দ্বাবিংশ দিন
তারিখ : ২৩ আগস্ট, ২০১৩
শিয়ালদা স্টেশন, সকাল ৮টা ১৫
কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেস প্রায় একঘণ্টা লেট করে সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে শিয়ালদা স্টেশনে ঢুকল। নেমে দশাসই চেহারার দুই ভদ্রলোকের সঙ্গে একটু এগোতেই সৌমিলি অমিতাভ সান্যালকে দেখতে পেল। পাশে দময়ন্তী মুখার্জী। ওদিকে পৃথ্বীশদা, শাক্য, রণরাও রয়েছে। ওরা সকলে নাইন বি প্ল্যাটফর্মের মুখে দাঁড়িয়ে আছেন।
তার ঘণ্টাদেড়েক পর সৌমিলি আর শিরিনকে নিয়ে নিজের কেবিনে বসলেন অমিতাভ। সঙ্গে দময়ন্তী আর লোকনাথ।
এই মেয়েদুটোকে বেশ লাগে দময়ন্তীর। টগবগে। প্যাশনেট। ভাবনাচিন্তাও খুব পরিষ্কার। বিশ্বাস হচ্ছে না যে নুটুর খুনের সঙ্গে ওদের কোনওরকম যোগাযোগ আছে। তবে বাজিয়ে তো দেখতেই হবে।
চেয়ারে বসে সিগারেট ধরিয়ে অমিতাভ বললেন, ‘আপনারা যেহেতু শিলিগুড়ির ঘটনা সবটাই জানেন, ফলে আমি ভূমিকা না করে সরাসরি প্রশ্নোত্তর পর্বে যাচ্ছি। ঠিক এই টাইম পিরিয়ডে দু-দিনের জন্য আপনাদের শিলিগুড়ি যাওয়াটা কি নিতান্তই কাকতালীয়?’
শিরিন বলল, ‘স্যার, কিছু মনে করবেন না, আপনার প্রশ্নের উত্তর দেবার আগে একটা কথা জিগ্যেস করব?’
মাংসের দোকানে খাঁচার মধ্যে জবাইয়ের অপেক্ষায় বসে থাকা মুরগির মতো বোধ করছিল সৌমিলি। শিরিনের প্রশ্ন শুনে ব্যোমকে গেল। বুকের পাটা আছে বটে মেয়েটার।
জেরার শুরুতেই এরকম পাল্টা প্রশ্নের আর্জি আসবে, অমিতাভও সম্ভবত ভাবেননি। দময়ন্তীর সঙ্গে একবার দৃষ্টি বিনিময় করে বললেন, ‘বলুন।’
শিরিন বলল, ‘আপনি বলতে চাইছেন ওরা নিজেদের দলেরই দুজন লোককে মেরেছে? আর লোক মানে কি আপনি পুরুষ বলছেন? ওদের দলে পুরুষও আছে নাকি? মানে এটা উইমেন্স গ্যাং নয়?’
অমিতাভ খুক করে একটু হেসে ফেললেন, ‘চমৎকার প্রশ্ন। কিংবা বলা যায় প্রশ্নের আকারে নিজেদের ইনোসেন্সের পক্ষে ওকালতি।’
‘বিশ্বাস করুন, আমরা সম্পূর্ণ নির্দোষ,’ শিরিন আত্মবিশ্বাসী গলায় বলল, আমি পুরোটা খুলে বলছি, তাহলেই বুঝতে পারবেন।’
‘শুরু করুন।’
শিরিন বলতে শুরু করল, ‘গত শুক্রবার সকালে আমরা জানতে পারি, আপনাদের দুজন অফিসার নর্থ বেঙ্গল যাচ্ছেন। খবরটা জানান আমাদের নর্থ বেঙ্গল করেসপন্ডেন্ট প্রভাস গাঙ্গুলী। সেদিন সকালে ওদের গাড়ি কিছু প্রবলেম করায় ওরা কিছুক্ষণের জন্য রায়গঞ্জ থানায় ঢুকেছিলেন। প্রভাসদা একটা খবরের ব্যাপারে তখন ওখানেই ছিলেন। দময়ন্তীদি আর রাহুলবাবুকে প্রভাসদা চিনতেন। উনি কিছু কথাবার্তা ওভারহিয়ার করে আমাদের জানান যে ওঁরা শিলিগুড়ি যাচ্ছেন। আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না যে শিলিগুড়িতে একটা শো-ডাউন হতে চলেছে। সেদিন সকালের ফ্লাইটে আমরা দুজন বাগডোগরা রওনা হয়ে যাই। ওঁরা কোথায় উঠেছেন, সেই খবর প্রভাসদাই জোগাড় করে দিয়েছিলেন। শিলিগুড়িতে গিয়ে উঠি ওঁদের হোটেলের অপোজিট ফুটের একটা হোটেলে। কিন্তু আনফরচুনেটলি আমরা যখন গিয়ে পৌঁছই, ওরা তখন ছিলেন না। আমি প্ল্যাটিনাম হোটেল, মানে ওঁরা যে হোটেলে উঠেছিলেন, তার একজন সিকিউরিটি গার্ডকে পয়সা দিয়ে বলে রেখেছিলাম যে ওঁরা ফিরলেই যেন আমাকে ইনফর্ম করে। ওঁরা ফিরলেন বিকেলে। ততক্ষণে আমরা খুনের খবর পেয়ে গেছি এবং এটাও বুঝতে পেরেছি যে খুনদুটো এই কেসের সঙ্গে গভীরভাবে রিলেটেড।’
অমিতাভ সব শুনে বারকয়েক চোখ পিটপিট করলেন, ‘দময়ন্তীরা হোটেল প্ল্যাটিনামে ফিরে আসার পরে আপনারা সাগর রেসিডেন্সিতে গিয়েছিলেন?’
শিরিন বলল, ‘হ্যাঁ স্যার। তবে এক ঘণ্টার মধ্যেই আবার ফিরে এসেছি। ফিরেই রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম ট্রেনের জন্য।’
‘আপনারা কি জানতে পেরেছিলেন দময়ন্তীরা কখন ফিরছে?’
‘হ্যাঁ স্যার। সাগর হোটেলে গিয়ে শুনলাম ধৃত মেয়েটিকে নিয়ে সন্ধেবেলাই ওঁরা রওনা হয়ে পড়বেন গাড়িতে।’
অমিতাভ আর ভাঙলেন না যে দময়ন্তীরা পরে সিদ্ধান্ত বদল করে ফ্লাইটে ফিরেছে। বললেন, ‘তাহলে ওই বিকেলের আগে আপনারা সারাক্ষণ হোটেলের ঘরেই ছিলেন?’
‘প্রায় সারাক্ষণই স্যার,’ সৌমিলির মধ্যে এতক্ষণে যেন একটু আত্মবিশ্বাস ফিরেছে, ‘সাড়ে তিনটে নাগাদ এক ঘণ্টার জন্য সাগর হোটেলে যাওয়াটুকু বাদ দিলে গোটা দিন আমরা হোটেলের ঘর ছেড়ে বেরোইনি। এমনকী খেতেও বাইরে যাইনি। ব্রেকফাস্ট লাঞ্চ ডিনার সব ঘরেই নিয়েছি।’
‘কোন হোটেলে উঠেছিলেন? নাম কী?’
‘টিউলিপ।’
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকনাথের দিকে তাকালেন অমিতাভ, ‘লোকনাথ, ওটা কোন থানার আন্ডারে পড়ছে দ্যাখো। হোটেলে খোঁজখবর নিয়ে এঁদের বয়ান ভেরিফাই করাও।’
লোকনাথ মাথা নেড়ে বেরিয়ে গেল।
অমিতাভ বললেন, ‘আপনারা নির্দোষ ধরে নিয়ে এবার আপনার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি। না। খুন-হওয়া লোকদুটো মজন্তালীদের দলের নয়। কিন্তু এরা মজন্তালীদের বিষয়ে এমন কিছু জানত, যেটা আমরা জানতে পারলে মজন্তালীদের বিপদ হত। সম্ভবত এই কারণেই ওদের মরতে হল।’
হাতে চায়ের কেটলি আর ডিসপোজেবল কাগজের কাপ হাতে রমেশ ঘরে ঢুকল।
‘চা কেন?’ ভুরু কুঁচকে বললেন অমিতাভ, ‘ওদের জন্য ব্রেকফাস্ট আনতে বললাম যে।’
রমেশ বলল, ‘আসছে স্যার। ছকু আনতে গেছে।’
অমিতাভ আপ্যায়নের ভঙ্গিতে সৌমিলিদের বললেন, ‘নিন। চা খান। ব্রেকফাস্ট আসছে।’
সৌমিলি সংকুচিত হল, ‘না না স্যার, এসবের আবার কী দরকার?’
‘ট্রেন থেকে আপনাদের সোজা এখানে এনে তুলেছি। আপনাদের ব্রেকফাস্ট করা হয়নি। খেয়ে নিন প্লিজ। আরও খানিকক্ষণ বসতে হবে কিন্তু।’
.
ভবানী ভবন, ইন্টারোগেশন রুম, সকাল ১০টা ১৫
টানা আধ ঘণ্টা ধরে নানা উপায়ে বোবা মেয়েটার পেট থেকে কথা বের করার চেষ্টা করে তানিয়া একেবারে হেদিয়ে পড়েছিল। হাঁপাতে হাঁপাতে ঘরের বাইরে এসে রাহুলকে বলল, ‘কথা বলতে পারে না, লিখতে পড়তেও জানে না। কোত্থেকে জোটাল বলো তো একে?’
রাহুল বলল, ‘শুনতে তো পাচ্ছে। কথা বুঝতে পারছে বলেও মনে হচ্ছে। মানে কালা নয়। কিন্তু কমিউনিকেটই যদি না করতে পারা যায়, কী লাভ?’
‘মজন্তালীদের ওপর শ্রদ্ধা কমে গেল।’ তানিয়া রুমাল দিয়ে কপালের ঘাম মুছল, ‘সিরিয়াসলি। নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য একটা অসহায় বোবা মেয়েকে ফাঁসিয়ে দিল?’
‘মেয়েটা মোটেই অসহায় নয়। যথেষ্ট সেয়ানা। ভুলে যাস না, মজন্তালী খুন করে উল্টোদিকের ঘরে সেঁধিয়ে যাবার পর এই মেয়ে নিজে ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করে বাথরুমের কাচ ভেঙে নেমেছে।’
‘কী করি বলো তো? ওকে সাসপেক্টদের ছবি দেখাই?’
‘দেখা। কিন্তু চিনলেও কোনও সিগনাল দেবে কি? একটু খাতিরযত্ন দরকার।’
‘বাচ্চা মেয়ে রাহুলদা।’
‘দময়ন্তীদিকে ডাক। তোর দ্বারা হবে না।’
‘হ্যাঁহ! দময়ন্তীদি যেন বিশাল খাতিরযত্ন করতে পারে!’ মুখ বেঁকিয়ে ওয়ার্ক স্টেশনের দিকে হাঁটা লাগাল তানিয়া।
রাহুল বাথরুমের দিকে এসে একটা সিগারেট ধরাল। মেয়েটাকে সত্যিই টোপ হিসেবে ব্যবহার করা হল? অবশ্য এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। দর্শনের চেয়ে বরাবরই সংগ্রাম বড় হয়ে ওঠে। তাছাড়া পিছনে আগুন লাগলে এইসব নীতি-টিতি খিড়কি দিয়ে পালাবেই। ধোঁয়ার সঙ্গে ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাসও বেরিয়ে এল রাহুলের।
.
রাজাবাজার সায়েন্স কলেজ, সকাল ১০টা ২০
আগামীকাল বিকেলে লীনার কাছে যাবার কথা। ঠিক হয়েছে ওর বাড়িতে ক্যাজুয়াল আবহেই এপিসোডটা শ্যুট করা হবে। কিন্তু সৌমিলি গতকাল রাতের মধ্যে হোয়াটসঅ্যাপে কিছু ব্রিফ মেইল করবে বলেছিল। এখনও পাঠাল না তো! শালিনী আরেকবার মেইলবক্স চেক করল। না, মেইল আসেনি। একটা ফোন করে নেওয়া যাক।
ফোন বেজে বেজে কেটে গেল। সৌমিলি ফোন তুলল না। শালিনী এরপর শিরিনের নম্বর ধরার চেষ্টা করল। সে-ও ফোন তুলল না। কী ব্যাপার? সাংবাদিকরা ফোন তুলছে না, এমন ঘটনা কমই ঘটে। পারলে তারা চিতাকাঠেও ফোন নিয়ে যায়। কী হল মেয়েদুটোর?
শালিনীর মনে পড়ল, শাক্যর নম্বর দিয়েছিল সৌমিলি। ওকেই ফোন করা যাক।
কয়েকবার রিং হবার পর ফোন তুলল শাক্য, ‘হ্যালো?’
‘শাক্য, আমার নাম শালিনী সিনহা। সৌমিলির কাজিন।’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। বলুন।’
‘সৌমিলি, শিরিন কাউকে ফোনে পাচ্ছি না, কী ব্যাপার বলো তো? আগামীকাল বিকেলে লীনা দাশগুপ্তের সঙ্গে ইন্টারভিউ আছে। সৌমিলি কাল রাতের মধ্যে আমায় একটা ব্রিফ পাঠাবে বলেছিল।’
ফোনের ওপারে কয়েক সেকেন্ড সময় নিল শাক্য। তারপর চাপা গলায় বলল, ‘শালিনীদি, একটা বিপদ ঘটেছে।’
.
ভবানী ভবন, ওয়ার্ক স্টেশনের বাইরে, সকাল ১০টা ৩০
ক্যাঁচ করে দরজা ঠেলে দময়ন্তী মুখার্জী কেবিন থেকে বেরিয়ে এলেন। শাক্যরা একটু তটস্থ হল। অপারেশন থিয়েটার থেকে ডাক্তার বেরিয়ে আসার পর রোগীর পরিবার-পরিজনের মুখচোখ যেমন হয়, পৃথ্বীশদার মুখটা অবিকল সেরকম দেখতে লাগছে। দময়ন্তী মুখার্জী কিন্তু দাঁড়ালেন না। ‘আপনারা দাঁড়িয়ে কেন? চেয়ার আছে তো। বসুন।’ বলে ব্যস্তসমস্ত হয়ে কোথায় চলে গেলেন।
পৃথ্বীশ ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘কী বুঝছিস?’
শাক্য বলল, ‘এখান থেকে কী বুঝব বলো তো!’
‘দেখি একটু জায়গা দিন!’ বলে একটা লোক মনজিনিসের কয়েকটা ফুড প্যাকেট নিয়ে পৃথ্বীশ আর রণকে পাশ কাটিয়ে অমিতাভ সান্যালের কেবিনে ঢুকে গেল।
শাক্য আড়চোখে দেখল, রণর চোখ চকচক করছে। বিপদের মধ্যেও শাক্যর বেদম হাসি পেয়ে গেল।
.
ভবানী ভবন, বেলা ১২টা
যোগাযোগ করার আধ ঘণ্টার মধ্যে প্রধাননগর থানার ওসি রিং ব্যাক করে জানালেন, সৌমিলিরা সত্যি কথা বলছে। হোটেলের সমস্ত কর্মচারীই বলছে, ওদের ঘর থেকে বেরোতে দেখা যায়নি প্রায়। ফলত দুজনকে ছেড়ে দেওয়া হল।
আর এক দফা চা-পানের পর অমিতাভ সান্যাল মাথা নেড়ে বললেন, ‘এটা কিন্তু ওদের ইনোসেন্সের যথেষ্ট প্রমাণ নয়। হ্যাঁ, কোনও প্রমাণ নেই বলে ওদের ধরে রাখার গ্রাউন্ডও নেই। কিন্তু সত্যিটা অনেকরকম হতে পারে।’
রাহুল বলল, ‘তা তো হতেই পারে। টাকা দিয়ে হোটেলের লোকেদের ম্যানিপুলেট করা সম্ভব। ওদের চোখে ফাঁকি দিয়ে অন্য কোনওভাবে বেরোনোও অসম্ভব নয়। এটা মজন্তালী সরকারের কেস। কিছুই অসম্ভব না।’
‘যাই হোক, এত নিখুঁত একটা ব্লু প্রিন্টে এত আলগা একটা মুভ থাকবে বলে মনে হয় না। সেজন্যই মেয়েদুটোর ওপর সন্দেহ হচ্ছে না।’
‘অতি চালাক যদি হয়?’ গালে হাত দিয়ে সুকান্ত-স্টাইলে বসল রাহুল।
‘ফেউ লাগিয়ে রাখলেই জানা যাবে।’ ঠোঁট ওল্টালেন অমিতাভ।
‘আরও ফেউ? এবার তো স্যার রাস্তায় বেরিয়ে ব়্যান্ডম পাঁচটা লোককে ধরলে তার মধ্যে একজন দেখা যাবে এই কেসের ফেউ।’
‘টাকা চাইলে ডিজি তো না করছেন না।’ অমিতাভ হাসলেন, ‘আর যে-টাকা অডিটের বাইরে, সেটা নিয়ে ভাবছ কেন?’
সুকুমার বলল, ‘ওরা সামনে এসে আমাদের জিজ্ঞাসাবাদ করলেই তো এই সমস্যায় পড়তে হত না। ব্যাপারটা গোপন করেই সন্দেহ বাড়াল।’
‘হয়তো ভেবেছিল সামনে গেলে আমরা কিছুই বলব না, এদিকে আড়ালটাও যাবে। সত্যি বলতে কী, খুনটা না-হলে আমরা কি প্যাসেঞ্জার লিস্ট চেক করতাম? খুনটা হয়ে আমাদের যেমন হিসেব ওলটপালট হয়ে গেছে, ওদেরও তো হয়েছে।’ বলে এদিক-ওদিক তাকালেন অমিতাভ, ‘আচ্ছা, দময়ন্তী কই গেল?’
.
রাজাবাজার সায়েন্স কলেজ, দুপুর ১টা ১০
সৌমিলিদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে শুনে কিছুটা চিন্তামুক্ত হয়েছে শালিনী। ভাইস চ্যান্সেলরের ঘরে কিছু জরুরি কাজে গেছিল। নিজের কেবিনে ফিরে এসে দেখল উপাসনা আচার্য বসে আছেন। হেসে বললেন, ‘তোমার ফোন কানেক্ট হচ্ছিল না। তোমাদের এক স্টাফ বললেন তুমি কলেজেই আছ। তাই অপেক্ষা করছিলাম।’
শালিনী বলল, ‘আরে, আমিও তো আপনাকে ফোন করার চেষ্টা করে যাচ্ছি গত কয়েকদিন ধরে। কোথায় ছিলেন? ফোন আনরিচেবল পাচ্ছিলাম।’
‘দিনকয়েকের জন্য বহরমপুর গেছিলাম। বাংলাদেশ বর্ডারে একটা কাজ ছিল। একটা পাচারের খবর পেয়েছিলাম।’
‘বলেন কী?’
‘হ্যাঁ। একটা বাচ্চা মেয়েকে বিহার থেকে নিয়ে এসে কেউ ঢাকায় বিক্রি করে দিয়েছিল। ওখান থেকে আরেকবার হাতবদল হয়ে বহরমপুরে। তাকেই রেস্কিউ করতে গেছিলাম।’
শালিনী চোখ বড় বড় করল, ‘করতে পারলেন?’
‘হ্যাঁ। অনেক কষ্টে,’ উপাসনা তৃপ্তির হাসি হাসলেন, ‘একটা মাংসের দোকানের চোরাকুঠুরিতে লুকিয়ে রেখেছিল মেয়েটাকে। আমাদের আরেকটু দেরি হলে বর্ডার পার করে দিত। ইসলামপুর থানার পুলিশ খুব সাহায্য করেছে।’
‘এ তো দুর্দান্ত রোমহর্ষক ব্যাপার! সত্যি, ইউ আর আ পাওয়ারহাউজ উপাসনাদি! আপনাকে যত দেখি অবাক হই!’
‘যতটা করা দরকার, সে তুলনায় কিছুই করতে পারছি না শালিনী! যা-ই হোক, শোনো, খুব তাড়ায় আছি। বেহালা যাব। যেটা বলতে এসেছি, টুক করে বলে বেরিয়ে যাই। তুমি কী জন্য ফোন করছিলে সেটা শুনে নিই আগে।’
‘চা-কফি কিছু বলি?’
‘না না। সত্যি তাড়া আছে ভাই। তুমি তোমার কথাটা বলো।’
‘জেন্ডার ভায়োলেন্সের শিকার হওয়া মেয়েদের নিয়ে লাইভ নিউজে একটা নতুন শো শুরু করছি, বলছিলাম না? তো আমি ফোন করছিলাম যে আপনাদের হোম থেকে দুজনকে যদি বেছে দেন, যারা ইন্টারভিউ দিতে পারবে।’
‘সানন্দে। নো প্রবলেম। এবার আমার অনুরোধটা শোনো। এটাও হোম নিয়েই। হোমের বাচ্চাদের একটা সাইকোলজিকাল প্রোফাইলিং করানোর পরিকল্পনা করছিলাম। টাকার অভাবে আটকে ছিল। একটা এনজিও-কে অনেক বলেকয়ে কিছু ফান্ড জোগাড় করতে পেরেছি। তুমি কাজটা করবে?’
‘আবার টাকাপয়সার কথা আসছে কেন? এটুকু আমি এমনিই করে দেব।’
‘না না।’ প্রবল বেগে মাথা নাড়লেন উপাসনা, ‘ফ্রি-তে কাজ করানো আমার একেবারেই পছন্দ না। সম্মানদক্ষিণা ছাড়া আমি কাজ করি না, করাইও না। ফ্রি সার্ভিসে একটা দয়া করার মেন্টালিটি চলে আসবেই। ইউ কান্ট হেল্প দ্যাট। যেখানে জানবে তুমি দয়াদাক্ষিণ্য করছ, সেখানেই প্রাথমিক আবেগ কেটে গেলে একটা গয়ংগচ্ছ ভাব আসতে বাধ্য। তুমি চাইলে বরং হোমের ফান্ডে তোমার সুবিধামতো কিছু ডোনেট কোরো। কিন্তু কাজটা টাকা নিয়েই করো। প্লিজ।’
‘বেশ, আপনি জোর করছেন যখন, টাকা নিয়েই করব।’
‘থ্যাঙ্ক ইউ। আরেকটা কথা। কাল সন্ধেবেলা একবার আমার বাড়ি আসবে? কিছু বন্ধু আসবেন। নতুন কিছু কাজের কথা হবে।’
‘কাল আমার একটা শুটিং আছে। পাঁচটার মধ্যে গুটিয়ে যাবে আশা করি। তার পরে যাওয়াই যায়।’
‘শুটিং। বলো কী? সিনেমায় নামছ নাকি?’
‘আরে না না! লাইভ নিউজের শো-টার প্রথম এপিসোড শুট করা হবে। লীনা দাশগুপ্তের সঙ্গে।’
‘খুব ভালো। ওটা শেষ হলেই এসো তবে। আমরা সাড়ে ছ’টা থেকে বসব। অন্তত দু-ঘণ্টা তো বসবই। তুমি শুটিং সেরে ধীরেসুস্থে এসো।’
‘ডান। আপনি লোকেশনটা মেসেজ করে রাখবেন।’
‘বেশ। আজ আসি তাহলে? কাল দেখা হচ্ছে।’ হাতব্যাগটা তুলে নিয়ে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেলেন উপাসনা।
আন্দোলিত পর্দার দিকে তাকিয়ে ঠিক সেই মুহূর্তে চকিত বিদ্যুৎরেখার মতো শালিনীর মনে পড়ে গেল শিলিগুড়ির দুটো খুনের কথা।
ঠিক এই দু-দিনই তো উপাসনা আউট অব রিচ ছিলেন। কো-ইন্সিডেন্স?
.
ভবানী ভবন, ক্যান্টিন, বিকেল ৫টা
দময়ন্তী অফিস ক্যান্টিনে খুব একটা খেতে আসে না। আজ এল নিতান্ত বাধ্য হয়েই। কাজের চোটে লাঞ্চ স্কিপ হয়ে গেছে। ছুঁচোরা পেটে ভলিবল খেলছে। ব্রেড অমলেট খেতে খেতে ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিন দেখে ভুরু কুঁচকে গেল দময়ন্তীর। চয়নিকা রাউত। লিলুয়া হোমের সুপার। কী ব্যাপার?
‘বলুন চয়নিকা ম্যাডাম।’
‘ম্যাডাম, এই যে নতুন মেয়েটার ছবি আপনারা ছেড়েছেন, এই মেয়েটিই কি মজন্তালী?’
‘আমরা সেরকমই সন্দেহ করছি। কেন বলুন তো?’
‘এই মেয়েটা আমাদের হোমের মেয়ে।’
দময়ন্তী হিপনিক জার্কের মতো ঝটকা খেয়ে সোজা হল, ‘আপনাদের হোমের মেয়ে?’
‘হ্যাঁ। বছরদুয়েক আগে রিলিজ পেয়েছে। মামণি হেমব্রম।’
প্রতিবারই দময়ন্তী ভাবছে এর চেয়ে বেশি অবাক বোধহয় হওয়া যায় না। আর পরের ঘটনাতেই সেই রেকর্ড ভেঙে যাচ্ছে। উত্তেজনা চেপে বলল, ‘মেয়েটি কি সেই সময় থেকেই বোবা?’
‘হ্যাঁ। শুনেছিলাম ছোটবেলায় ওকে রেপ করার পর জিভ কেটে নেওয়া হয়েছিল, যাতে লোকটার নাম না বলতে পারে।’
দময়ন্তী উত্তেজিত কণ্ঠে বলল, ‘চয়নিকা ম্যাডাম, আপনি প্লিজ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মেয়েটার ফাইল স্ক্যান করে পাঠিয়ে দিন। আর আপনাকে কালই একবার ভবানী ভবন আসতে হবে।’
.
রানিকুঠি, সন্ধে ৬টা ৩০
পৃথ্বীশদা আজ স্বাভাবিক কারণেই ছুটি দিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু সৌমিলিরা বাড়ি ফেরেনি। ট্যাক্সি চড়ে ইতিউতি ঘুরেছে, খাওয়াদাওয়া করেছে, ধর্মতলার নিউ এম্পায়ার সিনেমা হলে গিয়ে একটা হিন্দি ছবি দেখেছে, তারপর সৌমিলি জোরজার করে শিরিনকে ধরে এনেছে নিজের বাড়িতে।
বাড়ি ঢুকে সৌমিলি মা-কে বলল, ‘শিরিনকে নিয়ে চলে এলাম। আজ একসঙ্গে থাকব। আড্ডা মারব। বিরিয়ানি খাব।’
‘খুব ভালো করেছিস,’ বলে হাসিমুখে শিরিনের দিকে তাকালেন মা, ‘তোমার কথা অনেক শুনেছি।’
শিরিন মাথা ঝুঁকিয়ে বলল, ‘আমিও কিন্তু আপনার স্পেশাল আইস টি-র কথা অনেক শুনেছি কাকিমা। সেটা কি আজ পাওয়া যাবে?’
‘নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে। তোমরা ফ্রেশ হও। আমি দিচ্ছি।’
সৌমিলির বাবা পাশের ঘরে টিভি দেখছিলেন। ওদের সাড়া পেয়ে উঠে এলেন, ‘হ্যাঁ রে, কেমন হল তোদের ট্যুর?’
সৌমিলি আর শিরিন চোখাচোখি করল। দুজনের মুখেই ঠোঁট-টেপা হাসি। বাড়িতে ওরা আসল কথাটা জানায়নি। বলেছিল ঝাড়গ্রামের একটা আদিবাসী উৎসব কভার করতে যাচ্ছে। শিরিন বলল, ‘ট্যুর দুর্দান্ত হল কাকু! কাজও হল।’
‘খুব ভালো, খুব ভালো। চলে আসবে মাঝে মাঝে। আমরা কিন্তু খুব লিবারাল লোক।’
শিরিন হেসে ফেলতে গিয়ে সামলে নিল কোনওমতে। বলল, ‘নিশ্চয়ই কাকু।’
সৌমিলি দাঁত চেপে মোলায়েম গলায় বলল, ‘বাবা! আমরা ক্লান্ত! এখন ঘরে যাচ্ছি। ডিনারের সময় গল্প করব।’
ঘরে এসে দরজা বন্ধ করে সৌমিলি রাগে গরগর করে উঠল, ‘মিনিমাম ম্যানার্স শেখানো গেল না লোকটাকে!’
শিরিন বলল, ‘চটে যাচ্ছিস কেন? উনি সরল মনে বলেছেন। তুই তো ভাগ্যবান রে। ধর্ম নিয়ে ইনহিবিশন নেই, এমন বাড়ি এদেশে সত্যিই দুর্লভ।’
সৌমিলি ফোনের মেসেজ চেক করতে করতে চোখ মটকাল। তারপর তিন নম্বর মেসেজে চোখ পড়তেই বিরক্তির সুরে বলল, ‘উফফ! দ্যাখ! শাক্য এখন বলছে আজকের রিপোর্টটা চেক করে দিতে।’
‘এখন?’ শিরিনও বিরক্ত হল, ‘একটা দিনও শান্তিতে থাকতে দেবে না তোকে।’
দু-হাতে মাথা চেপে ধরে খাটে বসে পড়ল সৌমিলি, ‘আমার আর মাথা চলছে না ভাই।’
‘তোর লেখার হাত আমার বা শাক্যর চেয়ে ঢের বেটার, সেটা প্রমাণ হয়ে গেছে। সব তো ঘাড়ে এসে চাপবেই। তোকে না দেখিয়ে কপি ছাড়তে ভরসা পাবে কী করে?’
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ল্যাপটপের ব্যাগটা টেনে নিল সৌমিলি, ‘সেইজন্যই মাঝে মাঝে ভাবছি প্রিন্টে শিফট করব কিনা।’
শিরিন চমকাল, ‘সিরিয়াসলি?’
‘সিরিয়াসলি। তোকেই প্রথম জানালাম।’
‘কী বলছিস! প্রিন্ট মিডিয়া ইজ ডায়িং! ’
‘না, এখানে অবস্থা অতটাও খারাপ না। আমার ধারণা প্রিন্ট এদেশে সারভাইভ করে যাবে ঠিক। তাছাড়া আমি চ্যানেলের কাজ খুব একটা এনজয় করছি না।’
শিরিন একটু গুম হয়ে রইল। তারপর খাটের কোণে বসে বলল, ‘শাক্য কী বলছে?’
‘শাক্যকে বলিনি এখনও।’
‘সে কী! শাক্যকেই বলিসনি?’
সৌমিলি ভুরু কুঁচকে তাকাল, ‘মানে?’
‘এত অবাক হচ্ছিস কেন?’ শিরিন দাঁত বের করল, ‘অনেকেই বুঝতে পারছে। রণর মতো আকাটও সেদিন বলল।’
‘কী বলল?’
‘সন্টুমনা!’ হাত বাড়িয়ে সৌমিলির গাল টিপে দিল শিরিন, ‘অন্যের মুখে শুনলে মনে বুঝি বেশি সুড়সুড়ি লাগে?’
সৌমিলি অপ্রস্তুত ভাবটা চাপা দেবার চেষ্টা করল, ‘হ্যাট! ওরকম কিছু না।’
‘জানি। তোরা খুব ভালো বন্ধু। তাই তো?’ মুখ ভেঙাল শিরিন, ‘শোন ইডিয়ট, একে অন্যকে পছন্দ করা দুটো মানুষ যখন কাছাকাছি থাকে, তাদের মধ্যে একটা বিশেষ বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বিনিময় হয়। ওটা লুকোনো যায় না।’
‘এটা তো শীর্ষেন্দুর থেকে ঝাড়লি! পার্থিব!’
‘হ্যাঁ। বই কি তুই একাই পড়িস নাকি? আমার লাইব্রেরিও নেহাত ছোট না।’
সৌমিলি এতক্ষণে পাল্টা দেবার সুযোগ পেয়ে লুফে নিল, ‘তুই কোনওদিন তোর বাড়ি নিয়েই গেলি না, কী করে জানব!’
শিরিন চুপ করে গেল। বিষণ্ণ হয়ে এল তার চোখ, ‘আমার বাড়ির পরিবেশ তো তোদের বাড়ির মতো না। তোকে তো বলেছি সব। নিয়ে যাওয়া গেলে কি নিয়ে যেতাম না?’
সৌমিলি শিরিনকে জড়িয়ে ধরল। আর্দ্র গলায় বলল, ‘সব ঠিক হয়ে যাবে দেখবি।’
শিরিনের গলাও দ্রব হয়ে এল, ‘তুই চলে যাবি ভাবতে ভালো লাগছে না।’
‘আরে এখনই যাচ্ছি নাকি? নতুন প্রোগ্রামটার ঝামেলা নিয়ে ফেলেছি, সেটার তিরিশটা এপিসোড তো নামিয়ে যেতে হবে। তাছাড়া মজন্তালীর কেস কভার করার দায়িত্ব পেয়েছি। এমন এক্সাইটিং অ্যাসাইনমেন্ট ছেড়ে মাঝপথে চলে যাওয়া যায় নাকি? মজন্তালীর কেস যতদিন চলছে, আমি পুরোটাই আছি।’
‘তাহলে আয়,’ বলে হাত বাড়িয়ে নিজের পিঠব্যাগটা টেনে নিয়ে ভিতর থেকে ওল্ড মঙ্কের একটা মাঝারি বোতল বের করল শিরিন, ‘মজন্তালীর, থুড়ি, মজন্তালীদের স্বাস্থ্যপান করি। যাতে তোর চাকরি ছাড়া অনেকটা পিছিয়ে যায়।’
‘আরিব্বাস!’ সৌমিলির চোখ চকচক করে উঠল, ‘কখন তুললি?’
‘তুই যখন মলে বাথরুমে গেলি। ওই মলের নিচেই তো লিকার শপ। থামস আপও তুলেছি।’
‘কিন্তু গ্লাস কী করে আনি?’
‘প্লাস্টিক আবিষ্কার হয়েছিল কীসের জন্য?’ বলে ব্যাগের ছোট পকেট থেকে খানকয়েক প্লাস্টিক-গ্লাস বের করল শিরিন। বলল, ‘ল্যাপটপ খুলেই বসলি যখন, রাইট আপটা আগে সেরে নে। বুড়ো সাধু পালাচ্ছে না।’
‘না ভাই। গত কয়েক ঘণ্টায় অনেক হ্যাপা গেছে। বোতল দেখেই ফেলেছি যখন, একটু পেটে না পড়লে কাজে মন দিতে পারব না। প্লিজ ঢাল। আমায় জল কম, থামস আপ বেশি।’
‘শাক্য খুব ভালো ছেলে।’ পেগ বানাতে বানাতে একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করল শিরিন, ‘তুই ভাগ্যবান সৌমিলি। তুই যাকে ভালোবাসিস, সে-ও তোকে ভালোবাসে।’
সৌমিলি ঝট করে তাকাল, ‘কী ব্যাপার বল তো?’
শিরিনের দুর্ভেদ্য ডিফেন্সে আজ ফাঁক দেখা দিয়েছে। কিন্তু এইসব ক্ষেত্রে ড্যামেজ সামাল দিতে সে অন্যদিন যেমন ব্যস্ত হয়, আজ একেবারেই তা হচ্ছে না। মৃদু হেসে বলল, ‘কিছু না।’
সৌমিলি কপট রাগের ভঙ্গিতে বলল, ‘তুই তো কিছুই শেয়ার করিস না। নিজের মধ্যে গুমরে মরিস। আদৌ বন্ধু বলে মনে করিস আমায়?’
‘এরকম করে বলিস না।’
‘তাহলে বল কী ব্যাপার।’
‘বলব,’ সৌমিলির হাতে গ্লাস তুলে দিল শিরিন, ‘আজ জোর করিস না। তাড়াতাড়িই বলব। প্রমিস।’
.
ভবানী ভবন, রাত ৯টা
‘মামণি হেমব্রম। পূর্ব মেদিনীপুরের সুতাহাটায় বাড়ি। অনেকগুলো চুরির কেসে জুভেনাইল অপরাধী হিসেবে হোমে পাঠানো হয়েছিল। দু-বছর আগে ছাড়া পেয়েছে। বাকিটা খুঁজে বের করতে হবে। ফাইলটা তোমায় ফরওয়ার্ড করছি।’
লোকনাথ বুট ঠুকে বেরিয়ে গেল।
অমিতাভ সিগারেট ধরিয়ে দময়ন্তীকে বললেন, ‘তাহলে যতটা নিরীহ একে ভাবা হচ্ছিল ততটা না। দময়ন্তী, আমার মনে হয় মেয়েটির ডাক্তারি পরীক্ষা হয়ে গেলে আমরা চার্জশিট ফাইল করার কথা ভাবতেই পারি।’
দময়ন্তী বলল, ‘তা ঠিক। কিন্তু এ যদি মজন্তালীদের কেউ হত, এত সহজে একে স্কেপগোট করে দিত কি? আমার ধারণা, এ মেয়েটি পাতি লেগম্যান। এটা আউটসোর্সিং।’
অমিতাভ নিটোল গোল দুটো রিং ছেড়ে বললেন, ‘খুব সহজে স্কেপগোট করেছে এটা ভাবছ কেন? শিলিগুড়িতে ঘটনাবলি যেরকম স্পিড নিয়েছিল তাতে খুব গুরুত্বপূর্ণ কাউকে বাঁচাতে হয়তো এই মেয়েটাকে স্কেপগোট করা ছাড়া উপায় ছিল না ওদের কাছে। ভুলে যেও না, মজন্তালী ওখানে তোমাদের হাত থেকে আক্ষরিক অর্থেই এক চুলের জন্য বেঁচে গেছে।’
দময়ন্তী ঠোঁট কামড়াল। এটা খুবই সম্ভব। হয়তো সত্যিই নিতান্ত নিরুপায় হয়ে মেয়েটিকে স্যাক্রিফাইস করতে হয়েছে। বড় ঘুঁটি বাঁচানোর জন্য বোড়ে স্যাক্রিফাইস করতেই হয়। বহু-বিতর্কিত ট্রলি প্রবলেমের সবচেয়ে ব্যবহারিক সমাধান।
অমিতাভ বললেন, ‘যা-ই হোক, আমাদের জন্য এটা একটা বিরাট সাফল্য। কাল প্রবীরবাবুর সঙ্গে একবার কথা বলব। তারপর প্রেস রিলিজের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেব।’
দময়ন্তী ঘাড় নেড়ে সায় দিল, ‘লিলুয়া হোমের সুপার চয়নিকা রাউত কাল সকালে আসছেন। প্রেস রিলিজের আগে আরও কিছু ইনফো পেয়ে যাব আশা করছি।’
‘হুমম। বারবার ওই হোমের নাম উঠে আসছে কেন সেটাও একটা প্রশ্ন।’
‘সেটা অবশ্যই একটা বড় প্রশ্ন,’ বলে তানিয়ার দিকে ফিরল দময়ন্তী, ‘আমাদের হিরোইনের খবর কী রে?’
তানিয়া ডেস্কটপ থেকে মুখ তুলে বলল, ‘পরশু বেরিয়েছিলেন নৈশ অভিযানে। আবারও চা-বিস্কুট খেয়ে ফেরত এসেছেন।’
দময়ন্তী কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর ফোন বের করে কাকে যেন ফোন করল, ‘সম্পূর্ণা মিত্রের মায়ের সাইকিয়াট্রিস্টের খোঁজ নিতে বলেছিলাম। কী হল সেটা?’
.
