দ্বাদশ দিন
তারিখ : ১৩ আগস্ট, ২০১৩
কাশীপুর, সকাল ১০টা ১৫
লীনা আজ কলেজে যাবে প্রায় আড়াই মাস পর।
স্নান সেরে বেরিয়ে ওয়ারড্রোব ঘেঁটে লীনা হলুদ সালওয়ারটা বের করল। প্রতিদিনের বাইরে যাবার জন্য যে ড্রেসগুলো, তার মধ্যে এটাই ওর সবচেয়ে পছন্দ। দু-দিন আগে ল্যাকমে-র নতুন একটা নেলপলিশ এসেছে ফ্লিপকার্টে। রংটার নাম কোম্পানি রেখেছে রেড রিস্ক। নামটা দারুণ পছন্দ লীনার। অনেকদিন পর আজ আবার ট্রাই করবে।
লীনা ইউনিভার্সিটি যাবে শুনে বাবা তো দারুণ খুশি। অফিস যাবার পথে ড্রপ করে দিতে চাইছিল। লীনা বারণ করেছে। নিজেই যাবে। বাসে। কোনও জড়তা রেখে লাভ কী? মা যথারীতি কোনও মন্তব্য করেনি। মুখ গোমড়া করে সরে গেছে সামনে থেকে। লীনা মন খারাপ করেনি সেটা নিয়ে। ড্রেস করতে করতে নিজেকে তার মনে হচ্ছিল দৌড়বীর। একটার পর একটা হার্ডল টপকে এগিয়ে যেতে হবে। আজ বোধহয় সবচেয়ে বড় হার্ডল অপেক্ষা করছে। কলেজ। মানে গোটা দিন অজস্র পাবলিক ইন্টেরাকশন। অজস্র চোখ। অজস্র কথাবার্তা। এক-একটা মুহূর্ত এক একটা চ্যালেঞ্জ। তবে ভয় লাগছে না একটুও। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে লীনা নিজের কাঁধে মৃদু চাপড় দিল। চ্যাম্পিয়ন! অন ইয়োর মার্ক!
.
ভবানী ভবন, সকাল ১১টা
ভচাইয়ের থেকে একটা পোর্ট্রেট পার্লের বেশি কিছুই পাওয়া যায়নি। কিন্তু মজার কথা, এই হুলিয়াটা আগের তিনটে হুলিয়ার সঙ্গে একেবারেই মিলছে না। অর্থাৎ আরও একটা নতুন চেহারা। অমিতাভ হতাশ। তিনি এটাকে ‘ডেড এন্ড’ হিসেবেই ধরছেন। দময়ন্তী অবশ্য ‘ওপেনিং’ হিসেবে এতে অখুশি নয়। চা খেতে খেতে অমিতাভকে সে বলল, ‘সম্পূর্ণা মিত্র আজ সন্ধেয় সময় দিয়েছেন। আমার গাট ফিলিং বলছে দ্যাট মে বি অ্যান ওপেনিং টু। তানিয়া সম্পূর্ণার একটা প্রাইমারি ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করেছে। শুনুন।’
তানিয়ার সামনে নোটবুক খোলা ছিল। বলল, ‘উঠতি অভিনেত্রী হলেও সম্পূর্ণা মিত্র ইজ নট ভেরি ওয়েল কানেকটেড। ছবির ক্ষেত্রে চুজি, বন্ধুবান্ধবের ক্ষেত্রেও। পার্টি একেবারে অ্যাটেন্ড করেন না বলা ভুল, তবে পার্টি অ্যানিম্যাল নন একেবারেই। কখনোই খুব রাত অবধি পার্টিতে থাকেন না। কারও বাড়ি স্টে করতে চান না। একটু প্রাইভেট কাইন্ড অব পারসন।’
অমিতাভ মাথা নাড়লেন, ‘হয়তো অতীতের জন্য। অতীতের ভূত হয়তো এখনও তাড়া করে বেড়ায়।’
‘পরের পয়েন্টগুলো স্ট্রাইকিং। সোলো ট্যুর করেন মাঝেমধ্যেই। ড্রাইভ করতে ভালোবাসেন। নিজে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। মাঝে মাঝে মাঝরাতেও। হুন্ডাই এসইউভি গাড়ি। লেট নাইট খুনগুলোর দিন তিনি গাড়ি নিয়ে বেরিয়েছিলেন।’
‘এখানে প্রশ্ন হচ্ছে, উনি কি বরাবরই এভাবে রাতবিরেতে বেরিয়ে পড়তেন, নাকি এই অভ্যেসটা তাঁর হালে এসেছে?’
রাহুল দ্রুত পায়ে ঘরে ঢুকে বলল, ‘টিভি চালান।’
‘কী হল আবার?’
রাহুল টিভির রিমোট খুঁজতে খুঁজতে জবাব দিল, ‘তিয়াসা পৈলান নতুন করে কেস করছে। ক্ষতিপূরণের টাকা আটকে আছে বলে। উকিল কে জানেন?’
‘কে?’
এদিক-ওদিক খুঁজে অমিতাভর টেবিলের ডেস্ক অরগ্যানাইজার থেকে রিমোটটা খুঁজে পেল। টিভি অন করতে করতে বলল, ‘আওয়ার ভেরি ওন বিবস্বান দত্ত। দেখুন।’
রাহুল টিভি অন করে লাইভ নিউজে যেতেই স্ক্রিন জুড়ে আবক্ষ দেখা গেল শামলা-আঁটা বিবস্বান দত্তকে। পিছনে কলকাতা হাইকোর্টের বিল্ডিং। ইতিউতি হেঁটে যাচ্ছে লোকজন। বিবস্বান দৃপ্ত গলায় বলছেন, ‘দেশে অ্যাসিড আক্রান্তদের ক্ষতিপূরণ দেবার ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সরকার ও সুপ্রিম কোর্টের নির্দিষ্ট গাইডলাইন রয়েছে। দুর্ভাগ্যবশত এই গাইডলাইন কখনোই ঠিকমতো মেনে চলা হয় না। হামলার পরে চিকিৎসা, অপারেশনের বিপুল খরচ থাকে। সময়ে টাকা না পেলে খুবই সমস্যায় পড়তে হয়। এছাড়া আক্রান্তদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করাও কিন্তু সরকারের নৈতিক কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। শুধু আমার ক্লায়েন্ট তিয়াসা পৈলানের কথা বলছি না, আমি সেই সমস্ত দুর্ভাগাদের কথা বলছি যারা এই ঘৃণ্য অপরাধের শিকার হয়েছেন। আমি তাঁদের স্থায়ী পেনসন প্রকল্প তৈরির জন্য পিটিশন দাখিল করব। আরও একটা তথ্য আপনাদের দিই। এই ব্যাপারে আমাদের সহায়তায় এগিয়ে আসবেন শাহরুখ খানের মীর ফাউন্ডেশন। অ্যাসিড সারভাইভারদের নিয়ে তাঁরা বড়সড় পরিকল্পনা করছেন।’
লাইভ নিউজের প্রতিনিধিটি সবার চেনা। সৌমিলি। বিবস্বানকে সে প্রশ্ন করল, ‘সুজান জর্ডানের পর এবার তিয়াসা পৈলান। আপনার ক্লায়েন্টদের সঙ্গে মজন্তালী সরকারের একটা যোগসূত্র বারবার করেই সবার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসছে। এ-ব্যাপারে আপনি কিছু বলবেন?’
বিবস্বান বললেন, ‘দেখুন, মজন্তালী সরকারের বিষয়ে আমি কোনও মন্তব্য করব না। আমি আমার ক্লায়েন্টদের ব্যাপারে কথা বলতে পারি। আমার এই দুই ক্লায়েন্টের মধ্যে একটাই মিল। এঁরা দুজনেই নির্যাতন এবং অবিচারের শিকার। আমি এঁদের ন্যায়বিচার পাইয়ে দেবার জন্য লড়ব। ধন্যবাদ।’
ক্যামেরা বিবস্বানকে ছেড়ে ফোকাস করল সৌমিলিকে। সৌমিলি এন্ডিং দিচ্ছে। ভল্যুম কমিয়ে দিল রাহুল।
অমিতাভ দময়ন্তীর দিকে তাকালেন। দময়ন্তীর মুখে মেঘ। বলল, ‘এই লোকটা তো পিছনই ছাড়ছে না।’
অমিতাভর মুখও ভারী, ‘যতটা ভাবছিলাম, লোকটার নৌকা দেখছি তার চেয়েও উঁচুতে বাঁধা। আরও ভালো করে কাল্টিভেট করতে হবে।’
‘কিন্তু এর মুভমেন্ট খুব ক্লিন,’ রাহুল বলল, ‘সোর্স কোনও ফিশি মুভমেন্ট রিপোর্ট করেনি এখনও পর্যন্ত।’
তানিয়া কম্পিউটারে খুটখাট করছিল। মুখ তুলে অমিতাভকে জিগ্যেস করল, ‘স্যার, গাইঘাটা থেকে কোনও লিড নেই, না?’
অমিতাভকে একটু অবাক মনে হল। এই প্রশ্নটা যেন আশা করেননি। বললেন, ‘নাথিং।’
‘বরুণের বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজনকে ডেকে একবার জেরা করলে হত না?’
‘বারোই সেপ্টেম্বর বরুণ বিশ্বাসের জন্মদিন বলে? এই সামান্য একটা হাঞ্চ নিয়ে ওদের জিজ্ঞাসাবাদ করা সম্ভব না, তানিয়া। বরুণের কেসে এমনিতেই সিআইডি-র যথেষ্ট মুখ পুড়েছে।’
দময়ন্তী ডায়েরি খুলে কীসব আঁকিবুঁকি কাটছিল। বলল, ‘তানিয়া, একবার রেকর্ডস সেকশনে যাবি? দুটো ফাইল লাগবে।’
‘শিওর,’ তানিয়া উঠে দাঁড়াল, ‘কীসের ফাইল বলো।’
‘লিখে দিয়েছি এতে,’ একটা চিরকুট বাড়িয়ে দিল দময়ন্তী, ‘একটা ফাইল একটু পুরোনো। বলিস এখনই লাগবে। দিলীপদা গাঁইগুঁই করবে। তুই দাঁড়িয়ে থেকে নিয়ে আসবি।’
‘ওকে।’ চিরকুট নিয়ে তানিয়া বেরিয়ে গেল।
‘কীসের ফাইল দময়ন্তী?’ অমিতাভ জিগ্যেস করলেন।
‘কিছু না। ওকে সরানোর আর কোনও বাহানা পাচ্ছিলাম না। আসলে আপনাকে একটা পার্সোনাল কথা জিগ্যেস করব।’
‘করো।’
‘রাগ করবেন না প্লিজ। চাইলে উত্তর না-ও দিতে পারেন।’
‘কাম অন দময়ন্তী।’ হাসলেন অমিতাভ।
‘আপনি বরুণ বিশ্বাসের কেস হাতে নেননি তার একটা কারণ কি এই যে আপনার স্ত্রী বরুণের কলিগ?’
‘প্রাক্তন স্ত্রী, দময়ন্তী।’
‘সরি। প্রাক্তন স্ত্রী। এনিওয়ে, এটাই কি কারণ?’
‘না। কাবেরীর সঙ্গে অনেক আগেই সব হিসেব চুকেবুকে গেছে। ওর জন্য আলাদা করে বদারড হবার কিছু ছিল না। তুমি তো জানোই বরুণের কেসে পলিটিকাল ইন্টারভেনশন এক্সট্রিম লেভেলের। এমন অনেক কিছু বলতে হত, যেগুলো বলতে আমার অসুবিধা হত।’
‘জানি স্যার।’
‘মজন্তালীর কেসে বরুণের সঙ্গীদের কোনওরকম লিংক আছে বলে মনে হয় না। যদি লিঙ্ক থাকে, খবর আসবেই। আক্রামুলের ওপর ভরসা রাখো।’
‘না না, সে নিয়ে ভাবছি না। বিবিসি আর আল জাজিরার পরেই আক্রামুল।’
সিটি কলেজ, কলকাতা, সকাল ১১টা ৪৫
‘…পিডোফিলিয়া বলে একটি শব্দ এক্ষেত্রে কেউ কেউ ব্যবহার করেন। আমি একমত নই। আসল কারণ হচ্ছে ধর্ষক বা ধর্ষকামীদের জন্য। শিশুরা সহজ টার্গেট। পথশিশুদের টার্গেট করা তো আরও অনেক বেশি সহজ। বিকৃত কামনা চরিতার্থ করার সবচেয়ে সহজ এবং ঝুঁকিহীন উপায় পথশিশু। তাদের থাকার ঠিক নেই। খাওয়া-দাওয়ার ঠিক নেই। ফলে লোভ দেখিয়ে হোক, বা জোর করে, এদের যৌন কর্মে লিপ্ত করা খুব কঠিন কাজ নয়।
কিন্তু কিছুদিন আগে একটা খবর পড়ে চমকে উঠেছিলাম। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশন ডিপার্টমেন্টের একটা রিসার্চে কলকাতার ১৫০ জন পথশিশুর ওপর সমীক্ষায় দেখা গেছে পাড়ার মস্তান, দোকানদার থেকে শুরু করে অফিসফেরত বাবু কেউই বাদ যায় না। ইনটিগ্রেটেড চাইল্ড প্রোটেকশন স্কিম ইত্যাদি টুকটাক কয়েকটা সরকারি প্রজেক্ট হয়েছে এদের নিয়ে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।
সবচেয়ে বড় কারণ সরকারের কাছে এদের সংখ্যা সম্পর্কে কোনও ঠিকঠাক তথ্যই নেই। প্রচুর এনজিও গত দেড় দশকে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে। যার নব্বই শতাংশই বছরে একবার বই-খাতা-কম্বল দেওয়া ছাড়া আর কিস্যু করে না। কোনও কোনও এনজিও-র বিরুদ্ধে সেক্স ব়্যাকেট চালানোর অভিযোগ পর্যন্ত আছে। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে অবস্থাটা কেমন।
আমি নিজে ব্যক্তিগত উদ্যোগে এই নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করে যাচ্ছি গত এক-দেড় বছর ধরে। তাই দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি শুধু এই শহরেই প্রায় প্রতিটা ব্যস্ত অঞ্চলে এবং রেলস্টেশনে পথশিশুদের নিয়ে সেক্স ব়্যাকেট তৈরি হয়েছে। আমি বিশ্বাস করি না লোকাল পুলিশ এসব জানে না। হতে পারে সঠিক সময়ে সঠিক প্রমাণটুকু পাওয়া মুশকিল হয়ে যায়। কিন্তু পুলিশের সদিচ্ছা থাকলেও এদের ধরা যাচ্ছে না, একথা আমি বিশ্বাস করি না…।’
শালিনী মুগ্ধ হয়ে শুনছিল। এত তেজালো বক্তব্য গ্রাউন্ড-লেভেল কর্মীদের পক্ষেই সম্ভব। ইজিচেয়ার অ্যাকটিভিস্টদের গলায় এই আত্মবিশ্বাসটা আসবে না। মাঠ-ঘাটের ধুলো না-লাগলে গলায় এই জোর আসে না। ইনি নাকি মজন্তালীর কেসে সন্দেহের তালিকায় আছেন। কারণ ইনি প্রয়াত সুজান জর্ডানের ঘনিষ্ঠতম বন্ধু। দময়ন্তীদির মুখে শালিনী শুনেছে, উপাসনা আচার্য একটা বুটিক চালান। পাশাপাশি হিউম্যান রাইটস নিয়ে কাজ করেন। তাঁর কাজটা যে নেহাত কাজ-কাজ খেলা নয়, সেটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। কোনও ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ ব্যাপার নেই। যা যা খতিয়ান দিচ্ছেন, ঠিকঠাক কাজ এগোলে অনেক মৌচাকে ঢিল পড়ে যাবে।
পড়ুয়াদের মধ্যে একটা চাপা গুঞ্জন উঠল। ঘাড় ঘুরিয়ে শালিনী দেখল, একজন বেশ গ্ল্যামারাস মহিলা ঢুকছেন। সঙ্গে দু-চারজন পড়ুয়া-স্বেচ্ছাসেবী। সকলেই খানিকক্ষণের জন্য ঘাড় ঘুরিয়েছে। ফলে উপাসনা আচার্যও থেমে গেছেন। মহিলা এগিয়ে এলেন মঞ্চের দিকে।
শালিনী এঁকে চেনে। টিভির পর্দায় দেখেছে। উঠতি অভিনেত্রী। সম্পূর্ণা মিত্র। ইন্টেলেকচুয়াল। আর্টহাউজ ফিল্ম করেন। কলেজের ফ্যাকাল্টি শ্রীপর্ণাদি, মানে যার ডাকে আজ শালিনীর এখানে বক্তব্য রাখতে আসা, তিনিই অনুষ্ঠান শুরুর আগে সম্পূর্ণার কথা বলছিলেন। ইনি এই কলেজেরই প্রাক্তনী। অভিনয়ের পাশাপাশি কাগজে কলাম-টলাম লেখেন। এইসব প্রগতিশীল কাজেও আগ্রহ আছে। চমৎকার বক্তব্যও রাখেন। ফলে কলেজের বাছা বাছা দু-একটা প্রেস্টিজিয়াস প্রোগ্রাম বা সেমিনারে তাঁকে ডাকা হয়। তিনিও সময় ম্যানেজ করার চেষ্টা করেন। শালিনীর পাশেই একটি চেয়ার সম্পূর্ণা মিত্রের জন্য বরাদ্দ। আজ তিনিও বলবেন। দেখা যাক কেমন বলেন।
.
হাজরা, বিকেল ৫টা ১৫
লীনা আজ কলেজ আসবে, গুটিকয়েক বন্ধুই জেনেছিল কাল রাতে।
ক্লাসরুমে ঢুকেই দু-হাতে মুখ চেপে দাঁড়িয়ে পড়তে হল লীনাকে। পিছনের দেওয়াল জুড়ে বিরাট ফ্লেক্স। ‘জাস্টিস ফর লীনা দাশগুপ্ত’। ফ্লেক্সের চারপাশে অজস্র হাতে-লেখা পোস্টার। কোনওটায় লেখা ‘ওয়েলকাম ব্যাক লীনা’, কোনওটায় ‘মোর পাওয়ার টু ইউ, লীনা’, কোনওটায় ‘স্ট্যান্ডিং উইথ লীনা দাশগুপ্ত’।
গোটা দিনটা একটা ঘোরের মধ্যে কাটল। স্যার-ম্যাডামরাও সবাই খুব স্বাভাবিক ব্যবহার করলেন। যেন কিছুই পাল্টায়নি। ক্লাস শেষের পর নীল, সেমন্তী, ঋতু, অগ্নিভ, পিয়ালীরা জোর করে লীনাকে ধরে নিয়ে এল জিশানে।
ঋতু বলল, ‘হ্যাঁ রে, সিআইডি-র লোকজন তো তোকেও মজন্তালী বলে সন্দেহ করছে?’
‘ঋতু!’ ধমক দিল পিয়ালী, ‘আবার এক কথা! এই টপিক ছাড়া কি কথা নেই?’
‘আরে! কেন কথা হবে না! এই ব্যাপারটা নিয়ে ওকে সহজ হতে হবে তো!’ ঋতু কাঁধ ঝাঁকাল, ‘কিছুই হয়নি। বি নর্মাল গাইজ। ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট।’
লীনা বলল, ‘ঋতু ঠিকই বলছে। তোরা আমাকে আতুপুতু করলে আমি নর্মাল হতে পারব না।’
অগ্নিভ বলল, ‘মজন্তালীর বিষয়ে তোর কী মনে হয় বল তো লীনা? সুজান জর্ডানের ফ্যামিলি বা ফ্রেন্ডস সার্কেলের কেউ? নাকি সুচেতা দত্ত?’
‘আমার মনে হওয়া দিয়ে কী এসে যায়?’
সেমন্তী বলল, ‘সুচেতা দত্তের বাপ সুজানের অ্যাডভোকেট ছিল। হাইলি সাসপিশাস।’
পিয়ালী বলল, ‘সুচেতার বয়ানে কোনও গোলমাল পাওয়া যায়নি। অ্যালিবাই নিখুঁত।’
নীল বলল, ‘এখন তো গল্পে নতুন ক্যারেক্টার এসেছে। তিয়াসা পৈলান। আমার তো ওকেই সন্দেহ হচ্ছে।’
‘তোরা কি এখানে বসে রোল খেতে খেতে কেস সলভ করে ফেলবি?’ লীনা হেসে বলল, ‘সিআইডি-র লোকগুলোকে একটু খাটাখাটনি করতে দে।’
ইতোমধ্যে চিকেন রোল এসে যাওয়ায় তদন্তে একটু ছেদ পড়ল।
রোলে কামড় দিয়ে নিচু গলায় ঋতু জিগ্যেস করল, ‘সিআইডি-তে বেশ হ্যান্ডুমতো একটা ছেলে আছে। টিভিতে দেখছিলাম। দময়ন্তী মুখার্জীর পাশে বসেছিল প্রেস কনফারেন্সে। নাম কী রে?’
লীনা চমকে উঠল। পরক্ষণেই সামলে নিয়ে মুখে যথাসম্ভব উদাসীন একটা ভাব আনার চেষ্টা করে বলল, ‘সিআইডির সবাইকে কি আমি চিনে বসে আছি?’
.
গার্ডেন ক্যাফে, আলিপুর, বিকেল ৫টা
বিবস্বান দত্তের ফোন পেয়ে একটু চমকেই গেছিলেন অমিতাভ। কারণ তাঁকে নিয়েই সাত-পাঁচ ভাবনা চলছিল মনে।
‘আধ ঘণ্টা বাদে একবার দেখা করা যায় স্যার? বাইরে কোথাও? একটু কথা ছিল।’
‘যায়। কোথায় বসবেন বলুন?’
ভবানী ভবন থেকে অনতিদূরে গার্ডেন কাফের নাম করেছিলেন বিবস্বান। পাঁচ মিনিট আগে পৌঁছে বিবস্বানকে এন্ট্রান্সেই পেয়ে গেলেন অমিতাভ। খাতির করে ভিতরে নিয়ে এসে চেয়ারে বসিয়ে বিবস্বান বললেন, ‘আমার একটা মোজিতো অর্ডার করে রেখেছি। আপনার জন্য কী বলব বলুন।’
‘আমার কিছু লাগবে না। আপনি বলুন কী বলবেন।’
বিবস্বান বসলেন। ঘন ঘন শ্বাস পড়ছে। চোখেমুখে চাপা উত্তেজনা। একটা-কিছুর প্রস্তুতি নিচ্ছেন যেন। কী বলতে পারে লোকটা? অমিতাভ খুব দ্রুত ভাবার চেষ্টা করছিলেন। কথাটা কি এমনই যে দুঁদে উকিলকেও মেন্টাল প্রিপারেশন নিতে হচ্ছে?
মুখ খুলতে বিবস্বান অবশ্য কয়েক সেকেন্ডের বেশি সময় নিলেন না, ‘আপনাকে অফিসের বাইরে ডাকলাম বলে দুঃখিত। কথাটা আসলে কনফিডেনশিয়াল। এখনও মিডিয়া বা অন্য কাউকে জানাইনি।’
অমিতাভ ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন।
বিবস্বান বললেন, ‘আপনার তো ক্রাইমই রুটিরুজি। তা, ক্রাইম থ্রিলার কি পড়েন?’
‘কেন বলুন তো?’
‘পড়েন কিনা বলুন না।’
‘না।’
ওয়েটার এসে বিবস্বানের সামনে মোজিতোর গ্লাস নামিয়ে রেখে গেল। স্টারার দিয়ে গ্লাসে ঘোঁট পাকাতে পাকাতে বিবস্বান বললেন, ‘তাহলে সায়নদীপ গুপ্ত নামটার সঙ্গে তো খুব একটা পরিচিত নন।’
‘না। কে তিনি?’
‘এই সময়ের প্রতিশ্রুতিমান একজন থ্রিলার লেখক। চমৎকার লিখছেন।’
‘মিঃ দত্ত,’ অমিতাভর গলায় বিরক্তি, ‘প্রসঙ্গে আসুন প্লিজ।’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। এসেই পড়েছি।’ মোজিতোর স্ট্রয়ে সুড়ুৎ করে টান দিলেন বিবস্বান, ‘তো এই সায়নদীপ গুপ্তের ফ্ল্যাট হচ্ছে টলিগঞ্জ সেমেট্রির ঠিক উল্টোদিকে। বলাকা অ্যাপার্টমেন্ট। জি প্লাস ফোর। সায়নদীপ গুপ্তের ফ্ল্যাট চারতলায়, দক্ষিণমুখো। ব্যালকনি থেকে সেমেট্রির একটা সোজাসুজি ভিউ পাওয়া যায়।’
অমিতাভর স্নায়ু টানটান হয়ে উঠল, ‘তো?’
‘ন’তারিখ রাত আড়াইটে-তিনটে নাগাদ সায়নদীপ সেমেট্রিতে কিছু আনইউজুয়াল অ্যাকটিভিটি লক্ষ করেন। পরের দিন উনি টলিগঞ্জ থানায় গিয়ে ঘটনাটা জানান। রিপোর্ট লেখাননি যদিও। ঝামেলা নিতে চাননি। স্বাভাবিক। তবে থানা থেকে এক জুনিয়র অফিসার সেমেট্রিতে গেছিলেন। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছেন। ফিশি কিছু পাননি। আসলে সিকিউরিটি এবং কর্মীদের সঙ্গে সেটিং থাকে, বুঝলেন?’
বিবস্বানের চোখ থেকে চোখ সরালেন না অমিতাভ, ‘আপনার এক্স্যাক্ট পয়েন্টটা কী?’
বিবস্বান মুচকি হাসলেন, ‘টলিগঞ্জ সেমেট্রিতেই সুজানের গ্রেভ রয়েছে কিনা। তাই ভাবলাম আপনাকে জানিয়ে রাখি।’
.
আড়িয়াদহ, সন্ধে ৬টা ৩০
আড়িয়াদহের বেশ অভিজাত এক অ্যাপার্টমেন্টের দু-নম্বর টাওয়ারের সাততলায় সম্পূর্ণা মিত্রের তিন কামরার ফ্ল্যাট। সেই অর্থে খুব বিলাসবহুল বলা যায় না। বসবার ঘরে ইন্টেরিয়ারের থিম মূলত টেরাকোটা। আসবাবে একটা ভিন্টেজ ভাব ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। একটা দেওয়ালে তাক করে ছোট ছোট বনসাই আর ক্যাকটাস রাখা। সব মিলিয়ে রুচির ছাপ আছে। বড় রাস্তামুখী দেওয়ালের অন্তত অর্ধেকটা জুড়ে একটা বিরাট কাচের জানলা। আজকাল এটা একটা ট্রেন্ড। হাতে বাড়তি পয়সা থাকলে উপর থেকে শহরটাকে দেখতে ইচ্ছে করে।
অবশ্য সম্পূর্ণা মিত্র এই মুহূর্তে আর্থিকভাবে ঠিক কোন জায়গায় সেটা নিয়ে দময়ন্তীর মনে একটু ধোঁয়াশা আছে। আসার আগে অভিনেত্রীর কেরিয়ারগ্রাফে চোখ বোলাচ্ছিল সে। মানে তানিয়ার তৈরি করে দেওয়া ব্রিফে। বিখ্যাত এক মেগাসিরিয়াল দিয়ে কেরিয়ার শুরু করে সম্পূর্ণা দ্রুতই বড় পর্দায় চলে আসেন।
কিন্তু ‘মননশীল’ ট্যাগ গায়ে লেগে যাবার পর থেকে তাঁর কেরিয়ারে এই মুহূর্তে একটু ভাঁটার টান। ভালো আর জনপ্রিয়র মেলবন্ধনটা টলিউড ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি করে উঠতে পারছে না। মাথার দিকে কম্বল টানলে পা বেরিয়ে যাচ্ছে, পায়ের দিকে টানলে মাথা। নতুন প্রজন্মের বাঙালি কলাকুশলীদের জন্য অভিনয় একটা স্টেবল পেশা কিনা সেটা দময়ন্তী ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। রুপোলি জগতের নতুন তারকাদের দু-একজনকে সে ব্যক্তিগতভাবে চেনে। ‘বাহিরবাড়ি লণ্ঠন ভিতরবাড়ি ঠনঠন’ অবস্থা৷ সম্পূর্ণার হালও কি সেরকম?
সম্পূর্ণা কফির কাপ হাতে এসে সামনের সোফায় বসল, ‘বলুন ম্যাম।’
দময়ন্তী বসল, ‘এখানে আপনি একাই থাকেন?’
‘হ্যাঁ,’ সম্পূর্ণা বলল, ‘মা-বাবা থাকেন শ্রীরামপুর। এখানে কমই আসেন।’
‘আমরা মজন্তালী সরকারের কেস নিয়ে আপনাকে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করতে এসেছি। জাস্ট কিছু রুটিন কোয়ারিজ।’
সম্পূর্ণা হাসল, ‘আমার অতীত নিয়ে ভালো করে হোমওয়ার্ক করে এসেছেন মনে হচ্ছে।’
‘তা না-হলে আপনার কাছে আসব কেন? আমরা বাগনান থানায় গেছিলাম। লিলুয়ার সেই হোমেও গেছিলাম যেখানে আপনি ছিলেন। আপনি কিন্তু বেশ তাড়াতাড়ি ছাড়া পেয়েছিলেন।’
‘আমি দু-বছর দশ মাসের মাথায় ক্লিনচিট পেয়ে যাই। খুনটা আত্মরক্ষার্থে করেছিলাম।’
‘খুন করলেন সেলফ ডিফেন্সে। অথচ লাশের পাশে আপনার হাতে লেখা চিরকুট পাওয়া গেল। এটার কী ব্যাখ্যা দেবেন?’
‘আমার মধ্যে প্রতিশোধস্পৃহা ছিল। প্রবলভাবেই ছিল। সেটা কোনওদিন আমি অস্বীকার করিনি। কিন্তু একটা ছোট্ট মেয়ে তার চেয়ে কুড়িগুণ শক্তিশালী একটা লোককে প্ল্যানফুলি মার্ডার করবে কীভাবে? লোকটা ফাঁকা জায়গা পেয়ে আমাকে অ্যাটাক করতেই এসেছিল। চুলের কাঁটা দিয়ে অ্যাক্সিডেন্টালি আমি খুনটা করে ফেলি। লোকটা যখন মরে গেছে তখনও আমি তার গলায় আঘাত করেই যাচ্ছিলাম। তারপর প্রতিশোধের জ্বালা সামলাতে না পেরে ওই চিরকুট লিখেছিলাম।’
‘মানে চিরকুট লেখা হয়েছিল মার্ডারের আগে নয়, পরে। তাই তো?’
‘এক্স্যাক্টলি।’
‘মানে আপনি বলতে চান, অ্যাক্সিডেন্টালি একটা খুন করে ফেলে আপনি ভয় না পেয়ে নিজেকে খুনী হিসেবে এস্টাবলিশ করার তোড়জোড় করেন? এটা বিশ্বাসযোগ্য?’
‘হ্যাঁ। নিজেকে বাঁচানোর জন্য খুন করলেও আমার কাছে সেই মুহূর্তে প্রতিশোধস্পৃহাটা অনেক বড় ছিল। আমার অবচেতনে খুনটা আমি করতেই চাইছিলাম। সেটা সেই মুহূর্তে ভয়ের চেয়ে গ্রেটার ইমোশন হিসেবে কাজ করেছে। এটা একজন জুভেনাইলের ক্ষেত্রে খুব অস্বাভাবিক নয়। সেই সময়ে হোমের সাইকোলজিস্ট নিজের বয়ানে এটাই উল্লেখ করেছিলেন। আপনারা হোমের ফাইলে সেই সার্টিফিকেট দেখেছেন নিশ্চয়ই। ইন্সটিউট অব সাইকোলজির সার্টিফিকেটও ছিল। সেখানেও আমাকে ক্লিনচিট দেওয়া হয়েছে।’
‘দেখুন সম্পূর্ণা, আমরা মজন্তালী সরকারের যে-হুলিয়া পেয়েছি, আপনার প্রোফাইল সবদিক থেকেই সেই হুলিয়ার সঙ্গে মিলে যায়। আপনি নিজে রুপোলি জগতের মানুষ, মেক আপের ব্যাপারটায় আপনি নিশ্চয়ই সিদ্ধহস্ত। তাছাড়া চুলের কাঁটা দিয়ে খুন করার পদ্ধতি এবং চিরকুট লিখে রাখাটা মজন্তালী সরকারের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যাচ্ছে।’
সম্পূর্ণা মুখে হাত চাপা দিয়ে হাসছে। সায়লেন্ট মোডে। হাসির দমকে কেঁপে কেঁপে উঠছে তাঁর শরীর, ‘আপনারা এত সরলীকরণ করেন?’
দময়ন্তী আরও গম্ভীর হল, ‘আপনি সুজান জর্ডানের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। ওঁর সঙ্গে বিভিন্ন ক্যাম্পেন বা ইভেন্টে আপনাকে দেখা গেছে। এটাও আপনার বিপক্ষে যাচ্ছে।’
‘হ্যাঁ, আমরা বন্ধু ছিলাম। ওঁর হয়ে ক্যাম্পেনও করেছি। ইন ফ্যাক্ট আমার কেরিয়ারের পার্মানেন্ট ক্ষতি হয়ে গেছে সেজন্য। অন্য পথ দেখতে হবে মনে হচ্ছে।’
‘কী বলছেন? আপনার ফিল্মোগ্রাফিতে ঋতুপর্ণ ঘোষ, অঞ্জন দত্ত, কৌশিক গাঙ্গুলীর ফিল্ম রয়েছে। রাজ চক্রবর্তীর ছবিতেও তো আছেন দেখলাম। বরুণ বিশ্বাসকে নিয়ে যে ফিল্মটা হচ্ছে সেটাতে। আর বলছেন অন্য কেরিয়ার দেখতে হবে?’
‘এগুলো কোনওটাই তেমন গুরুত্বপূর্ণ রোল না।’
‘ঋতুপর্ণ ঘোষের মৃত্যুতে নিশ্চয়ই আপনি মর্মাহত? ওঁর সঙ্গে তো দুটো ছবিতে কাজ করেছিলেন?’
‘ঋতুদা ওয়াজ আ জিনিয়াস,’ সম্পূর্ণার কণ্ঠ একটু মেদুর হল, ‘দেখতে দেখতে তিন মাস হতে চলল মানুষটা নেই, ভাবতেই পারি না। দেয়ার উডন্ট বি অ্যানাদার ঋতুদা।’
দময়ন্তী শিথিল গলায় বলল, ‘ঋতুপর্ণ ঘোষেরই কোনও একটা সিনেমায় আপনাকে প্রথম দেখেছিলাম। আপনার অভিনয় আমার ভালো লাগে সম্পূর্ণা। আপনি ভালো অভিনয় করেন।’
‘অনেক ধন্যবাদ।’ অভিবাদনের ভঙ্গিতে মাথা ঝোঁকাল সম্পূর্ণা।
‘প্রসঙ্গে ফিরে আসি। আপনি সুজান জর্ডানকে আগে থেকে চিনতেন নাকি তাঁর সঙ্গে দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার পর চিনলেন?’
‘আমি সুজানকে একজন সারভাইভার হিসেবেই চিনেছি।’
‘আপনার কি মনে হয় মজন্তালী সরকারের সঙ্গে ওঁর কিছু যোগাযোগ ছিল? বা ওঁর ক্লোজ সার্কলের কেউ মজন্তালী সরকার হতে পারে?’
‘এ-বিষয়ে আমার কোনও ধারণা নেই। দুঃখিত।’
‘হোমের তৎকালীন ইনচার্জ অপর্ণা সামন্তর কাছে আগের বছর কে বা কারা যেন আপনার খোঁজ করেছিলেন। আপনার অতীতের কেউ কি আপনার কাছে এসে পৌঁছেছেন?’
‘না। আপনারাই প্রথম।’
‘গত কয়েকদিনে আপনার রুটিনটা একটু বলুন।’
‘শ্যুটিংয়ের কাজে বাইরে ছিলাম।’
‘চার তারিখ রাতে কোথায় ছিলেন?’
‘ভারতলক্ষ্মী স্টুডিয়োতে শ্যুটিং ছিল রাত দশটা পর্যন্ত। ছবির নাম “মাছ-ভাত”। ডিরেক্টর মৈনাক পাল।’
তানিয়া নোট নিতে নিতে বলল, ‘কো-স্টার কয়েকজনের নাম বলুন।’
সম্পূর্ণা বলল, ‘সেদিন আমার সিন ছিল রাইমা চক্রবর্তী, অনুব্রত রয় আর রচিতা ঘোষের সঙ্গে। ভেরিফাই করতে পারেন।’
দময়ন্তী প্রশ্ন করল, ‘স্টুডিয়ো থেকে সোজা ফ্ল্যাটে ঢুকেছিলেন?’
‘হ্যাঁ।’
‘বেশ। তার পরের রাতে?’
‘বাড়ি ফিরিনি। বন্ধুর বাড়িতে ছিলাম। যাদবপুর।’
‘ক’টায় গেছিলেন সেখানে?’
‘সন্ধেবেলা। সাতটা নাগাদ। একেবারে শ্যুটিং সেরে গিয়েছিলাম।’
‘আপনাদের ফিল্ম লাইনে তো শুনেছি এখন টানা ষোল, সতেরো ঘণ্টাও কাজ হয়। আপনার শ্যুটিংগুলো রোজই সন্ধে বা রাতে শেষ হয়ে যায় নাকি?’
‘না না, প্রায়ই টানা শ্যুটিং চলে। বাড়ি ফিরতে পারি না অনেক সময়। আসলে প্রোডাকশন হাউসের প্রেশারে আজকাল অনেক ডিরেক্টরই টানা কাজ করে আঠেরো-বিশ দিনে কাজ তুলে দিচ্ছেন। তবে মৈনাকদা ততটা কমার্শিয়াল ডিরেক্টর নন। প্রোডাকশন হাউসটাও ততটা কর্পোরেট নয়।’
দময়ন্তী নাক টানল। বলল, ‘সম্পূর্ণা, এবার আপনার সেইদিনের অভিজ্ঞতার কথা শুনব। যেদিন আপনি নানকু মণ্ডলকে খুন করেছিলেন। ক্ষমা করবেন। ওটা নিশ্চয়ই আপনার গভীর ট্রমার বিষয়, তবু আমাকে তদন্তের খাতিরে আপনাকে জিগ্যেস করতেই হচ্ছে।’
.
বালিগঞ্জ প্লেস, রাত ৮টা
সৌমিলি একমনে কপি লিখছিল। শাক্য ডেকে বলল, ‘তুই তো বইপত্র পড়িস। সায়নদীপ গুপ্তকে চিনিস? থ্রিলার লেখে।’
সৌমিলি বলল, ‘নাম জানি। তবে পড়িনি। আমি আজকালকার থ্রিলার পড়ি না। হাফ বেকড নলেজ নিয়ে লেখে সব। প্রায় সবই ওই স্বপনকুমারের মতো “কোথা থেকে কী হইয়া গেল” কেস। মাথামুন্ডু নেই।’
‘কী আশ্চর্য! না পড়ে জানছিস কী করে? তোদের প্রবলেমই এই। লেখক মরে না-গেলে তোরা তাঁর বই উল্টে দেখবি না। যাক গে, কথাটা সাহিত্যগুণ নিয়ে হচ্ছে না। সেটা কথা না, কথা হচ্ছে সায়নদীপ গুপ্ত আমার সেকেন্ড কাজিন।’
‘তাতে আমি কী করব?’
‘সায়নদা আজ একটা অদ্ভুত কথা বলল। মজন্তালীর কেসের সঙ্গে রেলেভ্যান্স তার থাকতে পারে।’
‘কী কথা?’
‘সায়নদার বাড়ির উল্টোদিকেই টলিগঞ্জ সেমেট্রি। কয়েকদিন আগে মাঝরাতে সেখানে কিছু ফিশি অ্যাকটিভিটি দেখা গেছে। সায়নদা রাত অবধি লেখালিখি করে। তিনটেয় ব্যালকনিতে গিয়ে দেখতে পেয়েছে কিছু লোক কীসব খোঁড়াখুঁড়ি করছিল।’
সৌমিলি ঝট করে মুখ তুলল। চোখ ছানাবড়া, ‘টলিগঞ্জ সেমেট্রিতেই তো…?’
‘সুজান জর্ডানের কবর।’ শূন্যস্থান পূরণ করে দিল শাক্য।
‘তার মানেটা কী শাক্য?’
শিরিন ফোন পেয়ে উঠে গিয়েছিল। ফিরে এল ছানাবড়া-চোখে, ‘ব্রেকিং নিউজ এগেইন। সম্পূর্ণা মিত্রকে সিআইডি জেরা করেছে।’
‘অভিনেত্রী সম্পূর্ণা মিত্র?’
‘হ্যাঁ। প্রায় দেড় ঘণ্টা।’
‘বলিস কী! হেফাজতে নিয়েছে?’
‘না। জাস্ট জিজ্ঞাসাবাদ।’
‘কোথা থেকে জানলি?’
‘নেবুলা নিউজের শৌনক মেসেজ করল। ওই অ্যাপার্টমেন্টে ওর কোনও আত্মীয় থাকে। তার থেকেই খবর পেয়েছে।’
‘তোর দেখি আশিকের শেষ নেই, শিরিন। রাইভাল চ্যানেলেও ভাব পাতিয়ে রেখেছিস?’
‘তাতে লাভ ছাড়া ক্ষতি হচ্ছে কিছু?’ শিরিন ঠোঁট বেঁকাল, ‘দময়ন্তী মুখার্জীকে ফোন করে খবরটা কনফার্ম কর।’
তাই করল সৌমিলি। এবং একবারেই পেয়ে গেল। দময়ন্তী নম্বরটা সেভ করে রেখেছেন সেটাও বোঝা গেল। নাম ধরে সম্বোধন করলেন, ‘হ্যাঁ সৌমিলি, বলো।’
শিরিন ফিসফিস করে বলল, ‘স্পিকারে দে।’
ফোন স্পিকারে দিয়ে সৌমিলি বলল, ‘ম্যাম, খবর আছে মজন্তালী সরকারের কেসে অভিনেত্রী সম্পূর্ণা মিত্রকে আপনারা জেরা করেছেন। এটা কি সত্যি?’
দময়ন্তীর উত্তর আসতে চার-পাঁচ সেকেন্ড সময় লাগল, ‘জেরা ঠিক নয়। কিছু কনফার্মেশন নেওয়ার জন্য গেছিলাম।’
‘মানে তাঁর সঙ্গে কি মজন্তালী সরকারের কোনও লিঙ্ক রয়েছে?’
‘সেরকম কিছু খুঁজে পেলে তো হেফাজতে নিতাম। আমরা বিষয়টা খতিয়ে দেখছি।’
‘হঠাৎ সম্পূর্ণা মিত্রই কেন ম্যাম? কিছু একটু বলুন।’
‘বলার মতো কিছু পেলে আমি নিজেই তোমাদের জানাব। আর খবরটা কিন্তু এখন ফ্ল্যাশ করা যাবে না। ভদ্রমহিলা একজন ব্লুমিং অ্যাক্টর। অকারণে তার পেশাকে ক্ষতির মুখে ফেলতে চাইছি না। তোমার সোর্স যদি কোনও নিউজ পারসন হয়ে থাকে, তাকেও বারণ করে দাও প্লিজ।’ বলে ফোন কেটে দিলেন দময়ন্তী।
তিনজনে পরস্পর মুখ চাওাচাওয়ি করল। শাক্য মুখ থেকে ভুস করে একটা শব্দ বের করল।
সৌমিলি শাক্যকে বলল, ‘টলিগঞ্জ সেমেট্রির ব্যাপারটা বল শিরিনকে।’
শিরিন বিস্ময় আর ক্লান্তিমেশানো দৃষ্টিতে তাকাল, ‘টলিগঞ্জ সেমেট্রিতে আবার কী হল?’
.
চাংওয়া, এসপ্ল্যানেড, রাত ৯টা ১০
সোর্সদের গোপনাঙ্গের চেয়েও বেশি গোপন রাখতে হয়। ফলে অমিতাভ তাদের সঙ্গে দেখা করার কোনও ফিক্সড জায়গা রাখেন না। আজ জাপানের অনুরোধে চাংওয়া। জাপান চাইনিজ ভালোবাসে।
কাট্টা জাপানের আসল নাম কেউ জানে না। কুতকুতে চোখ। মুখে একটা হালকা মঙ্গোলিয়ান আদল আছে। সেইজন্য ‘জাপান’। আর দেশি বন্দুক বেচে বলে ‘কাট্টা’। জাপান অবশ্য বিদেশিও বেচে। গোটা কলকাতায় বেআইনি বন্দুকের একচেটিয়া কারবার তার। আজ জাপান বড় খবর দেবে। বড় খবর থাকলে সে ফোনে বলে না। তার বিশ্বাস, পুলিশের বড়কর্তাদের সবার ফোনে আড়ি পাতা হয়। অমিতাভর কাছে সে একথাটা বেশ কয়েকবার যাচাই করার চেষ্টা করেছে। অমিতাভ তথ্যটাকে সমর্থন বা অসমর্থন কিছুই করেননি।
জাপান একটা টু-সিটার টেবিলে বসেছিল। অমিতাভকে দেখে উঠে দাঁড়াল। ক্ষয়াটে দাঁত বের করে স্যালুট মারল একটা। অমিতাভ সামনে এসে বসলেন, ‘কী খবর?’
জাপান চাপা গলায় বলল, ‘কেঁচো খুঁড়তে অ্যানাকন্ডা বেরোল স্যার। নেপাল থেকে ভায়া শিলিগুড়ি একটা বড় আর্মস ডেলিভারি ঢুকেছে। সঙ্গে একশো কিলো আরডিএক্স।’
অমিতাভ শরাহত পাখির মতো ছিটকে সোজা হয়ে বসলেন, ‘আরডিএক্স? শিওর?’
‘পাক্কা খবর।’
‘কারা আনিয়েছে খোঁজ দিতে পারবি?’
‘দিনকয়েক সময় দিন স্যার।’
রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠেই অমিতাভ চালককে বললেন, ‘কেষ্টপুর। এডিজি সাহেবের বাড়ি। জলদি।’ তারপর ডিআইজি আলিপুর কারেকশনাল সুব্রত সরকারকে ফোন করলেন, ‘শোন, কাল একবার দেখা করা যায়?’
‘কাল তো সারাদিন ক্রাইম কনফারেন্সে ব্যস্ত থাকব রে।’
‘খুব আর্জেন্ট। কলকাতায় একশো কেজি আরডিএক্স ঢুকেছে। আমার সন্দেহ, বারোই সেপ্টেম্বরের জন্যই। কাল যে করেই হোক সময় বের কর তুই।’
.
কাশীপুর, রাত ৯টা ১৫
মাকে চায়ের ফরমাশ করে এসে মোবাইলের ডেটা অন করতেই টুং করে ফেসবুকের একটা নোটিফিকেশন এল। একটা নতুন ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট এসেছে। নোটিফিকেশনে আঙুল ছুঁইয়ে নামটা দেখতেই লীনার বুকের ভিতরটা কেমন গুড়গুড় করে উঠল। রাহুল সেনগুপ্ত। ডিপিটা দারুণ। কালো ওভারকোট আর সানগ্লাস পরে লোকটাকে হেবি দেখাচ্ছে। পিছনে কাঞ্চনজঙ্ঘা।
একটু পরে চায়ের কাপ হাতে এসে মা বলল, ‘মুখটা হাসি হাসি কেন রে?’
লীনা বলল, ‘এমনি।’
.
কেষ্টপুর, রাত ১০টা ২০
এডিজি প্রবীর চক্রবর্তী ‘কুল’ মানুষ। যাকে বলে দুঃখেষু-অনুদ্বিগ্নমনা। তিনি টেনশনে পড়লে টের পাওয়া যায় শুধুমাত্র তাঁর ঘন ঘন চোখ-পিটপিট দেখে। খবরটা শুনেই তাঁর চোখের পাতারা উত্তেজিত হয়ে খাটাখাটনি শুরু করে দিল, ‘তোমার এই সোর্সটি কতকালের?’
অমিতাভ বললেন, ‘ছ বছর স্যার। চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করা যায়।’
প্রবীর চক্রবর্তী মাথা নিচু করে ভাবলেন একটু। তারপর বললেন, ‘এসটিএফ-কে জানাতে হবে। আরডিএক্স যে-উদ্দেশেই এসে থাকুক, ইটস আ ম্যাটার অব গ্রেভ কনসার্ন, অমিতাভ।’
মাথা নাড়লেন অমিতাভ। এসটিএফ মানে স্পেশাল টাস্ক ফোর্সকে তো খবর দিতেই হবে। তাঁরা তাঁদের মতো তদন্ত শুরু করুক। আরডিএক্স হান্ট করার দায়িত্ব তাঁদের। আর এই আরডিএক্স যদি আলিপুর কারেকশনালে নাশকতার উদ্দেশেই এসে থাকে, তাহলেও আরডিএক্স-ই নিশ্চয়ই মজন্তালীদের একমাত্র প্ল্যান নয়। প্ল্যান বি, প্ল্যান সি থাকবে নিশ্চয়ই। ফলে সম্ভাব্য অন্যান্য দিক থেকেও অ্যাটাকের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকতে হবে। অমিতাভর মাথা ভোঁ ভোঁ করছিল।
প্রবীর চক্রবর্তী বললেন, ‘দ্যাখো অমিতাভ, এটা কমন টেররিস্ট অ্যাক্ট হলে একরকম। কিন্তু ইন এনি কেস, যদি এই আরডিএক্সের সঙ্গে মজন্তালী সরকারের লিঙ্ক থাকে, তাহলে ব্যাপারটা আরও চিন্তার। টেররিজম বা অন্য যে-কোনও অরগ্যানাইজড ক্রাইমের সঙ্গে ব্যাপারটা জুড়ে গেলে…।’ কথাটা শেষ করলেন না এডিজি।
অমিতাভ বললেন, ‘টেকনিক্যালি অরগ্যানাইজড ক্রাইম বলা যাবে কিনা সেটা এখনও স্পষ্ট নয় স্যার। কিন্তু আমি নিশ্চিত, টেররিজমের সঙ্গে এই কেসের কোনও লিঙ্ক পাওয়া যাবে না।’
‘না পাওয়ারই তো কথা। আমি তো মেলাতে পারছি না কিছুই। মোটিভ, লাইন অব অ্যাকশন কিছুই মেলাতে পারছি না।’
‘আর সে-কারণেই এই আরডিএক্সের হাতবদল শিলিগুড়িতে হোক বা বাংলাদেশে, ফুটপ্রিন্ট পাবার হাই চান্স রয়েছে স্যার। যদি আদৌ মজন্তালীর সঙ্গে লিঙ্ক থাকে।’
প্রবীর চক্রবর্তী অন্যমনস্কভাবে মাথা নাড়লেন। তাঁর কপালে ভাঁজ বাড়ছে। সেদিকে তাকিয়ে অমিতাভর একটা বেয়াড়া ধরনের অস্বস্তি শুরু হল। গভীর চিন্তায় ডুবে গেলে প্রবীরবাবু নাকে পুরোনো ল্যান্ডফোনের কায়দায় ডায়াল করতে থাকেন। খুব অন্তরঙ্গ পরিসরেই করেন অবশ্য। দুর্ভাগ্যক্রমে অমিতাভ বেশ কয়েকবার তাঁর সেই নাসিকাবিলাসের সাক্ষী। এইসব ব্যাপারে অমিতাভর একটু ওসিডি টাইপের আছে। হে ভগবান! আঙুল যেন নাকের দিকে না এগোয়!
ভগবান শুনলেন। প্রবীর চক্রবর্তী আজ ডায়াল করলেন না। খানিকক্ষণ উসখুস করলেন। তারপর চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন, ‘ডিজি-কে ফোন করে আসছি। তুমি বোসো। লেট হয়ে যাচ্ছে না তো?’
‘না স্যার। বসছি। আপনি ফোন সেরে আসুন।’
মোবাইল কানে ধরে ব্যালকনির দিকে যেতে যেতে থমকে দাঁড়ালেন এডিজি। মুখ ফিরিয়ে বললেন, ‘ডিনারটা এখানেই করে যাও অমিতাভ। কিছু কথাও সেরে নেওয়া যাবে।’
.
.
