ষোড়শ দিন
তারিখ : ১৭ আগস্ট, ২০১৩
ভবানী ভবন, সকাল ১০টা
রাহুল ফ্যাক করে হেসে বলল, ‘স্রেফ এয়ারপোর্টের দিক থেকে একটা চক্কর মেরে এসে এক্সপ্রেসওয়েতে চা খেয়ে ফিরে এল।’
তানিয়া হাঁ, ‘চা খেয়ে মানে? অত রাতে চায়ের দোকান খোলা থাকে?’
‘হ্যাঁ। ওই চায়ের দোকানগুলো রাত দেড়টা অবধি খোলা থাকে। আসলে বেলঘরিয়া এক্সপ্রেসওয়ে আইটি কর্মীদের যাতায়াতের রাস্তা। আর আইটি সেক্টরে লোকজনের দিনরাত বলে কিছু নেই, জানিস তো।’
‘তা রাতে বেরোচ্ছে বলেই কি সন্দেহ করতে হবে? উনি তো জানিয়েছিলেন যে উনি মাঝেসাঝে রাতে ড্রাইভ করেন।’
‘সেটা কি খুব নর্মাল ব্যাপার বলে মনে হচ্ছে তোর? একজন একলা মহিলার রাতে ড্রাইভ করার জন্য শহরটা এখনও উপযুক্ত হয়নি তানিয়া। এটা উচিত-অনুচিতের কথা হচ্ছে না। যেটা প্র্যাক্টিকাল, সেটা প্র্যাক্টিকাল। উনি কি জানেন না যে-কোনওদিন একটা বিপদ-আপদ ঘটতে পারে? জানেন নিশ্চয়ই। তা সত্ত্বেও যখন এরকম একটা শখ কন্টিনিউ করে চলেছেন, তার পিছনে গভীর কোনও কারণ থাকতেই হবে।’
‘তা গভীর কারণ আর খুঁজে পাওয়া গেল কই? চা খেয়েই তো ফিরে এল।’
‘হয়তো টের পেয়েছেন ওঁকে ফলো করা হচ্ছে।’
‘তাহলে? এবার কি উনি কিছুদিনের জন্য খাপে যাবেন?’
‘তাই তো মনে হচ্ছে।’
‘তবে উনি যদি নির্দোষ হন, ওঁর প্রফেশনাল লাইফ তছনছ হয়ে যাবে রাহুলদা। মিডিয়া, পাবলিক কেউ তো খাপ বসাতে ছাড়বে না।’
‘অমিতাভ সান্যাল আর দময়ন্তী মুখার্জীকে আমি ঠিক এই কারণেই শ্রদ্ধা করি রে তানিয়া। জিরো টলারেন্স হয়েও ওঁরা সাসপেক্টদের রুথলেসলি বুলডোজ করে দিচ্ছেন না। তাঁদের সামাজিক সম্মানের যথেষ্ট খেয়াল রাখছেন। সম্পূর্ণার ব্যাপারে যেমন মিডিয়া ট্রায়ালের সম্ভাবনাই রাখেননি। একেবারে বোল্ডার ফেলে দিয়েছেন। আগে লিঙ্ক পাওয়া যাক, তারপর। সামন করছেনই না প্রায়, এ জিনিস কিন্তু ভাবা যায় না। অন্য কেউ হলে বয়েস, মনের অবস্থা এসব কতটা রেয়াত করত জানি না। সম্পূর্ণার সঙ্গে হিস্ট্রি বা প্যাটার্নে যে পরিমাণ মিল পাওয়া গেছে, অন্য কোনও অফিসার লিড করলে এতক্ষণে বাবা-মা শুদ্ধু নায়িকাকে হেফাজতে নিত। আর আমাদের লিড অফিসাররা এখন তেল পুড়িয়ে শ্রীরামপুর যাচ্ছেন তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে।’
‘ঠিক। তবে সম্পূর্ণার মাকে তো বলল জিজ্ঞাসাবাদ করা যাবে না। উনি ট্রমাটাইজড। দময়ন্তীদি সেই অনুরোধও রাখছেন কাগজপত্র না-দেখেই।’
‘যতটুকু বুঝছি, মজন্তালীরা মানুষের স্মৃতি থেকে বেশিদিনের জন্য সরে যেতে চায় না। খুব বড় ব্রেক নেবে বলে আমার মনে হয় না। একটা পারপাস-ড্রিভেন ক্রাইমের লক্ষ্যই থাকে নিজের উদ্দেশ্যকে ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রচার করা। ফলে শুরুর ক’টা দিনের মতো খুনখারাপি না হোক, নানাবিধ উৎপাত এরা চালিয়ে যাবেই।’
‘ঠিকই বলেছ। এখন তো দিব্যি ভয় দেখিয়েই টুকটাক কাজ হাসিল করে নিচ্ছে। প্রডিউসারদের থ্রেট কলের ব্যাপারটাই ভাবো।’
‘হ্যাঁ। পরিশ্রম করে একটা ভয় তৈরি করেছে। সেটাকে এনক্যাশ তো করবেই।’
‘তবে দুষ্টু লোকগুলোকে ভয় পেতে দেখে ভালো লাগছে কিন্তু, যা-ই বলো।’
রাহুল হাসল, ‘ব্যক্তি তানিয়া কি পক্ষ নিচ্ছেন?’
শ্রীরামপুর, সকাল ১১টা ৩০
ছিমছাম মধ্যবিত্ত পাড়ার মাঝখানে ছাপোষা দোতলা বাড়ি। সদ্য রং করা হয়েছে মনে হচ্ছে। বেল বাজাতে দরজা খুললেন এক ভদ্রলোক। মাঝারি, ক্ষয়াটে চেহারা। তবে চোখজোড়া উজ্জ্বল। সম্পূর্ণার সঙ্গে মিল বলতে ঠোঁটের দিকটায়।
‘শ্যামলবাবু?’
‘আজ্ঞে।’
অমিতাভ আইডি তুলে ধরলেন, ‘আমরা সিআইডি থেকে আসছি।’
‘আসুন আসুন,’ হাত জোড় করে বললেন শ্যামল মিত্র, ‘রেখা বলেছিল আপনারা আসবেন।’
ভারি চমৎকার গমগমে গলা ভদ্রলোকের। বাচিকশিল্পীর উপযুক্ত। বৈঠকখানাটা ছোট। দুটো বড় সোফাতেই অনেকটা ভরে গেছে। দেওয়ালের একদিকে মা কালী, অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ আর লেনিন পাশাপাশি। খুবই বিভ্রান্তিকর মতাদর্শের পরিবার। সোফায় বসে অমিতাভ বললেন, ‘শ্যামল মিত্র আমার ভারি পছন্দের গায়ক।’
হাসি ফুটল প্রৌঢ়ের মুখে, ‘আমারও।’
‘নাম পাল্টানোর সময় সেইজন্যই কি…?’
‘তা বলতে পারেন।’
‘আপনার স্ত্রীকেও যদি ডেকে নেন, কথাবার্তা শুরু করতে পারি।’
শ্যামলবাবু একটু গলা খাঁকড়ে নিয়ে বললেন, ‘কিছু মনে করবেন না। আমার স্ত্রী-র সঙ্গে কথা বলা কঠিন হবে। আসলে উনি মানসিকভাবে খুব একটা সুস্থিত নন।’
‘কী হয়েছে?’
‘ডাক্তার বলেছেন অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার এবং অ্যাকিউট স্কিজোফ্রেনিয়া।’
‘ওঁর এই সমস্যা কি ওই ঘটনার পর থেকেই?’
‘সমস্যাটা প্রকট হয়েছে অনেকটা পরে। তবে শিকড় তো ওখানেই। এক মেয়ের ওভাবে মৃত্যু, আর এক মেয়ের খুনের অভিযোগে হোমে যাওয়া—পরপর দু-মাসের ব্যবধানে এত বড় দুটো ঘটনা…’
দময়ন্তী বলল, ‘ওঁর এই অবস্থা। আপনি পারেন একা-একা সামলাতে?’
‘চব্বিশ ঘণ্টার আয়া রয়েছেন। আমিও যতটা পারি সময় দিই।’
অমিতাভ বললেন, ‘আপনি কি এখনও যজমানি করেন?’
‘না না। পূর্বাশ্রম পুরোপুরি মুছে ফেলতে পারলে বাঁচি। মেয়ে একটা জেরক্স-স্টেশনারির দোকান খুলে দিয়েছে। সেটাই চালাই। লোক আছে। আমি মাঝেমাঝে গিয়ে বসি।’
‘মেয়ের সঙ্গে থাকেন না কেন?’
‘কলকাতার অত ভিড়ের মধ্যে ভালো লাগে না। আর তাছাড়া আমার মনে হয়, একটা বয়েসের পর ছেলেমেয়েদের একটু স্বাধীনভাবে থাকাই ভালো। ও যে-পেশায় আছে, ওর জীবনযাত্রা হয়তো আমরা সবসময় মেনেও নিতে পারব না। তার চেয়ে ও নিজের পথ তৈরি করুক না। আমরা তো রইলামই। ওকেও তো নিজেকে নতুন করে গুছিয়ে নিতে হচ্ছে। সেটাও কি কম লড়াই, বলুন?’
অমিতাভ দময়ন্তীর দিকে দৃষ্টিপাত করলেন। তারপর শ্যামল মিত্রকে বললেন, ‘আপনি মজন্তালী সরকারের কথা তো শুনেছেন। সেই ব্যাপারেই আপনার কাছে আসা।’
‘হ্যাঁ। রেখা বলেছে আপনারা ওকে সন্দেহ করছেন।’
‘আসলে অনেকগুলো পয়েন্ট মিলছে। প্রতিশোধের জন্য খুন, চুলের কাঁটা দিয়ে খুনের প্যাটার্ন, বয়েস।’
‘গোয়েন্দা সাহেব, আমরা সবাই মিলে অনেক চেষ্টা করে নিজেদের গুছিয়েছি।’ শ্যামলবাবুর কণ্ঠে একটু বিষণ্ণতা মিশল, ‘লড়াইটা খুব কঠিন ছিল। নিজের জায়গা-জমি ছেড়ে ভাড়াবাড়িতে উঠে এসেছি। শূন্য থেকে শুরু করতে হয়েছে। আমি একটা মিষ্টির দোকানে কাজ করেছি। আমার স্ত্রী সেলাইয়ের কাজ করেছেন। নেহাত রেখা খুব মেধাবী ছিল। ঝড়ঝাপটা সামলে ঠিক দাঁড়িয়ে গেল। এখন ও নিজের জগতে একটু-আধটু নাম করছে। এরকম একটা সময়ে আপনারা এমন অভিযোগ আনছেন। আমরা যে আবার ভেঙেচুরে যাব।’
‘তাহলে আপনি বলছেন মজন্তালী সরকারের সঙ্গে রেখার কোনও যোগ নেই?’
‘না স্যার। ভুল দিকে ধাওয়া করছেন আপনারা।’
‘রেখা খুনটা করেছিল আত্মরক্ষার্থে। তাই তো?’
‘হ্যাঁ স্যার। সেইজন্যই তো ছাড়া পেয়ে গেল।’
‘কিন্তু মার্ডারের কারণ নিজেই তো চিরকুটে লিখেছিল। ব্যাপারটা যে মিলছে না শ্যামলবাবু।’
‘খুনটা নিজেকে বাঁচাতেই করেছিল। পরে রাগের মাথায় চিরকুট লিখে ফেলে। বাচ্চা মেয়ে। মনের অবস্থাটা ভাবুন।’
অমিতাভ আঙুল মটকাতে মটকাতে বললেন, ‘আপনারা গ্রাম ছাড়লেন কি পলিটিকাল চাপে?’
‘হ্যাঁ স্যার। নানকু মণ্ডল ছিল কাউন্সিলার মনা মিত্তিরের একদম খাস লোক। ও মারা যাবার পর একটা প্রলয় শুরু হয়ে গেল। আমাদের বাড়ি বয়ে এসে দুবেলা হুমকি দিতে শুরু করল মনা মিত্তিরের লোকজন। পুলিশ প্রোটেকশনের জন্য আবেদন করেছিলাম। তিনদিন পরে একটা সেপাই দিল। মনা মিত্তিরের লোক এলেই তাঁর বাথরুম চাপত।’
‘শ্যামলবাবু, সেই দিনটার কথা আপনার কাছে ডিটেলে শুনব। যেদিন সম্পূর্ণা নানকু মণ্ডলকে খুন করল। সবিস্তারে বলুন। খুঁটিনাটি কিছু বাদ দেবেন না।’
.
গলফ গ্রিন, রাত ৯টা
আননোন নম্বর থেকে ফোন এলেই কেমন একটা অজানা অস্বস্তি হতে থাকে শালিনীর। একটা উদ্বেগ গোছের। কোনও সঙ্গত কারণ নেই। প্রতিবারই শালিনীর মনে হয়, ফোনটা ধরবে না। কিন্তু না-ধরে থাকাও যায় না। কতরকম প্রয়োজনই তো থাকতে পারে লোকজনের। দোনামনা করতে করতেই ফোনটা রিসিভ করল সে, ‘হ্যালো।’
ওপাশ থেকে একটা মহিলা কণ্ঠ খুব পরিশীলিত উচ্চারণে বলল, ‘শালিনী সিনহা বলছেন?’
‘বলছি। আপনি?’
‘আমার নাম সম্পূর্ণা মিত্র। আপনি আমাকে রেখা নামে চিনতেন।’
শালিনী এটার জন্য তৈরি ছিল না। একটু কেঁপে গেল। চট করে জবাব এল না মুখে।
‘দিদি শুনতে পাচ্ছেন?’ সম্পূর্ণা বলল ওপাশ থেকে, ‘আমি আপনার সঙ্গে একবার দেখা করতে চাই। কাল বিকেলের দিকে একটু সময় পাওয়া যেতে পারে?’
.
কাশীপুর, রাত ১০টা ৩০
‘ফোন থেকে মাথাটা একটু তোল এবার। চোখদুটো তো যাবে।’ বলতে বলতে বাসন হাতে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল মা।
লীনা পাত্তা দিল না। মনটা উচাটন হয়ে আছে। আগের মেসেজটা সিন করেনি কেন লোকটা? দু-ঘণ্টা আগে অ্যাকটিভ ছিল দেখাচ্ছে। আরেকটা মেসেজ পাঠাতে ইচ্ছে করছে। হ্যাংলা ভাববে? ভাবুক। লীনা টকাটক টাইপ করল, ‘কী ব্যাপার? সাড়াশব্দ করছেন না যে!’
.
