বাবা

বাবা

গাড়িটা ওদের ছোট গলি দিয়ে বেরিয়ে বড় রাস্তায় পড়তেই দীপার হঠাৎ গা-টা গুলিয়ে উঠল, ইঙ্গিতে ও সন্দীপনকে বলল গাড়িটা থামাতে। বমি পাচ্ছে হঠাৎ, কয়েকদিনের অনিয়ম, কাল সারাদিনের উপোসের পর খাওয়া, সেগুলো ঠেলে বেরোতে চাইছে বোধ হয়। নাকি তারাও আর দীপার সাথে এবাড়ি ছেড়ে যেতে রাজি নয়?

সন্দীপন একটু কিন্তু কিন্তু করে বলল, ”ইয়ে, থামাতেই হবে? কিন্তু এই গাড়ি থামানো যায় না বলে তো! তুমি একটু জল খাবে? দাদা, এসি-টা একটু বাড়িয়ে দিন না!” শেষ কথাটা ড্রাইভারের উদ্দেশ্যে বলে সন্দীপন জলের বোতলটা দীপার মুখের সামনে তুলে ধরল। দীপা ট্র্যাফিকের প্যাঁ-পোঁর মধ্যে কাঁপা কাঁপা হাতে বোতল থেকে কয়েক ঢোক জল নিজের গলায় ঢালল। কাল রাতের মেকআপ গলে গলে পড়ছে, চন্দন ধেবড়ে গিয়ে সিঁদুরের সাথে একাকার, কেঁদে কেঁদে ফুলে লাল হয়ে যাওয়া চোখদুটোয়, কপালে, গালে আলগোছে জলের ঝাপটা দিলো দীপা, চলন্ত গাড়িতে পরিষ্কার তো হলই না, উল্টে আরো কান্না বেরিয়ে এল। গাড়ি ততক্ষণে বাইপাস ধরে হু হু করে ছুটছে। দীপাদের কসবার সবুজে ঢাকা অলিগলি নয়, এহল নতুন কলকাতার ঝাঁ-চকচকে রাস্তা, দুপাশে বিশ্ববাংলা-হাট, ইকোপার্কের চোখ জুড়নো মনোরম শোভা। সন্দীপন দীপার একটা হাত আলতো করে ধরে জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে।

দীপা মনে মনে ভাবল, আগেরবারও তো গাড়ি কিছুতেই দাঁড় করাতে দেননি দীপ্তর মামা! সেবার বমি নয়, দীপার খুব খিদে পেয়ে গিয়েছিল, গাড়ি দাঁড় করিয়ে কেক-বিস্কুট কিনবে ভেবেছিল, কিন্তু মামা কিছুতেই রাজি হননি। তাতে কি এমন ভালো হয়েছিল! বিয়ের ঠিক পাঁচ মাসের মাথায় মর্গে গিয়ে যখন দীপ্তর বাইক অ্যাকসিডেন্টে তালগোল পাকানো নিথর শরীরটা দেখেছিল দীপা, তখন এই কথাটাই প্রথম মাথায় এসেছিল ওর। আচ্ছা বাবামা-ও কি নৈনিতাল যাওয়ার সময় গাড়ি থামিয়েছিল?

নিজেকে একটু সামলে নিতে না নিতেই ফোন বাজল। বাবা। দীপা নিজেকে কোনোরকমে সামলে কানে ফোনটা দিল, ”হ্যালো!”

-”কদ্দূর ছোট-মা? গাড়ি ঠিকঠাক যাচ্ছে তো?”

দীপার বুকের ভেতর থেকে আবার একদলা কান্না উঠে এল। সেই আদরমাখানো গলা। এরপর থেকে আর কেউ ওকে পরম স্নেহে ছোট-মা বলে ডাকবে না! উৎগত অশ্রুকে কোনোমতে সামলে বলল, ”হ্যাঁ বাবা! আর কিছুক্ষণের মধ্যেই এয়ারপোর্ট ঢুকবে। তুমি কি করছ?”

—”আমি কি করব মা! তুই চলে গেলি, বাড়ি ফাঁকা হয়ে গেল, একা বুড়ো যখের মতো বসে আছি। আমার কথা বাদ দে! তুই ওখানে গিয়ে সাবধানে থাকবি কিন্তু! আর নতুন জায়গা, গিয়েই বেশি জল ঘাঁটবি না, তোর তো একটুতেই ঠান্ডা লেগে যায় মা!”

দীপা এবার কেঁদে ফেলল, বলল, ”তোমায় ছেড়ে কি করে থাকব বাবা?”

—”ওসব অভ্যেস হয়ে যাবে! সন্দীপন বড় ভালো ছেলে। তোর খেয়াল রাখবে। তুই আমার কথা ভাবিস না। থিসিসটা ভালোভাবে লিখবি। পৌঁছে ফোন করবি কিন্তু!”

ফোনটা রেখে দীপার অঝোরে কান্না দেখে সন্দীপন দীপার হাতটাকে শক্ত করে ধরল, ”এত কাঁদছ কেন দীপা? আর একঘণ্টা বাদেই ফ্লাইট আমাদের। সব ঠিক হয়ে যাবে। আমরা খুব ভালো থাকব দেখো!”

হুম আমরা তো খুব ভালো থাকবই, মনে মনে ভাবল দীপা। আর যে মানুষটা এতগুলো বছর ধরে নিজের শখ-আহ্লাদ সব বিসর্জন দিয়ে দীপাকে আগলে রাখল, সে কেমন থাকবে তা নিয়ে দীপার আর কোনো দায় নেই। কি স্বার্থপর দীপা!

প্লেনে উঠে উইন্ডো সিটে বসে বাইরে মেঘগুলোর আস্তে আস্তে নীচে নেমে যাওয়া দেখছিল দীপা। কান্নাকাটি আর করছে না, কিন্তু মনটা খুব ভারি হয়ে আছে। দিল্লি যাচ্ছে ও, ওর নতুন শ্বশুরবাড়িতে। শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়স্বজন যারা বিয়েতে এসেছিলেন, তাঁরা সবাই আজ বিকেলের রাজধানী এক্সপ্রেসে রওনা দেবেন। বিয়ে আর রিসেপশন দুটোই কলকাতায় একসাথেই মিটিয়ে নেওয়া হয়েছে। সন্দীপনের ছাত্রজীবন যদিও কলকাতায়, কিন্তু ওরা চার প্রজন্ম ধরে দিল্লির বাসিন্দা। ফোনে কথাবার্তার পর বাবা দিল্লিতে ওদের বাড়ি দেখতে এসেছিলেন, ঘুরে গিয়ে বলেছিলেন, ”আমি যেমন চাইছিলাম, ঠিক তেমন ফ্যামিলি রে ছোট-মা। সন্দীপনকে তো অনেকদিন ধরে দেখছি, যেমন ভালো ছাত্র, তেমনই ভালো ছেলে। বাড়িও খুব ভালো। ছোট পরিবার, কিন্তু আত্মীয়স্বজনদের সাথে যোগাযোগ ভীষণ, ছেলের মা-ও খুব ভালো, খুব সোৎসাহে বলছিলেন যে তোর জেএনইউ তে পিএইচডি-র জন্য নাম উঠলে খুব ভালো হবে। তুই খুব ভালো থাকবি রে ছোট-মা!”

নিখিলেশবাবুর কথা শুনে দীপা তখন বইয়ের পাতা থেকে মুখ তুলে ঈষৎ অভিমানের গলায় বলেছিল, ”আমি জানি তুমি ইচ্ছে করে আমাকে দূরে পাঠিয়ে দিতে চাও বাবা! আমি কতবার বলেছি না, আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাব না?”

নিখিলেশ এগিয়ে এসে দীপার মাথায় হাত রেখেছিলেন, ”না রে মা! আমি চাই তুই খুব ভালো থাক। সেটা যেখানে পাবো সেখানেই তো যেতে হবে। আর আমার জীবন তো শেষ হয়েই এল, তুই কি নিয়ে থাকবি? ছেলেকে তো আগেই হারিয়েছি, এবার মেয়েও যদি কষ্টে থাকে, আমি কি নিয়ে বাঁচব বল তো?”

আমাদের সমাজ প্রতিটা সম্পর্কের একটা করে ওয়েল-ডিফাইন্ড নাম দিয়ে দেয়, জানলায় বসে ভাবছিল দীপা। ননদ-জা, দেওর-ভাজ, বেয়াই-বেয়ান কতরকম নাম সেসব সম্পর্কর! সেই দিক দিয়ে দেখতে গেলে নিখিলেশ দীপার শ্বশুরমশাই। সাড়ে সাত বছর আগে যখন দীপা সবে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছিল, তখন ওর মামা বিয়ে দেন দীপ্তর সঙ্গে। ছোটবেলাতেই দীপার বাবা-মা ঘুরতে গিয়ে নৈনিতালে গাড়ি-অ্যাকসিডেন্টে মারা যান, সাড়ে তিন বছরের দীপা কোনোরকমে বেঁচে যায়। সেই থেকে ও মামার কাছেই মানুষ। মামা-মামি ওকে বড় করলেও ওর বিয়ে দেওয়ার জন্য বড় উতলা হয়ে পড়েছিল, আর বোধ হয় পারছিল না দায়ের বোঝা বইতে। তাই উচ্চমাধ্যমিকে দীপা খুব ভাল রেজাল্ট করলেও ওর বিয়ে দিয়ে দেয়।

দীপ্তর মা ছিল না, শুধু দীপ্ত আর শ্বশুরমশাই নিখিলেশ। বিয়ের পরেরদিন মামির শিখিয়ে দেওয়া মত দীপা অপটু হাতে রান্নাঘরে ঢুকতে যেতেই নিখিলেশ গম্ভীরভাবে বলেছিলেন, ”শোন, আমাদের রান্নার লোক আছে, তোমাকে রান্নাঘরে সময় নষ্ট করতে হবে না। সামনেই প্রেসিডেন্সির অ্যাডমিশন টেস্ট, ভালো করে প্রিপারেশন নাও, নাহলে এত ভালো রেজাল্ট করা বেকার হবে। আর এ’বাড়ির সব ছেলেমেয়ে পড়াশুনোয় ভালো, তোমাকেও সেই মান রাখতে হবে। পড়াশুনোয় ফাঁকি আমি কিন্তু সহ্য করব না।”

জলদগম্ভীর কণ্ঠস্বরে দীপা ভয় পেয়ে ঢোঁক গিলেছিল। এ কি শ্বশুরমশাই না মাস্টারমশাই! মামার কাছ থেকে দীপা আগেই শুনেছিল, নিখিলেশ তখন সবে রিটায়ার করেছেন কলেজ থেকে। ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটির ইকনমিক্সের নামজাদা প্রোফেসর, দু-বেলা ছাত্রছাত্রীরা আসে তাঁদের প্রিয় স্যারের কাছে, কখনো পড়ার ব্যাপারে আলোচনা করতে, কখনো আশীর্বাদ নিতে। দীপা পড়াশুনোয় ভালো হলেও মামার বাড়িতে পড়ার খুব একটা পরিবেশ ছিল না। যেটুকু পড়ার ও নিজের তাগিদেই পড়ত। এবাড়িতে সারাক্ষণ পড়াশুনোর আলোচনা, বইয়ের বাতাবরণের মধ্যে থাকতে থাকতে ও যেন নতুন করে নিঃশ্বাস নিচ্ছিল।

এয়ারহোস্টেস ডাকল, ”ভেজ অর ননভেজ ম্যাম?”

দীপা অস্ফুটে ‘ননভেজ’ বলে আবার জানলার দিকে মুখ ঘোরাতে গিয়ে দেখল সন্দীপন একটা বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েছে হেলান দিয়ে। প্রথম প্লেনে উঠেছিল ও বছরচারেক আগে, প্রেসিডেন্সি থেকে ইকনমিক্সে বি এসসি পাশ করে দিল্লি স্কুল অফ ইকনমিক্সে মাস্টার্স করার পরীক্ষা দিতে যাবার সময়। বাবা হাতে ধরে শিখিয়েছিলেন বোর্ডিং পাস কাকে বলে, কি করে লাইফ বেল্ট বাঁধতে হয়। দিল্লি গিয়ে লোটাস টেম্পল ঘোরার সময় বলেছিলেন বাহাই ধর্মের কথা, গল্পচ্ছলে বলেছিলেন কুতুব মিনারের ইতিহাস, ইলতুৎমিস।

সেবার ওর নাম ওঠেনি। যাদবপুরে ভর্তি হয় ও। বাবার কাছেই পড়ত। মাইক্রো-ইকনমিক্সের দুরূহ সব থিয়োরি জলের মতো করে বোঝাতেন নিখিলেশ।

দীপ্ত যখন চলে যায়, তখন ও সবে প্রেসিডেন্সিতে ভর্তি হয়েছে। বাবা যত শোকে পাথর হয়ে উঠছিলেন, তত জড়িয়ে ধরছিলেন দীপাকে। ‘তুমি’ নেমে এসেছিল ‘তুই’-তে, বলেছিলেন, ”নিজের মা তো কবেই আমাকে ফেলে চলে গেছে, বউ-ছেলে সবাই চলে গেল। তুই-ই এখন থেকে আমার মা, আমার ছোট-মা। মেয়ের গলায় বাবা ডাক তো আগে কখনো শুনিনি, প্রাণটা জুড়িয়ে যায়!”

দীপার চোখদুটো আবার জ্বালা করে উঠল, কে বাবাকে ওষুধ দেবে মনে করে, কে ভোরবেলা উঠে বাবাকে নিয়ে মর্নিং ওয়াকে বেরোবে? দীপার পিএইচডির সাবজেক্ট মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ইকনমিক গ্রোথ আর ইনক্ল্যুসিভ ডেভেলপমেন্টের মধ্যেকার প্যারিটি, কে-ই বা সেটা বুঝিয়ে দেবে জলের মতো?

ভাবতে ভাবতে দীপা কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল ও নিজেই জানে না। ঘুম ভাঙল এয়ারহোস্টেসের ঘোষণায়, প্লেন একটু বাদেই ল্যান্ড করবে, বেল্ট পরে নিতে হবে। সন্দীপন ওর দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছিল। বলল, ”কি, মনখারাপ কমেছে?”

দীপা কিছু বলল না। সন্দীপন কি বুঝবে এই কষ্ট! প্রথম বিয়ের সময় দীপা কাঁদেই নি তেমন, কষ্টও হয়নি খুব একটা। তবে এবারে বিয়ের আগে প্রায় চারমাস কথা বলেছে ও আর সন্দীপন, বাবার তাড়নায় ঘুরতেও বেরিয়েছে দু-বার। সন্দীপনকে যথেষ্ট সংবেদনশীলই মনে হয়েছে। প্রথম দিন ওর কথাতেই সবথেকে ভালো লেগেছিল দীপার। প্রথমেই সন্দীপন বলেছিল, ”স্যারকে এতদিন শিক্ষক হিসেবে অসীম শ্রদ্ধা করতাম, এখন থেকে মানুষ হিসেবেও শ্রদ্ধাটা অনেক বেড়ে গেছে দীপান্বিতা! তুমি খুব লাকি এমন একজন বাবা পেয়েছ। আমিও সত্যিই লাকি, আমারও বাবা নেই আর স্যারের মতো মানুষকে বাবা হিসেবে পাচ্ছি!”

 তবু, সাময়িক ভালোলাগা আর একছাদের তলায় কাটানোর মধ্যে আকাশপাতাল পার্থক্য!

দিল্লিতে পৌঁছে প্রথম ক-টা দিন কাটল চূড়ান্ত ব্যস্ততায়। জেএনইউ-তে পিএইচডির সব ফরম্যালিটিজ মেটানো, গাইড ঠিক করা, শাশুড়ি-মায়ের সাথে টুকটাক কেনাকাটা, এসবেই কেটে গেল প্রথম মাসটা। মাঝে ও আর সন্দীপন দিনচারেকের জন্য সিমলা-মানালির দিকটা ঘুরে এল। দুজনের মনের মিল হলেও এখনো আড়ষ্টতাটা পুরোপুরি কাটেনি দীপার। সন্দীপন ভালোবাসার কথা বলতে শুরু করলে ওর ভালো লাগে, কিন্তু উত্তরে কিছু বলতে পারে না, গুটিয়ে যায়।

বাবার সঙ্গে দিনে তিনবার কথা হয় দীপার। তবু মনটা খারাপ হয়ে থাকে মাঝে মাঝেই। করবীমাসি ঠিকমতো তেলঝালমশলা ছাড়া রান্না করছে কি না, ওষুধ দিচ্ছে কি না, দিনের মধ্যে দশবার ফোন করে করবীমাসিকে জিজ্ঞেস করে ও। মাঝেমাঝে ভাবে ওর শাশুড়ি-মা কিছু মনে করছেন না তো এতবার করে ও ফোন করে বলে? ওর কাছে নিখিলেশ বাবা-ই, কিন্তু ওঁদের কাছে তো আগের পক্ষের শ্বশুর ছাড়া কিছুই নন! ও কিছুতেই বুঝতে পারে না সন্দীপনের মায়ের অভিব্যক্তি। ও বাবাকে ফোন করলেই উনি উঠে ভেতরে চলে যান।

*

সেদিন সকালে বিছানায় শুয়ে চোখ খুলেই ওর মনে পড়ল আরে, আজ তো উনিশে জুন, ফাদার্স ডে! খারাপ হয়ে থাকা মনটা আরও খারাপ হয়ে গেল। বাবাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছিল কয়েকদিন ধরেই। আগের বছর অবধিও এই দিনে ও আর বাবা কোথাও না কোথাও ঘুরতে যেত, টুকটাক সিনেমা দেখে, খেয়েদেয়ে বাড়ি ফিরত। তাই কয়েকদিন আগে সন্দীপনকে ও বলেছিল, ”চল না, সামনের সপ্তাহে একবার কলকাতা থেকে ঘুরে আসি, যাবে?”

সন্দীপন অবাক হয়ে বলেছিল, ”হঠাৎ কলকাতা! কেন?”

দীপা একটু থমকে গিয়ে বলেছিল, ”সামনের রবিবার বাবার জন্মদিন, ওইদিনটা আমি আর বাবা খুব আনন্দ করতাম!”

সন্দীপন কোনো উত্তর দেয়নি, ভ্রূ কুঁচকে চুপ করে গিয়েছিল। কিন্তু দীপা যেন স্পষ্ট দেখতে পেয়েছিল, সন্দীপনের মুখে ব্যঙ্গের আভাস, যেন বলছে, ”হু! তাও যদি নিজের বাবা হত! আগের শ্বশুরকে নিয়ে আদিখ্যেতার শেষ নেই!” সন্দীপনের উত্তর না দেওয়া অগ্রাহ্য করা ব্যবহারে গুম হয়ে গিয়েছিল ও। তারপর থেকেই লক্ষ করছে, সন্দীপন অফিস থেকে এসে মায়ের সাথে কিসব আলোচনা করছে, ওকে দেখলেই চুপ করে যাচ্ছে।

দীপার মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। তবে কি মামিমা-ই ঠিক বলতেন? ও কি সত্যিই অপয়া? সুখ ওর কপালে সয়না, নাকি সুখকে ও যত্ন করে রাখতে পারে না! বাবামা-কে হারাল, বিয়ে হতে না হতেই স্বামীকে হারাল, এখন বাবার এত কষ্ট করে দেওয়া বিয়েটাকেও কি ভেঙে ফেলল ও!

সন্দীপন কাল অফিসের ট্যুরে মুম্বাই গেছে, ফিরবে কাল। সেদিনের পর দুজনের মধ্যে হু-হাঁ ছাড়া খুব একটা কথা হয়নি। শাশুড়িমা-ও বেশি কথা বলছেন না ওর সাথে, খেয়াল করে দেখেছে। অন্যদিন দীপা কাজের মধ্যে থাকে, বেরিয়ে যায়, আজ রোববার, সে উপায়ও নেই।

একজন বৃদ্ধ মানুষ, যিনি ওকে এতটা বড় করলেন, সমাজে প্রতিষ্ঠা দিলেন, বাঁচতে শেখালেন, তাঁর খেয়াল রেখে, খবর নিয়ে এতোটাই দোষ করে ফেলল ও?

বাবা ওর গলা শুনেই বুঝতে পেরে যাবেন কিছু একটা হয়েছে, তাই তিন-চারদিন ধরে বাবা কে আর ফোনও করেনি দীপা। কি করছেন, ঠিকমতো খাচ্ছেন কিনা, কে জানে! ধুর, সন্দীপন ওকে আর না চাইলে কলকাতায় ফিরে যাবে ও, বাবার সাথেই কাটিয়ে দেবে বাকি জীবনটা, স্থির করে ফেলে দীপা! নিজের বাবামায়ের আদর তো জ্ঞানত কোনোদিনও পেল না, নিখিলেশের আদর থেকে বঞ্চিত হতে চায় না ও।

ঘর থেকে বেরিয়ে কাউকে দেখতে পেল না দীপা। দিল্লির সি আর পার্কে দোতলা সুন্দর ছিমছাম একটেরে বাড়ি, সামনে পিছনে একফালি করে বাগান। সামনের রাস্তাটা ফাঁকা ট্র্যাফিক ফ্রি, তাই খুব শান্ত। অন্যমনস্কভাবে বারান্দায় এসে দাঁড়ায় ও, শাশুড়িমা তৃপ্তি মনে হয় বাথরুমে। এই ক-দিনে একটা অদৃশ্য দূরত্ব তৈরি হয়েছে সন্দীপন আর ওনার সাথে, কেউ কিছু না বললেও কোথাও যেন তাল কেটে গেছে। দীপা কি চা করে ডাকবে ওনাকে, কথা বলবে স্বাভাবিকভাবে? কি করবে বুঝতে পারছিল না ও!

সদর দরজায় কাজের লোকের কলিং বেল শুনে অন্যমনস্কভাবেই ও খুলতে গেল, যাবার সময় শাশুড়িমায়ের ঘরে একবার উঁকি দিল, ঘর ফাঁকা। কোথায় গেলেন মা? তেতো মুখে দরজা খুলতেই ও অবাক হয়ে গেল। নিখিলেশ দাঁড়িয়ে রয়েছেন, পাশে দুটো বড় বড় ট্রলি।

খুশিতে কয়েক মাইক্রোসেকেন্ডের জন্য মনটা নেচে উঠলেও পরক্ষণেই আড়ষ্ট হয়ে গেল দীপা। রবীন্দ্রনাথের দেনাপাওনা-র নিরুপমার মতোই অসহায় মনে হল নিজেকে। বিবাহিত কন্যাদের বড় জ্বালা, বাবাদেরকেও পর করে দিতে হয় সময়বিশেষে!

এইসময়ই বাবা কেন এলেন? যদি ওঁরা কোনো অপমান করেন, দীপা কিছুতেই সহ্য করতে পারবে না!

আড়ষ্টতা কাটিয়ে ও এগিয়ে গিয়ে নিখিলেশকে প্রণাম করতে যাবে, হঠাৎ দেখল সামনে অটো থেকে আরেকটা ট্রলি নামাচ্ছে সন্দীপন! চোখাচোখি হতে হেসে বলল, ”কলকাতায় বাবা একা একা রয়েছেন, এখানে আমার মা একা। কি দরকার! তাই বাবাকে নিয়ে চলে এলাম! এবার থেকে আমরা সবাই একসাথে থাকব।”

পেছন থেকে শাশুড়ির গলা শুনে চমকে তাকাল ও, শাড়ির আঁচলে হাত মুছতে মুছতে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন তৃপ্তি, ”আসুন দাদা, ট্রেন অনেক লেট করল, তাই না!”

দীপা কিছুই বুঝতে পারছিল না। এসব কি হচ্ছে! বিহবলভাবে ও বাবাকে প্রণাম করলে। বাবা ওকে জড়িয়ে ধরলেন, ”কেমন আছিস ছোট’মা?”

ঘরে গিয়ে ট্রলিগুলো সব গুছিয়ে রাখছিল দীপা, পেছন থেকে এসে জড়িয়ে ধরল সন্দীপন, ”বাবার জন্মদিনে কেমন সারপ্রাইজ দিলাম বল! উফ, কত কাণ্ড করলাম, এক মাস ধরে বাবাকে বলে বলে আমি আর মা রাজি করালাম, ইন্টারনেটে অ্যাড দিয়ে কলকাতার বাড়িতে একটা ভালো ভাড়া ঠিক করলাম, তড়িঘড়ি অফিসে ছুটি নিয়ে কলকাতা গেলাম, তবু আমার সুন্দরী বউয়ের মন পেলাম না! যেমন জাঁদরেল শ্বশুরমশাই তেমন জাঁদরেল আমার বউ! এইজন্যই বলে, স্ত্রীয়াশ্চরিত্রম দেবা ন জানন্তি কুতো মনুষ্যা’!”

দীপার চোখ থেকে প্রথম দিনের মতো জল ঝরছিল অঝোরে, কিছু না বলে ও সন্দীপনের বুকে মাথা হেলিয়ে দিল।

সন্দীপন আবার চুপিচুপি বলল, ”কি ভালো হল বল তো! তোমাকে আর বাবার শরীর নিয়ে চিন্তা করতে হবে না, মন খারাপ করতে হবে না। তোমার পিএইচডি-র থিসিসে বাবা দারুণভাবে হেল্প করবেন। আর আমরা সবাই মিলে এক ছাদের তলায় থাকব। কি ভালো হল না, বল!”

দীপা চোখ বুজে নীরবে ভাবছিল, জীবনের সেরা গিফটটা আজ ও পেয়ে গেল! ওসব আড়ষ্টতা ঝেড়ে ফেলে বলল, ”আই লাভ ইউ সন্দীপন!”

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *