উপন্যাস
গল্প
উপন্যাস

এলেভূতের সন্ধানে – তপন বন্দ্যোপাধ্যায়

এলেভূতের সন্ধানে

নতুন খড় দিয়ে মরাই ছাইতে ছাইতে গল্পটা শুনিয়েছিল পঞ্চ ঘরামি। এলে ভূতের গল্প। এলেভূত যে কী জিনিস তখনও জানতাম না। কিন্তু পঞ্চ ঘরামির গল্প বলার ধরন এমনই যে, ভূতপ্রেত সব জ্যান্ত হয়ে ঘোরে চোখের সামনে। শিরশির করে ওঠে গা-হাত-পা-শরীর।

এখন ঘোর শীতকাল। ‘পোষের শীত মোষের গায়/ মাঘের শীত বাঘের গায়’ এরকম একটা প্রবচন আমাদের প্রায়ই বলতেন ঠাকমা। এখন পৌষের শেষে সেই শীত কাঁপ ধরিয়ে দিচ্ছে দুশো বত্রিশখানা হাড়ে। তার মধ্যে একটু আগেই এই সাতসকালে দু-গেলাস নলেন রসে পাটকাঠি ডুবিয়ে চোঁ চোঁ করে সাবাড় করেছি। তাতে শীতের দাঁত আরও ধারালো আরও তীক্ষ্ণ হয়ে ফোটাচ্ছে সারা গায়ে। একটা ছোটোমোটো শাল জড়িয়ে রেহাই পেতে চাইছি শীত থেকে। শালে কুলোচ্ছে না বলে বইখাতা ফেলে ছুটেছি পুকুরপাড়ে রোদ পোহাতে। পুকুরের চারপাশে নতুন চামরমণি ধানের গোছ ডাঁই হয়ে জমে আছে ক’দিন ধরে। একপাশে ঝাড়াই-মাড়াই হচ্ছে সেই ধানের গোছ। তার খড় টাল হয়ে জমা হচ্ছে খামারের পাশে। আর সোনালি ধান মাথায় মাথায় চলে যাচ্ছে মরাইতে।

পুকুরের চারপাশে তাই নতুন ধানের মিষ্টি গন্ধ। সেই গন্ধের ওম নাকের লতিতে নিয়ে বসে পড়ি একগলা রোদের মধ্যে। মরাইয়ের ধার ঘেঁসে। নতুন মরাইটা বেশ বড়োসড় করে বাঁধা হচ্ছে এবার। সেখানে পঞ্চ ঘরামি মরাইয়ের উপর বসে, আর নীচে থেকে নতুন খড় জোগান দিচ্ছে তার ছেলে ফড়িং।

তার মধ্যেই আবার ভূতের গল্প! তাতে তো শরীরের কাঁপ আরও বেড়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু তা হল না পঞ্চ ঘরামির গল্প বলার ভঙ্গিতে। বরং রক্ত আরও চলকে ওঠে, গায়ের লোম খাড়া হয়।

পঞ্চ ঘরামি এ তল্লাটের নামকরা ঘরামি। তার চেহারাটা যেমন দশাসই, তেমনি তার হাতের বাইসেপ। তার বুকটাই শুধু বিয়াল্লিশ ইঞ্চি। তার জন্যে পঞ্চ ঘরামিকে কখনও ডনবৈঠক দিতে হয়নি বা বার্বেল ভাঁজতে হয়নি। হাতে-পায়ের বেশ কিছু শিরা নারকেলের দড়ির মতো পাকিয়ে রয়েছে যা অনেক দূর থেকেই দৃশ্যমান।

পঞ্চ ঘরামি সম্পর্কে নানা গল্প লোকমুখে প্রচারিত, তার মধ্যে একটা হল গাঁয়ে ডাকাত পড়া ও একচড়ে ডাকাত সর্দারের পঞ্চত্বপ্রাপ্তি। সেবার চারপাশে হইচই ফেলে ডাকাতরা যে-বাড়িতে ঢুকছে, লুটপাট করে নিঃস্ব করে দিচ্ছে মনের সুখে। তাদের বাধা দেবে তেমন পুরুষমানুষ কই গাঁয়ে। এক পঞ্চ ঘরামি আছে কিন্তু সে তো ঘুমিয়ে পাহাড়। পঞ্চ ঘরামি রাতে ঘুমোলে নাকি কেটে ফেললেও উঠতে পারে না। ডাকাত পড়ায় সেবার কীভাবে যেন তার কানের মধ্যে জল ঢেলে ডেকে তোলে গাঁয়ের মানুষ। পঞ্চ ঘরামির গায়ের জোর কত সে-গল্প পাঁচগাঁয়ের মানুষ জানে, জানে ডাকাতরাও। কিন্তু লোকে এও জানে তার কুম্ভকর্ণপ্রতিম ঘুমের গল্পও। ডাকাতরাও সেই কাহিনি সম্পর্কে সচেতন বলেই এ গাঁয়ে ডাকাতি করার সাহস পেয়েছে। কিন্তু তারা ভাবতে পারেনি পঞ্চ ঘরামি জেগে উঠবে মধ্যরাতে। পঞ্চ ঘরামি জেগে উঠে কিছুক্ষণ সময় নিল ব্যাপারটা বুঝতে। তারপর এক হুঙ্কার দিয়ে ছুটল সেই বাড়িটার দিকে যেখানে তখনও লুটপাট চলছে ঘোরতরভাবে। ডাকাতরা হঠাৎ ঘটনাস্থলে পঞ্চ ঘরামিকে আবির্ভূত হতে দেখে বেশ থতমত। নিজেদের মধ্যে কী যেন বলাবলি করে লুটপাটের মাল ফেলে ছুট লাগাল পড়িমরি করে। পঞ্চ ঘরামির চোখে তখনও কিছু ঘুম। নইলে ডাকাতদের ধরতে তার দু মাইল ছুটতে লাগে! শেষে ডাকাতদের সর্দারকেই জাপটে ধরতে পারল আর এমন একখানা থাপ্পড় লাগাল যে তাতেই স্বর্গলাভ হয় তার। তারপর থানা-পুলিশ হয়ে কী ছিরকুট্টি কাণ্ড!

সেই গল্প আমাদের শোনাতে শোনাতে পঞ্চ ঘরামি হেসে বলে, সে সব কী দিনকাল ছেল, দা’ঠাকুর! লোহা চিবিয়ে খেতে পারতাম।

সেই পঞ্চ ঘরামির বয়স এখন কত হবে তা আর জিজ্ঞাসা করা হয়ে ওঠে না। কিন্তু এখনও তার চেহারা দেখে ডাকাত দল কেঁপে উঠবে নিশ্চিত।

শুধু যে ডাকাত মারার গল্পই তার ঝুলিতে তা কিন্তু নয়। মাঝেমধ্যে কাজে বা অকাজে এসে কত যে গল্প শোনায় তার সীমাসংখ্যা নেই। কখনও শ্মশানকালীতলার মামদো ভূতের গল্প, কখনও সুন্দরবনে গিয়ে বাঘের মুখে পড়ার গল্প, কখনও কখনও বাজি ধরে এক ধামা নাড়ু এক আসনে বসে খাওয়ার গল্প, কখনও এক পাগলা ঘোড়ার পিঠে চড়ে বিপত্তির গল্প।

সেই পঞ্চ ঘরামি আজ হঠাৎ মরাই ছাইতে-ছাইতে বলতে শুরু করল এলেভূতের গল্প। তখন ভোরের শীত পেরিয়ে দিনের রোদ ঢুকে পড়ছে তার ফণা তুলে। শীত কমতে শুরু করেছে গা থেকে। তবু শালের ওম গায়ে নিয়ে আমি বলি, এলেভূত! সে আবার কী?

—এলেভূত কী তা কি আমিই জানতাম? শুনেছিলাম আমাদের গাঁয়ের লক্ষ্মণখুড়োর কাছে।

কে লক্ষ্মণখুড়ো তা জিজ্ঞাসা করলে এখন আবার সেই কাহিনি সাতকাহন শোনাতে বসবে পঞ্চ ঘরামি। তাতে এলেভূতের গল্পটা মাঠে মারা যাবে।

কিন্তু পঞ্চ ঘরামি সে প্রসঙ্গ এড়িয়ে যেতে দিল না, বলল, কে লক্ষ্মণখুড়ো তা জানতে চাইলে না তো, দা’ঠাকুর!

বাধ্য হয়ে বলতে হল, কে ছিলেন তিনি?

—সে এক ভারী রগুড়ে লোক। থাকত আমাদের গাঁয়ে। আমাকে দেখলে বলত, পঞ্চ, তোর এরকম পাহাড়ের মতো শরীর! তুই ঘর ছেয়ে নষ্ট করলি জেবনটা! তোর হওয়া উচিত ছেল মস্ত ব্যায়ামবীর। রেবা রক্ষিতের মতো বুকে হাতি তুলতে পারতিস। তাতে তোর বাড়িতে পয়সা রাখার জায়গা হত না!

রেবা রক্ষিত যে একজন শক্তিমতী মহিলা, সার্কাসে বুকের উপর হাতি তুলে শিহরিত, রোমাঞ্চিত করতেন দর্শককে সে কথা বহুবার শুনেছি আমাদের বাবা-কাকাদের মুখেও।

রেবা রক্ষিতের প্রসঙ্গ তুললে হয়তো তাকে নিয়েই এখন দশকাহন ফাঁদতে বসবে পঞ্চ ঘরামি। তার চেয়ে এলেভূতেই ফিরে যাওয়া যাক এই ভেবে বলি, তারপর পঞ্চদা, এলেভুতের কী হল?

—তো লক্ষ্মণখুড়োর কথা বলছিলাম না? আমার কাছে আর কী শোনছ! তেনার কাছে গল্প শুনলে তিন জনম কেটে যাবে, বুঝলে, দা’ঠাকুর! তিনি নাকি সুন্দরবনে মাছ ধরতে গিয়ে একবার একটা বাঘ মেরেছিলেন বলে খুব গর্ব ছিল তেনার।

বাঘের গল্প আমার কাছে যদিও খুব প্রিয়, কিন্তু এখন এলেভূতটা আমাকে এমন উসকোচ্ছে যে, সুন্দরবনের বাঘকেও ঠেলে সরিয়ে দিই একপাশে। বলি, তুমি এলেভূতের গল্পটাই আগে বলো, পঞ্চদা।

—তো সেই লক্ষ্মণখুড়োর কাছেই শুনেছিনু এলেভূতের কথা, বলে পঞ্চ ঘরামি একটু থামে। তার গল্পে আবার সেই লক্ষ্মণখুড়োর কথাই ঘুরেফিরে আসে দেখে মুখ কিসমিস করে তাকিয়ে থাকি। কার গল্প শুরু হবে এবার, লক্ষ্মণখুড়োর, না এলেভূতের!

না, এল দুজনেই। একজনের পিঠে আর একজন চড়ে।

—বুঝলে, দাঠাকুর, সেই লক্ষ্মণখুড়ো বলেছিল এলেভূত নাকি জলের মধ্যে থাকে। এলোমেলো ঘুরে বেড়ায়, এক-একবার ভুস করে ঠেলে ওঠে উপরে, দপ করে আগুন জ্বালায়, আবার আগুন নিবিয়ে ভুস করে ডুবে যায়। আগুনটা নাকি তার নিশ্বাস। কখনও জলের মধ্যে একলা মানুষ বাগে পেলে তার ঘাড় ঠেসে ধরে জলের তলায়। তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না।

এতক্ষণে বুকের মধ্যে হাপিসটিপিস করতে থাকে। কী জানি কেমন সেই এলেভূত!

—বুঝলে, দাঠাকুর, এলেভুতের নাম জানতাম, কখনও চোখেও দেখিনি তাকে, সেই এলেভূতের পাল্লায় পড়ব তা স্বপনেও ভাবিনি।

চমকে উঠে বলি, এলেভূতের পাল্লায় পড়লে? কী সর্বনাশ!

—সব্বোনাশ বলে সব্বোনাশ! যাকে বলে সাড়ে সব্বোনাশ!

–তা কোথায় পেলে সেই এলেভূতকে?

— বুঝলে, সেবার লালতাকুঁড়ি গাঁয়ে গেছি ষাঁড়ের লড়াই দেখতে। সে যদি দেখতে ষাঁড়ের লড়াই, তুমি নিশ্চিত ভিরমি খেয়ে যেতে!

এলেভূতের মধ্যে ষাঁড়ের লড়াই ঢুকে যাক তা আমি একেবারেই চাই না, কিন্তু পঞ্চ ঘরামির কাছে গল্প শুনতে গেলে মাঝেমধ্যে বেলাইন হবেই তার গল্প। আসলে গল্পের পেটে গল্প থাকে পঞ্চ ঘরামির ঝুলিতে। কিন্তু না, এবার ষাঁড়ের লড়াইকে রেহাই দিয়ে ফিরে এল এলেভূতের গল্পে।

—ষাঁড়ের লড়াই দেখে ফিরতে অনেক রাত হয়ে গেল সেবার। অন্তত পাঁচক্রোশ পথ ফুরুতে হবে জোর পায়ে হেঁটে। হয়তো পৌঁছোতে ভোর হয়ে যাবে। তাই বড়ো রাস্তা দিয়ে নয়, সরাসরি মাঠ ভেঙে পেরোচ্ছি অতখান পথ। সঙ্গে গাঁয়ের আরও জনাছয়েক ছেলে। সবারই জোয়ান বয়স। হাঁটতে-হাঁটতে পৌঁছে যাই চেনাই দহের বিল। সেই বিলের পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে কে যেন বলল, ‘পঞ্চদা, এখেনে বাবলাঘাঁটি গাঁয়ের তিনু সর্দারের লাশ পাওয়া গিয়েছিল না?’শুনে মনে পড়ে গেল গল্পটা। না, ঠিক গল্প নয়, সত্যি ঘটনা। পা-দুটো উপরে ভেসে আছে, মুণ্ডসহ শরীরটা নীচে।

সেই তিনু সর্দারের লাশের গল্প শুরু হবে ভেবে আঁতকে উঠি। যদিও জানি পঞ্চ ঘরামি যে- গল্পই শুরু করবে তা শেষ না-হওয়া পর্যন্ত দম বন্ধ হয়ে থাকবে। কিন্তু তিনু সর্দারের লাশ থেকে গল্প ঘুরে গেল এলেভূতের দিকে।

—বুঝলে, চেনাই দহের বিলের ধারে কতবার এসেছি দিনমানে। বিলের জলও আমাদের তন্নতন্ন চেনা। এর মধ্যে বড়োবড়ো রুই আর কাতলায় ভরা। এক-একটার ওজন হবে পনেরো- কুড়ি কেজি। বিয়ের লগনশায় কত-কত যে জাল পড়ে বিলের জলে তার ইয়ত্তা নেই। সাতগাঁয়ের মানুষ চেনাই দহের মাছ খেয়ে ধন্য ধন্য করে।

চেনাই দহ থেকে পঞ্চ ঘরামি কখন যে এলেভূতের গল্পে ঢুকবে আমি সেই প্রত্যাশায় অপেক্ষা করি। গল্প তখন ঘাই দিতে থাকে চেনাই দহের জলে। লাফিয়ে উঠতে থাকে সেই বিশাল আকারের মাছগুলো। শরৎচন্দ্রের কার্তিক আর গণেশদের দেখতে ইচ্ছে হয় মনে-মনে। কিন্তু সেই লোভ সামলে আমি শুনতে থাকি পঞ্চ ঘরামির গল্প।

—বুঝলে, তখন চারদিক জনমানবহীন। সুনসান করছে গোটা চত্বর। ঘুরঘুট্টি আঁধারে কোথাও আলো বলতে নেই। হাওয়ায় শব্দ উঠছে শোঁ শোঁ করে। এক-একটা হাওয়া দমকা মেরে মিলিয়ে যাচ্ছে কোথায় না কোথায়! বিলের জল তখন সমুদ্দুরের মতো। তার আদিঅন্ত কিছুই বোঝা যায় না আঁধারে। চোখে দেখা যায় না তার জল। শুধু একটা কালো চাদরের মতো শুয়ে আছে সাত মাইল লম্বা হয়ে। আর বিলের ধার ঘেঁসে ফুটে আছে অজস্র নালফুল। তার বড়ো বড়ো পাতার মধ্যে থিকথিক করছে নালগুলো। কিন্তু অন্ধকারে দেখাই যাচ্ছে না তার রং। মেঠোপথ এক্কেবারে নির্জন। লোকজন দূরের কথা, একটা ঝিঁঝি পর্যন্ত রা কাড়ছে না কোনও দিগরে।

বললাম, বেশ সাংঘাতিক জায়গা, তাই না?

—বেজায় সাংঘাতিক। এ সব তল্লাটে সন্ধে হতে না হতে নিশুত। রাতে লোকজন চলাফেরা করে না। লোকে বলে সন্ধের পর চেনাই দহের বিলের ধারে নিশি হাতছানি দেয়। ডেকে নিয়ে যাবে সুন্দরী মেয়ের রূপ ধরে।

অধৈর্য হয়ে বলি, তারপর? এলেভূতের কী হল?

—সেইটে বলার জন্যিই তো এত তোড়জোড়।

—তোমার ভয় করছিল না?

—ভয়! পঞ্চ ঘরামি হেসে ওঠে আমার অজ্ঞতায়, বলে, ছোটোবেলা থেকে আমার শরীলে ভয়ডর বলতে নেই। তা ছাড়া আমরা তো তখন সাতজন! আমার একা যেতেও ভয় করত না। ভূতের ভয় তো নেইই। কতবার বাজি ধরে রেতের বেলা শ্মশানে গেছি মাঝরাতে। একবার বাজি- ধরার লোকেরা বলল, ‘তুমি যাওনি। মিথ্যে বলছ।’ বলি, ‘তাইলে একটা পাঁচটাকার নোট সই করে রেখে এসো চিতার উপর। দেখো ঠিক গে নে আসব’খনে।’ ব্যস, যে কথা সেই কাজ। সই করা নোট নে এসে তাক লাগিয়ে দিছি সবাইকে। আর মানুষের ভয়! মানুষও আমাকে দেখলে ডরায়।

আমি শুধু একটা কথা বেফাঁস বলে ফেলতে অমনি আর একটা গল্প পেড়ে ফেলল পঞ্চ ঘরামি। তৎক্ষণাৎ গল্পের মুখ ঘুরিয়ে দিতে বলি, তারপর? এলেভূতের কী হল, ও পঞ্চুদা? এল নাকি তোমাদের পথের উপর?

—ওই দ্যাখো, এলেভূত পথের উপর আসবে কী করে? তেনারা তো থাকে জলের মধ্যি। তোমারে তো আগেই বললাম। তো এলেভূত সত্যিই এল।

–এল! আমার বুকের ভিতর কাঁপ ধরে।

—হ্যাঁ। বিলের ধার দে সাতজনে জোর পায়ে হাঁটছি। হঠাৎ দেখি মাইলখানেক দূরে একটা আগুনের ডেলা দপ করে জ্বলে উঠল। আমাদের মধ্যে কে একজন বলল, পঞ্চদা, ওই দ্যাখো—

আমি দম বন্ধ করে বলে উঠি, কী দেখলে?

—দেখি কি, আগুনের ডেলাটা ভাসছে জলের উপর। কিন্তু একসঙ্গে সবাই দেখছে আগুনের ডেলাটা। এ নিশ্চয় চোখের ভুল নয়। এত দূর থেকেও দেখতে পাচ্ছি আগুনের ডেলাটা ভেসে- ভেসে এগোচ্ছে এদিকেই। বাকি সবাই তো ভয়ে আধখানা। ততক্ষণে জোর পায়ে হেঁটে পৌঁছে গেছি বিলের মাঝ বরাবর। দলের অন্যেরা তখন দৌড় দে পালাতে চাইছে। কিন্তু আমি তাদের থামিয়ে বলি, রোসো, বেপারটা কী তা ভালো করে বুঝতি দে।

একটু পরেই দেখি আগুনের ডেলাটা ভাসতে ভাসতে এগিয়ে আসছে আমাদের দিকে। বেশ জোরেই এগোচ্ছে দপদপ করতে করতে। আমাদের পটলা ভয় পেয়ে গোঙাতে থাকে, কী হবে পঞ্চদা? আজ রেতে নির্ঘাত আমাদর এলেভূতে ধরবে।

তাদের বুক থেকে ভয় তাড়াতে বলি, অত ভয় কীসের? ভূত সামনে এলে কষে ধমক দিবি। যাক গিয়ে, এখন তাড়াতাড়ি পা চালা।

—নিজের জন্য নয়। ভূতে আমাকে কখনও কাবু করতে পারবে না। ভূতদের যা হাড়গিলে চেহারা, তাতে আমার নিরানব্বই সিক্কার ঘুষি সামলাতে দম বেরিয়ে যাবে ব্যাটাদের। কিন্তু দলের বাকি ছ’জন এমন ছড়তাড় করছে যে, জায়গাটা পার হতে পারলেই যেন বাঁচে। পা চালিয়ে ছুটছে সবাই। উদ্দেশ্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এলেভূতের আওতা থেকে দূরে পালিয়ে যাওয়া। কিন্তু হল কি, হঠাৎ সাঁইসাই করে একটা দমকা হাওয়া লাফিয়ে চলে এল আমাদের ঘাড়ের উপর। তখন সামনে বিশাল জল কালো রং মেখে ভুষ হয়ে আছে, তার মধ্যে রাশ-রাশ নালফুল ফুটে আছে, সেগুলোর রংও তখন মিশকালো, আমরা হাওয়া সামলে হাঁটছি এলোমেলো পায়ে, সে সময় দেখি কি আগুনের তেলাটা ভুস করে নিভে গেল। যেই না হাঁপ ছেড়ে ভাবছি, যাক, বোধহয় নিস্তার পাওয়া গেল এলেভূতটার হাত থেকে। বোধহয় জানতে পেরেছে দলটার সঙ্গে পঞ্চ ঘরামি আছে। বেশি জারিজুরি খাটবে না। কিন্তু সে বোধহয় কিছুক্ষণ, হঠাৎই দেখি আগুনের ডেলাটা ভেসে উঠল আমাদের একেবারে কাছে। বলতে গেলে হাতার মধ্যে। তক্ষুনি বিশে নামের একটা ছেলে হাউমাউ করে চেঁচিয়ে উঠে প্রায় ভিরমি খাবার জোগাড়। তাকে এক ধমক গিয়ে বলি, চুপ, চুপ। যে-ছোঁড়া ভয় পাবে তার গা বেয়ে উঠে পড়বে এলেভূত।

—কিন্তু তাতেও কারও ভয় ভাঙে না, কেউ কেউ অন্ধকারে দৌড় লাগাল বিলের পাশে-পাশে চলতে থাকা মেটেপথ ধরে। কিন্তু এলেড়তের আওতা থেকে রেহাই পাওয়া যে অত সহজ কাজ নয় তারও প্রমাণ পাওয়া গেল পরক্ষণেই। আগুনের ডেলাটা নিভে গিয়ে যেদিকে ছেলেগুলো দৌড়োচ্ছিল সেখানেই গিয়ে ভেসে উঠল। তারা সে-দৃশ্যে এত ভয় পেয়ে গেল যে, পরক্ষণে যতটা এগিয়েছিল ততখানি পিছিয়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে হাইমাউ করে কাঁদতে শুরু করে, ‘পঞ্চুদা, বাঁচাও।’ তখন বললাম, ‘ধুস, ভূতফুত বলে কিছু নেই। চল, আমরা এলেভূতটারে তেড়িয়ে ধরি। আয়, জলে নামি। দেখবি পালিয়ে পথ পাবে না’। তাড়িয়ে ধরার প্রস্তাবে সবাই তো আরও থতমত। বলল, ‘তা কী করে হবে, পঞ্চদা? এলেভূত তো গা বেয়ে ওঠে শুনেছি।’ তাদের বুকে সাহস ভরতে বললাম, ‘একটা বুদ্ধি বার করেছি। সবাই মিলে রামনাম করবি। তাহলে আর এলেভুত গা বেয়ে উঠতে পারবে না। রামের কাছে ব্যাটারা জব্দ। আর সেই ফুরসতে আমরা ভূতটারে ধরব। কাউকে ওর গায়ে হাত লাগাতে হবে না। সে কাজটা আমার।’ তো যে কথা সেই কাজ। কিছুক্ষণ আমতা-আমতা করে সবাই মিলে ঝাঁপিয়ে পড়ে বিলের জলে। নালফুল সরিয়ে পৌঁছে যাই আগুনের ডেলাটার কাছে। তাকে ঘিরে এগোতে থাকি। সবাই তখন রামের পায়ে তেল মাখাচ্ছে। কিন্তু চোখেমুখে যেমন আতঙ্ক, তেমনই কৌতূহল। কী হবে আগুনের ডেলাটার কাছে গেলে তা ভেবে সবাই রুদ্ধশ্বাস। কিন্তু বরাত এমনই যে, যেই মাত্তর আগুনের ডেলাটার কাছে পৌঁছে গেছি, অমনি দপ করে নিভে গেল আগুনটা। আমরা বোকার মতো এ ওর দিকে তাকিয়ে থাকি। পরক্ষণে দেখি আর একটু দূরে ভেসে উঠেছে আগুনটা। বলি ‘দ্যাখ, কেমন ভয় পেয়েছে এলেভূত!’ অমনি কে যেন বলল, ‘ঠিক বলেছ, পঞ্চদা। কী রম ঘাবড়ে দিয়েছি বলো?’ কথাটা সবার মনে ধরে। অমনি সবাই হইহই করে ঝাঁপিয়ে পড়ে তার চারদিক ঘিরে। এগোচ্ছি সবাই। গোল হয়ে ঘিরে ধরছি আগুনের ডেলাটাকে। ভয়ও কেটে গেছে। যেই না তার কাছে পৌঁছেছি, অমনি আবার নিভে গেল আগেরবারের মতো। ছেলেদের সাহস দিতে বলি, ‘দেখলি তো, কী ভয় পেয়েছে ব্যাটা?’ তখন সবাইকার মধ্যে একটা বিপুল উত্তেজনা। পরক্ষণে যেই না একটু দূরে জ্বলে উঠেছে আগুনটা, অমনি আবার এগোতে থাকি তার চারপাশ ঘিরে। বলি, আজ রেতে ধরবই ব্যাটাকে। চল্ রে, বিশে

এই পর্যন্ত শুনে আমার আর ধৈর্য থাকে না, বলি, তারপর? ধরা পড়ল এলেভূত?

—কী আর বলি, দাঠাকুর? সে এক ভারী আজব গল্প।

—কী আজব গল্প, পঞ্চুদা?

—সারারাত ক’জনে মিলে কী তাড়াই না করলাম এলেভূতটারে। তারপর বুঝলাম এলেভূতটা আমাদের চেয়েও ঢের বুদ্ধিমান।

— বুদ্ধিমান! আমার ঠিক প্রত্যয় না পঞ্চুদার কথায়। ভূতের আবার বুদ্ধি থাকে নাকি?

পঞ্চ ঘরামি হাসে, থাকে না আবার? সাত-সাতটা ছেলেকে সারাটা রাত ধরে লণ্ডভণ্ড করে দিল ধোঁকা দিয়ে! কী ঘোরানটাই না ঘোরাল! তাইলে রগড়টা শোনো মন দে।

বলে আবার শুরু হয় তার গল্প, বুঝলে, তো এরকম তেড়িয়ে নে যাচ্ছি তারে এক-একবার, আর এলেভূতটা পালিয়ে যাচ্ছে বারবার। তো আমার ছেলেরা তখন মরিয়া। ততক্ষণে ভোরের রং দেখা দিচ্ছে পুব আকাশে। ফরসা হয়ে আসছে পৃথিবী। কিন্তু এলেভূতটা তখনও চোর-পুলিশ খেলে যাচ্ছে একনাগাড়ে। শেষে এমন হল আমরা একেবারে এলেভূতের হাতার মধ্যে। আমার হাতদুটো তো প্রায় আঁকশির মতো সিড়িঙ্গে। যেই না তারে বাগে পেয়েছি, অমনি একটা লম্বা লাফ দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লাম আগুনের ডেলাটার ঘাড়ে। আর—

—আর? তখন আমারও শ্বাস রুদ্ধ, পেলে এলেভূত?

পঞ্চ ঘরামি হাসে, কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হাসল মিটিমিটি, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, সে এক রগড়ের কাণ্ড!

—কী রগড়? আমারও তর সইছে না শেষটা জানতে।

—আগুনের ডেলাটা নিভে গেল দপ করে। কিন্তু আমিও ছাড়বার পাত্র নই। আগুনটার সাথে সাথে আমিও দিলাম ডুব যাতে ফসকে না যায় ব্যাটা। কিন্তু হাতড়ে-মাতড়ে কী পেলাম জানো?

–কী?

—একটু ফুটো মালসা।

সারারাত এলেভূতের পিছনে এক কোমর জলে ছুটে বেড়িয়ে শেষে একটা ফুটো মালসা পেয়েছে শুনে আমার ঠিক মন ভরে না। এত কষ্ট শেষে সব বৃথা?

পঞ্চ ঘরামি তখন মিটমিট করে হাসছে। বুঝলে দাঠাকুর, আসলে কী জানো, ভূতটুতকে যত ভয় পাবে তত সে চেপে বসবে গাড়ে। তারে যদি তুমি টুটি ধরে চেপে ধরতে চাও তো দেখবে লেজ গুটিয়ে চোঁ চাঁ দৌড় দেবে উল্টোমুখো

পঞ্চ ঘরামির গল্পটা শুনে ঠিক তৃপ্তি হয় না কেন যেন। পরদিন স্কুলে গিয়ে মাস্টারমশাইকে বলি গল্পটা। শুনে মাস্টারমশাই তো হেসে বাঁচেন না, বললেন, পঞ্চ ঘরামি বলেছে এই গল্প? আর তুমি তা বিশ্বাস করলে?

ঠিক বিশ্বাস করিনি, আবার অবিশ্বাসও করিনি, কেন না পঞ্চুদা এর আগেও তার নির্ভীকতার গল্প আরও অনেক শুনিেেয়ছে। তা ছাড়া এলেভূতের কাণ্ডকারখানা শোনার পরেও তার পিছনে ধাওয়া করেছে, সেই ধরার মধ্যেও তো এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ।

পরদিন মাস্টারমশাইয়ের কথা মতো পঞ্চদাকে গিয়ে বলি, পঞ্চদা, আসলে কী জানো, এলেভূত বলে কিছু নেই। আসলে ওটা মিথেন গ্যাস। অনেকদিনের জমে থাকা জলের মধ্যে এই গ্যাসের সৃষ্টি হয়। সেই গ্যাস বুদবুদ কেটে ওঠে জলের নীচে থেকে। সেই গ্যাস যখন জলস্তর পেরিয়ে উপরে বাতাসের সংস্পর্শে আসে তখনই জ্বলে ওঠে আগুন। গ্যাস ফুরিয়ে গেলেই আগুন নিভে যায়। তখন অন্য জায়গায় গ্যাস উঠতে থাকে। সেখানে আবার আগুন ধরে।

কথাটা শুনে অনেকক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে তাকে আমার দিকে। তার অভিব্যক্তি দেখে অনুমান করি কথাটা পছন্দ হয়নি পঞ্চ ঘরামির, বলল, তোমরা লেখাপড়া শিখে কী যে সব বলো, দাঠাকুর!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *