হিজিবিজি ডাক্তারের গোঁফ ও হিটলারের ভূত
সেলবেঁধে বারফট্টাই করতে করতে হাঁটুঅব্দি ধুলো ছিটিয়ে হাঁটছিল উড়ুকুময়ী হাইস্কুলের ক্লাস বেলা
নাইনের ছাত্ররা। বেলা এগারোটা প্রায় বাজো বাজো, আর একটু পা চালিয়ে না-হাঁটলে নির্ঘাত প্রেয়ারের ঘণ্টা পড়ে যাবে, আর প্রেয়ারে যোগ না-দিতে পারলে ক্লাসে ঢোকার অনুমতিও দেবেন না রাশভারী হেডমাস্টার প্রশান্তপ্রভা পুততুণ্ড। অর্থাৎ রোলকলের খাতায় অ্যাবসেন্ট।
অতএব বারফট্টাই কমিয়ে আরও একটু হাঁটার গতিবেগ বাড়াতে যাবে সবাই, হঠাৎ উলটোদিক থেকে একটা শ্লথগতির সাইকেল ক্যাঁচ শব্দে ব্রেক কষে দাঁড়াল। বলা যায় তাদের পথ অবরোধ করেই। বেশ খানিকটা হকচকিয়ে গিয়ে ছাত্ররা মুখ তুলে তাকাতেই দেখল সাইকেলের আরোহী আর কেউ নন, স্বয়ং হিজিবিজি ডাক্তার।
হিজিবিজি ডাক্তারকে এ তল্লাটের সব্বাই চেনে। গাঁয়ের আর সবই এলেবেলে কোয়াক ডাক্তার। তাদের হাতে পড়লে রুগিরা পটাপট এ ধাম ছেড়ে অন্যধামে যাত্রা শুরু করে। কেবল এই একজনই এল এম এফ, লোকে এনাকে বলে ধন্বন্তরি। সেই ধন্বন্তরি ডাক্তার হঠাৎ এই স্কুলটাইমে কেন তাদের পথ আগলে এসে দাঁড়ালেন ভাবতে ভাবতে ক্লাসের ষণ্ডাগুণ্ডা ছাত্র–লাচ্চু মিত্তির থেকে শুরু করে রোগাপটকা ফড়িং রায় সব্বাই অবাক।
হিজিবিজি ডাক্তারের চেহারা, পোশাকপরিচ্ছদ সবই একটু সৃষ্টিছাড়া। তাঁর পরনে সেই ব্রিটিশ আমলের পুরোনো কোটপ্যান্ট, তাতে গোটা চোদ্দো তাপ্পি আর সেলাই। গলায় একখানা ধূসর রঙের পুরোনো হ্যাট, যার বকলসটি তাঁর গলার সঙ্গে বেশ টাইট করে আটকানো। পায়ে রংচটা শায়ের সঙ্গে একজোড়া নতুন মোজা। গলায় লতপত করে ঝুলছে সেই মান্ধাতা যুগের স্টেথোটি।
তবে পোশাকের চেয়েও তাঁর যেটি সবচেয়ে বিখ্যাত তা হল তাঁর ভোঁতা নাকের নীচে একরত্তি বুরুশ বুরুশ গোঁফ। হিজিবিজি ডাক্তার সেই গোঁফখণ্ডটিতে অনবরত আঙুল বোলান, আর বেশ ভারিক্কি গলায় বলেন, ‘এ হল কিনা হিটলারি গোঁফ।’ এই গোঁফখানার নাকি দারুণ মাহাত্ম্য। এহেন গোঁফে দু-চারবার আঙুল বোলালেই বুদ্ধি উথলে ওঠে হিজিবিজি ডাক্তারের মগজে।
তো এহেন হিজিবিজি ডাক্তার হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই, চট করে সাইকেল থেকে নেমে পট করে চেপে ধরলেন ক্লাস নাইনের বোকা-বোকা, সরলসিধে ছাত্র বুধো দত্তর হাত ধরেই বাজখাঁই গলায় বললেন, ‘কি রে, তোর তো চোখমুখ একেবারে ন্যাবা মেরে গেছে অ্যাঁ?’ বলতে বলতে হাত ছেড়ে বুধোর পেটে কী সব কারিকুরি করতেই বুধো তো ‘বাবা রে মা রে’ বলে তারস্বরে চিৎকার।
‘হুঁ, তবে তো ঠিকই ধরেছি, এ হল কামলা’, বলেই তাঁর সাইকেলের হ্যান্ডেলে ঝোলানো ওষুধের বাসো খুলে বুধো কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার হাতে মস্ত একখানা ইনজেকশন। পরক্ষণে বললেন, ‘কাল সকালে উঠেই আমার চেম্বারে যাবি, ওষুধ নে আসবি, ঝুঝলি? নইলে – ‘
বুধোর তখন সেসব শোনার অবকাশ নেই। সে তখন হাউমাউ করে কান্না জুড়েছে, আর তাই দেখে বাকি ক-জন ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়।
হিজিবিজি ডাক্তার কিছুক্ষণ হাঁ করে দৃশ্যটি দেখে মাথার হ্যাটটি ঠিকঠাক করে নিয়ে চেপে বসলেন তাঁর সাইকেলে। তাঁর এই হিজিবিজি অব্যেসটি অবশ্য নতুন নয়। এমন কাণ্ড প্রায়ই করে থাকেন রাস্তায় বেরিয়ে। তাঁকে পথেঘাটে দেখলে গাঁয়ের লোকজন একটু সন্ত্রস্তই থাকে বরাবর। বিশেষ করে তাঁর ওই ইনজেকশনের ভয়ে।
হিজিবিজি ডাক্তারের আসল নাম কিন্তু হিজিবিজি নয়, তাঁর এহেন বিদঘুটে নামকরণের একটি নাতিদীর্ঘ ইতিহাস আছে। সাত নাতনির পর যখন বহু আকাঙ্ক্ষিত একটি নাতি জন্মাল, তখন তার দাদু সাধ করে নাতির নাম রাখলেন হরিগোপাল, আর দিদা আহ্লাদ করে নামকরণ করলেন ব্রজগোপাল। দাদু আর দিদা, দু-জনেরই ভারী আদরের নাতি, ঝোলের লাউ আর অম্বলের কদুর মতো তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে ভালোবাসতেন দুজনেই। কিন্তু বিটকেল ব্যাপার ঘটল একটাই, দুজনের কেউই নামের অধিকার ছাড়তে বিন্দুমাত্রও রাজি নন। অনেক টালবাহানা, রিস্তর জলঘোলার পর ইস্কুলের খাতায় তার নাম লেখানো হল হরিগোপাল ব্রজগোপাল রায়। তারপর লাফিয়ে লাফিয়ে ক্লাসে উঠে ক-বছরের মধ্যে ধাঁ ধাঁ করে ডাক্তারি পাস করে বাড়ির গেটে নামসংক্ষেপ করে সাইডবোর্ড টাঙালেন, ডা. এইচ জি বি জি. রায়, এল এম এফ। গাঁয়ের লোক ডাক্তারের নাম আরও একটু সংক্ষেপ করে ডাকতে লাগলেন হিজিবিজি ডাক্তার।
তো এই হিজিবিজি ডাক্তারের সারাদিন একটাই ধ্যানজ্ঞান, তাঁর ডাক্তারি। অষ্টক্ষণ পাগলের মতো রুগির পর রুগি দেখেন তাঁর চেম্বারে, একটু ফুরসত পেতেই পুরোনো আমলের (হিজিবিজি ডাক্তারের ভাষায় অবশ্য দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আমলের) লজঝরে সাইকেলটিতে ঢনঢন করে ঘুরতে থাকেন এক গাঁ থেকে আর-এক গাঁয়ে, কখনও কল পেয়ে, কখনও না-পেয়েও, স্রেফ দেশসেবা করতেই।
তাঁর এই হুলস্থুল প্র্যাকটিসে সবচেয়ে বিপদ হয়েছে গাঁয়ের কোয়াক ডাক্তারদের। তাঁদের কোনো প্রেসক্রিপশন যদি হিজিবিজি ডাক্তারের হাতে কোনোক্রমে পড়ে, তাহলে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে বলবেন, ও, তুমি বুঝি সেই গ্রেট অশ্বিনীডাক্তারের রুগি। তাই তোমার পাদুটো অমন ফুলে ঢোল হয়েছে? তা বাপু, আমার কাছে আর এসেছ কেন এখন। যাও না, ড্যাঙডেঙিয়ে সোজা যমরাজার কাছে হাজিরা দাও।
অবশ্য রুগি যদি ঠিক মতো, তাঁর হাতে পায়ে ধরতে পারে, তাহলে হিজিবিজি ডাক্তারের মোক্ষম দাওয়াই আর ইনজেকশনে মরা রুগিও কথা বলতে বলতে উঠে বসে।
এ ছাড়াও হিজিবিজি ডাক্তারের আরও অনেক কিছুই হিজিবিজি। যেমন টাইফয়েড রুগির কাছে তাঁর একরকম ফিজ, কিন্তু কলেরার সময় অন্যরকম, ইনফ্লুয়েঞ্জা, ম্যালেরিয়া কিংবা সর্দিজ্বরে আবার ভিন্নতর ফিজ। রোগ অনুযায়ী ফিজের রেট লেখা একটা লম্বা চার্ট টাঙানো আছে তাঁর চেম্বারের দেয়ালে। আবার বড়োলোকদের কাছে যে-ফিজ নেন, গরিবদের বেলা তার চেয়ে ঢের কম। কখনও অর্ধেক, কখনও সিকি, কেউ যদি কাকুতিমিনতি করে বলে, ‘কিছু দিতে পারব না ডাক্তারবাবু,’ তাহলে প্রথমে দু-চার ধমকধামক দিয়ে পরে হেসে বলবেন, ঠিক আছে, মকুব।
আর রাস্তাঘাটে হঠাৎ সাইকেল থেকে নেমে যদি কাউকে নাগালের মধ্যে পেয়ে চিকিৎসা করেন, তাহলে তার ফিজও মকুব, ওষুধও ফ্রি। হয়তো তার নাড়ি দেখে মালুম হল জ্বর, ‘এই রে তোকে তো ম্যালেরিয়ায় ধরেছে, হাঁ-কর, হাঁ-কর,’ বলে হাকুচতেতো কুইনাইন বড়ি টপ করে ফেলে দিলেন তার গালের মধ্যে। আরও ক-টা বড়ি তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, এক্ষুণি কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়গে যা। বড়িগুলো খেতে যেন ভুলিসনি—
তো ডাক্তারের এই বিদঘুটে অব্যেসটা একবার একটা কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলল। একদিন সাইকেলে যেতে যেতে দেখলেন, একটা পেটমোটা লোক তার বাড়ির দাওয়ায় শুয়ে ছটফট করছে যন্ত্রণায়। দেখামাত্র সাইকেল থেকে পট করে নেমে তাকে ভালো করে পরীক্ষানিরীক্ষা করে দেখলেন, তার একপেট জল, আঁতকে উঠে বললেন, ‘আরে, কী জম্পেশ কাণ্ড, তোর তো উদুরি হয়েছে। যমরাজের দোরগোড়ায় পৌঁছোতে মাত্র আর ক-সিঁড়ি বাকি।’ তৎক্ষণাৎ সাইকেল নিয়ে ফিরলেন তাঁর চেম্বারে, সেখান থেকে অস্ত্রপাতি সঙ্গে নিয়ে মুহূর্তের মধ্যে ফিরে এলেন লোকটার বাড়িতে। ব্যস্, লোকটাকে বোঝবার কোনো সুযোগ না দিয়েই ফুটো করে ফেললেন তার পেটটা। সঙ্গে সঙ্গে হুড়হুড় করে জল বেরোতে শুরু করল পেট দিয়ে, প্রায় দু-বালতি জল। ইতিমধ্যে খবর পেয়ে সারা গাঁয়ের লোক হুড়মুড়িয়ে এল ডাক্তারের এহেন কিম্ভূতকিমাকার কাণ্ডটি চর্মচক্ষে অবলোকন করতে। সে প্রায় রথের মেলা। কিছুক্ষণের মধ্যে হাজারখানেক লোকের ছানাবড়া চোখের সামনে একাদশীখুড়োর কুমড়োভুঁড়ি একদম চুপসে আমসি।
এ ঘটনার পর গাঁয়ে এক অত্যাশ্চর্য দৃশ্য লক্ষ করা গেল। কোনো ভুঁড়িওলা লোক আর ডাক্তারের সামনে বের হতে চায় না। দেখা হলেই সট করে হয় কোনো দোকানের মধ্যে, দোকান-বাড়ি না-থাকলে রাস্তা ছেড়ে সিধে নেমে যায় পাশের ধানখেতে। যেন ধানের শিষ কতটা পুরুষ্ট হল তা দেখাটা তার তক্ষুনি দরকার।
ঠিক এহেন সময়ে একদিন মেঠোপথে যেতে যেতে হিজিবিজি ডাক্তারের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল উড়ুক্কুময়ী হাইস্কুলের সেকেন্ড মাস্টার কিষ্কিন্ধ্যাচর পানিগ্রাহীর। সেকেন্ড মাস্টারমশাইয়ের যে এক বিশাল, দোর্দণ্ডপ্রতাপ ভুঁড়ি আছে তা এলাকার সর্বজনবিদিত। হঠাৎ তাকে দেখলে মনে হয় তাঁর হাঁটুতক পাঞ্জাবির নীচে নিদ্রিত একখানা পাঁচ নম্বর সাইজের ঝকঝকে ফুটবল ছাত্ররা মাঝেমধ্যে উঁকিঝুঁকি মেরে দেখেওছে সেকেন্ড মাস্টারমশাই সত্যিসত্যিই কোনো ফুটবল লুকিয়ে রাখেন কি না তাঁর ধবধবে পাঞ্জাবির তলায়। তো সেই নিরীহ ভালোমানুষ সেকেন্ড মাস্টার হঠাৎ পথের ওপর হিজিবিজি ডাক্তারের মুখোমুখি হতে চরম ফাঁপরে পড়লেন। ইতিমধ্যে একাদশীখুড়োর ভুঁড়ি ফাঁসিয়ে দু-বালতি জল হুড়মুড় করে বের করার কাহিনি পল্লবিত হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে দিগদিগন্তরে। কিষ্কিন্ধ্যাচরণ পানিগ্রাহীর কানেও পৌঁছে গেছে সেই রোমহর্ষক গল্পকথা। বস্তুত ভুঁড়িওলা লোকদের কাছে হিজিবিজি ডাক্তার তখন প্রায় বিভীষিকা। তাঁকে দেখে সেকেন্ড মাস্টার তাঁর মস্ত মুখ আমসিপানা করে এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখলেন কাছেপিঠে কোনো দোকানপাট, লোকালয় তো নেইই, একটা বড়ো আমগাছও নেই যে তার ডালে উঠে পড়বেন চট করে। অবশ্য ছোটোবেলার সেই গাছে চড়ার অভ্যেসটা এতদিনে বজায় আছে কি না, থাকলেও এহেন ঘটোৎকচপ্রতিম শরীর নিয়ে গাছে চড়া আর সম্ভব কি না তাও একলহমা ভাবেননি তা নয়, কিন্তু কোথাও কিছু না-দেখে দিশে না-পেয়ে সোজা মাঠ ভেঙে উলটোদিকে চোঁ চাঁ দৌড়! হিজিবিজি ডাক্তার তো আদৌ বুঝে উঠতে পারলেন না, হঠাৎ উড়ুক্কুময়ী হাইস্কুলের সেকেন্ড মাস্টার তাঁকে দেখে অমন দৌড়োলেন কেন বেমক্কা। সাইকেল থেকে নেমে পড়েছিলেন ডাক্তার, কিষ্কিন্ধ্যাবাবুকে অমন বেঘোরে ছুটতে দেখে নিজের হিটলারি গোঁফে আঙুল বুলিয়ে বুরুশ করলেন কয়েকদফা। তারপর হঠাৎ তড়াক করে সাইকেলে উঠে ধাওয়া করলেন সেকেন্ড মাস্টারের পেছন।
কিন্তু সেই সাইকেল আর দৌড়ের অসম প্রতিযোগিতার ফল হয়েছিল বড়ো বিদঘুটে। অমন মস্ত কুমড়োপটাশভুঁড়ি বাগিয়ে দৌড়োনো কী মুখের কথা! বিশেষ করে যদি মনে হয়, পেছনে সাইকেল নিয়ে যমদূতের মতো ছুরি বাগিয়ে সাঁসাঁ করে ছুটে আসছেন হিজিবিজি ডাক্তার! কিছুক্ষণ পরেই আলপথে হোঁচট খেয়ে পথের ধানখেতে উলটে পড়লেন সেকেন্ড মাস্টার। ভাগ্যিস ধানের গোছ ছিল বেশ গায়েগতরে ভারী, তাই তেমন আহত হননি তিনি। ডাক্তারবাবুও তৎক্ষণাৎ সাইকেল রেখে তাঁকে টেনেটুনে তুললেন ওপরে। কিন্তু সিধে হয়ে দাঁড়াতেই হাউমাউ করে কেঁদে সেকেন্ড মাস্টার বলে উঠলেন, বিশ্বাস করুন ডাক্তারবাবু, আমার পেটে একফোঁটাও জল নেই। স্রেফ মাংস আর চর্বি। রোজ মাংস খেয়ে খেয়ে আমার এই দশা। আপনার কাছে দিব্যি করে বলছি, আজ থেকে মাংস খাওয়া ছেড়ে দিলাম।
হিটলারি গোঁফে বুরুশ করতে করতে হিজিবিজি ডাক্তার তখনও বোঝার চেষ্টা করছেন সেকেন্ড মাস্টারের আজব কাণ্ডকারখানা। কিছুক্ষণ পরে কারণটা হৃদয়ংগম হতে তাঁর ঠোঁটের কোণে ঝিলিক দিয়ে উঠল একখানা লাখ টাকার হাসি।
লাখ টাকাই, কারণ আশপাশের দু-দশখানা গাঁয়ের কোনো লোক নাকি তাঁকে কখনও হাসতে দেখেনি।
অতএব বেশ মোলায়েম কণ্ঠেই তিনি সেকেন্ড মাস্টারকে বললেন, আসলে আপনার সঙ্গে আমার একটা অন্য দরকার ছিল। পথেঘাটে রোজই দেখতে পাই আপনাদের ইস্কুলের ছেলেদের শরীরস্বাস্থ্য খুব খারাপ। ভাবছি একদিন ইস্কুলে গিয়ে স্বাস্থ্যপরীক্ষা করব ওদের। যদি আপনারা অনুমতি দেন-
—এই কথা। কিষ্কিন্ধ্যাচরণ পানিগ্রাহী তখন তাঁর হাপসি-কাটা বন্ধ করে ড্যাবড্যাবে চোখে তাকালেন ডাক্তারের দিকে, সে তো হেডমাস্টারমশাইয়ের সঙ্গে কথা বলে কালই ব্যবস্থা করে দিচ্ছি আমি।
তো এই স্বাস্থ্যপরীক্ষা উপলক্ষ্যেই হিজিবিজি ডাক্তরের আগমন উড়ুক্কুময়ী হাইস্কুলে। সকাল থেকেই সাজ-সাজ রব। অবশ্য হেডমাস্টারমশাই থেকে অন্য সমস্ত মাস্টারমশাই, ছাত্রকুল—সব্বাই তটস্থ হয়ে রয়েছে বিদঘুটে ডাক্তারের ভয়ে। হিজিবিজি ডাক্তার তো স্রেফ নাড়ি টিপেই সব্বার নাড়ির খবর, পেটের খবর, হাঁড়ির খবর জেনে ফেলেন। প্রথমেই ঢুকলেন সেই ক্লাস নাইনে। বুধো দত্ত নামের সেই যে ছেলেটা তাঁর ভয়ে ডুব মেরেছিল, দেখাই করেনি তাঁর সঙ্গে, তিনি খোঁজ করে তাকে ঠিক টেনে বের করেছিলেন তার বাড়ি থেকে। তারপর সমানে ওষুধ আর ইনজেকশন ক-দিন। আজ তাকে টিপেটুপে দেখলেন, তার চোখের ও গায়ের হলদেটে ভাবটা প্রায় অদৃশ্য। তাকে ছেড়ে ধরলেন তার পাশেই ছিল পটলা, প্রায় পটলের মতোই তার ওপর-নীচ সরু, শুধু পেটটা মোটা। তার নাড়ি টিপে বললেন, ‘কি রে, চুরি করে খেয়ে খেয়ে মস্ত একখানা পিলে বাড়িয়ে ফেলেছিস যে, অ্যাঁ?” বলেই তার হাতে পট করে একখানা কড়া ইনজেকশন। পটলার চোখে তখন অশ্রুর ধারাবিবরণী। পটলার পাশেই ছিল নষ্টে। তাকে পরীক্ষাটরীক্ষা করে বললেন, ‘তোর মনে হচ্ছে ম্যালেরিয়া। খুব ভুগছিস মাঝে মাঝে, তাই না? নে হাঁ কর, হাঁ কর,’ বলেই তার গালে হাকুচতেতো বড়ি। নন্টের পাশে ছিল ক্লাসের ডাকাতে-ছেলে লালু। তার নাড়ি টিপতেই অমন দস্যু-দস্যু চেহারার লালু ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলে বলল, সত্যি বলছি স্যার, দিদিমার আমসত্ত্ব একটাও আমি চুরি করিনি। সব চুরি করে আনে আমার ছোড়দা। আমি তার দু-একখানা ভাগ পাই। কুইনিন দিন, ডাক্তারবাবু, আমার ম্যালিরি। ইনজেকশন দেবেন না, আপনার পায়ে পড়ি।
লালুর অমন ডাক ছেড়ে কান্না দেখেই বোধহয় ডাক্তারবাবু গোঁফে বুরুশ করলেন কয়েকবার। তাকে ছেড়ে গিয়ে দাঁড়ালেন কেষ্টর সামনে। কেষ্ট, মানে গাছে উঠে ফলপাকুড়-ডাব ইত্যাদি চুরিতে যার ভয়ানক খ্যাতি। কেষ্টার নাড়ি টিপতেই মুখের চেহারা আদ্যন্ত বদলে গেল তার। ডাক্তারবাবু কড়া চোখ করে জিজ্ঞাসা করলেন, কি রে, তুই কী চুরি করে খাস?
কেষ্ট জিব কেটে বলল, মাইরি বলছি ডাক্তারবাবু, চুরি আমার ধাতে নেই। যা করি, লোকের চোখের সামনেই করি। লোকে আমাকে বলে, ডাকাত।
চুরির ওষুধ যদি ইনজেকশন হয়, তবে ডাকাতির ওষুধ কী। প্রশ্নটা ঘুরতে থাকে ক্লাসসুদ্ধ ছেলেমেয়েদের মাথায়। লাচ্চু তার পাশে বসা অভয়ের কানে-কানে বলল, দেখবি, কেষ্টর নির্ঘাত পেট অপারেশন হবে।
ওদিকে লালুর আমসত্ত্ব-কেসে তখনও কোনো রায় দেননি ডাক্তারবাবু। লালুর মতো দস্যুকে রেহাই দেওয়ায় সবাই বেশ অসন্তুষ্ট। তার মতো কেষ্টার কেসটাও ঝুলিয়ে রেখে ডাক্তারবাবু গিয়ে দাঁড়ালেন তার পাশে রোগাপটকা ফ্যালার কাছে। তারও নাড়ি টিপেটুপে কী পেলেন ডাক্তারবাবু কে জানে, পট করে তার হাতেও একখানা কড়া ইনজেকশন।
হিজিবিজি ডাক্তারের এতসব কাণ্ডেভাণ্ডে ছাত্ররা ভারী ক্ষুব্ধ, অসন্তুষ্ট। ক্লাসের দৈত্যগুলোকে বেমালুম ছেড়ে দিয়ে রোগাপটকাদের ধরে ধরে ইনজেকশন দেওয়াটাকে সব্বাই একবাক্যে কাপুরুষের কাজ বলে সিদ্ধান্ত নিল। কিন্তু মি. কাপুরুষ এই প্রথম আগমনেই ক্ষান্ত দিলেন না। পরপর তিন-চার সপ্তাহ শনিবার-শনিবার এসে প্রতিবারই এইসব রোগাপটকাদের ওষুধ আর ইনজেকশনে আপ্যায়ন করতে লাগলেন চোয়াল শক্ত করে। আর কী আশ্চর্য, সেই রোগাপটকাগুলো চিকিৎসার এহেন আক্রমণে ধরাশায়ী হওয়ার পরিবর্তে মাসখানেকের মধ্যে হয়ে উঠল বেশ নাদুসনুদুস চেহারার।
তাতে হিজিবিজি ডাক্তারের বেশ নাম হয়ে গেল উড়ুক্কুময়ী হাইস্কুলে। রাশভারী হেডমাস্টারমশাই নিজেই একদিন উদ্যোগী হয়ে ঘটা করে মালাটালা পরিয়ে দারুণ সংবর্ধনার আয়োজন করলেন এমন দয়াবান ডাক্তারের।
তো ভালোই চলছিল। এরমধ্যে হিজিবিজি ডাক্তার হঠাৎ বেখাপ্পাভাবে জড়িয়ে পড়লেন এক নিদারুণ ঝামেলাপূর্ণ ঘটনায়। এলাকার জমিদারের বউয়ের হল বিটকেল জ্বর। ফলে অবশ্যম্ভাবী কারণে সে রোগীর চিকিৎসার দায়িত্ব এসে পড়ল ধন্বন্তরি ডাক্তারের হাতেই। ডাক্তার নিয়ম করে রোগী পরীক্ষা করে ওষুধ-ইনজেকশন সব দিয়ে আসেন, কিন্তু জ্বরটা বড়ো তে এঁটে জ্বর, কিছুক্ষণ ক্ষান্ত দেয়, আবার পরদিন ফিরে আসে হু হু করে। এমন অব্যর্থ ওষুধ যে, জ্বর আসার কথা নয়। তবু ডাক্তার আবার দেখেশুনে নতুন করে ওষুধ-ইনজেকশন দিয়ে আসেন, কিন্তু তাতে ফল সেই একই, সাময়িক নিরাময় হয় সে জ্বরের, কিন্তু পরদিন আবার যে-কে সেই। হিজিবিজি ডাক্তারও ছাড়ার পাত্র নন। এমন কত-কত জ্বর তাঁর এই চুল পাকার বয়সের মধ্যে দেখেছেন। ওষুধ দিয়ে ইনজেকশন দিয়ে নির্মূল করেছেন সেসব, আর জমিদার বউয়ের জ্বরের কাছে তিনি কিনা কাবু হয়ে যাবেন! পরদিন আবার জ্বর আসে তো নতুন-নতুন ওষুধ লিখে দেন প্রেসক্রিপশনে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় না। দিনপনেরো এহেন তেএঁটে জ্বরের পাল্লায় পড়ে হিজিবিজি ডাক্তার একদম হিজিবিজি হয়ে গেলেন। গোঁফে হাজারবার বুরুশ করতে করতে গোঁফটাই তেরচা মেরে গেল খামোখা। নতুন কোনো ওষুধের নামও তাঁর কলমের ডগায় আর আসতে চায় না।
ওদিকে জমিদারমশাই তো রেগে আগুন। হিজিবিজি ডাক্তারকে লোকে বলে ধন্বন্তরি। অথচ তাঁর বউয়ের সামান্য জ্বর সারাতে পারছে না এ কী আজব কাণ্ডকারখানা। নাকি ডাক্তার রোগী হাতে রাখছে। মোটা টাকা ভিজিট নেওয়ার লোভে সব ডাক্তাররাই এরকম করে থাকে হামেশা। একদিন রাগ সামলাতে না-পেরে জমিদারমশাই বলেই দিলেন, দেখুন ডাক্তারবাবু, কেস হাতে রাখবেন না। যদি অসুখ সারাতে না পারেন, বলে দিন, অন্য ডাক্তার আনাই।
লজ্জায়, অপমানে লাল হয়ে গেল হিজিবিজি ডাক্তারের মুখ। শেষে বললেন, আর-একটা দিন সময় চাই জমিদারবাবু, তারপর আপনাকে বলব।
রোগী দেখে সেদিন রাতে বাড়ি ফেরার পথে হঠাৎ এমন একটা অদ্ভুত কাণ্ড ঘটল যা স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি ডাক্তার। সাইকেলে চেপে অন্ধকার পথে ফিরছেন, অমনি দেখলেন তাঁর সাইকেলের হ্যান্ডেলে আরও দুখানা হাত, তাঁরই হাতের পাশাপাশি। হাতদুটো কেমন অদ্ভুত কালো লোমে ভরা। বিস্ময়ে হাঁ হয়ে আরও দেখলেন, তাঁর সাইকেলের আগে আগে অন্ধকারের মধ্যে একজোড়া কালো চোখ জ্বলজ্বল করে তাকিয়ে আছে তাঁরই দিকে। নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারলেন না তিনি। ডাক্তারিশাস্ত্রে অগাধ পাণ্ডিত্য তাঁর। এরকম ভৌতিক ব্যাপারে তার কোনো বিশ্বাস নেই। কিন্তু পুরোপুরি অবিশ্বাস করার আগেই হঠাৎ শুনলেন, অন্ধকারে ফিসফিস করে কে যেন বলল, হিজিবিজি ডাক্তার!
সাইকেলের হ্যান্ডেলে ডাক্তারবাবুর হাতটা সহসা কেঁপে উঠল ভয়ংকরভাবে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আবার শুনলেন, জমিদারের বউয়ের অসুখ কিন্তু সারবে না, যদি না-
—যদি না? ডাক্তারবাবুর গলা থেকে অমনিই যেন বেরিয়ে এল কথাটা। অন্ধকারে মনে হল সামনের জ্বলজ্বলে কালো চোখদুটো যেন হাসছে। হ্যান্ডেলে সেই লোমে ভরা হাতদুটো শক্ত হয়ে চেপে বসেছে আরও। সেই সঙ্গে শোনা গেল সেই অদৃশ্য গা-শিউরানো কণ্ঠস্বর, যদি না তোমার ওই হিটলারি গোঁফটা উপড়ে ফেলো—
—গোঁফ! হিজিবিজি ডাক্তার হঠাৎ স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। এর মধ্যে হঠাৎ গোঁফের প্রসঙ্গ আসছে কোত্থেকে। নিজের অজান্তেই তাঁর আঙুলগুলো একবার বুরুশ করে নিল প্রিয় গোঁফখগুটি। এ তাঁর বড়ো সাধের গোঁফ। গোঁফ! হঠাৎ ধমক দিয়ে বলে উঠলেন, অসম্ভব।
হা হা করে হেসে উঠল সেই কালো চোখ আর লোমে ভরা হাতের মালিক। পরক্ষণেই অদৃশ্য হয়ে গেল গা-শিউরানো দৃশ্যটি। ডাক্তার খেয়াল করে দেখলেন তিনি এসে পড়েছেন তাঁর বাড়ির সিঁড়ির কাছে। সাইকেল রেখে বারান্দায় উঠে তখনও বিশ্বাস হচ্ছে না ব্যাপারটা। অতএব গাঁজাখুরি বলে উড়িয়ে দিয়ে তিনি ডুবে গেলেন তাঁর ডাক্তারিশাস্ত্রের গভীরে। আলমারি ঘেঁটেঘুটে, এ-বই ও-বই খুঁজে বের করতে চাইলেন এহেন ভুতুড়ে অসুখের সঠিক ওষুধটি।
পরদিন গিয়ে দেখলেন যথারীতি জাঁকিয়ে এসেছে জমিদারগিন্নির জ্বর। জ্বরের গতিও যেন অন্যদিকে বাঁক নিচ্ছে ক্রমশ বেশ গুছিয়ে গাছিয়ে একটা প্রেসক্রিপশন করে দিয়ে জমিদারবাবুকে বললেন, যেসব ওষুধ এ ক দিন দিয়েছি তাতে জ্বর অমনি সেরে যাওয়ার কথা। আজ আবার ওষুধ বদলে দিয়ে গেলাম। এতেও যদি জ্বরের উপশম না হয়, তাহলে আপনি অন্য ডাক্তার আনবেন।
খুবই বিমর্ষ মনে সে-রাতেও বাড়ি ফিরছেন ডাক্তার, হঠাৎ চমকে দেখলেন সাইকেলের হ্যান্ডেলে আবার একজোড়া লোমে ভরা হাত। সেই সঙ্গে সামনে গনগনে চোখ। কিছুক্ষণ পর সেই গায়ের রোম খাড়া করা কণ্ঠস্বর, শিগগির গোঁফজোড়া কামাও ডাক্তার, নইলে জমিদার বউয়ের কিন্তু নিস্তার নেই।
ডাক্তারবাবু আবার তাঁর হিটলারি গোঁফে বুরুশ করলেন বারদুয়েক। হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কে?
তৎক্ষণাৎ জবাব এল সেই অদৃশ্য কণ্ঠস্বরে, আমি হিটলার।
—হিটলার! ডাক্তারের হাত কেঁপে উঠল সাইকেলের হ্যাণ্ডেলে। চমকে উঠে বললেন, তুমি হঠাৎ আমার কাছে কেন?
—কেন, তা তো তুমি ভালোই জানো? যুদ্ধের সময় কি প্রতিজ্ঞা করেছিলে তা মনে আছে? প্রতিজ্ঞা রাখোনি বলে আমার আত্মার শান্তি হচ্ছে না। অকদম আড়াআড়ি ঝুলে আছি-
—প্রতিজ্ঞা! হিজিবিজি ডাক্তার রীতিমতো বিস্মিত। সে তো বহুকাল আগের কথা। সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আমলে, যখন হিটলারের অকথ্য অত্যাচারে সারা পৃথিবী ব্যতিব্যস্ত, সেসময় মিত্রপক্ষের হয়ে মিলিটারির খাতায় নাম লিখিয়ে ছিলেন হিজিবিজি ডাক্তার। সেসময় হিটলারের মতো একরত্তি গোঁফ রেখে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, হিটলারের পতন হলে তবেই কামাবেন গোঁফটি। শেষ অবধি ধ্বংস হলেন হিটলার। কিন্তু বিদঘুটে গোঁফটার ওপর এত মায়া পড়ে গেল তাঁর যে সে গোঁফ আর কামাবার কথা মনে হয়নি। তারপর এতদিন পর হঠাৎ কেন যে সেই গোঁফখণ্ডটা কামাতে হবে তাও ঢুকল না তাঁর মগজে।
সেদিন আয়নার সামনে বারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলেন এতদিনকার প্রিয় গোঁফটি। হিসেব করে দেখলেন, তাঁর গোঁফজোড়ার বয়স কম হল না। এককালের কালো কুচকুচে গোঁফ ইতিমধ্যে পেকেটেকে একশো। এই গোঁফে বুরুশ না-করলে তার বুদ্ধিই খোলে না আজ-কাল!
পরদিনও জমিদার বউয়ের অসুখ সারল না দেখে তিনি হাতজোড় করে জমিদারকে বললেন, আমাকে মার্জনা করবেন। এ রোগ আমি সারাতে পারব না। আপনি অন্য ডাক্তার আনান-
তারপর ফেরার পথে সেই কালো চোখজোড়াকে কষে ধমক লাগালেন, যতই বিপাকে ফেলো আমাকে, গোঁফ আমি কিছুতেই কামাচ্ছি না। এভাবেই অনন্তকাল ঝুলে থাকো হিটলারসাহেব।
দিনদুয়েক পরে খবর পেলেন, জমিদারবাবু এ-গাঁ ও-গাঁ ছুঁড়ে কয়েকজন বাঘা-বাঘা ডাক্তার আনিয়েছেন। তারা ধুন্ধুমার চিকিৎসা করছে জমিদার গিন্নির। কিন্তু তাতে রোগ সারা দূরে থাকুক, ক্রমশ অবনতি হচ্ছে রোগীর। আরও কদিন পর শুনলেন প্রাণসংশয়। দু-এক দিনের মধ্যেই মারা যাবেন জমিদার বাড়ির বউ।
সেদিন রাতে অন্য একটা কল সেরে ঘরে ফিরছিলেন হিজিবিজি ডাক্তার, হঠাৎ চমকে উঠলেন আবার সেই অশরীরীর উপস্থিতিতে, ফিশফিশ করে বলল, কী চাও ডাক্তার? তোমার গোঁফ, নাকি জমিদারবউয়ের প্রাণ! আর একটা দিন সময় দিলাম ভেবে দেখো—
কথাগুলো শুনে এতটাই টাল খেয়ে গেলেন ডাক্তার যে, সে রাতে বাড়ি ফিরে আর ঘুমই আসে না চোখে। তাঁর এতদিনকার ডাক্তারিজীবনে এমন কঠিন সমস্যার মুখোমুখি হননি কখনও। রোগীর প্রাণ বাঁচানোই তো একজন ডাক্তারের জীবনের সবচেয়ে বড়ো কর্তব্য। মুহূর্তে ঠিক করলেন, গোঁফটা কামিয়েই ফেলবেন।
জমিদারগিন্নির কেসটা ছেড়ে দিয়ে এসেছিলেন বটে, কিন্তু তাঁর রোগ নিয়ে ভাবনাচিন্তা ছাড়েননি তিনি। নতুন নতুন মেডিকেল জার্নাল উলটেই চলেছিলেন, সেভাবেই হঠাৎ একটা অসুখের খবর পড়লেন, যার সঙ্গে জমিদারগিন্নির অসুখের মিল আছে।
পরদিন নিজে থেকেই সাইকেল নিয়ে ছুটলেন জমিদার বাড়ি। গিয়ে দেখলেন জমিদারগিন্নি মৃতুশয্যায়, শুধু হরিনাম শোনানোই যা বাকি। অন্য ডাক্তাররাও এসে জবাব দিয়ে ফিরে গেছেন যার-যার ডেরায়।
হঠাৎ সাইকেলে ডাক্তারকে জমিদার বাড়ি আসতে দেখে চমকে উঠল গোটা বাড়ির লোক। ইনি কি হিজিবিজি ডাক্তার। না তার কোনো ভাইটাই। কামানো গোঁফে আঙুল বোলাতে বোলাতে ডাক্তার বললেন, আর-একবার শেষ চেষ্টা করে দেখি। জমিদারবাবু, এই ওষুধটা খাইয়ে দিন তো-
আর কী আশ্চর্য, ওষুধটা যেন ম্যাজিকের মতো কাজ করল রোগীর শরীরে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই চোখ মেলে তাকালেন জমিদারগিন্নি, তারপর দ্রুত আরোগ্যের পথে। জমিদার তো অবাক। আরও অবাক এই ভেবে ইনি নিশ্চয়ই হিজিবিজি ডাক্তার নয়।
হিটলারের আমলেও এই ধারণা প্রচলিত ছিল যে গোঁফ কামালে নাকি তাঁকে নিশ্চিত চেনা যেত না।
সেদিনই জমিদারগিন্নি সুস্থবোধ করে উঠে বসলেন বিছানায়। হাসিমুখে হিজিবিজি ডাক্তার ঘরে ফিরতে ফিরতে ভাবতে লাগলেন, ব্যাপারটা সত্যিই ভৌতিক, নাকি তাঁর চোখের ভুল। তবে এ ব্যাপারটা বেশ বুঝে গেলেন, তার দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ আমলের চিকিৎসার ধরন আর চলে না। নতুন নতুন মেডিকেল জার্নালে নতুন নতুন চিকিৎসাপদ্ধতির কথা লেখা হচ্ছে। অতএব তাঁকেও বদলাতে হবে চিকিৎসার ধরন। অতএব হিটলারি গোঁফ রাখারও আর কারণ নেই।
