ভূত সমগ্র – তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
কয়েক দশক আগে ‘ভূতুড়ে দুপুর’ উপন্যাসটি আনন্দমেলায় প্রকাশিত হওয়ার পর যথেষ্ট সাড়া জাগিয়েছিল খুদে পাঠকদের মধ্যে। ভূত যে কত রকমের হতে পারে, তাদের কাণ্ডকারখানা কী যে অদ্ভুত, নানা রকমের ভূতদের সেই বিচিত্র সব কর্মকাণ্ড বেশ শিহরিত করেছিল শিশুকিশোরদের। সেই উপন্যাসের সঙ্গে আরও একটি ভূতগন্ধী উপন্যাস ও অনেকগুলি গা-ছমছমে গল্প নিয়ে প্রকাশিত হল ‘ভূতসমগ্র’।
BHOOT SAMAGRA
A Collection of Bengali Ghost Stories for Juveniles
by TAPAN BANDYOPADHYAY
Published by Sudhangshu Sekhar Dey, Dey’s Publishing
প্রথম প্রকাশ : কলকাতা পুস্তকমেলা জানুয়ারি ২০১৮, মাঘ ১৪২৪
প্রচ্ছদ ও অলংকরণ : রঞ্জন দত্ত
প্রকাশক : সুধাংশুশেখর দে, দে’জ পাবলিশিং
.
যে এখনও ভূতকে ভয় পেতে শেখেনি
বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
স্নেহভাজনেষু
.
ভূমিকা
যে কোনও কারণেই হোক ভূত বিষয়ে একটা কৌতূহল লালিত হয় প্রতিটি শিশুর মনে। অস্পষ্ট, অথচ ভীতিপ্রদ এক অস্তিত্ব ভূতের। ভীতির সঙ্গে কৌতূহল। রূপকথায় না-দেখা রাজপুত্র-রাজকন্যা নিয়ে যেমনটি গড়ে ওঠে এক ধরনের ভালো-লাগা, সেইসঙ্গে বিপুল অ্যাডভেঞ্চার, ভূত তার বিপরীত মেরুর। ভূতের গল্পে ভালো-লাগার সঙ্গে মিশে থাকে ভয়মিশ্রিত রোমাঞ্চ। মা-মাসি-পিসি বা ঠাকুমা-দিদিমাই হোন, বা সমবয়সি বন্ধুরাই হোক, শিশুমনে ভীতির সৃষ্টি করতে ভূতের আবির্ভাব যুগে যুগে।
ভূতকে আমরা যতই অবিশ্বাস করি না কেন, ভূত সারা পৃথিবী জুড়ে বসবাস করে। পৃথিবীর সব ভাষায় ভূতের গল্প লেখা হয়, সেই সব ভূতের গল্প পড়তে পড়তে শিরশির করে ওঠে গা। ফরাসি ভাষায় ভূতকে বলে রেভেনা (revenant), অর্থাৎ যে ফিরে এসেছে মৃত্যুপুরী থেকে। ইংরেজিতে ঘোস্ট, অফ ডেড পারসন অ্যাপিয়ারিং টু বি লিভিং। তাই তো মপাশার মতো লেখক লেখেন ‘হু নোজ’-এর মতো সাংঘাতিক ভূতের গল্প, আবার এডগার অ্যালান পো লেখেন ‘দি ফল অফ দি হাউস অফ আশার’ কিংবা ই এম ফস্টার লেখেন ‘দি স্টোরি অফ সাইরেন’।
‘হু নোজ’ গল্পটার কথাই বলি, এটি এক যুবকের গল্প যে একদিন ‘সিগার্ড’ নামে একটি নাটক দেখে প্যারিসে নিজের বাড়ি ফিরতে গিয়ে কেন কে জানে মুখোমুখি হল ভৌতিক পরিবেশের। যে-বাড়িতে তার আগে দশ বছর বাস করেছে সেই বাড়িই হঠাৎ রাতারাতি পরিণত হয়েছে এক ভূতের বাড়িতে। ভয়ংকর সব ঘটনা ঘটতে লাগলে তার চোখের সামনে। ভূতের হাত থেকে বাঁচতে গেল ইটালিতে, সেখানেও কিন্তু ভূতের উপদ্রব। শেষপর্যন্ত সে একটি বেসরকারি উন্মাদ-আশ্রম গিয়ে নিজেকে রক্ষা করে।
এত-এত ভূতের গল্প লেখা হয়, তবু ভূত সত্যিই আছে, না কি নেই, তা নিয়ে মানবসমাজে গবেষণার অন্ত নেই। অথচ ভূতের অস্তিত্ব সারা পৃথিবী জুড়ে। কোনও একটা পোড়োবাড়ি, দীর্ঘদিন বন্ধ হয়ে থাকা কোনও পরিত্যক্ত ফ্ল্যাট, গ্রামাঞ্চলের নির্জন শ্মশান-এরকম কিছু জায়গা ঘিরে গড়ে ওঠে ভূতের অস্তিত্ব।
শৈশব-কৈশোর হল মানবমনের সবচেয়ে নরম সময়কাল, এই সময়কালেই একজন শিশু বা একজন কিশোরের কাছে যে কোনও ভাবেই হোক পৌঁছোয় এই রহস্যের অস্তিত্ব। এক-একজনের কাছে ভূতের জীবনকাহিনি পৌঁছয় এক-একরকম ভাবে। রাতের বেলা ঘুমপাড়ানি গান শুনে যেমন ছোটোদের চোখে এসে বসে ঘুমপরিরা, তেমনই কখনও রূপকথা, কখনও ভূতের গল্প হয়ে ওঠে ঠাকুরমা-দিদিমা, মা-মাসি-পিসিদের কাছে ছোটোদের চোখে ঘুম নিয়ে আসার প্রধান অস্ত্র। এভাবেই কোনও না কোনও অভিভাবকের মুখ থেকে ছোটোরা সন্ধান পায় ভূতের গল্পের। একটি গল্প শোনার পর শিশু বা কিশোরমন উদবেল হয়ে ওঠে ভয়ে, বিস্ময়ে, উদ্বেগে, অনুসন্ধিৎসায়। তার পরেই তার কণ্ঠে শোনা যায় আবদার, ‘আর একটা বলো’।
তবে শহর ও গ্রাম দুই পটভূমিতেই বাস করার ফলে আমার অভিজ্ঞতা বলে যে, শহরের চেয়ে গ্রামদেশই পছন্দ করে ভূতরা। শহরের পটভূমিতে বড়ো হওয়া বাচ্চারা তেমন উপলব্ধি করতে পারে না ভূতের অস্তিত্ব, হয়তো এত-এত মানুষের ভিড়ে ভূতেরা তেমন কায়দা করতে পারে না, হয়তো এত আলো, এত বাস-ট্রাম-গাড়ির শব্দে অতিষ্ঠ হয়ে থাকে ভূতরা, বেশি দৌরাত্ম্য করার সুযোগ নেই তাদের। ফলে শহুরে বালক হেলায় উড়িয়ে দেয় ভূতকে, ধুর, ও সব ভূত-ফুত কিছু নেই।
ইদানীংকার শিশু-কিশোররা অবশ্য ঢের বুদ্ধিমান কেন না আধুনিক মা-মাসি-পিসিরা ছোটোদের জীবনের শুরু থেকেই ভূত সম্পর্কে কোনও ভয়ের ধারণা গড়ে উঠতে দেন না। তবে গ্রামবাংলায় এখনও ভূতের কথা শোনা যায়। কেউ বলে ভূত দেখেছে, ‘ওই যেন কী একটা নড়ল ছায়ার মতো’, বেশিরভাগই বলে, ‘কখনও দেখিনি, তবে শুনেছি’, এভাবেই ভূতের অস্তিত্ব আজও বিরাজমান।
আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা একেবারেই অন্যরকম। শৈশব-কৈশোর কেটেছে গ্রামবাংলায়, সেখানে কী কারণে যেন প্রায়শ কাউকে না কাউকে ভূতে পেত, একবার ভূতে ধরলে সহজে ছাড়ত না। দূর-দূর গ্রাম থেকে বিকটদর্শন ওঝারা এসে নানা কেরামতি দেখাত ভূতের হাত থেকে ভূতগ্রস্তকে রেহাই দিতে। কিম্ভূত ধরনের মন্ত্রও যেমন পড়ত, তেমনই নানাভাবে শারীরিক অত্যাচার করে তাড়াতে চাইত ভূত। আমরা বন্ধুরা দল বেঁধে অনেকবার এই ভূত তাড়ানোর প্রক্রিয়া দেখতে গেছি ও ভূতের সঙ্গে ওঝার চরম দ্বৈরথের সাক্ষী। এই সংকলনে তিনটে গল্প রেখেছি সেই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার প্রকাশ ঘটাতে।
অনেকেই মত প্রকাশ করেন ভূতের গল্প যেন এমনভাবে লেখা না হয় যাতে ভূতের অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। ভূত আছে কি নেই তা নিয়ে বহু মানুষের মনে আজও প্রবল বিতর্ক। তবে দেশ-বিদেশের বহু খ্যাতনামা লেখক হাড় হিম করা ভূতের গল্প লিখেছেন, সেখানে কিন্তু ভূতের অস্তিত্বই দেখানো হয়েছে, সেগুলি পড়ে পাঠকও মোহিত।
অতএব ভূত থাকুক না থাকুক, ভূতের গল্প থাকুক।
প্রকৃত তথ্য এই যে, ছোটোরা আজও ভূতের গল্প পড়তে পছন্দ করে, পত্রপত্রিকার সম্পাদকরাও ভূতের গল্পের বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেন, প্রকাশকরাও স্বচ্ছন্দ বোধ করেন ভূতের গল্পের বই ছাপতে
এই সংকলনের গল্পগুলি নানা সময়ে লেখা হয়েছিল, সবগুলোই পত্রিকা- সম্পাদকদের অনুরোধে। তবে ভূতুড়ে দুপুর’ উপন্যাসটি আমার প্রথম ছোটোদের লেখা, নিজের তাগিদেই, প্রকাশিত হয়েছিল নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী সম্পাদিত ‘আনন্দমেলা’য়। এই পর্যায়ের শেষ লেখা ‘অলিন্দে অশরীরী’ প্রকাশিত এ বছরের শারদীয়া ‘ঝালাপালা’য়।
অতিসম্প্রতি হার্ড ডিস্ক বসে যাওয়ায় আমার বহু লেখা চলে গেল কালের গর্ভে। কমপিউটারে থাকে বলে কপি রাখার অভ্যাস নেই, অতএব কয়েকটি ভূতের গল্পও গ্রাস করলেন মহাকাল। হাতের কাছে যতগুলি ভূতের গল্প পাওয়া গেল, সেগুলি একত্রিত করে এখন প্রকাশিত হল দুই মলাটের মধ্যে।
তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
৮ জানুয়ারি ২০১৮
.
বড়োদের লেখক হিসেবে তপন বন্দ্যোপাধ্যায় সুপরিচিত হলেও ছোটোদের জন্যও লিখে চালেছেন একের পর এক ছড়া-কবিতা-গল্প-উপন্যাস। গত চার দশকের সাহিত্যজীবনে এখনও পর্যর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে ন-টি কবিতার বই, গ্রন্থিত হয়েছে সাড়ে তিনশোরও বেশি ছোটোগল্প, বড়োদের ও ছোটোদের মিলিয়ে ঘাটটিরও বেশি উপন্যাস, তা ছাড়াও তিরিশটি রহস্য উপন্যাস। অনুবাদ ও সম্পাদনার কাজও করেছেন নানা সময়ে। প্রকাশিত হয়েছে ভ্রমণ ও প্রবন্ধের বইও। ছোটোদের জন্য লিখেছেন বারোটি উপন্যাস, ও বহু গল্প।
সুন্দরবনের একশো বছরের ইতিহাস অবলম্বনে লেখা তিনখণ্ডে প্রকাশিত নদী মাটি অরণ্য’ উপন্যাসের জন্য লেখক পেয়েছেন রাজ্য সরকারের বঙ্কিম পুরস্কার। “মহুলবনীর সেরেঞ চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ কাহিনিকার: হিসেবে পেয়েছেন বি এফ ডে এ পুরস্কার। তা ছাড়াও পেয়েছেন অসংখ্য ছোটো-বড়ো নানা পুরস্কার। সম্প্রতি পেয়েছেন বাংলাদেশের টাঙ্গাইলের বিখ্যাত পত্রিকা ‘অরণি’-র তরফ থেকে পুরস্কার। কিশোর সাহিত্যের জন্য ‘পত্রভারতী’ থেকে ২০১১তে পেয়েছেন দীনেশচন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার।
এ ছাড়া বহু সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান দিয়েছে সম্মাননা ও সংবর্ধনা।
সাহিত্য আকাদেমির আমন্ত্রণে ভারতীয় লেখক হিসেবে চিনের আন্তর্জাতিক বইমেলায় দিয়েছেন দুটি বক্তৃতা। চারবার গিয়েছেন বাংলাদেশের নানা প্রতিষ্ঠানের কবিসম্মেলন ও আলোচনাসভায়।




নমস্কার, ও ঘরে কেউ আছে- রিমি মিত্র-র রিকোয়েস্ট রইল
ধন্যবাদ