একটি সত্যি-ভূতের গল্প
ভূত বিয়য়ে আমাদের এক মাস্টারমশাই প্রায়ই বলতেন, ভূত বলে কিচ্ছু নেই। ও হল এক ধরনের হিস্টেরিয়া।
আমি ভূতে বিশ্বাস করি কি না-করি সেই বিতর্কিত বিষয়টি আপাতত উহ্য রেখে শোনাই আমার শৈশবের গল্প। ভূত নামক বস্তুটি কীরকম দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সারা পৃথিবী জুড়ে, জনমানসে কীরকম ছাপ ফেলে নানা কিসিমের ভূত, কীভাবে শিশুমনে কোনও এক সময় তার অজান্তে বাসা বেঁধে বাস করতে শুরু করে, সাহিত্যেই বা ভূত কীভাবে ঢুকে পড়েছে যুগে যুগে তা আমরা জেনেছি ভূতের নানা ধরনের গল্প পড়ে। কিন্তু শৈশবে স্বচক্ষে দেখা এই ঘটনাটি তখন যেমন চমকপ্রদ লেগেছিল, পরবর্তীকালে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সন্ধান পেয়েছি আরও আশ্চর্যের।
যেখানে ছিল আমার শৈশবের বসতবাটি, সেই ঈশ্বরীপুর গ্রাম আমার খুব প্রিয়। কৈশেরকালের শেষপ্রান্তে পৌঁছে তাকে ছেড়ে এসেছি ঠিকই, কিন্তু সেই গ্রাম আমার মগজে আজও এক অবশেসন।
গ্রামটার একটা বৈশিষ্ট্য ছিল প্রায়ই কাউকে না কাউকে ভূতে ধরত। ভূতে পাওয়ার খবরটা হু হু করে রটে যেত দূর থেকে দূরান্তরে। পাঁচ-দশটা গাঁ থেকে লোকে ‘হুড়িয়ে’ আসত সেই ভূতে- পাওয়া মানুষটিকে দেখত। তবে অবাক কাণ্ড এই যে, গাঁয়ের মেয়ে-বউদেরই ভূতে পেত বেশি, পুরুষকে তুলনামূলকভাবে কম।
একবার দেখেছিলাম মাছমারাদের একজনের বউকে ভূতে পেতে।
ঈশ্বরীপুরে পর-পর অনেকগুলো বসতি আছে যেখানে থাকে মাছমারারা। রাস্তার ধারে যাদের বাড়ি, বছরের বেশিরভাগ সময়ে তাদের উঠোনে রোদ্দুরে শুকোতে দেওয়া থাকে খ্যাপলা জাল থেকে বেনজাল, সবই। ভোরে উঠে মাছ ধরতে যেত ইছামতীতে, কিছুটা বেলা পর্যন্ত মাছ ধরে সেই মাছ নিয়ে ছুটত বাজারের দিকে। এভাবেই তাদের রুজিরোজগার, জীবনযাপন।
বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে তারা সারি-সারি নৌকো সাজিয়ে চলে যেত সোঁদরবন পেরিয়ে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে। ফিরে এসে শোনাত জঙ্গল আর সমুদ্রের রোমহর্ষক সব গল্প।
তাদের কারও কারও ছেলেরা আমাদের সহপাঠী ছিল। তবে শেষ ক্লাস পর্যন্ত পড়তে পারত খুব কমজনই। বেশিরভাগই হঠাৎ পড়া ছেড়ে দিয়ে জুটে যেত মাছ ধরার পেশায়। তখন আমাদের সঙ্গে দেখা হলে লাজুক মুখে হাসত, সেই হাসি দেখে মনে হত পড়ায় এলেক দিয়ে রোজগারের পথে নামতে হওয়ায় অপরাধ বোধ করত তারা।
হয়তো গরিববাড়িতে এরকমটাই ভবিতব্য।
একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে মাছমারাদের পাড়ায় দেখি ভিড়ে-ভিড়াক্কার। ভিড় দেখলে মানুষের দাঁড়িয়ে পড়া স্বভাব। আমিও ভিড়ের মধ্যে মাথা গলিয়ে দেখতে চেষ্টা করি কী ঠিক ঘটেছে এখানে! শুনলাম ভূতে পেয়েছে বক্কেশ নামে এক মাছমারার বউকে!
শৈশবে ভূত ব্যাপারটা খুবই ভয়ের বস্তু। গ্রামদেশে মাঝেমধ্যে শোনা যায় কেউ না কেউ ভূত দেখে দৌড়ে পালিয়ে এসেছে, কেউ দাঁতে দাঁত লেগে অজ্ঞান। কেউ হয়তো সাইকেলে চলতে চলতে ঠুল খেয়েছে বটগাছের ঝুরিতে। সে এসে কাঁপতে কাঁপতে বলল, ‘পষ্ট দেখিছি ওটা ছিল ভূতের পা। বটের ডালে পা ঝুলিয়ে ছিল বসে ঠিল ভূতটা।’ সেই কাহিনি পল্লবিত হয়ে এক গ্রাম থেকে দশ-বিশ গ্রামে চাউর। ভূতে পাওয়ার কাহিনিও শোনা যায় দূর-দূরান্তরের গ্রামে। কাছেপিঠের গ্রামেও ভূতে পেয়েছে কখনও, কিন্তু চাক্ষুষ করিনি এর আগে।
মা-ঠাকুমার মুখে শুনেছি, ভূতে পাওয়ার একটা লক্ষণ অনর্গল কথা বলে যাওয়া। তখন তার কণ্ঠস্বর যায় বদলে, পুরুষ-ভূতে পেলে পুরুষালি ধরনের গলা, মেয়ে-ভূতে পেলে বেরোয় খ্যানখ্যানে নাকি সুর, চেহারা হয়ে ওঠে ভয়ংকর। তুবড়ির ফুলকির মতো একনাগাড়ে বেরিয়ে আসতে থাকা অশ্রাব্য সব কথার সূত্র ধরে লোকে আঁচ করত কে সেই ভূত!
এ ক্ষেত্রেও লোকের কৌতূহল কার এত লোভ হল বক্কেশের তরুণী বধূটির ঘাড়ের উপর ভর করতে!
ভিড়ের মধ্যে একটু সময় দাঁড়িয়ে যে-দৃশ্যের শরিক হলাম তা আমার বয়সে শিউরে ওঠার মতো। বউটির ঠিক কত বয়স তা বোঝার মতো বয়স হয়নি তখনও। বউ মানে বউ, মা- কাকিমাদের মতো তার অনেক বয়স। বউটির নাম যে আন্না তা জানতাম কেননা স্কুলে যাতায়াতের পথে মাছমারাদের বাড়ির লোকজনদের কিছু কিছু পরিচয় জানাই হয় যেত।
আন্না-বউয়ের গায়ের রং কালো, তার চোখমুখ বেশ সুন্দর। খুব নরমসরম, আর লাজুক ধরনের, মুখ টিপে-টিপে হাসে। সেই আন্না-বউকে মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকতে দেখে কীরকম করে উঠল শরীরের ভিতরটা।
তার সামনে একটা মস্ত ঝাঁটা হাতে ভীষণদর্শন একটি লোক। বুঝতে অসুবিধে হল না এই লোকটিই ওঝা। ওঝা নানা ধরনের হয়–ভূত তাড়ানোর ওঝা, সাপের বিষ নামনোর ওঝা, এমনকী, তুকতাক চিকিৎসাও করে কোনও কোনও ওঝা।
এখন যাকে দেখছি তার নাম শুম্ভ ওঝা, অসুরের মতোই চেহারা। কপালে মস্ত লাল ফোঁটা, ঝাঁকড়া-চুলো, ভাটার মতো জ্বলতে থাকা দুই চোখ, সেকেন্ড ব্র্যাকেটের মতো ইয়া তাগড়াই গোঁফ। সেই ওঝা এসেছে ভূত তাড়াতে।
খবরে প্রকাশ, আন্না-বউকে ভূতে পেয়েছে কাল রাতের বেলা। প্রথমে এসেছিল কম ফিজ নেয় এমন এক কোয়াক ডাক্তার। তিনি জবাব দেওয়ায় খোঁজ পড়ল ওঝার। কোথায় তক্কে তক্কে ছিল শুম্ভ ওঝা, খবর পাওয়ামাত্র আজ দুপুরের দিকে এসে উপস্থিত।
তখন থেকে চলছে ভূত তাড়ানোর কসরত। পেল্লাই এক ঝাঁটা হাতে শুম্ভ ওঝার বীরবিক্রমে লড়াই চলছে এক অদৃশ্য ভূতের সঙ্গে। সাদা বাংলায় ঝাঁটাপেটা। তার পরিণতি আন্না-বউয়ের পিঠের ব্লাউজ ফুঁড়ে চাপ চাপ রক্ত।
গ্রামেগঞ্জে জীবন চলে রয়েবসে, হঠাৎ কোনও উত্তেজনার কারণ ঘটলে সবাই ছুটে আসে কী ঘটেছে! সেই ঘটনা নিয়ে দু-দশদিন আলোচনা-রটনা চলবে যতদিন না নতুন কোনও ঘটনার আবির্ভাব ঘটে। যাকে ভূতে ধরে, সাধারণত সে থাকে ঘরের ভিতর, ওঝাও তার ঘাড় থেকে ভূত তাড়াবে বলে ঘরে অন্তরিন হয়, বাইরে থেকে আকাশবাণীর মতো শুধু শ্রাব্য হয় ওঝার তড়পানি, অজস্র গালিগালাজ, সেই সঙ্গে বেত বা ঝাঁটা দিয়ে পিটুনির শব্দ, সবই সেই অদৃশ্য ভূতের উদ্দেশে। বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে আমোদিত দর্শকবৃন্দ ভয়ে হিম হয়ে এক-বুক আতঙ্ক বহন করে ফিরে আসে ঘরে।
কিন্তু এ-বাড়ির ঘটনায় কিছু ব্যত্যয়। বক্কেশদের ঘরটা বেজায় ছোটো। ওঝা যে সেই ভূতে- পাওয়া বউকে নিয়ে ঘরের কোণে সেঁধুবে তার জো নেই, কাজে-কাজেই আন্না-বউ মুখ থুবড়ে পড়ে আছে বাড়ির সামনে উঠোনে, তার সামনে একটা বলশালী ঝাঁটা নিয়ে দাঁড়িয়ে ওঝা।
ঘটনাটি দৃশ্যমান বলে তাদের বাড়ির সামনে তখন অজস্র দর্শনার্থীর ভিড়। পাড়াগাঁয় আমোদের শো খুব বেশি হয় না, তার উপর এটি বিনি পয়সার শো, অতএব কাতারে কাতারে লোক।
আমোদ এ ক্ষেত্রে অনেকটা বেশিই কেননা নিতান্তই লাজুক এক গৃহবধূ যে-ভাষায় কথা বলছে তা শুনে কানে আঙুল দেওয়ার মতো। কিছু স্কুল-পড়ুয়া ছেলে এক ধরনের খারাপ ভাষা শিখে এন্তার বলে মজা পায় ও যারা একটু ভালো ছেলে তাদের সামনে বলে নিজেদের কৃতিত্ব জাহির করে। আন্না-বউও অনর্গল বলে চলেছে সেই বাছা-বাছা খারাপ শব্দ।
গ্রামগঞ্জে প্রকাশ্য জায়গায়, শয়ে শয়ে মানুষের সামনে এক গৃহবধূর এহেন শব্দপ্রয়োগ বিরল ঘটনা। সবাই অবাক হয়ে শুনছে, কেউ মুখ বিকৃত করছে, কেউ কানে আঙুল দিয়ে চলে যাচ্ছে ভিড়ের বাইরে, কেউ হাসি-হাসি মুখ করে মজা পাচ্ছে।
এ ক্ষেত্রে কিছুক্ষণ জড়িয়ে জড়িয়ে কথা বলতে থাকা বউটির বিশ্রী বাক্যসমগ্র বিশ্লেষণ করে তার শাশুড়িই রায় দিল, ঝা ধরিছি, ঠিকই ধরিছি, ধরিছেন উনিই। মুখ দে পোকা বেরুত তেনার!
মাছমারাদের পাশের পাড়া বামুনপাড়া, সেখানকার ষষ্ঠীজ্যেঠাও বড়ো বড়ো চোখ করে শুনছিলেন আন্না-বউয়ের কথাগুলো, তিনিও সায় দিয়ে বললেন, ঠিক বলেছ, এ হল গে বক্কেশের বাপ পঞ্চা। পঞ্চা খুব বাজে বাজে কথা বলত সগগলের সামনে।
তক্ষুনি বাকি দর্শকরা জলবৎ বুঝে গেল আন্না-বউ নামে এই পুতবউয়ের ঘাড়ে ভর করেছে তার কতদিন আগে মরে যাওয়া শ্বশুর। তিনি নাকি থাকেন চাঁপা গাছের ডালে। কাল সন্ধেবেলা তিনি পেয়েছেন আন্না-বউকে, আজ বিকেল অতিক্রান্ত হতে চলল, এখনও বহাল তবিয়তে তার ঘাড়ে!
বউটির ‘ক্যান্টাঙ্কারাস’ শাশুড়ি তখন চেঁচাচ্ছে, খোকার বাপ বেঁচে থাকতে হদ্দ জ্বালান জ্বালিয়েছে, মরে গিয়েও রেহাই দেবেনিকো, আবার এস্যাছে জ্বালাতে। মার্, মুড়ো ঝ্যাঁটা দিয়ে মার-
কথাটা ওঝাকে উদ্দেশ করে বলা। ওঝার চোখদুটো ঠিকরে বেরোচ্ছে চোখের কোটরের বাইরে। সেই মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা বউটির উদ্দেশে সে থেকে-থেকে চিৎকার করে বলছে, মারের এখনও হয়েছে কি, মেরে তোর পিঠ ভেঙে দেব! বল তুই যাবি কি না!
বলে সপাং সপাং করে ঝাঁটা দিয়ে পেটাচ্ছে ভূতে পাওয়া বউটিকে।
কে যেন বলল, আহা, আর মেরো না! দ্যাখছ না কীর’ম রক্ত বেরুচ্ছে বউটার পিঠ দে! ওঝা চিৎকার করে বলল, আমি কি ওকে মারছি। মারছি ওর শউরকে। হারামজাদার এত সাহস শুন্তু ওঝার সঙ্গে তার করে!
বলেই আবার ঝাঁটাপেটা। আর চেঁচাচ্ছে, বল, যাবি কি না বল্?
সপাটে ঝাঁটাপেটা খেয়েও বউটি তাতে একটুও মুষড়ে না পড়ে, চেঁচাচ্ছে, না, যাব না! পুতের বউ অনেক অত্যাচার সহ্যি করেছে। বক্কেশ রাতে বাড়ি ফিরে এসে আন্নাকে আকথা কুকথা বলবে, মারবে, এ তো আর সহ্য করা যায় না! আজ আমার একদিন আর বক্কেশের একদিন! সব দেখতি পাই চাঁপা গাছের ডালে বসি। কিছুতে এ-বাড়ি ছেড়ে যাব না! দোব বক্কেশের ঘাড় মটকে শালা-
বলে আবার একরাশ চেঁচামিচি।
—যাবি নে মানে? তোর চোদ্দপুরুষ যাবে
বলে আবার ঝাঁটার দৌরাত্ম্য আন্না-বউয়ের পিঠে। তারপর শুরু হল শুম্ভ-ওঝা কর্তৃক শ্বশুর- ভূত খেদানোর এক আশ্চর্য প্রক্রিয়া।
গাঁয়ের মাছমারাদের বাড়ির এক শান্তশিষ্ট, সাত-চড়ে-রা-কাড়ে-না এমন তরুণী বউয়ের ঘাড়ে চেপে বসা শ্বশুর-ভূত গাঁ-বাসীদের কাছে যেমন ত্রাসের তেমনই কৌতূহলের। রগড় পাওয়ার মানুষই বেশি, কেননা এক নিরীহ তরুণী বউয়ের প্রকাশ্যে চেঁচামেচি উপভোগ করছে অনেকে।
আমরা যারা স্কুল-পড়ুয়া তার মাস্টারমশাইয়ের কথা স্মরণ করে ধন্দে পড়ছি। হিস্টেরিয়ায় আক্রান্ত রোগী কি এরকম তেরিয়া হয়ে কথা বলে! কানে আঙুল-দিতে-হয় এরকম বিশ্রী গালাগাল দেওয়া কি হিস্টেরিয়া-রোগীর পক্ষে সম্ভব!
ভিড়ের মধ্যে তখন একশো এক আলোচনার ঝড়। বউটির স্বামী বক্কেশ বেশ হক্কাডক্কা জোয়ান লোক। তাকিয়ে দেখি ভিড়ের মধ্যে বক্কেশ লুকিয়ে দেখছে তার বাপের কাণ্ডকারখানা। মুখটা চুপসে গেছে ভয়ে। তার বাপ মারা গেছে তাও ক-বছর হয়ে গেল, হঠাৎ এতদিন কোথায় তক্কে তক্কে বসে ছিল, আজ হঠাৎ তার বউয়ের ঘাড়ে—
আন্না-বউ তখন গালাগাল দিয়ে ধমকাচ্ছে তার শাশুড়িকেও, বলছে, ইনিও কম যায় না! কথায় কথায় পুতের বউটাকে খুন্তি দে পেটায়! আমি বেঁচে নেই বলে হাতির পাঁচ পা দেখিছে! দোব চুলের মুঠি ধরে চাঁপা গাছে ঝুলিয়ে–
আন্না-বউয়ের শাশুড়িও এতক্ষণ তেড়ে গাল পাড়ছিল তার মরে যাওয়া স্বামীকে, আন্না- বউয়ের কথায় ঘাবড়ে গেল বেশ।
বক্কেশ আর তার মায়ের মুখ—দুটোই তখন শুকিয়ে কিসমিস। বক্কেশ এসে শুন্তু ওঝার কাছে কী যেন বলতে লাগল, তা দেখে আন্না-বউ আরও তেরিয়া বয়ে বলল, হুঁ, লোকটা আবার যুক্তি দেচ্ছে ওই ছেলেটারে! আজ রাতের বেলা জ্যান্ত পুঁতে ফেলব গাঙের চরে।
শুশু ওঝাই বা ভূতের এত ত্যান্ডাইম্যান্ডাই সহ্য করবে কেন, সেও ঝাঁটা বাগিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে মুখ থুবড়ে শুয়ে থাকা আন্না-বউয়ের দিকে।
ঝাঁটা বাগিয়ে আবার শুম্ভ-ওঝা যখন মত্তর পড়ে ভূত ঝাড়াতে যাচ্ছে, অমনি আন্না-বউ উঠে বসে মারমুখী হয়ে তেড়ে যাচ্ছে ঝাঁটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ভয়ংকর চেহারার ওঝাটির দিকে।
বলছে, কত মারবি মার, কিন্তু আজ আমি একটা হেস্তনেস্ত না-করে পুতবউয়ের ঘাড় থেকে নামছি নে।
ততক্ষণে প্রচণ্ড মার খেয়েছে বউটি, মারের চোটে তার পিঠ রক্তারক্তি, ঝাঁটার আঁচড়ে লম্বা- লম্বা লালসিটে রক্তাক্ত দাগ সারা পিঠে। মার খেয়ে গোঙাচ্ছে মুখে আঁ আঁ–শব্দ করে। আচ্ছন্নতার মধ্যেও কীরকম তড়পে চলেছে ঝাঁটা-উঁচোন ওঝার উদ্দেশে।
আমার মনে হচ্ছিল এ সব দেখা ঠিক নয়। পাশে দাঁড়ানো পল্টনকে বললাম, চল, পল্টন, চলে যাই। সন্ধে হয়ে আসছে।
পল্টন বলল, দাঁড়া, আর একটু দেখি। শুম্ভ ওঝা বলছে আজ রাতের মধ্যে ভূত তাড়াবেই তাড়াবে।
এর মধ্যে মাছমারাদের কারও একজনের বউ খুব ভয়ে ভয়ে আন্না-বউয়ের কাছে গিয়ে কী যেন বলল অনুনয় বিনয় করে।
ওঝা আরও একবার তার রক্তাক্ত পিঠে ঝাঁটার বাড়ি শপাং শপাং করে মারতেই আন্না-বউ গোঙাতে গোঙাতে শুয়েই পড়ল আগের মতো। তবু বলে চলেছে, যাব না, কিছুতেই না। য্যাতোক্ষণ না উদের কিছু একটা ব্যবস্থা হচ্ছে।
ওঝা তার গোঙানির উত্তরে আরও ক্রুদ্ধ হয়ে চেঁচাতে লাগল, যাবি না! তোর এত সাহস, জানিস তোর সামনে কে দাঁড়িয়ে আছে! তোর যম।
বলেই একটা ছড়া কাাটতে শুরু করে, দ্রুতবেগে আউড়ে যাওয়া সেই ছড়ার দু-চারটে শব্দ যা আমাদের কানে আসছিল, তা এরকম :
শ্যাওড়া গাছে থাকিস যদি সপাং / চাঁপার ডালে থাকিস যদি সপাং / সাতখানা গাঁ পার হয়ে এই শুম্ভ ওঝা / ঝেটিয়ে তোকে করবেই আজ সোজা / হাতের তেলোয় তুলে তোরে পাঠাবে কৈলাস।
বলেই সপাং সপাং করে আবার ঝাঁটা দিয়ে মারতে শুরু করল তার পিঠে।
এলোপাথাড়ি মার দেখে আমারই শরীর খারাপ লাগছিল, আমার পাশে আরও কতক মেয়ে- বউ দাঁড়িয়ে দেখছিল সেই দৃশ্য, তারা চোখমুখ কুঁচকে বলছিল, আহা বেচারি, আন্নাটা মুখচোরা মেয়ে, আর ওর শউর কিনা ধরল ওকেই! কী পেটানিই না দিচ্ছে!
ক্রমে ভিড় বাড়তে শুরু করে, চারদিক থেকে নানা আলটপকা মন্তব্যও, তার মধ্যে বিজাতীয় ভাষায় মন্তর আর নির্মম ঝাঁটাপেটা। পিঠ দিয়ে রক্ত ঝরঝর করে পড়ছে মাটিতে, কিছুক্ষণ পর বউটি নেতিয়ে পড়ল মাটিতে, হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, যাব, যাব, চলে যাব।
এতক্ষণে শুম্ভ-ওঝার মুখে ফাইনাল রাউন্ডে জেতা বিজয়ীর হাসি। হাতের ঝাঁটাটি শূন্যে ঘোরাতে ঘোরাতে বলল, যাবি না মানে! শুম্ভ ওঝা যখন কেসটা নিয়েছে, তার হাতেই তোর মৃত্যু!
আন্না-বউ তখনও গোঙানো কণ্ঠস্বরে বলে চলেছে, কিন্তু এও বলে যাচ্ছি বক্কেশ যদি ত্যান্ডাইম্যান্ডাই করে, আন্নাকে মারে, যদি ওই শাউড়িটা আন্নাকে খুন্তি-পেটা করে, তা হলে কিন্তু আবার আসপো! ওদের ঘাড় মটকে টাঙিয়ে দোব চাঁপা গাছের ডালে। লোকে লাইন দে দেখতি আসপে।
ওঝার মুখে তখন জয়ের হাসি। নেতিয়ে পড়া বউটার কাছে গিয়ে ঝুঁকে পড়ে বলল, বল, কীভাবে যাবি? ওই শিরীষ গাছটার ডাল ভেঙে যাবি? না, জলভর্তি কলসি মুখে নিয়ে যাবি?
ওঝার কথায় উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে বেশ সাড়া পড়ে যায়। আমি নিজেও খুব উত্তেজিত বোধ করি কেন না এর আগে বহুবার শুনেছি গাঁয়ে ভূতে পাওয়া লোকদের ঘাড় থেকে যখন ভূতেরা চলে যায়, যাওয়ার সময়টা নাকি রীতিমতো রোমহর্ষক। এমন নাকি হয় যে, ভূতরা যখন চলে যায় অশথগাছের মস্ত ডাল ভেঙে পড়ে মড়মড় করে।
বিষয়টা নিয়ে ঘোর সন্দেহ ছিল আমার। ভূত ব্যাপারটা খুবই রহস্যময়। হিস্টেরিয়া হলে কি মানুষ এরকম উল্টাপাল্টা বকে! আন্না-বউ এবার বলল, কলসি। কলসি-
শুম্ভ ওঝা তৎক্ষণাৎ ভিড়ের উদ্দেশে চেঁচিয়ে বলল, কে আছো। এক কলসি জল নে এসো– তার কথা শেষ না হতে পাশের বাড়ির একজন বউ কাঁখে করে নিয়ে এল একটা মেটে কলসি ভর্তি জল নিয়ে। সেই কলসি তার সামনে রেখে ওঝা বলল, কাঁখে করে নে যাবিনি। দাঁতে করে তুলে নে যাবি। এক-পা দু-পা তিন-পা, ব্যস, তারপর যেন তোকে আর এ দিগরে না দেখি!
পরক্ষণেই যে-দৃশ্য চোখের সামনে ঘটল তা প্রায় অবিশ্বাস্য। নেতিয়ে পড়া আন্না-জেলে বউ উঠে বসে, সেই জলভর্তি কলসির কানা চেপে ধরল তার দু-পাটি দাঁতের মধ্যে। ভারী কলসিটা সত্যিই তুলে ধরল দাঁত দিয়ে, অবশ্য সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারল না, একটু নুয়ে এগিয়ে গেল এক-দুই-তিন পা, তারপর কলসিসুদ্ধ দড়াম করে উল্টে পড়ল মাটিতে। কলসি ভেঙে চুরমার, সারা উঠোন জলে জলময়।
মাটিতে পড়েই আন্না-বউ একেবারে অজ্ঞান, তার দুই হাতে মুঠি লেগে গেল শক্ত করে, দু চোখ বোজা, দাঁতে-দাঁত লেগে শরীর স্থির।
সমস্ত উঠোনে তখন লোকে লোকারণ্য। কয়েকজন বউ তাকে ঘিরে ধরে তার মুখে দিতে শুরু করল জলের ঝাপট। একের পর এক ঝাপট দিতে কিছুক্ষণ করে বড়ো করে একটা শ্বাস ফেলল জেলে-বউ। অমনি সমস্বরে সবাই বলল, ও রে জ্ঞান ফিরেছে, জ্ঞান ফিরেছে!
তারও কিছুক্ষণ পর সে অতিকষ্টে উঠে বসল মাটিতে। বাকি বউরা তক্ষুনি ভিজে গোবর হয়ে যাওয়া তার শরীরটা ধরে ধরে নিয়ে গেল ঘরের ভিতর। ওঝা তখন তার তর্জনী শূন্যে ঘোরাতে ঘোরোতে বলল, আই যাও সব। কাছেপিঠে থাকবে না। এখনও তেনার আত্মা কাছেপিঠে আছে।
বলতেই অমনি ভিড় পাতলা হতে শুরু করে।
আমরাও দ্রুত ঘরমুখো। যেতে যেতে মনে হচ্ছিল কলসি-ভরা জল দাঁতে তুলে নিয়ে যাওয়া বেশ কষ্টকর, তবু ভূতটা যদি শিরীষ গাছের ডাল ভেঙে যেত, তা হলে পরিপূর্ণ হত ভূতের বিদায়- দৃশ্যটা।
.
সংযোজন : কিছুটা এগোতেই দেখি বামুনপাড়ার ষষ্ঠীজ্যেঠা তার সামনে জড়ো হওয়া কয়েকজনকে বলছে, এই সব মেয়েদের তো ভূতে পাবেই। রোজ রোজ মার খাওয়া আর খুত্তিপেটা হওয়া কতদিন সহ্য করবে বলো! সব জমা হয়েছিল বুকের ভিতর, তেড়ে বার করে দিয়েছে আজ।
