মজন্তালী সরকার – বিংশ দিন

বিংশ দিন

তারিখ : ২১ আগস্ট, ২০১৩

হ্যারিসন রোড, সকাল ৭টা

পৃথ্বীশদা সকাল সকাল ফোন করে ঘুম ভাঙিয়ে বলল, ‘আর্জেন্ট। গাড়ি পাঠাতে পারছি না। ক্যাব ধরে এখনই চলে আয়।’

হুড়ুমধুড়ুম করে তৈরি হয়ে ক্যাবে উঠে সৌমিলিকে ফোন করল শাক্য, ‘তুই কোথায়?’

‘অফিসে। আমার তো মর্নিং। তুই চলে আয় চটপট। বিরাট লিড পাওয়া গেছে।’

‘কী? বল না!’

‘আয় না। এত তাড়া কীসের?’ কটাস করে লাইন কেটে দিল সৌমিলি।

ঝাঁটপাতি জ্বলে গেল শাক্যর। একে ঘুমটা ভালো করে কাটেনি এখনও। তার ওপর সবাই মিলে রহস্য করছে। এখন অফিস পৌঁছানো অবধি পেটটা গুড়গুড় করবে।

নিউজ চ্যানেলের অফিস ঘুমোয় না। শাক্য ক্যাব থেকে নেমে সিকিউরিটি মিশ্রাজিকে ‘রাম রাম!’ বলে ছুট্টে গিয়ে লিফটে উঠতে যাবে, পিছন থেকে চিৎকার শুনতে পেল, ‘দাঁড়া দাঁড়া! দরজাটা থামা!’ শাক্য দেখল আলুথালু বেশে দৌড়ে আসছে শিরিন। শাক্য দরজা থামাল। শিরিন হাঁপাতে হাঁপাতে এসে ঢুকল। লিফট উঠতে শুরু করল।

শাক্য বলল, ‘কী ব্যাপার বল তো!’

বড় বড় শ্বাস ফেলতে ফেলতে শিরিন বলল, ‘কে জানে!’

তিনতলায় নিজেদের ডেস্কের জায়গায় গিয়ে শাক্যরা দেখল সৌমিলি আর রণ দাঁড়িয়ে আছে। পৃথ্বীশ অস্থির হয়ে পায়চারি করছে। ওদের দেখে পৃথ্বীশ চোখ-মুখ বিস্ফারিত করে বলল, ‘দময়ন্তী মুখার্জীকে একটু আগে নর্থ বেঙ্গলের রাস্তায় দেখা গেছে। ওরা বাই রোড শিলিগুড়ি যাচ্ছে।’

‘শিলিগুড়ি?’ শাক্য ভুরু কুঁচকে জিগ্যেস করল, ‘মজন্তালী শিলিগুড়ি পালিয়েছে?’

‘সেটাই তো লাখ টাকার প্রশ্ন। ঘণ্টাখানেক আগে ওদের গাড়ি প্রবলেম করায় রায়গঞ্জ পুলিশ স্টেশনে কিছুক্ষণ হল্ট নিয়েছিল। আমাদের এক করেসপন্ডেন্ট প্রভাস গাঙ্গুলী তখন একটা খুনের ব্যাপারে সেখানেই ছিল। ওদেরকে প্রভাস চেনে। তাই তড়িঘড়ি আমাকে ফোন করল যে আমি এই বিষয়ে কিছু জানি কিনা।’

‘পুরো নাটকের যবনিকা পতন হবে নর্থ বেঙ্গলে!’ রণ বেজায় উত্তেজিত।

‘তাই তো মনে হচ্ছে!’ বলে দাড়ি চুলকাতে চুলকাতে শাক্যর দিকে তাকিয়ে পৃথ্বীশ বলল, ‘শাক্য, তুই আর রণ এখনই শিলিগুড়ি রওনা হয়ে যা। ন’টা পঁচিশে এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইট আছে। দশটা দশের মধ্যে বাগডোগরা নামিয়ে দেবে।’

‘এক মিনিট পৃথ্বীশদা,’ পৃথ্বীশকে কথাটা ঠিকমতো শেষ করতে না দিয়েই বলে উঠল শিরিন, ‘এই অ্যাসাইনমেন্টটা আমি আর সৌমিলি করব। প্লিজ।’

পৃথ্বীশ এমনভাবে তাকাল যেন তার চোখের সামনে ক্রেনিয়াস গ্রহের অ্যাং দাঁড়িয়ে আছে, ‘আমি ভুল শুনলাম, নাকি তুই এইমাত্র সত্যিই একটা ভয়ঙ্কর হাস্যকর কথা বললি?’

‘হাস্যকর কথা! কেন?’

‘হাস্যকর নয়? তোদের দুজনকে কী করে ছাড়ব? তাহলে শাক্যর সঙ্গে তুই বা সৌমিলি চলে যা!’

‘একটা ছেলের সঙ্গে গেছে শুনলে সৌমিলির মা ওকে ত্যাজ্যকন্যা করে দেবে, সেটা জানো? আর আমারও এক প্রবলেম। তার চেয়ে ভালো আমরা দুজন যাই।’

পৃথ্বীশ বিমূঢ় চোখে সৌমিলির দিকে তাকাল। সৌমিলিও একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেছে। কী বলবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। শিরিন যে বেমক্কা এমন একটা আবদার করে বসবে, কে জানত!

শিরিন বলল, ‘দময়ন্তী মুখার্জীর সঙ্গে আমাদের পার্সোনাল জেলিং খুব ভালো। সেটাও ভাবো।’

‘এরকম একটা বিপজ্জনক কাজে দুটো মেয়েকে ছেড়ে দেব?’ পৃথ্বীশ ঘাড় বেঁকিয়ে বলল, ‘তোদের যদি কোনও বিপদ-আপদ হয়?’

রিস্ক ফ্যাক্টরটা সৌমিলিকেও ভাবাচ্ছিল। আলটপকা এই প্রস্তাবে ভিতর থেকে সায় আসছিল না ঠিক। কিন্তু শিরিনের স্পিরিটটাকে অন্তত সমর্থন করা দরকার। সৌমিলি তড়িঘড়ি বলল, ‘বিপদ-আপদ তো ছেলেমেয়ে দেখে আসবে না, পৃথ্বীশদা।’

রণ বলল, ‘মেয়েদের কিছু এক্সট্রা বিপদ থাকে। এটা যদি তোরা স্বীকার না করিস, কিছু বলার নেই। সব প্রশ্নের উত্তর ফেমিনিজম দিয়ে পাওয়া যায় না।’

‘বোকা বোকা কথা বলিস না রণ,’ ধমকে উঠল শাক্য, ‘এখানে ফেমিনিজম আসছে কোত্থেকে! ওরা দুজন এ-ব্যাপারে এনি ডে আমার বা তোর চেয়ে বেশি যোগ্য।’

শিরিনের চোখ পৃথ্বীশের দিকে। বাকিদের সে যেন গ্রাহ্যই করছে না। জেদি গলায় বলল, ‘আমরা কি মুচলেকা দিয়ে যাব পৃথ্বীশদা? যে আমাদের কিছু হলে তুমি দায়ী থাকবে না?’

পৃথ্বীশ তোম্বা মুখে দাঁড়িয়ে রইল।

.

শিলিগুড়ি, সকাল ১১টা

অমিতাভ সান্যাল একটা কনট্যাক্ট দিয়েছিলেন। রামকৃষ্ণ ঘোষ। শিলিগুড়ি পুলিশ কমিশনারেটের অ্যাডিশনাল ডেপুটি কমিশনার। দময়ন্তীরা পৌঁছেই তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে। জাঁদরেল লোক। লম্বা-চওড়া ভীতিপ্রদ চেহারা। গলাটা অবশ্য সেই তুলনায় মিহি। কথা বললে মনে হয় অন্য কেউ ‘ডাবিং’ করছে। মিঃ ঘোষ আগেই একজন ইনফর্মারকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। তার নাম মোহন।

এয়ারপোর্ট থেকে জোগাড় করা নুটুর ছবি দেখিয়ে দময়ন্তী মোহনকে প্রশ্ন করল, ‘একে চেনো?’

মোহন ছবিদুটো হাতে নিয়ে এক মুহূর্তও না ভেবে বলল, ‘চিনি সাব। উপেন। পশুর চামড়া পাচার করে।’

‘ওর সঙ্গে আরেকজন থাকে। বুয়া।’

‘বুয়া নামে কাউকে তো চিনি না। উপেনের সঙ্গে থাকে পরকাশ।’

‘পরপর ছবিগুলো দ্যাখো তো, পরকাশের ছবি আছে কিনা।’ বলে মোহনের সামনে ফোনটা ধরে ওই একই ফ্লাইটের অন্যান্য পুরুষ-যাত্রীদের ছবিগুলো পরপর স্ক্রোল করতে শুরু করল দময়ন্তী।

খান পাঁচ-সাতেক ছবির পরেই মোহন আঙুল তুলে বলে উঠল, ‘এই তো পরকাশ।’

‘যে কৃষ্ণ সে-ই মুরারী,’ দময়ন্তী রাহুলের দিকে ফোনটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘স্যারকে পাঠিয়ে দে।’ বলে মোহনকে বলল, ‘আচ্ছা মোহন, এই উপেন আর পরকাশের শুনেছি সিমকার্ডেরও বিজনেস আছে? আনঅথরাইজড সিমকার্ড।’

‘সেটাও আছে ম্যাম। ইস্ট ইন্ডিয়া পুরোটা, নেপাল, ভুটান আর বাংলাদেশে এদের একচেটিয়া বিজনেস। উপেন কলকাতা থেকে অপারেট করে। পরকাশের এরিয়া নেপাল, বাংলাদেশ। এখানে পরকাশই বেশি আসা-যাওয়া করে।’

দময়ন্তী জিগ্যেস করল, ‘এখানে এলে কোথায় কোথায় থাকে বলতে পারবে?’

‘আমি বলতে পারব না সাব। ওয়াংডু বলতে পারবে।’ মোহন মিঃ ঘোষকে বলল, ‘ওয়াংডুকে তো আপনি চেনেন সাব?’

রামকৃষ্ণ ঘোষ চোখ বুজে কয়েক মুহূর্ত ভেবে বললেন, ‘ভক্তিনগর চোরাবাজারের ওয়াংডু?’

‘হাঁ সাব।’

‘কোথায় পাব ওকে?’

‘জুবিলি চকের কাছে রহমত আলির বাড়িতে সন্ধেবেলা তাস খেলতে যায়।’

‘তাড়া আছে আমাদের। এখন কোথায় পাব?’

‘সেটা তো বলতে পারব না সাব।’

রাহুল বলল, ‘রহমত আলি নিশ্চয়ই বলতে পারবে।’

.

শিলিগুড়ি, হোটেল টিউলিপ, ফোন, দুপুর ১টা ৩০

ঘরে ঢুকে ব্যাকপ্যাকটা সোফায় নামিয়ে রেখেই পৃথ্বীশকে ফোন করল শিরিন, ‘প্রভাসদার নেটওয়ার্কিং জাস্ট অসাম! ওদের খোঁজ পেয়ে গেছি!’

‘শাবাশ!’ পৃথ্বীশের গলায় খুশি ছলকে উঠল, ‘কোথায় আছে ওরা?’

‘হোটেল প্ল্যাটিনাম। আর আমরা উঠেছি প্ল্যাটিনামের অপোজিট ফুটে একটু এগিয়ে হোটেল টিউলিপে।’

‘ভেরি গুড। শোন, দিস ইজ আ হিমালয়ান অপরচুনিটি। মজন্তালী যদি ওখানে ধরা পড়ে, আমরা ফার্স্ট হ্যান্ড স্টোরি করতে পারব। একমাত্র আমরা! এক্সক্লুসিভ! আপাতত কিপ সেফ ডিসট্যান্স অ্যান্ড ওয়াচ। বুঝলি?’

‘বুঝলাম। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, এই মুহূর্তে ওরা হোটেলে নেই।’

‘যাঃ! কোথায় গেছে?’

‘সেটাই তো প্রশ্ন।’

একটু চুপ করে থেকে মিয়নো গলায় পৃথ্বীশ বলল, ‘তোদের যাওয়াটা কি জলে গেল?’

‘চিন্তা কোরো না। আমি একটা ব্যবস্থা করেছি। হোটেল প্ল্যাটিনামের একজন সিকিউরিটিকে টাকা খাইয়েছি। বলে এসেছি ওই সাহেবরা ফিরলেই আমাকে ফোন করতে। প্রভাসদাও খোঁজ লাগাচ্ছে। এদিকের আরও কয়েকজন করেসপন্ডেন্টকে ফোন লাগাচ্ছি। কিছু-না-কিছু জানা যাবেই।’

‘বেশ বেশ। চেক আউট করেনি যখন, চিন্তা নেই। যাক গে, শোন, আমি কিছু টাকা তোকে ব্যাঙ্ক ট্রান্সফার করে দিচ্ছি। টেক কেয়ার, কেমন?’

ফোন রেখে শিরিন ঝুপ করে সোফায় বসল। অসম্ভব ক্লান্ত লাগছে। চেবানো ডাঁটার মতো নিঃশেষিত মনে হচ্ছে নিজেকে। একইসঙ্গে প্রবল একটা উৎকণ্ঠা কামড়ে ধরে আছে মাথাটাকে। কোন তাস লুকিয়ে আছে মজন্তালী সরকারের এই উত্তরবঙ্গ-পর্বের আস্তিনে?

.

শিলিগুড়ি, জুবিলি চক, সন্ধে ৭টা

দরজায় খুটখুট শুনেই ফোন কেটে ঝট করে ঘুরে দাঁড়াল দময়ন্তী। গিয়ে দরজা খুলে দেখল, অ্যাডিশনাল ডিসি রামকৃষ্ণ ঘোষ দাঁড়িয়ে আছেন। হাতে পেয়ালা-পিরিচ। একগাল হেসে ভদ্রলোক বললেন, ‘চা।’

‘থ্যাঙ্কিউ,’ দময়ন্তী হাসির ভঙ্গিতে ঠোঁট টানল, ‘খুব দরকার ছিল। কিন্তু তা বলে আপনি চা নিয়ে আসবেন?’

‘তাতে কী হয়েছে?’ আপ্যায়নের হাসি হাসলেন রামকৃষ্ণ ঘোষ, ‘হোটেলের চা-টা দেখলাম জঘন্য। তাই ভালো চা-পাতা আনিয়ে করালাম। আপনার জন্যেও নিয়ে এলাম।’

দময়ন্তী পাল্টা সৌজন্যের হাসি হাসল। লোকটা বড় পদাধিকারী হলেও অমায়িক। ইগোহীন।

রামকৃষ্ণ ঘোষ চোখ কুঁচকে দময়ন্তীকে ভালো করে লক্ষ করছিলেন। বললেন, ‘কিছু মনে করবেন না ম্যাডাম, আপনার চোখমুখ দেখে মনে হচ্ছে দিনকয়েক একেবারেই ঘুমোননি।’

কথাটা সত্যি। ক্লান্তি দময়ন্তীর সর্বাঙ্গে পোস্টারের মতো সেঁটে আছে। একথার জবাবে কী-ই বা বলা যায়। ঠোঁট উল্টে মৃদু ঘাড় নাড়ল দময়ন্তী।

‘জানি প্রবল উৎকণ্ঠায় থাকতে হচ্ছে, কিন্তু না ঘুমালে তো অসুস্থ হয়ে পড়বেন। আমি বলি কী, একটু পাওয়ার ন্যাপ দিয়ে নিন না। আমার লোকজন তো রয়েইছে। রহমত পালাতে পারবে না।’

দময়ন্তী আবারও ঘাড় নাড়ল। এবার সম্মতিসূচক। শিলিগুড়ির অ্যাডিশনাল ডিসি হেসে বিদায় নিলেন।

দরজায় ছিটকিনি আঁটতে আঁটতে দময়ন্তী ভাবল, রামকৃষ্ণ ঘোষ কি জীবনানন্দের কবিতা পড়েছেন? তাহলে তাঁকে বোঝানো সহজ হত। ‘জানিবার গাঢ় বেদনার অবিরাম— অবিরাম ভার…’ কাকে বলে, তা যে বোঝে, সে-ই শুধু বোঝে। বাকিদের বোঝানো যায় না। দময়ন্তী কাউকে কী করেই বা বোঝাবে যে তার ঘুম নেই, শুধু ট্রাঙ্কুলাইজার আছে?

তার ওপর অজ্ঞাতপরিচয় একদল মেয়ে জেগে আছে। বাকি মেয়েদের জন্য। শহরের সব মেয়ে যাতে নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারে, সেজন্য জেগে আছে তারা। শহরের দিন আর রাতের দখল নিচ্ছে সেই মেয়ের দল, যাতে কেউ কোনও মেয়ের গায়ে অবাঞ্ছিত হাত ছোঁয়ানোর সাহস না পায়। আর দময়ন্তীরা? দময়ন্তীরা তাদেরই হদিশ পেতে দিনরাত এক করে ফেলছে।

তারপরও কি ঘুম আসে? আসা উচিত?

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *