একবিংশ দিন
তারিখ : ২২ আগস্ট, ২০১৩
শিলিগুড়ি, সকাল ৯টা ২০
রহমত আলি সকাল আটটা নাগাদ বাড়ি ঢোকার পাঁচ মিনিটের মধ্যে শিলিগুড়ি কমিশনারেটের স্পেশাল ব্রাঞ্চের সাতজনের একটা দল তাকে তুলে নিল। ওয়াংডুর হোয়ারঅ্যাবাউটস বের করতে তাদের খুব বেশি বেগ পেতে হল না। বেগ পেতে হল তার আধ ঘণ্টা পর, ওয়াংডুর থেকে নুটু আর বুয়া ওরফে উপেন আর পরকাশের খবর বের করতে। পাহাড়ি লোকেরা নিজেদের কাজের প্রতি কুকুরের মতন বিশ্বাসী হয়। নখে অন্তত বার পঁচিশ আলপিন ঢোকানোর পর ওয়াংডু মুখ খুলল। নুটু আর বুয়া আছে সেবক রোড ভক্তিনগরের কাছে হোটেল সাগর রেসিডেন্সিতে। আজ রাতেই এখান থেকে চট্টগ্রাম চলে যাবে। ভাগ্যকে ধন্যবাদ দিল দময়ন্তী। এখনও দেরি হয়নি তাহলে।
রামকৃষ্ণ ঘোষ ভক্তিনগর পুলিশ স্টেশনে ফোন করতে চাইছিলেন। রাহুল বাধা দিল, ‘ওই ভুলটা করবেন না কাইন্ডলি।’
‘কেন?’
‘লোকাল পুলিশে ওদের লোক নেই কী করে জানছেন? যদি খবর পৌঁছে যায়? লোকাল পুলিশকে জানানোর দরকার নেই। তুমি কী বলো দময়ন্তীদি?’
দময়ন্তী কিছু বলার আগেই হাঁ হাঁ করে উঠলেন মিঃ ঘোষ, ‘কী বলছেন মিঃ সেনগুপ্ত! তা বলে ফোর্স না নিয়ে এত বড় দুটো ক্রিমিনালকে ধরতে যাবেন?’
দময়ন্তী বলল, ‘ফোর্স নেব না তা তো বলিনি। নেব। কিন্তু ব্যাপারটা যথাসম্ভব গোপন রাখাই ভালো। একটা কোভার্ট অপারেশন চাইছি। আপনার খুব বিশ্বস্ত কয়েকজনকে পাওয়া যাবে কি? উইদাউট ইনফর্মিং লোকাল থানা?’
রামকৃষ্ণ ঘোষ একটু ভাবলেন, ‘কতজন চাইছেন?’
‘আমরা চারজন। সঙ্গে আরও জনাআটেক হলেই চলবে।’ বলে রাহুলের দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল দময়ন্তী।
রাহুল ইতিবাচক মাথা নাড়ল।
ঠিক এক ঘণ্টা পরে, মোট এগারোজনের স্কোয়াড সেবক রোডের নির্ধারিত ঠিকানায় পৌঁছে গেল। একজন বৃদ্ধ ফলওয়ালাকে জিগ্যেস করায় সে দূর থেকে দেখিয়ে দিল, ‘হুই গল্লিতে সাগর হোটেল।’
রামকৃষ্ণ ঘোষ তাঁর ড্রাইভারকে বললেন, ‘গলির মধ্যে গাড়ি ঢুকিও না। একটু এগিয়ে পার্ক করে দাও। তারপর হেঁটে যাব।’
প্ল্যান আগেই ছকে নেওয়া হয়েছিল। টিম তিন ভাগে ভাগ হবে। অ্যামবুশে যাবে দময়ন্তী, রাহুল আর রামকৃষ্ণ ঘোষ সহ মোট পাঁচজন। সুকুমারের সঙ্গে মিঃ ঘোষ দিলেন তাঁর অত্যন্ত বিশ্বস্ত অফিসার সুরজ অগ্নিহোত্রীকে। সঙ্গে আরও দুজন। সুকুমারের নেতৃত্বে চারজনের দলটা কভার করবে হোটেলের ব্যাকইয়ার্ড, অর্থাৎ পিছনদিক। আর তিনজনের একটা দল অপেক্ষা করবে গলির মুখে। সবার কাছে থাকবে হুইসল।
গাড়ি থেকে নেমে দময়ন্তী আরও একবার সবাইকে মনে করাল, নুটু আর বুয়াকে জ্যান্ত চাই।
ব্যাকইয়ার্ডের টিম আগে এগোল। তার ঠিক দেড় মিনিট পর বাকিদের নিয়ে দময়ন্তী এগোল হোটেলের গেটের দিকে।
.
ভবানী ভবন, সকাল ১০টা ৪২
এসি ষোলয় চলছে। ঘর দময়ন্তীর ভাষায় ‘অ্যান্টার্কটিকা’ হয়ে আছে। তবু তানিয়া ঘামছে। টেনশনে আর উত্তেজনায় মুঠো পাকাচ্ছে ঘন ঘন, ‘ওরা এতক্ষণে বেরিয়ে পড়েছে, না?’
টেনশন অমিতাভরও হচ্ছিল। সেটাকে চাপা দিতে তিনি নখে নখ ঘষছিলেন। তানিয়ার প্রশ্ন শুনে ঘড়ি দেখলেন, ‘হ্যাঁ, দশটা তো বেজে গেছে।’
‘এতদিনে বেড়ালবাহিনীকে চাপে ফেলতে পেরেছি, বলুন? এখন আমরাই অলআউট অ্যাটাকে যাচ্ছি। ওরা ডিফেন্স করতে বাধ্য হচ্ছে।’
‘সেটা বলা মুশকিল। ডিফেন্স করতে বাধ্য হচ্ছে নাকি পাওয়ার সেভার মোডে রয়েছে, নট শিওর।’
‘কিন্তু আজ আশা করছি কফিনে একটা পেরেক অন্তত পড়ে যাবে। কী বলেন?’
‘হোপ সো। উই আর ডুইং ওয়েল, এটুকুই বলতে পারি।’ বলে হাতদুটো আয়েসের ভঙ্গিতে দুদিকে ছড়িয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন অমিতাভ, ‘কখনও রেসের মাঠে গেছ তানিয়া?’
‘না স্যার। কেন?’
অমিতাভ তাকালেন না। ধীর পায়ে জানলার দিকে হেঁটে যেতে যেতে বললেন, ‘তদন্তের সঙ্গে ঘোড়দৌড়ের স্টেজগুলো ভারি সুন্দর মেলে। ওয়াক, ট্রট, ক্যান্টার আর গ্যালপ। আমরা এখন শেষ দুটো পর্যায়ে। ক্যান্টার, মানে প্রবল বেগে ছুটছি আর গ্যালপ, মানে লম্বা লম্বা লাফ দিয়ে লক্ষ্যের সঙ্গে দূরত্ব কমিয়ে আনছি। আমি এটা বলছি না যে আমরা সমাধানের একদম দোরগোড়ায় আছি। আমি বলছি, মজন্তালীদের সঙ্গে আমাদের দূরত্ব কমছে।’
তানিয়া ঘাড় নাড়ল, ‘সেইদিক থেকে সাবধানতা অবলম্বন করে ভালোই হয়েছে, বলুন? ওদের গাড়িতে যাবার সিদ্ধান্তটা একদম ঠিক ছিল। ফ্লাইটে গেলে অভিযানের খবর গোপন রাখা যেত না।’
‘অবশ্যই। ইট ওয়াজ আ ওয়াইজ ডিসিশন।’
শুকিয়ে আসা ঠোঁট জিভ দিয়ে ভেজানোর চেষ্টা করে তানিয়া বলল, ‘এখন ওদিকে ঠিক কী চলছে কে জানে! এই উত্তেজনা আর ধরে রাখতে পারছি না!’
.
হোটেল সাগর রেসিডেন্সি, শিলিগুড়ি, পার্কিং লট, সকাল ১০টা ৩২
হোটেলের ব্যাকইয়ার্ড জুড়ে পার্কিং লট। খানিকটা বাগানমতোও আছে। সুকুমারের তিন সঙ্গী সেখানে পজিশন নিয়েছিল। আর সুকুমার গেছিল গোটা চত্বরটা একবার গোল করে টহল দিয়ে আসতে। হঠাৎ বাজখাঁই কণ্ঠে তার চিৎকার শোনা গেল, ‘অ্যাই! কে রে!’ তারপরেই হুইসল বেজে উঠল তীক্ষ্ণ স্বরে।
বাকিরা সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গেল বাঁ-দিকে। সুকুমারের দৃষ্টি অনুসরণ করে তারা দেখল, দোতলার একটা সানশেড থেকে লাফ মারছে একটা আপাদমস্তক কালো পোশাকে ঢাকা শরীর।
মাটি ছুঁয়েই লোকটা পা মুচড়ে বিচ্ছিরিভাবে মুখ থুবড়ে পড়ল। ফলে ধরতে কোনও অসুবিধাই হল না। সুকুমার কলার ধরে হেঁচড়ে তুলে তার মাথার হাফ মাস্কটা টান মেরে খুলল।
একজন মহিলা। মেয়ে বলাই ভালো। বয়েস পঁচিশের বেশি হবে না। চোখে ভয়।
সুকুমার গর্জে উঠল, ‘কে তুই? এখানে কী করছিলি?’
মেয়েটার ঠোঁট কেঁপে উঠল। ‘উঁ উঁ’ করে একটা জান্তব শব্দ বেরোল।
অগ্নিহোত্রী হিংস্র থাবায় মেয়েটার চোয়াল মুচড়ে দিয়ে বলল, ‘কথা বল শালি!’
‘টেক ইট ইজি প্লিজ,’ সুকুমার অগ্নিহোত্রীর হাত চেপে ধরল, ‘আপনি লেডি পুলিশ নন। মেয়েটি খুব সম্ভবত কথা বলতে পারে না।’
অগ্নিহোত্রী ক্ষুব্ধ হল, কিন্তু কিছু বলল না। মেয়েটার চোয়াল আর হাত দুটোই ছেড়ে দিল।
সুকুমার ধমকের সুরে মেয়েটাকে বলল, ‘হাঁ করো। মুহ দিখাও।’
মেয়েটা হাঁ করল। জিভটা কাটা।
.
হোটেল সাগর রেসিডেন্সি, শিলিগুড়ি, রুম নম্বর ৩০৭, সকাল ১০টা ৩৫
বুয়া পড়ে আছে বাথরুমের সামনে। নুটু বিছানার ওপর। দুজনকেই পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি করা হয়েছে। একেবারে কপালের মাঝখানে। অর্থাৎ আততায়ী বিন্দুমাত্র রিস্ক নিতে চায়নি।
লাশদুটো দেখেই দময়ন্তী বাথরুমে ছুটে গেছে এবং আবিষ্কার করেছে বাথরুমের কাচের জানলা সদ্য ভাঙা। সেখান থেকে রোগাভোগা একটা শরীর দিব্যি গলে যেতে পারে। অর্থাৎ আততায়ী ওই পথেই পাইপ বেয়ে তিনতলা থেকে নেমে গেছে, এবং সেটা ঘটেছে সম্ভবত দময়ন্তীরা আসার সামান্য কিছুক্ষণ আগেই।
রামকৃষ্ণ ঘোষ অবাক গলায় বললেন, ‘ঢুকল কীভাবে? দরজা তো ভেতর থেকে বন্ধ ছিল।’
‘হতে পারে আততায়ী খোলা দরজা দিয়ে ঢুকে খুন করেছে। তারপর ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে বাথরুমের জানলা ভেঙে পালিয়েছে।’
হোটেলের ম্যানেজার, কর্মচারীরা এসে পড়েছিল। সিকিউরিটি গার্ড, রিসেপশনিস্ট এবং অন্যান্য কর্মচারীরা একবাক্যে বলল, তারা বাইরের কাউকেই আজ ঢুকতে দেখেনি।
‘প্যাসেজে সিসিটিভি আছে তো?’ দময়ন্তী ম্যানেজারকে বলল, ‘ফুটেজগুলো দেখব, চলুন।’
প্রৌঢ় ম্যানেজার কুলকুল করে ঘামছিলেন। বললেন, ‘এই ফ্লোরের সিসিটিভি খারাপ আছে ম্যাম। তবে রিসেপশন আর নিচের ফ্লোরেরটা কাজ করছে।’
দময়ন্তী ঝাঁঝিয়ে উঠল, ‘খুন এই ফ্লোরে হয়েছে, নিচের ফ্লোরের সিসিটিভি নিয়ে আমি কী ছিঁড়ব?’
ম্যানেজার কাঁচুমাচু, ‘এখানে চব্বিশ ঘণ্টা সিকিউরিটি থাকে ম্যাম। বাইরের কেউ আমাদের চোখ এড়িয়ে ঢুকতে পারবে না।’
‘কেমন সিকিউরিটি থাকে সে তো দেখতেই পাচ্ছি।’
ঠিক সেই সময় নিচ থেকে ভেসে এল হুইসলের শব্দ। একবার। দুবার। তিনবার।
রাহুল মুহূর্তে জানলার কাছে ছুটে গেল। এক ঝলক দেখেই দময়ন্তীকে একটা ইশারা করে ছুটল দরজার দিকে। বিনা বাক্যব্যয়ে দময়ন্তীও ছুটল।
‘দুজন এখানে থাকো!’ বলে নির্দেশ দিয়ে রামকৃষ্ণ ঘোষও বন্দুক বাগিয়ে দময়ন্তীকে অনুসরণ করলেন।
.
হোটেল সাগর রেসিডেন্সি, শিলিগুড়ি, পার্কিং লট, সকাল ১০টা ৫০
রামকৃষ্ণ ঘোষ ও তাঁর লোকজন মেয়েটাকে ঘিরে ধরে জিজ্ঞাসাবাদ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। রাহুলের হাত ধরে পার্কিংয়ের এককোণে নিয়ে এল দময়ন্তী, ‘শোন, এই মেয়েটা মজন্তালী না। এটা ফলস ফ্ল্যাগ।’
‘এত শিওর কী করে হচ্ছ?’
‘মেয়েটা ভয়ে কাঁপছে রাহুল। ওকে বলা হয়েছে আমাদের ডিসট্রাক্ট করতে। আর কিছুই না।’
রাহুল মেয়েটার দিকে তাকাল। সত্যিই, খানিকটা দূর থেকেও বোঝা যাচ্ছে যে মেয়েটা থরথর করে কাঁপছে। পেট থেকে কথা উদ্ধার করারও উপায় নেই। মেয়েটা বোবা।
দময়ন্তী বলল, ‘ও খুনির সঙ্গে ছিল। খুনি অন্য পথে পালিয়েছে। ও দরজা বন্ধ করে বাথরুম গলে নেমেছে। ওটুকুই ওর কাজ ছিল।’
রাহুলের চোখমুখ হঠাৎ টানটান হয়ে গেল, ‘তুমি কি বলতে চাও খুনি এখনও এই হোটেলেই আছে?’
দুজনে একসঙ্গে মুখ তুলে তাকাল তিনতলার রুমের দিকে।
.
হোটেল সাগর রেসিডেন্সি, শিলিগুড়ি, রিসেপশন, সকাল ১১টা ৩০
হোটেলের রেজিস্টার খাতা খুলে দয়মন্তী বলল, ‘এইটাই। তিনশো দুই। এই ঘরেই ছিল। এটা ভাড়া হয়েছে আজ সকালে।’
রামকৃষ্ণ ঘোষ বললেন, ‘তিনশো দুই তো তিনশো সাত নম্বর ঘরের একেবারে মুখোমুখি।’
‘হ্যাঁ। সব খাপে খাপ হয়ে যাচ্ছে। মহিলা গেস্ট। দুদিনের বুকিং। অ্যাডভান্স পেমেন্ট ডান। মুখোমুখি ঘর।’
‘কিন্তু জলজ্যান্ত একজন মহিলা তো উবে যেতে পারে না।’
‘কাজ সেরে টুক করে বেরিয়ে তিনশো দুইয়ে ঢুকে পড়েছে। ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করে বাথরুমের জানলা দিয়ে বেরিয়ে আমাদের ফলস ফ্ল্যাগ দিয়েছে এই মেয়েটি। আমরা যখন সবাই ওকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি, সেই সুযোগে সবার চোখ এড়িয়ে আসল লোক ভাগলবা হয়েছে।’
ম্যানেজার আমতা আমতা করে বললেন, ‘কিন্তু মালপত্র তো রয়েছে ম্যাডাম।’
দময়ন্তী বলল, ‘চলুন একবার ঘেঁটে দেখি কী রয়েছে।’
তিনশো দুইয়ে খাটের ওপরেই মস্ত একটা ট্রাভেল ব্যাগ রাখা। খুলে দেখা গেল তার মধ্যে রাজ্যের খবরের কাগজ আর প্লাস্টিক গোল্লা পাকিয়ে পাকিয়ে রাখা।
ম্যানেজারের মুখ নিমেষে রক্তশূন্য। পুলিশ ছুঁলে ক’ঘা হবে সেটাই গুনছিলেন বোধহয়।
রাহুল রামকৃষ্ণ ঘোষকে বলল, ‘তিনশো সাত আর তিনশো দুই, দুটো ঘরই ফরেন্সিক সার্চ করানোর ব্যবস্থা করে দিন স্যার।’
‘নিশ্চয়ই।’ মাথা নাড়লেন মিঃ ঘোষ, ‘আপনারা তো আজই বেরিয়ে যাবেন?’
‘ফরেন্সিকের কাজ মিটে গেলেই বেরিয়ে পড়ব। রিপোর্টের ব্যাপারটা আপনি যদি পার্সোনালি তাগাদা দিয়ে একটু তাড়াতাড়ি বের করাতে পারেন, দেখবেন। আর হোটেলের ওয়ার্কিং সিসিটিভি ক্যামেরাগুলোর গত দুদিনের সমস্ত ফুটেজের ব্যবস্থা করুন প্লিজ।’
‘বেশ। আর এই মেয়েটার কী হবে? আপনারা নিয়ে যাবেন তো?’
‘হ্যাঁ। আপনাকে একটা গাড়ি আর দুজন ফিমেল স্টাফ অ্যারেঞ্জ করে দিতে হবে।’
দময়ন্তী নিচু গলায় রাহুলকে বলল, ‘হ্যাঁ রে, শুভ্রকান্তি স্যারকে আনানো যায় না?’
রাহুল ভুরু তুলল, ‘তোমার মনে হয় উনি এতদূর আসবেন?’
‘ক্লোজড ডোর খুন। ফরেন্সিক এভিডেন্স ক্লিক করে যেতে পারে। এইসব ক্ষেত্রে অনেক সময় ছোটখাটো মাইক্রো-অবজারভেশনও তফাত করে দেয়। উনি এলে এইদিকটা নিয়ে পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হতে পারি। দুপুরের ফ্লাইটে যদি টুক করে চলে আসতে পারেন।’
রামকৃষ্ণ ঘোষ দময়ন্তীদের কথাবার্তা শুনছিলেন। বললেন, ‘কথার মাঝখানে ঢুকে পড়ছি, কিছু মনে করবেন না। আপনারা কি বাই এনি চান্স শুভ্রকান্তি ব্যানার্জী কথা বলছেন?’
দময়ন্তী বলল, ‘হ্যাঁ। চেনেন নাকি? অবশ্য এই সার্ভিসে থেকে ওঁকে না চেনাই কঠিন।’
‘খুব ভালো করে চিনি। আমাদের ফরেন্সিকের ক্লাস উনিই তো নিতেন। উনি আসতে পারলে তো খুবই ভালো হয়। তবে আসবেন কি? ওঁর মেজাজটা তো একটু ইয়ে!’
দময়ন্তী রাহুলকে বলল, ‘স্যারকে ফোন কর। ঘটনাটা জানা আর শুভ্রকান্তি স্যারকে আসতে রিকোয়েস্ট করা যায় কিনা সেটাও বল।’
‘সেই ভালো,’ ফোনে অমিতাভর নম্বর বের করতে করতে রাহুল বলল, ‘খিস্তি খেলে স্যার খাবেন।’
.
ভবানী ভবন, সকাল ১১টা ৪৫
ওপাশ থেকে প্রথম বাক্যটা শুনেই অমিতাভর মুখের ম্যাপে ভূমিকম্প ঘটে গিয়েছিল। ফোন রেখে একেবারে প্রস্তরবৎ হয়ে গেলেন।
তানিয়া একটু ভয়ে ভয়েই জিগ্যেস করল, ‘কী বলছে?’
জলদমন্দ্র স্বরে অমিতাভ বললেন, ‘নুটু আর বুয়াকে মার্ডার করে দিয়েছে।’
তানিয়া অবিশ্বাসভরে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকল, ‘কী বলছেন!’
‘সেবক রোডের একটা হোটেলে ওদের লাশ পেয়েছে। রাহুলদের পৌঁছানোর সামান্য কিছুক্ষণ আগেই মেরে বেরিয়ে গেছে।’
‘কী করে? মানে…’ তানিয়ার কথা আটকে যাচ্ছে।
‘একটা মেয়ে ধরা পড়েছে বলল, কিন্তু সে মজন্তালী নয়। ফলস ফ্ল্যাগ।’
তানিয়া কয়েক সেকেন্ড সময় নিয়ে খবরটা হজম করল। তারপর খসখসে গলায় বলল, ‘এর মানে একটাই। নুটু ডেফিনিটলি এমন কিছু জানত যা থেকে মজন্তালী সরকারের পর্দা ফাঁস হতে পারত!’
‘বেড়ালবাহিনী সবসময় আমাদের থেকে এক কদম এগিয়ে আছে।’ বলে আবার ফোন তুলে নিলেন অমিতাভ, ‘দাঁড়াও, কঠিন একটা কাজ এসে জুটেছে। একটা ফোন সারতে হবে।’
শুভ্রকান্তি প্রথমেই নাকচ করে দিচ্ছিলেন। অমিতাভ অনেক কাকুতি-মিনতি করায় রাজি হলেন। কিন্তু শর্ত চাপালেন, ‘আমি কিন্তু ফিরবও ফ্লাইটে। এখন কাজের জন্য তড়িঘড়ি ফ্লাইটে পাঠিয়ে ফেরার সময় ট্রেন দেখালে হবে না, আগেই বলে দিচ্ছি। আর আমার সঙ্গে ব্যালিস্টিকসের অনির্বাণ যাবে।’
এই লোকটার ট্যানট্রাম সহ্য করতে করতে হাড়ে দুব্বো গজিয়ে যাবে। অমিতাভ রাগ হজম করে বললেন, ‘বেশ। আমি ব্যবস্থা করছি। আপনারা রেডি থাকুন।’
ফোন রেখে খানিকক্ষণ মাথায় হাত দিয়ে বসে রইলেন অমিতাভ। আক্ষেপের সুরে বললেন ‘একেবারে মুখের গ্রাস ছিনিয়ে নিয়ে গেল!’
তানিয়া বলল, ‘কিন্তু স্যার, আমরা একেবারে ঠিক পথে এগোচ্ছিলাম, এটুকু অন্তত বোঝা যাচ্ছে।’
টেবিলে সশব্দে একটা চাপড় মেরে অমিতাভ মুখ তুললেন, ‘চলো আবার ছাই ঘাঁটা শুরু করি। গত তিনদিনে উত্তরবঙ্গগামী সমস্ত ট্রেন এবং বাগডোগরা এয়ারপোর্টগামী সমস্ত ফ্লাইটের ফুল প্যাসেঞ্জার লিস্ট স্ক্রুটিনি করাও। আমাদের সাসপেক্টদের সঙ্গে সম্পর্কিত কারও নাম পাও কিনা দ্যাখো। আর নর্থ বেঙ্গলে সোর্সদের খোঁচাও। গত তিনদিনে কোনও সাসপিশাস মুভমেন্টের খবর আছে কিনা খোঁজ নাও। কুইক।’
.
হোটেল টিউলিপ, শিলিগুড়ি, বিকেল ৪টে ১০
‘পৃথ্বীশদা, ওরা ফিরেছে। অ্যান্ড সামথিং ইজ টেরিবলি ব্যাড!’
‘মানে? কী হয়েছে?’
শিরিন বলল, ‘এখানে হোটেল সাগর রেসিডেন্সিতে দুটো মার্ডার হয়েছে।’
পৃথ্বীশের চমকানি ফোনের এপাশ থেকেও দিব্যি টের পাওয়া গেল, ‘মার্ডার? কারা মার্ডার হয়েছে?’
‘কিছুই জানতে পারিনি এখনও। তবে এটা নিশ্চিত যে মার্ডারদুটো এই কেসের সঙ্গেই সম্পর্কিত। প্রভাসদার ফোন আউট অব নেটওয়ার্ক কভারেজ। আমরা যাচ্ছি সাগর হোটেলে। তুমি ততক্ষণে এদিকের অন্য করেসপন্ডেনটদের কাছে খোঁজ লাগাও। কারা খুন হয়েছে খবরটা জোগাড় করতে পারলেই তো দুয়ে দুয়ে চার তো হয়ে যাবে।’
‘বেশ। দেখছি।’
‘আচ্ছা পৃথ্বীশদা, আমরা কি গিয়ে দময়ন্তীদিদের সরাসরি প্রশ্ন করব?’
‘না। সেটা করতে যাস না। প্রশ্ন করতে হলে ওখানের করেসপন্ডেনটরা করলেই ভালো। আর তাছাড়া ওরা ফ্রন্টে আসবেও না। মিডিয়া স্টেটমেন্ট পুলিশই দেবে। তোরা সাগর হোটেলে গিয়ে খোঁজ লাগা। যতটা ইনফো পাচ্ছিস, নিয়ে ফিরে আয়। আমি টিকিটের ব্যবস্থা করছি। আজ রাতের ট্রেনেই ফিরে আয়।’
.
কলকাতা এয়ারপোর্ট, রাত ৯টা ৩০
শিডিউলড টাইম পঁয়তাল্লিশ মিনিট ধরা থাকলে কী হবে, বাগডোগরার রানওয়ে ছেড়ে কলকাতার রানওয়ে ছুঁতে মিনিট কুড়ি-বাইশও লাগল না। লাগেজ-টাগেজ নিয়ে এয়ারপোর্ট চত্বর ছেড়ে বেরিয়ে গাড়িতে উঠতে উঠতে আরও মিনিটখানেক। দময়ন্তী সিটের ওপর এলিয়ে পড়ে হাঁ করে ঘুমোতে লাগল। ওদিকে সামনের সিটে শুভ্রকান্তি ব্যানার্জিও ঝিমোচ্ছেন।
এই লোকটার থাকা আর না-থাকা ফরেন্সিক ফিল্ডে একটা ডেফিনিট তফাত তৈরি করে। আজও রাহুল অবাক হয়ে দেখছিল, লোকটার বেসিক অবজারভেশন কী মারাত্মক নিখুঁত। যন্ত্রপাতি তো পরের কথা। অবশ্য এত ওপেন কেসে ফরেন্সিকের তথ্য শেষমেশ কতটা কাজে আসবে, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। দেখা যাক।
রাহুল মস্ত একটা হাই তুলল। হাই উঠছে পরপর। অথচ ঘুম আসছে না। যে কাজ নিয়ে এখানে আসা, তার অনেক হিসেব ওলটপালট হয়ে গেল। অবশ্য সেসব নিয়ে এই মুহূর্তে ভাবতে ইচ্ছে করছে না। মাথার মধ্যে লকআউট হয়ে আছে। শেষ কবে এরকম হেকটিক শিডিউল গেছে, মনে পড়ে না। দু-রাত ঘুম প্রায় হয়নি বললেই চলে। বাড়ি ফিরে টেনে ঘুম দরকার। একটা গোটা দিন রেস্ট পেলে সবচেয়ে ভালো হত। কিন্তু সে কি আর কপালে আছে?
রাহুল জানলা দিয়ে রাতের হাইওয়ের দিকে তাকাল। রিফ্লেকটরগুলোকে আলোর মালার মতো মনে হচ্ছে। গাড়িতে নাইন্টিজের বলিউডি গান চলছে বিনবিন করে। শানুদা নাকি-গলায় প্রেমের তুলনা করছেন শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে। এইসব শুনলে আজও একটা তরল আবেগ মথিয়ে ওঠে ভিতরে।
সে একটা সময় ছিল বটে। টাটা ডোকোমোর এগারো টাকায় একশো দশটা এসএমএস। ‘রহেনা হ্যায় তেরে দিল মে’-র রিংটোন। স্কুলফেরত সাইকেলবাজি। বারো টাকার এগরোল। ওভারসাইজ জামা পরে দু-হাত মেলে দাঁড়িয়ে থাকা শারুক খান। পাড়ায় পাড়ায় খেলার মাঠ। বুকভর্তি ছলাৎছল প্রেম। দিতে চাই, নিতে কেহ নাই।
এইতো সেদিনের কথা। সিপিএম-এর শেষদিকের অগ্নিমান্দ্যময় নিঃশ্বাসে বাতাস তখন ভারী। ক্লাস ফোর অবধি ইংলিশ না শিখে গুছিয়ে কেস খেল গোটা একটা প্রজন্ম। অর্থনীতি বুলেটের গতিতে এত বেশি উদার হয়ে পড়ল যে আচমকা জিনিসে জিনিসে ভরে গেল চারপাশ। ধাঁধিয়ে যেত মধ্যবিত্ত ছেলেপুলেদের চোখ। ইগোয় হুল ফুটিয়ে যেত পয়সাওলা বাড়ির বন্ধুদের মাল্টিমিডিয়া ফোন। ভাবতে ভাবতে হঠাৎ রাহুলের মনে হল, অনেকক্ষণ নেট অন করা হয়নি। জরুরি কিছু এল কিনা চেক করা দরকার।
পকেট থেকে ফোন বের করে মোবাইল ডেটা অন করতেই হোয়াটসঅ্যাপ আর ফেসবুক ইনবক্সে টুংটাং করে বেশ কয়েকটা মেসেজ ঢুকল। ফেসবুকের মেসেজগুলো লীনার। সিক্স আনরেড মেসেজেস।
রাহুল সোজা হয়ে বসল। মেয়েটা হয়তো দুঃখপ্রকাশ করতে চাইছে। সেদিনের রূঢ় ব্যবহারের পর হয়তো অনুতপ্ত। কিন্তু ইনবক্স খুলে মেসেজ ‘সিন’ করলেই রিপ্লাই দিতে হবে। আপাতত শরীর, মাথা কোনওটাই সেই পরিশ্রমটা করতে চাইছে না। ‘সিন’ না করেই পড়ার চেষ্টা করতে হবে। সেক্ষেত্রে অবশ্য শুধু শেষ মেসেজটা দেখা যাবে। যাক গে, তাতেও বক্তব্যের নির্যাস পাওয়া সম্ভব। রাহুল খুব সন্তর্পণে স্ক্রিনে আঙুল ছুঁয়ে স্ক্রোল করতে শুরু করল। ঠিক তখনই ফোন গোঁ-গোঁ করে উঠল। তানিয়ার কল।
কল রিসিভ করে রাহুল বলল, ‘দুটো মিনিট পরেও তো ফোন করতে পারতিস!’
‘কেন, কী হয়েছে?’
‘না, না, কিছু না। ইয়ার্কি মারলাম। বল।’
‘শোনো, দারুণ একটা ব্যাপার ঘটেছে। বাঘের ঘরে ঘোগের বাসা বোঝো?’
রাহুলের স্নায়ু টানটান হয়ে উঠল, ‘মানে?’
‘তোমরা তো ফলো করছিলে নুটু হালদারকে! তোমাদের কারা ফলো করছিল জানো?’
কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেস, আলুপারা জংশন, রাত ৯টা ৩৫
‘থার্টি টু আর থার্টি থ্রি। মিস সৌমিলি নন্দী আর মিস শিরিন জাহান।’
সৌমিলি একমনে বই পড়ছিল। নিজেদের নাম শুনে চমকে মুখ তুলে দেখল, কালো কোট পরা টিটির পেছনে দশাসই চেহারার একটা লোক। নর্মাল ড্রেস, কিন্তু দেখেই মালুম হয় পুলিশ নয়তো ক্রিমিনাল। শরীরে একটা অজানা আতঙ্ক তরঙ্গ তুলে গেল। তবু সৌমিলি যথাসম্ভব স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করল, ‘আমি সৌমিলি নন্দী। কী ব্যাপার?’
দশাসই চেহারা সৌমিলিকে আপাদমস্তক একবার দেখে নিয়ে বলল, ‘শিরিন জাহান আপনার সঙ্গেই যাচ্ছেন তো?’
‘হ্যাঁ।’
‘কোথায় উনি?’
‘বাথরুমে গেছে,’ ঢোঁক গিলল সৌমিলি, ‘কী ব্যাপার বলুন তো?’
‘কিছু মনে করবেন না ম্যাডাম,’ লোকটা পকেট থেকে আই কার্ড বের করে দেখিয়ে বলল, ‘সিআইডি থেকে আমাদের বলা হয়েছে আপনাদের দেখেশুনে শিয়ালদা স্টেশন পর্যন্ত পৌঁছে দিতে। আশা করি আপনারা কো অপারেট করবেন।’
.
বউবাজার, রাত ৯টা ৪৫
যারা খুন হয়েছে তাদের নাম নুটু হালদার আর বুয়া হাসান। লোকদুটো নানারকম অবৈধ কারবারের সঙ্গে যুক্ত ছিল। শিলিগুড়ির প্রধাননগর থানা থেকে এর চেয়ে বেশি কিছু জানানো হয়নি। কিন্তু এদের সঙ্গে মজন্তালী সরকারের ঠিক কী লিঙ্ক, সেটা এখনও বোঝা যাচ্ছে না। সিআইডি কোনও সদুত্তর না দিলে সেটা জানতে পারা মুশকিল। সৌমিলিরা তেমন কিছুই জানতে পারেনি। কেস কোনদিকে বাঁক নিচ্ছে কিচ্ছু বোঝা যাচ্ছে না। এইসব ভাবতে ভাবতেই শাক্য দেখল, স্টপেজ এসে গেছে।
পৃথ্বীশদার ফোনটা যখন এল, শাক্য তখন পল্টুর দোকানে দাঁড়িয়ে কোল্ড ড্রিঙ্কের বোতল গলায় উপুড় করেছে।
‘হ্যাঁ পৃথ্বীশদা, বলো।’
‘শোন, একটা কাণ্ড ঘটেছে।’
পৃথ্বীশদার গলা যেন পাতালের কোন অন্ধকার অতল থেকে উঠে আসছে। ভয় পেয়ে গেল শাক্য, ‘কী হয়েছে পৃথ্বীশদা?’
‘সৌমিলি আর শিরিনকে পুলিশ অ্যারেস্ট করেছে। ট্রেন থেকে।’
‘অ্যারেস্ট করেছে মানে?’
‘মানে, ঠিক অ্যারেস্ট করেনি। নজরবন্দি করেছে। সিআইডি অফিসাররা নাকি কী সব জিজ্ঞাসাবাদ করবে। আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না!’
‘কীসের বেসিসে? কী জিজ্ঞাসা করবে?’
‘সেটা কিছু বলেনি। তবে আমার মনে হচ্ছে…।’
‘কী মনে হচ্ছে?’ শাক্য অস্থির গলায় জিগ্যেস করল।
‘শিলিগুড়িতে দুটো খুন হয়েছে জানিস তো? মনে হয় ওই ব্যাপারে ওরা সৌমিলিদের সন্দেহ করছে!’
‘খুনের সঙ্গে সৌমিলিদের কী সম্পর্ক?’
‘সম্পর্ক আছে কিনা সেটাই ওরা জানতে চাইছে। নিশ্চয়ই ওরা রিজার্ভেশন লিস্ট চেক করেছে। তাতে ওদের নাম পেয়েছে।’
শাক্য বিপন্ন গলায় বলল, ‘কী করব এখন?’
‘দময়ন্তী মুখার্জীকে একটা ফোন করে দেখবি?’
.
