পঞ্চম দিন
তারিখ : ৬ আগস্ট, ২০১৩
বনহুগলী, সকাল ৯টা ০৫
তানিয়ার নতুন চাকরি। বাড়ির কেউই এখনও মনে রাখতে পারে না যে সে একজন সিআইডি অফিসার। বাচ্চা মেয়ের মতো ব্যবহার করে। তাতে অবশ্য তানিয়ার মজাই লাগে। তার বাড়ির মানুষগুলো ভারি মজার।
তানিয়ার বাবা তন্ময়বাবু সাহেবি কেতার মানুষ। জেদাজেদি করে বাড়িতে ইংলিশ ব্রেকফাস্ট চালু করেছেন। কলকাতার শীতে ওভারকোট পরে রাস্তায় বেরিয়ে একদিন ঘামতে ঘামতে অজ্ঞান হয়ে গেছিলেন, তা-ও তার সাহেবিয়ানা যায় না। ইংরেজরা এখনও এদেশে থেকে গেলেই বোধহয় তিনি খুশি হতেন।
অন্যদিকে কাকা সন্ময় অকৃতদার, নিরামিষভোজী এবং ধর্মপ্রাণ। প্রবল গুরুবাদী। দশ আঙুল মিলিয়ে চোদ্দটা আংটি। দু-হাতের কবজি থেকে কনুই অবধি অঞ্চল পুরোটাই তাগা-তাবিজে ঢাকা। মাসে একবার কাকা সমস্ত তাবিজ খুলে স্নানে যান। সেই সময় তানিয়া দেখেছে জায়গাটা ফ্যাটফ্যাটে সাদা। যে-কোনও দিন দাদ-হাজা হয়ে যাবে। তা বললে কে শোনে!
সবচেয়ে বড় কথা দুই ভাই পরস্পরের যুযুধান প্রতিপক্ষ। পৃথিবীর কোনও বিষয়েই তাঁরা কোনওদিন একমত হতে পারেন না। আজও খোশগল্প শুরু হতে না হতেই যথারীতি তর্কে পৌঁছে গেল বিষয়টা। অবশ্য আজকাল তর্কের বিষয় বলতে একটাই। মজন্তালী সরকার। কাকার বিশ্বাস, মজন্তালী সরকার আসলে কল্কি অবতার। কলিযুগ শেষের মুখে, তাই সে এসেছে। কাকার গুরুদেব নাকি তাই বলেছেন।
তন্ময়বাবু রুটিতে মাখন লাগাতে লাগাতে বললেন, ‘ওইজন্যই বলি, একটু মাছ মাংস খা! খাদ্যাভ্যাস এক হলে তৃণভোজীদের সঙ্গে বুদ্ধিতেও খুব একটা তফাত থাকে না!’
‘শাস্ত্র নিয়ে ইয়ার্কি মেরো না,’ সন্ময় উত্তপ্ত হলেন, ‘এই মেয়ের চেহারায় যাবতীয় সুলক্ষণ আছে।’
তানিয়া হাসি চেপে বলল, ‘কাকা, কল্কি অবতারের জেন্ডার বিষয়ে শাস্ত্রে কিছু বলা ছিল না? ইনি তো দেখা যাচ্ছে মহিলা!’
‘শাস্ত্র-পুরাণ না জেনে কেন কথা বলিস? ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে বলা আছে কল্কি নারীও হতে পারেন। আর তাছাড়া মহিলাদের ওপর এরকম নির্যাতনের যুগে তো মহিলা-অবতারই আসবে! এতে অবাক হবার কী আছে?’
‘উফফ! কাকা! আমাদের মিটিংয়ে তুমি যদি একটিবার বলে দিতে যে এসব মানুষের কাজ না, আমাদের কত কাজ বেঁচে যেত বলো তো!’
‘ঠাট্টা করছিস কর,’ সন্ময় থমথমে মুখে বললেন, ‘পরে যখন আমার কথা মিলবে তখন বুঝবি।’
‘তবে আমি বাপু ওইরকম সাজগোজের মানে বুঝতে পারছি না!’ তপতী বললেন, ‘চেনা না দিতে চাইলে শুধু মুখ ঢাক! ওরকম কালোকুলো পোশাক পরার মানে কী? ওতে মোটেই ভগবানের অবতার বলে মনে হয় না ঠাকুরপো! মনে হয় শয়তানের অবতার!’
‘ভুল বুঝছ। ওকে তোমরা ভুল বুঝছ সবাই। মা কালীর বেশভূষাও কিন্তু ভীতিপ্রদ।’ সন্ময় বললেন।
‘মজন্তালী নামটা তো উপেন্দ্রকিশোর থেকে নেওয়া,’ একদা সাহিত্যের ছাত্রী তপতী খুশির গলায় বললেন, ‘তার মানে মেয়েটা সাহিত্য ভালোবাসে বল?’
‘হতেই পারে। ব্যাটম্যানের কমিকসে ক্যাটওম্যান বলে একটা অ্যান্টিহিরোইন ক্যারেক্টার আছে। মেইনলি ওটা থেকে ইন্সপায়ারড। কাগজে অ্যাড দেবার ব্যাপারটাও নাকি আগাথা ক্রিস্টির কোন একটা গল্পে ছিল! উপেন্দ্রকিশোর থেকে আগাথা ক্রিস্টি, ক্যাটওম্যান থেকে দস্যু মোহন, কালো ভ্রমর—সব এক দেহে হল লীন! এ-ক্যাট শুধু ক্যাট নয়! কপিক্যাট! বুঝলে?’
ছোটবেলার চরিত্রদের নাম শুনে তপতী এত উত্তেজিত হয়ে পড়লেন যে তানিয়ার দারুণ পানিংটা মিস করে গেলেন, ‘ওহোহো তুন্না! কী মনে করিয়ে দিলি! দস্যু মোহন! কালো ভ্রমর! উফফ! কী থ্রিলিং সব গপ্পো! চৈতন্য পাঠাগার থেকে এনে পড়তাম! আহা রে! কী সব দিন! তবে সে কথা যদি বলিস, তাহলে তো আমাদের রঘু ডাকাত, বিশে ডাকাতের কথাই আগে ধরতে হয়। চিঠিচাপাটি দিয়ে ডাকাতি করতে আসত! নাঃ! মজন্তালী দেখছি নস্টালজিক করে দিল!’
তন্ময় অবাক হয়ে তপতীকে দেখছিলেন, ‘তুমি এত খুশি হচ্ছ কেন বলো তো? আফটার অল শি ইজ আ ক্রিমিনাল! তোমার মেয়ে দিনে পনেরো-ষোল ঘণ্টা ডিউটি করছে ওকে ধরার জন্যই।’
‘চুপ করো তো!’ মুখ ঝামটা দিলেন তপতী, ‘বুকে হাত রেখে বলো দেখি মেয়েটা ভুল কাজ করছে! তুন্না বলুক!’
মায়ের কথাটা আচমকা হাওয়া কেটে এসে তিরের মতো গেঁথে গেল তানিয়ার মাথার মধ্যে। একটু আনমনা হয়ে গেল সে। মজন্তালী সরকার কি অপরাধী? এই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়ানোর ক্ষমতা তানিয়ার নেই।
মজন্তালী যদি কথা রাখে, আজ আরও একটা ঘটনা ঘটবে। বিউটি স্পট ফ্যাশন ম্যাগাজিনের অফিসে আজ সে আগুন লাগিয়ে দেবে বলেছে। লোকাল থানা থেকে সিকিউরিটির ব্যবস্থা করা হয়েছে। লোকনাথদা নিজেও হয়তো থাকবে। মজন্তালী সরকার কি কথা রাখতে পারবে? হুটহাট খুন করে দেওয়া, আর আগে থেকে বলে রেখে সেই কাজ এক্সিকিউট করা, দুটোর মধ্যে অনেক তফাত।
আজই বোঝা যাবে, পেপারের ওই অ্যাডটাকে কতটা সিরিয়াসলি নেওয়া উচিত। আজই বোঝা যাবে, মজন্তালী সরকার টুনিবালব নাকি সন্ধ্যাতারা। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা হচ্ছে, তানিয়া কি নিরপেক্ষ তদন্ত করতে পারছে? ওদের মধ্যে কেউই কি পারছে?
কাশীপুর, সকাল ১০টা ৪০
‘হাইড অ্যান্ড সিক বিস্কিট আছে?’
মুখ তুলে তাকিয়েই দোকানীর চোখ স্থির হয়ে গেল।
দৃষ্টিটা অগ্রাহ্য করে লীনা গোটা গোটা উচ্চারণে আবার বলল, ‘হাইড অ্যান্ড সিক বিস্কিট আছে?’
‘আছে।’ বলে দোকানী ডানদিকের তাকে হাত চালাল। আরেকজন খদ্দের দাঁড়িয়েছিলেন। তারও চোখ আটকে গেছে লীনার মুখে।
‘কত?’
‘পঁচিশ।’
লীনা টাকা দিয়ে বিস্কুটটা হাতে নিয়ে দেখল খদ্দের ভদ্রলোক একইভাবে তাকিয়ে আছেন। মুচকি হেসে লীনা বলল, ‘কিছু বলবেন?’
‘না, না। কিছু না।’ অপ্রস্তুত হয়ে লোকটা তাড়াতাড়ি নেমে পড়ল রাস্তায়। লীনা দোকানীর দিকে তাকাল। সে-ও চোখ নামিয়ে কী একটা খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।
হাসিটা মুখে ধরে রেখেই পিছন ফিরল লীনা। প্রথম রাউন্ড দুর্দান্ত চলছে। বাড়ির বাইরে বেরোনো থেকে অজস্র চোখ ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে। জাপানি কোনও চিত্রশিল্পীর আঁকা একটা ছবি দেখেছিল লীনা। এঁটুলির মতো গায়ে লেগে থাকা রাশি রাশি চোখকে ঝেঁটিয়ে ফেলে দিচ্ছে একটি মেয়ে। লীনা এখন সেই মেয়েটা। এ-যেন নতুন জন্ম। নতুন চোখ। কোনওকিছুই আর আগের মতো নেই। লীনা দাশগুপ্তকে যেন কেউ নতুন ইটের মতো আগুনে পুড়িয়ে রাঙা গনগনে করে বের করে এনেছে। আগুনের কথাতে মনে পড়ল, মজন্তালী আজ একটা ফ্যাশন ম্যাগাজিনের অফিসে আগুন লাগিয়ে দেবে। অনেকেই হুমকিটাকে সিরিয়াসলি নিচ্ছে না। আজ নিতে বাধ্য হবে। দুপুরে আজ একটু তাড়াতাড়ি খেয়ে টিভি চালিয়ে বসে যেতে হবে।
একটু এগিয়ে লীনা দিশারীকে দেখতে পেল। মোবাইল রিচার্জের দোকানে দাঁড়িয়ে আছে। সঙ্গে বোধহয় ওর মা। দিশারী তার টিউশনের বন্ধু। সেরকম ঘনিষ্ঠ নয়। কিন্তু কাছাকাছি থাকার কারণে মাঝেসাঝেই দেখাসাক্ষাৎ হয়। লীনা এগিয়ে গেল, ‘কী রে!’
দিশারী ফিরে তাকিয়েই কেমন অপ্রতিভ হয়ে গেল, ‘তুই!’
‘কেমন আছিস? কতদিন পর দেখা হল।’
দিশারী ফ্যাকাসে হাসল, ‘ভালো আছি।’
দিশারীর চোখে আট আনা অস্বস্তির সঙ্গে চার আনা করুণা আর চার আনা বিস্ময়। লীনার হাসি পেল। বেশ মজা লাগছে দিশারীকে দেখে। বেচারি কী বলবে ভেবেই পাচ্ছে না। ঘেমে উঠছে। হাসিমুখে লীনা বলল, ‘কাকিমার সঙ্গে আলাপ করাবি না?’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ,’ দিশারী তড়বড়িয়ে উঠে ওর মাকে বলল, ‘মা, এই যে, লীনা।’
দিশারীর মায়ের হাসি আরও ফ্যাকাসে। ‘ও! ভালো আছ তো?’ বলে উত্তরের অপেক্ষা না করেই দিশারীকে কনুই দিয়ে এক ঠেলা দিয়ে বলল, ‘চল তাহলে। তোর গানের ক্লাসে দেরি হয়ে যাবে তো।’
দিশারীও যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। চলো। আসি রে।’
দুজনে লম্বা লম্বা পা ফেলে চলে গেল।
লীনা ওদের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। পেট গুড়গুড়িয়ে হাসি উঠে আসছে। লজ্জা যাদের পাবার কথা, তারাই পাবে। চোখে চোখ রাখতে পারলেই হল। ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনাটুকু ঝেড়ে ফেলে লীনা নুড়ো জ্বেলে দিতে শিখে গেছে। আগামীকাল দোল নয় মোটেই, কিন্তু আজ তার একান্ত ব্যক্তিগত ন্যাড়াপোড়া।
হোয়াট ডাজ নট কিল ইউ, মেকস ইউ স্ট্রঙ্গার।
.
হিন্দুস্থান পার্ক, দুপুর ১২টা ৪৫
‘দুটো গোল্ড ফ্লেক। কিং।’
বয়স্ক দোকানী মুখ তুলে ভালো করে একটু মেপে নিল। কলিযুগের মেয়ে। কে কী বলবে এদের।
‘থ্যাঙ্ক ইউ। আর একটা দেশলাই দেবেন।’
‘এই ন্যান। একুশ ট্যাকা।’
‘এই যে। আচ্ছা, বিউটি স্পট ম্যাগাজিনের অফিসটা কোনদিকে বলতে পারবেন?’
.
বালিগঞ্জ, লাইভ নিউজের অফিস, বেলা ২টো ২০
পৃথ্বীশদা বলে দিয়েছে, চ্যানেলের স্টান্স প্রো-মজন্তালীই থাকবে। কারণ জনমত সেদিকে। তবে বক্তব্যে একটা ব্যালেন্স রাখা দরকার। শাক্য, সৌমিলি আর শিরিন মজন্তালীর সব ঘটনা কভার করার স্পেশাল দায়িত্ব পেয়েছে। তিনজনেই মহা খুশি। শাক্য কপি লিখছিল। শিরিন আর সৌমিলি ডেস্কে বসেই কফি খেতে খেতে গল্প করছিল। লীনা মজন্তালী হবার কতটা সম্ভাবনা, তাই নিয়ে দুজনে একমত হতে পারছিল না।
সৌমিলি বলল, ‘এভরিওয়ান হ্যাজ আ ব্রেকিং পয়েন্ট শিরিন। কোন পরিস্থিতিতে পৌঁছে একটা মানুষ পেগলে যাবে, ইউ নেভার নো। এবং আমি বিশ্বাস করি না যে পেগলে যাবার জন্য সবসময় কোনও ব্যক্তিগত ধাক্কা দরকার। ব্যক্তিগত ইতিহাসের ভিত্তিতে একজনকে চেজ করাটা কতটা যুক্তিযুক্ত আমি জানি না।’
‘ব্যতিক্রম থাকতেই পারে। কিন্তু ব্যক্তিগত ইতিহাসটা একটা বিরাট ফ্যাক্টর, সেটা তো অস্বীকার করা যায় না। এইসব খুনে নিরানব্বই শতাংশ ক্ষেত্রে মোটিভ হয় রিভেঞ্জ।’
‘লীনা ইজ টু অবভিয়াস। একটা কলেজপড়ুয়া মেয়ের পক্ষে এত ফুলপ্রুফ প্ল্যানিং সম্ভব না।’
‘লীনাই মজন্তালী এমন তো বলছি না। অন্য কেউও হতে পারে। কিন্তু যে-ই হোক তার ব্যক্তিগত ইতিহাস থাকতেই হবে। ব্যক্তিগত ইতিহাস ছাড়া মজন্তালী সরকার সম্ভব না। কিছু মনে করিস না, তুই বা আমি কি এত বড় একটা কাণ্ড ঘটানোর আর্জ অনুভব করব?’
সৌমিলি উত্তর দেবার আগেই ডেস্কের দিক থেকে একটা উত্তেজিত কণ্ঠ শোনা গেল, ‘এই যে টিম মজন্তালী!’
সৌমিলিরা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, অমৃতা। দু-আঙুলে গুলি করার মুদ্রা দেখিয়ে অমৃতা বলল, ‘অ্যাকশন!’
শিরিন জিগ্যেস করল, ‘কী হয়েছে?’
‘বিউটি স্পট ম্যাগাজিনের অফিসে আগুন লেগেছে।’
.
হিন্দুস্থান পার্ক, বেলা ২ টো ৪০
চারটে দমকল গাড়ি মিনিট কুড়ির চেষ্টায় আগুনকে বাগে আনতে পেরেছে। আগুন অবশ্য এখনও পুরোপুরি নেভেনি। এদিক ওদিক থেকে লাফিয়ে উঠছে হলুদ জিভ।
বিউটি স্পট কর্তৃপক্ষ উড়ো ফোনটাকে খুব বেশি গুরুত্ব দেননি, আবার একেবারে অবহেলাও করেননি। কর্মীদের মধ্যে অবশ্য চাঞ্চল্য ছিল শুরু থেকেই। লোকাল থানায় বলে পুলিশ পোস্টিং রাখা হয়েছিল। সবাইকে তল্লাশি করে ঢোকানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তার মধ্যেই মজন্তালী সরকার নিজের কথা রেখেছে।
হুমকির খবরটা চাপা দেওয়ার চেষ্টা করেও খুব লাভ হয়নি বলে অফিস কর্তৃপক্ষ হাজিরা বাধ্যতামূলক করে দিয়েছিলেন। সুতরাং লোকজন এলেও সকাল থেকে কাজকর্ম কিছুই হয়নি। সবাই কার্যত ‘রেডি স্টেডি অন ইয়োর মার্ক’ হয়েই ছিল এবং অনেকেই নানা অছিলায় মেন ডোরের কাছে ঘুরঘুর করছিল। ঠিক ১টা নাগাদ ফায়ার অ্যালার্ম বাজতে শুরু করে এবং মুহূর্তের মধ্যে অফিস ফাঁকা হয়ে যায়।
পুলিশ ব্যারিকেডের সামনে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন অমিতাভ। সঙ্গে দময়ন্তী, রাহুল, তানিয়া, লোকনাথ, সুকুমার, ম্যাগাজিনের সম্পাদক এবং গার্ড। অফিসকর্মীদের কাউকে ছাড়া হয়নি। সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। স্থানীয় থানার ইন-চার্জ খুব হাত-টাত নেড়ে অমিতাভকে বোঝাচ্ছিলেন, কীভাবে নিউজপ্রিন্ট রাখার ঘর থেকে আগুন লেগেছে।
রাহুল বলল, ‘ইথানল বা মিথানল জাতীয় কিছু ব্যবহার করা হয়েছিল মনে হয়। না-হলে সামান্য হলেও গন্ধ পেতাম।’
অমিতাভ বললেন, ‘শুভ্রকান্তিদা নিশ্চয়ই ইনফ্রারেড স্পেকট্রোস্কপি করিয়ে নেবেন। কিন্তু কথা হচ্ছে বাইরের কেউ নিশ্চয়ই আগুনটা লাগায়নি। আপনাদের তো বায়োমেট্রিক আছে?’
শেষ প্রশ্নটার লক্ষ্য ম্যাগাজিনের সম্পাদক। তিনি একপাশে দাঁড়িয়ে কপালের ঘাম মুছছিলেন। নার্ভাস গলায় বললেন, ‘চার-পাঁচ দিন ধরে বায়োমেট্রিক মেশিন খারাপ আছে স্যার।’
‘চমৎকার! এর চেয়ে বড় সুযোগ আর কী হতে পারে! ঠিক ঘটনার আগে আগেই বায়োমেট্রিক খারাপ হল! অপূর্ব কো-ইন্সিডেন্স! ফরেন্সিক টিম কতদূর, তানিয়া? আরেকবার ফোন লাগাও তো।’
তানিয়া বলল, ‘চলে এসেছে প্রায়। মিন্টো পার্কের কাছে নাকি হেবি জ্যাম।’
‘শুভ্রকান্তিদা নিজে আসছে?’
‘হ্যাঁ স্যার। ওঁর সঙ্গেই কথা হল।’
‘ঢপ মারছে। শিয়ালদা পেরোয়নি,’ বলে ম্যাগাজিনের সম্পাদকের দিকে ফিরলেন অমিতাভ, ‘আপনার কোনও এমপ্লয়ি চলে যায়নি আশা করি? আমি সবার সঙ্গে একবার কথা বলতে চাই। একটা ঘর অ্যারেঞ্জ করুন প্লিজ।’
একমাত্র জমাদার বাদে সবাইকেই পাওয়া গেল। তার ঠিকুজি-কুষ্ঠি কেউ স্পষ্ট করে বলতে পারল না। তবে লোকটা নাকি অনেকদিন কাজ করছে। এই এলাকায় বিভিন্ন ছোট-বড় অফিসে সে কাজ করে। লোকাল থানার দুজন স্টাফকে তার খোঁজে ফিট করে দিয়ে বাকি স্টাফদের অমিতাভ সম্পাদকের ঘরে বসেই জিজ্ঞাসাবাদ করলেন।
শেষ এমপ্লয়ি বিদায় নেবার পর অমিতাভ সিগারেটের বাক্স বের করলেন, ‘তার মানে তো এটাই দাঁড়াচ্ছে যে ভিতরের কেউ জড়িত।’
রাহুল বলল, ‘পিওন, চাপরাশি ধরে ন’জন তো মোটে স্টাফ। প্লাস জমাদার। এদের কেউ হলে ফরেন্সিকে ঠিক ধরা পড়বে।’
অমিতাভ সিগারেট ধরিয়েছেন। বললেন, ‘চলো। অফিসে ফিরি।’
দময়ন্তী বলল, ‘শুভ্রকান্তিদা এলেন না তো এখনও।’
‘সুকুমারকে রেখে যাচ্ছি। আপডেট নিয়ে নেব পরে।’
‘কী মনে হচ্ছে স্যার? ভিতরের কেউ?’
অমিতাভ সিগারেট ধরিয়ে বললেন, ‘ভেতরের কেউই যদি হবে তাহলে আর বায়োমেট্রিক মেশিন খারাপ করার দরকার কেন হবে। কিন্তু আজ আটজন এমপ্লয়ির সকলেই উপস্থিত ছিল। বাইরের কেউ আসেওনি। ঢোকার অন্য কোনও পথ বা প্রমাণ কোনওটাই নেই। তাহলে প্রশ্ন জাগছে বায়োমেট্রিক খারাপ হওয়াটা কি নিতান্তই কাকতালীয়?’
রাহুল বলল, ‘হতে পারে পুলিশকে বিভ্রান্ত করার জন্য বায়োমেট্রিক খারাপ করা হয়েছে।’
‘হতেই পারে,’ ধোঁয়ার রিং ছেড়ে অমিতাভ বললেন, ‘দ্যাখো, এমনিতেও ভিতরের কারোর বিন্দুমাত্র সাহায্য ছাড়া এ কাজ করা সম্ভব না, সে বিষয়ে আমি কনফার্ম। কিন্তু কারোর সঙ্গে কথা বলেই তেমন সাসপিশাস কিছু মনে হল না। যাই হোক, প্রপারলি ফলো আপ করতে হবে বিষয়টা। সবার ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করাতে হবে।’
তানিয়া বলল, ‘একটাই ব্যাপার। এখানে কোনও চিরকুট পাওয়া গেল না।’
‘আহা, এখানে তো আগে থেকেই অ্যানাউন্সমেন্ট ছিল। চিরকুটের দরকারটা কী?’
লোকনাথ এসে বলল, ‘স্যার, রিপোর্টাররা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছেন। আপনারা কেউ যদি গিয়ে কিছু বলে দেন।’
অমিতাভ দময়ন্তীর দিকে তাকালেন। দময়ন্তী বলল, ‘জানি তো এই কাজটা আমায় দিয়েই করাবেন।’
হন্তদন্ত হয়ে ঘরে এসে ঢুকলেন ফরেন্সিক এক্সপার্ট শুভ্রকান্তি ব্যানার্জী। পিছনে তাঁর ব্যাটেলিয়ন। শুভ্রকান্তি স্টেট ফরেন্সিক ল্যাবের অলিখিত ডন। বড় অফিসারেরা তো বটেই, মন্ত্রীসান্ত্রীরাও সমঝে চলেন তাঁকে। ডিপার্টমেন্টের ‘নেতাজিনগর’ বলে পরিচিত। কারণ পরিবর্তনের প্রবল হাওয়ার মাঝেও নিজের কমিউনিস্ট আনুগত্য তিনি ঘোষিতভাবেই ধরে রেখেছেন। মেজাজ ভালো থাকলে যখন-তখন ‘ইন্টারন্যাশনাল’ গেয়ে ওঠেন। যদিও সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম পার্টির ঐতিহাসিক ভুল বলেই স্বীকার করেন। স্পেশালাইজেশন ফিঙ্গারপ্রিন্টে। বিজ্ঞানের জগতে যে-বিদ্যাকে বলে ডারম্যাটোগ্লিফিক্স। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, ঠিক সময়ে তাকে পাওয়া বড় কঠিন। তিনি স্পট ভিজিটে বেরোলেই ঝড়ঝঞ্ঝা, ঘূর্ণাবর্ত, ভূমিকম্প, দাবানল, জঙ্গীহানা কিছু না কিছু এসে হাজির হয়। ডিপার্টমেন্টের লোকজন এইসব ঢপের সঙ্গে অভ্যস্থ হয়ে গেছে। তবু শুভ্রকান্তির ওপরে কেউ কথা বলে না। কারণ নিজের ফিল্ডে তিনি প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী। অল্প রিসোর্স নিয়েও যে বেঙ্গল সিআইডি এই একটি ফিল্ডে আন্তর্জাতিক মান ছুঁয়ে ফেলেছে, তাঁর পুরো কৃতিত্ব এই ভদ্রলোকের। ভগবান সবাইকেই কোথাও না কোথাও অল্প একটু মেরে রাখেন। শুভ্রকান্তি ল্যাদখোর না হলে তাঁর প্রতিভাকে ধারণ করার ক্ষমতা রাজ্য পুলিশের ছিল না। ঘরে ঢুকেই একগাল হেসে ভদ্রলোক বললেন, ‘সরি ভাই, একটু লেট হয়ে গেল। বীভৎস জ্যাম ছিল।’
অমিতাভ একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করে বললেন, ‘বসুন, শুভ্রকান্তিদা। রোদে তেতেপুড়ে এলেন। জল-টল খান।’
.
গড়িয়াহাট ক্রসিং, লাইভ নিউজের গাড়ি, বিকেল ৪টে ১৫
গাড়িতে উঠে শাক্য বলল, ‘দেখলি? বললাম না মহিলা হেবি খড়ুশ! একটা কথারও ঠিকঠাক জবাব দিল না। উল্টে আমাকেই ধমকে দিল।’
শিরিন বলল, ‘সেই সুগন্ধী রবারগুলো তোর মনে আছে শাক্য? আমাদের ছোটবেলায় পাওয়া যেত? সুন্দর গন্ধ বেরোত, কিন্তু মোছার কাজটাই ঠিকমতো হত না।’
‘ওগুলো এখনও পাওয়া যায় ভাই। আমরাই বড় হয়ে গেছি।’
‘তুই হচ্ছিস ওই রবারগুলোর মতো। দেখতেই স্মার্ট। কাজের বেলায় ক্যাবলাকান্ত। হুমকিটা সিরিয়াসলি নিয়েছিল কিনা এটা জিগ্যেস করা তোর মোটেই উচিত হয়নি।’
‘আরে আমি নিজেই তো এই হুমকিটাকে সিরিয়াসলি নিইনি। সেইজন্যই মুখ ফস্কে বেরিয়ে গেছে।’ শাক্য কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, ‘তবে লেডি অফিসাররা একটু টাফ হলেই ভাল্লাগে। মহিলাকে আমার ভাল্লেগেছে। লুকটা খানিকটা নন্দিতা দাশের মতো, না?’
‘আই ডোন্ট ডিসক্রিমিনেট। আমার কাছে পুলিশ পুলিশই।’
‘আই অলসো ডোন্ট ডিসক্রিমিনেট। আমার কাছে মহিলা মহিলাই।’
শিরিন ঠাস করে একটা থাবড়া বসিয়ে দিল শাক্যর হাতে। তারপর বলল, ‘কী বুঝছিস বল তো? জল কোনদিকে গড়াচ্ছে?’
‘ভাবতে গেলেই মাথা গুলিয়ে যাচ্ছে ভাই। আমি নিজের ধান্দা নিয়েই ভাবছি। এটুকু বুঝতে পারছি যে, মাস সেন্টিমেন্ট দিন দিন মজন্তালীর দিকে যাচ্ছে। মজন্তালী জনতার আবেগে ধুনো দিয়েছে, পুজোটা আমাদের করতে হবে। তবেই টিআরপি।’
শিরিন কয়েক মুহূর্ত আনমনা হয়ে রইল। তারপর বলল, ‘আমরা কি একটা লাইফটাইম এক্সপেরিয়েন্সের সাক্ষী হতে চলেছি শাক্য? বারোই সেপ্টেম্বর কি সত্যিই কিছু হবে? কী মনে হয় তোর?’
‘আজকে এই ঘটনার পর সত্যিই মনে হচ্ছে বারোই সেপ্টেম্বরটা ফাঁকা আওয়াজ নয়। যদিও একটা অফিসে আগুন লাগানো আর আলিপুর জেলে ঢুকে খুন করে আসা এক নয়।’
শিরিন ব্যাজার ভঙ্গিতে ঘাড় নুইয়ে বলল, ‘কিছু না হলে হেবি দুঃখ পাব মাইরি।’
গাড়ি রেড রোড চিরে ছুটে যাচ্ছে। কাচ নামানো। হাওয়া এসে এলোমেলো করে দিচ্ছে চুল, জামা। আকাশ অংশত মেঘলা। রাস্তায় লোক কম। দুটো ছেলেমেয়ে হাত ধরে হেঁটে যাচ্ছে। বাইক আরোহীর সঙ্গে অট্টহাসি হাসছে ট্র্যাফিক পুলিশ। একজন অন্ধ মানুষকে রাস্তা পার করিয়ে দিচ্ছে এক দাড়িওলা যুবক। বেলুন কিনে উড়িয়ে দিচ্ছে বাচ্চা একটা মেয়ে। কল্পতরু হয়ে আছে কলকাতা। এই ভালোবাসার শহরটার শিয়রের কাছে প্রহরীর মতো রাত জাগছে কেউ। আর পুলিশ কিনা তাকেই ধাওয়া করছে! মজন্তালী সরকার এই শহরের ‘ডার্ক নাইট’। কলকাতার এই মুহূর্তে তাকেই প্রয়োজন। ভীষণভাবে। কিন্তু তাকে কি কলকাতা ডিজার্ভ করে আদৌ?
শিরিন পাশ থেকে আবেগতাড়িত গলায় বলল, ‘আমাদের না-পারাগুলোই তো মজন্তালী, বল?’
.
