পাঁচ
হুঁ-পু তার লম্বা লম্বা ঠ্যাং ফেলে মাঠ পেরিয়ে চলল অন্যদিকে। বাইরে তখন সন্ধেরাত, বড়ো বড়ো বুনো আমগাছগুলো ঝাপসা হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে ভূত হয়ে, কালো অন্ধকারের রাশ তার উপর হুমড়ি খেয়ে জড়িয়ে ধরেছে। লম্বা তালগাছগুলো যেন ভূতের ঠ্যাং এক-একখানা। কড়াইমণ্ডির জঙ্গলের যে ডাঁশা কুল আর বৈঁচির বাগান তাদের অতীব প্রিয় ছিল, এখন এই অন্ধকারে তাদের এক-একটা পো-ভূত বলে মনে হল।
বাইরে এসে অন্ধকার ঘন হয়ে গেছে দেখে বাড়ির কথা মনে পড়ল সন্টুর। বিল্টুদার সঙ্গে কতক্ষণ কথা বলতে পারেনি, কেবল ইশারায় কাজ চলছে। এতক্ষণে বাড়িতে খোঁজাখুঁজি শুরু হয়ে গেছে নিশ্চয়ই। সেই যে দুপুরে রেনট্রি গাছের গুঁড়িতে জম্পেশ করে ঠেস দিয়ে গল্পের বই পড়ার বিলাস নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল, তারপর সাত-আট ঘণ্টা যাবৎ তাদের এই নিপাত্তা নির্ঘাত হুলস্থুল বাধিয়ে দিয়েছে। হয়তো কান্নাকাটিও পড়ে গিয়েছে এতোক্ষণ। কিন্তু উপায় কী! সে যে এই কড়াইমণ্ডির জঙ্গলে বুনো আম, ডাঁশা কুল আর ডাকপাখির খোঁজে এসে ভূতের পাল্লায় পড়ে হাঁসফাস করছে তা তো কেউ জানে না। তার ছোটোবোন রুনু ভাবতেই পারবে না, ঠাকুমার মুখে যে ভূতপেনির গল্প শুনতে শুনতে ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে সে ঠাকুমার কোলের মধ্যে ক্রমশ সেঁধিয়ে যায়, সেই ভূতের রাজ্যে সে দিব্যি ঘুরে বেড়োচ্ছে এতোলবেতোল ভাবে। যদিও তাদের প্রাণটা এখন ভূতদের হাতের মুঠোয়।
কিছুক্ষণ পর সন্টু আর বিল্টুদা বুঝতে পারল তারা কড়াইমণ্ডির জঙ্গল পেরিয়ে এসে পড়েছে তাদের পাশের পাড়ায়, মানে পশ্চিমপাড়ায়। পাড়ার একপ্রান্তে চৌধুরিদের বাড়ি, তার পাশে একটা আমবাগান, বাড়ির ঠিক পিছনে খিড়কি-দরজার সামনা-সামনি শান-বাঁধানো পুকুর। অবাক হয়ে ওরা দেখল, আরো কয়েকটা ছায়ামূর্তি আমগাছের ডালে বসে রয়েছে। সন্টুর মনে পড়ল, আরে এই গাছের তলাতেই তো তারা জষ্টিমাসের ঝড়ে আম কুড়োতে আসে। বোরখা-ঢাকা মুখেই একবার চোখাচোখি করে নিল দুজনে।
তবে হ্যাঁ, পদিপিসি একবার একটা গল্প শুনিয়েছিল বটে। এই চৌধুরিদের আমবাগানে কবে একবার কালবোশেখির ঝড়ে পদিপিসিরা তাদের ছোটোবেলায় আম কুড়োতে এসেছিল। তাদের ছ-সাতজনের হাতেই ছোটো ছোটো থলে, আর একটা লম্বা কালো বুড়োপানা লোক একটা ঢাউস বস্তা নিয়ে তাদের সামনে সামনে রয়েছে। তুমুল ঝড় উঠেছে সেদিন, ডালগুলো যেন আছড়ে ভেঙে পড়বে মাটিতে, আমও পড়ছে ঢপঢপ, বেশ শব্দ শোনা যাচ্ছে চারপাশে, ছেলেমেয়েরা সিঁদুররং আমের চেহারাও দেখতে পাচ্ছে, কিন্তু কুড়োতে পারছে না কেউ। যে আমটাই মাটিতে পড়ে, গড়িয়ে চলে যায় বুড়োর বস্তার সামনে, আর বুড়ো মহানন্দে টপাটপ কুড়িয়ে নিচ্ছে তার বস্তায়। একটু পরেই বুড়োর বস্তা ভর্তি হয়ে গেল, পলকের মধ্যে ঝড়ও গেল থেমে। সময়টা ছিল ভোরবেলা, তখনো অন্ধকার পুরো কাটেনি, তার মধ্যে সেই বুড়ো বস্তাভর্তি আম পিঠে ফেলে লম্বা পায়ে মিলিয়ে গিয়েছিল। আর পাড়ার ছেলেমেয়েরা থোতামুখ ভোঁতা করে বাড়ি ফিরে এসেছিল খালি থলি হাতে নিয়ে।
কিন্তু সে পদিপিসির ছেলেবেলার কথা। তাঁর অল্পবয়সের অনেক গাঁজাখুরি গল্পের মতো এটাকেও তারা গপ্পো বলে উড়িয়ে দিয়েছিল। এখন সেই গাছের ডালে-ডালে ভূতের সমাহার দেখে সন্টু ঢোক গিলল, হয়তো বিল্টুদাও তার পোশাকের ভিতর জিব কামড়াচ্ছে। ওরা মরে গেলেও আর কখনো চৌধুরিদের আমবাগানে আম কুড়োতে আসবে না।
হুঁ-পু পুকুরের পাড়ে একটা আমগাছ বেছে নিয়ে তার মগডালে চড়ে বসল, এমনভাবে ঠ্যাংটা মাটিতে ঝুলিয়ে দিল যে সেটা প্রায় মাটি ছুঁয়ে ফেলেছে। শুধু তাই নয়, পট করে নিচু হয়ে দু’হাতে বিল্টুদা আর সন্টুকে সাঁ করে তুলে নিল গাছের উপর। মগডালে বসে সন্টু সজোরে ডালটা চেপে ধরলো, ফসকালেই হয়েছে আর কি। গাছের এতটা উঁচুতে সে কখনো ওঠেনি। নীচের দিকে তাকিয়ে তার বুক ঢিপঢিপ করতে লাগল। গাছের ওপর থেকে চৌধুরিদের বাড়ি প্রায় সবটাই দেখা যায়। খিড়কিদরজা থেকে পুকুরের পথ, পুকুর সবই স্পষ্ট। সামনের আমগাছে আর একটা ছায়ামূর্তি বসে আছে, তার ধরনধারণ দেখে মনে হল সে যেন শিকারের অপেক্ষায় ওঁত পেতে বসে, তার মুখের ওপর থেকে আলখাল্লার ঢাকনা সরানো, আর কঙ্কাল হলেও সন্টুর মনে হল মুখের আদলটা চেনা-চেনা, একটু পরেই মনে পড়ল, ওহো, এ তো সেই চাটুজ্জেবাড়ির বুড়ো-ভূতটা, যার সম্পর্কে চৌধুরিবাড়ির সেজদাদুর কমপ্লেন ছিল।
বসে আছে তো বসেই আছে। হুঁ-পুর মতলবখানা ওরা ঠাহর করতে পারছে না। হঠাৎ সন্টু দেখল, চৌধুরিবাড়ির খিড়কিদরজা খুলে কলসি নিয়ে জল আনতে আসছে ও-বাড়ির ছোটোবউ। চৌধুরীবাড়িতে যাতায়াত আছে বলে সন্টু ছোটোবউকে চেনে। ভারী শান্ত আর মিষ্টি স্বভাবের। এই রাতের বেলা ঘরের মেয়ে-বউ-রা সাধারণত পুকুরঘাটে একলা আসে না। তাই একটু উদ্বিগ্ন হল সে।
ছোটোবউ পুকুরঘাটে আসতেই চাটুজ্জেবাড়ির বুড়োভূতটা আমগাছ থেকে একলাফে নিচে নামল, তারপর শিকারের দিকে এগোনোর মতো তড়ি-ঘড়ি লম্বাপায়ে ধাওয়া করল ছোটোবউ-এর পিছনে।
বুক কাঁপতে লাগল সন্টুর। সর্বনাশ! ছোটোবউটা একদম বুঝতে পারছে না তার সামনে কী বিপদ, তিনি তো দিব্যি কলসি কাঁখে নিয়ে শান-বাঁধানো সিঁড়ি বেয়ে হেলতে-দুলতে জল ভরতে নামছেন। সন্টুর একবার মনে হল, চেঁচিয়ে সাবধান করে দেয় ছোটোবউকে। কিন্তু তার তো উপায় নেই, তাহলে তার ঘাড়টি ধরে ছুড়ে ফেলে দেবে হুঁ-পু। এত উপরে তারা বসে আছে যে ভূতের ভয়ের চেয়ে নীচে পড়ে যাবার ভয়ই এখন তার বেশি। ক’ঘণ্টা ভূতের সঙ্গে থেকে থেকে তার ভূতের ভয় যেটুকু ছিল, এখন আর একদম নেই।
একটু পরে সেই কাণ্ড। বুড়োভূতটা পিছন পিছন হাজির হল ছোটোবউ-এর কাছে। আর যেই না ছোটোবউ জলের কাছে নিচু হয়ে কলসি ভরতে শুরু করেছে, অমনি বুড়োভূতটা পিছন থেকে জাপটে ধরল তাকে। আশ্চর্যের ব্যাপার, ছোটোব কিছুই বুঝতে পারল না। একটু পরে সন্টু দেখল বুড়ো ভূত ম্যাজিকের মতো ছোটোবৌ-এর শরীরের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল।
ছোটোবউ তখন সবে কলসি ভরে তার কাঁখে তুলেছে, অমনি ধপাস করে তার কাঁখ থেকে পড়ে গেলো কলসিটা। দুদ্দাড় করে সিঁড়ি ভেঙে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে লাগল খিড়কির দরজার দিকে। অমনি হুঁ-পু দুহাতে বিল্টুদা আর সন্টুকে তার দুই বগলে চেপে ধরে একলাফে আমগাছের মগডাল থেকে চলে গেল চৌধুরিদের বাড়ির রান্নাঘরের ছাদে, তিনজনে পাশাপাশি উবু হয়ে বসে দেখতে লাগল ব্যাপারটা।
খিড়কিদরজা ভটাস করে খুলে ছোটোবউ তখন বাড়ির ভিতর শান-বাঁধানো উঠোনে। তার চুল, আঁচল সব এলোমেলো, নাকিসুরে চিৎকার করে বলল, এই, কেঁউ আমার গাঁয়ে হাঁত দেবে না।
ছয়
মুখে একটা আঁ আঁ শব্দ তুলে ছোটোবৌ বনবন করে ঘুরতে লাগল। আলুথালু কাপড়ে, এলোচুলে তাকে দেখাচ্ছিল ভীষণ রকমের। ঝুপ করে উবু হয়ে বসে বলতে লাগল, আমি বুড়ো চাটুজ্জে, অনেকদিন তক্কে তক্কে ছিলাম তোদের বাড়ি আসব বলে। আজ এসেছি।
ততোক্ষণে চৌধুরিবাড়ির ছেলেরা বাইরে বেরিয়ে এসেছে। বড়ো ছেলে, তার বউ ছেলেমেয়ে, মেজোছেলে, ছোটোছেলে সবাই হতভম্ব হয়ে গেছে। কোথা থেকে ছুটে এল বিধবা পিসি, ক্ষেন্তিমাসি, বাড়ির চাকরবাকর সবাই।
উঠোনে পা ছড়িয়ে বসে চৌধুরিবাড়ির বড়োছেলের দিকে আঙুল বাড়িয়ে ছোটোবউ বলতে আরম্ভ করল, তোর বাবা যে সেবার দুগ্গাপুজোর সময় তিন বিঘে জমি লিখে নিল, তার টাকা দে যায়নি। টাকাটা শোধ করে দে এক্ষুণি, নইলে এ বাড়ি ছেড়ে যাচ্ছি নে।
এতক্ষণ সবাই হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল। বাড়ির ছোটোবউ তুই-তোকারি করছে দেখে বড়োছেলেও অপমানিত, হতবাক। হঠাৎ বড়োবউ হাউমাউ করে কেঁদে উঠে বলল, ওমা, কি হবে গো, ছোটোবউকে যে ভূতে পেয়েছে।
ভূতে পেয়েছে শুনে সবাই আরো ভয় পেয়ে গেল। ছোটোছেলে তো হতভম্ব, বড়োছেলে ঘাবড়ে গিয়ে বলল, তা এখন কী হবে?
বড়োবউ তেড়ে উঠলো, কি আর হবে? হাঁদার মতো তাকিয়ে দেখছ কি? এক্ষুণি ওঝা ডাকো। নইলে আর দেখতে হবে না।
বড়োছেলেও বেশ ভয় পেয়ে গিয়েছে, আমতা-আমতা করতে লাগল। ছোটোমেয়েটা চেঁচিয়ে উঠল, মাগো, আমার যে ভীষণ ভয় করছে। ওদিক থেকে ক্ষেন্তিমাসি ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে বলল, তখন পইপই করে মানা করেছিনু, ছোটোবৌমা, রাতেরবেলা পুকুরঘাটে যেয়ো না। তেনারা এখানে-ওখানে ছড়িয়ে থাকে। তা কানে নেয় সেসব কথা?
বড়োছেলে একা যেতে সাহস পাচ্ছে না, মেজোভাইকে সঙ্গে নিল। মেজোভাইটা একটু ডাকাবুকো আছে, হাতের পাঞ্জা, বাইসেপ বেশ মজবুত, রোজ এক্সারসাইজ করে তো। কিন্তু ভূতের কাছে শক্ত পাঞ্জা কোনো কাজে লাগে না, ওখানে পালোয়ানদের কোন জারিজুরি নেই। একাদশী ওঝার বাড়ি এখান থেকে পাক্কা দু মাইল হবে, এই অন্ধকারে বেরোতে দুজনেরই বেশ অস্বস্তি লাগছিল। কিন্তু উপায় তো নেই।
এদিকে ছোটোবউ ফের বনবন করে ঘুরছে, আর চেঁচাচ্ছে নাকিসুরে, কবে চৌধুরিবুড়োর সঙ্গে রাত জেগে যাত্রা দেখেছিল, একসঙ্গে রাঙাদিঘিতে মাছ ধরেছিল, কবে কোর্টে মামলা করেছে, এইসব বিবরণ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বলে যাচ্ছে। একবার বড়োবউ-এর দিকে তেড়ে এল, হাঁ করে দেখছিস কি, যা দুটো ঝুনো নারকেল কুরে নিয়ে আয়, কতোদিন নারকেল খাইনি।
চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে বাড়ির উঠোনে ভিড় জমে যাচ্ছে, চারপাশের বাড়ি থেকে সবাই এসে জুটেছে। বেশিরভাগ মজা দেখতে এসেছে, একজন আহা-উহু করছে। কেউ-কেউ ভয়ে সিঁটিয়ে রয়েছে কোণের দিকে।
এদিকে ওঝার গন্ধ ভুতে ঠিক বুঝতে পারে। ঘণ্টাখানেক পরে হঠাৎ ছোটোবউ চেঁচাতে লাগল, ওই ব্যাটা একাদশী আসছে আমাকে তাড়াতে। আমিও চাটুজ্জেবাড়ির ছেলে, দেখে নেব কী করে তাড়ায় আমাকে। পনেরো দিনের আগে নড়ছি না।
শুনে বাড়ির ছেলেমেয়েরা হাউমাউ করে কেঁদে উঠল, কি হবে আমাদের, ছোড়দা গো। একটু পরেই একাদশী ওঝা বাড়ির ভিতর ঢুকল, আর তৎক্ষণাৎ ছোটোবউ-এর অন্য মূর্তি। রক্তচক্ষু করে তাকাল ওঝার দিকে, এমন রণরঙ্গিনী চেহারা যেন এক্ষুনি ভস্ম করে ফেলবে তাকে।
বিন্টুদা আর সন্টু অবাক চোখে দেখছিল সব কিছু। বুঝতে পারছে, ওঝার আগমনে হুঁ-পুও বেশ চঞ্চল হয়ে উঠেছে। সন্টুদের একবার জিজ্ঞাসা করল, ওটাকে দেখে তোদের ভয় লাগছে না তো?
সন্টু ঘাড় নেড়ে জবাব দিল, না।
খানিক পরে একাদশী ওঝা যখন স্থির হয়ে বিড়োবিড়ো করে, মন্ত্র পড়তে শুরু করল, হাত বৃত্তের মতো ঘোরাতে জলের ছিটে দিকে লাগল ছোটোবউ-এর চোখে-মুখে, আর চোখদুটো ভাঁটার মতো করে মাঝেমাঝে চিৎকার করতে লাগল, তখন বেশ নেতিয়ে পড়ল ছোটোবউ। তবু ক্ষীণস্বরে বলতে লাগল, বেরিয়ে যাও, বেরিয়ে যাও।
এতে ওঝার সুর আরো সপ্তমে উঠতে শুরু করে, কিছু অশ্রাব্য গালিগালাজ আর অবোধ্য শব্দ দিয়ে ওঝা তার আক্রমণ চালাচ্ছে। ছোটোব-ও তেড়ে উঠছে মাঝেমাঝে। কিছুক্ষণ এরকম চলার পর ভূতের তেজ কমছে না দেখে একাদশী ওঝা একটা প্রচণ্ড চড় মারল ছোটোবউ-এর গালে। চারপাশ হ্যাজাকের আলোয় তখন ভরপুর। তারই আলোয় সবাই দেখল, ছোটোবউ-এর ফরসা গাল লাল হয়ে উঠেছে।
ঘণ্টাখানেক বিভিন্ন কসরত করার পর ভূতটা হার মানল। ছোটোবউ হাতজোড় করে বলল, আর করব না, ছেড়ে দাও আমাকে। ‘ওষুধে কাজ হয়েছে দেখে ওঝার গলা আরো চড়ে গেল, ছাড়ব না তোকে, আজ শেষ করে দেব, তুই অনেকদিন ধরে আমাকে জ্বালাচ্ছিস।’ বলেই আরেক চড়। এসব দেখেশুনে বেশ ঘেমে উঠছিল সন্টু, ছোটোবউকে এত মার মেরেছে যে বেচারি উঠোনে বসে ধুঁকছে। ছোটোছেলের অবস্থাও করুণ, সে অসহায়ভাবে ওঝার কাণ্ডকারখানা দেখছে।
ইতিমধ্যে রান্নাঘরের ছাদে যে আমের ডালটা এসে পড়েছিল, সেখানে কিচিরমিচির শব্দ শুনে সন্টু তাকাল। চৌধুরিবাড়ির বুড়ো-ভৃত্যটা ছটফট করছে, উঁ, আমার বাড়ির বউকে হেনস্তা করা। আজ চাটুজ্জেবুড়োকে আমি দেখেই নেব। তার লম্ফঝম্পে আমগাছের ডালটা অস্বাভাবিকভাবে নড়ছে, সবাই উঠোনে ভূত-ঝাড়ানো দেখতে ব্যস্ত, কেউ আমগাছের ডালটা কেন নড়ছে তা দেখতে পেল না। অন্যসময় হলে নির্ঘাত সবাই ভয় পেত।
ছোটোবউ-এর অবস্থা করুণ দেখে ওঝা নরম হয়ে বলল, ‘ঠিক আছে, তাহলে বল, কীভাবে যাবি। গাছের ডাল ভেঙে, জুতো মুখে করে, না জলভর্তি ঘড়া দাঁতে নিয়ে।’ ছোটোবউ জুতো মুখে নিতে রাজি হল। ওঝা তখন কোত্থেকে একটা ছেঁড়াজুতো নিয়ে এল, ছোটোবউ-এর সামনে ছুঁড়ে দিয়ে বলল, এই নে, আর যেন এই বাড়ির ত্রিসীমানায় না দেখি।
তখন ছোটোবউ উবু হয়ে হামাগুড়ি দেওয়ার ভঙ্গিতে জুতোটা কামড়ে ধরল, তারপর এক পা এক-পা করে সাত পা হেঁটে দড়াম করে উঠোনের উপর পড়ে গেল। অমনি বাড়ির বৌ-মেয়েরা জলের ঘটি হাতে নিয়ে ছুটে গেল ছোটোবউ-এর দিকে, ক্রমাগত তার চোখে-মুখে জলের ঝাপটা দিতে লাগল।
সন্টু দেখল, চাটুজ্জে-ভূত অমনি আবার লকপক করতে করতে চৌধুরিদের আমবাগান ছাড়িয়ে ওদিকে চলে গেল, আর তার পিছু-পিছু ধাওয়া করল চৌধুরি-ভূত।
হঠাৎ হুঁ-পু বেশ চঞ্চল হয়ে উঠল, ‘একটু দাঁড়া, কিসের যেন গন্ধ পাচ্ছি।’ বলেই সে কোথায় যেন মিলিয়ে গেল ফট করে।
সাত
বিল্টুদা তখন সন্টুকে বলল, সন্টু রে, যা গেরোতে পড়েছি তাতে আমাদেরও ভূত হয়ে যেতে খুব বেশি দেরি নেই।
সন্টুর মুখ শুকনো, চোখদুটো ছলোছলো। বলতে চাইল, রানি মিং মিং-এর রাজত্বে আরো দুটো পো-ভূত বেড়ে যাবে আর কি। কিন্তু বলা হল না, হুঁ-পুকে হন্তদন্ত হয়ে আসতে দেখে থমকে গেল। হুঁ-পু এসেই বলল, খুব মাছভাজা খেতে ইচ্ছে করছে। তোরাও দুটো খাবি নাকি?
ওদের হ্যাঁ বলা ছাড়া কোনো উপায় নেই। খিদে অবশ্য পেয়েছে, কিন্তু খাবার ইচ্ছের চাইতে এই ভূতের রাজ্য থেকে পালাবার ইচ্ছেটাই ওদের মাথায় চাগাড় দিয়ে উঠেছে। কিন্তু নো উপায়। বাধ্য হয়ে বিল্টুদা জিজ্ঞেস করল, ‘কোঁথায় মাছ ভাজা?”
বাতাসে গন্ধ পেয়েছি। শিবরামপুরের হাট থেকে প্রমাণ সাইজের দুখানা ইলিশ কিনেছে একজন। চল্ তো যাই, নোলাটা বড্ডো সুড়সুড় করছে।
দ্রুত হেঁটে ওরা যে-পথটায় এসে পড়ল, তা ওদের অচেনা। শিবরামপুরের হাটের নাম শুনেছে। মস্ত হাট, সাতখানা গাঁয়ের লোক প্রতি মঙ্গলরার আর শুক্কুরবার এসে জোটে। পাওয়া যায় না হেন জিনিস নেই। সন্টুর বাবা একবার শিবরামপুরের হাট থেকে ইয়া বড়ো বড়ো নলেন পাটালি এনেছিল। সেই পাটালির কি ফার্স্টক্লাস স্বাদ। এখনো জিবে লেগে আছে।
রাত কত হবে কে জানে, পথে লোকজন নেই। কেবল একটা লোক হাতে দু’খানা ইলিশ ঝুলিয়ে হনহন করে হেঁটে যাচ্ছে সুনসান পথ দিয়ে। হাট থেকে এত রাতে ফিরছে একা একা, ওর গা নিশ্চয় ছমছম করছে। বিল্টুদা আর সন্টুকে একটু পিছনে রেখে হুঁ-পু একেবারে লোকটার ঘাড়ের উপর এসে পড়ল। লোকটাও হাঁটে, পিছু পিছু হুঁ-পু। একেবারে ছায়ার মতো লেগে আছে। খানিক চলার পর লোকটা হঠাৎ পিছন ফেরে, কিন্তু কাউকেও দেখতে পায় না। এবার হুঁ-পু নাকিসুরে বলল, বড্ডো মাছভাজা খেতে ইচ্ছে করছে, একখান ইলিশমাছ দাও না বাপু।
লোকটা আবার পিছন ফেরে, কাউকে দেখতে না পেয়ে ভাবল, ভুল শুনেছে। সে আবার চলতে শুরু করে। হুঁ-পু কিন্তু সেই একইভাবে তার ঘাড়ের উপর হুমড়ি খেয়ে রয়েছে, ‘দে না বাপু একখান ইলিশমাছ। খুব নোলা লেগেছে।’ শুনে লোকটা আবার দাঁড়াল, কাউকে না দেখতে পেয়ে বিড়োবিড়ো করে ওঠে, ‘নাহ্, রেতে ইলিশমাছ নিয়ে একা ফিরতি নেই। গগনখুড়ো ঠিকই বলেছে।’ বলে আবার চলতে থাকে, এবার একটু পা চালিয়ে। কিন্তু হুঁ-পু ছাড়ে না, না দিলে কিন্তু খারাপ হবে। দে বলছি।
ফাঁকা মাঠের ভেতর খাঁ খাঁ রাস্তায় জনমনিষ্যি নেই, তবু কোত্থেকে গলার স্বর ভেসে আসছে, তা লোকটা বুঝতে পারে না, এবার একা-একাই বিড়বিড় করে, খেতের পাট বেচে মাছ কিনিছি। কাউকে দেবো না।
হুঁ পু রেগে উঠে বলে, আচ্ছা, দেখাচ্ছি তোকে মজা। লোকটাকে ছেড়ে এবার হুঁ পু পিছু হটে। ওদিকে হুঁ পু-র শেষ কথাটা শুনে লোকটা প্রায় দৌড়োতে শুরু করে। অল্প জ্যোৎস্নার আলোয় সে দৌড় দেখে সন্টু খিলখিল করে হেসে ওঠে। বিল্টুদা কনুই-এর খোঁচা দেয়, এই সন্টু, করছিস কি। ওই দ্যাখ, হুঁ পু আসছে।
হুঁ পু এসে বলল, কেমন ভড়কি দিলাম লোকটাকে। কাঁচা মাছ তো আর নেব না। আমরা ভাজা মাছ খাব।
কিন্তু কেমন করে খাবে তা হুঁ পু বলল না। কেবল হুঁ পু-র পিছু পিছু হেঁটে পৌঁছে গেল একটা দোতলা মাটির বাড়িতে। বোঝাই যাচ্ছে এটা একটা সম্পন্ন গেরস্থ ঘর। নিশ্চয় অনেক ধেনোজমি আছে। দোতলার চালে নতুন টালি। বাড়ির চারপাশে ঘেরা বাগান। সবজির মেলা চাষ করেছে লোকটা। বাড়ির পিছনদিকে ওরা যেখানে এসে দাঁড়াল, সেটা রান্নাঘর। জানলা দিয়ে উঁকি মেরে ওরা দেখল, একটা বউ মাছ কুটে ভাজবার তোড়জোড় করছে। বেশ বড়ো বড়ো পিস্ করে মাছ কোটা হয়ে গেছে, কড়াইতে তেল ফেলতেই হুঁ পু বলল, কেমন বুঝছিস্?
যেন অনেক বুঝেছে এমনভাবে ঘাড় নাড়ল বিল্টুদা। চারপাশে ভনভন করছে মশা। এখন মশা কামড়ালেই তো চিত্তির। তারা তো এখন পো-ভূত, মশা কামড়ালে তো চলবে না। সমস্ত শরীর আলখাল্লা দিয়ে ঢাকা আছে বটে, কিন্তু যা পেল্লাই সাইজের মশা, তারা আলখাল্লা কেন, লোহার বর্মও বোধহয় ভেদ করে কামড়াতে পারে।
একটু পরেই ছ্যাঁক ছ্যাঁক শব্দ হতে লাগল কড়াইতে, আর হাওয়ায় ম ম করতে লাগে ইলিশমাছের গন্ধ। গন্ধ শুঁকে তো সন্টুর জিবে জল এসে যায়। জানলা দিয়ে দেখল একটা এনামেলের ডিসে বউটা ইলিশমাছ ভেজে ভেজে রাখছে। সে একটু এদিক-ওদিক ঘাড় ফেরাতেই হুঁ পু তার লম্বা হাত বাড়িয়ে খানকতক মাছভাজা তুলে নিয়ে এল। ভাজা ইলিশের গন্ধে রমরম করে উঠল বাগানের হাওয়া। সন্টু আর বিল্টুদার হাতে একখানা করে মাছভাজা ধরিয়ে দিয়ে বাকি কখানা নিজের গালে পুরে দিল। মাছভাজাটা এত গরম যে সন্টুর হাত পুড়ে যাবার জোগাড়, বিল্টুদারও তদ্রূপ অবস্থা।
মাছভাজা খেতে হুঁ পুর একমিনিটও দেরি হয় না, খাওয়া শেষ হতেই সে তার লম্বা হাত বাড়িয়ে আবার একমুঠো মাছ তুলে নিয়ে আসে। সন্টুদের খাওয়া তখনো শেষ হয়নি, তাই হুঁ পু বলে, দেরি করিস নে, দেরি করলেই ফসকে যাবি। বলেই সে তার হাতের মাছভাজাগুলো পটাপট নিজের মুখে পুরে দিতে শুরু করে। সেগুলো শেষ হতে আবার একমুঠো।
কিছুক্ষণ পর বউটার সন্দেহ হয়, এতগুলো মাছ ভাজল, কিন্তু ডিশটা কিছুতেই ভরছে না কেন। এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখল, কিছুই বুঝে উঠতে পারল না। তারপর আবার কড়াইতে ছ্যাঁক ছ্যাঁক শব্দ তোলে।
যে লোকটা হাট থেকে মাছ কিনে ফিরছিল, তাকে এবার রান্নাঘরের দরজায় দেখা যায়, ‘কই, এখনো ভাজা শেষ হয়নি?”
‘যাচ্ছি, যাচ্ছি, উনুনটা নিবিয়ে দিয়েই যাচ্ছি। কি নোলা রে বাবা, তর আর সইছে না।’ এই বলে কড়াই থেকে শেষ ভাজাগুলো ডিসে রেখে উনুন নিবোতে থাকে সে। এই সুযোগে পুরো এনামেলের ডিসটাই হুঁ পু বাইরে নিয়ে চলে এল। আহ্, কি রমরমে গন্ধ!
ওদিকে, ‘ওমা, একি কাণ্ড! মাছভাজার ডিশটা কোথায় গেল, এই যে এক্ষুনি এখেনে রাখলাম। হাওয়ায় উড়ে গেলো নাকি’ এরকম কথা কানে যেতে হুঁ পু খুকখুক করে হাসতে হাসতে বলে, ‘চল এবার একটা নিরিবিলি জায়গায়, মৌজ করে মাছভাজা খাই। কতোদিন এমন গরম মাছভাজা খাইনি।’ তখনো মাছের গায়ে বিড়বিড় করে তেল ফুটছে, ইলিশের গন্ধে নিমগাছ, সুপারিগাছ, নারকেলগাছ পর্যন্ত ভরে যায়। বিল্টুদার সঙ্গে সন্টুও পাল্লা দিয়ে তিনচারখানা মাছভাজা খেয়ে ফেলে। আর হুঁ পু তো পটাপট মুখে ফেলছে, এক-একসঙ্গে চার-পাঁচখানা। ‘ল্যাংপ্যাংটা টের পেলে আর রক্ষে নেই।’ বলতে বলতে এনামেলের ডিশ একদম ফরসা।
খাওয়া শেষ হতে হুঁ পু বলল, চল তো দেখি, চৌধুরি-ভূত আর চাটুজ্জে-ভূতে আজ নির্ঘাত মারামারি হবে। সেপাই-ভূতটাকে এক্ষুনি পাঠিয়ে দিই, নচেৎ এক্ষুণি একটা কুমড়োকাণ্ড হবে।
কুমড়োকাণ্ড কী তা কে জানে। তবে একটা লঙ্কাকাণ্ড যে হতে পারে সে ব্যাপারে সন্টু হলফ্ করে বলতে পারে। তবে ভূতে পাওয়ার ব্যাপারটায় তার মাথায় একটু খটকা লেগে আছে। যাই হোক, আপাতত ভাববার সময় নেই। পৃথ আগলে দাঁড়াল একটা পেনি। বলল, হাওয়ায় ইলিশমাছের গন্ধ বেরুচ্ছে কেন রে। ছিলাম বসে চাঁপাগাছের ডালে, অমনি দেখি কি পমপমে গন্ধ, হাড় জুড়িয়ে যাচ্ছে যেন।
বিল্টুদা ফট করে বলে দিল, “গঁন্ধটা আমরাও পাচ্ছি, কিন্তু কোনদিকে কেঁ জানে! যদি খবর পাঁও, আমাদের জানিও।”
হুঁ পু এসে পড়ল এর মধ্যে, বলল, কিরে মিউমিউ, নিশ্চয় খাওয়ার গপ্পো করছিস। বড্ডো নোলা তোর, যার ভাগ্, মামদো ভূত জেগে উঠেছে। বেশি বকবক করলে তোকে ঝুলিয়ে রাখবে গাছে।
মামদো ভূতের নাম শুনে লাফিয়ে উঠল মিউমিউ, “তাই নাকি, জবর খবর।” বলে ল্যাকপ্যাক করতে করতে ছুটল। কিন্তু সন্টু ভিতরে ভিতরে চমকে ওঠে, এ আবার কেমনধারা ভূত।
আট
হুঁ পু-র সঙ্গে সন্টুরা যেখানে পৌঁছোল, তা ওদের খুব চেনা জায়গা। যে সিঁদুরকৌটা আমগাছের ডালে তারা অনেকবার চড়েছে, তার পাশে যে দত্যির মতো বটগাছ, তার নীচেই নাকি বাবা ভোম-ভোম উদয় হবেন। আরো অনেকগুলো ছায়ামূর্তি আগেই পৌঁছেছে সেখানে, কেউ-কেউ বট গাছের ডালে লম্বা-লম্বা পা ঝুলিয়ে বসে আছে, কেউবা ডালে হাঁটু ভাঁজ করে শরীরটাকে ঝুলিয়ে দিয়েছে, কেউ বা ঝুরিতে ঝুলছে। একটা ডাল অনেকটা নিচুতে ঝুলে আছে, তার তিনটে পাতার উপর তিনটে ভূত ছোট্ট হয়ে বসে আছে পরম আরামে, যেন কত নিশ্চিন্ত। সন্টুরা হুঁ পু-র পাশে বটগাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে বেশ জম্পেশ করে বসল। মামদো ভূত আসবে শুনে আজ এই ভূত-সমাগম, একটু পরে রানি মিং-মিংও নাকি আসবে।
মামদো ভূতটা নাকি ময়ালসাপের বিষ খেয়ে বুঁদ হয়ে পড়ে থাকে ছ-মাস, তারপর ঘুম ভেঙে সে কিছুক্ষণ হই-হুল্লোড় করে ভূতদের সঙ্গে, তারপর আবার সাপের বিষ খেয়ে বুঁদ হয়ে পড়ে থাকে বটগাছের কাণ্ড কিংবা গুঁড়ির ভিতর।
মামদো ভূত নামটাই ভয়ের, তার উপর যার নাম ভোম ভোম, সে না জানি কীরকম চেহারার! হুঁ পু জানাল, মানুষ মরে যেমন ভূত হয়ে যায়, তেমনি ভূত মরে গেলে হয় মামদো ভূত। তবে এক আধটা ভূত নয়, একশো ভূত মরলে তবে একটা মামদো ভূত।
হঠাৎ মড়মড় করে উঠল বটগাছের ডালপালা, আর সন্টুরা যেখানে বসে ছিল, সেই গুঁড়ির কোঁকড়ানো ঝুরিগুলো উলটে-পালটে ধোঁয়া বেরুতে লাগল। আর একটু হলেই সন্টু পড়ে যাচ্ছিল আর কি। গুঁড়ির ফাঁক দিয়ে গলগল করে ধোঁয়া বেরিয়ে কিছুক্ষণের জন্য অন্ধকার হয়ে গেল জায়গাটা। ক্রমশ ধোঁয়াটা ভীষণ হয়ে উঠল। পুঞ্জীভূত মেঘের মতো ঘন ও পুরু তার শরীর, একটু পরে বিশাল ভালুকের মতো চেহারা ধারণ করল সে।
কালো ভালুকের মতো চেহারাটা এবার গমগম শব্দ করে থরথরিয়ে কাঁপতে লাগল। শব্দটা শুনে মনে হল মামদো ভূতটা হাসছে, হাসির দমকে কাঁপছে তার শরীরটা, অথচ হাসির শব্দটা মেঘের গর্জনের মতো ভীষণ শোনাল সন্টুদের কানে।
হাসির মধ্যে ফের গমগমিয়ে উঠল শব্দ : হাঃ হাঃ হাঃ, সব রম্বি (কুশল) তো? অনেকদিন টাম্বু (খোঁজ-খবর) পাইনি। রানি মিং-মিং রিমনি (সুস্থ) আছে তো?
কী অদ্ভুত সব ভাষা! হুঁ পু সন্টুদের কথাগুলোর মানে বুঝিয়ে দিতে লাগল।
ভালুকের মতো চেহারার মামদো ভূতটা ক্রমাগত চেহারা বদলে ফেলছিল। এবার হা-হা করে হাসতেই তার চেহারা আবার অন্যরকম হয়ে গেল। বলল, “কত রুম্বায় (জায়গায়) গেছি, একটা হাতির নাকের ভিতর বেশ জুগনায় (মজায়) ছিলাম, দুটো মেঝের ভিতর দুমাস, একটা পুকুরে ক-দিন, তাছাড়া সমুদ্দুরের ঢেউ হয়ে ক-মাস বেশ কেটেছে। বাকিসময় এই বটগাছের গুঁড়িতে।”
“বেশ বেশ মামা ভোম-ভোম। এবার তোমার কী চাই বলো।” এক ছায়ামূর্তি জিজ্ঞেস করল। মামদো ভূত শরীরটাকে ওলটাল-পালটাল, তারপর বলল, “তাজা দু-একটা রসনি (কচি ছেলে) জোগাড় কর, আর একডাণ্ডি (পাত্র) বরফ-জুড়নো বাতাস। নিজের হাতে রসনির ঘাড় মটকে রক্ত চুষব আর ওই ভাঁড়ে চুমুক দিয়ে মৌতাত করব। যা জমবে না। হঃ হঃ হঃ।”
“ওহ্ মামা!” সেই ছায়ামূর্তিটা যেন হেঁচকি তুলল, “এবার জব্বর অর্ডার দিয়েছ মামা। জোগাড় করতে আমার কালঘাম ছুটে যাবে। ঠিক আছে, দুদিন সময় চাই। তবে একটা শর্ত আছে, রসনি নিয়ে এলে আমাকে মামদো ভূত করে দেবে তো, মামা ভোম-ভোম।”
আবার সেই ভীষণ মেঘের গর্জন, আর কালো পুঞ্জীভূত বিশাল চেহারা ওলট-পালট। হঠাৎ কোত্থেকে একটা ছোটোখাটো চেহারার লিকলিকে ছায়ামূর্তি এসে মামার ধোঁয়াটে শরীরের কাছে গিয়ে আদুরে অথচ খ্যানখ্যানে গলায় টেনে টেনে বলল, “তোমার ঘুম ভে-এ-ঙে-ছে মামা ভো-ওম-ভোম? কঁ অখন ভাঙল! আমি তো জানতে-ই পারিনি।”
আবা বিকট হাসি, কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগল সেই মেঘ, “তুই সেই মিউ-মিউ না? হাঃ হাঃ হাঃ আমি তো ভাবছিলাম তুই অ্যাদ্দিনে শাঁখচুন্নি হয়ে গেছিস?”
সন্টু এই পেতনিটাকে কিছুক্ষণ আগে চৌধুরিদের বাগানে বসে থাকতে দেখেছিল। মিউ-মিউ বলল, “মামা তুমি না বলেছিলে আমাকে মামদো-পেতনি করে দেবে।”
আবা সেই মেঘের বিকট শব্দ – “হাঃ হাঃ হাঃ, তোর আবার মামদো-পেতনি হবার শখ। হাঃ হাঃ হাঃ।”
খুব অপমানিত বোধ করল মিউ-মিউ। তারপর লম্বা পা বাড়িয়ে একটা বড়ো পাকুড় গাছের মগডালে একলাফে উঠে চুপ করে বসে রইল। ভঙ্গিটা দেখে খুব মজা পেল ওরা। কিন্তু এরপরেই ঘটল অন্যরকম ঘটনা। হঠাৎ মামদো ভূতটা কিসের যেন গন্ধ পেয়ে দোমড়াতে লাগল তার শরীর, তারপর গমগমে গলায় বলল, “এখানে কি কোনো রসনি (কচি ছেলে) আছে, গন্ধ ভুরভুর করছে যে।”
শুনে সন্টু আর বিল্টদার বুকটা একসঙ্গে ছ্যাঁত করে উঠল, দুজনে মুখঢাকা আলখাল্লার ভিতর দিয়ে চোখাচোখি করল একবার। হুঁ পু বলল, “না না মামা, তোমার ঠাহরে ভুল হয়েছে। এখানে তো কেউ নেই। বোধহয় তোমার জব্বর খিদে পেয়েছে।”
মেঘের গর্জনে ফের চমকে ওঠে সবাই—”নান্-না, বেশ রসনি রক্তের তাজা গন্ধ পাচ্ছি, ইচ্ছে করছে কচকচ করে মুণ্ডুটা চিবিয়ে খাই।”
বিল্টুদা আর সন্টুর বুকের রক্ত চঞ্চল হয়ে উঠল। সর্বনাশ! তারা কি এবার ধরা পড়ে যাবে? সন্টু ভয় পেয়ে রাম-নাম জপ করতে লাগল, হয়তো তাদের শেষ সময় উপস্থিত।
হঠাৎ একটা কাণ্ড ঘটল সেখানে। মিউ মিউ যে পাকুড়গাছটার ওপরে বসে ছিল, তার ডালে মামার জ্বলন্ত দৃষ্টি পড়তেই গোটা দুই গেছো-বাঁদর টুপ-টুপ করে ঝরে পড়ল মাটির ওপর। তারপর ম্যাজিকের মতো গেছোদুটো সেঁধিয়ে গেল মামদো ভূতের ভয়ংকর শরীরের মধ্যে। কয়েক ফোঁটা তাজা রক্ত কেবল ছিটকে পড়ল চারপাশে।
দেখে হিম হয়ে গেল সন্টুদের শরীর। এখন যদি তাদের দিকে নজর পড়ে মামদো ভূতের, তাহলে তো তাদের অবস্থাও ওরকম হবে।
কিন্তু বাঁদর-দুটো পেটে পড়তেই সেই মেঘের মতো শরীর থম্ মেরে গেল। তারপর আস্তে আস্তে কেমন যেন গুটিয়ে যেতে লাগল, একসময় কর্পূরের মতো বাতাসে মিলিয়ে গেল অতবড়ো শরীরটা।
নয়
হুঁ পু বলল, “রানি মিং-মিং আমাকে তলব করেছেন, দুটো নতুন স্যাঙাত এসে কিম্ভূত কাণ্ডকারখানা করছে, চল্ তো যাই।”
আবার সেই কড়াইমণ্ডির জঙ্গলে লতাপাতার ঝোপ-জঙ্গলের ফাঁকফোকর ফুঁড়ে এগোল। হুঁ পুর কোনো অসুবিধে নেই, সে তো গাছের কাণ্ড ভেদ করে ফুরফুর করে হেঁটে চলেছে, কিন্তু সন্টুদের তো ইয়া লম্বা ঠ্যাং নেই, বাতাসের মতো হাঁটতেও পারছে না। প্রায় ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে দুজনে ই পুর পিছু পিছু। চলতে চলতে এক কাণ্ড, একটা শ্যাওড়াগাছের কাছাকাছি এসেছে, হঠাৎ হুঁ পুর ঘাড়ের উপর লাফ দিয়ে পড়ল একটা অদ্ভুত মূর্তি।
ঘাড়ের উপর ওটা লাফিয়ে পড়তেই হুঁ পু প্রথমটা চমকে উঠল, তারপর বলল, “আরে শাঁখচুন্নিটা ফের জ্বালাতে এসেছে, কী রে প্যাংপ্যাং, কী খবর বল্?”
শাঁখচুন্নি প্যাং-প্যাং হুঁ পুর ঘাড় ধরে ঝুলে আদুরে গলায় বলল, “অনেকদিন ছানার ডালনা খাইনি, বড়ো নোলা ঝরছে ছানার জন্যে, একদিন আমায় খাওয়াও না বাপু।”
হুঁ পু শাঁখচুন্নিকে ঘাড় থেকে ছাড়াবার চেষ্টা করল, কিন্তু ওটা নাছোড়বান্দা, কিছুতেই নামবে না। হুঁ পু একটু বিরক্ত হয়ে বলল, “তোর শুধু খাই-খাই। তা যা না, ঘোষেদের বাড়ি যা, ওরা ছানা ডাঁই করে রেখেছে ভাঁড়ার ঘরে।”
আবার ঘ্যান-ঘ্যান করে উঠল প্যাং-প্যাং, “তাহলে আর তোমাকে বলছি কেন বাপু। ওদের বাড়ি যে ঠাকুরপুজো হয়, ঢুকতেই পারিনে। তোমার সঙ্গে দুটো পো-ভূত আছে, দাও না তাদের পাঠিয়ে।”
সন্টু চমকে উঠল, ঘোষেদের বাড়ি ছানা চুরি করতে গিয়ে কি একটা বদনাম কুড়োবে শেষে! হুঁ পু অবশ্য শাঁখচুন্নিটাকে পাত্তা দিল না, “না-না, হবে না, যা ভাগ। বরং সরকারবাড়ি যা, খাসা মাছ ভাজছে ওরা, গন্ধ বেরোচ্ছে।
“আ-হা”, নোলা টানল প্যাং-প্যাং, তারপর হুঁ পুর ঘাড় থেকে লাফ মারল সে। আর আশ্চর্য, মাটিতে পড়তেই সে একটা ছাইরঙের বেড়াল হয়ে গেল। চোখ-কটা বেড়ালটা লাফ দিয়ে ছুটল জঙ্গলের মধ্য দিয়ে, বোধহয় সরকারবাড়ির দিকেই।
যেতে যেতে যে-জায়গাটায় ওরা পৌঁছোল, সেটা একটা শ্মশান, এখানে কখনো আসেনি আগে। চার-পাঁচটা চিতা জ্বলছে। দুটো ঝাপসা চেহারার মূর্তি একপাশে দাঁড়িয়ে ঠকঠক করে কাঁপছে। হুঁ পু এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, “তোমরা কে?”
ঝাপসা চেহারার মূর্তির একজন বলল, “আমি পটল-খুড়ো, বিকেলে হাটে গিয়েছিলাম, ফেরবার পথে গোরুর গাড়ি চাপা পড়েছি, তা এখন বাড়ি ফিরতে চাই।”
আর একজন বলল, “আমি বামুনবাড়ি ভোজ খেয়ে কীরকম যেন হয়ে গেছি। কে একজন এসে রানির কাছে নিয়ে গেল, কোথাকার রানি চিনিও না, দুটো আলখাল্লার মতো পোশাক ছুঁড়ে দিয়ে বলল, ‘নাও পরো। বাড়ি ফিরতে চাইলাম, বলল, ‘আর ফেরা যাবে না।’ কী মুশকিলে পড়লাম বলো তো?”
সন্টু বুঝল, এরাই রানির কাছে গিয়ে গোলমাল বাধিয়ে এসেছে। বোধহয় ভূতেদের দেশে সদ্য এসেছে বলে মানিয়ে নিতে পারছে না।
নতুন ভূত দুটোকে হুঁ পু বলল, “আচ্ছা, ঠিক আছে, আগে ওই জ্বলন্ত কাঠটাকে হাত দিয়ে তোলো দেখি, তারপর তোমাকে বাড়ি নিয়ে যাব।”
ঝাপসা মূর্তির একটা নিচু হয়েই আঁতকে উঠল যেন, ভয়ে দু-পা পিছিয়ে এসে বলল, “পারব না, আগুন দেখে কেমন যেন ভয় করছে।”
হি-হি করে হেসে উঠল হুঁ পু। “চলো, এবার রানির কাছে চলো, তোমরা আর কখনো আগুন ছুঁতে পারবে না। আলখাল্লা পরে এখন তোমাদের আমাদের রাজত্বে থেকে যেতে হবে।”
মূর্তিদুটো কেমন বিহ্বল হয়ে তাকিয়ে থাকল, তারপর হুঁ পুর পিছু-পিছু হাঁটা শুরু করে দিল।
