উপন্যাস
গল্প
উপন্যাস

অ্যান্টেনা আন্টি – তপন বন্দ্যোপাধ্যায়

অ্যান্টেনা আন্টি

পাপানদের স্কুলের যাতায়াতের পথে পড়ে বিশাল এলাকা জুড়ে উঁচু পাঁচিল ঘেরা একটা গোরস্থান। বহুকাল আগের তৈরি, চটলা-ওঠা পাঁচিলের কোথাও কোথাও ফাটল। সেই ফাটলের ভিতর চোখ সেঁধিয়ে দিলে দেখা যায় অসংখ্য যোগচিহ্ন। প্রতিটি যোগচিহ্নের নীচে একটা করে সিমেন্টের বেদি। সেই বেদিগুলোর কোনওটা নতুন, কোনওটা পুরনো, কোনওটা আবার এতই কালচে রঙের যে দেখেই মনে হয় কোন আদ্যিকালের।

পাঁচিলের গেটের ওপরে একটা বড়ো সাইনবোর্ড ধরনের, তার ভিতর অস্পষ্ট হয়ে আসা অক্ষরে লেখা ‘দ্য অ্যাঞ্জেল সিমেট্রি’।

যাওয়া আসার পথে কখনও পাপান দেখে সাহেব-মেমরা হাতে লাল গোলাপের তোড়া নিয়ে ঢুকছেন, আবার কখনও দেখে কেউ বেরোচ্ছেন চোখ মুছতে মুছতে।

পাপানের অনেকদিনের শখ গোরস্থানের মধ্যে ঢুকে একবার দেখে আসে সমস্ত কবরগুলো। কিন্তু একা যেতে সাহসে কুলোয় না, একদিনের স্কুলে যাওয়ার পথে তার স্কুলসঙ্গী রুবুকে বলল, চল না দেখে আসি ভিতরটা। খুব দেখতে ইচ্ছে করে আমার।

রুবু মুখে কীরকম ভঙ্গি করে উঠে বলল, আমার খুব ভয় করে।

পাপান হেসে উড়িয়ে দেয়, ভয় কীসের? প্রায়ই তো দেখি ভিতরে যায় সাহেব-মেমরা।

রুবু বলল, তোর সাহস থাকে তুই যা। আমি যাচ্ছি না। কী জানি ভিতরে ভূতটুত থাকে কি না!

পাপান বলল, আমি তো যেতেই পারি। কিন্তু কোনও জায়গায় অনেকে মিলে গেলে দেখার আনন্দ অনেক বেশি। সেবার আমরা দিঘায় গেলাম বাইশজনে মিলে। কী হইচই কক’-দিন।

রুবু বলল, দিঘা এক, আর সিমেট্রি আর এক। তোর সাহস থাকে তুই যা। আমি যাচ্ছি না।

কী জানি ভিতরে ভূতটুত থাকে কি না।

পাপান বলল, আমার ভয়টয় কিচ্ছু নেই। ঠিক আছে আজই বিকেলে বাড়ি ফেরার সময় দেখে আসব সিমেট্রিটা।

সত্যিই সেদিন বিকেলে ফেরা সময় রুবুকে বলল, তুই আজ চলে যা, রুবু। আমি আধঘণ্টা পরে বাড়ি ফিরব। দেখিই না কী আছে ভিতরে!

পাঁচিলের গেটের কাছে একটা চেয়ারের ওপর বসে আছে একজন গোঁফওয়ালা লোক, মাথার চুল কাঁচাপাকা। পাপান জানে এই লোকটি সিমেট্রির পাহারাদার। সে নিশ্চয় পাপানকে ভিতরে ঢুকতে দেবে না। পাপান অতএব অপেক্ষা করতে থাকে কিছুটা দূরে। সবাই জানে লোকটি নামেই পাহারাদার। প্রায় এ-কাজে ও কাজে চলে যায় গেট ছেড়ে। সেরকমই হঠাৎ চেয়ার ছেড়ে উঠে কোথাও যেতেই পাপান লোহার গেট ঠেলে ঢুকে পড়ল ভিতরে।

গোরস্থানের ভিতরে ঢুকে পাপান হতবাক। বাইরে পাঁচিলের ফোকর থেকে যেরকম দেখা যায়, তার চেয়ে ঢের ঢের সুন্দর ভিতরটা। সামনে কিছুটা ফাঁকা জায়গা, সেখানে সবুজ মিহি ঘাস। তার ওপর হাঁটতে গিয়ে কী নরম একটা অনুভূতি। এপাশে-ওপাশে অনেক রকমের ফুলগাছ। লাল, নীল, হলুদ, মেরুন— কত রঙের ফুল! বেশ একটা ভালোলাগা অনুভূতি সবখানেই।

পাপান এগিয়ে গেল আরও ভিতরে। কত কবর হবে ভিতরে! ষাট, সত্তর, আশি, একশো, দুশো? পরপর দশটা সারি, সেই সারি চলে গেছে অনেকটা দূর পর্যন্ত। কোনও কোনওটা নতুন পুরনোই বেশি। কিন্তু যেগুলো পুরনো তাও বেশ পরিষ্কার করা। কিছু কিছু কবরের ওপর টাটকা গোলাপের তোড়া। লাল, ফিকে লাল, গোলাপি – কত রঙের গোলাপ। তবে একটাও শুকনো ফুল নেই। তার মানে শুকিয়ে গেলেই সেগুলো সরিয়ে ফেলা হয়।

পাপান দুলকি চালে হেঁটে চলেছে কবরগুলো ডাইনে বাঁয়ে রেখে। তার ইচ্ছে কবরগুলো একেবারে শেষ পর্যন্ত ঘুরেফিরে দেখতে। রোজ রোজ তো আর আসা হবে না। সারি সারি কবরগুলো কী সুন্দর লাগছে! যেন শুয়ে আছে পাশাপাশি।

ভাবনাটা মাথায় আসতে পাপানের মনে হল সত্যিই তো পাশাপাশি শুয়ে আছে এতগুলো কবরের নীচে কত মানুষ। প্রতিটি কবরের সামনে একটা ফলকে লেখা রয়েছে মানুষগুলোর নাম, তাদের জন্ম ও মৃত্যুর তারিখ। পাপান ফলকগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে কয়েকটা নাম পড়ল নিচু হয়ে। কেউ রবিনসন, কেউ অ্যানি, কেউ টমাস, কেউ—

হাঁটতে হাঁটতে পাপানের চোখে পড়ল দূরে একজন মহিলা ইতস্তত বিচরণ করছেন কবরগুলোর আশপাশে। পরনে পায়ের পাতা পর্যন্ত লম্বা গাউন। ঘন বাদামি রঙের গাউনে ভারী সুন্দর। দেখাচ্ছে মহিলাকে। পাপান চাইল তার সঙ্গে আলাপ করতে। নিশ্চয় তাঁর কোনও প্রিয়জন এখানে কোনও কবরের মধ্যে শুয়ে আছেন। তার কবরে ফুল দিতে এসে ঘুরছেন এলোমেলো।

পাপান দ্রুত পা চালিয়ে গেল তাঁর কাছে। মহিলার বয়স অনেকটাই। বয়সের কারণে একটু ঝুঁকে হাঁটছেন সামনের দিকে। মাথায় সাদা ধবধবে চুল দুলছে কাঁধের ওপর পর্যন্ত। চোখদুটো একটু কোটরে বসা। মাঝেমাঝে এদিকে-ওদিকে তাকাচ্ছেন কেন যেন! পাপানের দিকে চোখ পড়তেই হাসলেন, হাউ আর ইউ, ডিয়ার?

পাপান মুগ্ধ হল তাঁর মিহিকণ্ঠের সম্ভাষণ শুনে, হেসে বলল, আই অ্যাম ফাইন। বলেই বলল, আপনাকে আমি কী নামে ডাকব, আন্টি?

খুব ঝটিতি উত্তর, মাই নেম ইজ অ্যান্টেনা। তুমি আমাকে অ্যান্টেটা আন্টি বলে ডেকো।

—অ্যান্টেনা আন্টি! বাহ্, পাপান খুব খুশি হল নামটা শুনে। পরক্ষণে জিজ্ঞাসা করল, আপনি নিশ্চয় অপেক্ষা করছেন কারও জন্য?

—হ্যাঁ, আমার হাজব্যান্ড একটু পরেই আসবেন। রোজ সন্ধে হলে আমরা দু’জনে এই জায়গাটায় গল্প করতে করতে ঘুরি।

পাপান ভাবল জিজ্ঞাসা করে, তাঁরা দুজনে নিশ্চয় কোনও প্রিয়জনের কবর দেখতে আসেন। কিন্তু এখনই বলল না, বললে হয়তো আন্টির মন খারাপ হয়ে যাবে। বরং জিজ্ঞাসা করল, আপনারা কোথায় থাকেন, আন্টি?

অ্যান্টেনা আন্টি হাসলেন, বললেন, আমি থাকি ওই কবরটার নীচে, আর আমার স্বামী তার পাশের কবরটার নীচে। সারাক্ষণ মাটির নীচে থাকতে কি ভালো লাগে? তাই সন্ধে হলেই বেরিয়ে পড়ে গল্প করি দু’জনে। ওই তো, আমার হাজব্যান্ড এতক্ষণে বেরোলেন।

পাপান তাকিয়ে দেখে একটু দূরেই একজন কোর্টপ্যান্ট পরা সাহেব খুব শ্লথ পায়ে আসছেন তাদের দিকে। পাপানের গলা, জিব সব শুকিয়ে কাঠ। কী করবে ভেবে পেল না। হঠাৎ শরীরের সমস্ত শক্তি সঞ্চয় করে ছুট ছুট ছুট—

প্রাণপণে দৌড়ল যতক্ষণ না এক লাফ দিয়ে বেরোতে পারল সিমেট্রির গেটের বাইরে। বেরিয়েও থামতে পারল না। ছুট ছুট ছুট—

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *