মজন্তালী সরকার – তৃতীয় দিন

তৃতীয় দিন

তারিখ : ৪ আগস্ট, ২০১৩

মৌলালি, ভোর ৪টে

কিষণলাল রোজ ভোর চারটেয় ঘুম থেকে ওঠে। মর্নিং ওয়াক বা শরীরচর্চার জন্য না। অফিসও বাড়ি থেকে দু-পা। ছেলেপিলে এখনও হয়নি, তাই তাদের স্কুলে দিতে যাবারও কোনও ব্যাপার নেই। বস্তুত এত তাড়াতাড়ি ওঠার কোনও দরকারই নেই। তবু কিষণলাল ওঠে। উঠে একটু পায়চারি করে। পিতৃপুরুষের সূত্রে পাওয়া অভ্যাস। তার বাবা রামলালও অকারণে চারটেয় উঠতেন এবং ছেলেকেও টেনেটুনে তুলতেন। দাদাজিও তাই করতেন বলে শোনা যায়।

এই চারটেয় ওঠা নিয়ে একটু ঝামেলাই হয়। কারণ কিষণলাল যত সাবধানেই দরজা খুলুক না কেন, হতভাগা দরজাটা ক্যাঁচ করে আর্তনাদ করে উঠবেই। আর বউয়ের ঘুমটাও রামভরোসা গয়লার দুধের মতো পাতলা। ফলে নিত্যি অশান্তি লেগেই থাকে। কিষণলাল কোনও সদুত্তর দিতেও পারে না, আবার অভ্যেসটাও ছাড়তে পারে না। কয়েকবার চেষ্টা করে দেখেছে। ঘুম ভেঙে গেলেও মটকা মেরে শুয়ে থেকেছে। এক থেকে একশো গুনে দেখেছে ঘুম আসে কিনা। কিন্তু উপকার কিছুই হয়নি। বরং পেট ফেঁপে গেছে। অম্বল হয়েছে। অফিসে চোঁয়া ঢেকুর উঠেছে সারাদিন।

আজও ঠিক চারটেয় চটিটা পায়ে গলিয়ে কিষণলাল বড় রাস্তার দিকে হাঁটা লাগাল। ফুরফুর করে হাওয়া দিচ্ছে। নিঝুম রাত। চাঁদ দেখা যাচ্ছে না। নিয়নের আলোয় ভূতুড়ে হয়ে আছে হোর্ডিংগুলো। সেদিকে তাকিয়ে কিষণলাল ভাবছিল একটা সিগারেট ধরাবে কিনা, হঠাৎ চোখে পড়ল যুব কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের গেটের কাছে একটা লোক। দেওয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে কিছু একটা করছে।

চোর ছ্যাঁচোড় নাকি? তাছাড়া আর কীই বা হবে? কিন্তু ব্যাপারটা দেখতে হচ্ছে। কিষণলাল ত্বরিত পায়ে এগোল। ভয়ডর তার কোনওকালেই খুব একটা নেই। এগিয়েই দেখা যাক না। মলের তিন নম্বর গেটের কাছে একটা চেকপোস্টের আড়ালে দাঁড়িয়ে কিষণলাল দেখল, লোকটা দেওয়ালের গায়ে কিছু একটা লাগাচ্ছে।

বোম-টোম নয় তো?

না, কাগজ। মানে পোস্টার?

কিন্তু ভোররাতে কীসের পোস্টার লাগাচ্ছে লোকটা? সিনেমার? আর চোরই যদি হবে, তাহলে দেওয়ালে পোস্টার কেন মারবে? বেশভূষা দেখে সেরকম মনে হচ্ছে না। কালো গেঞ্জি, কালো প্যান্ট। দেখে কেন কে জানে খুব একটা সুবিধের ঠেকছে না ব্যাপারটা।

পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিতে কিষণলাল একটু ইতস্তত করল। লোকটার উদ্দেশ্য না জেনে এর চেয়ে বেশি কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করাটা বোকামি। হতেও তো পারে লোকটা বিপজ্জনক। চারপাশে আর কাউকেই তো দেখা যাচ্ছে না। তার চেয়ে এখান থেকে আওয়াজ দিলে কেমন হয়?

গলাটাকে যথাসম্ভব বাজখাঁই করে কিষণলাল চেঁচিয়ে উঠল, ‘কে? কে ওখানে?’

লোকটা সঙ্গে সঙ্গে এদিকে ফিরল। পরক্ষণেই পিছন ফিরে শেয়ালদার রাস্তা ধরে অসম্ভব ক্ষিপ্র গতিতে দৌড় মারল। হাতের বাকি কয়েকটা কাগজ রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ল। কিষণলাল তাড়া করার চেষ্টা করল না। শুধু কয়েক গজ দূর থেকে দেখল, লোকটার বেঁধে রাখা চুল খুলে গেছে।

কোমর অবধি লম্বা চুল।

.

ভবানী ভবন, কলকাতা, সকাল ১০টা ৩০

গাড়ি আলিপুর পেরোনোর আগেই দময়ন্তীর ফোনে অমিতাভ সান্যালের টেক্সট মেসেজ ঢুকেছিল। গাড়ি থেকে নেমে দেখল, কোর টিম মেম্বারদের নাম। রাহুল সেনগুপ্ত, তানিয়া গুহ, লোকনাথ পাইন, সুকুমার দত্ত। লোকনাথ আর সুকুমার সাব-ইন্সপেক্টর। অভিজ্ঞ লোক। কিন্তু প্রথম দুজন ইনস্পেকটর হলেও বয়েসে বেশ জুনিয়র। তানিয়া তো সবে প্রবেশন পিরিয়ড পার করেছে। এত হাই প্রোফাইল কেসের জন্য এরা কি একটু বেশিই বাচ্চা হয়ে গেল না? মনে সামান্য খিঁচ নিয়ে লিফটে উঠল দময়ন্তী।

অমিতাভ সান্যালের সঙ্গে এর আগে একটা ছোট কেসে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে দময়ন্তীর। আদ্যন্ত জেন্টলম্যান। ক্ষমতা-পিরামিডের আগা থেকে গোড়া সবাইকে অমিতাভ সান্যাল যথোচিত গুরুত্ব দেন। ডিজি থেকে গেটকিপার, সকলের সঙ্গে রীতিমতো পার্সোনাল রাপো মেনটেন করেন। স্বাভাবিক কারণেই তিনি তুমুল জনপ্রিয়। গোটা ভবানী ভবনকে বুকপকেটে ভরে রেখেছেন। যোগ্য মানুষ হিসেবেই চড়চড় করে উন্নতিও করে চলেছেন। এমনিতে দিলখোলা মানুষ। তবে সৌজন্য আর সম্ভ্রমের দূরত্ব অতিক্রম করেন না কখনোই। অকারণ ‘বসিং’ করেন না। অধস্তনদের স্পেস দিতে জানেন। কাজ আদায় করে নিতেও জানেন। ধরে খেলা আর ছেড়ে খেলা—দুটো আর্টই সহজাত।

আরেকটা মহৎ গুণ, মহিলা সহকর্মীদের সামনে তরল কথাবার্তা একেবারেই বলেন না। দুটো মাত্র পারমাণবিক খচখচানি। এক, ছোট্ট চেম্বারে দু-টনের এসি একেবারে সর্বনিম্ন তাপমাত্রায় চালিয়ে রেখে চেম্বারটাকে অ্যান্টার্কটিকা করে রাখেন। আর দুই, শার্টের দুটো বোতাম খোলা রাখেন। ফলে বুকের সাভানা তৃণভূমি উঁকি মারে। ব্যাপারটা এতই তুচ্ছ, বলাও যায় না। কিন্তু অস্বস্তিটাকে উড়িয়েও দিতে পারে না দময়ন্তী। কথা বলতে বলতে চোখ চলে গিয়ে খেই হারিয়ে যায়। আজও ঘরে ঢুকেই সেদিকে চোখ চলে গেল।

ঘরে তানিয়া রয়েছে। নেতাজি ইন্ডোরে একটা ডিউটিতে মেয়েটার সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। ছটফটে। ফ্ল্যামবয়েন্ট। শার্প। দুর্দান্ত উচ্চতা। চোখেমুখে উদ্দীপনা। চুলে ‘ওয়েজ’ কাট। তাতে খানিকটা মিশরের ফারাওদের মতো দেখতে লাগছে। অমিতাভ দময়ন্তীকে আপ্যায়ন জানিয়ে তানিয়ার দিকে নির্দেশ করলেন, ‘তানিয়া পরপর ঘটনাগুলো সব নোট নিচ্ছে। সঙ্গে প্রগ্রেসের আপডেটগুলো নিতে থাকবে, যখন যেমন পাওয়া যাবে।’

উঠে দাঁড়িয়ে মাথাটা সামান্য ঝোঁকাল তানিয়া, ‘গুড মর্নিং ম্যাডাম।’

দময়ন্তী সৌজন্যের হাসি হাসল।

অমিতাভ বললেন, ‘অ্যাডের লোকজন সকলেরই ডেসক্রিপশন একইরকম। ফরসা, কোঁকড়া চুল, মাঝারি হাইট, বয়স তিরিশের আশেপাশে। কেউ কেউ বলেছে চোখে কালো সানগ্লাস। তাহলে আমাদের প্রথম কাজ হচ্ছে মহিলার স্কেচ করিয়ে সব জায়গায় পাঠানোর ব্যবস্থা করা।’

দময়ন্তী বলল, ‘গিরিশ পার্ক থানার ইনস্পেকটর মণ্ডল আই উইটনেসদের ধরে লালবাজার থেকে আর্টিস্ট আনিয়ে মহিলার স্কেচ করিয়ে রেখেছেন। সকালেই কথা বলেছি আমি।’

‘ভেরি গুড,’ অমিতাভ হাসলেন, ‘আরও কিছু কাজ এগিয়ে রেখেছ কি?’

দময়ন্তী একটু সংকুচিত হল। একটু ইতস্তত করে সে বলল, ‘সব লোকাল থানার ইনভেস্টিগেটিং অফিসারদের সঙ্গেই একপ্রস্থ কথা হয়ে গেছে স্যার। আপনার অনুমতি না নিয়েই বলেছি।’

অমিতাভ খানিকক্ষণ তাঁর সেকেন্ড-ইন-কম্যান্ডের দিকে চেয়ে রইলেন। ঠোঁটে স্মিত হাসি। কিছু মানুষ প্রদীপের দৈত্যের মতো৷ একবার চালু হয়ে গেলে থামতে পারে না৷ দময়ন্তী সেরকমই৷ তুমুল হাইপারঅ্যাক্টিভ। এমন মানুষদের নিয়ে কাজ করার কিছু সমস্যা থাকে ঠিকই৷ কাজ খুঁজে না পেলে খুঁটে খুঁটে অপ্রয়োজনীয় কাজ বের করে। অকাজে এনার্জি অপচয় করে ফেলে প্রচুর৷ সহজ কাজকে অহেতুক কঠিন করার প্রবণতাও থাকে।

কিন্তু জটিল কেসের ক্ষেত্রে এইধরনের একজন টিমে থাকা খুব দরকার৷ অমিতাভ জানেন, গোটা টিমের মধ্যে একমাত্র দময়ন্তীই অপরাধী ধরা পড়ার আগে একটা রাতও ভালো করে ঘুমাবে না৷ তীব্র ব্যক্তিগত শূন্যতা থেকে এইধরনের প্রবণতা তৈরি হয় কিনা অমিতাভর জানা নেই৷ সেটা খুবই সম্ভব৷ হাজব্যান্ডের অ্যাক্সিডেন্টের ঘটনাটা দময়ন্তীকে একেবারে ভিতর থেকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু এই ট্রাজেডিটুকু বাদ দিলেও, মানুষটা এমনিই সম্ভবত বিষাদরোগে আক্রান্ত৷ এর আগে একটা কেসে কাজ করতে গিয়ে অমিতাভর সেরকমই মনে হয়েছিল।

বিষণ্ণ মানুষ অসীম ক্ষমতাশালী৷ তাকে ঠিকঠাক কাজে লাগানো গেলে ম্যাজিক হতে পারে। কারণ তার নিজের হারানোর কিছু থাকে না৷ সুবিধার কথা, দময়ন্তী কর্তব্যপরায়ণও৷ বিষাদ এবং কর্তব্যপরায়ণতা এক অপ্রতিরোধ্য জুটি৷ অমিতাভ নিজের ওপর খুশি হয়ে উঠলেন। নিজের জীবনে যথাযথ লোক বাছতে যতই ভুল করুন, তদন্তের ক্ষেত্রে লোক বাছতে আজও তাঁর ভুল হয় না৷

নরম গলায় অমিতাভ বললেন, ‘অনুমতি তুমি কাল রাতেই পেয়ে গেছ দময়ন্তী। তুমি আমাকে চেনো। রেজাল্ট পাওয়া নিয়ে কথা। ফলে আমার সঙ্গে ফর্মালিটিজের প্রয়োজন নেই। গত পরশু রাতের দুটো প্লেস অব অকারেন্সের কী কী ডিটেল জোগাড় করতে পেরেছ সেটা বলো।’

‘দুটো জায়গার সিজার লিস্ট পেয়ে গেছি। একেবারে ন্যাড়া। চিরকুট বাদে শুধু দুটো চুলের কাঁটা। মানে ওইগুলোই মার্ডার ওয়েপন।’

টেবিলে তবলার বোল তুলে অমিতাভ বললেন, ‘মুশকিল হচ্ছে, খুনের জায়গাগুলো সবকটাই পাবলিক স্পেস। গতকাল রাতেরটাও তাই। ফরেন্সিক এখানে সম্পূর্ণ কানা।’

‘হ্যাঁ। ফুটপ্রিন্ট, ডিএনএ স্যাম্পেল সব বারোটা বেজে গেছে। খুনের পরই রাজ্যের লোক ঝেঁটিয়ে ভিড় করে ক্রাইম সিনের দফারফা করে দিয়েছে। তবু দেখা যাক।’

‘চুলের কাঁটাগুলোর কোনও বিশেষ প্যাটার্ন?’

‘খুব সাধারণ মেটাল কাঁটা। যে-কোনও প্রসাধনের দোকানে পাওয়া যায়। একটা ছোট্ট পয়েন্ট। ফার্ন রোডের একটা খুন ঘাড় ভেঙে করেছে। সম্ভবত মার্শাল আর্ট গোছের কিছু জানে। আর একটা খুন এমন নৃশংস আর ইনোভেটিভ পদ্ধতিতে হয়েছে যে…।’ থেমে গেল দময়ন্তী।

‘কেন?’

অস্বস্তিমাখা গলায় দময়ন্তী বলল, ‘জাঙিয়ার মধ্যে টিকটিকি ঢুকিয়ে দিয়েছিল।’

অমিতাভ কফি খাচ্ছিলেন। এবার বিষম খেলেন, ‘টিকটিকি?’

ঘরের আরেক কোণের ছোট টেবিলে বসে ল্যাপটপে কাজ করছিল তানিয়া। সে-ও চমকে উঠল। দময়ন্তী বলল, ‘ফরেন্সিকের লোক তাই বলছে।’

‘মানে ইয়েতে অ্যাটাক করেছিল?’ অমিতাভর হাঁ বন্ধ হচ্ছে না।

দময়ন্তী একটা ছোট্ট গলা-খাঁকারি দিয়ে কথাটা এড়িয়ে গেল। বলল, ‘সমরেশ মজুমদারের একটা উপন্যাসে এরকম একটা ঘটনা ছিল। ভিয়েতনামে যুদ্ধবন্দিদের ওপর আমেরিকা নাকি এভাবেই টর্চার করত।’

অমিতাভ কয়েক সেকেন্ড সময় নিয়ে একটু ধাতস্থ হলেন। বললেন, ‘খুবই হিস্টোরিকাল শাস্তি! এ তো দেখছি রীতিমতো পড়াশোনা করা লোক!’

‘স্ত্রীলোক, স্যার।’

‘রাইট। স্ত্রীলোক।’

‘পড়াশোনার কথাই যখন বললেন তাহলে বলি, আরও একটা বিখ্যাত পিস থেকে রেফারেন্স আছে। আগাথা ক্রিস্টির একটা গল্প ছিল, “আ মার্ডার ইজ অ্যানাউন্সড”। খুনি পেপারে অ্যাড দিয়ে খুনের কথা ঘোষণা করেছিল।’

‘মনে পড়েছে। কোনও একটা অনুষ্ঠানে খুন করবে সেটা খবরের কাগজে অ্যাড দিয়ে জানিয়েছিল। মনে পড়েছে। তবে কে খুন হবে সেটা জানায়নি। এবং গল্পে সবার উপস্থিতিতেই খুনটা হয়। মহিলা তার মানে আগাথা ক্রিস্টির ভক্ত।’

‘কিন্তু কথা হচ্ছে, ক্রিস্টির গল্পটা সেই কবে লেখা। তখন খবরের কাগজে অ্যাড দেওয়াই ছিল সবাইকে জানানোর সবচেয়ে ভালো উপায়। কিন্তু এখন তো তা নয়। তাহলে খামোখা এত রিস্ক নেওয়া কেন?’

ঠোঁট কামড়ে একটু ভাবলেন অমিতাভ, ‘শি ইজ ট্রায়িং টু মেক ইট লার্জ, দময়ন্তী। বিকস শি নিডস অ্যাটেনশন। অ্যান্ড আই মাস্ট অ্যাডমিট, পুরোটার পিছনে খুব পাকা মাথা রয়েছে। পূর্ণেন্দু সরকারের পরিচিতিটাকে কী চমৎকার ইউজ করেছে বলো! অতগুলো লোককে তো ঘোল খাইয়ে দিল!’

‘তা বটে।’

‘আচ্ছা পেমেন্ট অনলাইন হয়েছিল তো? এনি লিড?’

‘হ্যাঁ। সবকটা কাগজে একই ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে পেমেন্ট করা হয়েছে। অ্যাকাউন্টটা রমা বেরা নামে একজনের। আইএফএসসি কোড এসবিআইয়ের ব্যান্ডেল ব্রাঞ্চ। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে ভদ্রমহিলা পাস্ট টেন্স। দেড় বছর আগে মারা গেছেন। তাঁর জ্ঞাতিগুষ্টি কারও সন্ধান পাওয়া যায় কিনা খোঁজ নিতে হবে।’

আর এক রাউন্ড কফি দিয়ে গেছে রমেশ। সঙ্গে অমিতাভর ফেভারিট গোল নোনতা বিস্কুট। অমিতাভ একটা বিস্কুট হাতে তুলে দময়ন্তীকে জিগ্যেস করলেন, ‘থানাগুলোকে চটপট ইনকোয়েস্ট রিপোর্ট দিতে বলো।’

‘তাড়া দিয়ে রেখেছি,’ দময়ন্তী কফিতে চুমুক দিল, ‘বউবাজার থানার ইনস্পেকটর মণ্ডল একদিনেই চমৎকার প্রগ্রেস করেছেন। ওঁকে একবার ডেকে নেওয়া যেতে পারে।’

‘ডেকে নাও আজই।’

তানিয়া আপডেট লিখে নিচ্ছিল। মেয়েটা এতই চুপচাপ যে তার উপস্থিতি দময়ন্তী ভুলেই গেছিল। এতক্ষণ পর সে বলে উঠল, ‘ম্যাম, আর কিছু আপডেট?’

দময়ন্তী তানিয়ার দিকে ফিরল। বলল, ‘না। আপাতত এটুকুই। আর ম্যাম নয়, দময়ন্তীদি। কেমন?’

লাজুক হেসে মাথা হেলাল তানিয়া।

অমিতাভ বললেন, ‘তানিয়া, তুমি যাও। এবার একটা স্প্রেডশিটে সবটা কম্পাইল করে ফ্যালো। যে যে পয়েন্টে যেমন যেমন প্রগ্রেস হবে, আপডেট করে দেবে। নতুন কোনও ঘটনা ঘটলে যোগ করবে। আপডেটেড ফাইল রোজ রাতে আমাদের মেল করবে। ওকে?’

‘কপি স্যার।’ বুট ঠুকে বেরিয়ে গেল তানিয়া।

দময়ন্তী কফি শেষ করে বলল, ‘বরুণ বিশ্বাস স্মৃতি কমিটির লোকজনকে কি একবার ডাকবেন স্যার?’

অমিতাভ শুনে একটু ভাবলেন। তারপর বললেন, ‘কীসের ভিত্তিতে ডাকব? বারো তারিখ বরুণের জন্মদিন, শুধুমাত্র এই কারণে ওদের ডাকা যায় না।’

‘তা ঠিক।’

‘শুনে খুশি হবে, গাইঘাটা আর জামদুনি দুটো জায়গারই দায়িত্ব আক্রামুল নিয়েছে।’

দময়ন্তী চমকাল, ‘আক্রামুল? শেখ আক্রামুল?’

‘ইয়েস।’

‘বলেন কী? সে অ্যাক্টিভ হয়েছে?’

‘অনেক বলেকয়ে।’

‘যাক, নর্থ চব্বিশ পরগনা আক্রামুলের খাস তালুক। ও দায়িত্ব নিলে একেবারে পিনপয়েন্ট খবর দেবে।’

‘হোপ সো।’ অমিতাভ আঙুলের ফাঁকে পেনসিল ঘোরাতে ঘোরাতে বললেন, ‘তোমার পার্সোনাল সোর্সদেরও ময়দানে নামিয়ে দিতে পারো। তার আগে কাদের পিছনে খোঁচর লাগাব, তার একটা ফুল লিস্ট রেডি করতে হবে, বুঝলে? ফান্ড নিয়ে ভেবো না। এডিজি-র সঙ্গে কথা বলে নিয়েছি। এই কেসে খোঁচররাই আমাদের প্রধান সহায় হবে, বুঝতেই পারছ।’

ইতিবাচক মাথা নাড়ল দময়ন্তী। তারপর একটু ইতস্তত করে বলল, ‘একটা কথা বলব স্যার? কিছু মনে করবেন না তো?’

‘এত ফর্মাল হবার দরকার নেই, দময়ন্তী।’

‘আপনার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলছি না। জাস্ট আমার মতটুকু বলছি। এরকম একটা কেসের পক্ষে রাহুল বা তানিয়া বড্ড ছেলেমানুষ হয়ে যাচ্ছে না স্যার?’

অমিতাভ চশমার ওপর দিয়ে তাকালেন, ‘ছেলেমানুষদের বড় হতে হবে তো! আর তাছাড়া এই বয়েসেই রাহুলের নেটওয়ার্ক কেমন তুখোড়, তুমি তো জানো। কৌশিকদার সাক্ষাৎ শিষ্য বলে কথা। আর তানিয়া নতুন হলেও ওর সবচেয়ে বড় গুণ হচ্ছে ডেডিকেশন। অবজারভেশনও দুরন্ত।’

‘হ্যাঁ, ওদের মেরিট বা কেপেবলিটি নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।’

‘তাহলে বলো, এমন ট্যালেন্টেড ছেলেপিলেকে আইপিএল বা ভিআইপি সিকিউরিটিতে ওয়েস্ট না করে তদন্তের কাজে লাগানোই ভালো না?’

‘অনেকেরই চোখ টাটাচ্ছে আসলে। এত সিনিয়র অফিসারদের ছেড়ে…।’

অমিতাভ হাসলেন, ‘সে তো তোমাকে নিয়েও কথা হচ্ছে। সিভিয়ার ডিপ্রেশন থেকে ফিরে তুমি এত বড় কেসের দায়িত্ব নেবার অবস্থায় আছ কিনা, সেই নিয়ে কি কম কথা হচ্ছে ভাবছ?’

দময়ন্তী একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করল, ‘জানি স্যার।’

‘লোকের কথায় কান দেবার বদঅভ্যেস তোমার ছিল না বলেই জানতাম। এ-ও কি ডিপ্রেশনের উপহার? তাহলে উপহারটা ফিরিয়ে দাও। সামনে কঠিন রাস্তা।’

দময়ন্তী নীরবে মাথা নাড়ল।

অমিতাভ কয়েক মুহূর্ত চেয়ে থেকে বললেন, ‘আমি তোমার ওপর ভরসা করি। তুমিও নিজেকে একটু ভরসা করো। আমি পুরোনো দময়ন্তী মুখার্জীকে চাই।’

দময়ন্তীর বুকের মধ্যে একটা কুবোপাখি তীব্র বিষণ্ণ ডাক ছেড়ে উড়ে গেল। পুরোনো দময়ন্তীকে কি অবিকল পাওয়া যাবে আর? তার অনেকটা যে রঞ্জন সরকার নিয়ে গেছে সঙ্গে করে। নন রিফান্ডেবল। সে কি আর ফেরত চাওয়ার উপায় আছে কোনও? দময়ন্তী বলল, ‘স্যার, একটা ছোট্ট কাজ আছে। আপনি অনুমতি করলে সেরে আসতে পারি।’

‘এখনই যেতে হবে?’

‘হ্যাঁ স্যার,’ বলে সামান্য ব্রেক কষল দময়ন্তী। তারপর ভাবল এইসব বাজে ট্যাবু ঝেড়ে ফেলাই শ্রেয়। বলল, ‘আসলে সাড়ে এগারোটা থেকে সাইকোলজিস্টের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েছি।’

ঠিক সেই সময় দরজা ঠেলে উঁকি মারল সুকুমার, ‘স্যার, মৌলালি থেকে কিষণলাল নামে এক ভদ্রলোক এসেছেন। বলছেন মজন্তালী সরকারকে দেখেছেন।’

.

বালিগঞ্জ, লাইভ নিউজের অফিস, সকাল ১১টা ১৫

সৌমিলি আর শিরিন দুজনেই ক্যাপিটাল পানিশমেন্টের পক্ষে। শিরিন একটু নরমপন্থী, সৌমিলি একেবারে খড়গহস্ত। শাক্য খানিকক্ষণ চুপচাপ ওদের আলোচনা শুনল। তারপর বলল, ‘তোরা পাওলো মালদিনির নাম শুনেছিস?’

‘হ্যাঁ। ফুটবল খেলতেন।’ শিরিন বলল।

‘কারেক্ট। লেজেন্ডারি ইটালিয়ান ডিফেন্ডার। এই মালদিনি একবার বলেছিলেন, বিপক্ষকে কড়া ট্যাকল করতে হচ্ছে মানেই আমি আসলে অলরেডি পরাজিত হয়েছি। শাস্তি বিষয়টা কিন্তু আধুনিক অপরাধবিজ্ঞানের চোখে খানিক সেরকমই। আধুনিক অপরাধবিজ্ঞান অপরাধীকে শাস্তি দেওয়াটাকেই চরম সাফল্য বলে মনে করে না। অপরাধ দমন করতে হলে অপরাধপ্রবণতার রুট খুঁজে বের করতেই হবে। যে দেশে জীবন বিজ্ঞানের ক্লাসে টিচার অর্ধেক জায়গা এড়িয়ে যান আর স্টুডেন্টরা মুখ টিপে হাসে, সেখানে সবকিছু সহজ হবে আশা করাটাই তো অন্যায়। ফলে শুধু শাস্তি দিয়ে দায় ঝেড়ে ফেললে চলবে?’

সৌমিলি বলল, ‘শুধু কথামৃত শুনিয়েও এ-সমাজকে শোধরানো যাবে না, শাক্য।’

শাক্য কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, ‘কী মুশকিল! শাস্তির গুরুত্বের কথা তো কেউ অস্বীকার করছে না! কিন্তু ক্যাপিটাল পানিশমেন্টের মধ্যে যে দায়সারা ব্যাপারটা আছে আমি সেটার বিরুদ্ধে। মানুষকে মেরে দায় সারলে হয় না। ওতে একরকম জান্তব সত্তার উল্লাসই প্রকাশ পায়। রেপের ঘটনায় এত যে মানুষ উল্লাস করে, তারা সব্বাই ধোয়া তুলসীপাতা? এটা মানতে হবে আমায়? তাদেরই কেউ বাসে মেয়েদের কনুই মারে, বাড়িতে বউ পেটায়, মহিলা সহকর্মীর সুযোগ নেয়। না হলে ধর্ষকের ছবির কমেন্টবক্স তার মেয়ে-বউকে পাল্টা ধর্ষণের হুমকিতে ভরে যায় কীভাবে? এই যে কোটি কোটি লোক ফাঁসি ফাঁসি করে লাফাচ্ছে, তারা কেউই কোনওদিন কোনও মেয়েকে টিজ করেনি? ভিড়ের সুযোগে কোনও মেয়ের গায়ে হাত দেয়নি? বা সেরকম ইচ্ছে মনে মনে পোষণ করে না? সুযোগ পেলে রেপ না হোক, অন্তত মলেস্ট করে সুখ পাওয়ার কথা ভাবে না? দেশজুড়ে এত ভালো লোকের ছড়াছড়ি? তাহলে প্রতি বছর এত মেয়েকে ধর্ষণ করছে কারা? সুতরাং, সচেতনতা না এলে হাজার আইন দিয়েও কিছু করা যাবে না।’

শিরিন বলল, ‘ক্যাপিটাল পানিশমেন্টকে তুই সাধারণভাবে দেখছিস কেন? এটা তো একটা হুঁশিয়ারি। সর্বত্র এত বেশি মানবাধিকার কপচালে কোনও সমস্যারই সমাধান করা যাবে না। বারাসাতের ঘটনাটা ভাব। কোনও পরিবর্তন সম্ভব? বোঝানো নিশ্চয়ই জরুরি। কিন্তু অ্যাট দ্য সেম টাইম, ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট থাকলে লোকে এরকম অপরাধ করার আগে দশবার ভাববে।’

‘অবশ্যই,’ সায় দিল সৌমিলি, ‘এটা তো ডিনাই করা যায় না যে শাস্তি জিনিসটা আছে বলেই অনেক পোটেনশিয়াল রেপিস্ট রেপ করতে ভয় পাচ্ছে। শাস্তি আরও কড়া হলে আরও বেশি সংখ্যক লোক সাবধান হবে বলেই আমার বিশ্বাস। আই এগ্রি, সচেতনতা বাড়ানোর দিকেই সবচেয়ে বেশি করে ফোকাস করা জরুরি। কনসেন্ট কী জিনিস সেটা বুঝতে শেখা জরুরি। বাট চরম শাস্তির ভয় থাকাটা দরকার।’

সৌমিলি বলল, ‘যে-আইন মানুষকে নিরাপত্তা দিতে পারে না, মানুষকে রক্ষা করতে গিয়ে যদি বাধ্য হয়ে সেরকম কয়েকটা আইন ভাঙতে হয়, তাহলে কি সেটা খুব দোষের?’

শাক্য মাথা নেড়ে বলল, ‘পিউনিটিভ জাস্টিসের ধারণা থেকে সরে না এলে সমাজ মধ্যযুগেই পড়ে থাকবে ভাই। উই আর নট মিডল ইস্ট। তাছাড়া ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট দিলে রেপ কমার বদলে রেপ করে খুনের সম্ভাবনা বেড়ে যাচ্ছে কিনা সেটা নিয়েও কথা হওয়া দরকার।’

সৌমিলি একরোখা গলায় বলল, ‘সমাজের একটা বড় অংশ যদি সাম বা দানের নীতি না বোঝে, দণ্ড ছাড়া উপায় থাকে কি?’

‘তাহলে তুই বলছিস মজন্তালী সরকারই একমাত্র রাস্তা?’ শাক্য কাঁধ ঝাঁকাল, ‘তাতে ঠগ বাছতে গাঁ উজাড় হয়ে যাবে না তো?’

ব্যালকনির দরজা খুলে মুখ বাড়াল পৃথ্বীশ চৌধুরী, ওদের ইমিডিয়েট বস। উত্তেজিত গলায় বলল, ‘তোরা এখানে গুলতানি মারছিস? রণিতার রুমে আয়! ফাস্ট!’

পৃথ্বীশের বলার ভঙ্গিতেই কিছু ছিল। মুহূর্তে সবার ভেতরে কিছু একটা টানটান হয়ে উঠল।

‘কী ব্যাপার পৃথ্বীশদা?’ সৌমিলি উত্তেজিত, ‘এনিথিং বিগ?’

‘বিগেস্ট!’ ঘন গোঁফদাড়ির ফাঁকে রহস্যময় হাসল পৃথ্বীশ, ‘ফড়িয়াপুকুর রেপ কেসের ভিক্টিম লীনা দাশগুপ্ত এসেছেন।’

.

ভবানী ভবন, কলকাতা, সকাল ১১টা ২০

কিষণলাল চলে গেলে রমেশকে একটা কোল্ড কফি আনতে বলে দিলেন অমিতাভ। তারপর কিষণলালের রেখে যাওয়া পোস্টারের গোছা থেকে একটা পোস্টার হাতে তুলে নিলেন। খুঁটিয়ে দেখে বললেন, ‘বাংলায় টাইপ করে এ-টু পেপারে ফটোকপি করেছে।’

‘মোটে খানচারেক লাগাতে পেরেছিল বেচারি। তার মধ্যেই কিষণলাল গিয়ে হাজির হয়ে ব্যাটার প্ল্যানে মুতে দিয়েছে।’ বলেই লোকনাথ মস্ত জিভ কাটল। অমিতাভর সামনে টুকটাক অশিষ্ট কথা বলা চলে। কিন্তু ঘরে দময়ন্তী রয়েছে। পিওরিটানিজমের জন্য দময়ন্তী মুখার্জী গোটা ভবানী ভবনে কুখ্যাত। লোকনাথ ভয়ানক অপ্রস্তুত হয়ে ঘরের কোণের ছোট টেবিলে গিয়ে বসে আজেবাজে কাগজপত্র নিয়ে নাড়াচাড়া করতে শুরু করল।

দময়ন্তী গম্ভীর গলায় বলল, ‘যা বুঝছি, এই কেসে ভালোই পলিটিকাল ইন্টারভেনশন সামলাতে হবে।’

‘সে আর বলতে!’ সায় দিলেন অমিতাভ, ‘পার্ক স্ট্রিট, ফড়িয়াপুকুর, জামদুনি। চেরি অন দ্য টপ হয়ে এল এই মজন্তালী সরকার। তবে একদিক থেকে ভালো। আই হেট স্ট্যাটাস কো। জীবনটা একেবারে আলুনি হয়ে যাচ্ছিল। একেবারে ভেঙেছ দুয়ার এসেছ জ্যোতির্ময় টাইপের…।’

দময়ন্তী বলল, ‘কথাটা কিন্তু এখানে ঠিকঠাক অ্যাপ্লিকেবল হল না স্যার।’

‘হল না?’

‘না। কারণ ওর পরের লাইন হচ্ছে তোমারি হউক জয়।’

‘তাই তো! খেয়াল ছিল না!’ জিভ কাটলেন অমিতাভ, ‘যা-ই হোক, আসল কথা হচ্ছে স্টোনম্যানের পর শহরে আবার সিরিয়াল কিলারের দেখা মিলল। এইবার আবার মহিলা।’

‘স্টোনম্যান আসলে স্টোনওম্যান ছিল কিনা কী করে শিওর হচ্ছেন?’

‘তা ঠিক।’

‘তাছাড়া এমনিতেও কলকাতায় মহিলা সিরিয়াল কিলার কিন্তু এই প্রথম নয়। কলকাতার প্রথম মহিলা সিরিয়াল কিলার অবতীর্ণ হয়েছিল লন্ডনে জ্যাক দ্য রিপারের আবির্ভাবেরও আট বছর আগে।’

‘বলো কী? ইন্টারেস্টিং। আরেকটু ডিটেলে বলো শুনি।’

‘প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়ের দারোগার দপ্তরে তার কথা রয়েছে। পরপর পাঁচটা খুন করেছিল সেই মহিলা। ফাঁদে ফেলে তাকে ধরেছিলেন দারোগা প্রিয়নাথ। জানা যায় সে একজন যৌনকর্মী। নাম ত্রৈলোক্যতারিণী। ১৮৮৪ সালে তাকে ফাঁসিতে চড়ানো হয়।’

‘তুমি কত খবর রাখো দময়ন্তী। এডিজি বাদে একমাত্র তোমার সামনেই আমি কমপ্লেক্স খাই।’

‘আপনার খালি বাজে কথা!’

‘সত্যি! চ্যালেঞ্জ করে বলছি, এই কেস দিয়েই তোমার কামব্যাক ঘটবে। তারপর দময়ন্তী মুখুজ্যেরে আর কেউ দাবায়া রাখতে পারবে না।’

‘আপনি আমায় নিয়ে যতটা কনফিডেন্ট, আমি নিজেকে নিয়ে ততটা নই স্যার।’

‘ফর্ম ইজ টেম্পোরারি, ক্লাস ইজ পার্মানেন্ট। বুঝলে? এই কেসই তোমার ভিতর থেকে সেই পুরোনো ঝাঁঝ ফিরিয়ে আনবে। এমন কেস বারবার আসে না।’

‘আপনার শেষ বাক্যের সঙ্গে একমত হলাম। এমন কেস সত্যিই বারবার আসে না।’

‘স্টোনম্যানকে ধরার জন্য লালবাজারের বড়কর্তাদের ফুটপাথে ভিখিরি সেজে শুয়ে থাকতে হয়েছিল, জানো তো? তবু ধরা যায়নি।’

‘সেসব তো প্রবাদ হয়ে গেছে। তবে আমার মনে হয়, ইনি অনেকদিন জ্বালাবেন। হঠাৎ গায়েব হয়ে যাবার বান্দা ইনি নন। স্টোনম্যান প্রবাবলি ওয়াজ আ সাইকোপ্যাথ। মজন্তালী সরকার হ্যাজ আ ক্লিয়ার মোটিভ। বাট দ্য স্কেচ ইজ অল উই হ্যাভ, স্যার।’

‘বুঝলে দময়ন্তী, তদন্ত হচ্ছে একটা বরফের বলের মতো। প্রথমেই হাতে যেটা পাবে সেটা হয়তো খুবই নগণ্য। কিন্তু সেটাকে ঠিক ঢালে গড়িয়ে দিতে পারলেই দ্রুত বড় হতে শুরু করবে। স্নো বল এফেক্ট। সবে তো একটা দিন গড়িয়েছে। কিপ পেশেন্স। যাই হোক, তোমার দেরি হয়ে গেল। তুমি তোমার কাজটা সেরে এসো চট করে। তারপর কার কার পিছনে খোঁচড় লাগাতে হবে তার একটা তালিকা করে ফ্যালো।’

লোকনাথ লজ্জায় কেঁচো হয়ে ছিল। দময়ন্তী বেরিয়ে যেতে উঠে এল অমিতাভর টেবিলের কাছে। অমিতাভ ফিচেল হাসি হেসে বললেন, ‘স্থান-কাল-পাত্র খেয়াল রাখতে শেখো হে, লোকনাথ ব্রহ্মচারী।’

লোকনাথ লজ্জা পেয়ে হাসল। তারপর বলল, ‘আচ্ছা স্যার, মজন্তালী মানে কী?’

‘সাহিত্য-টাহিত্য একেবারেই পড়োনি নাকি? উপেন্দ্রকিশোরের নাম শোনা আছে? উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী?’

‘শুনব না? বিরাট কবি। আমরা শক্তি আমরা বল আমরা ছাত্রদল..। এখনও ঝাড়া মুখস্থ।’

অমিতাভ বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘ওটা নজরুলের লেখা। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী একজন বিখ্যাত শিশুসাহিত্যিক। টুনটুনির গল্প, বোকা বাঘের গল্প, সাতমার পালোয়ানের গল্প এসব পড়োনি ছোটবেলায়?’

‘ঠিক ঠিক। একটু গুলিয়ে ফেলেছিলাম। তা, মজন্তালী বুঝি ওঁর বউয়ের নাম?’

অমিতাভর জিভের গোড়ায় একটা চার-অক্ষর এসে গিয়েছিল। অতি কষ্টে সংবরণ করলেন। এত অশিক্ষা আর নেওয়া যায় না। রমেশ কোল্ড কফি নিয়ে এসেছে। তাতে চুমুক দিয়ে অমিতাভ একটু ঠান্ডা হলেন। তারপর বললেন, ‘মজন্তালী সরকার উপেন্দ্রকিশোরের একটা গল্পের চরিত্র। একটা বেড়াল।’

‘বেড়াল?’ অবাক হল লোকনাথ, ‘খামোখা একটা বেড়ালের নাম কেন নিতে গেল স্যার?’

‘সেটা না-হয় মহিলাকেই জিগ্যেস কোরো। আগে ধরি।’

লোকনাথ একটু ভাবল। তারপর বলল, ‘আপনার কী মনে হয় স্যার, লোকটা ঠিক দেখেছে? সত্যিই একজন মহিলা?’

‘খবরের কাগজের লোকজনও তো তাই বলছেন। তোমার সন্দেহ যাচ্ছে না কেন?’

‘না না, তা তো বটেই’ লোকনাথ গাল চুলকে বলল, ‘আসলে…আমি বলতে চাইছিলাম, একজন মহিলা এত কিছু করছে ভাবলে কেমন একটা লাগে না?’

‘দময়ন্তী ম্যাডামের সামনে কথাটা একবার বলে দ্যাখো। মহিলারা ঠিক কী কী পারেন সেটা একেবারে জলের মতো সহজ করে বুঝিয়ে দেবে।’

লোকনাথ চোখ বড় বড় করে চুপ করে গেল। বলল, ‘দময়ন্তী ম্যাডাম খুব কড়া।’

অমিতাভ হেসে ফেললেন, ‘তোমরা যা মুখপাতলা হয়ে গেছ, তোমাদের জন্য এমন কড়া লোকই দরকার। উনি হচ্ছেন আমাদের টিমের অ্যান্টিভাইরাস।’

‘আমাদের টিমটা কিন্তু সব মিলিয়ে জবরদস্ত হয়েছে, স্যার। ইয়াং ব্লাডদের সুযোগ দিয়ে খুব ভালো করেছেন। রাহুলবাবু আর তানিয়া ম্যাডাম দুজনেই খুব ট্যালেন্টেড।’

‘আর তুমি তো আমার ফেভারিট ওল্ড বয়। তোমায় ছাড়া আমি অচল।’

লোকনাথ সলজ্জভাবে কিছু বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই সশব্দে দরজা খুলে ঘরে ঢুকল সুকুমার। হাঁপাচ্ছে। দেখেই বোঝা যায়, দৌড়ে এসেছে খানিকটা। উত্তেজিত গলায় বলল, ‘স্যার, টিভি খুলুন। ফড়িয়াপুকুর রেপ কেসের মেয়েটাকে দেখাচ্ছে।’

অমিতাভ একটু বিরক্ত হলেন, ‘হোয়াটস আর্জেন্ট ইন দ্যাট সুকুমার?’

‘মেয়েটাকে মজন্তালী সরকার চিঠি পাঠিয়েছে স্যার।’

.

বালিগঞ্জ, লাইভ নিউজের অফিস, সকাল ১১টা ৩০

‘লীনা, আপনি তৈরি তো?’ পৃথ্বীশ বলল, ‘আরেকবার ভেবে নিন।’

লীনা মাথা তুলল, ‘ভাবা হয়ে গেছে বলেই তো এসেছি।’

‘না না, আসলে এর আগে এমন ঘটনা হয়েছে। একজন সারভাইভারকে আমরা চ্যানেলে এনেছিলাম। লাইভের মাঝখানে তিনি হঠাৎ ব্যাকআউট করেছিলেন। সেজন্যই বলছি।’

‘গোটা একটা রাত আমি এটা নিয়ে ভেবেছি। সুইসাইড করার জন্য তৈরি হচ্ছিলাম। ঠিক সেই সময় মজন্তালী সরকারের চিঠিটা হাতে এল। এখন আমি বুঝেছি, সুইসাইড করার মতো কিছুই হয়নি। আমার সামনে গোটা জীবনটাই এখনও পড়ে আছে। বেঁচে থাকতে গেলে টুকটাক অ্যাক্সিডেন্ট তো হতেই পারে। তাই না? হাত-পা ভাঙে। মাথা ফাটে। নানান কিছু হয়। এটাও সেরকম। ইটস জাস্ট অ্যানাদার অ্যাক্সিডেন্ট।’

শাক্যর মুখ থেকে ফস করে বেরিয়ে গেল, ‘জাস্ট অ্যানাদার অ্যাক্সিডেন্ট?’

লীনা পূর্ণ চোখে শাক্যর দিকে তাকাল, ‘আজ্ঞে হ্যাঁ। রেপ থেকে লজ্জাটাকে মাইনাস করে দেখুন। ইটস নাথিং বাট অ্যানাদার অ্যাক্সিডেন্ট।’

শাক্যর মনে হল, মেয়েটা ওকে কষিয়ে একটা থাপ্পড় মারল। সত্যি বলতে কী, কথাটা বলেই মনে হয়েছিল, ফাউল হয়ে গেল। স্লিপ অব টাংয়ের পিছনে তো অবচেতনেরই কারসাজি। সুপার ইগোর ক্ষণিকের অমনোযোগ। তবে কি অবচেতনে সে ধরে নিয়েই বসে আছে যে লজ্জা মেয়েটারই পাবার কথা? লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিল শাক্য।

স্টুডিয়ো রুমে অস্বস্তিকর একটা নিস্তব্ধতা। কেউ কোনও কথা খুঁজে পাচ্ছে না। লজ্জা শাক্য একা পায়নি। এই মুহূর্তে আশি শতাংশ অফিস স্টাফ স্টুডিয়ো রুমে ভিড় জমিয়েছে। সবাই স্তব্ধ হয়ে লীনার দিকে চেয়ে আছে। নিজেদের ভিতরে সযত্নে পুষে রাখা একটা গহীন ভণ্ডামির সঙ্গে সবারই বোধহয় মুখোমুখি দেখা হয়ে গেছে আচমকা। রেপ সারভাইভারদের দেখলেই মানুষের সমবেদনা জানাতে ইচ্ছা করে। এই মেয়েটা সমবেদনা বা সহানুভূতি চায় না। হোঁচট খেয়েছে, আবার উঠে দাঁড়াতে চায়। এটুকুই। সিধি বাত, নো বকওয়াস।

পৃথ্বীশ ক্যামেরাম্যানের সঙ্গে শেষ মুহূর্তের জরুরি কিছু পরামর্শ করে নিল। তারপর লীনার কাছে এসে বলল, ‘লীনা, একটা ছোট্ট ইন্ট্রোর পর আপনি তাহলে চিঠিটা পড়ে শোনাবেন। তারপর কথাবার্তা এগোবে। কেমন?’

‘ঠিক আছে। জাস্ট একটা অনুরোধ।’

‘বলুন।’

লীনা বলল, ‘ইন্ট্রোয় আমাকে ফড়িয়াপুকুরের নির্যাতিতা বলে ট্যাগ করার দরকার নেই। আমার নাম নিতে পারেন স্বচ্ছন্দে। আমার নাম লীনা দাশগুপ্ত।’

.

সন্তোষপুর, কলকাতা, সকাল ১১টা ৩৫

অ্যাপার্টমেন্টের লিফটটা থার্ড ক্লাস। আরও থার্ড ক্লাস লিফটের মিউজিক। গেট খোলামাত্র এমন তারস্বরে কাড়া-নাকাড়া বাজিয়ে চেঁচামেচি শুরু হয়ে যায় যে মনে হয় লোকে লিফটে উঠে বিরাট অপরাধই করে ফেলেছে। এই একটা ব্যাপারে বিরক্ত হয়ে রাহুল পারতপক্ষে লিফট এড়িয়েই চলে৷ কিন্তু ট্যুর থেকে ফেরার সময় পিঠে ঢাউস রুকস্যাক থাকে৷ তাই নিয়ে সিঁড়ি ধরে চারতলায় ওঠা কঠিন৷ ফলে লিফটের জগঝম্প বাঁদরামি আজ মেনে নিতে হল। উঠতে উঠতে রুমাল দিয়ে ঘাড়ের ঘাম মুছল রাহুল। বেশ ক্লান্ত লাগছে। আজ অফিস কাটিয়ে দিলে হত। লম্বা ট্রেন জার্নি করে বাড়ি ঢুকে আবার বেরিয়ে পড়াটা খুবই হেকটিক। ইন ফ্যাক্ট, অমিতাভ স্যারও বলছিলেন আজ অফ নিয়ে নিতে। কিন্তু মজন্তালী সরকারের কেসটা এমন সব টার্ন নিচ্ছে, ঘরে বসে থাকা জাস্ট সম্ভব না। কাজ শুরু করে দিতে হবে। সিআইডি-তে আসার পর এত বড় কেস এই প্রথম।

পুলিশের চাকরিতে অনেকটা উঁচু পোস্ট না পেলে লোকে লালবাজার থেকে স্বেচ্ছায় ভবানী ভবনে আসতে চায় না। কারণ রাজ্য পুলিশের চাকরিতে গোটা জেলার কোন চুলোয় যে ঘুরতে হবে, তার ঠিকঠিকানা নেই। গোয়েন্দা বিভাগে স্পেশালাইজড ডিউটি বলে সেই হ্যাপা না থাকলেও অন্যরকম নানা ঝামেলা সিআইডি-তে পোহাতে হয়, যেগুলো লালবাজার ডিডি, মানে ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টে নেই। রাহুল উল্টোদিকে হাঁটছে দেখে অনেকেই অবাক হয়েছিল। কিন্তু রাহুল বরাবর চেয়েছিল সিআইডি-তে কাজ করতে। প্রথম কয়েক মাস আইপিএল, ভিআইপি সিকিউরিটি, ইলেকশন ডিউটি ইত্যাদিতে কেটেছে। তারপর টুকটুক করে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটা অ্যাসাইনমেন্টও এসেছে। সেগুলো লেটার মার্কসসহ পাশ করার ফলে অবশেষে আজ এত বড় কেসে তাকে ভরসা করা হচ্ছে। অবশ্য লাকও ফেভার করা চাই। লিফট থেকে নামতে নামতে নিজের ভাগ্যের গালদুটো মনে মনে টিপে দিল রাহুল। এইরকম কেসের জন্যই লোকে গোয়েন্দা-পুলিশে আসার স্বপ্ন দেখে।

মা দরজা খুলতে রাহুল শুনতে পেল, বাবা হাই ভল্যুমে নিউজ চ্যানেল শুনছেন। সারাদিন বসে বসে ভদ্রলোক একই খবর কী করে গিলতে পারে কে জানে! আর নিউজ চ্যানেলগুলোরও আশ্চর্য প্রতিভা, সারাদিন ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একই খবর জাবর কাটে। দিনদুয়েক আগেও চব্বিশটা ঘণ্টা হয় পঞ্চায়েত ইলেকশন, না-হয় জামদুনির খবর শোনাচ্ছিল। আর এখন তো খবর একটাই।

তপতী বললেন, ‘ভাত গরম করি?’

‘ভাত দিও না,’ রাহুল জুতোর ফিতে খুলতে খুলতে বলল, ‘ঘুমিয়ে পড়ব। অফিস যেতে হবে। তুমি বরং ছাতু গুলে দাও এক গ্লাস।’

‘আজই অফিস যেতে হবে?’

‘হ্যাঁ মা। নতুন কেস এসছে।’

তপতী বিরক্ত মুখে বললেন, ‘এমন কী কেস এসছে যে এই সবে অতদূর থেকে ফিরে এখনই ছুটতে হবে?’

‘ওই যে, বাবা যেটা শুনছে।’

‘মজন্তালী সরকার?’

মাথা নেড়ে মুচকি হেসে রাহুল বাথরুমের দিকে রওনা দিচ্ছিল, এমন সময় কমলবাবু পাশের ঘর থেকে গলা চড়িয়ে ডাকলেন, ‘শোন শোন! টিভিতে কাকে দেখাচ্ছে দেখে যা।’

এই হচ্ছে বাবার মুশকিল। কিছু-একটা দেখে উত্তেজিত হলে সবাইকে ডেকে দেখানো চাই। রাহুল তাড়াহুড়ো দেখিয়ে বলল, ‘এখন সময় নেই। স্নান করেই বেরোব।’

কমলবাবু বললেন, ‘আরে ফড়িয়াপুকুর রেপ কেসের মেয়েটা টিভিতে এসেছে। কী বলছে দ্যাখ।’

.

বালিগঞ্জ প্লেস, সকাল ১১টা ৪৫

‘তুমি করেই লিখছি। তোমার নাম আমি জানি না। ঠিকানাটুকু জোগাড় করতে পেরেছি। তোমার সঙ্গে একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে। হ্যাঁ, খুবই মারাত্মক দুর্ঘটনা। কিন্তু দুর্ঘটনা তো জীবনের অঙ্গ। অন্যান্য দুর্ঘটনায় জীবন তো থেমে যায় না। তাহলে এক্ষেত্রে কেন থামবে? তোমার সামনে একটা উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করে আছে। তুমি যদি নিজেকে গুটিয়ে নাও বা শেষ করে দাও, তাহলে কিন্তু আরও অনেক পোটেনশিয়াল রেপিস্ট সাহস পেয়ে যাবে। অনেক রেপ সারভাইভার, যারা একটু একটু করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, তাদের সবার লড়াই ধাক্কা খাবে। তুমি মাথা উঁচু করে বাইরে এসে দাঁড়াও। দেখিয়ে দাও, লজ্জাটা তোমার নয়, বাকিদের। যারা ধর্ষণ করেছে, লজ্জা তাদের। এবং যারা ভাবছে তুমি ধর্ষিত বলে তোমার জীবন শেষ হয়ে গেছে—তাদেরও। রেপ থেকে লজ্জাটাকে মাইনাস করে দিতে পারলে অর্ধেকটা লড়াই কিন্তু আমাদের জেতা হয়ে যাবে। সমাজ শিখুক যে, ধর্ষণ হলেই মেয়েরা বরবাদ হয়ে যায় না।

‘আমাদের আসল লড়াইটা কিন্তু বহুদিন ধরে দুধকলা দিয়ে বড় করা একটা মানসিকতার বিরুদ্ধে। ধর্ষণের মতো ঘটনা যার সবচেয়ে বিকৃত প্রকাশ। আমাদের লড়াই নারী পাচারের বিরুদ্ধে, পণপ্রথার বিরুদ্ধে, কন্যাভ্রূণ হত্যার বিরুদ্ধে, ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের বিরুদ্ধে। এমনকী আমাদের লড়াই আইটেম সং-এর বিরুদ্ধেও। মনে রেখো, লড়াই আসলে একটাই। যেখানে যেখানে মেয়েরা অপমানিত হচ্ছে সেখানেই আমাদের লড়াই। মনে রেখো, মেয়েদের অপমানের বিকৃততম দিক হচ্ছে ধর্ষণ। বিকৃততম, কিন্তু আলাদা কিছু নয়। ধর্ষণ বন্ধ করতে গেলে মেয়েদের সম্পর্কে সমাজ যা ভাবে তার সার্বিক বদল দরকার। যতদিন সেটা না হচ্ছে, ততদিন কঠিন হাতে প্রতিরোধ তো গড়ে তুলতেই হবে। তুমিও এই লড়াইয়ের একজন সৈনিক। নিজের নিয়মে লড়াই করো। তোমার অস্ত্র হোক লজ্জা না-পাওয়া। সুতরাং মাথা উঁচু, চোখ সামনে। ইতি—তোমার বন্ধু এবং কমরেড, মজন্তালী সরকার।’

এক ঝোঁকে পুরো চিঠিটা পড়ে লীনা থামল। প্রায় দশ–পনেরো সেকেন্ডের পিনপতনস্তব্ধতা। তারপর লাইভ নিউজের তেত্রিশজন কর্মীর হাততালির শব্দে কেঁপে উঠল স্টুডিয়ো। সৌমিলি আর শাক্য ছাড়া সবাই উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিচ্ছে। সৌমিলি কেঁদে ফেলেছে। শাক্যরও চোখে জল। শিরিন সঞ্চালকের চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে জড়িয়ে ধরল লীনাকে। ক্যামেরাম্যান কাট করেনি। সে-ও একটু আবেগাপ্লুত হয়েছে। অথবা ভেবেছে, ‘ক্যান্ডিড’ প্রতিক্রিয়াটুকু দর্শক ভালো ‘খাবে’। ফলে পুরোটাই লাইভ হচ্ছে। অমিতাভ সান্যালের কেবিনে সবার মাঝে বসে টিভির তাকিয়ে থাকতে থাকতে দময়ন্তী আর তানিয়ার গলার ভিতর কিছু-একটা দলা পাকিয়ে উঠছিল। কেউ কাউকে বলল না অবশ্য।

.

কাশীপুর, দুপুর ১টা ৪৫

এমনিতে সবকিছু ঠিকই আছে। শুধু মাঝে মাঝে লীনার মনে হচ্ছে ও লীনা নয়। লীনা দাশগুপ্ত একটা অন্য মেয়ে, যার জীবনে এসব কিছু ঘটছে।

জানা ছিল ঝড় বয়ে যাবে। লীনা প্রস্তুতও ছিল। ঘরের ঝড়টাই আসল। ওটা জেতা হয়ে গেলে দুনিয়ার সঙ্গে লড়ে নেওয়া অনেক সহজ হয়ে যায়। লাইভ নিউজের গাড়ি লীনাকে তার বাড়ির গলির মুখে ছেড়েছিল। গলিটুকু হেঁটে আসতে আসতে বিস্ময়াহত দৃষ্টিগুলো লীনা উপভোগই করছিল। টুকরো টাকরা মন্তব্যও ভেসে আসছিল। ‘কী ভয়ানক মেয়ে রে বাবা!’, ‘কোথায় লজ্জায় মুখ লুকোনোর জায়গা খুঁজবে তা না…’, ‘এইসব মেয়ের সঙ্গে এরকম হবে না তো কার সঙ্গে হবে…’ ইত্যাদি। লীনার মনে পড়ছিল এদেরই কারোর কোলেপিঠে করে ও বড় হয়েছে, কারোর কাছে ছোটবেলায় অঙ্ক শিখেছে, মাধ্যমিকে ভালো রেজাল্টের পর কেউ মাথায় হাত রেখে বলেছে, ‘আমাদের পাড়ার সবার মাথা তুমি উঁচু করে দিলে, মা।’ লীনা হেসে ফেলল। কষ্ট হচ্ছে না। শুধু মনে হচ্ছে লীনা অন্য একটা মেয়ে। মেয়েটার বড্ড কষ্ট।

বাড়ি ঢুকতেই মা যে চড়টা মারল, তার জন্যেও লীনা মনে মনে তৈরি ছিল।

মা কাঁদতে কাঁদতে বলছে, ‘সর্বনাশী মেয়ে! মুখ পুড়িয়ে এলি! টিভিতে মুখ দেখানোর আগে মরতে পারলি না তুই?’

বাবা সোফায় বসেছিল। বরাবরের চুপচাপ বাবা এই কদিনে আরও বেশি চুপচাপ, নির্জীব হয়ে গেছে। অফিস যায় না দিনের পর দিন। বাড়ি থেকেই বেরোতে চায় না। খেতে বসে ফেলে ছড়িয়ে উঠে যায়। এই ক’দিনে অনেকটা বুড়ো হয়ে গেছে লোকটা। আজও একেবারে চুপ করে বসেছিল। কিন্তু মায়ের শেষ কথাটাতেই বোধহয় হঠাৎ বাবার মধ্যে কী একটা ঘটে গেল। বাবা লাফিয়ে উঠে এসে লীনাকে আড়াল করে দাঁড়াল। ‘কী বলছ তুমি? কী বলছ এসব?’

‘কী বলছি জানো না?’

চিরকালের নির্বিবাদী বাবা বাঘের মতো গর্জন করে বলল, ‘একদম বাজে কথা বলবে না। ও কী করেছে? ওর কেন লজ্জা করবে?’

লীনা দেখল, জানলায় অনেকগুলো কৌতূহলী চোখ। তারিয়ে তারিয়ে নাটক উপভোগ করছে। চোখগুলোকে তো সয়ে নিতেই হবে। লড়াই তো সবে শুরু। এমনিতে মনটা বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আছে। মাঝে মাঝে শুধু মনে হচ্ছে লীনা অন্য কেউ, যার খুব কষ্ট। আর মাঝে মাঝে নিজের মধ্যে ফিরে এসে লীনা দেখছে, যে-লোকটা ওর কোনও ব্যাপারেই কোনওদিন কোনও কথা বলেনি, কোনও সিদ্ধান্ত নেয়নি, সব ব্যাপারে মায়ের কাছে দাস্য মেনে নিয়েছে, ঝামেলা এড়িয়ে এড়িয়ে থেকেছে সারাজীবন, আজ সে-লোকটা হঠাৎ আগ্নেয়গিরির মতো হয়ে উঠেছে। বাবা বলছে, ‘আমি আমার মেয়েকে নিয়ে গর্বিত। যে যাই বলুক আমার কিচ্ছু এসে যায় না।’

লীনার মনে পড়ল, বাবার সঙ্গে কতদিন ভালো করে গল্প করা হয় না। কৃত্তিবাসে ওর যে-কবিতাটা বেরোল সেটা কি বাবাকে দেখানো হয়েছিল? বাবা কি জানে কলেজ ফেস্টে ওর গান শুনে অমিত বসু কী বলেছেন?

মা তখন একদম চুপ করে গেছে। আর বাবা সপ্তমে গলা তুলে বলে চলেছে, ‘সবকিছু যেমন চলছিল তেমনই চলবে। ও আবার কলেজ যাবে। গানের স্কুলে যাবে। সবকিছু করবে যা যা এতদিন করছিল। সব নর্মালি চলবে। যে যা বলবে, আমরা দুজন মিলে সব বুঝে নেব।’

এইধরনের কথাবার্তার মধ্যে একটা জোলো হাওয়া থাকে। সমস্ত বরফ ভেঙেচুরে গলেটলে মনটা বেমক্কা সমুদ্র হয়ে যায়। কথা বলতে বলতে বাবা কেঁদে ফেলল। মা তো আগে থেকেই কাঁদছে। লীনারও কান্না পেয়ে গেল।

.

ভবানী ভবন, বিকেল ৪টে

গুরুগম্ভীর আলোচনার মাঝে বিকেলের চা-শিঙাড়া এসেছে। শিঙাড়ায় কামড় দিয়ে তানিয়া বলল, ‘লীনা দাশগুপ্তকে চেজ করে কি আদৌ কোনও লাভ আছে? ব্যাপারটা বড্ড সরলীকরণ হয়ে যাচ্ছে না?’

অমিতাভ হাসলেন, ‘জানি। কিন্তু আমি কোনও পৃষ্ঠাই না উল্টে এগিয়ে যেতে চাইছি না। লীনা নিজে হয়তো জড়িত নয়, কিন্তু লীনার ঘনিষ্ঠ কেউ তো হতেই পারে। অ্যাভেঞ্জার থিওরি খুবই ক্লিশেড, কিন্তু এইধরনের কেসে নিরানব্বই শতাংশ এ-পথেই সমাধান আসে। প্রতিশোধের চেয়ে বড় মোটিফ দুনিয়ায় এখনও আবিষ্কার হয়নি কিনা!’

দময়ন্তী বলল, ‘স্যার, আমাদের হাতে তো মেয়েটির বিরুদ্ধে কিছু নেই। বিষয়টাও টেন্ডার। ও নিজেই একজন সারভাইভার। সামন না করে আমি নিজেই যদি চলে যাই?’

অমিতাভ একটু ভেবে বললেন, ‘যাও।’

তানিয়া বলল, ‘স্যার, আমিও যেতে চাই। লীনাকে আমার খুব ভালো লেগেছে।’

‘ফুড চেইনটা মাথায় রেখো বাপু,’ অমিতাভ ফিক করে হাসলেন, ‘বাঘ হয়ে হরিণের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতিয়ে বোসো না।’

দময়ন্তী বলল, ‘পুল থেকে দুটো গাড়ি বলে রাখতে হবে স্যার। বেরোনোর সময় খোঁজাখুঁজি না করতে হয়।’

অমিতাভ বললেন, ‘সুকুমারকে বলে দিয়েছি। আজ সুকুমার যাবে। কাল থেকে পার্মানেন্ট একজন ড্রাইভার পেয়ে যাব। তোমরা চা খেয়ে বেরিয়ে পড়ো তাহলে।’

দরজা ঠেলে রাহুল উঁকি মারল। হাসিমুখে বলল, ‘কে কোথায় যাচ্ছে? আমিও যাব।’

অমিতাভ বললেন, ‘আরে! এসে গেছ!’

হাসিখুশি, তুখোড় বুদ্ধিমান এই ছেলেটিকে দময়ন্তী ভারি স্নেহ করে। এমনিতে ভীষণ নম্র, কিন্তু চোরা একটা আগ্রাসন রয়েছে। পি.আর. অমিতাভর মতোই দুরন্ত। সঙ্গে এক্স ফ্যাক্টর হিসেবে রয়েছে একটা ‘ডেভিল’স স্মাইল’। কানাঘুষো শোনা যাচ্ছে, অমিতাভর কাছে উপরমহলের অন্তত তিন জায়গা থেকে এ-ছেলের রেকমেন্ডেশন এসেছে। তবে রাহুল সেটার যোগ্য। তার ডেডিকেশনের প্রমাণ তো আজ আবার পাওয়া গেল। দময়ন্তী হেসে বলল, ‘ট্যুর থেকে ফিরে একটা বেলাও রেস্ট নিতে নেই?’

‘তমাল তরুমূলে এমন মোহন-বাঁশি বাজাচ্ছে, ঘরে থাকা যায়?’ রাহুল প্লেট থেকে টপ করে একটা শিঙাড়া তুলে নিয়ে বলল, ‘তা আমরা যাচ্ছি কোথায়? লীনা দাশগুপ্তের বাড়ি নাকি?’

.

কাশীপুর, বিকেল ৫টা

দেখেই বোঝা যায়, ভীষণ যত্ন নিয়ে সদ্য গোছানো একটা ঘর। ঘরের প্রত্যেকটা জিনিস অদ্ভুত নিখুঁত সেমিট্রিতে রাখা। কোথাও এক বিন্দু ধুলো নেই। একটা গোটা দেওয়াল জুড়ে কাঠের তাকভর্তি বই। সব খাপে খাপ। বোঝা যায়, ঘরটা যে গুছিয়েছে সে একজন সুখী মানুষ। দময়ন্তী অবাক হচ্ছিল। একটা চিঠি মানুষকে এতদূর মেরামত করে দিতে পারে?

সদ্য ভোরের আলোমাখা দিগন্তরেখার মতো তরতাজা দেখাচ্ছে মেয়েটাকে। পুলিশের সঙ্গে কথা বলতে হলে পৃথিবীতে কারও খুশি হবার কথা না। পুরোনো ক্ষত খুঁড়ে বেদনা জাগাতেও কারও ভালো লাগে না। লীনাকে দেখে মনে হচ্ছে সে দুটোই চূড়ান্ত উপভোগ করছে। লীনার সঙ্গে কথা যত এগোচ্ছিল, দময়ন্তী তত মুগ্ধ হচ্ছিল।

‘নিউজ চ্যানেলে যাবার ভাবনাটা তাহলে তোমারই?’

‘একেবারেই। আমি যে লজ্জা পাচ্ছি না, সেটা সবাইকে জানানো দরকার। কেউ একজন যে আমাদের মতো মানুষজনের কথা ভেবে একটা ধর্মযুদ্ধে নেমেছেন, সেটাও সবাইকে জানানো দরকার।’

‘মিডিয়ায় যাবার কথা মা-বাবাকে জানিয়েছিলে?’

‘জানলে মা কখনোই যেতে দিত না,’ একটু থমকে লীনা বলল, ‘এই নিয়ে মায়ের সঙ্গে এখনও অশান্তি চলছে।’

কথার ফাঁকে দময়ন্তী মজন্তালীর চিঠি আর খামটা খুঁটিয়ে দেখছিল। এ-ফোর কাগজে টাইপ করা। ব্রাউন পেপারের সাধারণ এগারো বাই পাঁচ খাম। লীনার মায়ের বক্তব্য, খামটা কেউ বারান্দায় ফেলে গেছিল। তানিয়ার হাতে চালান করে লীনাকে বলল, ‘চিঠিটা আপাতত রাখছি।’

‘নিশ্চয়ই।’

বইপ্রেমীদের বইয়ের সংগ্রহ থেকে তাদের স্বভাবধর্ম খানিকটা আঁচ করা যায়। তাই বোধহয় রাহুল লীনার বইয়ের তাক লক্ষ্য করছিল। এবার দময়ন্তীও সেদিকে চোখ চালাল। বেশিরভাগই বাংলা গল্প-উপন্যাস, কবিতা। বিদেশি বইও আছে। সেরকম ব়্যাডিকাল কোনও বিষয়ের প্রবন্ধ-টবন্ধের বই চোখে পড়ল না। দময়ন্তী তাক থেকে জাপানি লেখক হারুকি মুরাকামির একটা বই বের করল। ইদানীং মুরাকামিকে নিয়ে বুদ্ধিজীবী-মহলে খুব মাতামাতি হচ্ছে। দময়ন্তী এখনও ভদ্রলোকের লেখা পড়েনি। এই পুঁচকে মেয়েটা পড়ে ফেলেছে। তা-ও ইংরিজি অনুবাদে। ভাবা যায়! দময়ন্তী বইটা উল্টেপাল্টে দেখল একটু। তারপর যথাস্থানে গুঁজে রেখে লীনাকে বলল, ‘চমৎকার কালেকশন তোমার।’

লীনা হাসল, ‘ধন্যবাদ।’

‘আচ্ছা, এই চিঠিটার পর মজন্তালীর সঙ্গে তোমার আর কোনওরকম যোগাযোগ হয়নি। তাই তো?’

‘না।’

‘হাউ ইজ লাইফ, লীনা?’

আচমকা প্রশ্নটা শুনে লীনার মুখে খানিকটা রক্তের আভা ঝেঁপে এল কি? পরমুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিয়ে খুব সুন্দর করে হাসল মেয়েটা, ‘ভালো আছি। আমি খুব ভালো আছি।’

দময়ন্তী কিছু বলতে পারল না। খুব যত্ন করে লীনার একটা হাত নিজের হাতে তুলে নিল শুধু।

.

গলফ গ্রিন, বিকেল ৫টা

অঙ্কিত ঘরে ঢুকে দেখল, শালিনী বাইরের জামাকাপড় না ছেড়ে বসে আছে বিছানায়।

‘কী হল? এভাবে বসে আছ যে!’

‘এমনি। ভালো লাগছে না।’

‘এনিথিং রং?’

‘জয়ী ফোন করেছিল।’

‘কোন জয়ী?’

‘জয়িতা। যার বোনের ব্যাপারটা তুমি অংশুকে রেফার করলে…।’

‘ইয়েস ইয়েস। জয়িতা। বোনের নাম সঞ্চয়িতা, তাই না? কী হয়েছে তার?’

শালিনী ক্লান্ত গলায় বলল, ‘জয়ীর বিয়েটা ভেঙে গেল।’

‘মানে? কেন?’

‘ছেলেপক্ষ জানতে পেরেছে ওর বোন রেপ ভিকটিম।’

অঙ্কিত কোনও কথা বলতে পারল না। দুজনেই চুপ করে রইল।

প্রায় দু-মিনিট পর শালিনী বলল, ‘মুখে যে যা-ই বলুক না কেন, এই সমাজ টোটালি ইন ফেভার অব রেপ। বার্ড অব সেম ফেদার। রেপকে নিন্দে করছে সবাই। অথচ সবাই রেপিস্টের মতো করেই ভাবছে।’

অঙ্কিত হতাশ ভঙ্গিতে বলল, ‘বিয়ে-টিয়ে ছেড়ে দাও, এই তো সেদিন পেপারে পড়লাম, ক্লাস সিক্সের একটি মেয়ে, রেপড হয়েছে বলে স্কুল কর্তৃপক্ষ তাকে স্কুলে আসতে বারণ করে দিয়েছে। সে ক্লাস করলে অন্য মেয়েদের ওপর নাকি খারাপ প্রভাব পড়বে।’

‘কোনদিকে যাচ্ছি আমরা? লজ্জা কাদের পাওয়ার কথা আর লজ্জা কাদের পেতে হয়? এতদিনের অগ্রগতি তাহলে এই শিক্ষা দিল আমাদের যে, মেয়েদের সম্মান তাদের ভ্যাজাইনায় রাখা থাকে? আর পুরুষের পৌরুষ রাখা থাকে তাদের দু-পায়ের ফাঁকে? এটা কি কোনও সভ্য সমাজের নমুনা? আমার অসুস্থ লাগছে অঙ্কিত। সাফোকেটিং লাগছে।’

অঙ্কিত শালিনীর হাতের ওপর হাত রাখল, ‘রিল্যাক্স। আই থিঙ্ক ইউ নিড সাম রেস্ট।’

শালিনী অঙ্কিতের কথায় কর্ণপাত করল না। বিকারগ্রস্তের মতো বলল, ‘বাড়ির বউ বিদেশে কনফারেন্সে পেপার পড়তে বাইরে গেলে বা পুরুষ-বন্ধুদের সঙ্গে সোশাল মিডিয়ায় ছবি দিলে যে আত্মীয়স্বজন কু-ইঙ্গিত করেন, তারাও এই একই কয়েনের উল্টো পিঠ, অঙ্কিত।’

অঙ্কিত একটু যেন অবাক হল। ক্ষুণ্ণও। হাত সরিয়ে নিল, ‘এইসব কথা এখন উঠছে কেন?’

‘উঠছে, কারণ কথাগুলো প্রাসঙ্গিক।’

‘ইউ আর মেকিং ইট পার্সোনাল, শালিনী।’

‘ইট ইজ পার্সোনাল অঙ্কিত,’ চেঁচিয়ে উঠল শালিনী, ‘ইট অলওয়েজ ওয়াজ। ইটস আ চেইন। কোনও মহিলার পুত্রসন্তান হচ্ছে না বলে তাকে যে লাঞ্ছনার মুখোমুখি হতে হচ্ছে সেটাও কি এই চেনেরই অংশ নয়? পণ দিতে না পারায় যে মেয়েটিকে শ্বশুরবাড়ির লোকজন পুড়িয়ে মারল, সেটাও এই চেনের অংশ। উচ্চাকাঙ্ক্ষী, স্বাধীনভাবাপন্ন মেয়েটি নিজের চেষ্টায় একটা ভালো কেরিয়ার তৈরি করলে তাকে স্লাট শেম করা হবে, সেটাও এই চেনেরই অংশ। মেয়েদের দেখার চোখটাই ঠিক নেই আমাদের। ইউ হ্যাভ টু অ্যাক্সেপ্ট ইট। যেখানে যা কিছু হচ্ছে তার আসল কারণ এইটাই। মেয়েদের কনসেন্ট জিনিসটায় কারও বিশ্বাস নেই। মেয়েদের নিজের ইচ্ছেয় চলার অধিকারে কারও বিশ্বাস নেই। রেপ এই বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গীর কুৎসিততম আউটকাম। কুৎসিততম। কিন্তু আলাদা কিছু নয়।’

অঙ্কিত হাত উল্টে বলল, ‘তুমি কীসের সঙ্গে কীসে গোলাচ্ছ শালিনী?’

‘গোলাচ্ছি না। চেইনটাকে বোঝার চেষ্টা করো। মেয়েদের বাকি অপমানগুলো এত গা-সওয়া হয়ে যাওয়া উচিত ছিল না। মেয়েদের দেখার চোখটাই ঠিক নেই আমাদের।’

অঙ্কিত কিছু বলল না। তাকে বিভ্রান্ত দেখাচ্ছে।

শালিনী একটু অন্যমনস্ক সুরে বলল, ‘মজন্তালী সরকারের চিঠির শেষ দিকটা কিন্তু খুব ইম্পর্ট্যান্ট। মানে আমি বলতে চাইছি মজন্তালী সরকার যে-ই হোক না কেন সে যে জাস্ট একজন অ্যানার্কিস্ট না, ওই কথাগুলোই তার প্রমাণ। সে বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিষয়টা দেখছে।’

অঙ্কিত বলল, ‘কিন্তু মজন্তালী সরকারের পথটা ঠিক পথ নয়, তুমিও জানো।’

‘সে তো ঠিকই। এসব ভাবনাই বোধহয় দুর্বলের কলহ। কজনকে মারব?’

অঙ্কিত চুপ করে রইল আবারও।

বাইরে সন্ধে নামছে খুব সন্তর্পণে। সেদিকে চেয়ে শালিনী ধরা গলায় বলল, ‘গত বছর দিল্লির কেসে ধর্ষকদের পক্ষে দাঁড়ানো আইনজীবী এ.পি. সিং মিডিয়াকে কী বলেছিল মনে আছে? বলেছিল, এত রাত অবধি মেয়ে কোথায় ছিল, কার সঙ্গে ছিল, বাবা-মায়ের উচিত ছিল সেটা খোঁজ নেওয়া। আজ জয়ীর পাত্রপক্ষ বলে দিল, পরিবারটাই নষ্ট পরিবার। কজনকে মারব, অঙ্কিত?’

.

রবিনসন স্ট্রিট, রাত ১১টা ২০

সবুজ জমির ওপর সাদা দিয়ে চেনা ছাঁদে লেখা লোগো দেখে প্রথম ঝলকে বিসলেরি বলেই মনে হয়। কিন্তু বোতল হাতে নিয়ে ভালো করে খুঁটিয়ে দেখলে দেখা যায়, লেখা আছে ‘বিলসেরি’ বা ‘ব্লিস্টার’। এমন আকছারই ঘটছে। আর জিনিসপত্রের চেয়েও বেশি ঘটছে মানুষের ক্ষেত্রে। তাই অল্প সময়ে কাউকে বিশ্বাস করতে কোনওদিনই দময়ন্তীর মন চায় না। মুখোশ যদি হয়, একটু অপেক্ষা করলে খুলে পড়বেই। ফলে মজন্তালীর বিষয়ে এখনই কোনওরকম সিদ্ধান্তে আসতে দময়ন্তী নারাজ।

লীনাকে চিঠি দেবার পরে শ্রীমতী আরেকটা ছোট্ট ঘটনা ঘটিয়েছেন। পূর্ববর্তী কাণ্ডকারখানার সঙ্গে তুলনা করলে নেহাতই ঢাকের পাশে টেমটেমি। খানিকক্ষণ আগে একটা অ্যানোনিমাস ফেসবুক পোস্ট করা হয়েছে। একটা ছবি। আজ সন্ধে ৬টা থেকে সাড়ে ৬টার মধ্যে মোট কুড়িটা ফেক প্রোফাইল থেকে এটা শেয়ার হয়েছে।

সবক’টার আইপি অ্যাড্রেস বিদেশ। কোনওটা মালয়েশিয়া, কোনওটা রোমানিয়া, কোনওটা পাকিস্তান। আরও মজার কথা, সবকটা প্রোফাইল গত তিন থেকে চারদিনের মধ্যে খোলা হয়েছে। সাইবার সেল থেকে মেসেঞ্জারে পোস্টের লিঙ্ক পাঠিয়েছে। দময়ন্তী এখন সেইগুলোই দেখছে। ছবিতে যাকে দেখা যাচ্ছে তার আপাদমস্তক কালো পোশাক। স্কিনটাইট। দেহরেখা থেকে মহিলা বলে বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না। মুখে কালো হাফ-মাস্ক। পোশাকটা সম্ভবত পিভিসি জাতীয় কিছু দিয়ে তৈরি। লেদারও হতে পারে।

প্রতিটা পোস্টেই এক ডেসক্রিপশন। ফার্ন রোড, কলকাতা (পাশে সবুজ টিক), সোনারপুর (পাশে সবুজ টিক), বারুইপুর (পাশে সবুজ টিক)। এরপর কোথায়? তলায় ইংরেজিতে তিনটে হ্যাশট্যাগ। মজন্তালী সরকার, জাস্টিস ফর রেপ ভিক্টিমস আর ফাইট এগেইন্সট জেন্ডার ভায়োলেন্স।

এই পোস্টের পরেই মিডিয়া খবর করতে শুরু করেছে, মজন্তালী ক্যাটওম্যান নামে একটা চরিত্র থেকে অনুপ্রাণিত। এখানেও অনুপ্রেরণা। হাসি পেয়ে গেল দময়ন্তীর। ক্যাটওম্যানের কথা সে জানে। ডিসি কমিক্সের একটা ক্যারেক্টার। ব্যাটম্যানের সহচরী। তুখোড় ফিটনেস, মার্শাল আর্ট আর চুরিবিদ্যায় পারদর্শী। মজন্তালী সরকার নামটা এদিক থেকে যথাযথ। কিন্তু এখান থেকে কোনও লিড বা ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট পাওয়া গেল না। অ্যানালিটিকসের জয়ন্ত বলছে, ভিপিএন ইউজ করা হয়েছে। কিন্তু কঠিন মাস্কিং। ক্র্যাক করা যাচ্ছে না। ছবিটা লোকজন হুলিয়ে শেয়ার করছে। সব জায়গায় একটাই আলোচনা। মজন্তালী সরকার। অলৌকিক গল্পগাছাও ছড়াচ্ছে। কলকাতার বাতাসে প্রবাদের মতো ছড়িয়ে পড়ছেন শ্রীমতী সরকার।

দময়ন্তী বাইরে তাকাল। রাত বুড়োচ্ছে। বিনবিনে নিস্তব্ধতা ছিঁড়েখুঁড়ে মাঝেমধ্যে ছুটে যাচ্ছে বাইক বা চারচাকা। অন্ধকার রাতের গর্ভে শহরের কোন প্রান্তে কী ঘটে যাচ্ছে কে জানে।

.

বারুইপুর, রাত ১১টা ৪৫

লিকুইড মাল। সামান্য হাওয়া লাগলেই জমাট বেঁধে যায়। তখন দেখতে লাগে চিনির দানার মতো। গন্ধেই নেশা ধরে যায়।

সাপের বিষ শুনে ভচাই প্রথমটা ভয় পেয়ে গিয়েছিল। বাপটু বোঝাল, স্নেক ভেনম রক্তে না মিশলে মানুষ মরে না। শুনে ভচাই ভক করে এক খামচা মেরে দিল। তার তো অওকাদ নেই এইসব হাইফাই নেশা করার। ঝন্টুদার ল্যাজ ধরে থাকলে এসব জোটে। এক পাউন্ড গোখরোর বিষের দাম নাকি কয়েক কোটি টাকা। বড় বড় কেষ্টুবিষ্টু লোকজন এসব অ্যারেঞ্জ করে। ইউরোপ থেকে বুলেটপ্রুফ বয়ামে করে সাপ্লাই আসে বাংলাদেশের চট্টগ্রামে। সেখান থেকে বনগাঁ বর্ডার হয়ে চোরাপথে এদেশে আসে। পুলিশ জানে। বনদপ্তর জানে। কিন্তু যারা এসবের কারবার করে তাদের গায়ে হাত ছোঁয়াতে সাহস পায় না। বারুইপুরের শহরতলিতে নতুন গজিয়ে ওঠা এই ফার্মহাউজটায় প্রতি উইকেন্ডেই যে রেভ পার্টি হয়, পুলিশ জানে না এমন নয়। কিন্তু ঝন্টুদাকে ঘাঁটাবে কে? ঝন্টুদা হচ্ছে বারুইপুরের বেতাজ বাদশা।

পৌনে বারোটা বাজতে ভচাই বেরিয়ে এল। কাল সকাল সকাল পঞ্চসায়রে একটা সেটলমেন্টের কাজ আছে। বেশিক্ষণ থাকলেই বেশি টানা হয়ে যাবে। অ্যাসাইনমেন্ট মিস করলে ঝন্টুদা হেবি খচে যায়। তাছাড়া আজ ঝন্টুদার গাড়িতে ফেরা যাবে না, সে ভচাই অনেক আগে থেকেই বুঝতে পারছিল। কারণ ঝন্টুদার সঙ্গে আজ মেয়েছেলে আছে। সাপের মতো হিলহিলে শরীর। সন্ধে থেকে লেপ্টে আছে দুজনে। মেয়েটা এই লাইনে নতুন বোধহয়। আগে কোনওদিন দ্যাখেনি। বাপটু বলছিল, কলেজ স্টুডেন্টরাও নাকি হাতখরচা ওঠাতে এই লাইনে আসছে আজকাল। বিদেশের মতো ব্যাপারস্যাপার আরকি। তা ভালো। ভচাইয়েরও বিদেশের মতো ফ্রি সমাজই ভাল্লাগে।

বাইরে বেরিয়ে এসে পার্কিং লটের দিকে উঁকি মারল ভচাই। চেনা কেউ যদি বেরোয়, তার বাইকের পিছনে উঠে পড়তে হবে। কিন্তু কেউ নেই। টু আর্লি। এখন বোধহয় কেউ ফিরবে না। একটা গাড়ি ছাড়িয়ে ডানদিকে ফিরতেই ভচাই দেখল একটু দূরে কে যেন একটা শুয়ে আছে, আর তার ওপর ঝুঁকে আছে আরেকজন। জামাকাপড় দেখে বুঝল, মেয়েছেলে। আর যে শুয়ে আছে সে ব্যাটাছেলে।

লোকটা শুয়ে আছে কেন? বেশি নেশা হয়ে গেছে নাকি? এগিয়ে গেল ভচাই। ভচাইয়ের উপস্থিতি টের পেয়ে মেয়েটা মুখ তুলল। আরে! এ-যে সেই মেয়েটা। ঝন্টুদার আজকের ডিনার।

ঠিক সেই সময় আলো এসে পড়ল শুয়ে থাকা লোকটার মুখে। আতঙ্কে ভচাইয়ের মাথা ঘুরে গেল।

লোকটা ঝন্টুদা। দাঁত চিরকুটে পড়ে আছে। গলায় একটা ধারালো কিছু বিঁধে আছে। চুঁইয়ে নামছে রক্ত।

ভচাই টাল খেয়ে আছড়ে পড়ল পাশের গাড়িটার গায়ে। রাতপাখির মতো তারস্বরে চিৎকার করে উঠল গাড়ির সাইরেন।

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *