মজন্তালী সরকার – উনবিংশ দিন

উনবিংশ দিন

তারিখ : ২০ আগস্ট, ২০১৩

ভবানী ভবন, সকাল ১০টা

এডিজি একটা ঝটিতি অল হ্যান্ডস ডাউন মিটিং চেয়েছিলেন। ফলে লালবাজারের গোয়েন্দা বিভাগের সিনিয়র ইনস্পেকটর সুনীল ভঞ্জকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।

অমিতাভ সবাইকে স্বাগত জানিয়ে বললেন, ‘আমরা এই কেসে সহায়তার জন্য মিঃ ভঞ্জকে পেয়েছি। উনি গত কয়েক মাস ধরে প্রিঅ্যাকটিভেটেড সিমের কেস দেখছেন। বেশ খানিকটা এগিয়েওছেন। মিঃ ভঞ্জকে অনুরোধ করব সবার বোঝার সুবিধার্থে একটু সহজ করে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলতে যে, প্রিঅ্যাকটিভেটেড সিম নিয়ে গোলমালটা ঠিক কীভাবে হয়।’

মধ্যবয়সি, সৌম্য চেহারার সুনীল ভঞ্জকে দেখে ক্রাইম ব্রাঞ্চের অফিসার বলে মনেই হয় না। মনে হয় লাভা মনাস্ট্রির কোনও লামাকে সমতলে নামিয়ে এনে অসাড়, ক্লেদাক্ত এই কাজে জুতে দেওয়া হয়েছে। সুযোগ পেলেই যেন তিনি একছুট্টে দার্জিলিং মেল ধরে পালাবেন।

উঠে দাঁড়িয়ে খুব ঢিমেতালে কথা শুরু করলেন তিনি, ‘আপনারা জানেন যে অপরাধ জগতে বেওয়ারিশ সিমের দেদার সাপ্লাই পুলিশের একটা বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছে। গত কয়েকমাস ধরে আমরা আভাস পাচ্ছিলাম, প্রিঅ্যাকটিভেটেড সিমের একটা বিরাট চক্র কলকাতায় কাজ করছে। আমার হাতে কেসটা আসার পরে শহর, শহরতলি মিলিয়ে প্রাথমিকভাবে কয়েকটা ছোট ছোট দোকানের সন্ধান পেয়েছিলাম যেখানে একটু বেশি পয়সা দিলে বিনা নথিতে চালু সিম পাওয়া যায়।

‘শুনলে অবাক হবেন শুধু মোবাইলের দোকান না, সেই লিস্টে দুটো মুদিখানাও ছিল। কথা হচ্ছে, এইটা খুচরোভাবে হয়তো অনেকদিনই চলে আসছিল। কিন্তু সম্প্রতি এটা একটা অরগ্যানাইজড ক্রাইমে পরিণত হয়েছে। কেঁচো খুঁড়তে খুঁড়তে একটা বড়সড় কেউটের অস্তিত্ব টের পেলাম। জানতে পারলাম খাস কলকাতার একদম কমন দু-একটা জায়গায় নাকি ভাড়ায় সিম পাওয়া যাচ্ছে। এই ভাড়ার সিমের ক্রেতা হচ্ছে বিদেশিরা, যার একটা বড় সংখ্যক ট্রেসপাসার্স। তার মধ্যে প্রায় পঁচাশি শতাংশ বাংলাদেশি। এদেশের নথি না থাকলে তো এদেশের সিম তোলা যাবে না। অথচ অল্প কিছুদিনের জন্য এদেশে এলে অনেকেই চান এদেশের সিম ব্যবহার করতে। তাতে খরচ আর হ্যাপা দুটোই অনেকটা কম হয়। এদের জন্যই বিনা নথিতে ভাড়ার সিম দেওয়া হয়। এগেইন্সট কশান মানি। একটা সার্টেন পিরিয়ডের পর সেই সিম ফেরত দিলে কশান মানি ফিরিয়ে দেওয়া হয়। শুধু ভাড়া না, সিম কেনাও যেত। কিনলে দাম স্বাভাবিকভাবেই একটু বেশি পড়ে। এইভাবেই রমরমিয়ে চলছে ব্যবসা।’

একটু বিরতি নিলেন সুনীল ভঞ্জ। তারপর বললেন, ‘ঘটনাটা আর কিছুই না, বৈধ সিম তোলার সময় কাস্টমারেরা ভোটার আইডির যে জেরক্স দেন, সেগুলো দিয়েই তাদের অজান্তে তাদের নামে আরও সিম তোলা হচ্ছে এবং ব্যবসা করা হচ্ছে। ফলে তারা জানতেও পারছেন না তাদের নামে তোলা সিম কে কোথায় কোন উদ্দেশে ব্যবহার করছে। কিন্তু একটা প্রশ্নের উত্তর পাচ্ছিলাম না। এত বিপুল পরিমাণ আইডি-জেরক্স এরা জোগাড় করছে কোথা থেকে? তাহলে কি শুধু টেলিকম ব্যবসায়ীরা নন, আরও অনেক ধরনের মানুষ এর সঙ্গে জড়িত? তদন্ত করতে গিয়ে আমরা শিউরে উঠছি। একের পর এক ব্যাঙ্কিং, বিমা সংস্থার নাম উঠে আসতে শুরু করেছে। এবং, এটা বাইরে বলা সম্ভব না এখনই, কিছু সরকারি সংস্থার কর্মীদের নামও আমাদের সন্দেহের তালিকায় রয়েছে।

‘এই কেসের সঙ্গে মজন্তালী সরকারের কেস জড়িয়ে যাওয়াটা নিতান্তই আকস্মিক। তবে আশ্চর্যের নয়। তার কারণ এই সিম-চক্র এতটাই অরগ্যানাইজড যে এখন টেররিস্টরাও এই চেইন ব্যবহার করছেন। মজন্তালী কেসের সৌজন্যে আমরা এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ব্রেকটা পেলাম। খড়গপুর থেকে দুজনকে ধরা হয়েছে যাদের একজন একটি সরকারি বিমা সংস্থার সার্টিফায়েড এজেন্ট। আমি অমিতাভ সান্যাল এবং দময়ন্তী মুখার্জীর টিমের কাছে কৃতজ্ঞ। আমার নিজের কেসেও অনেকটা প্রগ্রেস হল। এদের স্টকের সিমগুলো পরীক্ষা করলে আরও অনেক প্রশ্নের উত্তর পাব আশা করছি। বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানাই টেলিকমের শৌভিক মুখার্জীকে। ওর বুদ্ধিতেই আমাদের বিপুল সময় বেঁচেছে এবং আজ এত বড় ব্রেকথ্রুটা পেয়েছি। কীভাবে, সেটা ওঁকে একটু ব্রিফ করতে বলব।’

শৌভিক জুনিয়র ছেলে। একটু অন্যমনস্ক হয়ে ছিল। রাহুল ঠেলা দেওয়ায় একটু থতমত খেয়ে উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘মজন্তালী যে নম্বরগুলো ব্যবহার করছে সেগুলো কাদের বৈধ ডকুমেন্ট ব্যবহার করে তোলা তার খোঁজ নিতে গিয়ে দেখলাম একেকটা নাম্বারের এগেইন্সটে গড়ে তিন-চারজন ইউজার পাওয়া যাচ্ছে। টেলিকম কোম্পানিগুলোর নিয়ম, কোনও নম্বর মাস ছয়েক নিষ্ক্রিয় থাকলে সেটা রিসাইকল করে ফ্রি নম্বর পুলে ফেলে দেওয়া হয়, তারপর নতুন ইউজারকে দিয়ে দেওয়া হয়। ফলে নম্বর ধরে ট্র্যাক করতে গেলে জনে জনে চেজ করতে হয়। বিপুল সময় নষ্টের সম্ভাবনা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ইউজাররা তো জানতেই পারেন না যে তাঁদের ডকুমেন্ট ব্যবহার করে সিম তোলা হয়েছে। আমি দুটো প্যাটার্ন খুঁজে পেয়েছিলাম। এক, কোনও রাজ্যে সাধারণত ভিনরাজ্যের নকল ডকুমেন্টস ব্যবহৃত হয়। আর দুই, অতিবৃদ্ধদের ডকুমেন্টস এক্ষেত্রে খুব গুরুত্ব পায়। কারণ ধরে নেওয়া হয় বছর তিন-চারেকের মধ্যেই তাঁরা ওপারের টিকিট কেটে ফেলবেন। ফলো আপ নিয়ে দেখলাম মজন্তালীর ব্যবহার করা আটটা সিমের প্রতিটার ক্ষেত্রে এই প্যাটার্ন মিলছে এবং বৃদ্ধ গ্রাহকরা সকলেই মৃত। একটা সিম বাদে। সাতাশি বছর বয়সে পৌঁছেও তিনি মরেননি। এমনকী তিনি ভিনরাজ্যেরও নন। খড়গপুরের বাসিন্দা অনিল পাহান। এটা সম্ভবত সিম ডিলারদের একটা ভুল। যাই হোক, এখান থেকেই সূত্র পাওয়া গেল। বাকিটা দময়ন্তীদি বলবেন।’

দময়ন্তী আবার উঠে দাঁড়াল, ‘খড়গপুরের গোলবাজারে মোবাইল রিচার্জের ব্যবসা করেন হারাধন বেরা। তাঁর দোকান থেকেই সিম নেন অনিল পাহানের পরিবার। ফলে হারাধনকে তুললাম। তার থেকে জানলাম দীপক জানার কথা। দীপক বিমার এজেন্ট। সেই সূত্রে ব্যাঙ্ক আর বিমা সংস্থার গ্রাহকদের নথিপত্রে তাঁর অ্যাক্সেস আছে। মানে ডকুমেন্টের সাপ্লাই লাইন। দীপককে রগড়ে কলকাতার ডিলারের নাম বের করা গেল। মহম্মদ ইসমাইল। এই ইসমাইলকে দুই সাগরেদসহ আজ সকালে আমরা অ্যারেস্ট করেছি। মিঃ ভঞ্জ এবং আমরা গতকাল এদের যৌথভাবে জেরা করেছি। জানতে পারলাম, বিভিন্ন ছোটখাটো দোকানে নাকি টাকার বিনিময়ে নাকি কাস্টমারের আইডির জেরক্স বিক্রি হয়। সিম বিক্রির সময় ভোটার কার্ডের জেরক্স দিতে হয়, তারই এক্সট্রা এক কপি নিজেদের কাছে রেখে দেয় কোনও কোনও দোকানি। পরে সেগুলো বিক্রি হয়। পার আইডি পঁচিশ টাকা। বয়স্কদের আইডির দাম কোথাও কোথাও চল্লিশ টাকা অবধি দেওয়া হয়। মহম্মদরা সেগুলো তুলে আনে। এদের বড় কাস্টমার রামভরত থাপা আর নুটু হালদার। এরা নিজেরাও সিম নেয়, আবার থার্ড পার্টির কাজও করে। তো এদের মারফত একটা বাল্ক পারচেস করেছে গত জুন মাসে। তিন খেপে মোট তিনশো প্রিঅ্যাকটিভেটেড সিম কেনা হয়েছে। এখানেই মজন্তালীর কেসের অনুপ্রবেশ। কারণ মহম্মদের দাবি, রিসিভিং এন্ডে একজন সুন্দরী মহিলা ছিলেন। আর কোনও ডিটেল সে দিতে পারেনি। কারণ যে মাল ডেলিভারি করেছিল, সে ইললিগাল ইমিগ্রেশনের চক্করে পুলিশের গুলি খেয়ে মরেছে।’

‘বোঝো।’

‘এই রামভরত থাপা এবং নুটু হালদার ইললিগাল ইমিগ্রেশনের সাথেও যুক্ত। চোরাকারবারের দুনিয়ায় পরিচিত নাম। রামভরতের বাড়ি কালিম্পংয়ে। নুটুর বাড়ি ট্যাংরায়। দুজনেই বেপাত্তা। সম্ভবত মহম্মদের অ্যারেস্ট হবার খবর পেয়ে পালিয়েছে। তার একটা নম্বর মহম্মদের থেকে উদ্ধার করেছি। কিন্তু নট রিচেবল। ট্র্যাকও করা যাচ্ছে না। কী করে রেখেছে কে জানে। একে না পেলে জানা যাবে না সেই সুন্দরী ম্যাডাম কে। উনিই যে বড় বিল্লি তাতে সন্দেহ নেই।’

দময়ন্তী বলল, ‘তিনশো সিমের জন্য মোট কত টাকা দিয়েছে শুনবেন?’

প্রবীরবাবু ভুরুদুটো ওপরে তুললেন, ‘কত?’

‘সাড়ে চার।’

‘লাখ?’

‘হ্যাঁ। পার সিম পনেরোশো টাকা। ভাবুন।’

‘ওরে বাবা!’

অনিমেষ ভদ্র বললেন, ‘আধার কার্ড এসে গেলে দেখবেন এইসব জালিয়াতি একদম বন্ধ হয়ে যাবে। সবার সব ইনফো স্টেটের হাতের মুঠোয় থাকবে।’

অমিতাভ তেরচা করে তাকালেন, ‘লাভের লাভ কিছু হবে কিনা জানি না, তবে ভারত একটা টোটালিটারিয়ান রাষ্ট্র হয়ে উঠবে।’

‘সো হোয়াট! তাতে অপরাধ কমবে।’

‘অপরাধীরা ঠিক নতুন উপায় খুঁজে বের করে নেবে অনিমেষদা। কিন্তু আধারের সঙ্গে প্যান, ভোটার, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট সব লিঙ্ক হয়ে গেলে অনলাইন আর্থিক জোচ্চুরি এমন জায়গায় যাবে যে কূলকিনারা করা যাবে না। ডেট দিয়ে লিখুন আমি সই করে দিচ্ছি।’

‘আধার হ্যাক করা যায় না। বলছেই তো।’

‘এমন কিছু নেই যা হ্যাক করা যায় না অনিমেষদা। এমন কিছু হতেও পারে না। হ্যাক না করা গেলে তো ভালোই। দেখাই যাক না, বছর দশেক বাদে কী দাঁড়ায় পরিস্থিতি।’

প্রবীর চক্রবর্তী বললেন, ‘আপনারা আধার নিয়ে বিতর্কটা থামালে আমরা কেসটা নিয়ে কথা বলতে পারি।’

অনিমেষ ভদ্র বললেন, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে এঁদের ফান্ডিং। আমার আরবান নকশাল থিওরিই ঠিক বলে প্রমাণিত হতে চলেছে।’

অমিতাভ বললেন, ‘আমাদের প্রাইম টার্গেট তাহলে এখন রামভরত থাপা আর নুটু হালদার। প্লাস সেই সুন্দরী মহিলা ক্রেতা, যিনি নুটুর থেকে সিম কিনেছেন।’

‘প্লাস একজন উচ্চপদস্থ পুলিশকর্তা বা আমলা যিনি আরডিএক্সকে সেফ প্যাসেজ দিয়েছেন।’ দময়ন্তী বলল, ‘আমরা নর্থ বেঙ্গল বেসড উচ্চপদস্থ মহিলা পুলিশ অফিসারদের একটা তালিকা বানিয়েছি। রাহুলকে সেটা ডিসপ্লেতে দিতে অনুরোধ করছি।’

রাহুল ল্যাপটপে খুটখাট করল। প্রোজেক্টর-পর্দায় ভেসে উঠল ছ’টা নাম।

অনিমেষ ভদ্র প্রথম নামটা দেখেই আঁতকে উঠলেন, ‘সর্বাণী সেন?’

‘হ্যাঁ,’ দময়ন্তী বলল, ‘উনি এখন দার্জিলিং পুলিশ ট্রেনিং স্কুলের ইন্সট্রাক্টর।’

অনিমেষ ভদ্র পাংশু মুখে বললেন, ‘সর্বাণী হতে পারে না। সর্বাণী ইজ আ ভেরি অনেস্ট, ভেরি ডিউটিফুল অফিসার।’

দময়ন্তী বলল, ‘সুজান জর্ডানের ব্যাপারে সর্বাণীদির স্ট্যান্ডপয়েন্ট এবং সরকারের সঙ্গে ক্ল্যাশের কথা ভুলে গেলে চলবে না। এই মুহূর্তে একটা আপাত গুরুত্বহীন পোস্ট তাঁকে সার্ভ করতে হচ্ছে সেই কারণেই। সবাই জানে এটা একটা পানিশমেন্ট পোস্টিং।’

রাহুল বলল, ‘পানিশমেন্ট পোস্টিংটা বড় কথা না। বড় কথা হচ্ছে সুজান জর্ডানের সঙ্গে সর্বাণীদির সম্পর্ক। উনি নিরপেক্ষ তদন্ত চালাতে চেয়েছিলেন।’

দময়ন্তী বলল, ‘নিরপেক্ষ কথাটায় আপত্তি আছে, রাহুল। সর্বাণীদি নিরপেক্ষ ছিলেন না। বাঘ যদি হরিণকে শিকার করতে যায় এবং তুই বলিস তুই নিরপেক্ষ থাকবি, তার মানে আসলে তুই বাঘের পক্ষে। সর্বাণীদি বাঘের পক্ষে থাকতে অস্বীকার করেছিলেন। তার ফল তাঁকে ভুগতে হয়েছে। আজ এই তদন্তে যদি উনি দোষী প্রমাণিত হন, তাহলেও ওঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধা অটুট থাকবে।’

অনিমেষ ভদ্র ঠান্ডা গলায় বললেন, ‘শেষ কথাটায় আপত্তি এবং প্রতিবাদ রইল দময়ন্তী। এই কথাটা সিনিয়র কলিগদের সামনে তুমি এইভাবে বলতে পারো না।’

‘এটাই আমার ব্যক্তিগত মত স্যার,’ দময়ন্তীর গলা ততোধিক ঠান্ডা, ‘তবে তা আমার ডিউটিকে আচ্ছন্ন করবে না, এটুকু কথা দিতে পারি।’

অমিতাভ কথা ঘোরানোর জন্য বললেন, ‘আমাদের আপাতত লক্ষ্য রামভরত থাপা আর নুটু হালদার।’

‘আমি ভাবছি অন্য কথা,’ রাহুল বলল, ‘তিনশো সিম তুলেছে, তার মধ্যে মাত্র আটটা সিম এখনও ব্যবহার করা হয়েছে। তার মানে এখনও যেটুকু হয়েছে সেটা জাস্ট ট্রেলার।’

প্রবীর চক্রবর্তী বললেন, ‘আমার মনে হয় মহম্মদ ইসমাইলকে আরেকটু রগড়াতে হবে। আরও কিছু বেরোবে।’

‘এদিকে সুনীলবাবুও কাস্টডি চাইছেন। আসল কেস তো লালবাজারেরই।’

প্রবীর চক্রবর্তী সুনীল ভঞ্জের দিকে তাকালেন, ‘সুনীল, এখনই লোকটাকে কাস্টডিতে নিলে কেসটা ওপেন হয়ে যাবে। আমি চাইছি সেফ হাউজে রেখে আরও দিনদুয়েক রগড়ানো হোক। তাতে দুটো কেসেরই উপকার। বুঝলে? আমি দরকারে ডিডি-তে কথা বলে নেব।’

সুনীল ভঞ্জ বিনীতভাবে মাথা নাড়লেন, ‘যেমন বলবেন স্যার।’

প্রবীরবাবু অমিতাভকে বললেন, ‘যাও, মালটাকে উল্টেপাল্টে ঝেড়েঝুড়ে দ্যাখো কিছু বেরোয় কিনা।’

অমিতাভ মাথা নেড়ে বললেন, ‘আরেকটা ভয়ের ব্যাপার হচ্ছে, এই পুরো কর্মকাণ্ডের পিছনে একটা বিপুল ক্যাশ ফ্লো টের পাওয়া যাচ্ছে।’

‘হ্যাঁ। সাড়ে চার লাখ টাকা শুধু সিমের পিছনে খরচ করেছে!’ অনিমেষ ভদ্র বললেন, ‘প্রশ্ন হচ্ছে এর উৎস কী?’

অমিতাভ বললেন, ‘ব্ল্যাক মানি তো নিশ্চিত। বাট কোন পথে আসছে সেটাই কথা।’

অনিমেষ ভদ্র বারদুয়েক বিড়বিড় করে ‘আরবান নকশালস! আরবান নকশালস!’ বলে চুপ করে গেলেন।

.

এলাহাবাদ ব্যাঙ্ক, মানিকতলা শাখা, সকাল ১১টা ৩০

‘বাকি সেভিংসটুকুও তুলে নিচ্ছেন ম্যাডাম?’

‘হ্যাঁ। নিতান্ত বাধ্য হয়েই।’

‘কিছু মনে করবেন না, আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপারে মন্তব্য করে ফেললাম। আসলে আপনি আমাদের অনেককালের কাস্টমার তো, সেইজন্যই বলছি। ভবিষ্যতের কথা ভাববেন না?’

‘না, না, ইটস ওকে। থ্যাঙ্কস ফর ইয়োর কনসার্ন। আসলে আচমকা খুব জরুরি দরকার হয়ে পড়ল।’

‘তা হলেও। পিএফ, গ্র্যাচুইটি সব একেবারে চেঁছেপুঁছে তুলে নেবেন? মেডিকেল এমারজেন্সি বুঝি?’

‘সেরকমই।’

‘বেশ। কিন্তু এত ক্যাশ একসঙ্গে বাড়িতে রাখবেন? খুব সাবধান কিন্তু।’

‘ভাববেন না। আমি ক্যারাটে, তায়কোন্ডু সব জানি। প্লাস আর্মসও ক্যারি করি।’

‘অ্যাঁ!’

‘দেখে বোঝা যায় না, না? শুনুন, আমি কিন্তু বেশ কয়েকটা খুনও করেছি।’

ক্যাশিয়ার খানিকক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলেন। তারপরেই হেসে উঠলেন হো হো করে, ‘ম্যাডাম বড্ড রসিক মানুষ।’

.

ভবানী ভবন, বিকেল ৪টে

‘অমিতাভ স্যার তো লাঞ্চ না করেই চলে গেলেন।’ তানিয়া বলল, ‘কী করব বলো তো? কাউকে দিয়ে ওখানেই পাঠিয়ে দেব স্যারের লাঞ্চ? বা কাউকে বলে দেব ওখানে?’

‘ভুলেও ও কাজ করতে যাস না। ঝাড় খেয়ে যাবি। ওঁকে ওর মতো ছেড়ে দে। আসলে রাঘববোয়াল পেয়েছেন তো! আগেরগুলো তো চারাপোনা ছিল। রগড়ে নতুন কিছু খবর বের না করে খাবার ছোঁবেন বলে তো মনে হয় না।’

তানিয়া আপনমনে বিড়বিড় করল, ‘রাহুলদাও কিছু খেল না।’

দময়ন্তী কৌতুকভরে বলল, ‘তোদের ব্যাপারস্যাপার কিচ্ছু বুঝি না আমি। তোরা কে কার সঙ্গে প্রেম করছিস বল তো?’

‘তুমি একটা সেকেলে বুড়ি হয়ে যাচ্ছ দিনদিন, দময়ন্তীদি। আমি মোটেই রাহুলদার সঙ্গে প্রেম করছি না। লীনার সঙ্গে রাহুলদার কিছু চলছে কিনা সেটাও আমি জানি না। জিগ্যেস করেছিলাম। ধমকে দিয়েছে।’

‘ডিপার্টমেন্টে একটা প্রেম হবে না! আমার কতদিনের শখ!’

‘তুমি কাল থেকে কেমন একটা করছ! তুমি কি পসেসড? হু আর ইউ অ্যান্ড হোয়াট হ্যাভ ইউ ডান টু আওয়ার বিলাভেড দময়ন্তীদি?’

খিলখিল থেকে খুব ধীরে ধীরে কেমন বিষণ্ণ হয়ে এল দময়ন্তীর হাসিটা, ‘দময়ন্তী মুখার্জী কড়া হলেও তোদের প্রবলেম, লাইট হলেও তোদের প্রবলেম। মানুষটা যাবে কোথায় বল তো!’

‘দময়ন্তী মুখার্জী নিজের ইমেজের কারাগারে নিজেই বন্দি হয়ে পড়েছেন।’

‘যাক গে, মহম্মদ ইসমাইলকে রগড়ে ওরা ফিরুক। আমরা চল একজনকে একটু দেখা দিয়ে আসি। প্রস্তুত হবার সময় দিলে লোকে অনেক কিছু লুকিয়ে ফেলতে পারে। ফলে না-জানিয়েই যাব।’

‘কাকে দেখা দিতে যাবে? সম্পূর্ণা? তাকে এই সময় বাড়িতে পাবে?

‘সম্পূর্ণা না। সম্পূর্ণার বাবার কাছে যাব। শ্রীরামপুর।’

.

শ্রীরামপুর, বিকেল ৫টা ১৫

দরজা খুলে ভূত দেখার মতো চমকালেন শ্যামল মিত্র, ‘আপনারা?’

‘এদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম। চলে এলাম। আসতে পারি?’

শ্যামলবাবু একবার ভিতরে তাকালেন। ঠোঁট ভিজিয়ে নিলেন জিভ দিয়ে। তারপর নিতান্ত অনিচ্ছাভরে বললেন, ‘আসুন।’

দময়ন্তী ভিতরে ঢুকে দেখল, সোফার ওপর স্তূপাকার কাপড়জামা। শ্যামলবাবু নার্ভাস গলায় বললেন, ‘আমি কাচাকুচি করতে যাচ্ছিলাম।’

‘আমরা পাঁচ মিনিটের বেশি সময় নেব না।’ দময়ন্তী একটা ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি দিল, ‘আপনাকে জানিয়ে রাখা দরকার বলে মনে হল যে সম্পূর্ণা প্রায়শই রাতে একা গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ছে। একজন মহিলার পক্ষে রাতের কলকাতা সেফ নয়, শ্যামলবাবু। এটা কি আপনি বুঝিয়ে বলবেন ওকে?’

দময়ন্তী কেন প্রয়োজনের চেয়ে বেশি গলা চড়িয়ে কথা বলছে, তানিয়া বুঝতে পারল না। তবে শ্যামল মিত্রকে প্যাড, হেলমেট ছাড়া ফাস্ট বোলিংয়ের সামনে নেমে পড়া ব্যাটারের মতো লাগছিল। দময়ন্তীর কথার জবাবে আমতা আমতা করে তিনি বললেন, ‘আমি জানতাম না। অবশ্যই বলব।’

দময়ন্তী ভিতরঘরের দিকে এক-দু পা এগিয়ে গিয়ে বলল, ‘আপনার স্ত্রী কেমন আছেন এখন?’

‘ওই একইরকম। এসব তো দীর্ঘকালীন রোগ। সঙ্গে ডিমেনশিয়া যোগ হয়ে ব্যাপারটা আরও খারাপ হয়ে গেছে।’

‘আপনার স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলা গেলে ভালো হত। যাই হোক, ডাক্তারের ব্যাপারে আমরা কিছু বলব না। তবে মেয়েকে একটু সাবধান করুন। খুব বিপজ্জনক নেশায় পেয়ে বসেছে ওকে।’

আচমকা পাশের ঘর থেকে ছিটকে বেরোলেন এক মহিলা। রুখাশুখা চুল। চোখে ভয়। খসখসে বিকৃত গলায় বললেন, ‘ও অভিনয় করছে! ওকে কিছু বলবেন না! ও অভিনয় করছে!’

শ্যামলবাবু এগিয়ে গেলেন স্ত্রীকে সামলাতে, ‘হ্যাঁ বীথি, ওঁরা জানেন বুড়িয়া অভিনয় করে। ওঁরা জানেন ও নির্দোষ। তুমি ব্যস্ত হোয়ো না। ওঁরা বুড়িয়াকে ধরতে আসেননি। একটু কথা বলতে এসেছেন।’

মহিলা তবু ভয়ার্ত চোখে দময়ন্তীদের দেখতে দেখতে মন্ত্রের মতো জপ করে যাচ্ছেন, ‘ওরা তো পুলিশ। ওরা কি ওকে ধরতে এসেছে?’

শ্যামলবাবু স্ত্রীকে দু-হাতে জড়িয়ে ধরেও শান্ত করতে পারছিলেন না। ভিতরের ঘর থেকে প্রায় ছুটে এলেন আরেক মহিলা, ‘দিদি, কী করছ? ঘরে চলো!’

শ্যামলবাবু বিরক্ত কণ্ঠে তাঁকে বললেন, ‘কোথায় ছিলে নির্মলা? দ্যাখো বাইরের লোকজনের সামনে কী তামাশা করছে!’

‘একটু কি বাথরুমেও যেতে পারব না?’ মহিলা মুখ আঁধার করে বললেন, ‘চলো দিদি, তোমার ওষুধ খাবার সময় হয়ে গেছে।’

নির্মলা বীথিদেবীকে ভিতরে নিয়ে গেলে শ্যামলবাবু একটু হাঁপ ছাড়লেন। তারপর দময়ন্তীদের বললেন, ‘দেখলেন? আপনাদের বলছিলাম না, বীথি একেবারেই কথা বলার পরিস্থিতিতে নেই!’

শ্যামলবাবুর গলায় আত্মবিশ্বাস ফিরে আসছে। কথা বাড়িয়ে আজ আর লাভ হবে না বিশেষ। আর দরকারও নেই। পরিকল্পনা কাজে লেগে গেছে। বীথিদেবী আরেকটু থাকলে আরও ভালো হত অবশ্য। যাক গে। দময়ন্তী শ্যামলবাবুকে বলল, ‘সম্পূর্ণাকে কথাটা বলে দেবেন, কেমন?’

শ্যামল মিত্র মাথা নাড়লেন, ‘নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই।’

গাড়িতে উঠে দময়ন্তী তানিয়াকে বলল, ‘একটা জিনিস নোট রাখিস তো! বীথিদেবীর সাইকিয়াট্রিস্ট বা সাইকোলজিস্টের সঙ্গে কথা বলতে হবে।’

.

কাফে কফি ডে, শ্যামবাজার, বিকেল ৫টা ২০

‘নুটু হালদার নর্থ বেঙ্গল গেছে। গত পরশু দমদম এয়ারপোর্ট থেকে সকাল আটটার ফ্লাইটে বাগডোগরা এয়ারপোর্ট। এই যে প্যাসেঞ্জার লিস্ট।’

‘কোথায়! নুটু হালদার বলে তো কেউ নেই!’

‘উপেন তামাং দ্যাখ।’

‘ওঃ! ছদ্মনামে গেছে?’

‘নুটুর চারটে ভারতীয়, দুটো বাংলাদেশি, একটা নেপালি একটা ভুটানি পাসপোর্ট।’

‘তাহলে এখন হোয়াট টু ডু?’

‘সিআইডি-র আগেই নুটুর কাছে পৌঁছাতে হবে। আবার কী?’

‘আমার হাত কামড়াতে ইচ্ছে করছে। এরকম একটা ভুল কীভাবে হয়ে গেল? অনেকবার করে নুটুকে বলেছিলাম, আমার এমন সিম চাই যেগুলো বাইরের স্টেটের লোকজনের নামে। নুটু অ্যাশিওর করেছিল, এই স্টেটের ডকুমেন্ট অন্য স্টেটে চলে যায়। অন্য স্টেটেরগুলো এখানে আসে।’

‘এত হাত ঘুরে এসব কাগজপত্র আসে, কোথায় কে ভুল করে জেরক্সের গাদায় লোকাল লোকের ডকুমেন্ট গুঁজে দিয়েছে সেটা কেউ কী করেই বা বুঝবে। যাক গে, আর ভেবে লাভ নেই। এখন মিশন নুটু।’

‘নুটু যদি নর্থ বেঙ্গলেই থাকে, তাহলে ওকে বের করতে বেশি সময় লাগবে না। আমার ধারণা ও বাংলাদেশে পালিয়ে যাবে। বাট উই কান্ট টেক চান্সেস। নুটুকে কোনওমতেই সিআইডি-র হাতে পড়া চলবে না।’

.

ভবানী ভবন, সন্ধে ৬টা ১০

‘নর্থ বেঙ্গলের কোথায় যেতে পারে? কোথায় ঘাঁটি আছে?’

‘ঘাঁটি তো অনেকগুলো। শিলিগুড়ির ভক্তিনগরে বুয়ার এক বন্ধুর বাড়ি আছে। দার্জিলিংয়ে ভুটিয়া বস্তিতে একটা ঘাঁটি আছে।’

‘মেনি থ্যাঙ্কস সুনীলদা। ঠিকানাগুলো একটু টেক্সট করে দেবেন?’

‘শিওর। আর কোনও দরকার লাগলে বলবেন নির্দ্বিধায়।’

ফোন রেখে দময়ন্তী বলল, ‘নুটু হালদার গত পরশু দমদম এয়ারপোর্ট থেকে সকাল আটটার ফ্লাইট ধরে বাগডোগরা গেছে। প্যাসেঞ্জার লিস্টে নাম উপেন তামাং।’

অমিতাভ বললেন, ‘নর্থ বেঙ্গলের সোর্সদের অ্যালার্ট করে দাও, লোকনাথ। ডিসট্রিক্ট অফিসগুলোকেও তৈরি থাকতে বলো। আর বাগডোগরার ফ্লাইট কখন আছে দেখে রিজার্ভেশন খোঁজো।’

লোকনাথ বলল, ‘আমরা কে কে যাচ্ছি স্যার?’

দময়ন্তী বলল, ‘স্যার, ফ্লাইট না। ইটস আ কোভার্ট অপারেশন। আমরা বাই রোড যাব।’

‘বাই রোড? মাথা খারাপ হল তোমার?’

‘ফ্লাইটে গেলে ব্যাপারটা হাজার চেষ্টা করেও গোপন রাখা যাবে না। ওদের চোখ-কানগুলোকে ফাঁকি দিতে চাই। সেজন্যই গাড়ি। আজ রাতে বেরিয়ে পড়ব।’

রাহুল বলল, ‘দময়ন্তীদির কথাটা যুক্তিযুক্ত লাগছে। স্যার, আপনি, তানিয়া আর লোকনাথদা হোম ফ্রন্ট সামলান। আমি, দময়ন্তীদি আর সুকুমারদা গিয়ে শিকার করে আনছি। এখান থেকে আর কাউকে নিচ্ছি না। ফোর্স রেসপেক্টিভ ডিসট্রিক্ট অফিস থেকে নিয়ে নেব।’

দময়ন্তী বলল, ‘পারফেক্ট।’

.

সন্তোষপুর, সন্ধে ৬টা ৩০

‘কী খবর?’

দুটো নিরীহ শব্দ। আদতে কি হিরণ্যগর্ভ?

লীনার মেসেঞ্জার থেকে মেসেজ এসেছে। রাহুল সিন করেনি। সিন করলেই কিছু-একটা রিপ্লাই দিতে হবে। রাহুলের মাথায় আপাতত কোনও জবাব আসছে না। শব্দ হচ্ছে ব্রহ্ম। ভেবেচিন্তে যত্ন করে প্রয়োগ করতে হয়। মেয়েটা ঠিক কী ভাবছে এখনও ক্লিয়ার না।

গাড়িটা পুলে দিয়ে একটা ক্যাব ধরে বাড়ি চলে এল রাহুল। দু-তিন দিন আর দরকার হবে না। পয়সা গেল একটু। সে যাক। বাসের ভিড়ে ঘেমো বগল ঠেলেঠুলে আসতে আর ইচ্ছে করল না। কয়েক ঘণ্টা পরেই তো বেরিয়ে পড়তে হবে। এইভাবেই বোধহয় মানুষের ক্লাস উঠে যায় ধ্যাড়ধ্যাড় করে। হাসি পেয়ে গেল রাহুলের।

অসময়ে তাকে বাড়ি ফিরতে দেখে মধুমিতা অবাক।

‘কী রে, কী হল? শরীর টরীর খারাপ হল নাকি?’

‘না না।’

‘তাহলে? এই সময়ে ফিরে এলি যে!’

রাহুল জুতো ছাড়তে ছাড়তে বলল, ‘আজ রাতে নর্থ বেঙ্গল যাচ্ছি। তাই একটু তাড়াতাড়ি চলে এলাম।’

‘নর্থ বেঙ্গল? হঠাৎ?’

‘একটা বদমাশ পালিয়ে ওখানে গেছে। সেটাকে ধরে আনতে হবে।’

মধুমিতা অপ্রসন্ন মুখে বললেন, ‘কীসে যাবি?’

‘গাড়িতে।’

‘অতটা পথ গাড়িতে? তুই একা?’

‘না না। আমি, দময়ন্তীদি আর সুকুমারদা।’

কমলবাবু খবর দেখছিলেন, কিন্তু কান ছিল এদিকে। বললেন, ‘হ্যাঁ রে, সম্পূর্ণা মিত্র নর্থ বেঙ্গল পালিয়ে গেছে?’

‘উফফ! সম্পূর্ণা মিত্র দোষী প্রমাণিত হয়নি বাবা। তুমি টিভি দেখছ, দ্যাখো না!’

.

মধ্যমগ্রাম (গাড়ি), রাত ১০টা ১৫

‘গ্রেট জব সুশান্ত। থ্যাঙ্কিউ সো মাচ। আর ব্যাপারটা কিন্তু হাইলি কনফিডেন্সিয়াল। কেমন? গুড নাইট।’ বলে ফোন কেটে দময়ন্তী হ্যান্ডসেটের মোবাইল ডেটা অন করল। হোয়াটসঅ্যাপে টুংটাং করে পরপর কয়েকটা মেসেজ ঢুকল। চেক করে খুশি হল দময়ন্তী। রাহুলের দিকে ফোনটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘এই দ্যাখ, নুটু আর বুয়ার ছবি এসে গেছে।’

রাহুল দেখে বলল, ‘দুটোই মুরগিচোর। এ-লাইনে এরকম চেহারা মস্ত সুবিধা দেয়।’

‘তাছাড়া ছদ্মবেশেও এক্সপার্ট। খুঁজে পেতে চাপ হতে পারে।’

সামনে দু-এক কিলোমিটার রাস্তা বেশ রুগ্ন। গাড়ি লাফাচ্ছে। পথের দু-পাশে ঝাঁপ ফেলছে দোকানপাট। ডিনার সেরে অচিরেই ঘুমিয়ে পড়ার উদ্যোগ নেবে শহরতলি।

‘তোমার চোখমুখ কেমন দেখাচ্ছে। একটু পাওয়ার ন্যাপ দিয়ে নাও।’

‘হ্যাঁ, ঘুম একটু দরকার ঠিকই।’ দময়ন্তী ভালো করে চোখ কচলে বলল, ‘একটা শিডিউল করে নে। পালা করে জাগব তিনজন। যাতে ড্রাইভারের অসুবিধা না হয়।’

.

কাশীপুর, রাত ১০টা ৩০

কালো টিক কখন নীল হবে?

কাল থেকে তিনবার মেসেজ করে রেখেছে লীনা। সবেতেই দুটো কালো টিক পড়েছে। মানে মেসেজ ডেলিভারড হয়েছে। কিন্তু লোকটা খুলে দ্যাখেনি। এত ব্যস্ত? নাকি ইচ্ছে করেই দ্যাখেনি? এত রাগ?

পিরিয়ডের দিন এসে গেছে। তলপেটে অল্প অল্প করে শুরু হচ্ছে যন্ত্রণা। মুড সল্টলেকের অটোভাড়ার মতো আচরণ করছে। তার মধ্যে লোকটা মেসেজ ‘সিন’ করছে না। প্রচণ্ড অস্থিরতায় বালিশ খামচে ধরল লীনা। বেশি সাড়াশব্দও করা যাচ্ছে না। পাশে মা শুয়ে। কাঁচা ঘুম। ধমক দেবে। গনগন করছে লীনার হাতের তালু, কপাল, বুক। দুটো ব্লু টিকের জন্যে যে এত হন্যে হয়ে অপেক্ষা করবে, এ কি লীনা নিজেই ভেবেছিল? দুটো নীল টিক চিহ্ন! পরিবর্তে নিজের স্থাবর-অস্থাবর সবকিছু নিলামে তুলে দিতে পারে লীনা। উফফ! হাঁদারামটা কি কিছুই টের পাচ্ছে না?

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *