ত্রয়োবিংশ দিন
তারিখ : ২৪ আগস্ট, ২০১৩
কেষ্টপুর, সকাল ১১টা
এডিজি প্রবীর চক্রবর্তী আজ অফিস যাননি। ফলে অমিতাভকে তাঁর কেষ্টপুরের বাড়িতে যেতে হল।
কফিতে চামচ নাড়তে নাড়তে প্রবীরবাবু বললেন, ‘প্রেস রিলিজ দিয়ে দাও। যদি পরে সাইডকিক বলে প্রমাণিতও হয়, তা-ও শি ক্যাটারস আ সুটেবল স্টোরি। এই মেয়েটির নিজের একটা খারাপ ইতিহাস আছে। যতদিন আসল মজন্তালীরা ধরা না পড়ছে, শি উইল ডু।’
অমিতাভ মাথা নেড়ে সায় দিলেন, ‘ইয়েস। শি উড বি আ গুড প্রক্সি।’
‘নর্থ বেঙ্গল কানেকশন দেখছি এই কেসের পিছু ছাড়ছে না,’ নাক চুলকে প্রবীরবাবু বললেন, ‘আচ্ছা, ওখানকার লেডি অফিসার যাঁদের শর্টলিস্ট করেছিলে, তাঁদের কী খবর? এনি ফিশি বিজনেস?’
‘তাঁদের পিছনে ফেউগিরি করা সহজ কাজ নয়, জানেনই তো। চেষ্টা চলছে। এখনও তেমন কিছু জানতে পারিনি।’
‘সর্বাণীর সঙ্গে কথা হয়েছে?’
‘এখনও হয়নি। নানা ঝামেলায় আটকে যাচ্ছি।’
‘বলো। শি ক্যান হেল্প।’
‘হ্যাঁ, যদি না…।’ বলে থেমে গেলেন অমিতাভ।
ঝট করে তাকালেন প্রবীরবাবু, ‘যদি না?’
দীর্ঘশ্বাস ফেলে অমিতাভ বললেন, ‘কিছু না স্যার। আমি কথা বলে নেব।’
প্রবীরবাবুর পরিমিতিজ্ঞান অসামান্য। স্থির চোখে কয়েক সেকেন্ড চেয়ে থেকে তিনি বললেন, ‘দ্যাখো, পুকুরে একটা ঢিল পড়লে কোনও তরঙ্গ জাগবে না তা তো হয় না। এরিয়া এবার ছোট হয়েছে। শুধু নর্থ বেঙ্গলের দিকে ফোকাস করতে হচ্ছে। আশা করি তরঙ্গটাকে এবার ট্র্যাক করা খুব কঠিন হবে না।’
অমিতাভ নীরবে মাথা নাড়লেন।
‘কফি ঠান্ডা হয়ে গেল।’
‘খাচ্ছি স্যার।’
ফোনে মন দিয়ে কিছু-একটা দেখতে দেখতে হঠাৎ কিছু মনে পড়ার ভঙ্গিতে মুখ তুললেন প্রবীরবাবু, ‘আচ্ছা শোনো, কাল দুপুর তিনটেয় ঘণ্টাদেড়েক সময় ফাঁকা রেখো। একটা জায়গায় যেতে হবে। অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কাজ।’
‘কোথায়?’
‘রাজ্য সরকার একটা নতুন প্রজেক্ট লঞ্চ করছে শুনেছ? সমস্ত স্কুল-কলেজে ছাত্রীদের জন্য বাৎসরিক একটা থোক টাকা। মেয়েদের স্কুলছুট যাতে কমে, যাতে উচ্চশিক্ষাতেও তারা আগ্রহী হয়।’
‘শুনছিলাম। খুব ভালো প্রজেক্ট হতে চলেছে।’
‘এই প্রজেক্ট নিয়েই কাল সরকারি বৈঠক। সিএম চাইছেন তুমিও থাকো।’
অমিতাভ চমকালেন, ‘সিএম চাইছেন?’
বর দেবার সময় সিনেমা-সিরিয়ালে ঠাকুরদেবতাদের যেরকম দেখায়, ঠিক সেরকম দেখাল প্রবীরবাবুর মুখটা, ‘হ্যাঁ। শুনলাম তোমার ওপর নাকি এখন বেশ সদয়। কাল কথা বললে অপূর্ণ মনস্কামনা পূর্ণ হতে পারে।’
.
ভবানী ভবন, সকাল ১১টা ৩০
চয়নিকা রাউতের কাছে মামণি হেমব্রম বিষয়ে কিছু তথ্য পাওয়া গেল। সুতাহাটা থানা থেকেও খবর এসে পৌঁছেছে। তথ্যগুলো অবশ্য যথেষ্ট নয়। মামণির আপন বলতে শুধু বাপ। সান্ত্রাস মিস্ত্রির কাজ করে আর মদ খেয়ে এখানে-সেখানে পড়ে থাকে। মেয়েকে নিয়ে তার মাথাব্যথা নেই। মামণি মাধ্যমিক পাশ করে টাকাপয়সার অভাবে আর পড়াশোনা চালাতে পারেনি। বন্ধুবান্ধব নেই। মাঝেসাঝে কোথায় চলে যায়। আবার ফিরেও আসে। ব্যাপারটা সন্দেহজনক। এর সদুত্তর দিতে পারে একমাত্র মামণির মাতাল বাপ। তা সে মিস্ত্রির কাজ করতে কোথায় চলে গেছে, কেউ খোঁজ দিতে পারেনি।
অফিশিয়াল বয়ান রেকর্ড করিয়ে দময়ন্তী চয়নিকাকে জিগ্যেস করল, ‘মামণির সঙ্গে আপনারা কথাবার্তা চালাতেন কীভাবে?’
‘কথাবার্তা আর কী?’ চায়ে বিস্কুট ডুবিয়ে অবজ্ঞার গলায় চয়নিকা বললেন, ‘খাওয়া, বাথরুম যাওয়া এইগুলো ইশারায় বুঝিয়ে দিতে পারত। ওতেই কাজ চলে যেত।’
সরকারি হোমের থেকে এর চেয়ে বেশি কিছু আশা করা অন্যায়। দময়ন্তী বিরক্তি চেপে বলল, ‘ওই সময় যারা হোমে কাজ করতেন, তাদের একটা তালিকা আমায় পাঠিয়ে দেবেন প্লিজ। বয়েস, ডেজিগনেশন, ঠিকানাসহ।’
মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন চয়নিকা। তারপর বললেন, ‘মেয়েটা ক্লেপটোম্যানিয়াক ছিল। কিন্তু খুনটুন করার মতো গাটস আছে বলে মনে হয়নি, জানেন? খুন করতে একটা আলাদা ইয়ে লাগে। সবার মধ্যে ও-জিনিস থাকে না।’
‘মামণির সঙ্গে দেখা করবেন নাকি?’
‘না। দেখা করে আর কী করব।’
‘আপনাকে দেখে কী প্রতিক্রিয়া হয় সেটা একটু দেখতে চাইছি। চা খেয়ে চলুন না একবার।’
চয়নিকার মুখে অনিচ্ছার রেখা ফুটল। চট করে সেটা গোপনও করলেন অবশ্য। তারপর কী ভেবে নিচু গলায় বললেন, ‘একটা কথা জিগ্যেস করব ম্যাডাম?’
‘করুন।’
‘খবরে স্পষ্ট করে কিছু বলছে না। হয়তো আপনাদের বারণ আছে। হিরোইন সম্পূর্ণা মিত্রই রেখা। তাই না?’
.
কাশীপুর, দুপুর ২টো ৩০
ক্যামেরা রোল হচ্ছে। পাহাড়ি নদীর মতো অনায়াস ভঙ্গিতে কথা বলে চলেছে লীনা। শালিনী মাঝেমাঝে ধরতাই দিচ্ছে। দুজন মিলে আশ্চর্যরকম সাবলীল একটা কথোপকথন বুনে তুলছে। সৌমিলিরা মুগ্ধ হয়ে শুনছিল।
রিলেশনশিপ সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তরে লীনা বলল, ‘দীর্ঘ তিন বছর একটা সম্পর্কে ছিলাম৷ বছরখানেক আগে সেটা ভেঙেও গেছে৷ আমি এখন সামনে দিকেই তাকাচ্ছি। এই মুহূর্তে আমার লক্ষ্য একটা ঠিকঠাক চাকরি জোগাড় করা।’
শালিনী প্রশ্ন করল, ‘কী ধরনের চাকরি করার ইচ্ছে?’
‘একসময় স্কুল বা কলেজের চাকরি করতে চাইতাম৷ এই মুহূর্তে সেটা চাই না। পাবলিক সেক্টরে কাজ করতে চাই না৷ কম মানুষের সঙ্গে ইন্টেব়্যাক্ট করতে হয়, এমন কাজ করতে চাই। আমি বুঝতে পারছি এই পারমানেন্ট ক্ষতিটা আমার হয়ে গেছে৷ আমার চারপাশে অনেকেই খুব সাপোর্টিভ। বিশেষত আমার বাবা আর আমার বন্ধুরা। তাঁরা আমাকে সেরে উঠতে সাহায্য করছেন। কিন্তু সব হুবহু আগের মতো হবে না। অন্তত এখনই হবে না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হয়তো কিছুটা হবে। দেখা যাক।’
শিরিন সৌমিলির কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, ‘মায়ের কথা বাদ দিয়ে গেল।’
সৌমিলি জবাব দিল, ‘খেয়াল করেছি।’
লীনার কাছে শালিনীর পরের প্রশ্ন, ‘বিয়ে নিয়ে কিছু ভাবছেন?’
এ-প্রশ্নের উত্তর যেন লীনার ঠোঁটের ডগায় ছিল, ‘না, ভাবছি না। বুঝতেই পারছেন, আমাদের সামাজিক পরিস্থিতিতে খুব সম্মানজনক শর্তে বিয়ের অপশন আমি আর পাব না। যদি কোনও কারণে পেয়েও যাই, তাহলেও আমি সম্ভবত রাজি হব না। বিয়ের রাস্তা আমার জন্য বন্ধ।’
‘আপনি বই পড়তে ভালোবাসেন। প্রিয় লেখক কে?’
‘শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় আর জয় গোস্বামী।’
‘লীনা, আপনি কি প্রেমে বিশ্বাস করেন?’
‘করি। আমি পুরুষের কাছে শুধু দস্যুতা প্রত্যাশা করি না। আমি আমার বাবাকে দেখেছি। আমার প্রিয় অন্তত তিন-চারজন বন্ধু ছেলে। তাদের দেখেছি। আমি পুরুষের ওপর থেকে বিশ্বাস হারাচ্ছি না। ফলে আমি প্রেমেও বিশ্বাস রাখছি।’
‘এই কথাটা খুব জরুরি,’ শালিনী বলল, ‘ধর্ষণ, শ্লীলতাহানি নিয়ে কথা উঠলেই নারী-পুরুষ বাইনারি চলে আসছে কোথাও।’
লীনা মাথা নাড়ল, ‘এটাই তো সবচেয়ে বড় সমস্যা। আমরা ঠিকঠাক সমস্যাটাই চিহ্নিত করতে পারি না। ব্যাপারটা নারী-পুরুষ বাইনারিতে দেখাই তো ভুল। এমন অনেক নারী আছেন যারা মনে করেন নারীর জায়গা পুরুষের নীচে। এমন অনেক পুরুষ আছেন যারা পিতৃতান্ত্রিক চিন্তাভাবনা থেকে মুক্ত। যারা চান মেয়েরা নিজের মতো করে বাঁচুক। তাঁরা নারী বলতে নারীর শরীরকে বোঝে না। লড়াইটা শুধুমাত্র নারীর লড়াই ছিলই না কোনওদিন। লড়াইটা একটা খারাপ ভাবনার সঙ্গে একটা ভালো ভাবনার। লিঙ্গবৈষম্যবিরোধী সমস্ত মানুষের লড়াই এটা। পুরুষতন্ত্র শুধু পুরুষের মধ্যে দিয়েই না, নারীর মধ্যে দিয়েও কাজ করে। আমি আবারও বলি, এই লড়াই পুরুষের বিরুদ্ধে নয়। এই লড়াই নারীর লড়াই নয়। এই লড়াই পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার লড়াই।’
‘ঠিক।’ সায় দিল শালিনী, ‘পুরুষতন্ত্রের বাহক নারী-পুরুষ যে কেউই হতে পারে। আবার তার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ব্যাটনটাও নারী-পুরুষ নির্বিশেষে যে-কেউই হাতে তুলে নিতে পারেন। আমাদের সমস্যাটা বুঝতেই পারছি না। ঠিক শত্রু চিহ্নিত না করতে পারলে তো লড়াইটাই ভুল হয়ে যাবে। আমাশা হলে নিউমোনিয়ার ওষুধ খেলে কি কাজে দেয়? দেয় না তো।’
‘দারুণ বলেছেন।’ হেসে উঠল লীনা।
একটা মুখরোচক প্রশ্ন করার লোভ সামলাতে পারল না শালিনী৷ টিআরপি-র স্বার্থে এরকম দু-একটা প্রসঙ্গ আনতে হবে, চ্যানেল আগেই বলে রেখেছে। দর্শক তো সিনেমা-সিরিয়াল ছেড়ে শুধু জ্ঞান শুনতে রাজি হবে না। একটু ‘রিলিফ’ দরকার। শালিনী প্রশ্ন করল, ‘লীনা, আপনি বললেন আপনার আগের সম্পর্ক ভেঙে গেছে। এখন তাহলে আপনি কারো সঙ্গে সম্পর্কে নেই?’
উত্তর দিতে সময় নিল লীনা। একটু ভেবে বলল, ‘না৷ তবে স্পেশাল একজন রয়েছেন, এটা অস্বীকার করব না। আমি তাঁকে ভালোবাসি৷ তিনি বাসেন কিনা জানি না৷’
‘আমি তার নাম জানতে চাইব না৷ তিনি কী করেন সেটুকু বলা যাবে কি? তিনি কি আপনার সহপাঠী?’
‘না৷ তিনি আমার চেয়ে বয়েসে কিছুটা বড়৷ গভর্নমেন্ট সার্ভিসে আছেন৷ এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে পারব না৷’
‘অনেক ধন্যবাদ লীনা। এবার একটু বিতর্কিত প্রশ্নের দিকে যাব। মজন্তালী সরকার। এই ভদ্রমহিলাকে নিয়ে কিছু প্রশ্ন না-করলেই নয়।’
‘অবশ্যই।’
‘আচ্ছা আপনি কি মনে করেন মজন্তালী সরকারের পিছনে কোনও অলৌকিক কাহিনি রয়েছে?’
‘একেবারেই না। কে বা কারা এটাকে অলৌকিক মোড়ক দেবার চেষ্টা করছে জানি না। কিন্তু মজন্তালী সরকার একেবারেই আমাদের মধ্যে থাকা কয়েকজন মহিলা। আপনার-আমার মতোই কেউ।’
‘তদন্তের গতিপ্রকৃতি বলছে, মজন্তালী সরকার একজন মহিলা নন, একটা ফিমেল গ্যাং। আপনি কি একমত?’
‘হ্যাঁ। আমি নিয়মিত খবর ফলো করছি। যেটুকু বুঝছি, তাতে আমারও তা-ই মনে হয়েছে। এটা একজনের কম্ম না।’
‘মজন্তালীর কেসে আপনি এখনও সন্দেহের তালিকায় রয়েছেন। তিনি বা তারা ধরা না পড়া অবধি সম্ভবত আপনি তালিকায় থেকে যাবেন। এই বিষয়ে আপনার কী বক্তব্য?’
‘কোনও বক্তব্য নেই। আইন আইনের পথে চলুক। আমি জানি সত্যিটা কী। পুলিশ-প্রশাসনকে আমি ধন্যবাদ জানাই। তারা আমার সঙ্গে শুরু থেকেই খুব সংবেদনশীল আচরণ করেছেন। সংবাদমাধ্যমের প্রতিও আমি কৃতজ্ঞ। দু-একটি চ্যানেল বাদ দিলে কেউই মিডিয়া-ট্রায়ালে আমায় দোষী সাব্যস্ত করেননি বা অহেতুক উত্যক্ত করেননি।’
অফিসে ফেরার পথে সিগারেট ধরিয়ে সৌমিলি বলল, ‘চমৎকার কথা বলল মেয়েটা। কিন্তু যতটা আশা করেছিলাম, ততটা ফ্রন্টফুটে খেলল না। তাই না? একটু যেন গুটিয়ে গেছে। ওর প্রথম ইন্টারভিউয়ের সঙ্গে আজকের ইন্টারভিউয়ের তফাত কিন্তু স্পষ্ট।’
শিরিন গাড়ির সিটে গা এলিয়ে বলল, ‘লীনা যদি সুজান জর্ডানের মতো না হতে চায়, হবে না। এটা ওর চয়েজ।’
‘না না, সে তো বটেই। ও যা করেছে সেটাও অভাবনীয়। নিঃসন্দেহে। আমি সেটা বলছি না।’
‘আমরা আমাদের প্রত্যাশার ভার কারও ওপর জোর করে চাপিয়ে দিতে পারি না সৌমিলি। সমাজের জন্য সবচেয়ে জরুরি স্টেটমেন্টটা মেয়েটা দিয়ে ফেলেছে। এবার ও নিজের ক্ষত যেভাবে সারাতে চায়, সারাক না। লেট হার বি হারসেলফ।’
.
মিন্টো পার্ক, বিকেল ৫টা
সিআইডি শুনে সময় দিতে বিন্দুমাত্র দেরি করেননি সাইকোলজিস্ট সবর্ণা চট্টোপাধ্যায়। তাঁর বয়েস দেখা গেল বেশ কম। বড়জোর আর্লি থার্টিজ হবে। দময়ন্তীকে দেখে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন, ‘আসুন। নমস্কার।’
‘দময়ন্তী মুখার্জী। এস.এস।’ নিজের আই কার্ড দেখিয়ে দময়ন্তী বলল, ‘আপনার এক পেশেন্টের বিষয়ে কিছু জিজ্ঞাস্য ছিল।’
‘অবশ্যই,’ সবর্ণা চেয়ারের দিকে নির্দেশ করলেন, ‘বসুন প্লিজ।’
দময়ন্তী বসল।
‘আপনি কোন কেসে কাজ করছেন, নিউজ চ্যানেল এবং খবরের কাগজের দৌলতে জানতে বাকি নেই।’
‘আপনার এক পেশেন্ট বীথি মিত্রকে নিয়ে কিছু কথা বলতে চাই।’
‘বীথি মিত্র। হ্যাঁ। সিজোফ্রেনিয়ার পেশেন্ট। চূড়ান্ত অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডার।’
‘হ্যাঁ। ওঁর ইতিহাস জানেন তো?’
‘হ্যাঁ জানি। ওঁর এক মেয়েকে ধর্ষণ করে খুন করা হয়েছিল এবং আরেক মেয়ে সেই ধর্ষককে খুন করেছিল, এটুকু জানি। সেই মেয়ে জুভেনাইল হোমে ছিল কয়েক বছর। তারপর ছাড়া পেয়েছে। মেয়েকে নিয়ে ওঁর দুশ্চিন্তার অন্ত নেই। মেয়েকে নিয়ে অবসেসড বলা যায়।’
‘মেয়েকে নিয়ে এত দুশ্চিন্তা করেন অথচ মেয়ের সঙ্গে থাকেন না কেন, সেই ব্যাপারে কিছু বলেছেন কখনও?’
‘হ্যাঁ। মেয়ে কাজের জন্য কলকাতায় থাকে, কিন্তু বীথিদেবী আর তাঁর স্বামীর কলকাতা পছন্দ না। ভদ্রমহিলার স্কোপোফোবিয়াও রয়েছে। সম্ভবত ওঁর স্বামীরও। পাবলিকের থেকে দূরে নিরিবিলিতে থাকতে চান।’
‘হয়তো লোকলজ্জার ভয়।’
‘তাই হবে। সত্যি বলতে কী, সেটা অস্বাভাবিক কিছু না।’
‘ওঁরা কিন্তু এফিডেভিট করে নাম বদলেছেন। তিনজনেই। এটা জানা ছিল?’
‘তাই নাকি? না, জানতাম না।’
‘আচ্ছা, মেয়ের সঙ্গে ওঁর বন্ডিং কেমন?’
‘খুব ভালো। মেয়েও মা-কে খুব ভালোবাসে। যখনই সময় পায়, শ্রীরামপুরে চলে যায়। গল্প করে। আসতে না-পারলে ভিডিও কলে গল্প করে।’
‘আরেকটা তথ্য মনে হচ্ছে আপনার জানা নেই। সম্পূর্ণা মিত্রকে চেনেন?’
‘অভিনেত্রী সম্পূর্ণা মিত্র? হ্যাঁ।’
‘উনিই বীথি মিত্রের মেয়ে।’
‘তাই নাকি? উনি বলেননি তো।’ বলে হঠাৎ একটু ঝটকা খেলেন সবর্ণা, ‘কিছু মনে করবেন না, নিউজ চ্যানেলে শুনেছি, কোনও এক উঠতি অভিনেত্রীকে নাকি মজন্তালী সরকারের কেসে জেরা করা হয়েছে। সম্পূর্ণা মিত্রই কি সেই অভিনেত্রী?’
দময়ন্তী মৃদু মাথা নাড়ল, ‘আমি সম্পূর্ণার ব্যাপারেই তথ্য জানতে এসেছি। দোষ প্রমাণিত হবার আগে মিডিয়া এবং জনতার ট্রায়ালে যাতে মেয়েটি দোষী সাব্যস্ত না হয়ে যায়, সেজন্যই আমরা নাম প্রকাশ করতে দিচ্ছি না। ফলে আপনাকেও অনুরোধ করব…।’
‘নিশ্চিন্ত থাকুন। পেশেন্টের গোপনীয়তা রক্ষা করা এমনিতেই আমাদের পেশার অঙ্গ। কিন্তু একজনের মায়ের সাইকোলজিস্টের থেকে সেই মানুষটার বিষয়ে কত আর তথ্য পাবেন?’
‘পাচ্ছি তো। আপনি এইমাত্র বললেন না মেয়ের সঙ্গে মায়ের বন্ডিং খুব ভালো?’
‘হ্যাঁ।’
‘তদন্তে এইসব খুঁটিনাটি বিষয়ই কাজে লেগে যায়। আচ্ছা, বন্ডিং ভালো মানে কি মেয়ে মায়ের সঙ্গে অনেক কিছু শেয়ার করে?’
‘যা ভাইব পেয়েছি, মা-মেয়ে দুজনেই দুজনের বেস্ট ফ্রেন্ড। ফলে শেয়ারিং হতেই পারে।’
‘আপনি বলছেন যে বীথি মিত্রের মেইন কনসার্ন এখন এই মেয়েকে নিয়েই?’
‘মূলত।’
দময়ন্তী চোখ সরু করে ভাবল খানিকক্ষণ। আঙুল-টাঙুল মটকাল। তারপর জিগ্যেস করল, ‘বীথি মিত্রের সঙ্গে শেষ সেশন কবে করেছেন?’
‘এই তো, দিন পাঁচেক আগে।’
‘অসাধারণ! শেষ সেশনে এই নিয়ে কিছু কথাবার্তা হয়েছে?’
‘উনি সেদিন বারবার বলছিলেন, ওঁর মেয়ে নির্দোষ। মেয়ে শুধু অভিনয় করছে। এটাই বলছিলেন বারবার। এবার কথাটার মানে আমি বুঝতে পারছি। সম্পূর্ণা তো অভিনেত্রীই।’
‘আপনাকেও এই কথাটা বলেছেন!’ উত্তেজনায় টেবিলে চাপড় মেরে বসল দময়ন্তী, ‘কিন্তু আপনি কি নোটিশ করেছেন যে ক্রিয়াপদের কালে একটা কিছু গোলমাল হচ্ছে?’
সবর্ণা ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, ‘ক্রিয়াপদের কালে গোলমাল? কীরকম?’
‘করছেন। মানে ঘটমান বর্তমান। প্রেজেন্ট কন্টিনুয়াস। কিন্তু আসল কথাটা হচ্ছে সম্পূর্ণা অভিনয় করেন। সাধারণ বর্তমান। সিম্পল প্রেজেন্ট টেনস। বীথিদেবী হঠাৎ সাধারণ বর্তমানকে ঘটমান বর্তমান করে ফেলছেন কেন?’
‘আমি ঠিক বুঝতে পারছি না আপনি কী বলছেন।’
‘আমি যেদিন শ্রীরামপুরের বাড়িতে গেছিলাম, সেদিন বীথিদেবী ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। সেদিনও সাধারণ বর্তমানকে ঘটমান বর্তমান করে ফেলেছেন। আপনার কাছেও তাই করেছেন। আচ্ছা, আপনি কত বছর হল দেখছেন বীথি মিত্রকে?’
‘বছর চারেক তো হবেই।’
‘একটু খেয়াল করে বলুন তো, মেয়েকে নিয়ে দুশ্চিন্তা গত এক মাসে খুব বেড়ে গেছে কিনা?’
সবর্ণা মনে করার চেষ্টা করলেন। বললেন, ‘হ্যাঁ, তা তো বেড়েইছে।’
‘গত এক মাসে বেড়েছে, না গত দিনদশেকের মধ্যে বেড়েছে? এভাবে বলা খুব কঠিন। তবু প্লিজ একটু মনে করার চেষ্টা করুন।’
সবর্ণা একটু ভেবে বললেন, ‘আমি বলব গত দেড় মাস। তবে দিন দশ-পনেরো হল মারাত্মক বাড়াবাড়ি শুরু হয়েছে। আমি নতুন একজন সাইকিয়াট্রিস্টও সাজেস্ট করেছি।’
‘আপনারা সাইকোলজিস্টরা সম্ভবত প্রতি সেশনে রোগীর উন্নতি বিষয়ে নোটস নেন। তাই না? সবার পদ্ধতি অবশ্য মেলে না।’
‘আমি নিই।’
‘বীথি মিত্রের নোটসগুলো আমার লাগবে। আপনি আজই জেরক্স করিয়ে রাখবেন প্লিজ? আমি লোক পাঠিয়ে নিয়ে নেব।’
‘বেশ। কিন্তু এই কাগজগুলো যদি শুধু আপনিই হ্যান্ডল করেন, খুব ভালো হয়। পেশেন্টের তথ্য আমাদের জন্য খুবই কনফিডেনশিয়াল। আমি চাই না তথ্যগুলো পাঁচ-হাত হোক।’
‘নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। আমি এটা সম্পূর্ণ নিজের দায়িত্বে রাখব।’
বেরিয়ে এসে দময়ন্তী গাড়িতে বসে রইল খানিকক্ষণ। স্টার্ট দিল না। মাথার ওপর পাখির মতো গোল হয়ে ঘুরছে টেনসের গন্ডগোল। ক্রিয়ার কাল। ‘অভিনয় করে’ আর ‘অভিনয় করছে’-র মধ্যে অতি সূক্ষ্ম এক ব়্যাডক্লিফ লাইন আছে। কিন্তু ইতিহাস? তাকেও তো অস্বীকার করা যায় না।
.
কালীঘাট, সন্ধে ৭টা
চমৎকার সাজানো-গোছানো ঘরটায় ঢুকেই মুগ্ধ হয়ে গেছিল শালিনী। কিন্তু ঘরের লোকজনের দিকে চোখ পড়তেই সেই মুগ্ধতা লেবুর রস পড়ে দুধ কাটার মতো কেটে গেল। উপাসনা আচার্যের সঙ্গে যাঁরা বসে আছেন তাঁদের মধ্যে দুজনকে শালিনী চেনে। প্রয়াত সুজান জর্ডানের মেয়ে লিলি জর্ডান আর অ্যাসিড-আক্রমণের ভিক্টিম তিয়াসা পৈলান। এরা এখানে কেন?
শালিনীর মুখ দেখে উপাসনা স্মিত হাসলেন, ‘মনে হচ্ছে এখানে দু-একজনকে তুমি চেনো।’
‘লিলি আর তিয়াসাকে চিনি,’ অপ্রস্তুত ভাবটা যথাসম্ভব চাপা দেবার চেষ্টা করল শালিনী, ‘চিনি মানে টিভিতে দেখেছি।’
‘বেশ। বাকিদের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই। উনি কাবেরী সান্যাল।’ বলে মাঝবয়সি ভদ্রমহিলার দিকে নির্দেশ করলেন উপাসনা। অফহোয়াইট শাড়ি। মিনাকারি কাজের পাড়। বেশ সম্ভ্রান্ত চেহারা। কাবেরী হাত জোড় করে নমস্কার জানালেন। প্রতিনমস্কার করল শালিনী।
উপাসনা বললেন, ‘কাবেরীদির আরেকটা পরিচয় হয়তো তোমায় এক্সাইটেড করবে। এস এস অমিতাভ সান্যাল ওঁর স্বামী।’
‘প্রাক্তন স্বামী।’ কাবেরীর ঠোঁট প্রসারিত হল।
‘সরি,’ জিভ কাটলেন উপাসনা, ‘প্রাক্তন স্বামী। আর ওই সোফায় ওঁরা দুজন জামদুনি থেকে এসেছেন। এই মুহূর্তে জামদুনির প্রতিবাদের মুখ। ঝুম্পা কয়াল আর মৌমিতা কয়াল।’
শেষ দুজনকে প্রতিনমস্কার জানাতে জানাতে শালিনীর মনটা আচমকা অনির্দেশ্য একটা আশঙ্কায় দুলে উঠল। এদের মধ্যে অনেকেই মজন্তালীর কেসে সাসপেক্ট। এরা সবাই এক জায়গায় হচ্ছে সত্যিই কোনও সেবামূলক উদ্দেশ্য নিয়ে? নাকি দ্বৈপায়ন হ্রদে আরও গহীন কোনও উদ্দেশ্য লুকিয়ে আছে? দময়ন্তীদি বলেছিল, মজন্তালী সরকার একটা গ্যাং। গার্লস গ্যাং। উপাসনা অন্যান্যদেরও পরিচয় দিচ্ছেন, কিন্তু শালিনীর কানে ঢুকছে না কিছুই। পায়ের তলা শিরশিরিয়ে উঠছে। উপাসনা এই দুদিন কোথায় ছিলেন? এখানে ডেকে এনে কি তাকেও জড়িয়ে নেবার চেষ্টা করা হচ্ছে?
শালিনীর মুখে নানারকম ভাবনার ঢেউ খেয়াল করে। উপাসনা জিগ্যেস করলেন, ‘কী হল শালিনী? এনিথিং রং?’
শালিনী খুব দ্রুত পরের পদক্ষেপ নির্ণয়ের চেষ্টা করছিল। ঝট করে বলল, ‘আমার হঠাৎ একটা আর্জেন্ট কাজের কথা মনে পড়ে গেছে উপাসনাদি। ভুলে গেছিলাম। আমাকে যেতে হবে।’
‘চলে যাবে?’ অবাক হলেন উপাসনা।
‘হ্যাঁ। ইটস ভেরি আর্জেন্ট। আমার মাথা থেকে বেরিয়ে গেছিল একদম।’
খুব অকওয়ার্ড একটা পরিস্থিতি। সবাই শালিনীর মুখের দিকে চেয়ে আছে। উপাসনা একটু যেন ক্ষুণ্ণ হলেন। তবে সেটা প্রকাশ করলেন না। পরিশীলিত ভঙ্গিতেই বললেন, ‘মিনিট দশেক বসো অন্তত। কফি খেয়ে যাও। সঙ্গে বাড়িতে বানানো ফিশফ্রাইও আছে।’
‘না উপাসনাদি। এখনই যেতে হবে। অন্য একদিন আসব। প্লিজ কিছু মনে করবেন না। ভেরি সরি।’ বলে প্রায় ছিটকে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এল শালিনী।
অভিনয়টা খুব খাজা হয়ে গেল। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা হচ্ছে, এঁরাই কি তবে তাঁরা? রাস্তা ফাঁকা পেয়ে গাড়ির অ্যাক্সিলেটর ষাটে তুলে দিল শালিনী। বাঁ হাতে পকেট থেকে ফোন বের করল। একবার দময়ন্তীদিকে কল করা দরকার।
.
ভবানী ভবন, দময়ন্তীর কেবিন, রাত ৮টা
‘তুই চলে এসে বুদ্ধিমানের কাজ করলি।’ দময়ন্তী বলল, ‘কে কার সঙ্গে দেখা করছে সবই খবর আসছে। উপাসনা আচার্যের বাড়ির আজকের মিটিংয়ের অতিথিতালিকা এসে পৌঁছেছে তুই ফোন করার ঠিক পনেরো মিনিট আগে। সেখানে কিছু নাম দেখে আমি চমকেছি। শেষের দিকে তোর নাম দেখে সোজা নেপচুন থেকে পড়েছিলাম।’
‘আরেকটা জরুরি কথা। উপাসনা আচার্যের কললিস্ট চেক কোরো। শিলিগুড়িতে এইসব কাণ্ড চলাকালীন ওঁর ফোন দুদিন আউট অব নেটওয়ার্ক কভারেজ পেয়েছি।’
‘হুমম। সে-সময়টা উনি বহরমপুরে ছিলেন।’
‘আমাকেও তাই বলেছেন। সত্যি কথাই বলেছেন তাহলে।’
‘মোবাইল নেটওয়ার্ক এসে এখন অপরাধী ধরা সহজ হয়েছে। এটা সুবিধার দিক। আর সমস্যার দিক হচ্ছে, এই কথাটা অপরাধীরাও ভালোমতন বুঝে ফেলেছে।’
‘উপাসনা আচার্য যে তোমাদের সাসপেক্ট লিস্টে আছেন সেটা জানতাম। তবে ভীষণ ভালো কাজ করছেন বলে আমি সেসব ভাবিনি। পথশিশুদের নিয়ে সত্যিই ভালো কাজ করছেন ভদ্রমহিলা।’
‘জানি। ওঁর হোমে তুই একদিন গেছিলি সেটাও জানি। ওঁর সঙ্গে ইদানীং তোর ঘনিষ্ঠতা নিয়ে ডিপার্টমেন্টে কথা উঠতে শুরু করেছিল। তুই আজ এসে খুবই ভালো করলি। নাহলে আজকের এই মিটিংয়ের পর মোস্ট প্রোবাবলি তোকে একটা তলব খেতে হত।’
কফি আর কুকিজ এল। কাপ হাতে তুলে শালিনী বলল, ‘আজ গিয়ে এত অবাক হয়েছি, খুব বিচ্ছিরিভাবেই বেরিয়ে এসেছি, জানো? আসলে মাথাটা হঠাৎ জ্যাম হয়ে গিয়েছিল। বিশেষত লিলি জর্ডান আর তিয়াসা পৈলানকে দেখে।’
দময়ন্তী বলল, ‘দ্যাখ, লিলির এই দলে থাকাটা আশ্চর্যের কিছু না। লিলির মা সুজান উপাসনার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। বাকিদের উপস্থিতিটা আমায় ভাবাচ্ছে। উপাসনার সঙ্গে জামদুনির দুই নেত্রীর যোগাযোগের ইনফরমেশন আমাদের কাছে ছিল। আর কাবেরীদি উপাসনার বুটিকের কাস্টমার।’
‘তাই বলো। আমি তো ওঁর পরিচয় পেয়ে ভেবলেই গেছিলাম। অমিতাভ সান্যালের প্রাক্তন স্ত্রী ওখানে! জাঁদরেল সব সাসপেক্টদের মাঝখানে। মানে আমার হালটা বুঝতে পারছ তো, কেন ওরকম ঘেঁটে গেছিলাম!’
‘আরেকটা ইনফো দিয়ে তোর হাল আরেকটু খারাপ করে দিই?’
‘আবার কী ইনফো?’
‘কাবেরী সান্যালও কিন্তু আমাদের সাসপেক্ট লিস্টে আছেন।’
.
গলফ গ্রিন, রাত ১১টা ১৫
অঙ্কিত গভীর মনোযোগ দিয়ে পুরোটা শুনল। তারপর বলল, ‘ভদ্রমহিলা একেবারে পারফেক্ট মেটিরিয়াল ফর মজন্তালী। ভাগ্যিস তুমি সোজা দময়ন্তীদির কাছে গেছ। না-হলে ফাঁসতে।’
শালিনী বলল, ‘দময়ন্তীদি তো বললই। না-হলে শিওর তলব খেতাম।’
‘আচ্ছা, তোমার অভিনেত্রী তো সেখানে ছিল না?’
‘সম্পূর্ণা? না ছিল না।’
‘আমার মনে হয় এই উপাসনা আচার্যই গ্যাং লিডার। সম্পূর্ণা তার ডেপুটি। ভুলে যেও না, উপাসনা কিন্তু সুজান জর্ডানের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ওরই সবচেয়ে বেশি সুযোগ ছিল সুজানের ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিয়ে ওই বিভ্রান্তিটা তৈরি করার।’
‘কিন্তু খুনগুলো তো এরা নিজে হাতে করছে না। এঁরা সবাই নজরবন্দি। সরাসরি এরা কোনও অ্যাকশন করছে না। পুরো ব্যাপারটাই খুব রহস্যময়।’
‘খুনগুলোর জন্য ভাড়াটে লোক আছে হয়তো। রিমোট এদের হাতে আমি শিওর।’
‘কিন্তু ওই পোশাক? ওই মুখোশ?’
‘ক’টা ক্ষেত্রে ওইসব ধড়াচূড়ো দেখা গেছে বলো তো? গ্যারান্টি কী যে সবক’টা খুন ওই ধড়াচূড়ো পরেই করেছে? ট্রেনের খুনটা হিসেবে ধরছি না। সুচেতা যে বর্ণনা দিচ্ছে সেটা যে সত্যি তার গ্যারান্টি কী? আদৌ সুচেতাই সেই মেয়ে কিনা সেটাই বা কে গ্যারান্টি দেবে? মোবাইল নেটওয়ার্ক একই লোকেশনে থাকলেই তো হল না।’
‘মৌলালিতে পোস্টারিং করতে দেখেছিল একজন।’
‘মনে আছে। পিছন থেকে। তা-ও ভোর চারটের সময়। কালো পোশাকটুকু শুধু দেখতে পেয়েছে। আসলে কালো না অন্য কোনও ডিপ রং সেটার গ্যারান্টি কী?’
‘যে-মেয়েটা শিলিগুড়ি থেকে ধরা পড়েছে?’
‘সে তো ফলস ফ্ল্যাগ!’ অঙ্কিত কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, ‘দময়ন্তীদির কথাটাই ঠিক। সন্দেহ নিরসন করতে হলে একদিন দুম করে ভদ্রমহিলার বাড়ি চলে যাও। একটা মানুষের বাড়ির পরিবেশ দেখলে তার সম্পর্কে বেশ কিছুটা ধারণা করা সম্ভব।’
‘ফাঁসব না তো?’
‘ফাঁসবে কেন? দময়ন্তীদিকে জানিয়ে যাও।’
.
রবিনসন স্ট্রিট, রাত ১১টা ১০
বীথি মিত্রের সাইকোলজিস্ট তাঁর পেশেন্ট-প্রোফাইল আর কেস প্রগ্রেস পুরোটাই ফটোকপি করে পাঠিয়ে দিয়েছেন। সেগুলো বারবার করে উল্টেপাল্টে দেখতে দময়ন্তীর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠছিল। এই কেস কোথায় গিয়ে থামবে সেটা বুঝতে না-পারলেও, কোথায় কোথায় থামবে না সেটার একটা স্পষ্ট আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
ঠিক রাত বারোটা দশ মিনিটে লোকনাথের ফোন এল, ‘ম্যাডাম, গাড়ি বেরোল।’
দময়ন্তী আলনা থেকে শার্টটা টেনে নিয়ে বলল, ‘কোনদিকে যাচ্ছে ফলো করো। বেরোচ্ছি।’
.
আলমবাজার মোড়, রাত ১১টা ৫৫
মহামিলন মঠ পেরিয়ে কিছুদূর এগিয়ে লোকনাথ সম্পূর্ণার গাড়িটাকে ওভারটেক করার সুযোগ পেল। তারপর রাস্তা আটকে আড়াআড়ি গাড়ি দাঁড় করিয়ে দিল। প্রচণ্ড জোরে ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে গেল সম্পূর্ণার গাড়ি।
সাদা এসউভি-র দরজা সজোরে বন্ধ করে দ্রুত পায়ে এগিয়ে এল সম্পূর্ণা মিত্র। কালো টি শার্ট, কালো প্যান্ট। দময়ন্তী আর সুকুমারও গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়িয়েছে। সুকুমার রিভলভার বের করতে যাচ্ছিল, হাতের ইশারায় দময়ন্তী জানাল, দরকার নেই।
দময়ন্তীদের দেখে সম্পূর্ণা অবাক হল না তেমন। রাগল অনেক বেশি, ‘আর ইউ ক্রেজি? অ্যাক্সিডেন্ট করার ইচ্ছে হয়েছে নাকি?’
দময়ন্তী মুখ টিপে হাসল, ‘রেড হেরিং ছড়ানোটা একটা আর্ট। বেশি ছড়াতে গেলেই ছড়িয়ে লাট হয়ে যায়।’
সম্পূর্ণার ভুরুদুটো সামান্য ওপরদিকে উঠল, ‘মানে?’
‘শুটিং আর সামাজিক কাজকর্মের চাপ সামলে এই যে প্রায় প্রতি রাতেই আপনি গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ছেন, বেশিরভাগই আবার কালো পোশাক পরে বেরোচ্ছেন, এটা আপনার স্বতঃস্ফূর্ত শখ নয়।’
‘আপনি ভুলে যাচ্ছেন, এই শখ আমার রাতারাতি গজায়নি। গত তিন-চার মাস ধরেই আমি রাতে গাড়ি নিয়ে বেরোই। মজন্তালী সরকার সে-সময় আবির্ভূত হননি।’
‘মজন্তালী সরকার আবির্ভূত হননি। কিন্তু তার আবির্ভাবের প্ল্যানিং নিশ্চয়ই ছকা হয়ে গিয়েছিল। সব শুরুরই তো একটা শুরু থাকে। রবীন্দ্রনাথ যাকে বলেছিলেন, সন্ধেবেলার প্রদীপ জ্বলার আগে সকালবেলার সলতে পাকানো। তাই না?’
সম্পূর্ণা খানিকক্ষণ চেয়ে রইল দময়ন্তীর দিকে। মুখের রেখায় কয়েকটা বিরোধাভাস ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল। বাঁকা হাসল সে, ‘আপনাদের ওপর চাপ বাড়ছে বুঝতে পারছি। তা বলে যাকে-তাকে যখন খুশি পাকড়াবেন এটা কি কোনও কাজের কথা? আর আমি কি জিগ্যেস করতে পারি যে আপনারা আমায় ফলো কেন করছিলেন?’
দময়ন্তী সম্পূর্ণার কথায় পাত্তাই দিল না। বলল, ‘নিজে হাতে খুনজখম না-ও যদি করেন, তদন্তকে ইচ্ছাকৃতভাবে বিপথগামী করাটাও কিন্তু ক্রিমিনাল অফেন্স।’
‘অ্যারেস্ট করবেন নাকি?’
‘এখনই না। আপাতত আপনাকে এটুকুই জানিয়ে রাখলাম যে আপনার আর এত কষ্ট করার দরকার নেই। আমরা আর মিসগাইডেড হচ্ছি না। ইউ ক্যান রিল্যাক্স।’
সম্পূর্ণার হাসি ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। দেহভঙ্গিতে ফুটে উঠছে একটা শিথিল ভাব। তার মানে তির একদম নিশানায় লেগেছে। হিরোইন সাদা পতাকা তুলছেন। চওড়া হল দময়ন্তীর হাসি, ‘বেশ কয়েকটা পাজল মিসিং। আমি জানি সেগুলো নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। ফলে আপনার অপরাধ প্রমাণ করা কঠিন হবে। কিন্তু ধরা আপনি পড়ে গেছেন। ক্রিয়ার কালই আপনার কাল হল।’
‘ক্রিয়ার কাল?’ অবাক হল সম্পূর্ণা।
‘আজ্ঞে হ্যাঁ। টেনস। ইংরেজি গ্রামারের বাইরেও যে এভাবে কাজে লেগে যাবে সেটা ভাবিনি।’ গাড়িতে উঠতে উঠতে দময়ন্তী বলল, ‘আপনি যেভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন, সেটাকে আমি সম্মান করি সম্পূর্ণা। বাড়ি ফিরে যান। আপনার মা খুব একটা ভালো নেই। তাঁর যত্ন নিন। নিজের কেরিয়ারেরও যত্ন নিন।’
.
