মজন্তালী সরকার – পঞ্চদশ দিন

পঞ্চদশ দিন

তারিখ : ১৬ আগস্ট, ২০১৩

ভবানী ভবন, সকাল ১০টা ৩০

প্রাক্তন স্ত্রীর সামনে বসে অমিতাভ সান্যালের মনের ভিতর ঠিক কী চলছে, তা বোঝার উপায় নেই। কাবেরী সান্যালও নিরাসক্ত মুখে বসে। বরং ঘরের বাকিরাই যেন বেশি অস্বস্তিতে।

ভাবলেশহীন মুখে কথাবার্তা শুরু করলেন অমিতাভ, ‘মজন্তালী সরকারের কেসে সন্দেহের তালিকায় আছেন এমন দুজনের সঙ্গে তোমায় গতকাল দেখা গেছে। তাই কিছু জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তোমায় ডাকা হয়েছে।’

কাবেরী যান্ত্রিক কণ্ঠে বললেন, ‘কারা তারা?’

‘অভিনেত্রী সম্পূর্ণা মিত্র আর অনুপমা বুটিকের মালিক, সোশাল অ্যাকটিভিস্ট উপাসনা আচার্য।’

কাবেরীর ভুরুদুটো সামান্য ওপরে উঠল।

অমিতাভ বললেন, ‘আমাদের সোর্সের বয়ান অনুযায়ী, সম্পূর্ণা মিত্রের গাড়িতে করে তুমি নিউ গড়িয়া থেকে হিন্দুস্থান পার্কে উপাসনা আচার্যের বুটিকে এসে নেমেছিলে। এটা সত্যি?’

‘ঘটনাটা সত্যি। কিন্তু তোমরা যে দুয়ে দুয়ে চার করছ, সেটা সত্যি না।’

‘এই দুজনের সঙ্গে তোমার কীভাবে আলাপ?’

‘উপাসনার বুটিক থেকে আমি গত দু-বছর ধরে শাড়ি নিই। প্রমাণ দিতে পারব না। পুরোনো ক্যাশমেমো রাখি না। আর সম্পূর্ণার সঙ্গে আমার গতকালই আলাপ। বুচুনের কথা তোমার মনে আছে? নাড়ুকাকার ছেলে বুচুন?’

‘কে বুচুন?’

‘সৌম্য। ডকু ফিল্ম বানায়।’

‘ও আচ্ছা আচ্ছা, হ্যাঁ।’

‘গঞ্জের মানুষ ফিল্মের ডিরেক্টর বাপ্পাদিত্য সৌম্যর বন্ধু। সৌম্যর সূত্রেই আলাপ। বাপ্পাদিত্যর নেক্সট ফিল্ম পিরিয়ড পিস। আমাকে কয়েকটা বিষয়ে এক্সপার্ট ওপিনিয়ন দিতে হবে। সেই কারণেই এই পার্টিতে আমি নিমন্ত্রিত ছিলাম। সেখানেই সম্পূর্ণার সঙ্গে আলাপ হল। ও এদিকেই আসত। আমিও এদিকে আসব শুনে লিফট দিতে চাইল নিজে থেকেই। এটুকুই ঘটনা।’

‘ফিল্মের টাইটেল কার্ডে নাম তুলে ফেল তবে? দারুণ ব্যাপার।’

‘কাজের কথা বলো।’

‘তাহলে সম্পূর্ণার সঙ্গে মাত্র এক দিনের আলাপ। বেশ। কিন্তু উপাসনাকে দু-বছর ধরে চেনো। তাঁর বিষয়ে যদি তোমার মতামত জানতে চাই? মানে তিনি কেমন মানুষ? স্বভাবচরিত্রের কোনও বিশেষ দিক?’

‘উপাসনার সঙ্গে আমার সম্পর্ক কাস্টমার এবং ওনারের।’ বলে একটু থেমে কাবেরী দময়ন্তীর দিকে তাকালেন, ‘দু-বছরটা কোনও সময় হল? তেরো বছর ঘর করেও অনেক সময় মানুষ চেনা যায় না।’

ঘরে নীরবতা। অমিতাভর মুখে কোনও অভিব্যক্তি নেই। দময়ন্তীও পাথরের মতো মুখ করে বসে আছে। রাহুল আর তানিয়া নিজেদের ডেস্কটপ দুটোকেই যথাসম্ভব মুখোশ করার চেষ্টা করছে। কয়েক সেকেন্ড পর অমিতাভ খুব শান্ত গলায় বলে উঠলেন, ‘রাহুল, ওঁকে একটা ট্যাক্সি ধরে দেবে প্লিজ?’

‘ট্যাক্সি আমি নিজেই ধরে নিতে পারব,’ বলে উঠে দাঁড়ালেন কাবেরী। টেবিলের ওপর থেকে হাতব্যাগটা টেনে নিয়ে দরজা ঠেলে বেরিয়ে গেলেন দ্রুত পায়ে।

অমিতাভ কাবেরীর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলেন খানিকক্ষণ। তারপর জলের বোতল টেনে নিয়ে অনেকটা জল খেলেন। রাহুলকে বললেন, ‘ভদ্রমহিলার ওপর নজর রেখো।’

রাহুল কিছু একটা বলতে গিয়েও গিলে নিল। অমিতাভর মুখের দিকে তাকিয়ে সাহস পেল না সম্ভবত।

.

মহাত্মা গান্ধী রোড, দুপুর ২টো ৫০

লীনা কলেজফেরত কলেজ স্ট্রিট গেছিল বই কিনতে। মেট্রো স্টেশনের দিকে এগোনোর পথে দেখা হয়ে গেল রাহুল সেনগুপ্তের সঙ্গে। লীনা হালকা কটাক্ষ হেনে বলল, ‘এরপরেও বলবেন আপনি আমায় ফলো করছেন না?’

রাহুল হাসল, ‘অবশ্যই বলব। আগেও বলেছি, ফলো করলে আপনি টের পেতেন না।’

‘এমন নয় তো যে আপনি খুবই স্মার্ট?’

রাহুল খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে বলল, ‘আপনার বাড়িতে যেদিন গেছিলাম, দেখছিলাম আপনি বই পড়তে খুব ভালোবাসেন। সেজন্যই বোধহয় আপনি খুব কল্পনাপ্রবণ।’

‘খুব মোটা দাগের একটা কথা বললেন,’ লীনা ঠোঁট উল্টে বলল, ‘বই পড়লে লোকে কল্পনাপ্রবণ হয়ে যায়?’

‘দিনরাত ক্রিমিনাল নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করি। সূক্ষ্ম কথা আসবে কোত্থেকে বলুন তো ম্যাডাম?’

লোকটার শরীর থেকে ঘাম-মেশানো একটা সুগন্ধ আসছে। লীনা গন্ধটা চেনে। ওল্ড স্পাইস। বাবা ব্যবহার করে। পুরুষালি গন্ধ বলে কি হয় কিছু? যদি হয়, তাহলে এই ধরাধামে সেটা একমাত্র ওল্ড স্পাইস। ভেবেই লীনার হাসি পেয়ে গেল। বাজারি বিজ্ঞাপনের বয়ান সূক্ষ্ম অনুভূতির জগতেও কেমন থাবা বসায়। রাহুলকে বলল, ‘আপনি বই পড়েন?’

‘পড়ি। মেইনলি ক্রাইম জার্নাল। ফিকশন একেবারেই চলে না।’

‘ক্রাইম থ্রিলার পড়লেও তো পারেন। ক্রাইমও পেলেন, সাহিত্যও পেলেন।’

‘ফেলুদা-ব্যোমকেশের পর আর তেমন কিছু পাতে দেওয়া যায় কি?’

‘না-পড়েই আলটপকা একটা মন্তব্য করে দিলেন তো? পড়ে দেখেছেন? দ্যাখেননি তো? তাহলে?’

‘তা ঠিক,’ রাহুল মাথা নেড়ে বলল, ‘আপনার থেকে ধার নিয়ে পড়া গেলে পড়া শুরু করতে পারি।’

‘ধার দিতে আমার আপত্তি নেই। তবে আমিই যদি অপরাধী সাব্যস্ত হই, তাহলে আমার থেকে বই ধার নিলে কি ভালো দেখাবে?’

রাহুল হার মানার ভঙ্গিতে বলল, ‘কিছু মনে করবেন না, আপনি মাইরি খুব চাটন দিতে পারেন।’

লীনা মুখে হাত চাপা দিয়ে হাসল। বলল, ‘আমারই বরং আপনার কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত। আগের দিনের আচরণের জন্য।’

‘ইটস ওকে। আমি বুঝতে পেরেছি আপনি কী বলতে চেয়েছেন।’

‘বোঝার জন্য ধন্যবাদ। যা-ই হোক, আপনাদের তদন্তের অগ্রগতির জন্য অভিনন্দন জানাই। জুতোর সূত্র ধরে যেভাবে ভবানী ভবনের ঘটনার রহস্য উন্মোচন করলেন, তাতে সিআইডি-র হৃত সম্মান অনেকটাই পুনরুদ্ধার হল।’

‘আপনি বড্ড কঠিন বাংলা বলেন।’

‘বাঙালি হয়ে সহজ ইংরেজি বলার চেয়েও কঠিন বাংলা বলাই বেশি সহজ লাগে আমার।’

‘দেখেছেন, কেমন ঝাঁঝালো উত্তর দেন কথায় কথায়!’ হাসল রাহুল, ‘যা-ই হোক, ওই লিড থেকে আসল লোক অবধি পৌঁছাতে পারিনি। মজন্তালী এত কাঁচা কাজ করার লোক নয়।’

‘এখন শুনছি আপনারা বলছেন মজন্তালী সরকার একবচন নয়, বহুবচন?’

‘সেরকমই মনে হচ্ছে।’

‘একটা জিনিস ভেবে খুব ভালো লাগছে, জানেন? টলিউডের নায়িকাও আপনাদের সন্দেহের তালিকায় আছেন, আমিও আছি। অন্তত একটা ব্যাপারে একজন স্টারের সঙ্গে একাসনে বসার সুযোগ তো হল।’

‘আপনাকে স্যাটায়ারশ্রী উপাধি দিতে পারলে শান্তি পেতাম।’

দুজনেই হাসল একচোট।

রাহুল বলল, ‘আপনি কি এখন বাড়ি ফিরছেন?’

‘হ্যাঁ।’

‘আমার ওইদিকেই একটা কাজ আছে। আপনার আপত্তি না থাকলে ড্রপ করে দিতে পারি।’

লীনা পূর্ণ চোখে তাকাল রাহুলের দিকে। ওল্ড স্পাইসের গন্ধটা বেড়ে উঠছে। বলল, ‘আপত্তি কী?’

.

ভবানী ভবন, দুপুর ৩টে ৩০

‘কেমন আছ অমিতাভ?’

অমিতাভ মুখ তুলে দেখলেন, আইজি নর্থ বেঙ্গল নবীন চতুর্বেদী। যিনি সিআইডি-র আইজি থ্রি হয়ে আসছেন বলে খবর। তিনি মালদা রেঞ্জের এসপি থাকাকালীন চতুর্বেদী ছিলেন আইজি। প্রায় সাড়ে ছ ফুট উচ্চতা। ছেলেছোকরা অফিসারদের কমপ্লেক্স দেবার মতো ফিগার। ভারি মাইডিয়ার লোক। উঠে দাঁড়ালেন অমিতাভ। খুশি-গলায় বললেন, ‘আরে নবীনদা, কী খবর? ট্রান্সফার অর্ডার বেরিয়ে গেল নাকি?’

‘না বেরোয়নি। কাগজপত্র রেডি করছি আস্তে আস্তে। ভাবলাম তোমার সঙ্গে একবার দেখা করে যাই। শুনলাম মেজর দুটো ব্রেকথ্রু পেয়েছ?’

‘খুব মেজর হয়তো নয়। সম্ভবত ডেড এন্ড। প্লিজ বসুন।’

চতুর্বেদী চেয়ারে বসে বললেন, ‘সে হোক, ভবানী ভবনের রহস্যময় ব্যাপারটা সলভ করে হারানো সম্মানটা তো ফিরে পেয়েছ। জুতোর ব্যাপারটা দারুণ থ্রিলিং। ভেরি ওয়েল ডান।’

‘কিছু খেয়েছেন? চা-কফি কিছু বলব?’

‘না না, এডিজি-র ঘরে স্ন্যাক্স-ট্যাক্স খেয়ে এলাম একগাদা। আর কিছু খাব না।’ বলেই আচমকা একটু গম্ভীর হয়ে গেলেন চতুর্বেদী, ‘অমিতাভ, ইটস আ গার্লস গ্যাং, তাই তো?’

‘গ্যাং বলব না পুরোদস্তুর অরগ্যানাইজেশন বলব বুঝতে পারছি না। এদের রুট ঠিক কোথায় সেটাই তো বুঝতে পারছি না।’

‘তোমার জন্য একটা এক্সক্লুসিভ খবর আছে। খবরটা চিন্তার।’

অমিতাভ সোজা হয়ে বসলেন।

চতুর্বেদী বললেন, ‘মাস দুয়েক আগে একশো কেজি আরডিএক্স শিলিগুড়ি হয়ে কলকাতায় ঢুকেছে।’

অমিতাভ একটা শ্বাস ফেললেন, ‘খবরটা আমরা সোর্স-মারফত পেয়েছি নবীনদা। কিন্তু এর ল্যাজামুড়ো কিছু জানতে পারছি না। এখন আরডিএক্স কোথায়, তারও কোনও হদিশ পাচ্ছি না। অবশ্য এটা এখনও নিশ্চিত নয় যে এই আরডিএক্সের লিঙ্ক আমাদের কেসের সঙ্গে রয়েছে। সেটা না-হলে ব্যাপারটা আরও অনেক বেশি ভয়ের।’

‘এই আরডিএক্স বারোই সেপ্টেম্বরের জন্যই ঢুকেছে, অমিতাভ। জানা যাচ্ছে, রিসিভিং এন্ডে একজন মহিলা ছিলেন।’

অমিতাভর বুকের ভিতর চিরিক করে একটা বিদ্যুৎরেখা ছুটে গেল এপাশ থেকে ওপাশ, ‘আরেকটু ডিটেলে বলুন নবীনদা।’

‘খুব ডিটেল তথ্য নেই। এসএসবি, মানে সশস্ত্র সীমা বল জওয়ানদের হাতে দিনকয়েক আগে একটা লোক ধরা পড়েছে পঞ্চাশ কেজি হেরোইন নিয়ে। মোবাইল টাওয়ারের লোকেশন ধরে তার আরেক সঙ্গীকে কাঁকড়ভিটা থেকে ধরা হয়েছে গত পরশু। এরা কাঠমান্ডু থেকে কাঁকড়ভিটা হয়ে শিলিগুড়ি মাল সাপ্লাই করত। আদরযত্ন করে আরডিএক্সের খবরটা বের করা গেছে। এরা নিজেরা করেনি। এঁদেরই দলের লোক করেছে। দ্বিতীয় লোকটা দাবি করেছে এক সুন্দরী ম্যাডাম এই আরডিএক্স নিয়েছেন। ডিটেল কিছু বলতে পারেনি। ওরা নিজেরা দেখেনি তাকে।’

অমিতাভর মুখটা হাল-ভাঙা নৌকার মাঝির মতো হয়ে গেল।

চতুর্বেদী বললেন, ‘এটা কিন্তু আনঅফিশিয়াল। লোকদুটো নারকোটিক্সের হেফাজতে আছে। এখনও খবরটা বাইরে আনা হয়নি। দেখা করতে চাইলে বোলো।’

অমিতাভ ব্যাজার মুখে বললেন, ‘ওই রুটটা তো মাদক পাচারের করিডর হয়ে উঠছে নবীনদা। কিন্তু তা বলে আরডিএক্স? একশো কেজি আরডিএক্স তো ছেলেখেলা না।’

‘তুমি তো জানো চিন বর্ডারে আচমকা একটু টেনশন শুরু হয়েছিল। তারই সুযোগ নিয়ে নেপাল বর্ডার হয়ে পাচারটা হয়েছে। পানিট্যাঙ্কির রাস্তা ধরে ঢুকেছে বলে আমাদের অনুমান। আর তাছাড়া…।’

‘তাছাড়া?’

‘নারকোটিক্সের কর্তারা আরও একটা কথা বলছেন,’ চতুর্বেদী গলাটা সামান্য নিচু করলেন, ‘এই আরডিএক্সকে সেফ প্যাসেজ দেবার পিছনে নাকি কোনও এক প্রভাবশালীর হাত আছে। সম্ভবত কোনও আমলা বা পুলিশের বড়কর্তা। ওই সুন্দরী ম্যাডাম আর এই প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব এক মানুষ হলেও হতে পারেন।’

কাশীপুর, কলকাতা, বিকেল ৫টা ২০

গাড়ি কাশীপুর ঝিল রোডের কাছাকাছি আসতে লীনা বলল, ‘ব্যাস। এইখানে নামিয়ে দিন।’

রাহুল গাড়ি থামিয়ে বাইরেটা দেখেশুনে বলল, ‘এখানে তো আপনার বাড়ি নয়?’

‘আমি চলে যেতে পারব।’

রাহুল গাড়ি সাইড করল। লীনা গাড়ি থেকে নেমে জানলার কাছে নিচু হল। বলল, ‘অনেক ধন্যবাদ এবং কেসের জন্য শুভেচ্ছা। আসি।’

‘আসুন।’

লীনা যতক্ষণ না গলির বাঁকে মিলিয়ে গেল, রাহুল চেয়ে রইল। হার্ড নাট টু ক্র্যাক।

.

ভবানী ভবন, সন্ধে ৬টা

নবীন চতুর্বেদীর বয়ে আনা উত্তরবঙ্গীয় বোমার আঘাত কাটিয়ে উঠতে সময় লাগছিল সবার। অমিতাভ জানলার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিস্কুট খাচ্ছিলেন। দময়ন্তী ভুরু কুঁচকে বসেছিল। আর তানিয়া ইন্টারনেটে শিলিগুড়ি করিডরে চিন-ভারত টেনশনের খবর সার্চ করছিল। দেখেশুনে বলল, ‘মুরগির ঘাড় নিয়ে চিনের বদমাইশি আর যাবার নয়।’

রমেশ কফি দিতে ঢুকেছিল। ‘মুরগির ঘাড়’ কথাটা কানে যেতেই বোধহয় ভারি অবাক হয়ে তাকাল।

‘আমাদের দেশেরও একটা “মুরগির ঘাড়” আছে রমেশ।’

‘আমাদের দেশের?’ রমেশ হাঁ।

‘এই দ্যাখো,’ পয়েন্টার দিয়ে ম্যাপে নির্দেশ করলেন অমিতাভ, ‘এই যে শিলিগুড়ি, একে ঘিরে চারটে দেশ। নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ আর চিন। মাঝখানে খুব সরু একটা অংশ ভারতের নিয়ন্ত্রণে। ম্যাপে দ্যাখো, এটাকে মুরগির ঘাড়ের মতো দেখাচ্ছে। ওর নাম শিলিগুড়ি করিডর। ওটাই হচ্ছে ভারতের “চিকেনস নেক”। বুঝতেই পারছ জায়গাটা অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে দেশের বাকি অংশের যোগসূত্র হিসেবে অবস্থান করছে ওই এলাকা। চারপাশে চারটে দেশ। ফলে সবসময় একটা টেনশন থাকে। এই জায়গাটা হচ্ছে অপরাধের স্বর্গরাজ্য। ট্রানজিট পয়েন্ট। এখান থেকে প্রচুর পাচার হয়। বুঝলে?’

রমেশ মন দিয়ে পুরোটা শুনছিল। খুশি হয়ে ঘাড় নাড়ল।

অমিতাভ বললেন, ‘এবার যেতে পারো।’

দময়ন্তী বলল, ‘তাহলে নর্থ বেঙ্গল বেসড উচ্চপদস্থ পুলিশকর্তা আর আমলাদের তালিকা বানাই?’

‘হ্যাঁ। ফিমেল অনলি।’

‘শুধু মহিলাদের ধরব?’ তানিয়া বলল, ‘কোনও প্রভাবশালী পুরুষও তো সাহায্য করতে পারেন। মজন্তালী সরকার গার্লস গ্যাং হলেও কোনও স্তরে কোনও পুরুষের সাহায্য তারা পাচ্ছে না, এটা ধরে নেওয়া কি ঠিক হচ্ছে স্যার?’

‘গুড পয়েন্ট। তবে সেই পুরুষেরও কোনও তীব্র ব্যক্তিগত ইতিহাস থাকতে হবে বলেই আমার বিশ্বাস। ব্যক্তিগত ইতিহাসকে গুরুত্ব দিচ্ছি বলেই তো আগে মহিলাদের চেক করে নিতে চাইছি। সন্তোষজনক ফল না পেলে পুরুষরা তো রইলই।’

.

গলফ গ্রিন, রাত ৮টা ৪৫

শালিনী ঘরে ঢুকে দেখল অঙ্কিত ফিরে এসেছে। শেফের অ্যাপ্রন পরে কোমর বেঁধে নেমে পড়েছে রান্নায়। কেরালার একটা মাছের রেসিপি ট্রাই করছে।

শালিনী বলল, ‘কী করছ?’

অঙ্কিত উৎসাহভরে বলল, ‘বলছিলাম না, কেরালার ওই মাছের রেসিপিটা ট্রাই করব? মীন ভারুথাতু। আজ স্কোপ পেয়ে তাড়াতাড়ি কেটে এলাম। সিকে মার্কেট থেকে ভেটকি নিয়ে একেবারে ঢুকলাম।’

‘জিও। আমায় কি জোগাড়ে হাত লাগাতে হবে?’

‘না না, ম্যানেজ করে নেব।’

‘থ্যাঙ্কিউ। আমি খুব ক্লান্ত। দিস মজন্তালী সরকার ইজ গেটিং অন মাই নার্ভস।’

‘একটা পেগ বানিয়ে দেব?’

‘না। ভাল্লাগছে না। ফ্লাক্সে যদি চা থাকে, একটু দিও।’

অঙ্কিত কিচেনের দিকে যেতে যেতে বলল, ‘সারাক্ষণ এই একই কেস নিয়ে ভেবে যাচ্ছ কেন? গল্পে তো তোমার সাইড রোল। তেমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা না। রিল্যাক্স।’

‘সাইড রোলে আর থাকব বলে মনে হয় না।’

‘মানে?’

‘দয়মন্তীদি আমায় এই কেসটায় ফরেন্সিক সাইকোলজিস্ট হিসেবে কাজ করতে বলছে।’

অঙ্কিত লাফিয়ে উঠল, ‘বলো কী! এ তো দারুণ অপরচুনিটি।’

‘আমি এখনও হ্যাঁ করিনি।’

‘কেন?’

শালিনী সোফায় শরীর এলিয়ে বলল, ‘অফারটা নিলে এই কেসের সঙ্গে আমি আর নৈর্ব্যক্তিক দূরত্ব রাখতে পারব না। অলরেডি পারছি না।’

‘অত কঠিন বাংলা বোলো না,’ চায়ের কাপ এগিয়ে দিল অঙ্কিত, ‘আমি এখনও নভিশ।’

‘মানে পার্সোনালি আরও বেশি অ্যাটাচড হয়ে পড়ব।’

‘কিন্তু সিআইডি-র সঙ্গে কাজ করলে তোমার প্রোফাইল কতটা কিক পাবে সেটা ভাবো।’

‘তা পাবে।’

‘যাই হোক, তোমার এই সম্পূর্ণা মিত্র মেয়েটি বেশ ভালো অভিনয় করে কিন্তু।’

‘তা করে। কিন্তু ইয়েসম্যান হতে পারছে না বলে নাকি ইদানীং কাজ কমছে। দময়ন্তীদিই বলল।’

‘সে তো হবারই কথা। প্লাস সুজান জর্ডানের বিভিন্ন প্রোগ্রামে ওকে এত অ্যাক্টিভলি দেখা গেছে। কিন্তু রাজ চক্রবর্তীর এই সিনেমাটাতেও তো ও আছে। বরুণ বিশ্বাসকে নিয়ে যে-সিনেমাটা হচ্ছে।’

‘ইনসিগনিফিক্যান্ট রোল।’

অঙ্কিত একটু ভেবে বলল, ‘দ্যাখো, বরুণ বিশ্বাস তোমার হিরো। অথচ তোমাদের জেন্ডার ভায়োলেন্স-বিরোধী মুভমেন্টের পুরো ফোকাসটা কেমন নারী ভার্সাস পুরুষ হয়ে যাচ্ছে না? তোমার কি মনে হয়?’

শালিনী প্রশংসাভরা চোখে তাকাল। সোশাল ইস্যুর ব্যাপারে অঙ্কিত অনেকটা সেই বারোয়ারি দেওয়ালগুলোর মতো, যেখানে যে পারে পোস্টার মেরে চলে যায়। নিজস্বতা প্রায় নেই বললেই চলে। যেখানে যা শোনে তাতেই প্রভাবিত হয়। এ-বিষয়ে অঙ্কিতের থেকে এত মেধাবী মন্তব্য আশা করা যায় না। খুশি হয়ে শালিনী বলল, ‘হচ্ছে তো। লোকজনকে এটা বোঝানো যাচ্ছে না যে আসল সমস্যা পুরুষে না, পুরুষতন্ত্রে।’

অঙ্কিত কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, ‘আমি তো বাবা রাস্তাঘাটে দোকান বাজারে ভয়ানক সাবধানে ঘুরছি। মহিলাদের থেকে দশ ইঞ্চি দূরত্ব রেখে চলছি। বলা যায় না কখন অনিচ্ছাকৃতভাবে কোনও টাচ লেগে যাবে আর মলেস্ট মলেস্ট বলে চেঁচাবে। তারপর তো গণপিটুনি খেয়েই মরে যাব।’

শালিনী চুপ করে থাকল। কথাটা ভীতিপ্রদ। পারস্পরিক বিশ্বাসের জায়গাটা একেবারে বালির বাঁধের মতো ভেঙে পড়ছে। একটা সার্বিক অবিশ্বাস ক্যান্সারের মতো ছড়িয়ে যাচ্ছে মানুষের শিরায় শিরায়। অবস্থাটা এখন এমন দাঁড়িয়েছে যে, নব্বই ভাগ ছেলেরা মেয়েদের ভোগ্যবস্তু ভাবে। আর নব্বই ভাগ মেয়েরা ছেলেদের ভাবে সম্ভাব্য ধর্ষক।

অঙ্কিত চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, ‘কোন টাচ ইচ্ছাকৃত, কোনটা অনিচ্ছাকৃত সেটা বোঝা খুব কঠিন না। কিন্তু মহিলারা বুঝতে চাইছেন কিনা সেটাই প্রশ্ন।’

শালিনী মাথা নিচু করে ছিল। টেবিলে নখের আঁচড় দিতে দিতে বলল, ‘মহিলাদের একতরফা দোষ দিয়ে লাভ নেই অঙ্কিত। পুরুষতন্ত্র এভাবেই ঘুরপথে পুরুষদেরও ভিক্টিম বানায়। আমাদের সোশাল কন্ডিশনিংটাই এরকম হয়ে যাচ্ছে। গোটা সমাজটা ইনফেকটেড। দু-দিন আগে এক স্কুলটিচারের ঘটনা পড়লাম পেপারে। বছর দুয়েক আগে মলেস্টেশনের মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়েছিল তাঁর বিরুদ্ধে। দু-বছর লেগে গেল সেই অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হতে। চাকরিটা রক্ষা পেল, কিন্তু সম্পূর্ণ বিনা অপরাধে ভদ্রলোককে যেরকম পাব্লিক শেমিং ফেস করতে হল তার কি কোনও ক্ষতিপূরণ হয়?’

‘সেইজন্যেই তো পাবলিক প্লেসে সারাক্ষণ ভয়ে ভয়ে থাকি।’

‘নির্ভয়া কাণ্ডের এফেক্টে গত বছর যে ক্রিমিনাল ল অ্যামেন্ডমেন্ট হল, সেটা নারী সুরক্ষার জন্য একটা মাইলস্টোন ঠিকই। কিন্তু আমার আজকাল সেটার উল্টো পিঠের কথাটাও মনে হচ্ছে। উইদাউট কনসেন্ট পেনিট্রেশন বা ইনসারটেশনই যে শুধু রেপ নয়, সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্টের সীমানা যে আসলে আরও অনেকদূর সেই কথাটা স্বীকৃতি পাওয়া মানে অবশ্যই খুবই জরুরি একটা পদক্ষেপ। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, অ্যাটেম্পট টু অ্যাসিড অ্যাটাক, স্টকিং বা ভারবাল টিজিং ব্যাপারগুলোই এমন যে এগুলো প্র্যাকটিকালি করাও সোজা, তাই মিথ্যা অভিযোগ করাও সোজা।’

‘আর অভিযোগ তো একটা করে দিলেই হল। তারপর পাবলিক রে রে করে ভিলেন বানিয়ে দেবে। কেন একজন নির্দোষ ওয়েল বিহেভড জেন্টলম্যানকে এরকম ভয়ে ভয়ে থাকতে হবে বলো তো?’

‘এবার বুঝতে পারছ তো অঙ্কিত? কেন একটা মেয়েকে লেট নাইটে বাড়ি ফিরতে হলে ভয়ে ভয়ে থাকতে হবে, এই প্রশ্নেরই উল্টো পিঠ তোমার প্রশ্নটা?’

অঙ্কিত বুঝতে পারছে কিনা বোঝা গেল না। তবে মাথা নেড়ে বলল, ‘মেয়েরাই হেনস্থাকারী, এমন উদাহরণও তো রয়েছে।’

‘রয়েছেই তো। পুরুষের হেনস্থা নিয়ে কথা কম হয়। তা বলে পুরুষের হেনস্থা তো কম হচ্ছে না চারপাশে। মেয়েদের দ্বারাও পুরুষের যৌন হেনস্থা হয়, এবং ক্ষমতা সেখানে কাজ করে বয়েস বা সামাজিক-অর্থনৈতিক স্টেটাসের অনুকুলে। তথ্য বলছে, মেল ইনফ্যান্টের ওপর যৌন নিগ্রহের হার প্রতি ছ-জনে একজন।’

‘বলো কী?’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ। ইটস অল অ্যাবাউট পাওয়ার পলিটিক্স। যে ছেলেটির কথা বলার ধরন তথাকথিত “মেয়েলি”, সে কি পুরুষতন্ত্রের শিকার নয়? যে ছেলেটি দৌড়ঝাঁপ করে খেলাধুলো করার চেয়ে ঘরে বসে ছবি আঁকতে বেশি ভালোবাসে, তাকে যখন বন্ধুরা “লেডিস” বলে খ্যাপায়, সে কি পুরুষতন্ত্রের শিকার নয়? যে ছেলেটি কাঁদলে তার বাড়ির লোক তাকে ধমক দিয়ে বলে—মেয়েদের মতো কাঁদছিস কেন, সে কি পুরুষতন্ত্রের শিকার নয়? ভাবো অঙ্কিত, ভাবা প্র্যাকটিস করো।’

.

রবিনসন স্ট্রিট, রাত ১১টা ৩০

দময়ন্তী কয়েকটা পয়েন্ট গুছিয়ে রাখছিল। আগামীকাল সম্পূর্ণা মিত্রের বাবা-মাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। বাবা-মা বলতে অবশ্য শুধুই বাবা। মায়ের সঙ্গে সম্ভবত কথা বলা যাবে না। সম্পূর্ণা বলছিল, উনি মানসিকভাবে ঠিক নেই। সেক্ষেত্রে দয়মন্তী অনুরোধ করবে না। এই কেসের সন্দেহভাজনদের কারও বিরুদ্ধেই খুব জোরালো সন্দেহ করার মতো কিছু পাওয়া যাচ্ছে না। আসল সন্দেহভাজন হয়তো মানিকতলার চারমাথার মোড়ে দাঁড়িয়ে তেলেভাজা খেতে খেতে পরের খুনের ব্লু প্রিন্ট ছকছে, কিংবা সল্টলেকের কোনও অভিজাত অ্যাপার্টমেন্টের বারোতলায় বসে গোল্ড ফ্লেক লাইট টানতে টানতে ভাবছে এরপর কী হাল্লা মাচানো যায়।

ভাবনায় বিভোর হয়ে ছিল দময়ন্তী। ফোন বেজে উঠতে চমকে উঠল। লোকনাথ। দেখেই রক্তচাপ বেড়ে গেল দময়ন্তীর। তার মানে কি বেড়াল বেরিয়েছে? ত্বরিত হাতে ফোন ধরল, ‘হ্যাঁ লোকনাথ?’

‘ম্যাডাম, গাড়ি বেরোল।’

দময়ন্তী বলল, ‘কিপ ফলোয়িং। আমি বেরোচ্ছি।’

.

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *