ছয়
গার্গীর চোখ জুড়ে এসেছিল মাত্র কিছুক্ষণ আগে, হঠাৎ বাইরের দরজায় কারও করাঘাত শুনে ধড়মড় করে উঠে প্রথমে আলো জ্বালাল, ঘরটা আলোয় ভরে যেতে সায়নের সোফার কাছে
এসে বলল, ওরা বোধহয় ডাকতে এসেছে।
সায়ন ঘুম ভেঙে উঠে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল, একটু পরেই আবার সেই ঠক ঠক ঠক।
বাইরে ট্যুরে যাওয়ার সময় তিনটে জিনিস সঙ্গে নিতে গার্গী ভোলে না কখনও। টর্চ, মোমবাতি আর দেশলাই। বড়ো ব্যাগটা খুলে তিনটেই হাতের কাছে রেখেছিল, এখন টর্চটা হাতে তুলে নিল চট করে। ভালো করে শুনল আওয়াজটা, দ্বিতীয়বার শুনে বলল, নিশ্চয় ওরা!
সায়ন উঠে দরজার কাছে গিয়ে বলল, কে? টপ্পা নাকি?
ওপাশে কারও গলার আওয়াজ না পেয়ে সায়ন দ্বিতীয়বার জিজ্ঞাসা করল, কে রিম নাকি? তখনও কারও কণ্ঠস্বর না শুনে দরজার ছিটকিনি খুলে বাইরে তাকিয়ে দেখল কেউ নেই সেখানে।
বিস্মিত সায়ন তাকায় গার্গীর দিকে, বলল, আমি দেখছি ওদের ঘরে গিয়ে।
টর্চ হাতে নিয়ে বাইরে বেরোতে এক বিশাল অন্ধকার। এত বড়ো বাড়ি, রাতে সব ঘরের আলো জ্বললে যা বিল আসবে তা ব্রনবাবুর রক্তচাপ বাড়িয়ে দেবে নিশ্চিত। অতএব টর্চ জ্বালিয়ে গার্গী চলল সায়নের সঙ্গে। থ্রি পেনি অপেরা যে-ঘরটায় আছে সেটি ভিতর থেকে বন্ধ দেখে বেশ অবাক হল, দরজার বাইরে থেকে সামান্য গলা উঁচু করে ডাকল, টপ্পা! টপ্পা!
তার একটু পরে ডাকল, মাদল, রিদম!
বার কয়েক ডাকাডাকির পর তিনজনেই চোখ মুছতে মুছতে বেরিয়ে এল বাইরে। সায়ন বলল, তোমরা তিনজনেই ঘুমোচ্ছিলে?
ওরাও বিস্মিত হয়ে বলল, হ্যাঁ। ঘুমিয়ে নিচ্ছিলাম কেননা প্রথম রাতে তেমন বিশেষ কিছু শব্দ হয়নি। একটা দীর্ঘশ্বাস, একটু ফিসফাস কথা। যা কিছু কাল রাতে শুনেছি সবই মাঝরাত্রির পর।
সায়ন বলল, তা হলে আমাদের ঘরে টোকা দিল কে?
তিন যুবক খুব বেশি অবাক হল না, বলল, এখনও তো শুধু টোকার পর্যায়ে আছে। রাত একটু বাড়লে আরও অনেক শব্দ শুনতে পাবেন।
গার্গী তখনও টর্চ জ্বেলে চারদিকে আলোয় ভরিয়ে দেখতে চাইছে কোনও কিছু অস্বাভাবিক চোখে পড়ে কিনা। দিনের বেলায় যে-রাজবাড়ির অন্দরমহলগুলো ঝকমকে দেখাচ্ছিল, এখন রাতের অন্ধকারে সত্যিই ভূতুড়ে দেখাচ্ছে.।
মাদল বলল, সায়নদা, আরও একটু ঘুমিয়ে নিন। অন্য শব্দ যদি শুনতে পাই, আপনাকে ডেকে তুলব।
তার কথা শেষ না হতেই হঠাৎ ঘরের কোনও কোণ থেকে ভেসে এল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলার শব্দ।
এতটাই জোর সেই দীর্ঘশ্বাসের শব্দে যে, চমকে উঠল পাঁচজনেই।
প্রত্যেকের ঘাড় ঘুরে যাচ্ছে সেই শব্দের উৎসের খোঁজে। বিশাল একটা ঘর, মাত্র একটি ছোটো টিউব জ্বলছে এক কোণে। ফলে রাত্রির অন্ধকার ঘিরে আছে চারদিক। তার কোন গহন থেকে দীর্ঘশ্বাসের শব্দটা ভেসে এল তা বুঝে উঠতে পারছে না কেউ।
টপ্পা বলল, সায়নদা, এত জোরে দীর্ঘশ্বাসের শব্দ কখনও শুনিনি।
গার্গীও বিস্মিত সেই শব্দের প্রাবল্যে। জিজ্ঞাসা করল, কাল কি এরকম কোনও শব্দ পেয়েছিলে তোমরা?
রিদম মাথা নাড়ে, হ্যাঁ। খুব আস্তে একবার শুনেছিলাম। এখন নীচে আছি বলে এত জোরে শুনছি। তবে বেশি শুনেছি তা নাচের ঘুঙুরের শব্দ।
টপ্পা বলল, আমিও শুনেছি, কখনও দু-চার কলি গান।
আরও কিছুক্ষণ নতুন কোনও শব্দের প্রতীক্ষা করল ওরা পাঁচজন। কিন্তু রাত্রিকালের মুহূর্ত যেন অনেক দীর্ঘ ও অস্বস্তিকর। কিছু পরে মাদল বলল, আমার ঘুম পাচ্ছে।
সায়ন বলল, তা হলে আপাতত ঘুমের চেষ্টা করা যাক যতক্ষণ না আবার কোনও ঘটনা না ঘটে।
গার্গী হেসে বলল, তোমার এর মধ্যে ঘুম আসবে?
সায়ন অবলীলায় বলল, চেষ্টা করতে দোষ কি!
গার্গী ঘড়ির দিকে চোখ রাখে, মধ্যরাত পেরিয়ে গেছে অনেকক্ষণ, একটা অদ্ভুত পরিস্থিতির মধ্যে বাস করছে তারা। এর মধ্যে ঘুম কোথায় পালিয়ে গেছে।
তাদের এই টালবাহানার মধ্যে হঠাৎ আবারও সবাইকে ঘোরতরভাবে চমকে দিয়ে কোথাও চলকে উঠল চমৎকার গানের কলি। নারীকণ্ঠের গান, যেন বহু দূর থেকে ভেসে আসছে গানটা। কী সুন্দর কণ্ঠস্বর আর গাইবার মুন্সিয়ানা। কোথায়, কত দূরে বসে কে গাইছে তা এই অন্ধকার ঘরে দাঁড়িয়ে বোঝা অসম্ভব।
মাদল ইতিমধ্যে সোফায় বসে ঢুলতে শুরু করেছিল, গানের সুর তার কানে যাওয়ামাত্র সেও তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠে এসে দাঁড়ায় অন্যদের পাশে। ফিসফিস করে বলল, আজ আবার।
রিদম নিচু গলায় বলল, কাল দোতলা থেকে এত স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল না। এই গান নিশ্চয় বহুকাল আগে কেউ গাইত। হয়তো এই পরিবারের কেউ চমৎকার গান জানতেন। এখনও প্রতি রাতে শোনাতে আসেন বাইরে আসা মানুষজনকে।
টপ্পা বলল, আজ কলিগুলোর কথাও বুঝতে পারছি।
সায়ন তাকিয়ে আছে গার্গীর বিস্ময়ে টং হয়ে থাকা মুখখানার দিকে। গার্গী বুঝতে চাইছে কোথা থেকে কীভাবে ভেসে আসছে এই গান।
পাঁচজনেই মুহূর্তে স্তব্ধ। এ কী অপূর্ব গানের সুর রাজবাড়ির কোন গহন থেকে উৎসারিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে এক ঘর থেকে আর এক ঘরে।
গার্গী লক্ষ করছে তিন সুরশিল্পীর অভিব্যক্তি। থ্রি পেনি অপেরার একমাত্র ধ্যানজ্ঞান সুর নিয়ে, এই কণ্ঠশিল্পীর গলার সুরেলা জাদু শুনে তারা এমনই অভিভূত যে, তিনজনেই গানটা শুনছে মন দিয়ে।
রিদম বলল, টপ্পা, গানটা কোথাও কি শুনেছি আগে।
টপ্পা বলল, কী আশ্চর্য, এই গান এ-বাড়িতে কে গাইছে!
মাদল বলল, এই গান যে এত পুরোনো তা জানতাম না।
মাত্র কয়েকটা কলি গেয়ে গানটা বন্ধ হয়ে গেল হঠাৎ। গার্গীও অবাক হয়ে ভাবছিল এত রাতে কে গাইছে এই গান! কোন ঘর থেকে আসছে গানের কলিগুলো।
হঠাৎ তাদের চমকে দিয়ে কোথায় যেন বেজে উঠল রুনুঝুনু রুনুঝুনু রুনুঝুনু –
স্পষ্ট ঘুঙুরের শব্দ। বেশ দক্ষ কোনও নৃত্যশিল্পীর পায়ের ঘুঙুর মাতিয়ে দিচ্ছে শরীরের রক্ত। রিদম বলল, কী আশ্চর্য, কোথায় হচ্ছে এই নাচ?
মাদল বলল, নিশ্চয় নাচঘরের মধ্যেই হচ্ছে। আমরা নাচঘরে গিয়ে দেখি সত্যিই কেউ নাচছে কি না।
রিদম বলল, সায়নদা, গার্গীদি চলুন, নাচঘরে গিয়ে দেখি শব্দটা ওখানেই হচ্ছে কিনা।
গার্গীর হাতে টর্চ, সেই বাকি চারজনকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল নাচঘরের দিকে। কিন্তু রাতের বেলা বন্ধ থাকে নাচঘর। পাঁচজনে সেই বিশাল দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে হতভম্বের মতো।
মাদল ফিসফিস করে, টপ্পা, নাচটা কি এই ঘরের মধ্যেই হচ্ছে? বুঝতে পারছিস কিছু?
গার্গী তাকায় সায়নের দিকে, তোমার কি মনে হচ্ছে এই ঘরের মধ্যেই নাচছে কেউ?
রিদম বলল, কী আশ্চর্য, নাচঘরের দরজা বন্ধ করে রেখেছে কেন?
টপ্পার হঠাৎ কী মনে হল, সবাইকে অবাক করে হন হন করে হেঁটে গেল রাজবাড়ির ফটকের দিকে। ফটকটা বন্ধ থাকে রাতের বেলা, কিন্তু তার পাশে একটা সরু দরজা আছে, সেই দরজা দিয়ে একজন মানুষ ঢুকতে বা বেরোতে পারে। সেই দরজা দিয়ে বেরিয়ে যেতেই মাদল বলল, টপ্পার কি উচিত হল এভাবে একা বেরিয়ে যাওয়া! আমাদের কাউকে ডাকতে তো পারত।
রিদম বলল, আমরাও তা হলে যাই ওর পিছু পিছু।
পাঁচজনেই দ্রুত পায়ে চলল সেই সরু গলিটার দিকে। তখনও সবাই সেই সরু পথ দিয়ে বাইরে বেরোতে পারেনি, অমনি বাইরে চত্বর থেকে একটা বিকট চিৎকারের শব্দ কাঁপিয়ে দিল গোটা চত্বর।
মাদল লাফিয়ে উঠে বলল, এ তো টপ্পার গলা মনে হচ্ছে!
রিদম বলল, আমারও তাই মনে হচ্ছে।
বাইরের চত্বরে টিমটিম করে জ্বলছে মাত্র কয়েকটা কুড়ি পাওয়ারের বাল্ব। তার মধ্যে গার্গীর হাতের টর্চ অন্ধকার ফুঁড়ে একটু পরেই আবিষ্কার করল টপ্পা পড়ে আছে চত্বরে ঘাসের ওপর। দুই চোখ বোজা, সংজ্ঞাহীন।
গার্গী শিউরে উঠে বলল, কী সর্বনাশ!
সায়ন নীচু হয়ে দেখল টপ্পার পায়ের কাছে একটা বড়ো ক্ষত, তার ভিতর থেকে চুঁইয়ে বেরিয়ে আসছে রক্ত।
সায়ন পকেট থেকে মোবাইল বার করে বলল, রামলালকে এখনই গাড়ি নিয়ে আসতে বলি। মনে হচ্ছে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে টপ্পাকে।
তাদের এই কথাবার্তার মধ্যে একটা বড়ো দীর্ঘশ্বাস ফেলল টপ্পা। একটু পরে চোখও খুলল বড়ো করে, বলল, আমি কোথায়?
মাদর আর রিদম মিলে ধরাধরি করে উঠে বসাল টপ্পাকে। টপ্পা উঠে বসল, সংবিৎ ফিরতে মুখ বিকৃত করল, একটা হাত চলে গেল ক্ষত হওয়া পায়ের দিকে। আঙুলের ডগায় লেগে গেল টাটকা রক্ত।
মাদল শুকনো মুখে জিজ্ঞাসা করল, কী করে হল এরকম?
টপ্পার তখন একটু একটু করে ফিরে আসছে স্মৃতি, বলল, আমার মনে হচ্ছিল গানটা যেন রাজবাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে কেউ গাইছে। তাই হঠাৎ বাইরে গিয়ে আবিষ্কার করতে চাইছিলাম গানের উৎস। সে সময় কিছু একটা যেন কামড়ে ধরল পায়ের গোড়ালি। কী ভীষণ যন্ত্রণা।
—কামড়ে ধরল? গার্গী নীচু হয়ে জায়গাটা দেখল আবার। সাপের কামড় নাকি? একেবারে পরিত্যক্ত না হলেও এই রাজবাড়ি বহুদিন আগের তৈরি। কোথায় কোন ফাটলের মধ্যে কোনও বিষাক্ত সরীসৃপ লুকিয়ে আছে কে জানে!
তবে ক্ষতটা আর একবার পরীক্ষা করে গার্গী নিশ্চিত হল সাপের কামড় নয়।
তা হলে কীসের ক্ষত?
আশেপাশে টর্চ জ্বালিয়ে গার্গী আবিষ্কার করল একখণ্ড চৌকো আকারের কাঠের টুকরো।
সায়ন বলল, মনে হচ্ছে এই টুকরোটাই কেউ ছুড়ে মেরেছে টপ্পার পায়ে। এখনই হাসপাতালে দিতে হবে টপ্পাকে। এত জোরে এসে কাঠের টুকরোটা লেগেছে পায়ে যে, সেই আঘাতেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে ও।
রিদম বলল, কিন্তু কে মারবে এই অন্ধকারের মধ্যে।
মাদল বলল, আশ্চর্য এই যে, সাংঘাতিক টিপ তার হাতে।
টপ্পা চেয়ে নিল কাঠের টুকরোটা, বলল, তা হতে পারে। বাইরে বেরিয়ে হাঁটছি অন্ধকারে, হঠাৎ মনে হল কিছু একটা তীব্রবেগে ছুটে এসে কামড় দিল পায়ে।
গার্গী কিছু একটা ভাবল, বলল, কিন্তু যদি ছুড়ে মেরেই থাকে, তা হলে কে ছুড়ল? কেনই বা ছুড়ল? আর যেই হোক, ভূতে কাঠের টুকরো ছুড়ে মেরেছে এমনটা হতেই পারে না।
টপ্পার ক্ষত থেকে তখনও রক্ত বেরিয়েই যাচ্ছে, তাকে রিদম আর মাদল ধরাধরি করে তুলে নিয়ে এল রাজবাড়ির মধ্যে। গার্গীর ব্যাগে একটা মেডিক্যাল কিট আছে, দ্রুত সেই বাক্সটা খুলে বার করল প্রয়োজনীয় ওষুধ ও ব্যান্ডেজ। টপ্পার পায়ের যথাযথ শুশ্রূষা করে বলল, একবার লোকাল ডাক্তারের পরামর্শ নিলে ভালো হত। অন্তত একটা টেটভ্যাকের দরকার।
টপ্পা এক ফুৎকারে প্রস্তাবটা উড়িয়ে দিয়ে বলল, আমার প্রায়ই এখানে-ওখানে কাটে, টেডভ্যাকের কোর্স নেওয়া আছে। আপাতত দরকার নেই।
গার্গী অনেকক্ষণ ধরে বিষয়টা ভাবছিল, টপ্পাকে বলল, টপ্পা, তুমি হঠাৎ রাজবাড়ির বাইরে চলে গেলে, কিছু একটা তোমার মাথায় এসেছিল নিশ্চয়ই?
টপ্পাও অনেক কিছু ভাবছিল, বলল, গার্গীদি, আমি তো সারাক্ষণ গান শুনি। সব রকম গান। লঘু সংগীতও যেমন শুনি, রাগাশ্রয়ী গানও শুনি। বাংলার ভাটিয়ালি-ভাওয়াইয়া যেমন শুনি, আবার আফ্রিকার ফোক সং তাও শুনি। বব ডিলান নোবেল পাওয়ার পর তাঁর যত গান সংগ্রহ করতে পেরেছি, সবই শুনেছি। কাল রাতে যে-গানটা হচ্ছিল, আমার মনে হচ্ছিল এই গান আমার খুব চেনা।
রিদম বলে উঠল, ঠিক, ঠিক। নাচের বাজনাটা শুনেও আমার মনে হচ্ছিল এই মিউজিকও
আমার চেনা। অনেক নাচের দল ব্যবহার করে গ্রুপডান্সের সময়।
গার্গীও গান শোনে, কিন্তু গান নিয়ে এত গভীরভাবে ভাবতে হয়নি কখনও।
কথায় কথায়, উত্তেজনায় কখন যে পার হয়ে গেল একটি ঘটনাবহুল রাত তা যেন বুঝে উঠতে পারল না ওরা। খুব ভোরে হঠাৎ ফটকের সামনে এসে হাজির হল দুই গেটম্যান—বিল্টু আর চাপ, সায়নকে বলল, স্যার, কাল রাতে সব ঘরে আপনারা আলো জ্বালিয়েছিলেন?
সায়ন বলল, হ্যাঁ। কেন?
— না, মানে? রাজাবাবু আমাদের বলে দিয়েছেন কেউ যেন নিজের ঘরের বাইরে আলো না জ্বালেন। মানে, অনেক মিটার আসে তো!
রিদম বেশ উম্মা দেখিয়ে বলল, কিন্তু রাতে যদি রাজবাড়ির নন্দীভৃঙ্গীর দল নৃত্য করতে থাকে, তা হলে কী করব?
চাপ বেশ থমকে গেল রিদমের প্রতিক্রিয়া দেখে, আমতা-আমতা করে বলল, স্যার, এই জন্যেই তো রাজাবাবু নীচের ঘরগুলো কাউকে ভাড়া দিতে চান না। আপনারাই তো জোর করে থাকলেন নীচের ঘরে।
মাদল বলল, তা হলে তোমরা নিশ্চয় জানো কে রোজ রাতে গান গায়, কে নাচ করে, কে দীর্ঘশ্বাস ফেলে?
—না, স্যার। না স্যার। আমরা কিছুই জানি না।
বিল্টু আর চাপ অমনি কেটে পড়ার উপক্রম করে, গার্গী তাদের চলে যেতে নিষেধ করে বলে, তোমরা তো এখানেই থাকো। নিশ্চয় রাজাবাড়ির প্রেতাত্মাদের নাচ-গানের শব্দ শোনো?
—না, ম্যাডাম। না, ম্যাডাম। আমরা কিছু শুনিনি কোনও দিন। এগুলো সবই অপপ্রচার।
— কেন? অপপ্রচার কেন?
— আমরা কিছু জানি না, স্যার। যারা ট্যুরিস্ট, তাঁরা এই সব বলেন এখানে বেড়াতে এসে।
—সেগুলো কি সব মিথ্যে বলতে চাও?
বিল্টু চুপ করে থাকে।
চাপ বলে, আমরাও তো মাঝেমধ্যে অনেক রাত পর্যন্ত রাজবাড়ির ভিতরে থাকি। ট্যুরিস্টদের ফাইফরমাস খাটতে হয়। কই আমরা তো কখনও শুনিনি। কিন্তু আমরা যেই চলে যাই রাজবাড়ি থেকে, অমনি ট্যুরিস্টরা বলে ওই সব শোনে।
গার্গী এবার জোর দিয়ে বলে, এটা হতেই পারে না ট্যুরিস্টরা সব শোনে, আর তোমরা কিছুই শুনতে পাও না! তোমাদের রাজাবাবুও নিশ্চয় সব জানেন। সব জেনেশুনেও তোমরা ট্যুরিস্টদের বিপদের মুখে ঠেলে দাও এভাবে।
চাপ ঘাবড়ে গিয়ে বলল, না স্যার। এই রাজবাড়ি আজ কতদিনের। কত মানুষ এসে থেকেছেন এখানে। কোনও দিন কেউ বলেননি কোনও উপদ্রব হয়েছে কখনও। হঠাৎ গত এক বছরে কী যে হল।
মাদল বলল, তোমরা দেখেছ, আমাদের বন্ধুর কী হয়েছে? আর একটু হলেই মারা পড়ত। চাপ আর বিল্টু দুজনেই হুমড়ি খেয়ে পড়ে টপ্পার ব্যান্ডেজ বাঁধা জায়গাটা দেখে এ ওর মুখের দিকে চাওয়াচাওয়ি করল। বলল, স্যার, আপনারা বলছেন তেনারা মেরেছেন এই স্যারকে?
গার্গী বলল, তোমাদের কি মনে হয় তেনারা এভাবে আহত করতে পারে একজনকে?
বিল্টু আর চাপ দুজনেই কিন্তু-কিন্তু করতে থাকে হতভম্ব হয়ে।
গার্গী এবার থ্রি পেনি অপেরার দিকে তাকিয়ে বলল, এবার তা হলে ব্রনবাবুর সঙ্গে একটু কথা বলতে হয়। রাজবাড়িতে উনি ভূত পুষে রেখেছেন, তার একটা হিল্লে করতে হবে তো!
বিল্টু অবাক হয়ে বলল, উনি ভূত পুষে রেখেছেন?
— বিল্টু, তোমরা ব্রনবাবুকে খবর দাও। হয় উনি এখানে আসুন, না হলে আমরা সবাই মিলে ওঁর কাছে যাব। শিগগির যাও। না হলে আমরা এখনই থানায় খবর দেব-
বলে গার্গী নিজের মোবাইলের কী-বোর্ডে হাত দেয়, বলে রাজবাড়ির ঘর ভাড়া দিয়ে মানুষ খুন করার চেষ্টা করছেন, তা থানায় জানাতে হবে না।
বিল্টু আর চাপ নিজেদের মধ্যে চোখ চাওয়াচাওয়ি করে, তারপর বলল, ম্যাডাম, আমার রাজাবাবুকে খবর দিচ্ছি। তারপর থানায় জানাবেন।
বলে দুজনে ছুটল রাজাবাবুর বাড়ির দিকে।
একটু পরেই ব্রনবাবু হস্তদন্ত হয়ে এসে পৌঁছোলেন রাজবাড়ির বৈঠকখানায়। দুই গেটম্যানের কাছে সব বৃত্তান্ত শুনে তিনিও বেশ উদবিগ্ন, বললেন, কই দেখি, কার কী হয়েছে?
টপ্পার পায়ে ব্যান্ডেজ দেখে বেশ চিন্তিত হয়ে বললেন, আমার কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না রাতের বেলা রাজবাড়ির ভিতরে ঢুকে কেউ আমার বোর্ডারকে মারার চেষ্টা করবে। চারদিকে উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা, গেটে মস্ত তালা। অসম্ভব।
গার্গী বলল, কিন্তু শুধু খুনের চেষ্টাই তো নয়, সারারাত্রি ভূতের নৃত্য হচ্ছে সেটাও তো অস্বাভাবিক।
ব্রনবাবু বিস্মিত হয়ে বললেন, আপনারাও তাই বলছেন? আমি কাল রাতে একবার ঘুরে গেছি রাজবাড়ির চারপাশে। কোনও অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়েনি বা কানে যায়নি।
—রাতে? কটা নাগাদ?
—এই ধরুন রাত্রি দুটো।
গার্গী এবার বলল, রাজবাড়িতে ভূত এসেছিল ঠিক তার পরেই। আড়াইটের পর। ব্রনবাবু বললেন, কী আশ্চর্য, ওরা কি জানতে পারে আমার গতিবিধি?
গার্গী বলল; রনোবাবু ওরা জানতে পারে। এইটেই হল রাজবাড়ির ট্রাজেডি। আপনাদের কোনও আত্মীয় চাইছেন না রাজবাড়িটা এভাবে ব্যবহার হোক। কেউ চাইছে এখানে যেন কোনও
ট্যুরিস্ট না আসে, আপনার আয় বন্ধ হয়ে যাক। বলুন, তাই চাইছে কি না।
ব্রনবাবু বললেন, হ্যাঁ। তাই চাইছে। আমি তো কালই বললাম আপনাদের।
—সেই তাঁরাই এখানে এমন ব্যবস্থা করে গেছেন যাতে কোনও ট্যুরিস্ট এলে তাকে ভয় দেখানো হয়।
সায়নও অবাক হচ্ছিল গার্গীর কথায়, বলল, তুমি কী করে বুঝলে?
—বুঝলাম কাল এখানে আসার পর যা যা ঘটল, তা বিশ্লেষণ করে। ব্রনবাবু বললেন, আমি এখানে এতদিন থেকেও যা বুঝতে পারিনি, তা আপনি এই ক-ঘণ্টায় বুঝে গেলেন? কী আশ্চর্য। কিন্তু আমার আত্মীয়রা তো কলকাতায় বসে এখানকার ট্যুরিস্টদের ভয় দেখাতে পারে না।
— তা পারেন না। কিন্তু এমনও হতে পারে এখানকার কেউ আপনার ওপর বিরক্ত। আপনার আত্মীয় এখানে গত বছর এসে তা আবিষ্কার করেন। আপনিই তো বললেন তারা চাইছেন এখানে রাজবাড়ির সংলগ্ন জায়গায় একটা বিশাল মাল্টি-স্টোরিড হোটেল করে ব্যবসাটা আরও জমিয়ে করতে। আপনি রাজি হননি। তাতে তিনি খুবই ক্ষুব্ধ। তিনি তখন এখানে বসেই এক ফন্দি আঁটলেন। ভাবলেন কোনও ভাবে যদি রাজবাড়িতে ভূতের আমদানি করা যায়, তা হলে ট্যুরিস্টরা আর কোনও ভাবেই এখানে পা দেবে না। তা হলে আপনার রুজিরোজগার বন্ধ।
ব্রনবাবু ঘাড় ঝাঁকিয়ে বললেন, হ্যাঁ। বন্ধ তো হয়েইছে। আজকের ঘটনার পর আর কোনওভাবেই ট্যুরিস্টরা পা দেবে না রাজবাড়িতে। যাও দিনের বেলায় কেউ কেউ আসছিলেন, এর পর তাও বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু
পরক্ষণে ব্রনবাবু বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন, কিন্তু তাঁরা কলকাতায় বসে কী করে এখানে উপদ্রব করছেন?
—রণিতবাবু, তা হলে একটু বিশদে বলতে হয় ঘটনাটা। দুদিন ধরে রাজবাড়িতে বাস করছেন যে তিনজন, তাদের পরিচয় আপনি জানেন না। এই যে তিনজনকে আপনার সামনে বসে থাকতে দেখছেন এরা তিনজনই একটা বাংলা ব্যান্ড চালায়, যেখানে কেউ গান করে, কেউ ড্রাম বাজায়, কেউ বাজায় সিনথেসাইজার। এরা তিনজনে আপনার বাড়িতে এসেছে এখানে যথেষ্ট ভূতের উপদ্রব শুনে। এরা কেউ ভূতে বিশ্বাস করে না, তাই নিছক কৌতূহলে এখানে এসেছে, বিষয়টা দেখে শুনে চক্ষুকর্ণের বিবাদভঞ্জন করতে। পরশু রাতে এখানে ছিল দোতলার ঘরে, অনেক রাতে কিছু অস্বাভাবিক শব্দ শুনেছে, কিন্তু বুঝে উঠতে পারেনি কেন এরকম শব্দ শোনা যাচ্ছে গভীর রাতে। ফলে আরও নিশ্চিত হতে তারা ঠিক করল নীচের ঘরেই থাকতে হবে। সেইমতো আপনার কাছে গিয়ে ঘর নিয়েছে। তারপর আমাদের এখানে দেখে আমাদেরও বলে যাতে আমরাও তাদের মতো রাতে নীচের ঘরে থাকি। বুঝতেই পারছেন একটা বড়ো দল হলে যে কোনও বিপদের মুখোমুখি হওয়া অনেক সুবিধের।
ব্রনবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, আপনাদের সঙ্গে ওদের আগে কোনও চেনাজানা ছিল না?
—একেবারেই ছিল না। আমরা দুজনে এসেছিলাম আলতাপুর রাজবাড়িতে ভূতের উপদ্রব আছে শুনে। বিষয়টা নিয়ে আমাদেরও কৌতূহল ছিল। কিন্তু জেলাশহরের গেস্টহাউসে উঠে রাজবাড়িতে বেড়োতে এসে এত বড়ো রাজবাড়ি মাত্র দেড়ঘণ্টা দেখে কিছু বোঝা যায়নি। এই থ্রি পেনি অপেরার সদস্যদের সঙ্গে আলাপ হতে, ওদের সঙ্গে কথা বলে আমরাও ঠিক করি রাতে থেকে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করব। আর সত্যি বলতে কি, বাইরের যে কেউ যদি এ বাড়িতে রাত কাটায়, নিঃসন্দেহে খুব ভয় পাবে।
ব্রনবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, সত্যিই কি খুব ভয় পাওয়ার কিছু আছে? আমাকেও অনেক বোর্ডার এসে এ ধরনের অভিযোগ জানিয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই যে, আমি নিজে অনেক রাতে ঘুরেছি একা-একা, কোনও দিন কিছুই চোখে পড়েনি বা কানে যায়নি। আপনারা কী শুনেছেন?
গার্গী হেসে বলল, আপনি তো দেখতে বা শুনতে পারবেন না, কেন না যা কিছু হচ্ছে আপনার চোখের আড়ালেই ঘটছে।
—কী ঘটছে বলুন তো খোলসা করে? ব্রনবাবু এবার রীতিমতো উত্তেজিত।
—ঘটছে অনেক কিছু। হঠাৎ মধ্যরাতে আপনার নাচঘরে শুরু হল ঘুঙুরের শব্দ। রীতিমতো নাচের আসর বসে রাতের বেলা।
—সত্যিই বসে? বলছেন কী? ব্রনবাবুর যেন বিশ্বাসই হচ্ছে না। আর-
—আর কেউ এসে গান গায় রাতের বেলা। খুব করুণ সুরের গান। যেন কোনও প্রেতাত্মা গান গেয়ে ঘুরে বেড়োয় রাজবাড়ির এ-ঘরে ও-ঘরে, অলিন্দে-অলিন্দে।
—মাই গড। আপনারাও তাই বলছেন? আরও অনেক বোর্ডাররাই বলেছেন আমার কাছে। আমি বিশ্বাস করিনি, কারণ এরকম কোনও ঘটনা আমি অনেক চেষ্টা করেও ধরতে পারিনি কখনও!
—আপনি পারবেন না কারণ এই অশরীরী সত্যিই অশরীরী নয়, একেবারেই শরীরী।
—শরীরী! উত্তেজনায় সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন ব্রনবাবু। বললেন, কারা তারা?
—হ্যাঁ, বলছি। তার আগে আপনার রাজবাড়ির ফটক বন্ধ করে দিন যাতে তিনি পালাতে না পারেন।
ব্রনবাবু চাপের দিকে তাকাতে চাপ গিয়ে বন্ধ করে দিয়ে এল দরজাটা।
—রণিতবাবু, আমরা প্রথমে এই অস্বাভাবিক ঘটনার উৎস কী বুঝে উঠতে পারিনি। সুবিধে হয়ে গেল এই থ্রি পেনি অপেরার অভিজ্ঞতার কারণে। কখনও গানের কলির হাওয়ায় ঘুরে বেড়োনো, কখনও নাচঘরের মধ্যে নাচের ঘুঙুরের বেজে ওঠা—এই যে দেখছেন তিন গানের সমঝদার, এরা শুনে বলল এই গানের কলি, এই নাচের ঘুঙুরের শব্দ সবই ওদের চেনা। তার মানে এগুলো সত্যিই কোনও অশরীরীর কাজ নয়, কোনও শরীরী মানুষ এগুলো করছে বোর্ডারদের ভয় পাওয়ানোর জন্য। তখনই রাজবাড়িতে ঢুকে আর একটা দৃশ্যের কথা মাথায় এল। রাজবাড়ির চত্বরে এমন কেউ থাকে যার কাছে একটি পুরোনো স্টিরিও সাউন্ড সিস্টেম আছে, কিন্তু তার স্পিকার দুটো নেই। আমার মনে হল তা হলে নিশ্চয় এই স্পিকারদুটো রাজবাড়ির ভিতরে কোথাও ফিট করা আছে, গভীর রাতে যখন বোর্ডাররা নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে, কেউ একজন সেই সাউন্ড সিস্টেমে সিডি চালিয়ে দিচ্ছে, তাতে কখনও গানের কলি বাজছে, কখনও নাচের ঘুঙুরের শব্দ। এমনকী, একটি সিডি আছে যাতে রেকর্ড করা আছে কিছু ফিসফিস কথার শব্দ, কিছু দীর্ঘশ্বাস ছাড়ার আওয়াজ। সব মিলিয়ে এক দিব্যি ভূতুড়ে পরিবেশ।
গার্গীর কথার মধ্যে একজনকে অস্থির দেখাচ্ছিল বেশ। ব্রনবাবু বড়ো বড়ো চোখ করে তাকালেন তার দিকে, বললেন, আপনি বসন্তের কথা বলছেন?
—হ্যাঁ। বসন্ত দিগার কোনও কারণে আপনার ওপর বেশ বিরক্ত। আপনি বলেছিলেন আপনার ছোটোভাই রণবীর সিংহরায় গত এক বছরের মধ্যে দুবার এসেছিলেন আপনার সঙ্গে বড়ো হোটেল করার প্রস্তাব নিয়ে। আপনি দুবারই বাতিল করেছিলেন তার প্রস্তাব। আপনি নিশ্চয় মনে করতে পারছেন তিনি খুবই ক্ষুব্ধ, ক্রুদ্ধ আপনার এই সিদ্ধান্তে। তখন তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন আপনাকে জব্দ করতে হবে যাতে আপনি আর রাজবাড়ির ঘর ভাড়া দিয়ে রোজগার করতে না পারেন। তিনি এখানে এসে লক্ষ করলেন বসন্ত দিগার পছন্দ করেন না আপনাকে। তখন বসন্ত দিগারের সঙ্গে তাঁর একটি গোপন আঁতাত হয়। রণিতবাবু তাঁর একটি পুরোনো সাউন্ড সিস্টেম বসন্তকে দিয়ে বলেন, তার স্পিকার দুটো রাজবাড়ির দুই ঘরের দুটি গোপন জায়গায় বসিয়ে রাখতে। তারপর যেদিন কেউ থাকতে আসবে রাজবাড়িতে, সময় বুঝে মাঝরাতে কখনও গান, কখনও নাচের ঘুঙুরের আওয়াজ, কখনও ফিসফিস শব্দ চালিয়ে দিতে। রিমোট চালিয়ে এই কাজটা গত এক বছর ধরে দিব্যি চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
ব্রনবাবু হঠাৎ বললেন, কিন্তু টপ্পাবাবুকে আহত করল কে?
—রণিতবাবু, আপনার বসন্ত দিগারকে আপনি কতটা চেনেন তা জানি না। কিন্তু ওঁর পদবি দেখে বুঝেছি উনি লোধা সম্প্রদায়ের মানুষ। লোধারা এখন লেখাপড়া শিখে দ্রুত উন্নতির পথে। কিন্তু কিছুকাল আগেও লোধারা ওঁত পেতে বসে থাকত জঙ্গলের মধ্যে। রাস্তা দিয়ে যে কেউ একলা যেত, সাইকেলে বা হেঁটে, অনেক দূর থেকে বাঁশের গাঁট, যাকে স্থানীয় মানুষ পাবড়া বলে থাকে, তা ছুড়ে মারত সেই একলা পথিককে। কাল রাতে টপ্পা যখন গানের সুরের উৎস কোথায় তা আঁচ করতে রাজবাড়ির বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছিল, বসন্ত দিগার ভয় পেয়ে ভাবল বোধহয় ধরা পড়ে যাবে তার জারিজুরি, তখনই তার কাছে থাকা এই কাঠের টুকরো ছুড়ে টপ্পাকে ফেলে দেয় ঘাসের ওপর। এর ফলে টপ্পা প্রাণে মরবে না, কিন্তু তখনই তার আর হাঁটার শক্তি থাকবে না। তবে ওই টুকরোটা এত জোরে এসে লেগেছিল টপ্পার পায়ে যে, সে সাময়িকভাবে হারিয়ে ফেলেছিল জ্ঞান।
ব্রনবাবুর দুই চোখে তখন আগুন জ্বলছে দাউ দাউ করে। সামনে দাঁড়ানো বসন্ত দিগার তখন কী করবে ভেবে পাচ্ছে না।
টপ্পা বলল, রণিতবাবু, আপনি ওকে থানায় দিয়ে দিন। আপনার টাকায় ও খাবে, আবার আপনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করবে তা কী করে হয়।
ব্রনবাবু সঙ্গে সঙ্গে পকেট থেকে মোবাইল বার করে ফোন করতে শুরু করলেন থানার অফিসারকে।
***
