চতুর্থ দিন
তারিখ : ৫ আগস্ট, ২০১৩
রানিকুঠি, সকাল ১১টা ৩০
মর্নিং ডিউটি সেরে বাড়ি ঢুকে সৌমিলি দেখল, বাবা ফিটফাট হয়ে হাতে ঘড়ি পরছে। অর্থাৎ কোথাও বেরোবে। তাকে দেখে খুশি হয়ে বলল, ‘পাপুন, খুব ভালো সময়ে এসেছিস। একটা উবের বুক করে দে না।’
‘কোথায় যাবে?’
‘সিঁথি।’
সিঁথি মানে সেলুন। সৌমিলি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। প্রতি মাসে লোকটা ক্যাব ধরে হ্যারিসন রোড থেকে উজিয়ে সিঁথির মোড় যায় চুল কাটতে। বহুকালের প্রিয় সেলুন। সেলুন না, আসলে প্রিয় হচ্ছে পরামানিক ইয়াকুব। সৌমিলিরা আগে সাউথ সিঁথিতে থাকত। তখন থেকেই ইয়াকুবের কাছে চুল কেটে অভ্যেস বাবার। চুল যে দুটো মানুষকে এভাবে দশকের পর দশক ধরে একটা আশ্চর্য বাঁধনে বেঁধে রাখতে পারে, ভাবাই যায় না। ইয়াকুব আর বাবা বলতে গেলে একসঙ্গেই বুড়ো হল। সৌমিলি ব্যাগ নামিয়ে রেখে ফোনে উবেরের অ্যাপ খুলল। পিক আপ আর ডেসটিনেশন টাইপ করে ভাড়া দেখে বলল, ‘আড়াইশো টাকা দেখাচ্ছে।’
মা এসে বললেন, ‘হ্যাঁ রে, তুই আবার স্লিভলেস পরে গেছিলি? কাজের জায়গায় এইসব কেন যে পরিস!’
সৌমিলির ব্রহ্মতালু জ্বলে গেল। প্রতিদিন একইধরনের প্রশ্নের উত্তর দিতে আর ভালো লাগে না। আগের জেনারেশনের সংস্কার, ধ্যানধারণা বদলানো সম্ভব নয়, এটা সৌমিলি অনেক আগেই বুঝে গেছে। কিন্তু ঝগড়াঝাঁটি করে চুপ করিয়ে রাখা সম্ভব। মা ইদানীং সেই ধারণাও ভেঙে দিচ্ছে। সৌমিলি চাকরিতে যোগ দেবার পর থেকে মা যেন আলোর বেগে পিছিয়ে চলেছেন মধ্যযুগের দিকে। ঘরে ঢুকেই সবসময় খিটিমিটি করতে ভালো লাগে না। সৌমিলি তাই কষ্ট করে মেজাজকে বাগে আনল। যথাসম্ভব শান্তভাবে বলল, ‘মা, এটা মধ্যযুগ নয়। ভারত এ-বছর চাঁদে রকেট পাঠাচ্ছে।’
‘তা বলে আজেবাজে ঘটনা তো থেমে নেই। মেয়েমানুষের নানারকম ভয় থাকে। সেটা তুমি জোর করে অস্বীকার করলে তো কিছু করার নেই।’
‘রেপ বা মলেস্টেশন জামাকাপড়ের ওপর নির্ভর করে না মা।’
সৌমিলির বাবা প্রগতিশীল না হলেও মধ্যপন্থী। তিনিও মাঝে মাঝে মায়ের আচরণে বিরক্ত হন। এখনও হলেন। পাঞ্জাবির হাতা গোটাতে গোটাতে মা-কে বললেন, ‘সত্যি! তুমি বড় সেকেলে। বোরখা পরলে রেপ হচ্ছে না? এক বছরের বাচ্চার রেপ হচ্ছে না?’
মা বললেন, ‘বড় বড় কথা বললে সমাজটা পাল্টে যায় না। সমাজটাকে আমরা বদলাতে পারব না।’
সৌমিলি তেতো গলায় বলল, ‘নিজের নিজের মতো করে চেষ্টা তো করতেই পারি। দেখছ না, একজন চেষ্টা করছে?’
মা একটু থমকে গেলেন, ‘কে কী চেষ্টা করছে?’
‘মেয়ে সারাদিন খবর নিয়ে থাকে, আর মা দুনিয়ার কোনও খবর খবর রাখে না।’ বাবা খিক খিক করে হাসলেন, ‘ও মজন্তালী সরকারের কথা বলছে।’
মা ভুরু কুঁচকে একটু ভাবল। তারপর বলল, ‘যে-মেয়েটা খুন করে বেড়াচ্ছে?’
মাথা নাড়ল সৌমিলি। বাবাকে বলল, ‘ক্যাব আর চার মিনিট।’
বাবা বললেন, ‘হ্যাঁ রে, কাল রাতেও নাকি একটা খুন হয়েছে?’
‘হ্যাঁ। সে আবার পলিটিকাল নেতা।’
যেন তাঁর ওপরেই তদন্তের ভার, এমন মুখ করে বাবা বললেন, ‘এই মজন্তালী সরকারটা কে বল তো?’
‘এমন কেউ, যে ভয় পেতে চাইছে না।’ সৌমিলি কাঁধ ঝাঁকাল।
.
ভবানী ভবন, সকাল ১১টা ৪০
ঘরে ঢুকে একটা ফাইল অমিতাভর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে সুকুমার বলল, ‘ফার্ন রোড আর সোনারপুরের ইনকোয়েস্ট রিপোর্ট স্যার।’
অমিতাভ ল্যাপটপ থেকে মুখ তুললেন না। হাত বাড়ালেন, ‘দাও।’
‘আর গতকালের মার্ডারের ব্যাপারে ফরেন্সিক থেকে একটা আপডেট আছে স্যার। কালকের মার্ডার স্পটে মজন্তালী যে চিরকুটটা ফেলেছিল, তাতে ফিঙ্গারপ্রিন্ট পাওয়া গেছে।’
অমিতাভর বিশেষ ভাবান্তর হল না। অন্যমনস্কভাবে বললেন, ‘ডিটেল রিপোর্ট দিতে বোলো। একেবারে যেন ডেটাবেস চেক করিয়ে দেয়।’
সুকুমার মাথা নেড়ে বেরিয়ে গেল।
অমিতাভ দময়ন্তীকে বললেন, ‘কী বলছিলে বলো।’
‘বলছিলাম, ঝন্টু ওরফে দেবব্রত কুণ্ডুর নামে একটা রেপের মামলা ঝুলছে। পার্টিতে ডেট-রেপ ড্রাগ খাইয়ে এক তরুণীকে রেপ করেছে। তিন মাস আগের ঘটনা। কেস নাকি একচুলও এগোয়নি। যুবনেতা। ভবিষ্যৎ এমএলএ ক্যান্ডিডেট। বুঝতেই পারছেন।’
অমিতাভ চিন্তিত মুখে বললেন, ‘এতগুলো লুইচ্চা লম্পট বরাহনন্দনের খবর তো জোগাড় করতে হয়েছে। এদের গতিবিধির ফলো-আপও নিতে হয়েছে। বেশ দীর্ঘ পরিকল্পনার ছাপ টের পাচ্ছি।’
‘সোনারপুর থানা আরেকটা আপডেট দিয়েছে। ঝন্টুর খুনের পর থেকে তার এক চ্যালা ভচাই নিরুদ্দেশ। ভচাইকে কোনওভাবে কাজে লাগানো হয়েছে কিনা, সেটা একটা প্রশ্ন।’
‘ভাড়াটে সৈন্য? লাগাতেই পারে। মনে হচ্ছে, আমরা লম্বা টেস্ট ম্যাচ খেলতে নেমেছি। যাক গে, তুমি কোথায় যাবে বলছিলে? ঘুরে এসো।’
‘বাড়ি যাব। মায়ের সঙ্গে দেখা করে আসব। টেস্ট ম্যাচ শুরু হয়ে গেলে আর কবে সময় করে উঠতে পারব তার ঠিক নেই।’
‘তোমার মা-বাবা কি বরানগরের বাড়িতে?’
‘হ্যাঁ। ফ্ল্যাটে সেটল করতে তো রাজি হলেন না।’
‘আমি ফ্ল্যাট করার পর আমার মা-বাবাকেও রাজি করাতে পারিনি। মানুষের সেন্টিমেন্টের তো ব্যাখ্যা হয় না। যাও, ঘুরে এসো।’
দময়ন্তী বেরিয়ে যেতে গিয়েও ঘুরে তাকাল, ‘ভালো কথা, আমাদের ওয়ার্কস্টেশনের কী হল? একটা আলাদা ঘর তো চাই।’
‘রমেশকে তিনতলার বড় ঘরটা রেডি করতে বলেছি। কাল থেকে ওখানে বসতে পারব আশা করছি।’
‘প্লিজ বলবেন ধুলোটুলো যেন ঠিক করে ঝাড়ে। আমার ডাস্ট অ্যালার্জি। হেঁচে মরে যাব জাস্ট।’ বলে দময়ন্তী বেরিয়ে গেল।
তানিয়া কোণের টেবিলে বসে ল্যাপটপে স্প্রেডশিটে ডেটা আপডেটের কাজ করছিল। বলল, ‘স্যার, ফিঙ্গারপ্রিন্টের ব্যাপারটা আপনাকে তেমন এক্সাইট করল না তো! এই ফিঙ্গারপ্রিন্টটা কি মেজর ব্রেকথ্রু না?’
‘ভালো প্রশ্ন করেছ,’ অমিতাভ খুশি হলেন, ‘শোনো, সিরিয়াল কিলিংয়ের ক্ষেত্রে ফরেন্সিক ফাইন্ডিংস সচরাচর খুব বেশি কাজে লাগে না। যেহেতু সাসপেক্টের তালিকা এখানে ইনফিনিটি। আউটডোর খুনে তো কাজে আসার প্রশ্নই নেই। খড়ের গাদায় ছুঁচ খোঁজার মতো হয়ে যায় ব্যাপারটা। হ্যাঁ, অল্প কিছু স্পেসিফিকেশন আর প্যারামিটার দিয়ে সার্চিং-এর বৃত্তটাকে খানিকটা ছোট করে আনা যেতে পারে। এটুকুই।’
সব জিনিস পুলিশ ম্যানুয়াল পড়ে শেখা যায় না, এটা ফোর্সে জয়েন করার পর থেকে রোজই একবার করে শিখতে হচ্ছে। অমিতাভ স্যারের কথাটা ব্রেনে কপি করে নিল তানিয়া। বলল, ‘বুঝেছি স্যার।’
অমিতাভ বললেন, ‘অপরাধ জগৎ একটা চেনের মতো। ভুঁইফোঁড় কেউ ঢুকে যা ইচ্ছে তাই করতে চাইলে সেটা সেই দুনিয়ার বাকিদের কাছ থেকে বেশিদিন গোপন রাখা খুব কঠিন। ডিজিটাল দুনিয়ায় যেমন কোনও ফুটপ্রিন্ট আসলে ডিলিট হয় না, অপরাধের দুনিয়াতেও তাই। বিশেষত, এরকম একটা বড়সড় ধারাবাহিক অপরাধ ঘটলে তার আঁচ অপরাধ জগতের বাকিরা টের পাবেই। সুতরাং সিরিয়াল কিলিংয়ের ক্ষেত্রে খোঁচররাই পুলিশের সবচেয়ে বড় সহায়। বুঝলে?’
‘তাহলে এই ফিঙ্গারপ্রিন্টের ডেটাবেস চেক করিয়ে কোনও লাভই হবে না বলছেন?’
‘এটা অপরাধীর ফিঙ্গারপ্রিন্ট কিনা দেখা যাক আগে। সে হয়তো গ্লাভস পরে কাজ সেরেছে, এদিকে যেটা পাওয়া যাচ্ছে সেটা হয়তো অন্য কারও ফিঙ্গারপ্রিন্ট। পুলিশ আসার আগেই কেউ হয়তো টাচ করেছে। ঝানু ক্রিমিনালরা এত কাঁচা কাজ করবে না, কারণ তাদের বায়োমেট্রিকস পুলিশের ডেটাবেসে আছেই। আর আনকোরা কেউ হলে শুধু ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়ে এই বিপুলা পৃথিবীতে তাকে কোথায় খুঁজবে তুমি! হ্যাঁ, আমরা যদি কাউকে ধরতে পারি, ফিঙ্গারপ্রিন্ট পেলে শিওর হওয়া যাবে।’
চুপ করে রইল তানিয়া। তারপর বলল, ‘এই কেসটা খুব অন্যরকম স্যার।’
অমিতাভ বললেন, ‘আমিও আমার সার্ভিস লাইফে এমন ইউনিক কেস দেখিনি বা শুনিনি। এখনও পর্যন্ত যা মনে হচ্ছে, এই সিরিয়াল ক্রাইমটার পিছনে একটা সেন্স অব মরালিটি কাজ করছে। আমাদের মজন্তালী সরকারের সাইকোলজিটা ধরতে হবে। তবে সবচেয়ে আগে এটুকুই মাথায় রাখা দরকার যে মজন্তালী সরকার একজন অপরাধী। এখানে দ্বিমত হলে চলবে না। তাই না?’
‘স্যার, স্পর্ধা বলে যদি মনে না করেন, তাহলে একটা প্রশ্ন করি?’
‘গো অন।’
‘আমি মজন্তালী সরকার বিষয়ে আপনার ব্যক্তিগত মতামত জানতে চাই। পেশাগত বাধ্যবাধকতার বাইরে।’
কফিতে শেষ চুমুকটা অমিতাভ সশব্দে দিলেন। তারপর একটা সিগারেট ধরিয়ে জানলার ধারে গিয়ে দাঁড়ালেন। রিং ছাড়লেন পরপর। জানলার বাইরেই উঁচু বাউন্ডারি ওয়াল। কাচ আর পেরেক বসানো। অমিতাভ দেখলেন, তার ওপর দিয়ে একটা বেড়াল হেঁটে যাচ্ছে।
.
হিন্দুস্থান পার্ক, বেলা ১২টা ২০
‘হ্যালো, এটা কি বিউটি স্পটের অফিস?’
‘হ্যাঁ। বলুন।’
‘আপনাদের এডিটরের কাছে কলটা ফরওয়ার্ড করবেন প্লিজ?’
‘সরি ম্যাডাম। উনি এখনও অফিস আসেননি। আপনি আধ ঘণ্টা পর ফোন করুন।’
‘তাহলে উনি এলে কাইন্ডলি একটা মেসেজ দিয়ে দেবেন।’
‘শিওর। বলুন কী মেসেজ?’
‘বলবেন আগামী কাল, মানে ৬ তারিখ, আপনাদের অফিস জ্বালিয়ে দেওয়া হবে।’
‘হোয়াট?’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ। কারণটাও বলবেন। আপনাদের ম্যাগাজিনে মেয়েদের জঘন্যভাবে কমোডিটিফাই করা হয়।’
‘ইজ দিস সাম কাইন্ড অব প্র্যাকটিকাল জোক?’
‘আনফরচুনেটলি নট। আমার নামটাও বলবেন। মজন্তালী সরকার। আপনার দিনটি শুভ হোক।’
.
বরানগর, বেলা ১২টা ৩০
গলির মধ্যে গাড়ি রাখার জায়গা নেই। বড় রাস্তায় গাড়ি রেখে হেঁটে গলিতে ঢুকল দময়ন্তী। পুরোনো পাড়ার একটা আলাদা গন্ধ আছে। দময়ন্তী সমস্ত ইন্দ্রিয় দিয়ে সেটা টের পায়। উইকডের দুপুর। মানুষজন নেই। একটা হাড়জিরজিরে কুকুর শুধু কুণ্ডলি পাকিয়ে জিরোচ্ছে। অনেক কিছু বদলে গেছে। গলিতে ঢুকেই ডানপাশে ছিল চুনুকাকুদের আমবাগান। চুনুকাকুর একটা পা একটু খুঁতো ছিল বলে বদমাশ ছেলেপিলে বলত, বাগানের গাছগুলো ল্যাংড়া আমের গাছ। এখন সেখানে মস্ত ফ্ল্যাট। এই সরু গলিতে পাঁচতলার পারমিশন পায় কী করে কে জানে।
যে-বাড়িগুলো টিকে আছে তাতেও পুরোনো লোকজন সব নেই অবশ্য। রুজিরোজগারের টানে নানা জায়গায় ছিটকে পড়েছে। এ-পাড়ায় আজকাল মাটি নেই। শুধু এ-পাড়ায় না, গোটা শহরে প্রায় কোথাও মাটি নেই। কর্পোরেশন যত্ন করে সব রাস্তা কংক্রিট দিয়ে মুড়ে দিয়েছে। যে-জলেরা উঠে আসে তারা পৃথিবীর গর্ভে ফেরত যাবার পথ পায় না। পরমহংসদেবের কথা অর্ধেকটা সত্যি হয়েছে। টাকা মাটি না হতে পারলেও, মাটি টাকা হয়েছে। লোকে এখন শখের টবে গাছ লাগানোর মাটি কেনে চড়া দামে।
এই পেল্লায় ফ্ল্যাটেই যেমন যে-ক’টা ব্যালকনি চোখে পড়ছে, উঁকি মারছে টবের সারি। পুরোনো দৃশ্য বলতে শুধু গলিতে বাঁক নেবার মুখে নোংরা-আবর্জনার ছোট্ট স্তূপ, দু-চার জায়গায় কুকুরের বিষ্ঠা, রাস্তায় উড়ে বেড়ানো বাউন্ডুলে পলিথিন-প্যাক।
মনে পড়ে, নোকিয়ার পুরোনো বেসিক মডেলের ফোনে ‘স্নেক জেঞ্জিয়া’ নামে একটা গেম থাকত। একটা সাপ বড় হতে হতে শেষমেশ নিজের লেজে মুখ দিয়ে ফেলে মরে যেত। চারপাশটাকে সেরকমই আত্মভুক বলে মনে হয় দময়ন্তীর। কিন্তু গতি কমানোর উপায় নেই। দময়ন্তী নিজেই কি পারবে গতি কমাতে? একটা ইকুইলিব্রিয়ামে চলতে চলতে গতি কমানো মানে আত্মহত্যা।
ধীর পায়ে বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল দময়ন্তী। বাড়িটাকে আপাদমস্তক দেখল ভালো করে। বিবর্ণ দোতলা বাড়িটার ছাদের দিক থেকে দেওয়াল ফুঁড়ে অশ্বত্থচারা নেমে এসেছে। সারাই দরকার। দময়ন্তী গত বছর এস্টিমেশন নিয়েছিল। যা খরচ হবে, তার চেয়ে ফ্ল্যাট করে নিলে অনেক সুবিধা। মা-বাবা তাতে রাজি। কিন্তু ভাগের বাড়ি। সব শরিক রাজি নন। ফলে বিষয়টা ঝুলে আছে। অশ্বত্থচারাও বাড়ছে।
দরজা খুলে দময়ন্তীকে দেখে মা অবাক, ‘তুই? এখন?’
‘সময় পেলাম, চলে এলাম।’ বলে মা-কে ভালো করে লক্ষ করেই চোখ কপালে তোলে দময়ন্তী, ‘আরে! এ কী কাণ্ড! চুল কেটে ফেলেছ?’
গলায় শ্লেষ্মা। খড়-কাটা মেশিনের মতো শব্দ করে হাসলেন মা, ‘আর বলিস না। বাবলিদির কাণ্ড। পাড়ায় নতুন একটা পারলার খুলেছে। অফার দিচ্ছিল। জোরজার করে নিয়ে গিয়ে…। আমি তো লজ্জায় মরছি।’
‘দুর্দান্ত লাগছে। বিশ্বাস করো।’
‘ভিতরে আসবি তো? নাকি গেটে দাঁড়িয়ে কথা বলে চলে যাবি?’ গেট ছেড়ে দাঁড়ালেন মা, ‘আয়।’
দময়ন্তী বারান্দায় জুতো ছেড়ে ঘরে ঢুকে দেখল দেওয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ছে। দেওয়াল-ঘেঁষা মেঝে ধুলো-ধুলো হয়ে আছে। বাড়ির পিছনে জলাজমি। ফলে গোটা বাড়িটাই ভীষণ ড্যাম্প। ছোট থেকে দময়ন্তীর মনে হত, ড্যাম্পের বাংলা অনায়াসে মনখারাপ হতে পারে। তার বিষাদরোগের সঙ্গে এ-বাড়ির নোনা-ধরা দেওয়ালের কী যেন একটা গভীর আত্মীয়তা আছে। আজকাল এ-বাড়িতে ঢুকলে একটা নতুন উপসর্গ দেখা দেয়। অকারণ একটা অপরাধবোধ গলা চেপে ধরে। মা-বাবা নতুন ফ্ল্যাটে যেতে রাজি হননি। তবে মাঝে মাঝে মনে হয়, সে কি আরেকটু জোর করতে পারত না?
গেটে তালা দিয়ে এসে মা বললেন, ‘এমন অদ্ভুত সময়ে এলি যে!’
‘নতুন কেস পেয়েছি। আবার কবে আসতে পারব ঠিক নেই। তাই চলে এলাম। বাবা কই?’
‘গ্যানার দোকানে, আবার কোথায়!’ বলে একটু অভিমানী স্বরে মা বললেন, ‘তুই কি আস্তে আস্তে বাড়ি আসা ছেড়েই দিবি?’
দময়ন্তী সোফায় বসল। বলল, ‘সময় হয় না মা। জানো তো কীরকম চাপের মধ্যে থাকি। এই তো একটু সময় পেতেই চলে এলাম।’
‘আজকাল তো মাঝেমাঝে রাতের ফোনটাও করতে ভুলে যাস।’
‘এই চাকরিতে এরকম হবেই, মা। কিছু করার নেই।’
‘ছাড় ওসব কথা। চা খাবি?’
‘না। তুমি একটু বসো তো।’
মা বসলেন। নাক টানলেন, ‘দ্যাখ না, বাবলিদের বাড়িতে লোভে পড়ে আইসক্রিম খেয়ে ফেললাম। ঠান্ডা লেগে গেল।’
‘বেশ করেছ খেয়েছ। ভেপার নাও, ঠিক হয়ে যাবে।’
‘কী কেস পেলি?’
‘মজন্তালী সরকারের নাম শুনেছ?’
‘বদমাশগুলোকে ধরে ধরে খুন করে বেড়াচ্ছে, সেই মেয়েটাই নাকি?’
‘ঠিক বলেছ। সেই কেস।’
‘মেয়েটা কে রে?’
‘তাকেই তো খুঁজছি।’
‘ভালো কাজই তো করছে। ধরবি কেন?’
‘তা বললে তো হয় না, মা। আইন কেউ নিজের হাতে তুলে নিতে পারে, বলো?’
মা জবাব দিলেন না। একটু ঝিম মেরে থেকে বললেন, ‘হ্যাঁ রে, রঞ্জনের মায়ের কাছে যাস? কথাটথা হয়?’
‘নিজের মা-বাবার কাছেই আসতে পারি না, আবার রঞ্জনের মা! তবে কথা হয়। ফোন করি।’
‘যাস একটু। দুঃখী মানুষ।’
রঞ্জনের মায়ের দুঃখের পর রাঙামামার ছেলের আমেরিকা-যাত্রা, মেজোপিসির হাঁটুর অপারেশন, জিনিসপত্রের আগুনে দাম, দময়ন্তীর রোগা হয়ে যাওয়া ইত্যাদি নিয়ে খানিকক্ষণ আতোলবেতোল কথা বলার পরেই কথা শেষ হয়ে যায়। মা-মেয়ে চায়ের কাপ হাতে বসে থাকে মুখোমুখি। মাঝখানে ওয়াঘা বর্ডার। এত সহজে মায়ের সঙ্গে কথা ফুরিয়ে যায় কেন, কে জানে। ভিতরে তো কত কথা জমে আছে বরফ হয়ে। মায়েরও আছে নিশ্চয়ই।
দময়ন্তী জানে না বরফগুলো কোনওদিন গলবে কিনা। কে ফিরিয়ে দেবে ওম? কে সেলোটেপ দিয়ে যত্ন করে জুড়ে দেবে ছেঁড়া তার? সে কি মাকে বোঝাতে পারবে যে, সব সন্তান তার মা-বাবাকে প্রশ্নহীন আনুগত্য উপহার দিতে পারে না? সে কি বলতে পারবে যে সেটা নিশ্চিত করতে চাইলে বাচ্চা পয়দা না করে কুকুর পোষা উচিত ছিল? নাকি বুঝিয়ে বলতে পারবে যে যখন একটা বাচ্চা মেয়ে দ্যাখে প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে তার মা-বাবা অন্য লোকের কথায় কান দিচ্ছে, তখন তার কতটা নিরালম্ব লাগে? পায়ের তলার মাটিকে মণিপুরের লোকটাক হ্রদের সেই ভাসমান শ্যাওলার মতো লাগে। ফুমডি। না। বলতে পারবে না দময়ন্তী। বললেও মা বুঝবে না।
মা-বাবার সঙ্গে শেষ ট্যুর ওই মণিপুর। ষোল বছর আগে। আর যাওয়া হবে কিনা, কে জানে! মিসোজিনিস্ট, ‘আলফা মেল’ বাবার সঙ্গে যোগাযোগের রাস্তা কবেই ধস নেমে ভেঙেচুরে গেছে। আফসোস, অপ্রাপ্তি আর অবুঝ গার্হস্থ্য অভিমান দিয়ে গড়া পেটি-মধ্যবিত্ত মায়ের সঙ্গে একটা সরু সুতো রয়ে গেছে কোথাও।
মা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘দুপুরে খেয়ে যাবি তো? খেয়ে যাস। কতদিন আমার কাছে খাস না।’
কথাটা মেয়ের কানে গেল না। মায়ের কবজিতে হলুদের দাগ আর তেবড়ে যাওয়া নোয়ার দিকে তাকিয়ে মেয়ে তখন মনে মনে বলছে, আই মিস ইউ মা! শুধু সামনাসামনি বলতে পারি না। হয়তো কোনওদিন বলতে পারব। তুমি একটু অপেক্ষা কোরো। একটু সময় দিও আমায়।
.
বালিগঞ্জ, লাইভ নিউজের অফিস, বিকেল ৩টে ৩০
রণ বলল, ‘আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। রেপিস্টদের খুন করছে তার না-হয় একটা যুক্তি আছে। কিন্তু একটা ম্যাগাজিনকে হুমকি দেবার কী কারণ?’
সৌমিলি বলল, ‘ফোনেই তো বলেছে। ম্যাগাজিনটায় মেয়েদের কমোডিটিফাই করা হয়।’
‘সেটা তো শুনলাম। কিন্তু কথাটার মানে কী? লোকে চাইছে বলেই তো এসব হচ্ছে। সিম্পল মার্কেট ইকোনমি।’
‘লোকে চাইলেই সেটা ঠিক, এমন কথা কে বলল তোকে? বিদ্যাসাগর বিধবা বিবাহের পক্ষে এগারোশো সই জোগাড় করেছিলেন। আর রক্ষণশীলরা কত সই জোগাড় করেছিল জানিস? দশ হাজারের ওপর।’
‘আমি তোর পয়েন্টটাই বুঝতে পারছি না। নায়িকারা তো স্বেচ্ছায় জামাকাপড় কম পরে। ম্যাগাজিনের দোষ কোথায়? এটা তাঁদের ব্যক্তিস্বাধীনতা। লোকের ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করার আমরা কে?’
শিরিন তেতে উঠে বলল, ‘সতীদাহ বা বাল্যবিবাহের মতো সিস্টেমকেও কি তুই ব্যক্তিস্বাধীনতা দিয়ে জাস্টিফাই করবি? ঠিক কোন লিমিটটা পেরিয়ে গেলে ব্যক্তিস্বাধীনতা সমাজের জন্য অপরাধ হয়ে ওঠে, সেটা ভাবার দরকার নেই?’
রণ আকাশ থেকে পড়ার মতো মুখ করল, ‘একটা ফ্যাশন ম্যাগাজিন কোন অ্যাঙ্গেল থেকে ক্ষতিকর ভাই?’
‘যৌনতা মানুষের নিজের চয়েজ। কিন্তু যৌন সুড়সুড়ি বিক্রি করাটা অন্যায়। সুড়সুড়ির বাইরে ফ্যাশন নেই? সবটা মিলেই একটা অবমাননাকর সিস্টেম গড়ে ওঠে, রণ। ম্যাগাজিনও তার একটা অংশ। একজন নারী হিসেবে মজন্তালী সেটার প্রতিবাদ করছে। প্রতিবাদের রাস্তাটা হয়তো আইনের চোখে ভুল। কিন্তু প্রতিবাদ কেন করছে সেটা নিয়ে প্রশ্ন তুলিস না প্লিজ।’
এইচআরের শর্মিষ্ঠাদি রণকে ডেকে পাঠানোয় আলোচনাটা সেখানেই থামল।
সৌমিলি বলল, ‘ছাড় না। ও একটা মিসোজিনিস্ট। ওকে এসব বুঝিয়ে লাভ নেই।’
শিরিন বলল, ‘না রে। কথা বলা দরকার। ছেড়ে ছেড়েই আজ এই হাল।’
শাক্য এতক্ষণ কফি খেতে খেতে ঝগড়াঝাঁটির মজা নিচ্ছিল। এবার বলল, ‘মজন্তালী তাহলে গোটা পেট্রিয়ার্কির বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করে দিল?’
‘তাই তো দেখছি,’ সৌমিলি বলল, ‘কিন্তু এইগুলো বোধহয় আমজনতার জন্য হজম করা একটু কঠিন হয়ে যাবে।’
শিরিন বলল, ‘কঠিন হোক, কিন্তু কথাগুলো ওঠা শুরু হোক।’
‘এটা ঠিক বলেছিস,’ শাক্য বলল, ‘মজন্তালী শুধু খুন করছে না, কিছু জরুরি প্রশ্নও তুলছে। লীনা জনসমক্ষে এসে খুব প্রয়োজনীয় একটা স্ট্যান্ডপয়েন্ট নিয়েছে। এইখানে কিন্তু আমাদের সুযোগ আছে মিডিয়ার ক্ষমতাকে ব্যবহার করে প্রশ্নগুলোকে আন্ডারলাইন করার। চ্যানেল কতটা অ্যালাও করবে জানি না।’
‘আমরা সাবোটাজের চেষ্টা করে যাব।’ হাসল শিরিন।
সৌমিলি বলল, ‘লীনার মতো সাহসী মেয়ে এই সময়ে আর একজনকেই মাত্র দেখেছি। সুজান জর্ডান। মজন্তালীর খবরের চোটে তাঁর মৃত্যু পিছনের সারিতে চলে গেল। ইনফ্যাক্ট, মজন্তালী চিঠিতে যে-কথাটা বলছে, সেটা সুজান বারবার বলে গেছেন।’
সৌমিলি বলল, ‘মনে পড়লেই গা রি-রি করে, দক্ষিণ কলকাতার একটা রেস্তোরাঁ পর্যন্ত সুজানকে ঢুকতে বাধা দিয়েছিল। জাস্ট বিকস শি ইজ আ রেপ ভিকটিম। আমি যে কতটা ইতর লোকজনে ভরা একটা দেশে বাস করি, সুজান জর্ডানের অভিজ্ঞতা সেটা আমায় শিখিয়েছে ভাই। যদিও ওঁর মৃত্যু হয়েছে রোগে ভুগে, তবু আমার মনে হয় এই একটা মৃত্যু আমাদের সবার দিকে আঙুল তুলে আছে।’
‘বরুণ বিশ্বাসের মৃত্যুও তাই।’ বলল শিরিন।
শাক্য বলল, ‘আচ্ছা তোদের কী মনে হয় বল দেখি, মজন্তালী সরকার কি বরুণ বিশ্বাসের কেউ হয়? বারোই সেপ্টেম্বর ডেটটাই কেন বেছে নেবে না-হলে?’
.
