শেষ চিহ্ন – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
শেষ চিহ্ন – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
প্রথম প্রকাশ ডিসেম্বর ২০২৩
.
বৌদ্ধশাস্ত্র ও পালিসাহিত্য গবেষক, লেখক,
অধ্যাপক, শ্রীসুমন পাল ভিক্ষুকে
শ্রদ্ধাসহ—
.
ভূমিকা
“যস্য সূর্যসমা দীপ্তর্যেন লোকঃ প্রকাশিতঃ।
পাবকোহপি মুনেস্তস্য চাস্হিমাত্রঃ জহৌ বপুঃ।”
—বুদ্ধচরিত, সপ্তবিংশ সর্গ
কথাসাহিত্যিক হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত বিরচিত ‘শেষ চিহ্ন’ উপন্যাসটি মূল অর্থে ভগবান বুদ্ধ সম্পর্কিত একটি বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাসনির্ভর লৌকিক দলিল। এই উপন্যাসটিকে কোনভাবেই কল্পতরু বা উপনিষদীয় আখ্যান বলা চলে না। কারণ লেখক তাঁর উপন্যাসে সমসাময়িক স্বপ্ন এবং কল্পনার পরিবর্তে ‘সূত্রধর’-এর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে যুক্তি-বুদ্ধি ও অগ্নিআখরে আসক্ত হয়েছেন। এক্ষেত্রে বলা যায় তাঁর এই সূত্রধরকামী ভূমিকা এক অর্থে নতুন গদ্যভূমি নির্মাণ করেছে। ফলে উপন্যাসটির প্রতি দৃষ্টিপাত করলে তাকে সমৃদ্ধ ও শাখায়িত অবস্থায় পাওয়া যায়। কারণ, তিনি বাস্তবিক অর্থে উপলব্ধি করেছেন সেই অমোঘ সত্য—‘বিসংবাদ, বিকর্ষণ আর্যসত্য জাগ্রত জগতে।’
পালিসাহিত্যে ‘দাঠাবংস’ গ্রন্থটি ধর্মকীর্তি মহাথ রচিত একটি গুরুত্বপূর্ণ কাব্যগ্রন্থ। এই কাব্যগ্রন্থে ভগবান বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণ সম্পর্কিত বিস্তৃত আলোচনা পরিলক্ষিত হয়। হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্তর ‘শেষ চিহ্ন’ উপন্যাসটি ভগবান বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের পরবর্তী সময়কালের এক মর্মস্পর্শী উপস্থাপনা।
এই উপন্যাসটিতে লেখক ইঙ্গিত করেছেন যে স্বপ্ন আর কল্পনা পৃথক হলেও তারা এক ঘরেরই বাসিন্দা, পরিপূরকও বটে। স্বপ্নের পরিশ্রুত বা বিশুদ্ধ রূপ কল্পনার এলাকায় চলে আসে। কল্পনায় যুক্তি বিচার সক্রিয় থাকে, স্বপ্নের অবস্থা সত্য হলেও তা অনেক ক্ষেত্রেই অযৌক্তিক হতে পারে। সেই অর্থে তা সত্য বলেই গ্রাহ্য হয় কিংবা হয় না। স্বপ্ন যেমন সর্বজনের অভিজ্ঞতায় আছে তেমনই অযৌক্তিক ও সর্বমানবিক হয়েও সত্যরূপে প্রতিষ্ঠিত। সাহিত্য বা শিল্পকলা যুক্তির পরিসরকে পেরিয়ে যায় বলেই স্বপ্নের পথে বিচরণ করবার সাহস লাভ করে। এই অর্থে হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্তের সারস্বত কল্পনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে বাস্তব স্বপ্নিল হয়ে ওঠে। ঐতিহাসিকদের কাছে বিষয়টি কিন্তু স্বপ্নে বিচরণ নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রেই কঠিন এবং পাথুরে প্রমাণ ও অভিজ্ঞতাসাপেক্ষ হতে হয়। ‘শেষ চিহ্ন’ উপন্যাসে ইতিহাস ও সাহিত্যের গতায়াতের এই বিষয়টি অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাবেই প্রতীয়মান হয়েছে।
পালি বৌদ্ধসাহিত্যের মতো মহাযান বৌদ্ধসাহিত্য (সংস্কৃত বৌদ্ধসাহিত্য) সেই অর্থে ততটা পরিপুষ্ট না হলেও অলৌকিকতা এবং কল্পনার বিষয়টি সম্পূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে এক্ষেত্রে বাস্তবতাকে সন্ধান বা অনুশীলন করা এক অর্থে অসম্ভব। কিন্তু এই ‘শেষ চিহ্ন’ উপন্যাসটি মহাযানের কল্পনাশ্রয়ীরূপে পরিপুষ্ট হয়নি। কারণ হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত মূল বৌদ্ধসাহিত্য বা পালিসাহিত্যসমূহের একটি অংশকে অত্যন্ত গভীর অর্থে অনুশীলন এবং হৃদয়ঙ্গম করেছেন। ফলে উপন্যাসটি হয়ে উঠেছে পরিশীলিত ভাবনার শীর্ষক অথবা বোধশব্দ। তবে অনেক ক্ষেত্রে মনে হয়েছে এই উপন্যাসটি মূল অর্থে কোনও উপন্যাস নয় বরং ‘সৌন্দরানন্দ’ কাব্যের ন্যায় একটি সুদীর্ঘ গদ্যকাব্য। বাস্তবকে স্বপ্নাচ্ছন্ন করবার কৌশল বা স্বপ্নকে বাস্তবে নিয়ে আসবার ক্ষমতাই বা কতটুকু, তারই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার অভিপ্রায় নিয়ে কথাসাহিত্যিক হিমাদ্রিকিশোর হয়ে উঠেছেন এক অর্থে ‘সূত্রধর’ আবার অন্য অর্থে ‘চারণকবি’।
হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্তের শেষ চিহ্ন উপন্যাসটি ‘কিশোর ভারতী’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। আশা করি, তা গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হওয়ায় বৃহত্তর পাঠক-পাঠিকাদের একাংশ অর্থাৎ যারা তাঁর সাহিত্যকর্মের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত, তাঁরা ভগবান বুদ্ধের জীবনবৃত্তান্ত এবং দন্তধাতু সম্পর্কিত বাস্তবনির্ভর, ইতিহাসনির্ভর ‘শেষ চিহ্ন’ উপন্যাসের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত বা সমৃদ্ধ করতে পারবেন। সর্বোপরি উপন্যাসটির পরিকাঠামো ও ভাষাবিন্যাসের সরলতায় মুগ্ধ ও বিস্মিত হতে হয়। এই উপন্যাসটি কেবল তরুণ পাঠক-পাঠিকা নয়, সকল স্তরের পাঠক সমাজের কাছে আদরণীয় হয়ে উঠুক।
ডঃ সুমন পাল ভিক্ষু
বৌদ্ধশাস্ত্র ও পালিসাহিত্য গবেষক, লেখক, অধ্যাপক
চেয়ারম্যান, বোধিনিধি সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার কালচারাল এসোসিয়েশন
.
লেখকের কথা
কুশীনগরের রাজকাননে শালতরুমূলে ভগবান বুদ্ধের নশ্বর শরীর সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হওয়ার আগেই প্রবল বর্ষণে নিভে গেল আগুন৷ তাঁর দেহের বেশ কিছু অস্থিকে তখনও সম্পূর্ণরূপে গ্রাস করে নিতে পারেনি অগ্নি৷ সেই পবিত্র অস্থির অধিকার নিয়ে উপস্থিত রাজন্যবর্গ আর সঙ্ঘের মধ্যে প্রবল সংঘাত শুরু হয়৷ শান্তিরক্ষার্থে সম্রাট অজাতশত্রু সেখানে উপস্থিত হন৷ কোনও অজ্ঞাতস্থানে স্থানান্তরের জন্য তিনি নিজহাতে সেই পবিত্র অস্থিসকল সংগ্রহ করেন৷ অতঃপর চিতাস্থল থেকে অন্তর্হিত হলেন সকলে৷ উপস্থিত শেষ ব্যক্তি ভিক্ষু ক্ষেম সেই স্থান ত্যাগ করার আগে ভস্মকণা সংগ্রহ করতে গিয়ে ভস্মাধারে খুঁজে পেলেন একটি বস্তু৷ ভগবান বুদ্ধের বাম চক্ষু দন্ত বা ছেদক দন্ত৷
ভগবান বুদ্ধের শেষ চিহ্ন৷ একটি দন্ত৷ আবার নতুন করে রাজন্যবর্গ ও সঙ্ঘের মধ্যে এই দন্তের অধিকার রক্তক্ষয়ী সংঘাতের জন্ম দিতে পারে ভেবে ভিক্ষু ক্ষেম সেই দন্তধাতু নিয়ে কুশীনগর ত্যাগ করে রওনা হলেন কলিঙ্গনগরীর দিকে৷ তার সঙ্গেই শুরু হল হাজার বছর ধরে ভগবান বুদ্ধের শেষ চিহ্নের এক অদ্ভুত পরিক্রমণ৷
প্রাচীন পালি গ্রন্থে যার উল্লেখ আছে৷ বার বার চেষ্টা হয়েছে সেই দন্তধাতুকে ধ্বংস করার৷ চক্রান্ত, যুদ্ধ, নানা বিঘ্নকে অতিক্রম করে, কত রাজ্যের উত্থান-পতনের সাক্ষী হয়ে সেই পবিত্র দন্ত কি শেষ পর্যন্ত কোনও নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছতে পেরেছিল, নাকি প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের জটিল আবর্তে হারিয়ে গিয়েছিল সেই পবিত্র দন্তধাতু? পালি গ্রন্থে ‘দাঠাবংস’ থেকে সংগৃহীত হয়েছে এই উপন্যাসের কাঠামো। কোথাও কোথাও উপন্যাস নির্মাণের প্রয়োজনে কল্পনার আশ্রয় নিতে হয়েছে। প্রাচীন ভারতের প্রেক্ষাপটে রচিত ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস ধারাবাহিক ভাবে প্রায় তিন বছর ধরে প্রকাশিত হয়েছিল কিশোর ভারতী পত্রিকাতে। করোনা বিপর্যয় সহ বেশ কিছু কারণে মাঝে মাঝে অনিচ্ছাকৃত ছেদ পড়েছিল উপন্যাস-প্রকাশে। বহু পাঠক পাঠিকা অপেক্ষা করেছিলেন উপন্যাসটি বই আকারে হাতে পাবার জন্য। তাদের আশা এবার পূর্ণতা লাভ করবে। পরিশেষে বলি, এই বই কোনও ধর্মগ্রন্থ বা ইতিহাসের কষ্টিপাথরে যাচাই করা কোনও ইতিহাসের বই নয়, ইতিহাস আশ্রিত একটি উপন্যাস মাত্র। উল্লিখিত গ্রন্থ ‘দাঠাবংস’, ‘জাতক কাহিনি’, ‘বুদ্ধ দর্শন’ সংক্রান্ত নানাবিধ পুস্তক ও কল্পনা মিলে সৃষ্ট এ উপন্যাস—শেষ চিহ্ন।
পরিশেষে কৃতজ্ঞতা জানাই বৌদ্ধধম্ম বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সুমন পাল ভিক্ষুকে। এই উপন্যাস রচনার সময় তিনি নানানভাবে সাহায্য করে আমাকে কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করেছেন।
হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
শ্রাবণ ১৪৩০






Leave a Reply