে বসে আছে জবুথবু হয়ে। কপালে বিজবিজ করছে ঘাম। পাল্টা আক্রমণ করা দূরে থাক, পালানোর কথাও মাথায় আসছে না।
মুখোশধারী তার দিকে চেয়ে বলল, ‘আপনি কি এরকম শালগ্রাম শিলার মতো বসেই থাকবেন নাকি?’
লোকটাকে মানতের ছাগলের মতো দেখতে লাগছিল। অতি কষ্টে একটা ঢোঁক গিলতে পারল শুধু।
হতাশ গলায় মুখোশধারী বলল, ‘যাক গে, প্যান্টটা খুলুন তো।’
কথাটা শুনে বৈদ্যুতিক শক খাবার মতো চমকে উঠল লোকটা।
মুখোশধারী এগিয়ে এসে লোকটার কাঁধে হাত রাখল, ‘প্যান্টটা খুলুন। ফালতু দেরি করাচ্ছেন। আমি সাহায্য করব?’
সাহায্যের কথা শুনেই বোধহয় লোকটা তড়বড় করে প্যান্টটা কোমর থেকে আলগা করল। পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়া প্যান্টটাকে দেখে তার মালিকের চেয়েও অসহায় লাগছে।
মুখোশধারী মেয়েটাকে বলল, ‘একটা মজা দেখবেন? দাঁড়ান, আগে ওর হাত-পা বেঁধে ফেলি।’ বলে লোকটার কলার ধরে টেনে সামনের ল্যাম্পপোস্টে সজোরে মাথা ঠুকে দিল। তার মাথা কেটে গলগল করে রক্ত পড়তে শুরু করল। কাটা-গাছের মতো এলিয়ে পড়ল সে। মুখোশধারী পকেট থেকে দড়ি বের করে তার হাত বেঁধে ফেলল। ভয়ে না যন্ত্রণায় কে জানে, লোকটা কেমন বিবাগী হয়ে গেছিল। বাধা দেওয়ার কোনওরকম চেষ্টাই করল না।
পকেট থেকে একটা ছোট কাচের শিশি বের করে মুখোশধারী মেয়েটাকে বলল, ‘আজ সকালে আলমারির পিছন থেকে এই দুটোকে ধরেছি। ভিয়েতনামে যুদ্ধবন্দিদের পেট থেকে কথা বের করত এভাবে। বুঝলেন?’ বলতে বলতে লোকটার জাঙিয়া টেনে ধরে ভিতরে শিশিটা ফাঁকা করে দিল। লোকটা সারা শরীর মুচড়ে বিকট চিৎকার করে উঠল। বিস্ফারিত হয়ে উঠেছে তার চোখদুটো। যেন ঠেলে বেরিয়ে আসবে।
মেয়েটা ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে। মেঘের মলাট ছিঁড়ে বেরিয়ে এসেছে ক্ষয়াটে চাঁদ। প্রাচীন লোককথা অনুযায়ী এইরকম রাতেই ওয়্যারউলফরা শিকারে বেরোয়। সেই কৃপণ জ্যোৎস্নায় মেয়েটা দেখল দুটো নিথর দেহ পড়ে আছে, আর দুটো লোক চিৎকার করতে করতে রাস্তায় গড়াগড়ি দিচ্ছে। পুরো ঘটনাটা ঘটতে মিনিট তিনেকের বেশি লাগেনি বোধহয়।
মুখোশধারী ধীরেসুস্থে ফাঁকা শিশিটা পকেটে ভরে মেয়েটাকে বলল, ‘কতদূর যাবেন?’
মেয়েটার সারা শরীর তখনও থরথর করে কাঁপছে। খুব কষ্ট করে টেনে টেনে উচ্চারণ করল, ‘স্টেশন।’
‘চলুন, আপনাকে একটু এগিয়ে দিই।’
‘আপনি যদি এসে না পড়তেন…।’
‘ব্যাগে জল আছে? একটু জল খান। খানিকটা সুস্থ লাগবে।’
মেয়েটা ব্যাগ থেকে জল বের করে ঢকঢক করে পুরোটাই শেষ করে ফেলল। তারপর চোখ বুজে ভালো করে শ্বাস নিল।
‘ভালো লাগছে একটু?’
মেয়েটা ইতিবাচক মাথা নাড়ল। শরীরের কাঁপুনি থামেনি এখনও। মুখোশধারীর কাণ্ডকারখানা তাকে এত চমকে দিয়েছে যে সে স্বাভাবিক হতে পারছে না কিছুতেই। যেটা ঘটল সেটা কি সত্যিই ঘটল? ঘোর কাটছে না। মাথা হ্যাং করে গেছে। তবে নিরাপত্তার বোধ যে-কোনও অস্বস্তির ওপর একটা চাদর বিছিয়ে দেয়। সেই চাদরটার ওম খানিকটা ধাতস্থ হতে সাহায্য করল তাকে। অ্যাড্রিনালিনের স্রোত শান্ত হচ্ছে খুব ধীরে ধীরে। মুখোশধারীকে এবার ভালো করে জরিপ করল সে। হাইট মাঝারি। কালো টাইট জাম্পস্যুটে নির্মেদ, ছিপছিপে দেহের চড়াই-উৎরাই প্রকট হয়ে উঠেছে। পায়ে হাঁটু অবধি লম্বা জুতো। মুখের মাস্ক মাথা আর চোখ ঢেকেছে। ঠোঁটের অংশ অনাবৃত। কার কথা মনে পড়ছে যেন! কোনও কার্টুন ক্যারেক্টার? পেটে আসছে, মুখে আসছে না।
মুখোশধারীও নিবিষ্ট চোখে মেয়েটাকে লক্ষ করছিল। বলল, ‘আপনার কিউপিড বো-টা খুব সুন্দর। ক্রিমসন রেড কালারের লিপস্টিক আপনার ফেসে ভালো খুলবে। ট্রাই করে দেখবেন। থ্যাঙ্ক মি লেটার।’
মেয়েটা আবারও মাথা নাড়ল। মুখের বিভ্রান্তি যাচ্ছে না তার। একটু ইতস্তত করে বলল, ‘আচ্ছা ওই শিশিটায় কী ছিল?’
‘ওইটায়?’ মুখোশধারী খুব নিস্পৃহ গলায় বলল, ‘এমন কিছু না। দুটো টিকটিকি।’
মেয়েটা শিউরে উঠল, ‘টিকটিকি?’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ। হাত খুলতে না পারলে মিনিট তিনেকের মধ্যেই লোকটা মরে যাবে।’ বলে মুখোশধারী জাম্পস্যুটের পকেটে হাত গুঁজে একটা কাগজ বের করে আনল। তারপর গোল্লা পাকিয়ে রাস্তায় ফেলে দিয়ে বলল, ‘একটু পরে সোনারপুরেও এরকম একটা কাণ্ড ঘটবে বলে আশা করা যাচ্ছে, বুঝলেন?’
টিকটিকির কথাটায় মহিলার কথাবার্তার মাথামুন্ডু বোঝা যাচ্ছে না। কোনওক্রমে সে বলল, ‘কী কাণ্ড?’
‘যা দেখলেন, মোটের ওপর তারই রিপিট টেলিকাস্ট।’
‘মানে?’
‘ওই পাড়াতেও কিছু গুন্ডা-বদমাইশ মলেস্টারের উৎপাত চলছে কয়েক মাস ধরে। তাদের বল্টুগুলো একটু টাইট দিতে হবে। ভালো কথা, আপনি সুজান জর্ডানকে চেনেন তো?’
‘পার্ক স্ট্রিটের…?’
‘হ্যাঁ, তিনিই। আজ একটু আগে মারা গেছেন। হয়তো তাঁকে নিয়েও সিনেমা হবে একদিন। যেমন বরুণ বিশ্বাসকে নিয়ে হচ্ছে।’ একটু যেন আনমনা হয়ে গেছিল মুখোশধারী। তারপরেই সচকিত হল, ‘আচ্ছা আপনি মুকেশ সিংকে চেনেন?’
‘না।’
‘লীনা দাশগুপ্ত?’
‘না।’
‘চিনে যাবেন। কালকেই চিনে যাবেন। খবরের কাগজ পড়েন তো? কালকের খবরের কাগজটা একটু খেয়াল করবেন প্লিজ। ফ্রন্টপেজে একটা দুর্দান্ত চমক থাকবে।’
‘কিন্তু আপনি…’ থেমে গেল মেয়েটা। ঠোঁট কাঁপছে।
‘বলুন কী বলছেন। শেষ করুন বাক্যটা।’
‘আপনি কে?’
মুখোশধারীর ঠোঁট প্রসারিত হল হাসির ভঙ্গিতে, ‘আমার নাম মজন্তালী সরকার। আপনার বন্ধু।’
‘বন্ধু?’
‘বেশক!’ বলে সে একটা রংচঙে মোড়ক বাড়িয়ে দিল মেয়েটার দিকে, ‘চিউয়িং গাম চলে আপনার?’
.
