মজন্তালী সরকার – অষ্টাদশ দিন

অষ্টাদশ দিন

তারিখ : ১৯ আগস্ট, ২০১৩

ভবানী ভবন, সকাল ১১টা

‘অনিল পাহানের খোঁজ পেয়ে গেছি স্যার।’

‘অনিল পাহানটা কে যেন?’

‘প্রডিউসার পূর্ণেন্দু সরকারকে যে-নম্বর থেকে কল করা হয়েছিল তাঁর দু-নম্বর গ্রাহক। সাতাশি বছর বয়েস। বয়স্ক গ্রাহকদের ডকুমেন্ট জালিয়াতি নিয়ে আপনাকে বলছিলাম না সেদিন?’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ, পাওয়া গেছে লোকটাকে?’

‘হ্যাঁ স্যার, খড়গপুরের ইন্দায় থাকে। আমার মনে হয় এঁর থেকে কিছু জরুরি ইনফো পাওয়া গেলেও যেতে পারে।’

অমিতাভ লোকনাথের দিকে তাকালেন, ‘কোন থানার আন্ডারে পড়ছে লোকনাথ?’

‘খড়গপুর লোকাল সম্ভবত,’ লোকনাথ বলল, ‘আমি দেখে নিচ্ছি।’

শৌভিক বলল, ‘প্রি অ্যাকটিভেটেড সিমের চোরাকারবার নিয়ে লালবাজারের সুনীল ভঞ্জ কাজ করছেন। তাঁর হেল্প নেওয়া যেতে পারে স্যার।’

‘অবশ্যই। কল হিম।’

.

হাওড়া স্টেশন, বেলা ১২টা

হাওড়া স্টেশন চত্বরে ঢুকলেই থুতু-কফ মেশানো একটা উৎকট টোকো গন্ধ ঠ্যাঙাড়ের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে নাকে। অভ্যস্ত না-হলে প্রথম ধাক্কায় নাকে হাত উঠে আসবেই। রাহুলেরও এল। তারপর নেমেও গেল খানিক বাদে। আরপিএফের রিপোর্ট নিতে হবে। মাত্র একদিনের মধ্যে রিপোর্ট দিয়ে দিচ্ছে। প্রায় অভাবনীয়। আসলে এরকম নজিরবিহীন খুন হাওড়া আরপিএফকে নাড়িয়ে দিয়েছে।

কিন্তু প্রথমেই সেদিকে গেল না রাহুল। দিকভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়াল খানিকক্ষণ। আট আর নয় নম্বর প্ল্যাটফর্মকে আলাদা করেছে যে পিচরাস্তা, যার নাম ওল্ড ক্যাব রোড, সেইটে ধরে বঙ্কিম সেতুর দিকে হাঁটা দিল।

রাস্তাময় থুতু। এত থুতু মানুষের আসে কোত্থেকে? কীসের প্রতি এত ঘৃণা তাদের? কাদের লক্ষ্য করে এত থুতু? অথচ খানিকটা উঁচু থেকে দেখলে নিশ্চয়ই সূর্যের আলোয় রাংতার মতো ঝলমলিয়ে উঠবে এইসব থুতুর চিত্রহার? আরও অনেকটা উপর থেকে দেখলে? নক্ষত্রমালার মতো দেখাবে এই থুতুদের? ট্রাজেডিকে যেমন লংশটে কমেডি দেখায়?

এই থুতুর শহরে কী করছে মজন্তালীরা? এই ঘৃণা, অবিশ্বাস আর ইতরের দেশে কী ছিঁড়তে নেমেছে একদল মেয়ে? ছ্যাঁচড়ামো আর ধান্দাবাজি ছাড়া এই শহরের লোকজন জোট বাঁধতে ভুলে গেছে৷ মজন্তালীরা এদের কাছ থেকে ভ্যালিডেশন চায়? এদের মাঝখানে স্বপ্ন ফেরি করতে চায়? যেদিন ফাঁসি হবে, এরা সিনেমার মতো দল বেঁধে এসে আটকে দেবে? বলবে, এই মহিলা সমাজকে বাসযোগ্য করতে চেয়েছিল? দুর্বলের কলহ, শালা! সামনে একটা কোল্ড ড্রিঙ্কের দোমড়ানো ক্যান পেয়ে রাহুল তাতে সজোরে লাথি মারল।

.

খড়গপুর লোকাল থানা, বিকেল ৩টে

সাতাশি বছরের অনিল পাহান প্রায় জরদগব! কান্নাকাটি জুড়ে দিয়েছেন। তাঁর ছেলে-বউমাকেও পুলিশ তুলে এনেছে। তারাও কিছু বুঝে উঠতে পারছে না। ভয়ে কাঁটা হয়ে আছে।

পরিস্থিতি দেখে থানার ইনস্পেকটর-ইনচার্জ দেবাশিস অট্টকে এক কোণে নিয়ে এসে জোর ধমক দিলেন অমিতাভ, ‘এত বয়স্ক মানুষকে এভাবে তুলে আনলেন? একটা ভালোমন্দ হয়ে গেলে কে দায়িত্ব নেবে?’

দেবাশিস অট্ট কাঁচুমাচু মুখে বললেন, ‘আসলে আপনাদের ফোন পেয়ে টেনশনে পড়ে গেছিলাম স্যার। মাথাটা ঠিক…।’

অমিতাভ অনিল পাহান আর তাঁর পরিবারের কাছে গিয়ে বললেন, ‘আপনার কোনও ভয় নেই। দু-একটা প্রশ্ন করে ছেড়ে দেব।’

গর্তে ঢুকে যাওয়া-গালে কোনওমতে চিবিয়ে চিবিয়ে অনিল পাহান বললেন, ‘আমি কী করিচি স্যার?’

‘আপনি কিছু করেননি। এই দেখুন এই নম্বরটা। আপনার ছিল তো?’ বলে হাতের কাগজটা অনিল পাহানের দিকে এগিয়ে দিতে গিয়ে থমকে গেলেন অমিতাভ। অনিলের পাহানের ছেলের দিকে এগিয়ে দিলেন তারপর, ‘আপনি দেখুন তো, এই নম্বরটা আপনার বাবা ব্যবহার করতেন কিনা?’

অনিল পাহানের ছেলে কাঁপা কাঁপা হাতে কাগজটা নিল। দেখে বলল, ‘হতে পারে স্যার। নম্বর তো মুখস্থ থাকে না। এখন তো বাবার অন্য নম্বর।’

কাগজ ফেরত নিয়ে অমিতাভ বললেন, ‘এই নম্বরটা এখন একজন ক্রিমিনাল ব্যবহার করছে।’

‘আমরা কী করে জানব বলুন স্যার, কে ব্যবহার করছে!’ বুকের কাছে হাত জড়ো করল অনিল পাহানের ছেলে, ‘আমরা তো এই নম্বর ছেড়ে দিয়েছি।’

‘সে আমরা জানি। আপনারা শুধু এইটুকু বলুন, ওই নম্বরটা কোন দোকান থেকে নিয়েছিলেন।’

‘আমরা তো সবাই সিম নিই হারুর কাছ থেকে।’

‘কে হারু? কোথায় তার দোকান?’

‘গোলবাজারের কাছে।’

দেবাশিস অট্ট বললেন, ‘হারুকে আমি চিনি স্যার। মহা দু-নম্বরি ছেলে।’

অমিতাভ বললেন, ‘দেবাশিসবাবু, প্রি-অ্যাকটিভেটেড সিমের একটা বিরাট চোরাকারবার গড়ে উঠেছে। হেডকোয়ার্টার কলকাতায়। বিভিন্ন জায়গায় তাদের লোকাল করেসপন্ডেনট ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। হারু এইসব করে কিনা সেটাই এখন প্রশ্ন।’

‘রেলশহর তো! নানারকম অপরাধের ঘাঁটি স্যার। হারু এরকম কিছু ঘাপলার সঙ্গে জড়িয়ে থাকলে অবাক হব না।’

‘তুলে আনুন তবে। একটু দলাইমলাই করি। আর এঁদের বাড়িতে নামিয়ে দিন প্লিজ।’

হারাধন বেরা ওরফে হারুকে তুলে আনতে পুলিশের ঠিক বারো মিনিট লাগল। এসেই সে নিষ্পাপ শিশুর মতো মুখ করে বলল, ‘আমি কী করেছি স্যার?’

চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে অমিতাভ বললেন, ‘লোকজন সিম নেবার পর ভোটার কার্ডের জেরক্সগুলো বিক্রি করিস তুই?’

হারু হাঁ করে চেয়ে রইল। যেন কিছুই বুঝতে পারছে না। অমিতাভ কানের গোড়ায় হালকা করে তবলা বাজাতে হাঁউমাউ করে উঠল, ‘আমি? আমি কেন বিক্রি করব স্যার? কাস্টমারের বিশ্বাস নিয়ে খেলব? এই দুর্মতি হবার আগে যেন ভগবান আমার জান নিয়ে নেয়।’

সুকুমারের দিকে তাকালেন অমিতাভ। ইঙ্গিত বুঝে সুকুমার জামার হাতা গোটাতে শুরু করল। এই হাতা-গোটানোটাকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছে সুকুমার। দেখলেই পেচ্ছাব চলে আসবে। হারুরও এল মনে হয়। তবু মিনমিন করে বলার চেষ্টা করল, ‘বিশ্বাস করুন স্যার। আমি…।’

সুকুমারের চড় কারও গালে আছড়ে পড়ার সময় কাছাকাছি গাছ থেকে পাখি উড়ে যায়। এখানে ধারেকাছে বড় গাছ ছিল না। থানার লোকজনই ভয় পেয়ে ছুটে এল।

তারপর হারুকে আর বিশেষ জোরজার করতে হল না।

.

খড়গপুর ১ ব্লক অফিস, বিকেল ৩টে ৪০

বিমার এজেন্ট দীপক জানা বিডিও অফিসের বাইরে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছিল। সিল্ক কাট থেকে ডিরেক্ট গোল্ড ফ্লেকে প্রোমোশন হয়েছে তার। গায়ের চামড়ায় গ্লেজ এসেছে। পালসারের জায়গায় বুলেট এসেছে। হয়তো এ-বছরের শেষে চারচাকাও নেমে যাবে। দীপককে দেখে লোকে এখন হিংসে করে। এক পকেটে বিডিও, আরেক পকেটে লোকাল নেতাকে রাখে সে।

সুখটানে বিভোর দীপক খেয়াল করল না যে পার্কিং লটে একটা গাড়ি এসে থামল আর ভিতর থেকে নেমে এসে তার দিকেই আঙুল নির্দেশ করল গোলবাজারের মোবাইলের দোকানের হারু। তার হুঁশ ফিরল সুকুমারের মুগুরের মতো কিল ঘাড়ে এসে পড়ায়।

দীপক প্রথমে বিস্তর তেড়িবেড়ি করছিল। সুকুমারের থাবড়া খেয়ে পায়ে পড়ে ভেউ ভেউ করে কাঁদল খানিক। মাটিতে ছেঁদড়ে বসে হিস্টিরিয়া রোগীর মতো কাঁপতে কাঁপতে, ‘আমাকে মেরে ফেলবে! আমাকে ওরা মেরে ফেলবে!’ বলে গেল একটানা। শেষে খানিকক্ষণ গুম হয়ে বসে থেকে বলল, ‘আমাকে ফ্যামিলি নিয়ে দুবাই বা সিঙ্গাপুর সেটল করিয়ে দিন। তবে বলব।’

অমিতাভ হো-হো করে হেসে উঠলেন। সুকুমার সিরিয়াস ধরনের মানুষ। সে হাসল না। খানচারেক স্ট্রেচ করে নিল।

পাঁচ মিনিট পর দময়ন্তীকে ফোন করলেন অমিতাভ, ‘মহম্মদ ইসমাইল। নিউ মার্কেট। ঠিকানাটা টেক্সট করছি, তুলে নাও।’

.

নিউ মার্কেট, সন্ধে ৬টা ১৫

নিউ মার্কেটের জঙ্গম এক গলির মধ্যে ছোট্ট এক সোডা-শরবতের দোকান। রংবেরঙের বোতল সাজানো। দাড়িগোঁফওয়ালা দশাসই চেহারার লোক বসে স্মার্টফোন ঘাঁটছে। রাহুল গিয়ে তার সামনে দাঁড়াল, ‘মহম্মদ ভাই আছেন?’

দাড়িগোঁফওয়ালা লোকটা মুখ তুলল। জলদমন্দ্র স্বরে বলল, ‘কী দরকার?’

‘আমাকে মকসুদ ভাই পাঠিয়েছেন।’

লোকটা রাহুলকে আপাদমস্তক মাপল। তারপর হাত বাড়াল, ‘আইডি দেখান।’

আধ ঘণ্টা আগে হাতে পাওয়া ফেক-আইডিটা পকেট থেকে বের করে বাড়িয়ে দিল রাহুল।

লোকটার মুখে সেরকম কোনও অভিব্যক্তি ফোটে না। রাহুল তাই ওকে ঠিক পড়তে পারছিল না। তবে আইডিতে চোখ বুলিয়ে বোধহয় লোকটা সন্তুষ্ট হল। হাঁক দিল, ‘লাল্টু!’

দোকানের পিছনেই পর্দা-ঢাকা একটা দরজা ছিল। তার পিছন থেকে আবির্ভূত হল লম্বা দোহারা চেহারার এক যুবক।

দাড়ি-গোঁফওয়ালা লোকটা বলল, ‘ইনি ইমানুর রহমান। ভিতরে নিয়ে যা। দ্যাখ কী দরকার।’

‘আসেন ভাই,’ বলে কাউন্টারের একটা ঝাঁপ তুলে ধরল লাল্টু। রাহুল ঢুকে পড়ল। তারপর লাল্টুর পিছন পিছন রওনা হল ভিতরমহলে।

নোনা-ধরা দেওয়াল। সরু প্যাসেজ। বেশ কয়েকটা সিঁড়ি ঘুরে রাহুল লাল্টুর পিছন পিছন গিয়ে তিনতলার একটা দশ বাই দশ ঘরে গিয়ে পৌঁছল। জানলা নেই। আসবাব বলতে একটা টেবিল আর একটা তক্তপোশ।

‘বসেন,’ লাল্টু তক্তপোশের দিকে ইঙ্গিত করল, ‘ইন্ডিয়া কী জন্য আয়েছেন ভাই?’

‘রিলেটিভ অসুস্থ। দেখা করতে এসেছি।’

‘ও। আমার বাড়িও বাংলাদেশে,’ লাল্টু হাসল, ‘আপনি কোথায় থাকেন?’

‘বরিশাল।’

‘আমি নোয়াখালি। তা আপনার একটাই সিম চাই তো?’

‘আজ্ঞে।’

‘কয়দিনের জন্য?’

‘এক মাস মতো।’

‘আটশো টাকা লাগবে। প্লাস রিচার্জ যা করাবেন।’

‘সে কী? এত কেন?’

‘ভাড়া চারশো। আর চারশো টাকা কশান মানি। এক মাস পর সিম ফেরত দিলে চারশো টাকা ফেরত পেয়ে যাবেন।’

রাহুল চোখ গোল গোল করল, ‘কশান মানি এত?’

‘ভাড়ার সিমের এটাই রেট। কী জানেন ভাই, অনেকেই সিম নিয়ে আর ফেরত দেয় না। সেই জন্যই কশান মানিটা বাড়িয়ে রাখি। ফেরত দিলে ভালো। না দিলেও আমাদের মোটা লাভ থাকছে।’

‘মকসুদ ভাই বলেছিল ভাড়ার সিম একটু বেশি পড়বে, তা বলে এতটা হবে বুঝতে পারিনি,’ রাহুল বিমর্ষ মুখে পকেট থেকে দুটো পাঁচশোর নোট বের করল।

‘কীসের সিম নেবেন?’

‘কম খরচায় কোনটা হবে?’

‘আইডিয়া নিয়ে নিন। একমাসের রিচার্জ করে দিচ্ছি দুশো বাইশ। লোকাল এসটিডি আনলিমিটেড। প্লাস তিনশো এসএমএস। আপনার কি স্মার্টফোন? ইন্টারনেট করবেন? তাহলে দুশো তিপ্পান্ন ভরে দিচ্ছি।’

‘না না ইন্টারনেট লাগবে না। সব জায়গায় নেটওয়ার্ক পাব এমন কিছু একটা দিলেই হবে।’

‘তাহলে ভোডাফোন দিচ্ছি। মোবাইল এনেছেন?’

‘হ্যাঁ,’ রাহুল পকেট থেকে ফোন বের করে দিল।

লাল্টু ফোনটা হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখল। ধীরেসুস্থে ব্যাটারি খুলে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কী সব দেখল। ‘সিম নিয়ে আসছি, বসুন।’ বলে ফোনটা টেবিলে নামিয়ে রেখে উঠে গেল।

ছেলেটার উঠে যাওয়ার ভঙ্গিটা রাহুলের ভালো লাগল না। ছেলেটা কি কিছু বুঝে ফেলল? দ্রুত হাতে ফোনটা সেট করতে গিয়ে রাহুল দেখল সিম নেই।

লাল্টু সিমটা নিয়ে গেছে।

.

নিউ মার্কেট, রাস্তা, সন্ধে ৬টা ৪৫

দময়ন্তী দলবল নিয়ে নিউ মার্কেটের গলির মুখে ভেলপুরির ঠেলার সামনে অপেক্ষা করছিল। রাহুলের দেরি দেখে চিন্তিত মুখে বলল, ‘এতক্ষণ লাগছে কেন?’

লোকনাথ বলল, ‘স্যারের একা যাওয়াটা ঠিক হল না। সবাই গিয়ে সোজা গিয়ে তুলে নিলেই তো হত।’

‘আমাদের মহম্মদ ইসমাইলকেই চাই, লোকনাথদা। গোলেমালে সে পালিয়ে গেলে চলবে না।’ বলে কবজি উল্টে ঘড়ি দেখে দময়ন্তী তানিয়াকে বলল, ‘আধ ঘণ্টা পর একবার কল করতে বলেছিল না?’

তানিয়া বলল, ‘হ্যাঁ। ও কলটাকে স্ক্রিপ্টের মধ্যে ঢুকিয়ে নেবে। করব?’

‘আধ ঘণ্টা তো হয়েই গেল। কর।’

তানিয়া রাহুলের নম্বর ডায়াল করতে একটা যান্ত্রিক গলা জানিয়ে দিল ফোন সুইচড অফ। শুকিয়ে এল তানিয়ার গলা, ‘সুইচড অফ!’

দময়ন্তীর মুখ পাংশু হয়ে গেল। পকেট থেকে সার্ভিস রিভলভার বের করে বলল, ‘লেটস গো!’

.

নিউ মার্কেট, সন্ধে ৬টা ৫৫

দময়ন্তী যখন স্যাঁতস্যাঁতে, প্রায়-অন্ধকার ঘরটায় এসে ঢুকল, রাহুল তখন তিন নম্বর লোকটাকে চোয়ালে লাথি মেরে শোয়াচ্ছে।

লোকটা ঘুরে গিয়ে পড়ল একটা কাঠের আলমারির গায়ে। তারপর মাটিতে।

তারপরেই হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে এলেন লোকনাথ। পিছন পিছন তানিয়া, আর চারজন কনস্টেবল।

চোয়ালে লাথি খাওয়া লোকটা নড়াচড়া করছে না। সম্ভবত অজ্ঞান হয়ে গেছে। বাকি দুজনের একজন লাল্টু। সে একটা টেবিল ভেঙে পড়ে আছে, অল্প অল্প কাতরাচ্ছে। আর একজন দেওয়ালে পিঠ দিয়ে বসে হাঁপাচ্ছে। নাক ফেটে গলগল করে রক্ত বেরোচ্ছে তার।

তানিয়া ছুটে গিয়ে রাহুলের পিঠে হাত রাখল, ‘ইউ অলরাইট?’

দময়ন্তী এগিয়ে এল, ‘এ কী রে? রক্ত পড়ছে তো।’

‘ও এমন কিছু না,’ রাহুল হাতের চেটো দিয়ে ঠোঁটের রক্ত মুছে বলল, ‘নীচের লোকদুটোকে ধরেছ তো? মহম্মদ আর তার সঙ্গে যে বেঁটে মালটা ছিল?’

‘ধরেছি,’ তানিয়া রিভলভার পকেটে ঢুকিয়ে বলল, ‘তুমি ফার্স্ট এইড নাও।’

রাহুল বেরিয়ে যাচ্ছিল। দরজার কাছে গিয়ে ঘুরে দাঁড়াল। গুটিগুটি ফিরে এল আবার।

‘কী রে,’ ধমকে উঠল দময়ন্তী, ‘যা। আমরা এগুলোকে নিয়ে নামছি। তুই যা, গাড়িতে ফার্স্ট এইড বক্স আছে।’

‘এক মিনিট।’

লোকগুলোকে ততক্ষণে তুলে দাঁড় করানো হচ্ছে। লাল্টু ভালো করে দাঁড়াতে পারছে না। কনস্টেবল সুজিত দাস তাকে কলার ধরে দাঁড় করিয়েছে। রাহুল লাল্টুর দিকে এগিয়ে গেল। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলল, ‘লাল্টু, আমার সিমকার্ড কোথায়?’

লাল্টু ফ্যাঁসফ্যাঁসে গলায় কিছু একটা বলার চেষ্টা করল। বোঝা গেল না। লোকনাথ কলার চেপে ধরতে কঁকিয়ে উঠে লাল্টু নিজের বুকপকেটের কাছে হাত দিয়ে চাপড়াল।

রাহুল ওর পকেট হাতড়ে সিমটা বের করে বলল, ‘এবার নিয়ে যাও।’

.

বালিগঞ্জ প্লেস, সন্ধে ৭টা ১৫

ফোনটা রিসিভ করে শিরিনের মুখের ম্যাপ বদলে যাচ্ছিল। তাতেই শাক্যরা বুঝল আবার কিছু বোমা।

ফোন রেখে শিরিন বলল, ‘বিরাট ব্রেকথ্রু। ভবানী ভবন যেতে হবে।’

সৌমিলি বলল, ‘কী হল?’

‘প্রিঅ্যাকটিভেটেড সিমের একটা বড় ডিলার ধরা পড়েছে। এবং বিষয়টা মজন্তালী কেসের সঙ্গে রিলেটেড।’

‘সিমকার্ডের মামলা কীভাবে মজন্তালীর সঙ্গে রিলেটেড?’ শাক্য জিগ্যেস করল।

‘অনুমান করতে পারছি। নিশ্চয়ই ওর থেকে মজন্তালীরা প্রচুর সিম নিয়েছিল। এই যে বিভিন্ন দিকে মজন্তালীর এত ফোন-টোন যাচ্ছে, এত বেনামি মোবাইল নম্বর কোত্থেকে পাচ্ছে? একটা অরগ্যানাইজড চেইন তো কাজ করছে।’

‘এটা তো বিরাট সাকসেস,’ শাক্য চোখ বড় বড় করে বলল, ‘এটাই এই কেসের টার্নিং পয়েন্ট হয়ে যেতে পারে। চল বেরিয়ে পড়ি।’

‘ফোনে চার্জ দিয়ে সুইচ দিসনি হতভাগা! এই দ্যাখ!’ বলে শাক্যর ফোনটা তুলে দেখাল সৌমিলি। তিন পারসেন্ট চার্জ।

শাক্য আঁতকে উঠল। তারপর সুইচ অন করে কৃতজ্ঞতার সুরে সৌমিলিকে বলল, ‘তুই না-থাকলে যে আমার কী হত!’

কথাটা সাধারণ কথা। শাক্য বলেওছে ক্যাজুয়ালি। কিন্তু সৌমিলির মুখে একটা পাতলা রাঙা সর পড়ল। আর শিরিনের সেটা চোখেও পড়ে গেল ঠিক।

.

সেফ হাউজ (মহেশতলা), রাত ৮টা ১৫

অখ্যাত শহরতলির ততোধিক অখ্যাত জায়গায় কিছু কিছু বিল্ডিং কেন সারাজীবন আন্ডার কন্সট্রাকশন হয়েই পড়ে থাকে, সেটা আমজনতার বোঝার কথা না। কোনও এক মন্ত্রবলে পাড়ার ফেকলু মস্তানরা ফূর্তিফার্তা, নেশা ভাং করার জন্য সেসব বাড়ির দখল নিতে এগোয় না।

ভবানী ভবন থেকে আধ ঘণ্টার দূরত্বে সেরকমই একটা আধাখ্যাঁচড়া বিল্ডিংয়ের দোতলার একটা ঘরে মহম্মদ ইসমাইলের মুখোমুখি বসেছিলেন অমিতাভ। সঙ্গে তানিয়া। মহম্মদের পাশে দাঁড়িয়েছিল সুকুমার। দময়ন্তীও ছিল। একটা ফোন পেয়ে এইমাত্র উঠে গেছে সে। বাইরে-ভিতরে মিলিয়ে পাহারায় আছে জনা পনেরোর একটা ফোর্স।

আপাতত কিছুটা খাতিরদারির পর মহম্মদ বেশ সাহায্যই করছিল, ‘এই ডিলটা স্যার নুটু এনেছিল। নুটু হালদার। মাল তিন খেপে ডেলিভারি হয়েছে নুটুর হাত দিয়েই। ফলে কোনও মহিলা নিয়েছেন কিনা সেটা আমাদের পক্ষে জানা সম্ভব না।’

‘নুটু হালদার বিষয়ে যা জানো বলে ফ্যালো।’

‘নুটুর অনেকরকম ব্যবসা। সবকটাই ইললিগাল। আমি নিজেও জানি না ও ঠিক কী কী করে। তবে মেইন ব্যবসা বর্ডার পার করা আর চোরাই মোবাইল। ওর কনট্যাক্টে আমি প্রচুর কাস্টমার পেয়েছি। তিনবছর আগে একবার নোকিয়ার নকলি হ্যান্ডসেটে কলকাতার বাজার ভর্তি হয়ে গিয়েছিল মনে আছে স্যার? আপনারা ধরতে পারেননি। ওইটা নুটুর কাজ। ঢাকা থেকে কয়েক হাজার নকলি সেট এনেছিল। ওর কাজ করার জায়গা হচ্ছে বাংলাদেশ। আর বুয়া দেখত নেপাল আর ভুটান।’

‘বুয়া কে?’ অমিতাভর ভুরু কুঁচকে গেল।

‘নুটুর মোবাইলের ব্যবসার পার্টনার,’ মহম্মদ বলল, ‘জানি না আরও কিছুর পার্টনার কিনা। আসল নাম মোস্তাক। কিন্তু লাইনে সবাই বুয়া বলে ডাকে। স্যার একটু পানি দিতে বলুন, তেষ্টায় ছাতি ফেটে যাচ্ছে।’

অমিতাভ সুকুমারকে ইশারা করলেন। সুকুমার একটা জলের বোতল এগিয়ে দিল মহম্মদের দিকে। ঢকঢক করে অনেকটা জল খেয়ে ধীরেসুস্থে মুখ মুছে মহম্মদ বলল, ‘স্যার, আমি জানি না ওই তিনশো সিম কে নিয়েছিল। নুটু আমায় বলেনি। বলা দস্তুরও না। বিজনেস সিক্রেট কেন বলবে? তাছাড়া যে নিচ্ছে সে তো আর আম আদমি নয়। আমি তখন ভেবেছিলাম কোনও টেররিস্ট গ্রুপ। কিন্তু এখন আমি বুঝতে পারছি ব্যাপারটা।’

‘তাই? কী বুঝলে?’

‘ওই মেয়েছেলেটা। কী যেন সরকার?’

‘মজন্তালী সরকার।’

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ।’

‘মেয়েছেলে শব্দটা ওই ম্যাডামের সামনে উচ্চারণ কোরো না মহম্মদ মিয়াঁ। তোমার চামড়া দিয়ে মানিব্যাগ বানিয়ে লোকজনকে গিফট করে বেড়াবে। যাই হোক, ঠিকই ধরেছ।’

‘কোনও টেররিস্ট গ্রুপ হলে আমাকে ধরতে পারতেন না সাহেব!’

অমিতাভ হাসলেন। বললেন, ‘গত দু-সপ্তাহ ধরে এই গ্রুপটা আমাদের কী নাকানিচোবানি খাওয়াচ্ছে, সেটা জানলে এ কথা বলতে না!’

‘জানি স্যার। সব খবরই রাখি। কিন্তু এরা তো আর প্রফেশনাল ক্রিমিনাল নয়। অত নিট অ্যান্ড ক্লিন কাজ করতেই পারবে না। না-হলে আমাকে কি আপনারা খুঁজে পেতেন?’

‘শোন মহম্মদ মিয়াঁ তোমাকে খুঁজে পেয়েছি ছোট্ট একটা ভুলের জন্য। আর সেই ভুলটা তোমার বিজনেসের কারোর। মজন্তালীর না।’

‘আমাদের কারোর ভুল?’ মহম্মদ বিভ্রান্ত চোখে তাকাল।

‘হ্যাঁ। কী ভুল জিগ্যেস কোরো না। তোমায় বলব না। তবে এটা তুমি ঠিক ধরেছ। মজন্তালীর কেসের সূত্রেই তুমি ধরা পড়েছ,’ অমিতাভ সিগারেটে টান দিলেন, ‘এবার নুটু আর বুয়ার ব্যাকগ্রাউন্ড বলো তো? কী করত, কোথায় থাকত, কীভাবে উঠল। যা জানো সব বলো।’

.

কাশীপুর, রাত ৮টা ২০

বাড়ি না গিয়ে হঠাৎ কাশীপুর আসতে ইচ্ছে হল কেন, সেটা রাহুল রাস্তায় আসতে আসতেও বোঝেনি। বুঝল লীনাদের বাড়ির বেল বাজানোর পর, যখন তার কপালের ব্যান্ড এইড আর মারকিউরোক্রোমের লাল দাগ দেখে লীনা ভয়ানক ব্যস্ত হয়ে পড়ল, ‘এ কী? কী হয়েছে আপনার?’

এই উদ্বেগ। এই প্রগলভ আশঙ্কা-প্রকাশ। এটুকুরই তো লোভ ছিল। বিশ্বের সবচেয়ে সুখী মানুষের মতো হাসল রাহুল, ‘ওই সামান্য হুটোপাটি…। চাকরিটাই সেরকম।’

লীনা রাহুলকে ঘরে এনে বসাল। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানতে চাইল সব। রাহুলের একটু লজ্জা করতে শুরু করল। এহেঃ! ঝোঁকের মাথায় বড্ড বোকার মতো কাজ হয়ে গেছে। ডোপামিন, অক্সিটোসিন আর সেরিটোনিনের ত্র্যহস্পর্শ মানুষকে যে কোথায় নিয়ে যেতে পারে!

লীনার মা চা নিয়ে এলেন। তিনি যে বেশ ভয় পেয়েছেন সেটা খুব ভালো বোঝা যাচ্ছে। সেটা স্বাভাবিক। লীনা যে সিআইডি-র সন্দেহের তালিকায় রয়েছে, সেটা তার বাড়ির লোকের কাছে খুব স্বস্তির বিষয় নয়। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে রাহুল লীনাকে বলল, ‘আপনাকে একটাই কথা বলার। জানি পুরুষের কাছে দস্যুতাই প্রত্যাশা করেছেন। বাট, নট অল মেন।’

‘জয় গোস্বামী পড়েছেন?’ লীনা চমৎকৃত হল, ‘আপনি তো ছুপা রুস্তম মশাই। তাহলে ভান করছিলেন কেন কিছুই পড়েননি?’

বোকামি ঢাকতে গিয়ে আরও বেশি বোকামি হয়ে যাচ্ছে, রাহুল বুঝতে পারছিল। এবার কিছু একটা বলে কাল্টি মারতে হবে। আমতা আমতা করে বলল, ‘ওই টুকটাক পড়েছি। জয় গোস্বামীর এই কবিতাটা বড্ড প্রিয়।’

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে লীনা বলল, ‘হঠাৎ এই সময়ে? কিছু বলার ছিল?’

‘হ্যাঁ,’ রাহুল জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজাল বারদুয়েক, ‘আপনি শুনলাম টিভিতে বড় সাক্ষাৎকার দেবেন?’

‘হ্যাঁ। লাইভ নিউজ থেকে একটা সিরিজ অব ইন্টারভিউজ হচ্ছে। তার একটা পর্বে আমি থাকছি।’

‘সেই বিষয়েই একটা আর্জি আছে,’ রাহুল হাত দিয়ে হাঁটুদুটো চেপে ধরল, ‘রাজ্য পুলিশের পক্ষ থেকে প্রতি বছর নানারকম সোশাল ইনিশিয়েটিভ নেওয়া হয় জানেন তো? পরের মাসে আমাদের থিম হচ্ছে জেন্ডার ভায়োলেন্স। আপনি যদি গেস্ট হিসেবে আসেন, দু-চার কথা বলেন, খুব ভালো লাগবে।’

লীনার মুখের ভাব হঠাৎ বদলে গেল। একটু চেয়ে থেকে বলল, ‘লাঞ্ছিত মহিলার বাজারদর কিন্তু বেশ চড়া, বলুন? বিনোদনের বাজারে দাম আছে।’

‘মানে?’ রাহুল অবাক।

‘আমি কী সুন্দর সবার অ্যাজেন্ডার অংশ হয়ে যাচ্ছি সেটাই দেখছি।’

কথাটা বুঝতে কয়েক মুহূর্ত সময় লাগল রাহুলের। মুখের আলো নিভে গেল তার, ‘আপনি কোন কথাকে কোথায় নিয়ে গেলেন?’

কথাটা বলে ফেলে লীনা নিজেও বুঝেছে অকারণ রূঢ়ভাষণ হয়ে গেছে। একটু থিতিয়ে গেল সে, ‘না, আপনি হয়তো সেই ভেবে বলেননি…।’

‘এটা আপনার রোগের পর্যায়ে চলে যাচ্ছে, লীনা। আপনি ভাবছেন লোকে আপনাকে করুণা করছে। সবসময় সেটা সত্যি নয়।’ খুব শান্ত স্বরে কথাগুলো বলে উঠে পড়ল রাহুল, ‘চলি।’

লীনার চোখে অপরাধবোধ স্পষ্টতর হল, ‘আমি আমার কথাটা ঠিক বোঝাতে পারিনি আপনাকে।’

‘থাক। আমি সূক্ষ্ম জিনিসপত্র ভালো বুঝি না।’

লীনার মা দরজায় এসে দাঁড়িয়েছিলেন। রাহুলকে উঠে দাঁড়াতে দেখে উদ্বিগ্ন গলায় বললেন, ‘চা খেলেন না যে!’

‘অন ডিউটি আছি, মাসিমা। সরি।’ বলে গটমট করে বেরিয়ে গেল রাহুল। ফিরে তাকাল না।

.

বালিগঞ্জ প্লেস, রাত ৮টা ৩০

রণ বলল, ‘পুলিশ গুছিয়ে নামলে আচ্ছা আচ্ছা প্রফেশনাল ক্রিমিনালদের কাজ কঠিন হয়ে যায়, এরা তো নভিশ। এদের কেন ধরতে পারছে না কে জানে!’

রণর সঙ্গে পাঁচ মিনিট কথা বললেই মটকা তেতে ওঠে। শিরিন বিরক্ত গলায় বলল, ‘তুই তো সব জেনে বসে আছিস। সবজান্তা গামছাওয়ালা!’

‘এতে বোঝার কী আছে?’ রণ তেলেভাজা খেতে খেতে বলল, ‘কয়েকটা মেয়েমানুষ ঝোঁকের মাথায় কিছু অ্যানার্কিস্ট কাজকর্ম করে ফেলেছে! হুঁশ ফিরলে হয় পগার পার হবে, না হয় ধরা পড়বে! এই তো ওদের ভবিষ্যৎ। তাছাড়া দু-দিন চুপ মেরে আছে খেয়াল করেছিস কি?’

‘বোকা বোকা কথা বলিস না তো! ঝোঁকের মাথায় করা কাজে এত নিখুঁত প্ল্যানিং, এত গোছানো মেশিনারি থাকে না। আর দু-দিন যে চুপ মেরে আছে তার মানে যে বড় কিছু প্ল্যান করছে না, সেটা তুই শিওর তো?’

ক্যাঁচ করে দরজা ঠেলে শাক্য মুখ বাড়াল। ভেতরে চোখ বুলিয়ে জিগ্যেস করল, ‘সৌমিলি কি বেরিয়ে গেছে?’

রণ বলল, ‘লাইব্রেরিতে গেল বোধহয়।’

‘আচ্ছা।’ বলে শাক্য দরজা টেনে বিদায় নিল।

সেদিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে রণ বলল, ‘আচ্ছা, শাক্য আর সৌমিলি কি প্রেম করছে?’

শিরিন চোখ কপালে তুলে তাকাল। তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, ‘হ্যাট!’

বলল বটে, কিন্তু মনে মনে খুব হাসল একচোট। রণর মতো ট্যালাও বুঝে গেছে। কিন্তু দ্যাবাদেবী নিজেরা বুঝলে তো! শাক্য তো একটা গরু। আর সৌমিলির প্রেম হচ্ছে বিনোদ রাঠোরের গান। ছুপানা ভি নেহি আতা, যতানা ভি নেহি আতা। এদের তুমি দেখো হে শালিকঠাকুর!

.

গলফ গ্রিন, রাত ৯টা ৩০

‘উপাসনা আচার্য!’ শিবনেত্র হয়ে মনে করার চেষ্টা করল অঙ্কিত, ‘নামটা চেনা চেনা লাগছে।’

শালিনী বলল, ‘টিভিতে শুনেছ। সুজান জর্ডানের বন্ধু।’

‘ঠিক ঠিক। তা তার সঙ্গে হঠাৎ এত খাতির? কী ব্যাপার?’

‘ভদ্রমহিলা পথশিশুদের নিয়ে দুর্দান্ত কাজ করছেন।’

‘কিন্তু মজন্তালীর কেসে উনি সাসপেক্ট লিস্টে আছেন। ভুলে যেও না।’

‘তাতে তো কাজকম্ম থেমে থাকলে চলবে না। উনি নিজেও থেমে নেই।’

‘কিন্তু তুমি একের পর এক সাসপেক্টের সঙ্গে যেভাবে জড়িয়ে পড়ছ, তাতে দু-দিন বাদে তোমাকেও না সাসপেক্ট লিস্টে ঢুকিয়ে দেয়।’

‘সিআইডি অফিসারদের গ্রে ম্যাটারে এতটাও টান পড়েনি।’

‘না, সিরিয়াসলি। তুমি কিন্তু দিন দিন আরও বেশি করে ইনভলভড হয়ে যাচ্ছ। আমি কিন্তু ব্যাপারটা খুব ভালো বুঝছি না। ভবিষ্যতে সমস্যায় না পড়তে হয়। সিআইডি তো তোমার দময়ন্তীদির প্রাইভেট কোম্পানি না।’

‘শোনো, মজন্তালী সবটা পারবে না। আমাদেরও এগিয়ে আসতে হবে। পরিপূরক হয়ে উঠতে হবে। আমি সেটাই চেষ্টা করছি। মজন্তালী বেআইনিভাবে চেষ্টা করছে, আমি বা উপাসনা আচার্য এরা আইনি নিয়মতান্ত্রিক পথে করছি।’

অঙ্কিত চৈতন্যের ভঙ্গিতে দু-হাত তুলে বলল, ‘আহা রে! ব্রিটিশ ভারতে কংগ্রেসের নরমপন্থী আর চরমপন্থী গোষ্ঠীর কথা মনে পড়ে যাচ্ছে!’

শালিনী মুখ টিপে হাসল, ‘তোমার সারকাজমের প্রভূত উন্নতি হয়েছে, অঙ্কিত। আই মাস্ট অ্যাডমিট। মাঝে মাঝে মনে হয় তুমি অতটাও ডাল নও, যতটা তোমায় দেখায়।’

‘আর আমার মাঝে মাঝে কী মনে হয় জানো?’ অঙ্কিত মুখ বেঁকাল, ‘মনে হয়, তুমিই শালা মজন্তালী সরকার।’

.

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *