মজন্তালী সরকার – অষ্টম দিন

অষ্টম দিন

তারিখ : ৯ আগস্ট

ভবানী ভবন, সকাল ১১টা

ভবানী ভবনের কনফারেন্স রুমে রাজ্যের সমস্ত মিডিয়া ভেঙে পড়েছে। যত লোক বসতে পেরেছে তার দ্বিগুণ লোক দাঁড়িয়ে আছে। আক্ষরিক অর্থেই ঘরটায় মাছি গলার জায়গা নেই। শাক্য, সৌমিলি, শিরিন তো আছেই। রণদীপও এসেছে। সঙ্গে ক্যামেরাম্যান হিসেবে এসেছেন স্বপনদা। শাক্য দেখল বেশ কয়েকটা ন্যাশনাল নিউজ চ্যানেলও এসেছে।

আজ মজন্তালী সরকারের কেস নিয়ে সিআইডি-র প্রথম প্রেস কনফারেন্স। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলবেন স্পেশাল সুপারিন্টেনডেন্ট (অপারেশন) অমিতাভ সান্যাল এবং এসিপি দময়ন্তী মুখার্জী। শাক্য চাপা গলায় সৌমিলিকে বলল, ‘দুটোই খরুশ। দেখবি একটা কথারও ঠিকঠাক উত্তর দেবে না।’

দময়ন্তী কথা শুরু করল, ‘আপনারা প্রশ্ন শুরু করার আগে একটা কথা বলে নিই। এই কেসটাকে আমরা সিরিয়াল কিলিং অ্যান্ড মাস নুইসান্সের আওতায় ফেলছি। এখনও পর্যন্ত যা আপডেট, মজন্তালী সরকার ছ’টা খুন করেছে। একটা পত্রিকার অফিসে আগুন লাগিয়েছে। আরও অনেক কার্যকলাপ করেছে যাতে পাবলিক আনরেস্ট তৈরি হয়েছে। তবে আমরা আশা করছি তাড়াতাড়িই আমরা অপরাধীকে ধরতে পারব এবং সিচুয়েশন উইল বি আন্ডার কন্ট্রোল। আপনারা এবার প্রশ্ন করতে পারেন।’

একজন সাংবাদিক বললেন, ‘তাহলে মজন্তালীকে আপনারা সাধারণ অপরাধীর মতোই ট্রিট করছেন?’

‘প্রশ্নটার মানে বুঝলাম না,’ দময়ন্তী খর চোখে তাকাল, ‘মজন্তালী সরকার একজন খুনি। একজন সিরিয়াল কিলার।’

‘কিন্তু তার উদ্দেশ্য মহৎ। সে যা করছে, একটা নৈতিকতার জায়গা থেকে করছে। যারা খুন হচ্ছে তারা সকলেই জঘন্য অপরাধী। সমাজের জন্য বিপজ্জনক।’

‘পদ্ধতিই যখন ভুল, উদ্দেশ্য মহৎ কিনা সেটা বিচার করা নিষ্প্রয়োজন। খুন ইজ খুন। উদ্দেশ্য যেটাই হোক, শি ইজ আ থ্রেট টু ল অ্যান্ড অর্ডার। আইন নিজের হাতে তুলে নেবার অধিকার আমাদের সংবিধান কাউকেই দেয় না।’

‘অনেকেই বলছেন, মজন্তালীর আবির্ভাব আসলে পুলিশ প্রশাসনের ব্যর্থতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। এ বিষয়ে আপনারা কী বলবেন?’

দময়ন্তী বলল, ‘মজন্তালী সরকার আইন ভাঙে। আর পুলিশ আইন রক্ষা করে। আমার মনে হয় প্রথম কাজটা অনেক বেশি সোজা। কারণ তাতে কোনও দায় থাকে না।’

সৌমিলি উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘সমাজের প্রতি মজন্তালীর একটা দায় আছে। সেটাকে কি অস্বীকার করা যায়? লীনা দাশগুপ্তকে লেখা চিঠিটাই কি তার প্রমাণ নয়?’

দময়ন্তী সৌমিলির দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল, ‘চারপাশে দিনদিন জেন্ডার ভায়োলেন্স বাড়ছে এটা ভয়ানক অ্যালার্মিং। কিন্তু মজন্তালী সরকার তার সমাধান হতে পারে না। অপরাধ অপরাধই। তাকে প্রত্যক্ষভাবে না হোক, পরোক্ষভাবে গ্লোরিফাই করার চেষ্টা করছে কোনও কোনও মিডিয়া হাউজ। এটা অভিপ্রেত নয়।’

চাপা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল ঘরে। অনেকের মুখে মৃদু অসন্তোষ দেখা দিল। বয়স্ক একজন সাংবাদিক বললেন, ‘মজন্তালীর চিরকুটে সুজান জর্ডানের ফিঙ্গারপ্রিন্ট কীভাবে পাওয়া গেল সে-বিষয়ে কিছু বলবেন? সুজান বা তাঁর পরিবারের কেউ কি তবে মজন্তালীর সঙ্গে জড়িত?’

দময়ন্তী বলল, ‘সেটা বলার সময় এখনও আসেনি। তদন্ত চলছে।’

অমিতাভ ছোট্ট একটা গলা খাঁকারি দিলেন। অর্থাৎ তিনি এবার বলবেন। সবার চোখ ঘুরে গেল তাঁর দিকে। কৌতূহলী দৃষ্টিগুলোকে কয়েক সেকেন্ড সময় দিলেন অমিতাভ। বললেন, ‘মজন্তালী নিয়ে চারদিকে নানারকম মিথ্যে রটনা ছড়াচ্ছে। এটা আমরা পরিষ্কার করে দিতে চাই যে এখানে কোনও সুপারন্যাচারাল অ্যাঙ্গেল নেই। চ্যানেলে চ্যানেলে দেখছি ভাঁড়ের মতো লোকজন ধরে আনা হচ্ছে; তাদের কেউ মজন্তালীকে উড়তে দেখেছে, কেউ গাছে গাছে ডিং মেরে হাওয়া হয়ে যেতে দেখেছে, কেউ দেখেছে মজন্তালী বেড়াল হয়ে পাঁচিল টপকে ওপাশে চলে যাচ্ছে। আপনাদের কাছে অনুরোধ, মিথ্যে রটনা ছড়ানোয় সাহায্য করবেন না। এই কেসের তদন্ত আমরা করছি। আপনাদের প্যারালাল ট্রায়াল চালানোর দরকার নেই।’

শাক্য বলল, ‘বারোই সেপ্টেম্বরের হুমকির ব্যাপারটা আপনারা কীভাবে দেখছেন?’

‘আমরা সমস্তরকম সতর্কতা নিচ্ছি। কারেকশনাল অথরিটি এবং সিআইডি এ-ব্যাপারে একসঙ্গেই কাজ করছে…।’

বলতে বলতে দময়ন্তীকে মাঝপথেই থেমে যেতে হল। কারণ কোথায় যেন একটা গান বেজে উঠেছে। গান নয় ঠিক, একটা ইন্সট্রুমেন্টাল। রহস্যময় একটা মিউজিক। কোনও হলিউডি থ্রিলার ছবির সাউন্ডট্র্যাকের মতো। কারও ফোন বাজছে মনে হচ্ছে। দময়ন্তী সাংবাদিকদের দিকে চেয়ে বলল, ‘ফোনটা প্লিজ সায়লেন্ট করুন।’

মিউজিক বন্ধ হল না। বরং ধীর থেকে দ্রুত হল লয়। আওয়াজটাও যেন বেড়ে উঠছে ক্রমশ।

এবার অমিতাভ ধমকে উঠলেন, ‘কার ফোন বাজছে? সায়লেন্ট করুন। কী হচ্ছে?’

মিউজিক বন্ধ হল না। এবার অমিতাভদের পিছনের পর্দায় একটা মানুষের অবয়ব ভেসে উঠল।

এক মুখোশধারী চেয়ারে বসে আছে। পরনে কালো ট্র্যাকসুট আর প্যান্ট। দেহরেখায় বোঝা যাচ্ছে মুখোশধারী মানুষটি মহিলা। হাত জোড় করে কথা শুরু করল সে, ‘নমস্কার, আমার নাম মজন্তালী সরকার। কিছু কথা আপনাদের সবার সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাই। সেই কারণেই এই ভিডিও। যে-কোনওরকম লিঙ্গ-হিংসার বিরুদ্ধে আমার লড়াই। এই লড়াইয়ে আমি আপনাদের সবাইকে পাশে চাই। এভাবে প্রেস কনফারেন্সের মাঝে বিঘ্ন ঘটানোর জন্য পুলিশ-প্রশাসনের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আমি পুলিশকে চ্যালেঞ্জ জানাতে চাই না। কারণ পুলিশের যা উদ্দেশ্য, আমার উদ্দেশ্যও তাই। তাদের কাছে আমার বিনীত অনুরোধ, আমার পিছনে সময় নষ্ট না-করে আসল অপরাধীদের ধরুন।

‘অনেকের মনে একটা প্রশ্ন নিশ্চয়ই উঠেছে, নামটা কেন মজন্তালী সরকার? যাঁদের একটু-আধটু বইপত্র পড়ার অভ্যেস আছে, তাঁরা জানেন যে, মজন্তালী সরকার উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর গল্পের একটা চরিত্র। বেড়াল। এখন প্রশ্ন, বেড়াল কেন? এর কোনও উত্তর আপনারা নিশ্চয়ই ভেবে পাচ্ছেন না। উত্তরটা দিয়ে যাই। বেড়াল এমনিতে খুব নরমসরম ভিতু একটা প্রাণী। কিন্তু আপনি তাকে কোণঠাসা করুন, টের পাবেন সে আসলে বাঘের জাত। মেয়েদের ক্ষেত্রেও এই কথাটা প্রযোজ্য। সেটা মনে করিয়ে দিতেই আমি এসেছি…।’

ঘটনার আকস্মিকতায় ঘরের সকলের মতো দময়ন্তী, অমিতাভরাও থ মেরে গিয়েছিল। তানিয়াই প্রথম বুঝতে পারল, সমস্যাটা আসলে প্রোজেক্টর মেশিনে। সে ছুটে গিয়ে প্রোজেক্টরের পাওয়ার সাপ্লাই অফ করল। কিন্তু ইউপিএস থেকে তখনও বিদ্যুৎ আসছিল। ফলে প্রোজেক্টর অফ হল না। ভিডিও এগিয়ে চলল। ওয়ারলেস প্রোজেক্টরকে অফ করার আর কোনও উপায় নেই। অমিতাভরা অসহায় হয়ে বাকি ভিডিওটুকু দেখলেন।

ক্যাটললনা তখন বলছেন, ‘যে যার ক্ষমতা অনুযায়ী চারপাশটাকে পাল্টাতে চেষ্টা করুন। এলাকায়-এলাকায় জোট বাঁধুন। ধর্ষণ বা শ্লীলতাহানির মতো ঘটনা ঘটতে দেবেন না। আমরা কেউ মহাপুরুষ নই। খুবই সামান্য আমাদের ক্ষমতা। কিন্তু সেগুলোকে যোগ করলে একটা বিরাট শক্তি তৈরি হয়। আসুন, এই দুনিয়াটাকে লিঙ্গ-হিংসা থেকে মুক্ত করি। আমাকে আপনারা একা করে দেবেন না। আপনাদের ছাড়া আমি কেউ নই, কিচ্ছু নই। মানুষের সংগঠিত শক্তি ছাড়া আর কোথাও কোনও ম্যাজিক নেই। ডু ইউ বিলিভ ইন ম্যাজিক? বুকে হাত দিয়ে নিজেকে প্রশ্ন করুন।’

.

সাদার্ন স্ট্রিট, সকাল ১১টা ৩০

ভবানী ভবন থেকে পাঁচ মিনিটের দূরত্বে একটা ক্যাফেটেরিয়া। এলইডি স্ক্রিনে নিউজ চ্যানেল চলছে। কনফারেন্স রুমের ভেতরের ঘটনাটার ফুটেজ দেখানো হচ্ছে বারবার। দময়ন্তী মুখার্জীর কথার মাঝখানে বেজে ওঠা সাসপেন্স মিউজিক, তারপরেই পর্দায় ভেসে ওঠা সেই চেহারা এবং কণ্ঠ। গোটা ঘরের লোক গুহাচিত্রের মতো স্থির, মন্ত্রমুগ্ধ। সিআইডি অফিসার আর পুলিশকর্মীরাই শুধু উদ্‌ভ্রান্তের মতো এদিক-সেদিক করছেন। লাইভ নিউজের তরুণী সাংবাদিকের উত্তেজিত ভয়েসওভারে শোনা যাচ্ছে, ‘কনফারেন্স রুমের প্রোজেক্টর কোনওভাবে হ্যাক করা হয়েছিল। অবশ্য কীভাবে সেটা সম্ভব হল সেই বিষয়ে সিআইডি কর্তারা কোনও মন্তব্য করতে চাইছেন না।’

কাফের কোনার দিকের টেবিলে একটা ক্যাপুচিনো নিয়ে যিনি বসেছিলেন, তাঁর ঠোঁটে একটা আলগা হাসি ফুটে উঠল। মনটা ফুরফুর করছে। আরেকটু কিছু খাওয়া যাক। এমনিতেও সকাল থেকে তাড়াহুড়োর চোটে তেমন কিছু পেটে পড়েনি। দেশলাই বাক্সের সাইজের রিমোটটা যত্ন করে লেদার কেসে ঢুকিয়ে ব্যাগে পুরলেন তিনি। তারপর বাঁ হাত তুলে সামান্য আন্দোলিত করলেন, ‘এক্সকিউজ মি।’

কাফের একজন কর্মী এগিয়ে এল, ‘ইয়েস ম্যাম?’

‘একটা চিকেন ক্লাব স্যান্ডউইচ প্লিজ।’

.

ভবানী ভবন, কলকাতা, দুপুর ১টা ৫০

রাজ্য পুলিশের উচ্চ আধিকারিকেরা প্রায় সবাই হাজির। এডিজি প্রবীর চক্রবর্তী যথারীতি ভাবলেশহীন, গম্ভীর। আইজি অনিমেষ ভদ্রর মুখ রাগে থমথম করছে। আইজি টু কেয়া ঘোষ আর ডিআইজি অভিজিৎ সাহার কপালে ভ্রূকুটি। অমিতাভ মরা মাছের মতো দৃষ্টি নিয়ে বসে। দময়ন্তী সহ বাকি এস এস-দের মুখে আষাঢ়ের মেঘ। সবটার মাঝখানে ভয়ানক নার্ভাস বোধ করছে তানিয়া। আড়চোখে সে রাহুলকে দেখে নিল একবার। রাহুল একমনে টেবিলের কোনা খুঁটছে।

দময়ন্তীর ইশারা পেয়ে সুকুমার উঠে দাঁড়িয়ে হাতের প্লাস্টিক পাউচটা উঁচু করে তুলে ধরল। তার মধ্যে ছোট্ট গোল চাকতির মতো একটা জিনিস। বলল, ‘এইটা একটা রিমোট অ্যাক্সেস ডিভাইস। এটা টেপ দিয়ে প্রোজেক্টরের গায়ে লাগানো ছিল। এর সাহায্যেই প্রোজেক্টর হ্যাক করা হয়েছে।’

আইজি টু কেয়া ঘোষ বললেন, ‘তার মানে অনেক দূরে বসে কেউ আমাদের প্রোজেক্টরের দখল নিয়ে নিয়েছিল?’

‘হ্যাঁ ম্যাম।’

আইজি অনিমেষ ভদ্র রাগত কণ্ঠে বললেন, ‘এসব পরের কথা, আগে বলুন যে-ঘরের সিসি ক্যামেরা গত দশ-বারো দিন ধরে খারাপ, সেখানে কনফারেন্স ডাকা হল কেন?’

‘আরেকটা কনফারেন্স রুমের ক্যামেরা আরও আগে থেকে খারাপ।’ অমিতাভ যান্ত্রিক গলায় বললেন, ‘আমি শুনলাম একসঙ্গে একুশটা নতুন সিসি ক্যামেরার রিকুইজিশন দেওয়া হয়েছে। সেগুলো কবে আসবে, সেটা আমার জানার কথা নয়।’

এক্ষেত্রে অমিতাভকে দোষারোপ করা সম্ভব নয়। ফলে অনিমেষ ভদ্র বারদুয়েক রাগতস্বরে বিড়বিড় করে চুপ মেরে গেলেন।

আইজি টু কেয়া ঘোষ বললেন, ‘ক্যামেরা না-হয় খারাপ। কিন্তু স্ক্যানার তো ঠিক আছে। দুটো ডিটোনেটর নিয়ে ঢুকল অথচ স্ক্যানারে ধরা পড়ল না? কীভাবে সম্ভব?’

‘জানি না। নো ক্লু।’ অমিতাভ কাঁধ ঝাঁকালেন, ‘আমি নিজে একটু আগে চেক করে দেখলাম স্ক্যানার ঠিকঠাক কাজ করছে।’

অনিমেষ ভদ্র বললেন, ‘সিকিউরিটির দায়িত্বে কারা ছিলেন? সাসপেনশন অর্ডার টাইপ করাতে বলুন।’

দুর্ঘটনার পর স্কেপগোট চাই। এটাই নিয়ম। এবার সেই স্কেপগোটের তালিকায় তদন্তকারী অফিসাররাও ঢুকে পড়বেন কিনা, সেটাই দেখার। তার জন্য মুখ্যমন্ত্রীর সিগনাল লাগবে। মুখ্যমন্ত্রী আজ বাংলাদেশ সফরে যাচ্ছেন। উদ্দেশ্য ছিটমহল পরিদর্শন। সফরসঙ্গী সেচমন্ত্রী আর ডিজি। এই মুহূর্তে সম্ভবত তাঁরা ফ্লাইটে। ফলে অমিতাভ, দময়ন্তীদের ভাগ্য আর কিছুক্ষণ পর জানা যাবে।

দময়ন্তী বলল, ‘অ্যানালিটিকস ডিপার্টমেন্ট সমস্ত সিসি ক্যামেরা ফুটেজ চেক করছে। লোক ধরে ধরে আইডেন্টিটি ভেরিফাই করতে বলেছি। যে করেছে সে নিশ্চয়ই মিডিয়ার কেউ না। ফলে আশা করছি ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই আমরা তাকে আইডেন্টিফাই করতে পারব।’

অনিমেষ ভদ্র বললেন, ‘একটা শহরে যখন ধারাবাহিকভাবে এত বড় একটা কর্মকাণ্ড ঘটে চলেছে, অ্যান্টিসোশাল মহলে তার বিন্দুমাত্র কোনও আভাস ইঙ্গিত বা ফুটপ্রিন্ট নেই, সেটা হতে পারে না। প্রবীরবাবুর কাছে আমি যতটুকু শুনেছি, এই কেসে অফিশিয়ালি মোট একাশি জন খোঁচর কাজ করছে। আনঅফিশিয়ালি সংখ্যাটা কোথায় দাঁড়িয়েছে সেটা আমি জিগ্যেস করব না। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমরা ক্লু লেস। হোয়াই অমিতাভ?’

অমিতাভ বললেন, ‘এটা একটা সংগঠিত টিমওয়ার্ক, অনিমেষদা। আমরা এতদিন মজন্তালী সরকারকে একজন মহিলা বলে ভেবে এসেছি। হয়তো মজন্তালী সরকার একটা কালেকটিভের নাম। হয়তো তাঁরা এতটাই সংগঠিত যে আমরা ভাবতেই পারছি না।’

‘কতটা সংগঠিত?’ অমিতাভকে চেপে ধরার সুযোগ পেয়ে ছাড়লেন না অনিমেষ ভদ্র, ‘একটা এথিকাল সিরিয়াল কিলিংয়ের কি-প্ল্যান কতগুলো লোককে এক ছাতার তলায় নিয়ে আসতে পারে? এরা সমাজসেবা করতে নামেনি নিশ্চয়ই? কয়েকটা মানুষ কখন একজোট হয়? যখন কোনও সমবেত ধান্দা থাকে। আসল প্রশ্ন এটাই। এখানে তাঁরা কী পাচ্ছে?’

‘এর উত্তর দেবার জন্য খুব একটা মাথা খাটাতে হয় না অনিমেষদা,’ অমিতাভ বললেন, ‘এদের একজোট করেছে প্রতিশোধস্পৃহা।’

অনিমেষ ভদ্র সামান্য থমকালেন।

দময়ন্তী অমিতাভর কথার রেশ ধরে বলল, ‘সেজন্যই আমাদের স্পেকুলেশন, এটা একটা ফিমেল গ্যাং। যারা রেপ ভিক্টিম, তাদের বা তাদের ঘনিষ্ঠ লোকজনের গ্যাং।’

ডিআইজি অপারেশনস অর্পণ পাল বললেন, ‘উত্তরপ্রদেশের সেই গুলাবি গ্যাংয়ের মতো?’

দময়ন্তী ইতিবাচক মাথা নাড়ল, ‘গুলাবি গ্যাংয়ের বাঙালি এবং শহুরে ভারসান। যদিও এখনও প্রমাণ নেই।’

প্রবীর চক্রবর্তী বললেন, ‘তুমি বলতে চাইছ এঁরা কেউই অপরাধ জগতের লোক নন?’

দময়ন্তী বললেন, ‘অপরাধ জগতের সাহায্য নিতে পারে। ইন ফ্যাক্ট নিয়েছে। কিন্তু এদের কোর গ্রুপটা মূলত শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত লোকজন নিয়ে তৈরি বলেই মনে হচ্ছে।’

অভিজিৎ সাহা বললেন, ‘তাহলে তো নিশ্চিতভাবেই এই লীনা দাশগুপ্ত বা সুজানের পরিবারের কেউই অপরাধী। আমাদের উচিত তাদের কষে জেরা করা।’

দময়ন্তী বলল, ‘রিসেন্ট কেসই যে হতে হবে, তার কী মানে? পুরোনো অত্যাচারিত কেউ হতে পারেন না? সেই প্রবাদটা শোনেননি? রিভেঞ্জ ইজ আ ডিশ বেস্ট সার্ভড কোল্ড।’

অনিমেষ ভদ্র বললেন, ‘বেশ, মেনে নিলাম। কিন্তু সেক্ষেত্রে রেগুলার অপরাধী মহলকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে দিনের পর দিন এত বড় স্কেলে একটা নুইস্যান্স চালিয়ে যাওয়া এই গার্লস গ্যাংয়ের ক্ষেত্রে আরওই অসম্ভব। ফুটপ্রিন্ট পাওয়া যাচ্ছে না কেন?’

অমিতাভ বললেন, ‘আমরা সোর্স-নেটওয়ার্কে ভরসা রাখছি অনিমেষদা। খবর আসবেই।’

রমেশ আর-এক প্রস্থ চা দিয়ে গেল। আলোচনায় সামান্য ছেদ পড়ল। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে প্রবীর চক্রবর্তী অন্যমনস্কভাবে বললেন, ‘একটা প্রেস রিলিজের ড্রাফট রেডি করে রাখো, অমিতাভ। ঘটনাটাকে যথাসম্ভব ছোট করে দেখাও।’

অমিতাভ বললেন, ‘প্রেস অলরেডি তাল করে ফেলেছে স্যার। আমরা চেপেচুপে কতটা তিল বানাতে পারব?’

অনিমেষ ভদ্র দুদিকে মাথা নাড়লেন, ‘ড্যামেজ কন্ট্রোল স্টেটমেন্ট দিয়ে খুব একটা কাজ হবে না প্রবীরদা। বেণীর আগুন হাতে লেগে গেছে। উই ব্যাডলি নিড সাম অ্যাকশন। দরকার হলে কয়েকটা ব়্যান্ডম অ্যারেস্ট করতে হবে।’

অমিতাভ দৃঢ় গলায় বললেন, ‘আই বেগ টু ডিফার, অনিমেষদা। এই কেসে পলিটিকাল ইন্টারভেনশন প্রচুর। তার ওপর, পরের বছর লোকসভা ইলেকশন। ব়্যান্ডম অ্যারেস্ট করলে সেটা আমাদেরই ব্যাকফায়ার করতে পারে। কিছু সলিড প্রাইমা ফেসি থাকতে হবে অন্তত, যেটা এখানে পাওয়া যাচ্ছে না। বাট উই আর ট্রায়িং আওয়ার বেস্ট। ব্রেকথ্রু আসাটা সময়ের অপেক্ষা শুধু।’

অনিমেষ ভদ্র কিছু একটা বলতে গিয়ে থেমে গেলেন। বোঝা গেল, বেশ চেষ্টা করেই নিজেকে সংবরণ করলেন। চায়ে চুমুক দিলেন। তারপর বিস্কুট নিয়ে খানিক নাড়াচাড়া করতে করতে বললেন, ‘উই কান্ট অ্যাফর্ড ইনফিনিটি, অমিতাভ।’

দময়ন্তী আড়চোখে অমিতাভর দিকে চাইল। অমিতাভর মুখের একটা পেশিও এদিক-ওদিক হয়নি। চোখদুটো সামান্য ছোট হল শুধু। বারদুয়েক শুকনো ঠোঁট চেটে সমাহিত গলায় অমিতাভ বললেন, ‘আপনারা যদি বলেন, এই ঘটনার দায় নিয়ে আমি সরে যাব। তাতে ড্যামেজ কন্ট্রোলের ব্যাপারটা আরও বেটার দেখাবে।’

প্রবীর চক্রবর্তী গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, ‘অপ্রাসঙ্গিক কথা বলে লাভ নেই। আপনারা প্লিজ প্রসঙ্গে থাকুন।’

তানিয়া খানিকক্ষণ ধরে খেয়াল করছিল যে রাহুল একটু উসখুস করছে। টেবিলের নীচে মোবাইলে কিছু দেখছে, বোঝা যাচ্ছিল। এইবার রাহুল উঠে দাঁড়াল। জিজ্ঞাসু চোখে তাকালেন সবাই। প্রবীর চক্রবর্তী বললেন, ‘কিছু বলবে?’

রাহুল বলল, ‘স্যার, ফেসবুকে একটা প্রোফাইল থেকে এইমাত্র এই ভিডিওটা আপলোড করেছে। অরিজিনাল ভিডিও। রেকর্ডেড নয়।’

অনিমেষ ভদ্র অবাক গলায় বললেন, ‘ফেসবুকেই যদি দেবে, তাহলে এত কাণ্ড করতে গেল কেন?’

অমিতাভ বললেন, ‘ভবানী ভবনে ঢুকে এটা করতে পারে, সেটা প্রমাণ করার জন্য।’

‘তার জন্য এত রিস্ক?’

অমিতাভ বললেন, ‘দিস ইজ আ ভেরি নেসেসারি গিমিক ফ্রম হার এন্ড। মহিলা ভালো করেই জানে এটা কতটা রিস্কি। কিন্তু গ্রো করতে গেলে ঝুঁকি যে নিতেই হয়, কেয়াদি। এটা আমাদের বুঝতে হবে যে মজন্তালী জনতা এবং মিডিয়ার মান্যতা চায়। পেপারে অ্যাড, পর্ন সাইট হ্যাক, ভবানী ভবনে ঢুকে এসে কাঠিবাজি—এই সবকিছু সেইজন্যই।’

এডিজি নিরুত্তাপ কণ্ঠে বললেন, ‘অমিতাভ, দিস ইজ আ ওয়ার এগেইন্সট স্টেট। অ্যাক্ট অ্যাকর্ডিংলি।’

কেষ্টুবিষ্টুরা বেরিয়ে যাবার পর অমিতাভ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর বললেন, ‘চলো, সবাই মিলে একসঙ্গে লাঞ্চ করে আসি।’

দময়ন্তী ভূত-দেখার মতো করে তাকাল। রাহুল, তানিয়া, লোকনাথরাও ঘুরে তাকিয়েছে। বিনা মেঘে বজ্রাঘাত হয়ে লোকটার মাথাটা একেবারেই গেল নাকি?

সবার মুখের ভাব দেখে অমিতাভ হাসলেন, ‘শোকের সময় পরিবারের লোকজন মিলে একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করে না? চলো। কোথায় খাবে বলো! আমার ট্রিট।’

.

বেথুন কলেজ, বিকেল ৪টে

দীর্ঘ বক্তৃতা শেষ করে শালিনী সামনে বসে থাকা মেয়েদের দিকে তাকাল। বেশ জোরে হাততালি পড়ছে। কিন্তু হাততালি কিছুই প্রমাণ করে না। ওরা সত্যি সত্যি কানেক্ট করতে পারল কিনা সেটাই আসল কথা। শালিনী ওদের মুখের ভাষা পড়ার চেষ্টা করছে। সবটা বোঝানো গেল কি? নাকি ওদের পক্ষে কঠিন হয়ে গেল কথাগুলো? স্কুলের ছেলেমেয়েদের জন্য, বিশেষত নিচু ক্লাসের ছেলেমেয়েদের জন্য জেন্ডার ওয়ার্কশপ খুব কার্যকরী। কিন্তু কলেজপড়ুয়াদের জন্য এ-ধরনের ওয়ার্কশপ ডিজাইন করা একটু কঠিন। নানা মাধ্যমে নিরন্তর সংলাপ দিয়েই তাদের মনের দরজায় কড়া নাড়তে হয়।

সঞ্চালক বললেন, ‘তোমাদের কারোর যদি ম্যাডামের কাছে কিছু প্রশ্ন থাকে, তোমরা করতে পারো।’

একটি মেয়ে হাত তুলল, ‘মজন্তালী সরকারের বিষয়ে আপনার কী মনে হয়?’

শুরুতেই বাউন্সার। অবশ্য প্রত্যাশিতই। হাসল শালিনী। জবাব তৈরি করাই আছে। বলল, ‘আমরা কী করছি সেটা যেমন জরুরি, তেমনই আমরা কীভাবে সেটা করছি, কোন পথ অবলম্বন করছি, সেটাও কিন্তু সমান জরুরি। এবং এইজন্যেই অ্যাট দ্য এন্ড অব দ্য ডে, মজন্তালী সরকার আইনের চোখে একজন অপরাধী।’

আরেকটি মেয়ে মাইক নিয়ে বলল, ‘তাহলে তো সেই অতি পুরোনো যুক্তিটাই দিতে হয়। আইনের চোখে তো ক্ষুদিরাম বা ভগত সিং–ও অপরাধী ছিলেন।’

এসব প্রশ্ন বিছুটি পাতার মতো। শুনলেই মুখ চুলকে ওঠে। কিন্তু এরই মধ্যে ল্যান্ডমাইন বিছানো থাকে, সে-ও শালিনীকে একরকম ঠেকেই শিখতে হয়েছে। ‘থার্ড পার্টি’ হয়ে বিচারাধীন বিষয় নিয়ে কোনও মন্তব্য করা বেশ ঝুঁকির। বিশেষত এমন একটা কেসে, যা নিয়ে গোটা রাজ্য সরগরম। তার ওপর আজ সকালেই একটা অভাবনীয় ঘটনা ঘটে গেছে। বাঘের খাঁচায় ঢুকে তার গোঁফে চুমকুড়ি দিয়ে আসা যাকে বলে। শালিনী সংযত গলায় বলল, ‘সমাজ এবং মানবতাকে রক্ষা করার জন্যই আইন। কিন্তু কখনও কখনও দেখা যায় এই দুটোর মধ্যে সংঘাত হচ্ছে। তখন সম্ভবত মানবিকতাকেই আমাদের বেছে নিতে হয়। কারণ মানুষের জন্যই আইন। আইনের জন্য মানুষ না। এর চেয়ে বেশি কিছু বলা আমার উচিত হবে না। কারণ এটা আন্ডার-ট্রায়াল একটা বিষয়।’

পরের প্রশ্ন, ‘এই মুহূর্তে আমাদের সবার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আরেকজন। লীনা দাশগুপ্ত। আমাদের সমাজে বহুকাল ধরে প্রচলিত ভিক্টিম ব্লেমিং-এর ট্রাডিশনকে সে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। লীনার বিষয়ে আপনার কী মত?’

শালিনীর মনটা নেচে উঠল। প্রসঙ্গ না উঠলে কথাটা বলা যাচ্ছিল না। লেসন হিসেবে মানুষের কাছে তুলে ধরার জন্য মজন্তালী সরকারের চেয়ে অনেক জরুরি লীনা দাশগুপ্ত। খুশি চেপে গম্ভীর হবার চেষ্টা করল শালিনী, ‘ভিক্টিম ব্লেমিং-এর যে জঘন্য কালচার আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে, লীনা সেটার একেবারে শিকড়ে ঘা দেওয়ার চেষ্টা করছে। খুবই কঠিন কাজ। কিন্তু ও যদি জিততে পারে সেটা আমাদের সবার জয় হবে। আর ও যদি হেরে যায়, ভেবে দ্যাখো, আমরাই কি হেরে যাব না?’ সামান্য থেমে শালিনী যোগ করল, ‘লীনা দাশগুপ্ত আমাদের কাছে একটা উদাহরণ। সবচেয়ে জরুরি লড়াইটাও শুরু করেছে। কিন্তু এই লড়াইটা ওর একার না। এটা প্রত্যেকটা মেয়ের লড়াই। আমাদের সবার লড়াই। আমরা যারা প্রতিদিন বাসে ট্রেনে আসতে আসতে নোংরা চোখ বা হাত সহ্য করা অভ্যেসে পরিণত করে ফেলেছি; আমরা যারা প্রতিটা রাস্তায় টিপ্পনি শুনে না শোনার ভান করে এগিয়ে যাই, আমরা যারা বাইরে বেরোলে বাড়ির লোক জানে না আমরা অক্ষত ফিরব কিনা; এটা আমাদের সবার লড়াই। যে-লজ্জা আমাদের প্রাপ্য নয়, তারই বোঝা আমরা মেয়েরা সারাজীবন বয়ে বেড়াই। আমরা লজ্জায় গুটিয়ে যাই বলেই তো সমাজ আরও সুযোগ পেয়ে যায়। আমরা সে-সুযোগ দেব না। আমরা লজ্জা পাব না, কারণ এই ঘটনাগুলোয় দোষ আমাদের নয়। যারা করে, দোষ তাদের। লজ্জা তারা পাক। আর যারা ভাবে এগুলো আমাদের লজ্জা, দোষ তাদেরও। লজ্জা তাদেরও পাওয়া উচিত।’

হাততালির ঝড় বয়ে গেল এই কথাটার পর।

মিনিট দশেক পর শালিনী যখন পার্কিং লটে গাড়ি আনলক করছে, একটা মেয়ে এসে ডাকল, ‘ম্যাডাম!’

শালিনী ফিরে তাকাল। শ্যামলা, মিষ্টি একটা মেয়ে। মাথায় একঢাল চুল। চোখেমুখে দ্বিধা, ‘আপনাকে একটা কথা বলার ছিল।’

‘বলো।’

‘কাউকে বলতে পারিনি। মনে হল আপনাকে বলা যায়।’

অনেকেই নিজের ব্যক্তিগত সমস্যার কথা ওপেন ফোরামে জিগ্যেস করতে অস্বস্তি বোধ করে, কিন্তু একান্তে শেয়ার করতে চায়। কোনও সেমিনার বা টকের পর শালিনীর কাছে এটা নতুন অভিজ্ঞতা না। শালিনী বলল, ‘অবশ্যই, নির্দ্বিধায় বলো।’

মেয়েটা একটু ইতস্তত করে বলল, ‘আমি মজন্তালী সরকারকে দেখেছি।’

.

বালিগঞ্জ, লাইভ নিউজের অফিস, বিকেল ৫টা ৩০

নিউজ চ্যানেলগুলোর কাছে প্রতিনিধি-তালিকা এবং তাঁদের ঠিকুজি চেয়ে পাঠানো হয়েছে। লোক ধরে ধরে পরিচয় পরীক্ষা করা হবে। লাইভ নিউজ থেকে শাক্য, সৌমিলি, শিরিনের সঙ্গে ক্যামেরাপার্সন স্বপন প্রামাণিকের ডিটেল পাঠানো হয়েছে। সেই নিয়েই এইচআরের ঘরে কথাবার্তা সেরে ব্যালকনিতে এসে শাক্য আর শিরিন একটু খোশগল্প করছিল। সৌমিলিও ছিল। একটা ফোন পেয়ে হন্তদন্ত হয়ে উঠে গেল এইমাত্র।

শাক্য হাতের সিগারেটটা শিরিনের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘বড় বড় থ্রিলারকে হার মানাবে রে! প্রোজেক্টর কী করে হ্যাক করল সেটাই আমার মাথায় ঢুকছে না। এই ভাবনাটাই আমার কাছে অবিশ্বাস্য লাগছে। আর এরা করে ফেলল!’

‘আমাদের সবার ডিটেল চেয়ে পাঠাচ্ছে মানে সিআইডি সন্দেহ করছে যে কোনও ম্যানুয়াল হ্যাকিং ডিভাইস ব্যবহার করা হয়েছে,’ শিরিন ধোঁয়া ছেড়ে বলল, ‘মজন্তালীর হাতে যে ডিজিটাল এক্সপার্ট রয়েছে, সে তো খবরের কাগজে অ্যাড দেবার সময়েই বোঝা গেছিল।’

‘কিন্তু ভেবে দ্যাখ, এই ভয়ানক ঝুঁকির কাজটা না করেও কি মজন্তালী এই মেসেজটা পৌঁছে দিতে পারত না? শুধু শুধু কেন রিস্ক নিচ্ছে? এবং একবার নয়, বারবার? দুপুরে যদি তুই ফেসবুকে ভিডিওই পোস্ট করিস, তাহলে সকালে সেই ভিডিও নিয়ে এত কাণ্ড করলি কেন?’

‘শি ইজ ট্রায়িং টু বিল্ড আ ফেনোমেনা। আ ব্র্যান্ড।’

‘এক্স্যাক্টলি। শি ওয়ান্টস টু শোকেস দি ব্র্যান্ড মজন্তালী সরকার। একটা সুপারহিরো ইমেজ তৈরি করতে চাইছে।’

‘কিন্তু সিস্টেমের সঙ্গে সরাসরি টাসলে যাওয়াটা ঠিক হচ্ছে না মনে হয়। আমি মজন্তালী হলে অন্তত এই গিমিকটা বাদ দিতাম। সিআইডি তো এবার খ্যাপা ষাঁড়ের মতো পিছনে ধাওয়া করবে।’

সৌমিলি ফিরে এল প্রচণ্ড উত্তেজিত চোখমুখ নিয়ে, ‘গাইজ। বিগ ব্রেক।’

শিরিন ঠোঁট থেকে সিগারেট সরিয়ে বলল, ‘কী হল?’

‘শালিনীদির সঙ্গে একটা মেয়ে এসেছে। কলেজ স্টুডেন্ট। সে নাকি মজন্তালী সরকারের প্রথম শো-ডাউনের আই উইটনেস।’

.

ভবানী ভবন, সন্ধে ৬টা ১৫

অ্যানালিটিকসের ঘরে আজ কুম্ভমেলা লেগে গেছে। কনফারেন্স রুমে পৌঁছানোর পথে যত চালু সিসি ক্যামেরা আছে, সবকটার ফুটেজ চেক করা হচ্ছে। অ্যানালিটিকসের হেড জয়ন্ত বাগচীর নেতৃত্বে একদল ট্রেনি মজন্তালীর ভিডিও থেকে স্টিল ইমেজ নিয়ে তাকে ই-ফিট নামে একটা সফটওয়ার দিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করছে। আরেকদিকে ডিজিটাল ফরেন্সিকের প্রতীকের নেতৃত্বে চলছে ভিডিও থেকে ভয়েস স্যাম্পল সংগ্রহ করার কাজ। সন্দেহভাজনদের চেহারা এবং কণ্ঠস্বরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হবে। প্রতীকের অবশ্য দাবি, সফটওয়ারের সাহায্যে কণ্ঠস্বর ফর্জ করা হয়েছে। ফলে ভয়েসপ্রিন্ট করে কিছু পাওয়া যাবে না। নিউজ চ্যানেলগুলো মেইলে তাঁদের পক্ষ থেকে আগত প্রতিনিধিদের ডিটেল পাঠাচ্ছে। তানিয়া সেগুলো ডাউনলোড করে চ্যানেল ধরে ধরে আলাদা ফোল্ডার বানিয়ে রাখছে। অমিতাভ জয়ন্তর সঙ্গে বসেছেন, দময়ন্তী প্রতীকের সঙ্গে, আর রাহুল সিসি ক্যামেরা সারভেলেন্সের টিমের সঙ্গে।

অনিরুদ্ধ বলল, ‘লাইভ নিউজে একটা কলেজ স্টুডেন্ট মেয়েকে দেখাচ্ছে, ম্যাম। মজন্তালী সরকারের ফার্ন রোডের উইটনেস।’

গত কয়েক ঘণ্টায় বারবার চমকাতে চমকাতে হার্টের গ্রহণক্ষমতা এখন অনেক বেড়ে গেছে। তবু কথাটা শুনে বুকে হাত রাখল দময়ন্তী। বড় খারাপ সময় যাচ্ছে বেচারার।

.

কাশীপুর, সন্ধে ৬টা ২০

অফিস থেকে ফিরে কাঁধ থেকে ব্যাগ নামিয়ে রেখে বাবা আজ বাথরুম গেল না। সোজা লীনার ঘরে এসে ঢুকল, ‘চল আজ বাইরে ডিনার করব।’

লীনা শীর্ষেন্দুর অদ্ভুতুড়ে সিরিজের একটা বই পড়ছিল। কথাটা শুনেই লাফিয়ে উঠল, ‘চলো চলো। অনেকদিন বিরিয়ানি খাইনি।’

‘কোথায় যাবি বল। আমিনিয়া নাকি আরসালান?’

‘তুমি সবে ঢুকলে! এখনি আবার যেতে পারবে? কষ্ট হবে না?’

‘কষ্ট আর কীসের? এলাম ট্যাক্সিতে। যাবও তো ট্যাক্সিতে।’ বাবা জামার বোতাম খুলতে খুলতে বলল, ‘একটু ফ্রেশ হয়ে জামাটা পাল্টে নিই। ততক্ষণে তোরা রেডি হয়ে নে।’

বাবার সাড়া পেয়ে মা রান্নাঘরের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছিল। শেষটুকু শুনেছে। অসন্তুষ্ট মুখে বলল, ‘আজকাল প্রায়ই বাইরে খাওয়াদাওয়া হচ্ছে। শরীর কিন্তু খারাপ করবে এবার।’

লীনা বলল, ‘মাঝেমধ্যে বাইরে খেলে কিচ্ছু হয় না। বোরডম কাটে অন্তত।’

‘সেই। রাস্তার ছাইপাঁশ খাবারই তো ভালো লাগবে! মায়ের হাতের রান্না ভালো লাগবে কেন?’

‘আরে বাবা, খেতে যাওয়া মানে তো একটা আউটিংও হচ্ছে নাকি?’

‘এত আউটিং আমার ভালো লাগে না, তোমাদের আগেই বলেছি আমি!’ ঝাঁঝিয়ে উঠল মা।

বাবা নির্বিকার মুখ করে জামা ছেড়ে গামছা হাতে নিয়ে বলল, ‘সেইটাই আসল কথা। বেরোতে লজ্জা করে তোমার। আজও তুমি মনে করছ লজ্জাটা আমাদেরই পাওয়া উচিত। তাই না?’

মা একটুও অপ্রস্তুত হল না। কঠিন গলায় বলল, ‘হ্যাঁ। সেইটাই আসল কথা। তোমাদের অত তত্ত্বকথা আমি বুঝি না। সবার মাঝে যেতে আমার ভালো লাগে না।’

‘সেইজন্যই তো আরও বেশি করে বেরোতে হবে। যাই হোক, তোমাকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করব না। কিন্তু আমরা দুজনে যাচ্ছি।’ বলে বাথরুমের দিকে রওনা দিল বাবা।

.

ভবানী ভবন, সন্ধে ৭টা ৩০

মেয়েটার নাম সুচেতা দত্ত। লাইভ নিউজের স্টুডিয়ো থেকে মেয়েটাকে হাইজ্যাক করে সোজা ভবানী ভবনে আনার পথে পুরো গল্প খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে শোনা হয়ে গিয়েছিল দময়ন্তীর। সঙ্গে ছিল তানিয়া। গল্প শোনার ফাঁকে তানিয়া সুচেতার বাড়িতে ফোন করে জানিয়ে দিয়েছিল চিন্তা না করতে।

অফিসে নিয়ে এসে দময়ন্তী সুচেতাকে ওয়ার্কস্টেশনে বসাল না। নিজের চেম্বারে নিয়ে এল। অমিতাভ, রাহুলরা আসতে সুচেতাকে পুরো গল্প আরও একবার বলতে হল। অমিতাভ কয়েকটা প্যাঁচোয়া প্রশ্ন করলেন। মেয়েটা প্রাথমিক জড়তা কাটিয়ে ফেলেছে। চা-বিস্কুট খেতে খেতে সব প্রশ্নেরই খুব সপ্রতিভ উত্তর দিল।

রাহুল জিগ্যেস করল, ‘কলেজ থেকে সেদিন অত দেরি করে ফিরছিলে? কারণটা জানতে পারি?’

সুচেতা বলল, ‘আসলে তিনদিন পর কলেজে থার্ড ইয়ারের ফেয়ারওয়েল পার্টি ছিল। তার রিহার্সাল চলছিল বলে সেই সপ্তাহটা রোজই ফিরতে দেরি হচ্ছিল।’

অমিতাভ বললেন, ‘ঘটনার পর বেশ কয়েকটা দিন তো কেটে গেছে। যদি প্রকাশ্যে আসবে বলে ভেবেই থাকো তাহলে এতদিন অপেক্ষা করলে কেন?’

সুচেতা ঠোঁট কামড়াল, ‘প্রথমত, ঘটনাটার ধাক্কা কাটিয়ে উঠতেই আমার বেশ কয়েকদিন লেগে গেছে। আই ওয়াজ ট্রমাটাইজড।’

একটা বিষয় দময়ন্তীকে অবাক করছিল। মেয়েটা শুরু থেকেই মোটের ওপর বেশ আত্মবিশ্বাসী। এতটা আত্মবিশ্বাসী হওয়া কি স্বাভাবিক? এখন মনে হচ্ছে, একটা মেয়ের ওপর রেপ অ্যাটেম্পট হয়েছিল বলেই তার কনফিডেন্স বলে কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না, এমন ধরে নিলে সেটা খুব ক্লিশে পেট্রিয়ার্কিয়াল একটা ভাবনা হয়ে যাবে। হতেই তো পারে মেয়েটা স্বাভাবিকভাবেই আত্মবিশ্বাসী। এই ঘটনাটা ওদের স্বাভাবিক জীবনকে অ্যাফেক্ট করতে পারেনি। এমন একটা সমাজের দিকেই তো এগিয়ে যেতে হবে। দময়ন্তী বলল, ‘মত পরিবর্তন হল কীভাবে? মানে নিউজ চ্যানেলে যাবার কথা কখন এবং কেন ভাবলে?’

সুচেতা বলল, ‘লীনাকে দেখে। ও যদি ঘুরে দাঁড়াতে পারে, আমি কেন পারব না? আমি তো অনেক বেটার পজিশনে আছি। খবরে যেমন শুনেছি, তাতে মনে হয় আমার ঘটনাটাই মজন্তালী সরকারের প্রথম শো-ডাউন। আমার সামনে আসাটা খুব দরকার ছিল। আমি মনে করি এভাবেই সব মেয়েদের লজ্জা না পেয়ে সামনে এগিয়ে আসা দরকার। তবে শালিনীদি সাহস না দিলে হয়তো আল্টিমেটলি পেরে উঠতাম না।’

দময়ন্তী বলল, ‘শালিনীদি কে?’

‘শালিনী সিনহা। রাজাবাজার সায়েন্স কলেজের প্রফেসর।’

‘তাঁকে কীভাবে চেনো?’

‘শালিনীদি আজ আমাদের কলেজে একটা টক দিতে এসেছিলেন। উনি আমাকে মেন্টালি রিকভার করতে হেল্প করলেন এবং টিভি রিপোর্টারের সঙ্গেও উনিই যোগাযোগ করিয়ে দেন।’

‘ওঁকে এত ভরসা করার কারণ?’

‘আজকের সেমিনারটা নারী বিষয়ক আলোচনা নিয়েই ছিল। ওঁর কথা শুনে আমার খুব ভালো লাগল। মনে হল এই মানুষটাকে বোধহয় সব খুলে বলা যায়। তবে তারপরেও দ্বিধায় ছিলাম। এত বড় একটা কথা ওপেন মিডিয়ায় বলব, তারপর তার কনসিকোয়েন্স সামলাতে পারব তো?’

‘নিউজ চ্যানেলের শালিনী সিনহাই যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিলেন?’

‘হ্যাঁ। লাইভ নিউজে ওঁর কাজিন কাজ করেন। সৌমিলিদি।’

অমিতাভ বললেন, ‘আচ্ছা সুচেতা, তোমার মা-বাবার কী প্রতিক্রিয়া? তাঁরা কী করেন বললে যেন?’

সুচেতা বলল, ‘মা ইংরেজির প্রোফেসর। বাবা অ্যাডভোকেট। দুজনেই খুবই সাপোর্টিভ। আমার পাশে আছেন।’

‘খুব ভালো। তুমি তাহলে লাকি।’

‘এবং অবশ্যই খুব সাহসী। তদন্তের কাজ তদন্তের জায়গায়। বাট পার্সোনালি, হ্যাটস অফ টু ইউ।’ দময়ন্তী এক চুমুকে চায়ের কাপ ফাঁকা করল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ সুচেতা, আপাতত আর কিছু জানার নেই।’ তারপর বলল, ‘তবে আবার বিরক্ত করব কিন্তু। বুঝতেই পারছ, আই উইটনেস হিসেবে তোমার ভূমিকা এই কেসে কতটা গুরুত্বপূর্ণ।’

‘এই বিষয়ে বারবার বিরক্ত হতে আমার খারাপ লাগবে না।’

রমেশ চিকেন রোল নিয়ে এসেছে। দময়ন্তী বলল, ‘অনেক জ্বালালাম। এবার খেয়ে নাও।’

সুচেতা যেভাবে খেতে শুরু করল, বোঝা গেল তার সত্যিই বেশ খিদে পেয়েছে। দময়ন্তী খর চোখে মেয়েটার দিকে চেয়ে রইল। এত নিখুঁত গল্প? ঠিক যেন ফিল্মের স্ক্রিপ্টের মতো গোছানো। কোথায় একটা খটকা লাগছে। কিন্তু মেয়েটার অ্যালিবাইগুলো শুনে পোক্ত বলেই মনে হচ্ছে। ক্রসচেক করলেই তো সব পরিষ্কার হয়ে যাবে। কেউ আগ বাড়িয়ে কেন এত বড় রিস্ক নেবে? মিলছে না। হিসেব মিলছে না। দময়ন্তী হঠাৎ বলল, ‘সুচেতা, তুমি নিশ্চয়ই চাইবে না যে আমরা সফল হই? মানে মজন্তালী ধরা পড়ুক?’

সরাসরি এমন প্রশ্নে সুচেতা একটু ঘাবড়ে গেল বোধহয়। চট করে জবাব দিতে পারল না। একটু অপ্রস্তুত হাসল। তারপর খানিক ভেবে বলল, ‘কিন্তু আমি আপনাদের সহযোগিতাই করছি এবং ভবিষ্যতেও করব। আমার মনে হয় আমি এত সামান্যই জানি যে তা দিয়ে আপনাদের কোনও উপকার হবে না।’

‘কোনটা কখন কাজে লেগে যায় কেউ বলতে পারে না। বাই দ্য ওয়ে, তোমার কাছে শালিনী সিনহার কনট্যাক্ট নাম্বার পাওয়া যাবে?’

.

গলফ গ্রিন, রাত ৯টা

অঙ্কিত ঘরে ঢুকে সৌমিলিকে দেখেই লাফিয়ে উঠল, ‘আরে সিস্টার! কী খবর?’

সৌমিলির মুখ স্যান্ডউইচে ভর্তি। উত্তর দিতে পারল না। হাসি হাসি মুখ করে হাত তুলল।

অঙ্কিত ব্যাগটা সোফায় ছুড়ে ফেলে বলল, ‘ডুমুরের ফুল হয়ে গ্যাছো যে!’

শালিনী চশমার ওপর দিয়ে সরু করে তাকাল, ‘এত ভালো ভালো বাংলা কার থেকে শিখছ?’

অঙ্কিত উত্তর না দিয়ে একটু কায়দা মেরে চুলটা ঠিক করে নিল। তারপর সৌমিলিকে বলল, ‘তোমাদের চ্যানেল তো কামাল করে দিচ্ছে! পরপর ব্লকবাস্টার! অ্যাঁ? ফড়িয়াপুকুরের ভিক্টিমের পর ফার্ন রোডের ভিক্টিম! সবাই তোমাদের চ্যানেলে!’

সৌমিলি মুখের স্যান্ডউইচটুকু শেষ করে বলল, ‘লীনা কেন আমাদের চ্যানেলে এল সেটা বলতে পারব না। কিন্তু সুচেতা তো তোমার বউয়ের থ্রু-তেই এসেছে। পুরো ক্রেডিট ওর।’

অঙ্কিত বলল, ‘শোনো, আজ একটা নতুন রেসিপি ট্রাই করব। এগ জার্ক ফ্রিটারস। খেয়ে যাবে।’

সৌমিলি চোখ বড় করল, ‘ওরে বাবা! খাব কী, নামের ঝাঁঝেই মরে যাব!’

‘আজকাল এই এক বাই চেপেছে,’ শালিনী ঠেসের সুরে বলল, ‘দিনরাত উৎপটাং সব রান্নার ঠেলায় আমার একেবারে প্রাণ যায়-যায় অবস্থা!’

অঙ্কিত শালিনীকে ভ্যাংচানোর মুখভঙ্গি করে সৌমিলিকে বলল, ‘যাই বলো, তোমাদের মজন্তালী কিন্তু জমিয়ে দিয়েছে! বিশেষত আজ ভিডিওয় মহিলার গেটআপ দেখে আমি ক্লিন বোল্ড। আমরা আমাদের বিশুদ্ধ বাঙালি ক্যাটওম্যান পেয়ে গেলাম তাহলে!’

শালিনী বলল, ‘মজন্তালী সরকারকে ভালো লাগার আরেকটা কারণ পেলাম। কন্যা ডিসি কমিকসের ফ্যান!’

‘কিন্তু একটা কথা বলো,’ অঙ্কিত ভুরু নাচাল, ‘চেন্নাই এক্সপ্রেসের রিলিজ ডেট চলে এল, আর তোমরা কিনা ফার্স্ট ডে ফার্স্ট শো প্ল্যান করার কথা বেমালুম ভুলে মেরে দিয়েছ! মজন্তালী তবে শাহরুখের থেকেও বড় স্টার এই মুহূর্তে!’

‘এখন আর মজন্তালী ছাড়া কিচ্ছু মাথায় নেই জ্যামস। ছুটে ছুটে তিন-চার কেজি ঝরিয়ে ফেললাম।’

‘তা ঠিক। মহিলা বসতেই দিচ্ছেন না।’

‘তার মধ্যে নতুন একটা প্রজেক্ট শুরু করছি। বিশাল চাপ।’

‘কী প্রজেক্ট?’

‘আইডিয়াটা আমার কলিগ শিরিনের মাথায় এসছে। জেন্ডার ভায়োলেন্সের ভিকটিমদের নিয়ে একটা সিরিজ অফ ডকুমেনটরি। রেপ, মলেস্টেশন, ট্রাফিকিং, ম্যারিটাল রেপ, পণ ইত্যাদি যে-কোনও ধরনের ক্রাইমের শিকার হওয়া মহিলাদের সঙ্গে আমরা কথা বলার চেষ্টা করব। এক-একজনের ওপর এক একটা এপিসোড। এভাবে তাদের জন্য জাস্টিস এবং মোস্ট ইম্পরট্যান্টলি, একটা অ্যাওয়ারনেস ক্রিয়েট করার চেষ্টা…।’

‘আমির খানের “সত্যমেব জয়তে”-র প্যাটার্ন?’

‘কিছুটা। তবে ওটা অনেকটা বড় ক্যানভাস। আমাদের প্রোগ্রামটা শুধুই জেন্ডার ভায়োলেন্স নিয়ে।’

অঙ্কিত স্যান্ডউইচ চিবোতে চিবোতে খানিক ভাবল। বলল, ‘ভালোই ভেবেছ। সবচেয়ে পজিটিভ ব্যাপার হচ্ছে, মজন্তালী সরকার এসে জেন্ডার ভায়োলেন্সের বাজার চাঙ্গা করে দিয়েছে। লোহা গরম। এটাই সময়।’

কথাটা সৌমিলির তেমন ভালো লাগল না, ‘আমি ওভাবে ভাবছি না জ্যামস। এটা একটা গ্রেটার কজ।’

‘ওভাবে না ভেবে ঠিক করছ না,’ অঙ্কিত হাসল, ‘গ্রেটার কজ যত গ্রেটই হোক না কেন, ভিটামিন এম না পেলে শুকিয়ে মরে যায়, সিস। যাদের হাতে টাকা, তারা তোমায় ফিলানথ্রপি করতে দেবে না। তুমি যে ধরনের প্রোগ্রামের প্ল্যান করছ তাতে এমনি সময় একেবারেই ভিউয়ার হবে না, টিআরপি হবে না। তিনটে এপিসোডের পর চ্যানেল স্ক্র্যাপ করে দেবে। চ্যানেল তো চ্যারিটি করতে বসেনি। বাট, থ্যাঙ্কস টু মজন্তালী সরকার, এই সময়টা এই প্রজেক্টের জন্য আইডিয়াল। ডোন্ট বি ইমোশনাল ফুল। সময়কে কাজে লাগাতে শেখো, সিস। তাতে লজ্জার কিছু নেই। মার্কেট ইকনমিকে এড়িয়ে তুমি কিছু করতে পারবে না, অ্যাকসেপ্ট দ্যাট।’

‘আশ্চর্য ব্যাপার। তোমার সঙ্গে একমত হলাম।’ শালিনী ভুরু নাচাল, ‘সত্যিই এখন জেন্ডার জাস্টিসের সুপবন বহিতেছে। পতাকা উড়িয়ে দিলেই পতপত করে উড়বে। বেশি দেরি করিস না। আমার মন বলছে, মজন্তালী সরকারের ধরা পড়তে আর বেশি দেরি নেই। মরণপাখনা না গজালে কেউ সিআইডির ঘরে ঢুকে কাঠিবাজি করতে যায়?’

‘এক যদি না সে সত্যিই আত্মাটাত্মা গোছের কিছু হয়ে থাকে।’ অঙ্কিত বলল।

শালিনী বলল, ‘তোমার কাজ আগুনকে ভালোবেসে উন্মাদ হয়ে যাওয়া নয়, আগুনকে ব্যবহার করতে শেখা। বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় নামে একজন কবি লিখেছিলেন। বুঝলি? মনে রাগ, ঘৃণা যেটাই জমা হোক তাকে ঠিকঠাক ব্যবহার করতে পারলে তবেই একটা পথ বের হয়। এই মহিলা আগুনকে ভালোবেসে উন্মাদ হয়ে গেছেন। আগুন এবার তাকেই পোড়াবে।’

সৌমিলি মাথা নাড়ল, ‘আজকের ঘটনাটা টু মাচ। দরকার ছিল না।’

শালিনী বলল, ‘মজন্তালীর সৌজন্যে কয়েকটা ঠিকঠাক প্রশ্ন উঠে আসতে শুরু করেছে। মহিলা ধরা পড়লেই সেগুলো হারিয়ে যাবে। কাজের কাজ হবে যদি সেই প্রশ্নগুলোকে তোদের প্রোগ্রামের মধ্যে দিয়ে পয়েন্ট আউট করতে পারিস। ইট উইল বি আ নোবেল এফর্ট। গো ফর ইট।’

সৌমিলি হেসে বলল, ‘আমি কিন্তু এই বিষয়েই একটা প্রস্তাব নিয়ে এসেছি তোমার কাছে। বলতে পারো, অফিশিয়ালিই।’

‘কী প্রস্তাব?’

‘তুমি প্রোগ্রামটা হোস্ট করবে।’

বেমক্কা এমন কথা শুনে শালিনীর একগাল মাছি। অঙ্কিতেরও। প্রাথমিক ধাক্কাটা সামলে উঠে শালিনী হাঁউমাঁউ করে উঠল, ‘আমি? হঠাৎ আমি কেন?’

‘তুমি এটার জন্য একেবারে উপযুক্ত লোক, তাই।’

‘জাতে উঠে গেলে!’ বলে তির্যক হেসে স্যান্ডউইচের শেষ টুকরোটা মুখে পুরে বাথরুমের দিকে চলে গেল অঙ্কিত।

শালিনীর হাঁ বন্ধ হচ্ছে না, ‘তোদের কি মাথা খারাপ? কজন চেনে আমায়?’

‘তোমার ইউটিউব চ্যানেলে এই মুহূর্তে কত সাবস্ক্রাইবার?’

‘ইউটিউব সাবস্ক্রাইবার দিয়ে কী প্রমাণ হয়? ইউটিউবকে লোকে কি সিরিয়াসলি নেয়?’

‘নেয় শালিনীদি। আজকাল নিচ্ছে। মেনস্ট্রিম মিডিয়া ইজ ডাইং। একটা প্যারাডাইম শিফট হচ্ছে। বছরকয়েক বাদে দেখবে সোশাল মিডিয়াই পুরো বাজার কন্ট্রোল করবে। তাছাড়া বাংলার সর্বাধিক প্রচারিত সংবাদপত্রটিতে মাঝে-মাঝেই তোমার লেখা বেরোয়। ইউ আর আ ফেস।’

‘আসল কথা বল। তোদের বাজেট কম। সেলেব পাচ্ছিস না।’

‘আই সোয়ার শালিনীদি। এটায় আমরা তোমাকেই ভেবেছি। না বোলো না প্লিজ।’

শালিনী তোম্বা মুখে স্যান্ডউইচ চেবাল খানিকক্ষণ। তারপর বলল, ‘কাজটা খুব কঠিন হবে কিন্তু। ক্যামেরার সামনে বসানো তো দূরের কথা, এদের অনেকের সঙ্গে কথা বলাটাই মুশকিল হবে।’

‘জানি তো,’ সৌমিলি কোল্ড ড্রিঙ্কে চুমুক দিয়ে বলল, ‘সেই জন্যই তো তোমার কথা ভেবেছি। নানা প্রজেক্টের সূত্রে তোমার তো এমন অনেক মহিলার সঙ্গে চেনাজানা হয়েছে। প্লাস, এঁদের সঙ্গে কীভাবে ইন্টারাকশন করলে ভালো হয়, সেটা তুমিই সবচেয়ে ভালো জানবে।’

‘আরে জানি বলেই তো বলছি, জেন্ডার ভায়োলেন্সের ভিক্টিমদের অন ক্যামেরা ইন্টারভিউ করার চেয়ে রামগরুড়ের ছানাকে হাসানো সোজা কাজ। সবাই তো আর সুজান জর্ডান না যে, ন্যাশনাল চ্যানেলে গিয়ে বলিউড সুপারস্টারের চোখে চোখ রেখে কথা বলে আসবে।’

‘সুজান জর্ডান বেঁচে থাকলে ওকে নিয়েই প্রথম এপিসোড করতাম, জানো। এবার ভাবছি প্রথম এপিসোড হবে লীনা দাশগুপ্তকে নিয়ে। লীনা এই নিয়ে কথা বলতে খুবই আগ্রহী হবে। আমি আর শিরিন মিলে অলরেডি কুড়িটা কেস শর্টলিস্ট করেছি। ব্যাক এন্ডে সব এক্সিকিউট করব আমরা। তুমি শুধু ফ্রন্টটা সামলাও। প্লিজ।’

‘আচ্ছা। সে না-হয় হল। কিন্তু পুলিশের ব্যাপারটা কী করছিস?’

‘পুলিশের ব্যাপার মানে?’

‘এই ধরনের অনেক কেস এখনও বিচারাধীন। প্রোগ্রাম করতে গেলে নানারকম জটিলতা হতে পারে। পুলিশ বাগড়া দিতে পারে। যেমন ধর, লীনা নিজেই মজন্তালীর কেসের প্রাইম সাসপেক্ট।’

সৌমিলির মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল, ‘এটা তো ভাবিনি।’

‘ভাবা উচিত ছিল। এত উচ্চাকাঙ্ক্ষী একটা প্রজেক্ট নিচ্ছিস, এগুলো ভাববি না? তোদের চ্যানেল হেডকে বলবি পুলিশের সঙ্গে কথা বলে রাখতে। তোদের লইয়ারের সঙ্গেও বসে নে একবার। বুঝলি?’

‘হবে না শালিনীদি,’ মিয়োনো গলায় বলল সৌমিলি, ‘মজন্তালীর কেসে সিআইডি বিশেষ আপডেট দিতে চাইছে না। ইট উইল বি আ কমপ্লিট নো ফ্রম দেয়ার এন্ড। লীনার ওই ইন্টারভিউয়ের পর ওয়ার্ন করা হয়েছে আমাদের। আমি কী করে এটা ভুলে গেলাম?’

‘অত ভাবছিস কেন? লীনাকে বাদ দিয়েই না-হয় করবি।’

‘ধুর।’

শালিনী জলের গ্লাস নিয়ে নাড়াচাড়া করছিল। মুখ তুলল, ‘আচ্ছা, যদি পারমিশন থাকে?’

সৌমিলি অবাক হয়ে তাকাল, ‘কার পারমিশন থাকবে?’

‘ধর যদি খোদ দময়ন্তী মুখুজ্যের পারমিশন থাকে?’

.

ভবানী ভবন, রাত ৯টা ১৫

অমিতাভরা ওয়ার্কস্টেশনে চলে গেছেন। সুচেতা দত্তকে রওনা করিয়ে দিয়ে দময়ন্তী ডিজিটাল ফরেন্সিকের ঘরে ঢুঁ মারল। লীনা আর লিলির ওপর ডিজিটাল নজরদারি চালানোর ভার ছিল ডিজিটাল ফরেন্সিকের শুভঙ্করের ওপর। দময়ন্তী সেই লিস্টে সুচেতার নাম জুড়তে বলে দিল। প্রতীক তখন ভিডিও থেকে মজন্তালীর ভয়েস স্যাম্পল এক্সট্র্যাক্ট করে সেটা স্পেকটোগ্রামে ফেলে দেখার তোড়জোড় করছে। দময়ন্তীর কথা শুনে বুড়ো আঙুল তুলল। ডিজিটাল দুনিয়া নিয়ে কাজ করে করে প্রতীক ইমোজির মুদ্রায় কাজ সারতে অভ্যস্থ হয়ে গেছে। গোটা ডিজি ফরেন্সিক বিভাগ হয়তো আজ সারারাত কাজ করবে। সবার কেমন একটা রোখ চেপে গেছে। মজন্তালী রাজ্য পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের ইগোয় পা দিয়েছে।

দময়ন্তী বেরিয়ে এল। ঘড়িতে এখন ন’টা কুড়ি। তার নিজেরই আরও অন্তত একটা ঘণ্টা লাগবে বেরোতে। এতক্ষণ অফিসে থাকা এই প্রথম। এবার থেকে হয়তো মাঝেসাঝেই এরকম দেরি হবে। কেসটা জটিল সব জ্যামিতি তৈরি করছে। সুচেতার পুরো বয়ানটাই অদ্ভুত। লালমোহন গাঙ্গুলির ভাষায় ‘হাইলি সাসপিশাস’। উড়ে এসে প্রত্যক্ষদর্শীর জায়গায় জুড়ে বসতে চাইছে কিনা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। এ এমন এক আসন যেখানে কোনও প্রতিযোগিতা নেই। আনকনটেস্টেড সিট। কিন্তু এত বড় একটা রিস্ক কেউ কেন নেবে? লোকে ইউপিএসসি বা জেইই-র মতো পরীক্ষার মেধাতালিকায় নাম তুলতে ব্যাকুল হবে, সাসপেক্ট লিস্টে নিজের নাম তুলতে উঠেপড়ে লাগবে কেন? এইসব ভাবতে ভাবতেই দময়ন্তী ওয়ার্কস্টেশনের দিকে যাচ্ছিল। করিডরে পথ আটকাল একটি মেয়ে, ‘ম্যাম!’

দময়ন্তী জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল। মেয়েটা গলায় ঝোলানো আইকার্ড তুলে ধরল, ‘খবর সারাদিন, ম্যাম।’

‘প্রেস কনফারেন্সে যা-বলার বললাম তো। তারপরে এখনও বলার মতো প্রগ্রেস ঘটেনি কিছু।’ বলে দময়ন্তী এগিয়ে যাচ্ছিল। মেয়েটা নাছোড়বান্দা, ‘ম্যাম, মজন্তালী সরকারের আই উইটনেস সুচেতা দত্তকে আজ একটু আগে আপনারা জেরা করেছেন। তাঁর থেকে কিছু লিড পাওয়া গেল?’

‘মিডিয়াকে জানানোর সময় হলে আমরা জানাব। ধৈর্য ধরুন।’

মেয়েটা দময়ন্তীর বাঁকা কথায় বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ না করে পরের প্রশ্ন ছুড়ল, ‘ম্যাম, সুজান জর্ডানের ভূতই কি মজন্তালী সরকার? কিছু জানতে পারলেন?’

‘মিডিয়ায় ফ্যাক্ট চেক বলে একটা ব্যাপার হয় জানতাম। সেটা কি এখন উঠে গেছে?’

মেয়েটা আমতা-আমতা করে কিছু একটা বলার চেষ্টা করল। ঠিক বোঝা গেল না।

‘কেস এখনও সিআইডি-র হাতে আছে মানে মজন্তালী সরকার রক্তমাংসের মানুষ। ভূত হলে ওঝাদের ডাক পড়ত। তাই না?’ বলে দময়ন্তী গটমটিয়ে এগিয়ে গেল।

ঘরে ঢুকে দেখল, অমিতাভ একটা ফাইলে চোখ বোলাচ্ছেন। রাহুল সামনে কাগজপত্রের স্তূপ নিয়ে চিন্তিত মুখে বসে আছে। তানিয়া ডেস্কটপে সুচেতার ফেসবুক প্রোফাইল স্ক্রল করছে। দময়ন্তীকে দেখে বলল, ‘একটা জিনিস একটু খটকা লাগছে। সুচেতা এপ্রিল মাসের ১৮ তারিখ অবধি খুবই অ্যাক্টিভ। তারপরে আশ্চর্যভাবে খুব সামান্য কয়েকটা পোস্ট। সবই শেয়ারড পোস্ট এবং সবকটাই শাসক দলের অ্যাচিভমেন্ট-বিষয়ক। আ বিট ফিশি, না?’

অমিতাভ ফাইল থেকে মুখ তুলে বললেন, ‘রুলিং পার্টির স্টুডেন্ট ইউনিয়ন জয়েন করেছে হয়তো।’

‘বেমানান লাগছে। চোদ্দই মার্চ মার্কসের মৃত্যুদিনে মার্কসের কোট শেয়ার করেছে। জানুয়ারির একটা পোস্টে ক্লারা জেটকিনের কোট শেয়ার করেছে। এপ্রিলে হঠাৎ ভোলবদল?’

দময়ন্তী বলল, ‘তুই কি বলতে চাইছিস এই নতুন ভোলবদলটা আসলে ওর কভার?’

‘মে বি। বাজিয়ে দেখা দরকার। আরেকটু ছানবিন করি।’ তানিয়া আবার ফেসবুকে ডুব মারল।

রাহুল বলল, ‘দ্যাখো, সুচেতার দাবি সত্যি হলে এই ঘটনাটা একটা অন-স্পট অ্যাম্বুশ। এবং এখানেই খটকা লাগছে। একেবারে ঠিক সময়ে ঠিক জায়গায় পৌঁছানোর পিছনে কী যুক্তি? মজন্তালী কি অন্তর্যামী? এখনও পর্যন্ত তো আর কোনও অন-স্পট অ্যাম্বুশের ঘটনা পাওয়া যাচ্ছে না।’

‘আমারও ব্যাপারটা গন্ডগোল লাগছে,’ দময়ন্তী ঠোঁট কামড়ে বলল, ‘তবে একটা কথা। হাজরার কেসটাও কিন্তু অন-স্পট অ্যাম্বুশ হতে পারে। ফার্ন রোড আর হাজরা দু-জায়গাতেই গত কয়েক মাসে বেশ কিছু রেপ-মলেস্টেশনের ঘটনা ঘটেছে।’

রাহুল ভুরু কুঁচকাল, ‘তুমি বলছ প্ল্যান করে ওখানে অভিযান চালিয়েছে? তার জন্য যথেষ্ট পাকাপোক্ত নেটওয়ার্কিং লাগবে। লোকবল লাগবে।’

দময়ন্তী বলল, ‘দ্যাখ, কোর টিমে যে-কজনই থাক, আমার অনুমান আরও লোককে কাজে লাগানো হচ্ছে। সম্ভবত টাকা দিয়েই।’

অমিতাভ বললেন, ‘তোমরা খেয়াল করছ কিনা জানি না, একজন অঘটন পটীয়সী মার্জারললনার ইমেজ কিন্তু খুব ধূর্ততার সঙ্গে পাব্লিকের মাথায় প্লান্ট করে দেওয়া হচ্ছে। এই ধড়াচুড়ো পরা মহিলার ছবি প্রথমে বিভিন্ন অ্যানোনিমাস প্রোফাইল থেকে সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া হল। আজ ভিডিওয় সেটাকে এস্টাবলিশ করল। তারপর, যদি ধরি সুচেতা ওদের দলের, তাহলে ওর বয়ানের মাধ্যমে সেটাকে ভ্যালিডেট করানো হল।’

দময়ন্তী বলল, ‘রাইট। সুচেতা যদি ওদের দলের লোক হয়, তাহলে গল্পটা দু-রকম হতে পারে। এক, সুচেতাকে টোপ বা হানিট্র্যাপ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। ওই এলাকায় রিসেন্টলি প্রচুর শ্লীলতাহানির ঘটনা শোনা যাচ্ছিল। হয়তো সেই কারণেই। আর গল্প নম্বর দুই, ফার্ন রোডে সেদিন যার ওপর আক্রমণ হয়েছিল, সে সুচেতা নয়। অন্য কেউ।’

রাহুল বলল, ‘আমার তো এই সেকেন্ডটাই বেশি কনভিন্সিং লাগছে।’

‘আমারও,’ অমিতাভ ঘাড় নাড়লেন, ‘সবাই জানে, আমাদের সমাজে খুব সহজে কেউ এ কথা কবুল করতে সাহস করবে না। তাই সুচেতাকে সামনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। কোনও প্রমাণ তো নেই যে ওই মেয়েটি সুচেতা নয়। ওই মেয়েটি সামনে আসার হলে এতদিনে অবশ্যই আসত। এটা তো সম্পত্তি নয়। কলঙ্কের ভাগ নিয়ে কেই-বা মারামারি করতে আসবে!’

‘মুশকিল হচ্ছে সুচেতার অ্যালিবাই একেবারে নিখুঁত। কথাতেও কোনওরকম লুপহোলস নেই। বড্ড বেশি কনফিডেন্ট।’

‘ওইটাই তো ব্যাপার!’ দময়ন্তী হাই তুলল, ‘একটু বেশিই নিখুঁত।’

তানিয়া ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল, ‘ওহ! শিট!’

সবাই চমকে তাকাল। অমিতাভ বললেন, ‘কী হল?’

তানিয়া বিস্মিত মুখে ফেরাল, ‘সুচেতার বাবা কে বলুন তো?’

‘কে?’

‘গতকালই আপনারা তাঁকে মিট করে এলেন। উকিলবাবু।’

.

রাধাগোবিন্দ নাথ সরণি, নেতাজিনগর, টলিগঞ্জ, কলকাতা রাত ২টো ২৫

লেখাটা পত্রিকার মেইল আইডিতে মেইল করে ল্যাপটপের স্ক্রিন নামিয়ে দিল সায়নদীপ। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে একটা স্বস্তির আড়মোড়া ভাঙল। চারটে হয়ে গেল। আরও দুটো। গতবার পুজোয় অনেক পত্রিকাকে ফিরিয়ে দিয়েছিল। এইবারে লেখা দেবে, এই প্রতিশ্রুতি সহ। ফলে এবারে গাঁট পাকানো বাঁশ। আসলে লেখক হিসেবে একবার ক্লিক করে গেলে জীবন দুটো ভাগে ভাগ হয়ে যায়। পুজোসংখ্যার লেখা আর বইমেলার লেখা। মাঝখানে থাকে সেগুলোকে কাঁচি চালিয়ে, রিফু করে বইয়ের জন্য তৈরি করার তাড়া।

উঠতি লেখক হিসেবে সায়নদীপ নাম করেছে। দুটো বই বেরিয়ে গেছে। মাথায় বড় হাউজের হাত আছে। কিন্তু তার দামও দিতে হচ্ছে। ফ্যামিলি টাইম, বন্ধুদের আড্ডা সবই কাটছাঁট করতে হচ্ছে। বাঘের পিঠে উঠে পড়া খুবই কঠিন, কিন্তু একবার উঠে পড়লে নামাটা তার চেয়ে আরও অনেক বেশি কঠিন।

অবশ্য এই জীবনই তো চেয়েছিল সে। আসল কথাটা ফরাসি ঔপন্যাসিক গুস্তাভ ফ্লবেয়ার বলে গেছেন বহুকাল আগে। রাইটিং ইজ আ ডগস লাইফ, বাট অনলি লাইফ ওয়ার্থ লিভিং।

হাতে-পায়ে খিল ধরে গেছে। একবার বারান্দায় ঘুরে এসে তারপর শোবার তোড়জোড় করা যাক। সায়নদীপদের অ্যাপার্টমেন্টের অন্য ফুটেই টলিগঞ্জ সেমেট্রি। তিনতলার এই দক্ষিণমুখো ফ্ল্যাট থেকে সোজাসুজি চোখে পড়ে সেমেট্রির অনেকটা অংশ। এমন গমগমে একটা পাড়ার মাঝখানে একটা সেমেট্রি থাকলে তার হরর-কোশেন্ট বলে তেমন কিছুই থাকে না। তবু রাতের দিকে ওই ফুটপাতটা মানুষ পারতপক্ষে এড়িয়েই চলে। সায়নদীপের ভারি ভাল্লাগে জায়গাটা। রাতে লেখা সেরে শুতে যাবার আগে সে প্রতিদিন একবার করে দক্ষিণের জানলার সামনে দাঁড়িয়ে যায়।

আজও তাই করল। জানলার দিকে হেঁটে আসতে আসতে সায়নদীপ মস্ত একটা হাই তুলতে শুরু করেছিল। জানলায় এসে সেমেট্রির দিকে চোখ ফেলতেই হাইটা মাঝপথে আটকে গেল।

রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলোয় সেমেট্রির ভিতরের খানিকটা অংশে অন্ধকার সামান্য ফিকে হয়ে আছে। সেই ফিকে অন্ধকারের মাঝে দুটো জমাট বাঁধা অন্ধকার। দুটো ছায়ামূর্তি! ডানদিকের ছায়ামূর্তিটার হাতে ওটা কী?

আতঙ্কে পাথর হয়ে গেল সায়নদীপ।

.

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *