দ্বিতীয় দিন
তারিখ : ৩ আগস্ট, ২০১৩
সল্টলেক, সকাল ৭টা ১৫
এস এস (ক্রাইম) অমিতাভ সান্যাল একটু ‘স্লো স্টার্ট’ করতেই পছন্দ করেন। অ্যালার্ম বাজার পর অন্তত দশ মিনিট তিনি বিছানায় এপাশ-ওপাশ করেন। সদ্য-ভাঙা ঘুম খানিকটা ঘন ক্কাথের মতো। ডিম ফেটে বেরোনো অ্যালবুমেনকে যেমন নন-স্টিক ফ্রাইপ্যানে এদিক-ওদিক করে নেড়ে নিতে হয়, সদ্য-ভাঙা ঘুমকে তেমনই মিনিটখানেক ধরে খেলাতে হয় সর্বাঙ্গে। শরীর টানটান করে দিতে হয়। শ্বাসের গতি মন্দমধুর ছন্দে বেড়ে ওঠে। শরীরের এখানে-ওখানে ফিসফাস শুরু করে নিউরোট্রান্সমিটারের দল। আয়েশে তিরতির করে কেঁপে ওঠে আঙুলেরা। তারপর একটা মস্ত আড়মোড়া ভেঙে অমিতাভ বিছানায় উঠে বসেন। বেশিরভাগ সময়ই অবশ্য এমন পারফেক্ট জাগরণ নসিব হয় না। বরুণ বিশ্বাস বা জামদুনি-কেসের দায়িত্ব নিলে এমন বিলাসিতার সুযোগ জুটত না। সেগুলো অনেক কষ্টে কাটানো গেছে বলে কয়েকটা দিন ভালো করে ঘুমিয়ে নেওয়া যাচ্ছে।
অবশ্য এরপর কোনও বড় কেস ঘাড়ে এসে পড়লে আর কাটানো যাবে না। পাঁচ বছরের জন্য ডেপুটেশন ভ্যাকেন্সিতে সেন্ট্রালে যাবার একটা সুযোগ আছে। তার জন্য বড় কিছু একটা ক্র্যাক করতে হবে। বড়, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে নিরামিষ একটা কেস চাই। কুড়ি বছরের কেরিয়ারে অমিতাভ কোনওদিন ফাৎনার দিক থেকে চোখ সরাননি। লক্ষ্যমাত্রাকে সবসময় ছোট ছোট সময়পর্বে ভেঙে নিয়েছেন। আপাতত ছকে রেখেছেন, পাঁচ বছর সেন্ট্রাল সার্ভ করে এসে সিআইডি-তে ফিরবেন এক ধাপ টপকে। সোজা এডিজি, মানে অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর জেনারেল হয়ে। তার জন্য একটু ধরে খেলতে হবে।
বছরদুয়েক হল, রাজ্যে বিরাট পালাবদল এসেছে। পঞ্চায়েত নির্বাচনে বিরোধীদের দুরমুশ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে করুণাময় বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। হাওয়া বলছে, আগামী বছর কেন্দ্রেও পালাবদল আসছে। এই সময়টা সমাজবিরোধীদের সঙ্গে পুলিশকেও খুব সতর্ক থাকতে হয়। অমিতাভ বিশ্বাস করেন, সুখী জীবনের জন্য চাই ঠিক সময়ে ঠিক জায়গায় উপস্থিত থাকতে পারার কপাল, আর দাগহীন একটা সার্ভিস বুক। ভুঁড়ি বেড়ে যাচ্ছে, এটাই যা বাজে লাগে। কম হাইটে ভুঁড়ি হয়ে গেলে দেখতে ভালো লাগে না। ব্যায়াম-ট্যায়াম করেও লাভ হচ্ছে না। রাজ্য পুলিশের মেডিকো লিগাল অ্যাডভাইসার প্রোজ্জ্বল দত্ত অবশ্য বলেন, ভারতীয় পুরুষের জন্য বেলি ফ্যাট একটা অলঙ্ঘ্য নিয়তি। গোঁফ ছাড়া যেমন অনিল কাপুর হয় না, তেমনই পেটে টায়ার ছাড়া ভারতীয় পুরুষ অলীক এক ভাবনামাত্র।
সকালের চা-টা অবশ্য সাতটা পনেরো থেকে সাতটা কুড়ির মধ্যে না-পেলে অমিতাভর অস্বস্তি হতে থাকে। কাবেরী চলে যাবার পর থেকে এসব দায়িত্ব গোবিন্দর। গোবিন্দ আগেও ছিল। কাবেরী চলে যাবার পর তার দায়িত্ব অনেকটা বেড়েছে। তার চেয়েও বেশি বেড়েছে মাইনে। তবে টাকাকড়ির ব্যাপারে অমিতাভর কোনওকালের তেমন আম্বা নেই। এমন বিশ্বাসী লোক চট করে পাওয়া যায় না, সেটাই বড় কথা। তাছাড়া গোবিন্দ বিনয়ী, ভালোমানুষ। নিয়মনিষ্ঠও। সকালের চা দিতে প্রায় কোনওদিনই তার দেরি হয় না। কিন্তু আজ হচ্ছে।
দাঁতটাত মেজে অমিতাভ ইজিচেয়ারে বসে আছেন। ভুরুদুটো সেকেন্ড ব্র্যাকেট। চায়ের সঙ্গে সঙ্গে খবরের কাগজ পড়ার সময়ও কমে যাচ্ছে। সেটাও কম অস্বস্তির কথা না। বিস্কুট না, খবরের কাগজই হচ্ছে চায়ের সঙ্গে তাঁর ফেভারিট মর্নিং স্ন্যাকস। পেপারের রোলটা পড়ে আছে বারান্দায়। নিজে উঠে নিয়ে এলেও হয়। কিন্তু সকালবেলাটা বেশি নড়াচড়া করতে ভালো লাগে না। গোবিন্দ এসে সামনে চা রেখে পেপারগুলো হাতে গুঁজে দিয়ে যায়। কিন্তু আজ যে কী হল! বাথরুম-টাথরুম গেল নাকি? আরও মিনিট পাঁচেক কেটে যাবার পরেও গোবিন্দর পাত্তা নেই দেখে মনে মনে দুটো চার-অক্ষর প্রয়োগ করে অমিতাভ নিজেই উঠে কাগজের বান্ডিলটা নিয়ে এলেন।
‘খবর এখন’ অমিতাভর সবচেয়ে প্রিয় কাগজ। এদের বাণিজ্যিক ট্যাগলাইনটা তিনি নিজেও মনে মনে একরকম বিশ্বাস করেন। সত্যিই ‘খবর এখন’ না-পড়লে মাথার মধ্যে একটা পিছিয়ে পড়ার বোধ ফরফর করে। আজ ফ্রন্টপেজে গরমাগরম হেডলাইনের অভাব নেই। মেনিঙ্গোএনসেফেলাইটিসে আক্রান্ত হয়ে পার্ক স্ট্রিট কাণ্ডের নির্যাতিতা সুজান জর্ডানের মৃত্যু। ফার্ন রোডে অজ্ঞাত আততায়ীর হাতে খুন চার যুবক। সোনারপুরে খুন দুই পথচারী। পঞ্চায়েত নির্বাচনে শাসক দলের বিরুদ্ধে অবাধ ভোট লুটের অভিযোগ বিরোধীদের। অভিযোগ উড়িয়ে দিচ্ছেন পঞ্চায়েতমন্ত্রী। ভোট করাতে গিয়ে খুন হওয়া শিক্ষক রামকুমার মণ্ডলের মৃত্যুর জন্য রাজ্য নির্বাচন কমিশনকে দায়ী করে রাজ্যপালের কাছে স্মারকলিপি শিক্ষক সংগঠনের। সিআইডি-র ওপর ভরসা নেই, সিবিআই তদন্তের দাবি জানালেন জামদুনির ধর্ষিতার পরিবার। হরিয়ানার জিন্দ জেলার খাপ পঞ্চায়েতের এক নেতা ক্রমবর্ধমান ধর্ষণ ও শ্লীলতাহানির জন্য চাউমিন, বার্গারের মতো খাবারকে দায়ী করেছেন। এর সবকটাই খবর হিসেবে চুম্বক। কিন্তু সব শিরোনাম ছুঁয়ে এসে অমিতাভর চোখ আটকে গেল ফ্রন্টপেজের নীচের দিকে।
পাতার এক-চতুর্থাংশ জুড়ে একটা বিজ্ঞাপন। লাল ব্যাকগ্রাউন্ডের ওপর সাদায় কয়েকটা লাইন।
সকাল সকাল ঘেঁটে যাওয়াটা অমিতাভর মোটেই পছন্দ নয়। কিন্তু মাঝে মাঝে মানুষের কাছে দ্বিতীয় কোনও অপশন থাকে না।
.
রানিকুঠি, সকাল ৭টা ৫
রিংটোনটা এমন বিদঘুটে যে, কানের ভিতর দিয়ে মরমে প্রবেশ করে আনতারা একেবারে ফুসকলিয়ে দেয়।
সৌমিলি অবশ্য ইচ্ছা করেই এটা রেখেছে, যাতে একবার ফোন বাজলেই ঘুম চটকে চৌষট্টি হয়ে যায়। মিডিয়ার লোকজনের কি আর ঘুম নিয়ে বিলাসিতা করা সাজে! ঘুমচোখে বেশ খানিকক্ষণ এদিক-সেদিক হাতড়ে তবে মোবাইলটা পাওয়া গেল। শিরিন কলিং।
‘বল।’
ট্রাফিকের উত্তুঙ্গ প্যাঁকপ্যাঁকের মধ্যে দিয়ে শিরিনের উত্তেজিত গলা শোনা গেল, ‘জানি তুই ঘুমোচ্ছিস। কিন্তু ঠিক পাঁচ মিনিটের মধ্যে রেডি হয়ে নীচে নাম। গাড়ি নিয়ে আসছি।’
সৌমিলি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘আমি কি ম্যাগি? রেডি হতে মিনিমাম সময় তো লাগে।’
‘সেটা তুই পৃথ্বীশদাকে ফোন করে বল। আমি কী করব! আমিও তাড়াহুড়োর চোটে ঘরের হাওয়াই চপ্পল পরে বেরিয়ে পড়েছি।’
সৌমিলি আরেকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এবারেরটা দীর্ঘতর। বাংলা মিডিয়া হাউজগুলোর মধ্যে ‘লাইভ নিউজ’ যে আজ বছরখানেক ধরে শীর্ষ স্থান ধরে রেখেছে সেটা এমনি এমনি না, স্টাফদের বহু শতাব্দীর ঘুম আর ঘামের বিনিময়ে। আর আছে পৃথ্বীশ চৌধুরীর মতো বস, যথা সময়ে সবাইকে তৈরি না পেলেই যে ভ্লাদ দ্য ইম্পেলার, অ্যাডলফ হিটলার, আর রুনু গুহনিয়োগীর ককটেল হয়ে যায়।
মিডিয়ায় যারা চাকরি করে তাদের জীবন থাকতে নেই, প্ল্যানিং থাকতে নেই, পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব কিছুই থাকতে নেই। কতবার যে বন্ধুদের সঙ্গে আউটিংয়ের প্ল্যান করে শেষ মুহূর্তে ক্যানসেল করতে হয়েছে! এমনকী বিয়ের দিনেও এরা বলতে পারে, সিঁদুরদান সেরে এসে কপিটা লিখে দিয়ে তারপর গিয়ে শুভদৃষ্টিটা করো। সৌমিলির দৃঢ় বিশ্বাস ইসিজি করালেই ওর হার্টের সমস্যা ধরা পড়বে। এমনিতেই প্রেসার লো, চোখের নীচে ডার্ক সার্কল। চুল উঠে যাচ্ছে। দুধে-আলতা গায়ের রং ট্যান পড়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সব এই হতভাগা চাকরির জন্য। বিরক্তি চেপে সৌমিলি বলল, ‘স্কুপ নাকি?’
‘স্কুপের বাপ!’ শিরিন ওপাশ থেকে বলল, ‘ফার্ন রোডে চারটে লাশ পাওয়া গেছে।’
‘তো?’
‘হাজরাতে দুটো।’
‘হ্যাঁ, তো তাতে হয়েছেটা কী! সত্যযুগ থেকে ইমপোর্ট হলি নাকি?’
‘আরে গরু, খুনি একজনই। ইটস আ কেস অফ সিরিয়াল কিলিং। দুটো স্পটেই একইরকম চিরকুট পাওয়া গেছে।’
‘চিরকুট?’ একটু চমকাল সৌমিলি।
‘ইয়েস ম্যাম।’
‘কীসের চিরকুট?’
‘খুনির নাম। সঙ্গে কৈফিয়ত।’
‘কৈফিয়ত! মানে?’
‘দুটো চিরকুটেই খুনি লিখেছে, লোকগুলো একটা মেয়েকে রেপ করার চেষ্টা করেছিল। তাই সে খুন করেছে। মানে ঠিক এরকম লেখেনি, কিন্তু মোদ্দা বক্তব্য এটাই।’
সৌমিলির ঘুম-ঘুম ভাবটা এক ঝটকায় কেটে গেল, ‘বলিস কী!’
‘এতেই চমকিও না গুরু,’ শিরিন নাটকীয় গলায় বলল, ‘আরও আছে।’
‘আরও আছে মানে? আবার কী?’
‘পেপারে একটা অ্যাডভারটাইজমেন্ট।’
‘মানে?’
‘আজকের পেপারটা দেখেছিস?’
‘কোন পেপার?’
‘লিডিং সবক’টা পেপারেই দিয়েছে। এখনই দ্যাখ। দেখতে দেখতে রেডি হ। রিজেন্ট পার্ক এসে গেছি। তোর হাতে আর তিন মিনিট।’
.
গলফ গ্রিন, কলকাতা, সকাল ৭টা ২৫
কফি ঠান্ডা হতে হতে প্রায় কোল্ড কফি হয়ে এসেছে। ঢাকা দেওয়া স্যান্ডউইচ পড়ে আছে। বৃন্দা যেমন রেখে গেছিল, সেরকমই।
পড়েই থাকবে। সকাল-সকাল খুব বেশি চমকে গেলে শালিনীর খিদে মরে যায়। বিছানার ওপর ইংরেজি, বাংলা মিলিয়ে সাত-আটটা খবরের কাগজ ছড়ানো। তার মাঝখানে উমনোঝুমনো হয়ে বসে আছে শালিনী। চোখেমুখে একটা উদ্ভ্রান্ত ভাব। এখনও পর্যন্ত চারটে খবরের কাগজে অ্যাডটা খুঁজে পাওয়া গেছে। আরও কোথাও বেরিয়েছে কি?
অঙ্কিত দাঁত মাজতে মাজতে দরজায় হেলান দিয়ে শালিনীকে দেখছিল। ফেনাভরা মুখে বলল, ‘আচ্ছা, এই ফড়িয়াপুকুর মামলার আসামিরই একটা ইন্টারভিউ নেবার কথা না তোমার? পারমিশন পেলে?’
‘আজই সেই ইন্টারভিউ, অঙ্কিত।’
‘আজই? হোয়াট আ কোইন্সিডেন্স!’
‘কোইন্সিডেন্স না। তার চেয়ে অনেক বড় কিছু।’
‘বড় কিছু মানে?’
বড় কিছু মানে যে ঠিক কী, সেটা শালিনী নিজেই বুঝতে পারছে না। রাজাবাজার সায়েন্স কলেজে সাইকোলজির অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রোফেসর হিসেবে তাঁকে সারাবছর নানারকম প্রজেক্টে যুক্ত থাকতে হয়। এখন যেমন গত তিন বছরে কলকাতায় ঘটে যাওয়া সমস্ত ধর্ষণকাণ্ডের আসামিদের সাইকোলজিকাল প্রোফাইলিং করতে হচ্ছে। ইউজিসি, মানে ইউনিভার্সিটি গ্রান্ট কমিশনের টাকায়, ইন্টারন্যাশনাল কোলাবরেশনে এই প্রজেক্টটা শালিনীর কেরিয়ারে একটা বিরাট এস্কালেটর। খাটনি কম, এক্সপোজার সেই তুলনায় অনেক বেশি। সেই কাজের সূত্রেই জঘন্যতম একেকজন অপরাধীর ইন্টারভিউ নিতে হচ্ছে শালিনীকে। আজ সকাল এগারোটায় আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে গিয়ে ফড়িয়াপুকুর ধর্ষণ মামলার আসামি মুকেশ সিংয়ের সঙ্গে দেখা করার কথা। সেই মুকেশ সিংকে নিয়েই কিনা খবরের কাগজে এরকম একটা উদ্ভট অ্যাড? আজই? মানে কী এর?
শালিনীকে নিরুত্তর দেখে অঙ্কিত বলল, ‘আরে অত বোঝাবুঝির কিছু নেই। মাস্ট বি সাম কাইন্ড অফ টিজার। একটু বেশিই রিয়ালিস্টিক। তা বলে অত দুশ্চিন্তা করার কী আছে? দু-দিন বাদে দেখবে কোনও ফিল্মের অ্যাড হয়তো!’
‘তোমার মুন্ডু!’ ঝাঁঝিয়ে উঠল শালিনী, ‘শেয়ার মার্কেট ছাড়া আর কোনও খবরই রাখো না! সকালে উঠে ল্যাদ না খেয়ে নিউজটা শুনলেও তো পারো।’
‘সাতসকালে কী এমন ঘটল শুনি!’
‘সাতসকালে ঘটেনি। সাতসকালে জানা গেছে। ঘটেছে লেট নাইটে।’
অঙ্কিত হাই তুলে বলল, ‘আহা, কী ঘটেছে সেটা তো বলবে।’
‘ফার্ন রোড আর সোনারপুর, দুটো জায়গা মিলিয়ে মোট ছটা লাশ পাওয়া গেছে,’ শালিনী উঠে বসে কফির কাপটা হাতে নিল, ‘মার্ডার। খুনি একজনই।’
‘আচ্ছা?’
‘স্পটে একটা চিরকুট পাওয়া গেছে। তাতে খুনির নাম রয়েছে। মানে খুনিই ফেলে গেছে চিরকুটটা। সে চায় সবাই তার নাম জানুক।’
‘তাই নাকি? ইন্টারেস্টিং!’
‘অ্যান্ড দি নেম ইজ মজন্তালী সরকার।’
অঙ্কিতের মুখটা এবার আক্ষরিক অর্থেই হাঁ হয়ে গেল, ‘তার মানে…।’
‘হ্যাঁ। যে পেপারে অ্যাড দিয়েছে!’
‘গুডনেস!’
.
কেষ্টপুর, সকাল ৭টা ৩০
ডিপার্টমেন্টের লোকজন বলে, এডিজি প্রবীর চক্রবর্তী আর তাঁর মোবাইল ফোনটি আসলে দুই দেহে একই আত্মা। কারণ রণে-বনে-জলে-জঙ্গলে যেখানেই তিনি থাকুন না কেন, ফোন দুবার রিং হবার আগেই তিনি কল রিসিভ করবেন। এবারেও তার অন্যথা হল না। ফোন ধরেই প্রবীরবাবুকে আকাশ থেকে পড়তে হল, ‘কীসের অ্যাড? কোন পেপার?’
ওপাশ থেকে অমিতাভ উত্তেজিত গলায় বললেন, ‘লিডিং সবক’টা পেপারেই দিয়েছে। আপনি এখনও দ্যাখেননি? দেখুন দেখুন।’
‘সান্যাল, আমি ল্যাট্রিনে।’
থতমত খেয়ে অমিতাভ বললেন, ‘মানে! আপনি ল্যাট্রিনে ফোন নিয়ে যান?’
প্রবীর চক্রবর্তী হতাশ গলায় বললেন ‘কয়েক বছর পর নিজে যখন এডিজি হবে তখন ঠেলাটা বুঝবে।’
‘শিগগিরি বেরোন। অ্যাডটা দেখুন।’
‘আরে কীসের অ্যাড সেটা তো বলবে!’
‘ফার্ন রোড আর সোনারপুরের খুনগুলো যে করেছে সে-ই অ্যাড দিয়েছে।’
সবে হ্যান্ড শাওয়ারে হাত দিয়েছিলেন প্রবীরবাবু। থমকে গেলেন, ‘হোয়াট! অ্যাড দিয়েছে মানে?’
‘না হলে আর বলছি কী!’
‘কী অ্যাড দিয়েছে?’
‘পড়ছি। শুনুন,’ অমিতাভ বিজ্ঞাপনের বয়ানটা পড়তে শুরু করলেন, ‘আগামী ১২ সেপ্টেম্বর সকাল ১১টায় ফড়িয়াপুকুর ধর্ষণ মামলার আসামিকে জেলের মধ্যে খুন করা হবে। বিনীত, মজন্তালী সরকার।’
.
এ জে সি বোস রোড, গাড়ি, সকাল ৯টা ৪৫
পার্ক স্ট্রিটের পর বারাসাত আটকানো যায়নি। বারাসাতের পর ফড়িয়াপুকুর আটকানো যায়নি। ফড়িয়াপুকুরের পর জামদুনি আটকানো যায়নি। অথচ এরাজ্যের মন্ত্রী কত অবলীলায় বলে দেন, লোক বাড়লে ধর্ষণ তো বাড়বেই। এইসবে আজকাল মানুষজন দিব্যি অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। এরই মাঝে বিনা মেঘে বজ্রাঘাতের মতো গতকাল রাতে ছ’টা খুন আর আজ সকালের পেপারে সেই খুনির তরফ থেকেই দেওয়া পিলে-চমকানো এক বিজ্ঞাপন। নানারকম এতোলবেতোল প্রশ্ন সৌমিলির মনের মধ্যে পপকর্নের মতো ফুটফাট করে লাফিয়ে উঠছে, অথচ এই মুহূর্তে কোনও উত্তর নেই। বাকি সব যদি ছেড়েও দেওয়া যায়, সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে খবরের কাগজগুলো এমন বিজ্ঞাপন ছাপল কীভাবে?
এদিকে সোনারপুরের মার্ডার প্লেসের নিউজ কভার করে গাড়িতে ওঠার পর থেকেই শিরিন কেমন গুম মেরে গেছে। কিছু একটা জেনেছে বা শুনেছে বলেই মনে হচ্ছে। শিরিনের এটাই দোষ। ঝেড়ে কাশতে অনেক সময় নেয়। সৌমিলি আবার বেশিক্ষণ চুপ করে থাকতে পারে না। দুজনে হরিহর আত্মা। কিন্তু স্বভাবে বিস্তর তফাত। সৌমিলি ছটফটে, শিরিন শান্ত। একটি মিঠে দখিন হাওয়া, আরেকটি দুর্দান্ত ঝড়ে। আর থাকতে না পেরে শিরিনকে কনুইয়ের গুঁতো মেরে সৌমিলি বলল, ‘কী ব্যাপার বল তো? মনমোহন সিং হয়ে গেলি কেন?’
শিরিন গম্ভীর মুখে সৌমিলির দিকে তাকাল, ‘একজন মহিলা।’
‘মানে?’
‘একজন মহিলা। ফরসা, স্মার্ট, তিরিশের কাছাকাছি বয়েস, কার্লি চুল।’
‘পাত্রপাত্রীর অ্যাড দিচ্ছিস নাকি? কে মহিলা? কোথাকার মহিলা?’
‘অ্যাডই বটে, তবে পাত্রপাত্রীর নয়।’ শিরিন হাই তুলে বলল, ‘চারটে খবরের কাগজই বলছে, অ্যাড দিতে এসেছিলেন একজন মহিলা।’
‘তোকে কে বলল?’
‘শাক্য খবরের কাগজগুলোর দপ্তরগুলো কভার করছে। ফোন করল একটু আগে।’
‘কখন?’
‘তুই বাইট নিচ্ছিলি।’
সৌমিলি খেঁকিয়ে উঠল, ‘তোর জীবনে কি সব প্রশ্নই এমসিকিউ? একটু বিস্তারিত বলতে কী হয়?’
শিরিনের খোঁপা আলগা হয়ে গিয়েছিল। বাঁধতে বাঁধতে বলল, ‘ফরসা, স্মার্ট, তিরিশের কাছাকাছি বয়েস, কার্লি চুলের এক মহিলা দু-দিন আগে চারটে খবরের কাগজের বিজ্ঞাপন গ্রহণ কেন্দ্রে গিয়ে এই অ্যাডটা অর্ডার করেছিলেন আজকের ফ্রন্টপেজের জন্য।’
সৌমিলি অবাক গলায় বলল, ‘এরকম অ্যাড পেপারগুলো ছেপে দিল?’
‘একজন খুনির অ্যাড বললে নিশ্চয়ই ছাপত না। কিন্তু মহিলা বলেছিলেন, আরকে মুভিজের নতুন ফিল্মের টিজার।’
‘অ্যাঁ!’
‘হ্যাঁ। আর সবচেয়ে বড় রহস্য হচ্ছে, চারটে কাগজের স্টাফেরাই একযোগে দাবি করছে যে তারা পার্সোনালি পূর্ণেন্দু সরকারের নম্বরে ফোন করে ব্যাপারটা কনফার্ম করেছে।’
‘মানে?’
‘মানে জানি না ভাই। শাক্য এখনও পর্যন্ত এইটুকুই জানতে পেরেছে।’
‘শাক্য এখন কোথায়?’
‘খবর এখনের অফিসে। পুলিশ ওখানে পেপারওয়ালাদের ধুচ্ছে।’
.
বি বি গাঙ্গুলি স্ট্রিট, ‘খবর এখন’ পত্রিকার অফিস, সকাল ১০টা ১৫
পিঠেপুলির ল্যাজ গজালে বোধহয় লোকে এর চেয়ে কম অবাক হত। সম্পাদকের চেম্বারের বাইরে চেয়ারে বসে শাক্য দেখছিল, একে একে কৌতূহলী মুখ এসে উঁকিঝুঁকি মেরে যাচ্ছে করিডরে। বিখ্যাত এই পত্রিকা-অফিসে শেষ কবে পুলিশের পা পড়েছে, বা আদৌ কোনওকালে পড়েছে কিনা, সেটা বলা খুব কঠিন। এই করিডর পর্যন্ত অন্য কোনও চ্যানেলের রিপোর্টার আসতে পারেনি। শাক্য পেরেছে, কারণ ‘খবর এখন’ কাগজের মালিক ‘লাইভ নিউজ’-এর বত্রিশ শতাংশ শেয়ার হোল্ডার।
চেম্বারের ভিতরে তখন বউবাজার থানার তদন্তকারী অফিসার ইনস্পেকটর মণ্ডলের সামনে বসেছেন কাগজের সম্পাদক অনীক চৌধুরী আর হেড অ্যাডভারটাইজ এক্সিকিউটিভ দীপ্তেন্দু কুণ্ডু। ইনস্পেকটর মণ্ডল বললেন, ‘এরকম একটা বয়ান দেখে আপনাদের কি উচিত ছিল না আরেকটু কনফার্ম হয়ে নেওয়া? সরি টু সে, আপনাদের মতো রিনাউন্ড মিডিয়া হাউজের কাছ থেকে এটা এক্সপেক্ট করা যায় না।’
‘কিন্তু পূর্ণেন্দু সরকার নিজে আমাদের কনফার্ম করেছেন স্যার,’ বলে ঘরের কোণে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কমবয়সি যুবকটির দিকে ফিরলেন দীপ্তেন্দু, ‘কী শ্যামল, বলো স্যারকে।’
শ্যামল নামের যুবকটি বেশ ঘাবড়ে আছে, দেখেই বোঝা যায়। ঢোঁক গিলে বলল, ‘হ্যাঁ স্যার। আমি নিজে আমাদের অফিশিয়াল নম্বর থেকে ফোন করেছিলাম পূর্ণেন্দুবাবুকে। কল রেকর্ডস দেখাতে পারব স্যার।’
ইনস্পেকটর মণ্ডলের ভুরু কুঁচকে গেল, ‘কিন্তু উনি তো বলছেন এই ব্যাপারে কিছুই জানেন না।’
‘আপনি কল রেকর্ডস চেক করুন।’ বলে ফোনের ডায়ালড কলের লিস্ট বের করে ইনস্পেকটরের দিকে এগিয়ে দিল শ্যামল।
ইনস্পেকটর মণ্ডলের কপালে ভাঁজ পড়ল। ডান হাত বাড়িয়ে শ্যামলের ফোন নিয়ে তিনি অন্য হাতে নিজের ফোনের কনট্যাক্ট লিস্ট বের করে পূর্ণেন্দু সরকারের নম্বর মিলিয়ে নিলেন। ফোনটা শ্যামলকে ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘পুরো সিনটা আমাকে খুলে বলতে পারবেন? মহিলা এলেন, তারপর কী কী করলেন বা বললেন পুরোটা বলুন।’
শ্যামল রুমাল দিয়ে কপালের ঘাম মুছে বলল, ‘মহিলা এসে বয়ানটা দিয়ে বললেন, আরকে মুভিজের নতুন ফিল্মের টিজার। টেকনিকালি সবকিছু অলরাইট। অবিশ্বাস করার কোনও কারণ নেই। অ্যাড নিয়ে নানারকম ইনোভেটিভ কাজকর্ম হচ্ছে আজকাল। ভদ্রমহিলা নিজেই বললেন, পূর্ণেন্দুবাবুকে ফোন করে কনফার্ম হয়ে নিতে। আমি স্যারের কাছ থেকে পূর্ণেন্দু সরকারের ফোন নম্বর চেয়ে ফোন করে নিলাম। তারপর পেমেন্ট নিলাম।’
‘পেমেন্ট কীভাবে নিলেন?’
‘অনলাইন ব্যাঙ্ক ট্রান্সফার। ডিটেল দেখাচ্ছি।’ বলে হাতের ফাইলে কাগজ খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল শ্যামল।
ইনস্পেকটর মাথা নেড়ে বললেন, ‘কোথাও একটা গন্ডগোল হচ্ছে মিঃ চৌধুরী। পূর্ণেন্দুবাবুই বা খামোখা মিথ্যে কথা বলতে যাবেন কেন?’
‘সেটা তো বুঝতেই পারছি ইনস্পেকটর,’ অনীক চৌধুরী বললেন, ‘খুনের খবরগুলো যখন এল ততক্ষণে কপি বেরিয়ে গেছে, ভেন্ডারদের হাতে চলে গেছে। আর কিছু করার নেই তখন। না-হলে যে করেই হোক, একটা ব্যবস্থা করতাম।’
‘দ্যাট আই হ্যাভ টু অ্যাডমিট,’ ইনস্পেকটর বললেন, ‘পুরো ব্যাপারটা খুবই ভেবেচিন্তে করা হয়েছে। পাকা মাথার কাজ।’
‘আমরা তো একা নই, একসঙ্গে সব কাগজই ধোঁকা খেয়ে গেল! আসলে কী বলুন তো ইনস্পেকটর, আমি আমার কাগজের কথাই বলছি, আরকে মুভিজের প্রতিটা প্রডাকশনের টিজার এবং পোস্টার আমাদের কাগজে দেয়। বড় প্রোডাকশন হাউজগুলো সকলেই দেয়। ফলে বুঝতেই পারছেন, এদের সঙ্গে আমাদের অনেকদিনের সম্পর্ক। আর শ্যামল যেটা বলল, নানারকম ইনোভেটিভ অ্যাড হচ্ছে আজকাল। ফলে বয়ান নিয়ে আর তলিয়ে ভাবিনি। ক্লিয়ারেন্স দিয়ে দিয়েছি। এই তো কিছুদিন আগেই “মোস্ট ওয়ান্টেড” বলে যুবরাজের ছবি দিয়ে একটা ফিল্মের টিজার পোস্টার ছেড়েছিল! সন্দেহ করার কোনও কারণ পাইনি। বিশেষত পূর্ণেন্দুবাবুর সঙ্গে শ্যামলের যখন কথা হয়েই গেছে।’
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ইনস্পেকটর বললেন, ‘যে-চারটে খবরের কাগজে অ্যাড দিয়েছে তার মধ্যে তিনটেরই অফিস এই চত্বরে। সবটা আমার ঘাড়েই এসে পড়ল। তবে ইনকোয়েস্ট রিপোর্ট দিলেই আপাতত আমার কাজ শেষ। এ-কেস ক্রাইম ব্রাঞ্চে যাবেই।’
‘এই যে স্যার।’ শ্যামল একটা কাগজ এগিয়ে দিল ইনস্পেকটরের দিকে। তার চোখমুখ থেকে উৎকণ্ঠা যায়নি এখনও।
একঝলক দেখে ইনস্পেকটর বললেন, ‘এটা আমায় একটা কপি করে দিন প্লিজ।’
সাব-ইনস্পেকটর গুপ্তর ফোনে কল এসেছিল। এতক্ষণ সে অফিসঘরের এক কোণে গিয়ে গুজগুজ করে কথা বলছিল। ফিরে এসে ইনস্পেকটর মণ্ডলকে বলল, ‘স্যার, পূর্ণেন্দু সরকারের ফোনে একটা ম্যালওয়ার পাওয়া গেছে।’
‘ম্যালওয়ার মানে?’
‘ভাইরাস। কোনওভাবে ওঁর ফোনে একটা ভাইরাস ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ভাইরাসটা রিমোট অ্যাক্সেস দেয়।’
‘তার মানে?’
‘পূর্ণেন্দুবাবুর ফোনের অ্যাক্সেস গোটা একটা ঘণ্টার জন্য অন্য কারও কাছে ছিল। এইজন্যই তিনি কোনও ফোন পাননি।’
ইনস্পেকটর মণ্ডল হাঁ হয়ে গেলেন। আশ্চর্য শয়তানি। পূর্ণেন্দু সরকারের ফোন হ্যাক করে নিজেরা কথাবার্তা সেরেছে। আরকে মুভিজ প্রায়শই এই কাগজগুলোয় অ্যাড দেয়। এছাড়া আরকের সিনেমাগুলোর পেইড রিভিউয়ের জন্য পূর্ণেন্দুবাবুর থেকে একটা অ্যামাউন্টও এরা পায়। ফলে একবার রুটিন কনফার্ম করার বাইরে এঁরা আর কিছু ভাবেননি। অর্থাৎ এরা জানতেই পারেননি যে পূর্ণেন্দু সরকারের সঙ্গে কথা বলছেন না। আর বেচারা পূর্ণেন্দুবাবুও জানতে পারেননি যে তিনি তাঁর আপকামিং ফিল্মের জন্য খবরের কাগজে টিজার দিচ্ছেন।
.
গিরিশ পার্ক, সকাল ১০টা ৫০
কথায় বলে, পুরুষের রোজগার আর নারীর বয়েস জিগ্যেস করতে নেই। কথাটা শুধু সেকেলে নয়, বেশ জালি। রোজগার বা বয়েস কাউকেই জিগ্যেস করা উচিত নয়। কিন্তু পূর্ণেন্দু সরকারের গিরিশ পার্কের ঝিনচ্যাক ডুপ্লে ফ্ল্যাটের ড্রইংরুমে বসে ভদ্রলোককে এই দুটো কথাই জিগ্যেস করতে ইচ্ছে করছিল ইনস্পেকটর মণ্ডলের। উপরি কত রোজগার থাকলে স্রেফ বাংলা ছবি করে সিঙ্গাপুর, লন্ডন আর লস অ্যাঞ্জেলসে একটা করে ক্যাসিনো কিনে ফেলা যায়, সেটা পশ্চিমবঙ্গের একজন রাজ্য সরকারি কর্মচারীর পক্ষে মাপতে চাওয়াটাই একটা স্পর্ধার বিষয়।
সর্বভারতীয় বাজারের হিসেবে বাংলা ছবির মার্কেটকে মাপলে আতশকাচ দিয়েও খুঁজে পাওয়া যাবে না। ঠিকঠাক সময়ে কালার-থিম বদলে বদলে সব পার্টির ঘনিষ্ঠ হয়ে থাকাটা একটা আর্ট। গান্ধিছাপ নোটই হচ্ছে সেই আগুনের পরশমণি, যা লোকজনের প্রাণে হালকা করে ছুঁয়ে দিলেই ম্যাজিক ঘটে যায়। বুড়ো হাবড়া প্রডিউসারও কচি হিরোইনদের বগলে নিয়ে ঘুরতে পারে। বয়েসের তফাত নিয়ে অবশ্য মণ্ডলের কোনও বক্তব্য নেই। ভালোবাসা বয়েস-ফয়েস মানে না, সেটা হক কথা। মানা উচিতও না। কিন্তু ভালোবাসা শুধু টাকা মানলে সেটা একটা খিঁচের বিষয় বটে।
সে যা-ই হোক, আপাতত পূর্ণেন্দু সরকারকে বেশ মুহ্যমান দেখাচ্ছে। বিনা মেঘে এহেন বজ্রপাতের জের এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেননি। কাঁধ ঝুলে পড়েছে তাঁর। ইনস্পেকটর মণ্ডল বললেন, ‘স্যার, আপনার ফোনটা লালবাজারের ডিজিটাল ফরেন্সিক বিভাগের কাছে জমা করা হয়েছে। দিন দুয়েকের মধ্যে আপনি ফেরত পাবেন। এই ফোনের সঙ্গে লিঙ্কড অ্যাকাউন্টগুলো সিকিওর করে নিয়েছেন তো?’
পূর্ণেন্দুবাবু কিঞ্চিৎ অন্যমনস্ক স্বরে বললেন, ‘হ্যাঁ। করে নিয়েছি।’
‘এবার যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নতুন ফোন নিয়ে নিন।’
‘কিন্তু এটা কীভাবে সম্ভব হল, আমার মাথায় কিছুতেই ঢুকছে না ইনস্পেকটর!’
‘কোনও ম্যালিশিয়াস লিঙ্কে ক্লিক করে ফেলেছেন,’ বললেন ইনস্পেকটর মণ্ডল, ‘আজকাল তো এইসব নতুন উপদ্রব শুরু হয়েছে, ফোনেও ভাইরাস-টাইরাস পাঠানো যাচ্ছে। ওইরকমই কিছু একটা ভাইরাস পাঠানো হয়েছিল আপনার কাছে। ভবানী ভবন সাইবার সেল থেকে জানানো হয়েছে, আপনার ফোনের অ্যাক্সেস এক ঘণ্টার জন্য অন্য কারও কাছে চলে গিয়েছিল।’
বিভ্রান্ত চোখে তাকালেন পূর্ণেন্দুবাবু, ‘আমি এরকম কোনও লিঙ্কে ক্লিক করেছি বলে মনে করতে পারছি না। আমি তো স্মার্টফোনে অত কিছু পারিও না। সেক্রেটারি শুধু জিমেইল, ইউটিউব, হোয়াটসঅ্যাপ এগুলো খুলে দিয়েছে।’
‘এখন স্মার্টফোন এসে যাওয়ায় এসব সমস্যা বাড়ছে, মিঃ সরকার। ফোন থেকে ব্যাঙ্ক পেমেন্ট করা হচ্ছে। ফলে ভাইরাস পাঠিয়ে ফোন থেকে টাকাও হাতিয়ে নেওয়া যাচ্ছে। আপনার কেসটা আইডেন্টিটি থেফট। সাইবার সেল তদন্ত করছে। ওরা আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করবে।’
পূর্ণেন্দু সরকারের কপালে চিন্তার ভাঁজ। চিন্তার বিলক্ষণ কারণ রয়েছে। তাঁর পরিচয় ভাঁড়িয়ে এক সিরিয়াল কিলার নিজের কাজ হাসিল করেছে। অপরাধী ধরা না-পড়া অবধি পুলিশ তাঁকে বারবার বিরক্ত করবে।
জলের গ্লাসে চুমুক দিয়ে তিনি বললেন, ‘কিন্তু আমি ভাবছি, এত বড় সাহস? অ্যানাউন্স করে দিচ্ছে, জেলে ঢুকে খুন করবে? কে এই তিরিশ বছর বয়সি ফরসা, কোঁকড়ানো চুলের মহিলা?’
‘মহিলার খোঁজ চলছে। তবে ফড়িয়াপুকুর কেসের আসামিকে খুন করার কথাটাকে আমরা এখনই খুব সিরিয়াসলি নিচ্ছি না। আলিপুর কারেকশনালে ঢুকে কাউকে খুন করে আসাটা ইজ নট আ ম্যাটার অব জোক।’
‘তা তো বটেই, তা তো বটেই,’ কেমন আনমনা হয়ে পড়লেন পূর্ণেন্দু সরকার, ‘কিন্তু বারোই সেপ্টেম্বর কি বিশেষ কোনও দিন, অফিসার? আমি গুগল ঘেঁটে কোনও রেলেভ্যান্স পেলাম না।’
ইনস্পেকটর মণ্ডল বললেন, ‘গুগল সব জানে না পূর্ণেন্দুবাবু। বারোই সেপ্টেম্বর একজন বিশিষ্ট বাঙালির জন্মদিন। গত বছরই তিনি মারা গেছেন। এই মজন্তালী সরকারের রহস্য সেখান থেকেই সুতো ছাড়তে শুরু করেছে কিনা, সেটাই এখন প্রশ্ন।’
‘বিশিষ্ট বাঙালি? কে বলুন তো?’
‘ভদ্রলোকের নাম বরুণ বিশ্বাস।’
.
আলিপুর সেন্ট্রাল কারেকশনাল হোম, সকাল ১১টা ১০
শালিনীর প্রশ্নের উত্তরে পোকায়-খাওয়া দাঁত বের করে হাসল ফড়িয়াপুকুর ধর্ষণ মামলার আসামি মুকেশ সিং, ‘অত রাত্তিরে যারা বাইরে ঘোরাঘুরি করে, তারা ভালো মেয়ে না।’
‘তার মানে আপনি বলতে চাইছেন, রেপ হলে দোষ মেয়েদেরই?’
‘বিলকুল। ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের দোষ অনেক বেশি আছে। দেখেন ম্যাডামজি, এক হাতে তালি বাজে না, এটা তো মানবেন?’
খটাস করে শব্দ তুলে পেনের ক্যাপটা ভেঙে গেল। পেনটা টেবিলে নামিয়ে রেখে ক্লান্ত একটা হাসি হাসল শালিনী, ‘আপনার কোনও অনুতাপ নেই?’
এত কঠিন বাংলা বোধহয় বুঝতে পারল না মুকেশ সিং, ‘জি?’
‘বলছি এই যে আপনি একটা মেয়েকে রেপ করেছেন, নিজেকে দোষী মনে হয়? ঘেন্না হয় নিজের ওপর?’
লোকটা শালিনীর চোখে চোখ রাখল। সেই চোখে প্রাগৈতিহাসিক শীতলতা, ‘কেন হবে? কোন ভালো ঘরের মেয়েটা রাত্তির সাড়ে ন’টার পরে রাস্তায় ঘুরে বেড়ায় আপনি বলুন তো!’ একটু থেমে শালিনীকে আপাদমস্তক জরিপ করে নিয়ে বলল, ‘মেয়েরা এইটুকুটুকু ড্রেস করবে, রাত কো দশ-গ্যায়ারা বজে রাস্তায় ঘুরবে, আর রেপ হবে না?’
নিষ্ফল আক্রোশ নিয়ে লোকটার দিকে কয়েক সেকেন্ড চেয়ে রইল শালিনী। প্রবল ঘৃণায় মুখে টক জল উঠে আসছে। এই প্রজেক্টটা তাকে মানসিকভাবে দুমড়েমুচড়ে দিচ্ছে। এর আগে আরও তিনজন রেপিস্টের ইন্টারভিউ শালিনী নিয়েছে। মুকেশ সিং চার নম্বর। চারজনের বক্তব্য মোটামুটি এক। আরও কতজন যে মনে মনে এদেরই বক্তব্যে বিশ্বাস করে, তার হিসেব নেই। এ তো একটা সর্বগ্রাসী মহামারি। রেপিস্টদের ধরে ধরে মারলেই কি শেষ হবে মনের জীবাণু? কিন্তু জেলের নাম পাল্টে ‘সংশোধনাগার’ করে দিয়েই বা কী লাভ হচ্ছে? একটা জঘন্য ধর্ষক চোখে চোখ রেখে আত্মপক্ষ সমর্থন করে যাচ্ছে।
মুকেশ যেখানে আছে, আলিপুর সেন্ট্রাল জেলের সেই পাঁচ নম্বর ওয়ার্ডকে লোকজন চলতি কথায় ‘মন্দির ওয়ার্ড’ বলে ডাকে। কারণ এই ওয়ার্ডের সামনে রাধাকৃষ্ণের একটা ছোট মন্দির আছে। মন্দির থেকে কাঁসর-ঘণ্টার শব্দ ভেসে আসছে। সম্ভবত কোনও পুজো আছে আজ। অথবা হয়তো নিত্যপুজোই হচ্ছে। যে-ওয়ার্ডের সামনে ঈশ্বরের অধিষ্ঠান, সেই ওয়ার্ডেই মুকেশের মতো পিশাচ। অতুলনীয় প্যারাডক্স। শালিনীর চোয়াল হঠাৎ শক্ত হয়ে গেল। মুকেশ আলাদা সেলে থাকে বলে বাইরের কোনও খবর পায় না। লোকটাকে খবরটা জানানো যাক। বাইরের কিছু দেখাতে গেলে অবশ্য আলাদা পারমিশন লাগে, তবে উপস্থিত রক্ষীরা সাধারণত ছোটখাটো ব্যাপারে তেমন গা করে না। নিয়ম-ভাঙাটাও কনফিডেন্সের সঙ্গে ক্যারি করতে হয়। এটাই দুনিয়ার নিয়ম। শালিনী হ্যান্ডব্যাগ থেকে একটা ভাঁজ করা খবরের কাগজ বের করে মুকেশের দিকে এগিয়ে দিল, ‘পড়তে পারো তো?’
‘ক্যা হ্যায়?’ মুকেশ হাত বাড়িয়ে পেপারটা নিল।
‘নীচে ডানদিকে একটা অ্যাড বেরিয়েছে। দ্যাখো।’
মুকেশ পেপারটা খুলে মেলে ধরল নিজের চোখের সামনে, ‘ক্যায়সা অ্যাড?’
নিজের ভিতরে শালিনী একটা উদগ্র আত্মপ্রসাদ টের পাচ্ছে। বত্রিশের অর্ধেক বিকশিত করে হাসল সে, ‘তোমার জন্য একটা লভ লেটার। পেপারে ছেপে দিয়েছে।’
.
রবিনসন স্ট্রিট, বেলা ১২টা ৩০
বিষাদ এক নিরালোড়ন পানাপুকুর। আজ অনেকদিন পর তাতে ঢিল পড়ল। ঢিল না বলে বড়সড় বোল্ডার বলাই ভালো।
পঞ্চায়েত ভোট মেটার পর জমানো কিছু ছুটি মাঝেসাঝেই নিয়ে নিচ্ছে দময়ন্তী। আজও নিয়েছে। সারাদিন শুয়ে-বসে থাকা, টুকটাক বই পড়া ছাড়া তেমন কিছুই করার থাকে না। মাথাটা রাবার ব্যান্ডের মতো হয়ে থাকে। কিন্তু আজকের কথা আলাদা। কলকাতা ও তার পার্শ্ববর্তী শহরতলি জুড়ে আজ একটা বোমা ফেটেছে। ফেটেছে বলা ভুল, ফেটে চলেছে পরপর। যাকে বলে কার্পেট বম্বিং। মজন্তালী সরকার নামে কোনও একজন মহিলা কলকাতাকে বিনা নোটিশে রোলার কোস্টারে চড়িয়ে দিয়েছে। ঘরে শেষ কবে টানা এতক্ষণ টিভি চলেছে, মনে করতে পারছে না দময়ন্তী। গতকাল রাত্রে ফার্ন রোডে চারটে এবং সোনারপুরে দুটো খুন। আজ সকালে চারটে খবরের কাগজে অ্যাড। খুনের জায়গাগুলোয় আততায়ীর নাম লেখা চিরকুট পাওয়া গেছে। সেই আততায়ী যে একজন মহিলা, সেকথার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে খবরের কাগজের বিজ্ঞাপন গ্রহণ কেন্দ্র থেকে। চার জায়গার স্টাফেরা একই হুলিয়া বলেছে। ফর্সা, চোখে সানগ্লাস, কোঁকড়া চুল। বয়েস কমবেশি তিরিশ। আপাতত চ্যানেলে চ্যানেলে পুলিশের কোনও শিল্পীর হাতে আঁকা পোর্ট্রেটটা ঘুরে বেড়াচ্ছে। পুরোটা মাথার মধ্যে সাজাতে সাজাতে দময়ন্তীর হাতে-পায়ে বিদ্যুৎ খেলে উঠছিল। ফড়িয়াপুকুর রেপ কেসের প্রতিশোধ নেওয়াই যদি আসল লক্ষ্য হয় তাহলে প্রিলিউড হিসেবে এতগুলো খুনোখুনি কেন? মোটিভ ঘোলাটে করে দিতে চাইছে? নাকি এত লম্ফঝম্প করে পুলিশ-প্রশাসনকে ব্যতিব্যস্ত করাটাই আসল উদ্দেশ্য? তাছাড়া প্রশ্ন হচ্ছে, হোয়াই মজন্তালী সরকার? একজন সিরিয়াল কিলার উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর গল্পের সেয়ানা বেড়ালের নাম কেন নেবে? নিউজ চ্যানেলগুলো বলছে, পুলিশের বড়কর্তারা আপৎকালীন মিটিংয়ে বসেছেন। ডিজি নর্থ বেঙ্গল সফর অসম্পূর্ণ রেখে ফিরে আসছেন। প্রশাসন-সূত্রের খবর, কেস সিআইডি-র হাতে আসছে। এসিপি দময়ন্তী মুখার্জী অবশ্য এখন একটা মরা গাছ, যার কোটরে বসে তক্ষক ডাকে। কিন্তু এ-কেসে ইন্টারেস্ট না নিয়ে থাকা যায়? অনেকদিন পর নড়েচড়ে বসার মতো কিছু একটা ঘটছে এ-শহরে। থোড়-বড়ি-খাড়ার বাইরে কিছু একটা, যেটাকে ঠিক ডিকোড করা যাচ্ছে না। দময়ন্তী আবার নিউজ চ্যানেলে মনোনিবেশ করল।
.
কাশীপুর, সকাল ১১টা ৩০
এতটা জিভ বের করে কেউ মরে যেতে পারে, না-দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। হাত বাড়িয়ে কাউকে পাবে না জানতে পারলে তবেই বোধহয় মানুষ এতটা জিভ বাড়িয়ে দেয়।
নিজেকে লীনা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল। মৃত্যু-পরবর্তী নিজেকে। কষ্ট হচ্ছে না। মনে হচ্ছে, মাথার মধ্যে কেউ যেন ‘পজ’ বোতাম টিপে দিয়েছে আর মাইলের পর মাইল সেই নিশ্চল ট্রাফিকের মধ্যে কার হাত ফস্কে উড়ে যাচ্ছে একটা নীল বেলুন।
এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়াটা কঠিন। কিন্তু একবার নিয়ে ফেললে মনটা বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে যায়। লীনা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। তার চলে যাওয়াটা কোনও স্টেটমেন্ট না। কোনও মেসেজ না। কিছুই না। নির্জলা চলে যাওয়া। মুকেশ সিংয়ের জেল হয়েছে। হয়তো ফাঁসিও হবে। কিন্তু লীনার যা গেছে তা তো আর ফিরে আসবে না। এখন আর সেসব ভেবে কষ্ট হচ্ছে না। তটের দিকেই যত কষ্টের ঢেউ, ভিতরসমুদ্র তো শান্ত। লীনা তরঙ্গবিক্ষোভের এলাকা পেরিয়ে এসেছে। পেরিয়ে এসেছে বলেই আলমারি খুলে প্রিয় নীল ওড়নাটা বের করে আনতে একটুও হাত কাঁপল না। ওড়নাটা অনেকটা লম্বা। দু-পাল্টা করে নিলে ছিঁড়বে না। হাতে-পায়ে ভালো করে কোল্ড ক্রিম মেখে নিল লীনা। দু-হাতের নখে যত্ন করে নেলপলিশ পরল। টি-শার্টে ফুসফাস করে দিয়ে নিল গ্রিন অ্যাপল ফ্লেভারের ডিও। ভারি মিঠে গন্ধটা। যেতে হলে পরিপাটি হয়ে যাওয়াই তো ভালো।
তৈরি হয়ে মাথার ওপরে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকাল লীনা। কালমেঘপাতা রঙের এই নিঃস্পৃহ ফ্যান আর নীলকমল কোম্পানির ক্যাটক্যাটে লাল টুলই লীনার এরোপ্লেন আর এরোপ্লেনের চাকা। একটু পরেই সে উড়বে। কোনও একটা হলিউড ছবিতে দেখিয়েছিল, মৃত্যু ঘনিয়ে এলে দৃষ্টি ধীরে ধীরে রঙিন থেকে সাদা-কালো হয়ে আসে। তবে লীনার চোখ থেকে তো রঙেরা ধীরে ধীরে অন্তঃস্ফোটনের পথে এগোবে না। ব্যাপারটা এক ধাক্কায় ঘটবে। নট উইথ হুইম্পার। উইথ আ ব্যাং। মৃত শরীরের কোষে পচন শুরু হলে পিউটরেসেনিক নামে একধরনের রাসয়ানিক বেরোয়। যার গন্ধ আচ্ছন্ন করে। অবশ করে। লীনা মৃত্যুর গন্ধ টের পাচ্ছিল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে জিভ বার করে সে ডেমো দিল একবার। প্রশ্ন হচ্ছে, তর্জনীর মতো এই জিহ্বাফলক কার দিকে বাড়ানো থাকবে? শুধুই মুকেশ সিংয়ের দিকে? মুকেশ সিং একাই কি দোষী? দু-দিন আগেও চিৎকারে ভিতরটা ফেটে পড়তে চাইছিল। এখন সব চিৎকার নিভে গেছে। মাথার মধ্যে মাইলের পর মাইল নিশ্চল হয়ে আছে ট্রাফিক। যেন ‘স্ট্যাচু’ বলে দিয়ে চলে গেছে কেউ। আর ফিরছে না। ফিরবেও না। কারণ লীনা তাকে দেখতে পাচ্ছে। লম্বা জিভ বাড়িয়ে সে ঝুলছে। দাঁতের চাপে হালকা থেঁতলে গেছে সেই জিভ। মাথা বেঁকে গেছে ডানদিকে। হাত দুটো লতপত করে দুলছে, নম্র বাতাসে বারান্দায় মেলা জামাকাপড় যেমন দোলে। দৃশ্যটা খুব মন দিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল লীনা, কোথাও কোনও খুঁত ধরা পড়ছে কিনা। এমন সময় দরজায় ঘা পড়ল।
বাইরে থেকে মায়ের উত্তেজিত গলা শোনা গেল, ‘কী হল? দরজা দিয়েছিস কেন?’
লীনার মাথার লম্বা যানজটটা হঠাৎ ভেঙে গেল। তীব্র হর্ন বাজিয়ে গড়াতে শুরু করল চাকারা। ত্বরিত হাতে ওড়নাটাকে বালিশের তলায় গুঁজে লীনা দরজা খুলতে উঠল।
ঘরে ঢুকেই মা লীনার কাঁধ খামচে ধরল। মুখ রক্তশূন্য। ত্রস্ত গলায় বলল, ‘দরজা বন্ধ করেছিলি কেন?’
লীনা ম্লান হাসল, ‘আরে এমনি।’
‘তোকে কতবার বলেছি না, দরজা দিবি না।’ বড় বড় করে শ্বাস নিচ্ছে মা।
মা শেষ একমাসে কেমন যেন বুড়িয়ে গেছে। কণ্ঠার হার উঁকি মারছে। ভাঁজ বেড়েছে চামড়ায়। চোখের তলার কালি লীনার থেকে আরও এক পোঁচ বেশি। কারণে-অকারণেই এখন মায়ের বুক ধড়ফড় করে। লীনাকে বেশিক্ষণ চোখের আড়াল করতে চায় না। কলঙ্ক জিনিসটাই এমন। তার কোনও ব্যক্তিগত মালিকানা হয় না। পরিজনেরা সবাই মিলে তাকে ভাগ করে নেয়। যাই হোক, আপাতত যমের দুয়ারে কাঁটা পড়ে গেল। আবার মনটাকে গুছিয়ে তুলতে হবে। সতর্ক থাকতে হবে। বাঁধ শক্ত রাখতে হবে। যাতে জল না ঢুকে পড়ে। লীনা মায়ের হাত ধরে বলল, ‘সরি মা, ভুল হয়ে গেছে!’
মা চারদিকে ভালো করে তাকিয়ে একটু যেন নিশ্চিন্ত হল। নিজেকে সামলে বলল, ‘তোর নামে একটা চিঠি এসেছে।’
‘চিঠি? আমার নামে?’ লীনা অবাক হয়ে গেল।
‘হ্যাঁ। কী অদ্ভুত একটা চিঠি! মাথামুন্ডু কিছুই বুঝতে পারছি না।’
এখনকার দিনে ফোন বা মেসেজ না-করে চিঠি কে লেখে? চিঠি লিখে কারও কীই-বা জানানোর থাকতে পারে তাকে? লীনা কিছুই ভেবে পেল না। জিগ্যেস করল, ‘কে লিখেছে? নাম কী?’
‘নামটাও অদ্ভুত!’ মা বলল, ‘মজন্তালী সরকার।’
.
বালিগঞ্জ, লাইভ নিউজের অফিস, সন্ধে ৭টা
ভারতের যে-কোনও স্টেশনে ট্রেন যত দেরি করেই ছাড়ুক, চলতে শুরু করলেই কোত্থেকে কিছু লোক দৌড়ে এসে হনুমানের মতো হুপ করে লাফ মেরে ট্রেনে উঠবে৷ লাইভ নিউজের অফিসে শাক্য হচ্ছে ওরকম৷ বিকেল পাঁচটায় কোনও একটা ভিডিও টেলিকাস্ট হবার কথা থাকলে ফাইনাল কপি শাক্যর হাত ঘুরে আপলোডারের মেলে এসে পৌঁছয় পাঁচটা বাজতে পাঁচে। তা-ও যে শাক্য টিকে আছে, সেটা তার নিখুঁত কাজের জন্য। মুশকিলের কথা হচ্ছে, সে নিজেও সেটা বুঝে গেছে। ফলে কিছুই পাল্টাচ্ছে না। আগামীকাল সকালের প্রেজেন্টেশনের জন্য শিরিন এসে তাগাদা দেওয়ায় শাক্য অম্লানবদনে হাই তুলে বলল, ‘এখনও ধরিনি।’
শিরিন জানত কী উত্তর আসবে। ফলে তেমন উত্তেজিত হল না। বিরস গলায় বলল, ‘তোর এই হচ্ছে মুশকিল। বড্ড গেঁতোমি করিস।’
‘এখনই সব সেরে রাখলে আবার হয়তো নতুন ইনফো আপডেট করতে হবে। তার চেয়ে ধীরেসুস্থে করাই ভালো। যা অবস্থা দাঁড়াচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে সিগারেট খেতে বারান্দায় গেলেই ফিরে এসে শুনব আরও দুটো খুন হয়ে গেছে।’ শাক্য চেয়ারে গা এলিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল, ‘কলকাতা এখন পুরো মওত কা মাউন্টেন, লাশ কা ফাউন্টেন, ডেঞ্জার ডেঞ্জার ডেঞ্জার!’
সৌমিলি পাশ থেকে বলে উঠল, ‘আহা! রামসে ব্রাদার্সের সেই হরর ইরোটিকা ফিল্মগুলোর ট্যাগলাইন!’
‘ঠিক ধরেছিস!’ বেজায় খুশি হল শাক্য, ‘খিল্লিগুলোর কনটেক্সট কেউ ধরতে না-পারলে মজাটা মাঠে মারা যায়! এমনিই আমার সেন্স অব হিউমার ধরতে পারার মতো প্রতিভা অফিসে কমই আছে।’
শিরিন মুখ বেঁকিয়ে বলল, ‘সেন্স অব হিউমার নিয়ে আত্মরতি পরে মারাস। কাজটা কর।’
শাক্য বলল, ‘কফি এনে দে তাহলে।’
শিরিন শাক্যর মাথায় একটা চাঁটি মেরে প্যাসেজের কফি মেশিনের দিকে রওনা হল। সঙ্গে সৌমিলিও উঠে পড়ল। তারও কফি-তেষ্টা পেয়ে গেছে। লোকজনকে চাঙ্গা রাখার জন্য এ-অফিসে কফি আনলিমিটেড এবং ফ্রি। সৌমিলিরা তার ভরপুর সুযোগ নেয়।
বালিগঞ্জ স্টেশন থেকে হাঁটা পথে ইস্টসাইড মলের একেবারে গা ঘেঁষে লাইভ নিউজের চারতলা অফিস। তৃতীয় তলায় বিরাট নিউজ রুমের পশ্চিম কোণে পরপর তিনটে ডেস্কে বসে শাক্য, সৌমিলি আর শিরিন। শাক্যও সৌমিলিদের সঙ্গে প্রায় একই সময়ে চ্যানেল জয়েন করেছে। একই বয়েস। ফলে বন্ধুত্ব হতে সময় লাগেনি। কফি নিয়ে এসে আবার মজন্তালীর আলোচনা শুরু করে দিল।
সৌমিলি বলল, ‘সবচেয়ে এক্সাইটিং ব্যাপার হচ্ছে মজন্তালী সরকার একজন মেয়ে।’
আলোচনায় নাক গলাল পাশের ডেস্কের রণদীপ। মুখ কুঁচকে বলল, ‘হ্যাঁ। তোদের আর কী! উইমেন এমপাওয়ারমেন্ট বলে নাচ! পরপর মানুষ খুন হচ্ছে সেটা তোদের কাছে বড় কথা না। বড় কথা হচ্ছে খুনি একজন মহিলা। আজব থিওরি মাইরি!’
বিভিন্ন বিষয়ে আলটপকা মন্তব্য করে বলে রণদীপের সঙ্গে সৌমিলি, শিরিনের টুকটাক খটাখটি লেগেই থাকে। বিশেষত ‘নারীবাদ’ নিয়ে রণর প্রচুর চোঁয়া ঢেকুর ওঠে, আর সৌমিলিরা রণকে ‘টক্সিক আলফা মেল’ বলে গাল দেয়। এইসব ব্যাপারে সৌমিলি-শিরিন একেবারে শচীন-সৌরভের জুটি। যেমন হাঁড়ি, তেমন সরা। ফলে রণর সঙ্গে মতান্তর মনান্তরে না পৌঁছলেও, মাঝেমাঝেই উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় অবধি গড়ায়। শাক্যর মতো ফচকে লোকজন তাতে উস্কানি দেয়। ডেস্ক-ডিউটির বাকিরা দিব্যি ফ্রি বিনোদন পায়। রণর কথা শুনে শিরিন বিরক্তির চোখে তাকাল, ‘মানুষ খুন হচ্ছে না রণ, অমানুষরা খুন হচ্ছে। তুই একটা মেল শভিনিস্ট। তোর মোটা মাথায় এসব ঢুকবে না।’
রণ কচরমচর করে তেলেভাজা চিবোতে চিবোতে বলল, ‘শিরিনকে কোনদিন আমি বাজিগরের শিল্পা শেটির মতো ছাদ থেকে ঠেলে ফেলে দেব, বুঝলি তো! শালা সবেতে ফেমিনিস্ট অ্যাঙ্গেল খোঁজে! বুরবক কাঁহিকা!’
‘মারব এক থাপ্পড়!’ শিরিন হাতের ফাইলটা রণর মুখে ছুড়ে দিয়ে বলল, ‘তুই নিজে কী? মেল শভিনিস্ট একটা! গার্লফ্রেন্ডকে নাচতে দিস না তোর বাড়ির লোক পছন্দ করে না বলে! লজ্জা করে না?’
ফাইলটা মাটিতে পড়ে গেছিল। রণ ধীরেসুস্থে তুলে ধুলো ঝাড়ল। তারপর সেটা টেবিলে রেখে নির্বিকার মুখে পরের পেঁয়াজিটায় কামড় বসিয়ে বলল, ‘না, করে না। কারণ তিতির সেটা মেনে নিয়েছে।’
‘মেনে নিয়েছে? না তুই বাধ্য করেছিস মেনে নিতে?’
‘বাধ্য করার কি আছে? ও আমার আর নাচের মধ্যে আমাকে বেছে নিয়েছে। এটা ওর চয়েস।’
সৌমিলি বলল, ‘এটা চয়েস বলে না। এটাকে ইমোশনাল ম্যানিপুলেশন বলে। সেটা তুইও বুঝিস, স্বীকার করতে চাস না।’
রণ বলল, ‘জারগন ঝাড়িস না তো। তিতিরকে ফোন করে জিগ্যেস কর, জবাব পেয়ে যাবি।’
‘তিতির তোর কথাই ইকো করবে। কারণ ও তোর গ্যাসলাইটিংয়ের শিকার।’ বলতে বলতে টেবিল থেকে একটা স্কেল তুলে নিয়ে শিরিন চটাস চটাস করে তিন-চার ঘা বসিয়ে দিল রণর পিঠে। রণ হেঁড়ে গলায় চেঁচিয়ে উঠল। আশপাশ থেকে লোকজন বিরক্ত চোখে তাকাল।
শাক্য চুপচাপ মজা নিচ্ছিল। এবার বলল, ‘বাট হোয়াই মজন্তালী সরকার? এরকম একটা নাম হঠাৎ কেন নেবে?’
সৌমিলি বলল, ‘সেটা একটা বড় প্রশ্ন। তবে মানে যা-ই হোক, নামটার মধ্যে কিন্তু একটা ট্রিপি ব্যাপার আছে। কী বলিস?’
শিরিন বলল, ‘কিন্তু আগামীকাল সকালের কপিটা রেডি না করলে পৃথ্বীশদা ট্রিপি হয়ে যাবে।’
শাক্য বলল, ‘তুই অত টেনশন নিস না। একটু গুছিয়ে একটা এক্সাইটিং হাইপোথিসিস দাঁড় করিয়ে দিলেই দেখবি সেলিং লাইক হট কচুরিজ। টের পাচ্ছিস না বাজার কীরকম গরম? গোটা একটা শহর ম্যাদা মেরে পড়েছিল। মজন্তালী সরকার ঝড়ের মতো এসে তার কলার ধরে ঝাঁকিয়ে দিয়েছে।’
‘টিআরপি এভারেস্ট ছোঁবে ভাই,’ রণ আমোদগেঁড়ে গলায় বলল, ‘মজন্তালী ভালো পারফরম্যান্স দিলে এই বাজারে বোনাস-টোনাসও পেয়ে যেতে পারি।’
শাক্য সায় দিল, ‘তবে কিছুদিন টানতে হবে। দুম করে ধরা পড়ে গেলে চলবে না।’
‘শুধু টিআরপি আর টিআরপি?’ শিরিন মুখ বেঁকাল, ‘তোমার মন নাই কুসুম?’
শাক্য বলল, ‘আমারটা তো তবু কোনওমতে টিমটিম করে টিকে আছে ভাই। পৃথ্বীশদার নেই এটা শিওর বলতে পারি।’
‘তা যা বলেছিস।’ সৌমিলি বলল, ‘আজকাল কেমন আলতু-ফালতু হাফ-বেকড সব স্টোরি অ্যাপ্রুভ করে দিচ্ছে খেয়াল করেছিস?’
‘ডিজি মিডিয়া এখন হাফ-বেকডেই চলছে সৌমিলি। সারাক্ষণ এক্সক্লুসিভের পিছনে ছোঁক ছোঁক করলে এর চেয়ে বেটার আর কী হবে!’
সৌমিলি বলল, ‘কেস কি সিআইডি-র হাতে যাচ্ছে? এনি আপডেট?’
শিরিন বলল, ‘হ্যাঁ। ইনভেস্টিগেটিং অফিসার সম্ভবত এস এস ক্রাইম অমিতাভ সান্যাল। এখনও কনফার্ম নই যদিও।’
‘সেই খিদিরপুর বিস্ফোরণ মামলার অমিতাভ সান্যাল?’
‘ইয়েস!’
রণ বলল, ‘দাবাং লোক। খেলা জমবে ভালো।’
‘বাট আই বেট অন মজন্তালী। আই অ্যাম কিন্ডা এক্সাইটেড।’ শিরিন বলল।
‘সেম হিয়ার ব্রো,’ হাত বাড়িয়ে শিরিনের সঙ্গে হাই ফাইভ করল সৌমিলি, ‘তবে খেলা ভালো জমত যদি তদন্তের দায়িত্ব কোনও মহিলা অফিসারকে দেওয়া হতো। কী বলিস?’
প্রশ্নপত্র হাতে পেয়ে সব প্রশ্ন অচেনা লাগলে পরীক্ষার্থীর মুখ যেমন দেখায়, তেমন মুখ করে শাক্যর দিকে তাকাল রণ, ‘হ্যাঁ রে, ওরা কি সত্যিই ফেমিনিন-ইস্যু নিয়ে আননেসেসারি বাড়াবাড়ি করে নাকি আমিই ওভাররিয়াক্ট করি বল তো?’
.
রবিনসন স্ট্রিট, সন্ধে ৭টা ৩০
বাথরুম থেকেই দময়ন্তী শুনতে পাচ্ছিল ফোন বাজছে। বেজে বেজে কেটে গেল। একবার বাজলে দময়ন্তী অত পাত্তা দেয় না। কিন্তু আবারও বাজছে। তাহলে জরুরি কিছুই হবে। দময়ন্তী তড়িঘড়ি বেরিয়ে এসে দেখল, এস এস ক্রাইম অমিতাভ সান্যালের কল। কী ব্যাপার? এত রাতে তলব?
ধরার আগেই কলটা কেটে গেছিল। দময়ন্তী রিং ব্যাক করল। একবার রিং হতে না হতেই ফোন রিসিভ করলেন অমিতাভ, ‘কোথায় ছিলে দময়ন্তী?’
‘বাথরুমে ছিলাম স্যার। এনিথিং সিরিয়াস?’
‘ড্যাম সিরিয়াস! রাতের ঘুম উড়ল বলে।’
‘নতুন কেস?’
‘ইয়েস,’ উত্তেজিত শোনাল অমিতাভর গলা, ‘মিশন মজন্তালী সরকার।’
‘মজন্তালী সরকারের কেস আপনার হাতে আসছে? খুব ভালো খবর। কংগ্র্যাচুলেশন।’
‘থ্যাঙ্কস দময়ন্তী। অ্যান্ড সেম টু ইউ।’
‘মানে?’
‘তুমিও থাকছ দময়ন্তী। এডিজি নিজে তোমায় রেকমেন্ড করেছেন।’
দময়ন্তী কয়েকশো ভোল্টের শক খেল, ‘আমি?’
‘হ্যাঁ। তুমি এই কেসে আমার সেকেন্ড-ইন-কম্যান্ড। কাল সকালে আমার ঘরে রিপোর্ট করবে। শার্প টেন।’
ফোন রাখার পর দময়ন্তীর সারা শরীর জুড়ে অনেকক্ষণ ধরে একটা কাঁপুনি হতে লাগল। এত বড় কেসে তাকে ভরসা করা হচ্ছে আবারও? এডিজি স্বয়ং রেকমেন্ড করেছেন? গত এক বছর প্রায় বসে যাবার পরেও? সেই বিষ মদের কেসের পর হাবজিগাবজি ডিউটি করে দিন কাটছে। সেখান থেকে সটান এই মুহূর্তের সবচেয়ে হাই প্রোফাইল কেস! বিশ্বাস হতে চাইছে না কিছুতেই। দময়ন্তী মুখে হাত চাপা দিয়ে বসে রইল খানিকক্ষণ। উদ্বেগের পারদ উঠছে চড়চড় করে। এখনই মাথা ধরবে।
মাথাটা এমনিতেই আজকাল সারাক্ষণ রাবার ব্যান্ডের মতো হয়ে থাকে। গড়পড়তার বাইরে কিছু ঘটলেই তাতে টান পড়ে। শিরা-টিরা ছিঁড়ে যাবার উপক্রম হয়। সাইকোলজিস্টকে ফোন করা দরকার। কনফিডেন্স একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছে। ভোকাল টনিকে চেগে ওঠার বয়েস অবশ্য চলে গেছে। এখন ওষুধ ছাড়া কাজ দেবে কি? কিন্তু এমন তো কোনও ম্যাজিক পুরিয়া হয় না, যা দিয়ে রাতারাতি আত্মবিশ্বাসকে চাঙ্গা করে তোলা যাবে। দু-একটা ওষুধের নাম দময়ন্তী জানে, যেগুলো সাময়িক কাজ দেয়। কিন্তু ওষুধের ওপর নির্ভর করে একটা গোটা তদন্ত উৎরে দেওয়া নিশ্চয়ই সম্ভব না। প্রেসক্রিপশন ছাড়া সেসব পাওয়াও যাবে না। তাছাড়া এমনিতেই ডিপ্রেশন কাটাতে রোজ এত ট্যাবলেট গিলতে হচ্ছে, কিছুদিন বাদে আর কোনও ওষুধে কাজ দেবে কিনা তাই সন্দেহ।
তবে আজ কিছু একটা দরকার। এখনই, কারণ আজ রাত জাগতে হবে। মজন্তালী সরকারকে নিয়ে হোমওয়ার্ক করতে হবে। হোমওয়ার্ক ছাড়া দময়ন্তী কোনও অফিশিয়াল মিট অ্যাটেন্ড করে না। কাল সকাল দশটায় যখন অমিতাভ সান্যালের কেবিনের দরজা ঠেলে ঢুকবে তার আগে সমস্ত আপডেট তার ডায়েরিতে থাকবে। ফলে ফোকাস নড়তে দেওয়া যাবে না। পরীক্ষার আগে নার্ভ ঠান্ডা রাখতে ‘ক্যালি ফস’ নামে একটা হোমিওপ্যাথি ওষুধ খাওয়াত মা। মা এখানে থাকে না। কিন্তু ক্যালি ফসের শিশিটা দময়ন্তীর সঙ্গে এই নতুন ফ্ল্যাটে চলে এসেছে। সেটাই দু-ফোঁটা খেয়ে নিলে হয় না?
তাই করল দময়ন্তী। মিনিটখানেক পর কাঁপুনি একটু কমল। হাত-পায়ে সাড় ফিরল একটু। তখন সে উঠে রান্নাঘরের দিকে গেল। রাতের বাসনগুলো পড়ে আছে। মেজে ফেলা যাক। বাসন মাজা চমৎকার স্ট্রেসবাস্টার। উত্তেজনা আর স্ট্রেস কমানোর সবচেয়ে ভালো দাওয়াই। স্কচব্রাইটে লিকুইড সাবান ঢেলে স্টিলের থালার পিঠে জোর ঘষা দিল দময়ন্তী।
.
কাশীপুর, রাত ৮টা ৩০
লীনা ওড়না ভাঁজ করে তুলে রেখে দিয়েছে আলমারিতে। ওটার আর দরকার নেই।
সেই কখন অন্ধকার নেমে গেছে। ঘরের আলো জ্বালাতে লীনা ভুলে গেছে। তার দরকারও নেই অবশ্য। অনেকদিন পর আজ এ-ঘরের জানলা খুলেছে। ল্যাম্পপোস্টের লাজুক আলো এসে পড়েছে ঘরের কোণে যত্নে বোনা মাকড়সার জালে। হাওয়া দিচ্ছে। জালটা কাঁপছে। লীনাও কাঁপছে অল্প অল্প। কতদিন বাদে যে বাইরের হাওয়া ঝামরে পড়ছে সারা শরীরে! চারপাশটাকে নতুন লাগছে খুব। বটের পাতার মতো তীব্র ঘন সবুজ লাগছে। ফাঁসিকাঠের পাটাতনের নীচে যে অন্ধকার থাকে তার সঙ্গে একবার দেখা হয়ে গেলে ফিরে আসা মুশকিল। কিন্তু লীনা পেরেছে তাকে ফিরিয়ে দিতে।
চিঠিটার গায়ে আরেকবার হাত বোলাল লীনা। এই মহিলাই গতকাল রাতে ফার্ন রোড আর সোনারপুরে রেপিস্টদের খুন করেছেন। এই মহিলাই পেপারে অ্যাড দিয়েছেন। মুকেশ সিং সত্যি সত্যিই মরবে কিনা সেটা আসল কথা না। আসল কথা হচ্ছে, লীনার মগজের পক্ষাঘাতটাকে চেঁচে তুলে নিয়েছে এই চিঠি। মরা পিঁপড়ের মতো নিশ্চল, নিরীহদর্শন এই অক্ষরেরা লীনার দু-মাসের ক্ষতে ঢেলে দিচ্ছে জীবাণুনাশক। স্ক্যালপেল দিয়ে খুঁটে খুঁটে তুলে আনছে সাদা ম্যাগট। এমন করে শীতলপাটি বিছিয়ে দেয়নি কেউ বহুদিন। মনে হচ্ছে এই অক্ষরমালার কোলে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়া চলে।
লীনা উঠে পড়ল। মা-কে আজ একটু তাড়াতাড়ি খেতে দিতে বলতে হবে। কাল সকালে বেরোতে হবে। অনেকদিন পর। জরুরি কাজ আছে।
.
