চার
নীচের রাজবাড়ি একেবারে অন্যরকম। যাকে বলে রাজকীয় পরিবেশ। বিশাল বিশাল ঘর, প্রতিটি ঘরের ওপরে নানা আকারের মস্ত মস্ত ঝাড়লণ্ঠন।
ঘনশ্যাম বলল, স্যার, নীচের ঘরগুলোর তিনটে অংশ। একটা দরবার মহল, একটা অন্দর মহল, একটা নাচ মহল। যেখানে এখন দাঁড়িয়ে আছেন, এইটে, স্যার দরবার মহল। দরবার মহলের আবার তিনটে ভাগ—অপেক্ষা ঘর, দরবার ঘর আর আপ্যায়ন ঘর। যে অংশে বাইরের অতিথি বা প্রজারা এসে অপেক্ষা করত, তার নাম অপেক্ষা ঘর। ঠিক এখন আপনারা যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন, সেটিই অপেক্ষাঘর। ওই দেখুন ছোটো ছোটো তিরিশ-পঁয়ত্রিশটি চেয়ার চারপাশের দেওয়াল ঘেঁষে রাখা। সেগুলোতে বসতেন রাজার কাছে যারা দর্শনার্থী আসতেন।
—অপেক্ষা ঘরের একপাশে দরবার ঘর, অন্যপাশে আপ্যায়ন ঘর। দরবার ঘরে বসে প্রজাদের সুবিধা-অসুবিধার কথা শুনতেন রাজাবাবু। এই যে-
গাইডের পিছু পিছু গার্গীরা পরের ঘরে। দরবার ঘরটা পেল্লাই। অনায়াসে একটা লন টেনিস কোর্ট হয়ে যাওয়ার কথা। তার মধ্যে সারি সারি অনেকগুলো হাতল-অলা চেয়ার। কয়েকটা বড়ো বড়ো সোফা। তাও পুরোনো আমলের। সব মিলিয়ে বেশ রাজকীয় চেহারার রাজবাড়ির দরবার মহল।
আর আপ্যায়ন ঘরের ঠিক মাঝখানের ছাদে একটা বিশাল ঝাড়লণ্ঠন। ঘরের ভিতর প্রচুর কাঠের আসবাব, সবই বার্মাটিকের, অন্তত সাত-আট সেট সিংহাসনের মতো দেখতে কাঁধ-উঁচু সোফা সেট। সবই সেই পুরনো আমলের। এখন ঝাড়পোঁছ করে রাখা পর্যটকদের জন্য। একটা সিংহাসনও আছে, সেটি নিশ্চয় রাজার ব্যবহারের জন্য। ঘরের এক কোণে একটা মস্ত পিয়ানো, একও অ্যান্টিক।
ঘনশ্যাম পরক্ষণে বলল, আসুন স্যার, এখনও অনেক কিছুই তো দেখা বাকি। বেশি দেরি করলে ওদিকে রাজবাড়ির ফটক বন্ধ হয়ে যাবে। এই ঘরটায় আসুন, এটা রাজবাড়ির নাচঘর।
ঘড়িতে তখন সাড়ে পাঁচটা। আর মাত্র আধঘণ্টা সময় বাকি। দরবার ঘরের উত্তর দিকে আর একটা বড়ো আকারের ঘর, দরজা খুলতেই সেই ঘরের সজ্জা বিস্মিত হওয়ার মতো। মাঝখানে একটা বিশাল অংশ ফাঁকা। গার্গী বলল, বড়ো হোটেলের ব্যালেরুম দেখেছি, বড়ো বারের ডান্স ফ্লোর দেখেছি, কিন্তু রাজবাড়ির নাচঘর কখনও দেখিনি।
ঘরটা দরবার ঘরের চেয়ে একটু ছোটো, তার মাঝখানে অনেকখানি জায়গা ফাঁকা, তার চারপাশে দেওয়াল ঘেঁসে বিছোনো কুড়ি-পঁচিশটি সুদৃশ্য রঙিন মখমলের রং সোনালি। সেটিতে নিশ্চয় রাজামশাই বসতেন। নাচঘরের সিলিং থেকে ঝুলছে প্রায় একই মাপের একটি ঝাড়লণ্ঠন। এই ঝাড়লণ্ঠনের একটি বিশেষত্ব আছে। তার স্ফটিকখণ্ডগুলি নানা রঙের। সন্ধের পর জ্বেলে দিলে নিশ্চয় বিচ্ছুরণ ঘটবে অনেকগুলো রং।
—এখন জ্বলে?
কিন্তু ঘনশ্যাম বলল, না, স্যার। এই ঝাড়লণ্ঠনটা এখন আর জ্বলে না। শুনেছি যখন জ্বলত, ঘরের মধ্যে শুধু রামধনুর রং।
নাচঘরের ওপরের চার দেওয়াল থেকে ঝুলছে ব্যালকনির মতো সরু বারান্দা। সেটা দেখিয়ে ঘনু বলল, স্যার, নাচের আসর যেদিন বসত, ওখানে বসতেন রাজবাড়ির যাবতীয় মহিলারা।
গার্গী এতক্ষণে মুখ খুলল, বলল, রাজস্থানের রাজপ্রাসাদের মধ্যেও এরকম দেখেছি। তবে তখনকার মহিলারা পর্দানশিন ছিলেন বলে বসার জায়গার চারপাশে ঝরোকা লাগানো থাকত যাতে মহিলাদের মুখ না দেখা যায়।
—স্যার, নাচঘরের নাচ নিয়ে নাকি পরের দিকে খুব অশান্তি হত।
— কীরকম?
—রাজাবাবুরা বাইরে থেকে বাইজি এনে নাচঘরে নাচের আসর বসাতেন।
নাচঘরের বিশেষত্ব দেখানো শেষ করে ঘনশ্যাম রাজবাড়ির উত্তরদিকে নাচঘর, তার ঠিক তার বিপরীতে, দক্ষিণে রাজার মহল। বিশাল তিনটি বেডরুম, একটি ঘরের সঙ্গে মস্ত সাজঘর, সাজঘরের কেতা অনেক পুরোনো যুগের, কিন্তু সে যুগের সাজের রকমে ছিল অন্য বৈচিত্র্য।
সেই ঘরের সংলগ্ন একটা বড়োমাপের স্নানঘর। প্রায় নৌকোর মাপের একটা বাথটব, এখন শুকনো খটখটে, তবু বাথটবের কিনারে একটা সোপকেস, তার মধ্যে দুটি বাহারি সাবান যার মোড়ক খোলা হয়নি এখনও। সাবান দুটো কিন্তু একেবারেই পুরোনো আমলের।
ঘনশ্যাম বলল, স্যার, ট্যুরিস্টদের দেখানোর জন্য রাখা আছে।
ঘরগুলো দেখানো হয়ে গেলে ঘনশ্যাম বলল, স্যার, এক ঘণ্টা হয়ে গেছে, এবার আমি যাব। গার্গী ঘড়ি দেখে বলল, এর মধ্যে এক ঘণ্টা পার হয়ে গেল!
সায়ন এতক্ষণ ধরে কিছু একটা শুনতে চাইছিল, হঠাৎ বলল, ঘনশ্যাম, এখন বাইরের লোকজন কিরকম থাকতে আসে এ বাড়িতে?
ঘনশ্যাম ইতস্তত করে বলল, আগে অনেক লোকজন আসত, দু-দিন তিনদিন ধরে থাকত, একটা ক্যান্টিন ছিল বাইরে। খুব বিক্রিবাটা হত। এখন ট্যুরিস্ট প্রায় আসে না বললেই চলে।
—কেন, আসে না কেন?
ঘনশ্যামের অভিব্যক্তিতে বেশ অস্বস্তি, বলল, ও কিছু না। নানা লোকে নানা রটনা করে। গার্গী বলে উঠল, সেই রটনাগুলো তুমি তো জানো। আমরা একটু শুনি।
ঘনশ্যাম ব্যস্ত হয়ে বলল, না স্যার। রটনা রটনাই। সে সব বললে আর কেউ এই রাজবাড়িতে বেড়াতে আসবে না।
সায়ন বলল, ঠিক আছে, আমরা কাউকে বলতে যাব না। আমরা কিছুটা শুনেছি, সেটা কতটা সত্যি কতটা মিথ্যে তা যাচাই করে নিই।
—স্যার, আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে। আমার টাকাটা যদি দিয়ে দেন।
—ও, হ্যাঁ, সায়ন তাকায় গার্গীর দিকে, তারপর হেসে পকেট থেকে পঞ্চাশ টাকা বার করে ঘনশ্যামের হাতে দিতে টাকাটা নিয়ে চলে যাবে এমন সময় রাজবাড়ির ভিতর থেকে হঠাৎ বেরিয়ে এল তিন আধুনিক চেহারার যুবক।
ঘনশ্যাম বলল, স্যার, এঁরা তিনজন কাল থেকে আছেন রাজবাড়িতে।
